রকিব হাসান বাংলাদেশের একজন গোয়েন্দা কাহিনী লেখক। তিনি সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত তিন গোয়েন্দা নামক গোয়েন্দা কাহিনীর স্রষ্টা। তিনি মূলত মূল নামে লেখালেখি করলেও জাফর চৌধুরী ছদ্মনামেও সেবা প্রকাশনীর রোমহর্ষক সিরিজ লিখে থাকেন। থ্রিলার এবং গোয়েন্দা গল্প লেখার পূর্বে তিনি অন্যান্য কাজে যুক্ত ছিলেন। তিনি রহস্যপত্রিকার একজন সহকারী সম্পাদক ছিলেন।রকিব হাসান শুধুমাত্র তিন গোয়েন্দারই ১৬০টি বই লিখেছেন। এছাড়া কমপক্ষে ৩০টি বই অনুবাদ করেছেন। তিনি টারজান সিরিজ এবং পুরো আরব্য রজনী অনুবাদ করেছেন। তাঁর প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ ড্রাকুলা। রকিব হাসান লিখেছেন নাটকও। তিনি "হিমঘরে হানিমুন" নামে একটি নাটক রচনা করেন, যা টিভিতে সম্প্রচারিত হয়।
তিন গোয়েন্দা বাংলাদেশে ঘুরতে এসেছে। আরও স্পষ্ট করে বললে ঢাকায় এসেছে। তারা যখন এই ঢাকার মাটিতে পা রেখেছে, সেখানে পায়ে পায়ে রহস্য আসবে না, তা কি হয়? কিশোর পাশার অনুসন্ধিৎসু মন, সবসময় চোখকান খোলা রেখে চলে। কোনো কিছুই তার নজর এড়ায় না। কানের বাইরে যায় না।
আত্মীয়ের বাসায় থেকে কিশোর জানতে পারে এক রহস্যের কথা। ঢাকার রাস্তায় না-কি গাড়ির উইন্ডশিল ভাঙা পাওয়া যায়। নিতান্তই বিচ্ছিন্ন ঘটনা? না-কি কেউ পরিকল্পিতভাবে এমন কান্ড ঘটাচ্ছে?
নিতান্তই ছুটিতে ঘুরতে এসেছে তিন গোয়েন্দা। তাই বলে তো হাত পা গুটিয়ে বসে থাকা যায় না। ঘুরে বেড়াতে হবে, সেই সাথে রহস্যজনক কিছু পেলে তাতেও ঝাপিয়ে পড়তে হবে। হয়তো ছুটির এই সময়টা আরো বেশি উপভোগ্য হয়ে উঠবে। আর যদি জানা যায়, প্রাচীন কোনো মুদ্রা এতে চুরি হয়েছে! তাহলে তো কথাই নেই।
আমেরিকার রকি বিচের পটভূমিতে যতটা জনপ্রিয় তিন গোয়েন্দা, দেশীয় গল্পে থিম ততটাই ফিকে। আমি তো গোয়েন্দাকে বাংলাদেশে যতগুলো অভিযানে দেখেছি, সেই অনুভূতি দিতে পারেনি। “ঢাকায় তিন গোয়েন্দা” তেমনই অবস্থানে শেষ হয়েছে।
এখানে রহস্য থাকলেই তিন গোয়েন্দার যে নিবেদন, তা কোথাও একটা অনুপস্থিত। কিশোরের ক্ষুরধার মস্তিষ্কের খেলা এখানে অবশ্যই ছিল। তবে সেই রকমের থ্রিল বা সাসপেন্স পাওয়া যায়নি। বরং এর বাইরে গিয়ে আশি বা নব্বই দশকের ঢাকার চিত্র এখানে ফুটে উঠেছে।
সেই সময় উত্তরাকে ঢাকার বাইরের একটা অঞ্চল হিসেবে ধরা হতো। এর আশেপাশে গ্রামীণ পরিবেশ ছিল। সেই গ্রামীণ পরিবেশের কিঞ্চিৎ অবস্থান লেখক ব্যক্ত করেছেন। শীতের রাতে খেজুর রস, দেশীয় মানুষদের আন্তরিকতার প্রতিফলন এখানে ছিল।
রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দা এক ধরনের আবেগ। যদিও এই গল্পে তেমন টানটান উত্তেজনা পাওয়া যায়নি, তারপরও খুব যে খারাপ লেগেছে এমন না। লেখকের স্বাভাবিক গল্প বলার ধরন, বাচনভঙ্গি, গল্পের গতি, কিশোর পাঠকদের ধরে রাখার সমস্ত উপাদান ছিল। এই গল্পটা আরো একটু কম বয়সে পড়লে বেশি উপভোগ করতে পারতাম।
শেষের দিকে যেভাবে চমক তিন গোয়েন্দায় উপস্থাপিত হয়, তেমনটি ছিল। চরিত্রগুলোও ঠিকঠাক নিজেদের প্রতি সুবিচার করতে পেরেছিল। তবে আবারও কিশোর শো। বুদ্ধিতে বাজিমাত করে এক নয়, দুটি রহস্যের সমাধানে করেছে। একই সাথে আরো একবার ভূত থেকে ভূতের মাধ্যমে রহস্য সমাধানের চেষ্টা।
এই ভূত থেকে ভূতের অনেক ভালো দিক থাকলেও একটা খারাপ দিকও আছে। যে তথ্য সংগ্রহের জন্য কিশোরের এই আবিষ্কার, ভুলক্রমে শত্রুপক্ষের কানেও ঘটনা চলে যেতে পারে। ফলে নির্দিষ্ট লক্ষ্য বাঁধা প্রাপ্ত হয়।
তিন গোয়েন্দা আমি যতবার পড়ি, নিজের বয়স ভুলে গিয়ে কিশোর হয়ে উঠি। বারবার কিশোর, মুসা, রবিনের সাথে যেকোনো রহস্যে হারিয়ে যাই। এবার ঢাকায় গাড়ি ভাঙা ও মুদ্রা চুরি রহস্যের সমাধান হলো। পরেরবার অন্য কোনো জায়গায়, অন্য কোনো রহস্যের কেন্দ্রে দেখা হবে।
▪️বই : ঢাকায় তিন গোয়েন্দা ▪️লেখক : রকিব হাসান ▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৩.৫/৫
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তিন গোয়েন্দার প্রথম গল্প। গল্পটা যে খুব একটা থ্রিলিং তা-ও না, কিন্তু বাংলাদেশের প্রকৃতি ও মানুয়ের বর্ণনা খুব ভালো লেগেছে। তিন গোয়েন্দা সিরিজের বেশিভাগ গল্প আমেরিকা বা বিদেশী পটভূমিতে লেখা। অনেক জানার আগ্রহ ছিলো যে, তিন গোয়েন্দা যদি বাংলাদেশে আসে সেক্ষেত্রে তারা কি করবে? প্রতিবারের মত রহস্যের প্রতি ছুটবে, নাকি বাংলার প্রকৃতির সৌন্দর্যতা ও মানুষের সহজ সরল জীবনযাপন দেখে বিভোর হবে? অথচ এই গল্পে দুটো কাজই একসাথে দেখিয়েছেন লেখক রকিব হাসান।
বহুদিন পর একটা তিন গোয়েন্দা পড়া, হুট করেই। সেই ক্লাসিক তিন গোয়েন্দা, প্রথমদিকের তিন গোয়েন্দাগুলো বুঝি যেমন ছিলো, চট করে পড়ে ফেলা যায়। যেহেতু আমার ভুলে যাওয়ার অভ্যাস আছে তাই পড়তে পড়তে বুঝেছি, অবশ্যই ছোটকালে এই বইটা পড়া হয়েছিল! মুসার খেজুরের রস খাওয়া কিংবা গরীব গৃহস্থের ঘরে তেল চিটচিটে বিছানা বালিশের গন্ধের মত কিছুকিছু কাহিনী তো সেই বাচ্চাকালেই মনে দাগ কেটে যাওয়া, রিভিশন দিতে গিয়ে যা আবার মনে পড়ল। এত বছর পর এসে যেটা সবচাইতে অদ্ভুত লেগেছে তা হল উত্তরা টঙ্গী খিলখেত এই নামগুলো পড়া। সাথে “১০ স্পিড বাইসাইকেল”-এর মত কিছু শব্দ। ছোটকাল বলতে অবশ্যই আমি বগুড়া থাকাকালীন সময়ে পড়েছি, অর্থ্যাৎ ২০০৬ এর আগে। সেই সময়ে এই নামগুলো আমার কাছে কিছুই মিন করে না, অথচ এরপর উত্তরাতেই কাটিয়ে দিয়েছি ১৬ বছর! হয়েছি সাইক্লিং নিয়ে এন্থুয়াজিস্ট। এই বইটা পাবলিশড হয়েছিল ৯১ সালে, সেই সময়ে উত্তরা, খিলখেত, টঙ্গী নামগুলো কোন বইয়ে আসা কিংবা বাংলাদেশি কারো “১০ স্পিড” সাইকেল সম্পর্কে জানাটাও যথেষ্ট অবাক করার মতন! সেসময়কার তুরাগ নদী কিংবা টঙ্গীর আশপাশের বিস্তীর্ণ বিরানভূমি বা ক্ষেতখামার জলাভূমির অপরূপ সৌন্দর্যের বর্ণনা পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি, চোখের সামনেই তো দেখলাম দিয়াবাড়ি সহ মেট্রোরেলের ওইদিকটা কীভাবে ধ্বংস করে ফেললো… তিন গোয়েন্দা হিসেবে যে খুব অসাধারণ, তা না, এর চাইতেও ঢের শ্বাসরুদ্ধকর তিন গোয়েন্দা পড়েছি। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লেখা প্রথম তিন গোয়েন্দা মেবি এটাই। আমার প্রথম পড়া তিন গোয়েন্দাটাও ছিল বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই লেখা, ভলিউম ৪৬ এর প্রথম গল্পটা, নাম ভুলে গেছি, পাইলে টপাটপ পড়ে ফেলতে হবে!
একটা প্রচ্ছদ ছিল খেজুর গাছে রস পাড়ার দৃশ্যের। এই বইটা আরেকটা ইলাস্ট্রেটেড প্রচ্ছদে বেরিয়েছিল, সেটাও সুন্দর। বইয়ের কাহিনি বাংলাদেশে ফিট করা গেছে কোনো মতে।