কনফুসিয়াস, লাওৎসু, গৌতম বুদ্ধ প্রমুখ মহামতির জীবন ও ভাব জারিত করে উদ্ভূত এক দর্শনের নাম ‘জেন’। জেনের সাথে বৌদ্ধ আদর্শের যোগ গভীর, তবে এর দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত। হিন্দু বৌদ্ধ শিখ মুসলমান কি খ্রিস্টান, চোর-ডাকাত কিংবা রাজা-মহারাজা, জেনের পতাকাতলে সবাই সমান।
জেনকে নানা আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করা যায়, তবে একে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। জেন দর্শন চর্চাকারী গুরু-শিষ্য একাধারে নিবিড় ধ্যানী ও কঠোর পরিশ্রমী। তাঁরা কথার মারপ্যাঁচে কিংবা হাস্যরসের সঞ্চার করে জীবনের গূঢ় অর্থ বোঝাতে পারদর্শী। সুকঠিন সময়ে তাঁরা নির্বিকার থাকতে পারেন, আবার সামান্যতেই ভাঙতে পারে তাঁদের ধ্যান।
এই সংকলনের গল্পসমূহ আকারে ছোট কিংবা ছোটর চেয়েও ছোট। তার মাঝেই পাওয়া যাবে দিগন্তবিস্তৃত প্রেম কিংবা সুগভীর কৌতুক। গল্পগুলো যেমন বুদ্ধিদীপ্ত, তেমনি আবার বোকা বোকা, অতি সরল। একটি গল্প যেখানে উদার, সেখানে পরের গল্পটিই ভীষণ কঠোর।
জেন গল্প পড়তে ভালো লাগে। ভালো লাগে এসব গল্পের সহজ জীবনদর্শন। তাই হাতের কাছে পেলেই জেন গল্প পড়ি। এ বইয়ের গল্প বেশিরভাগই দারুণ। অনুবাদ ভালো কিন্তু রাজীব দত্ত'র ঢাকাইয়া ভাষার ব্যবহার পছন্দ হয়নি। প্রতি পাতায় মাত্র একটা করে গল্প দিয়ে পৃষ্ঠা আর দাম বাড়ানোর মাজেজাও বুঝলাম না।
(বই থেকে পছন্দের একটি গল্প -
ধ্যান করতে করতে বিরক্ত শিষ্য গেল গুরুর কাছে। বলল, 'গুরু, আমি তো কিছু পারি না। বসলেই খালি ঘুম পায়। মনোযোগ থাকে না। পা ব্যথা করে। কী করি এখন?' গুরু বললেন, 'আচ্ছা। সবুর কর। কেটে যাবে।'
অনেকদিন পর। সেই শিষ্য আবার গেল গুরুর কাছে। বেশ খুশি। বলল, 'গুরু, এখন তো আমার কোন সমস্যাই নাই। ধ্যানে বসি আর শান্তি শান্তি লাগে। দুনিয়ায় যেন কোন দুঃখই নাই।' গুরু মন দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, 'আচ্ছা। সবুর কর। কেটে যাবে।)
আরিফ রহমানের 'একগুচ্ছ জেনগল্প' পড়ার কারণে বেশিরভাগ গল্পই আগে পড়া হয়ে গেছে। তবে জেন গল্পের এই সংকলনটা আরো ভালো হতে পারতো যদি জেন গল্পগুলো নিয়ে অনুবাদকদের নিজস্ব ব্যাখ্যাগুলো জানা যেত।
জীবন দর্শন এক রহস্যের নাম। অথচ জীবন খুব বেশি বড় কিছু নয়। জীবন কে জানতে ও বুঝতে কিছুটা সময় দরকার৷ জীবন হচ্ছে এক মায়া আর এই মায়ার বাধনেই সবাই আবদ্ধ থাকে।
বৌদ্ধ ধর্ম হচ্ছে সবচেয়ে শান্ত বা শান্তির বানী পৌছে দেয়ার অন্যতম মাধ্যম। থেরবাদ, মহাযান এবং ব্রজযান এই তিনটি শাখায় বিভক্ত।
তবে সব শাখাতেই মুল ছিল শান্তি। এই সব শাখার ভেতর থেকেই জন্ম নিয়েছিল জেন শাখা। মুলত জেন এর উৎপত্তি ছিল বৌদ্ধ ধর্মকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে যাওয়া।
জেন সাধুরা মুলত কর্ম কেই ধ্যান এবং জ্ঞান করতেন। তারা তাদের জ্ঞান কে হাস্যরসের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতেন। এই থেকেই জেন গল্পের উৎপত্তি।
সুক্ষ্ম হাস্যরস আর জীবন বোধের জ্ঞান দান ছিল এই গল্প গুলোর মুল। সাধুরা তার শিষ্যদের কাছে এই গল্প আর জীবনবোধকে তুলে ধরতেন। যাতে করে তারা জীবন ও জ্ঞান সম্পর্কে অবগত হন। তাদের জীবন ধারায় পরিবর্তন নিয়ে আসেন৷ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন।
গভীর দর্শন নয়৷ আবার জীবনের প্রতিটি দিক তুলে ধরাই হচ্ছে জেন গল্পের মূল দর্শন।
"মরা বিড়ালের মাথা" বইটিতে ছোট ছোট করে অনেক গুলো জেন গল্প অনুবাদ করা হয়েছে। তিন জন অনুবাদক বইটি গল্প গুলো অনুবাদ করেছেন।
জেন গল্প নিয়ে পড়া এটা প্রথম বই। এর আগে টুকটাক গল্প সোস্যাল মিডিয়াতে পড়া হয়েছে। এই বইতে গল্পের উপস্থাপনার ধরন পছন্দ হয়েছে বেশ। জেন গল্পের এই সংকলনটা আরো ভালো লাগতো যদি গল্পগুলো নিয়ে অনুবাদকদেরা নিজস্ব ব্যাখ্যাগুলো জানাতেন। জেন কে নানাভাবে বিশ্লেষণ করা যায়, কিন্তু সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। যারা জেন সম্পর্কে জানেন না, তাদেরকে বলবো জেন গল্পগুলো পড়েন, পড়তে পড়তে ভাববেন, ভাবতে ভাবতেই একটা ফ্রেম দাড় করাতে পারবেন। এই বই এর ভূমিকা থেকে অনেক তথ্য পাবেন, যা জেন নিয়ে সামগ্রিক একটা ধারণা দেবে,তবে পুরোপুরি না। তিনজনের অনুবাদের ফ্লেভার ৩ রকম। একজন সরাসরি আঞ্চলিকতাকে তুলে ধরেছেন। প্রয়াত মুরাদ নীল সাহেবকে ধন্যবাদ এই উদ্যোগের জন্য। মধুপোককে ধন্যবাদ, আমার মতো গরীবদের কথা ভেবে প্যাপারব্যাক সংস্করণ রাখার জন্য। অভিযোগও আছে। এতো এতো খালি পেজ রাখার কি প্রয়োজন ছিলো?
জেন গল্প হলো এমন এক ধরনের গল্প যা জেন বৌদ্ধধর্মের নীতি এবং প্রজ্ঞার উপর ভিত্তি করে লেখা হয়। এগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সহজ, সরল ভাষা এবং গভীর জীবনদর্শন। জেন গল্পগুলিতে প্রায়শই দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনা, প্রাকৃতিক দৃশ্য, অথবা গুরু-শিষ্যের কথোপকথন তুলে ধরা হয়।
জেন গল্পগুলি নিছক বিনোদনের জন্য নয়, বরং জীবনের গভীর অর্থ এবং আধ্যাত্মিক পথের দিশা খুঁজে পেতে সাহায্য করে। এগুলি মনকে শান্ত করতে সহায়তা করে থাকে।
এই বইয়ের গল্পসমূহ আকারে ছোট, তবে তার মাঝেই পাওয়া যাবে দিগন্ত বিস্তৃত প্রেম কিংবা সুগভীর কৌতুক। গল্পগুলি একসাথে যেমন বুদ্ধিদীপ্ত আবার তেমনি বোকা বোকা, অতি সরল টাইপের। আবার ঠিক পরের গল্পটি যেন গম্ভীর গাম্ভীর্যময় পূর্ণ।