"পাহাড়ের লাল আখ্যানে" উঠে এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে কমরেড সিরাজ সিকদার এবং পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির বিপ্লবী সংগ্রামের এক অজানা অধ্যায়। এ অধ্যায়টি প্রথমবারের মতো জনসম্মুখে প্রকাশিত হচ্ছে। এই সংগ্রাম ছিল মূলত ”ছয় পাহাড়ের দালাল” মুজিব দুঃশাসনের বিরুদ্ধে পূবাসপা-র সশস্ত্র গণযুদ্ধের অংশ। এটি ছিল কোনো কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পাহাড়ি ও বাঙালির সম্মিলিত একমাত্র বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রাম, যার সূচনা হয়েছিল জন সংহতি সমিতি-র সশস্ত্র সংগ্রামের আগে এবং বিস্তৃতি ঘটেছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় অর্ধাংশে। বাংলাদেশে তারাই প্রথম কোনো নিয়মিত গেরিলা বাহিনী কোম্পানি স্তরে সংগঠিত করেছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদেরই বিরুদ্ধে প্রথম ঘেরাও-দমন অভিযানটি পরিচালনা করে ব্যর্থ হয়েছিল। এ সব কারণে বাংলাদেশের সর্বহারা বিপ্লবের ইতিহাসে এই অধ্যায়টি বিরাট তাৎপর্য বহন করে। এই সংগ্রামের তিন কান্ডারির লেখা নিয়ে এ বই। তাদের লেখায় চিত্রিত হয়েছে সমতলের বাঙালি কর্মীদের পাহাড়িদের সাথে মিশে গিয়ে পাহাড়-জঙ্গলে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার এক রোমাঞ্চকর যাত্রা। রূপকথার মতো গণযুদ্ধের এ উত্থানের গল্প কেবল আলোড়িতই করে না, কমরেড সিরাজ সিকদারকেও নতুন আলোয় আবিষ্কার করতে সাহায্য করে।
মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরেই বামপন্থীদের একটা অংশ "পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি গঠন করে যার নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড সিরাজ সিকদার। বুয়েটে অধ্যয়নকালেই তিনি মাওবাদী, লেলিনবাদী রাজনৈতিক সাহিত্যের নিবিড় পাঠ তাকে পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানের শাসনের নামে শোষণ তাকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন পূর্ব বাংলা গঠনের স্বপ্নে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ করে। মুক্তিযুদ্ধের পরেও তিনি তাঁর পার্টির কার্যক্রম সম্প্রসারিত করেন। তারই সংগঠনের একটা অংশ ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে।
স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে বহু বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়েছে। মুজিব সরকারের আমলে সিরাজ সিকদারের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আজও আলোচিত বিষয় এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন রাজনৈতিক চর্চা কিভাবে ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী দ্বারা ভূলুণ্ঠিত হয় তারই জলন্ত উদাহরণ। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আমলের পুরো সময় সংগ্রাম করেছিলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার অল্প দিনের মধ্যেই তাঁর নীতিগত মতাদর্শের আমুল পরিবর্তন হয়। তাঁর শাসনামলেই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো বিচার বহির্ভূত হত্যার সাথে পরিচিত হয়। বিপ্লবী ও সর্বহারা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সিরাজ শিকারকে গুম করে দেয়া হয়। এখনো এই বিচার বহির্ভূত গুম ও খুনের কোন সুরাহা হয়নি। এই বিষয়টি ইতিহাসে অমীমাংসিত ঘটনা হিসেবেই রয়ে গেছে। তাছাড়া, সিরাজ শিকদারই প্রথম ব্যক্তি যিনি কিনা বাঙালী ও পাহাড়ীদের বিভেদ দূর করে একটা সংগঠনে আনতে পেরেছিলেন। সিরাজের নেতৃত্বেই পাহাড়ি-বাঙালী একত্রে হয়ে মুজিব দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গণসংগ্রাম গড়ে তুলেছিলেন। যার কারণেই, মুজিব রোষানলে পরতে হয়েছিল সিরাজ শিকদারকে। ১৯৭৪ সালের দিকে সিরাজ সিকদার সহ সর্বহারা পার্টির সকল নেতা কর্মীদের উপর ব্যাপক দমন পীড়ন চালানো হয় সরকারি বাহিনী কর্তৃক।
সিরাজ সিকদারের রাজনৈতিল দল এবং তাঁর সংগ্রামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল এমন তিনজনের বয়ানেই চিত্রিত হয়েছে বইটা।