অন্ধকারের একটা অদ্ভুত আকর্ষণ আছে। একসময় বাঁশবনের মধ্যে, ছায়াঘন পুকুরে, নির্জন মাঠে জমে থাকা অন্ধকারের টানে আমরা ভূতের গল্প পড়তাম, শুনতাম, উপভোগ করতাম। আজ আমরা মনের অন্ধকারের টানে ডার্ক গল্প খুঁজি। সে গল্প যেন এমন হয়, যা পড়তে গিয়ে চেনা চরিত্রদের অচেনা পরিণতি দেখে শিহরন... না, একেবারে ভয় জেগে ওঠে। পাই কি? অন্তত এই বইয়ের ছ'টি গল্প সেই নিজস্ব অন্ধকারের সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতে পেরেছে। গল্পগুলো হল~ ১) বার্টার ডিল; ২) মাংসাশী; ৩) ছাতুরী; ৪) কাক ডাকা রাতে; ৫) ধূমপান নিষেধ; ৬) সত্যি হলেও গল্প। এই গল্পেরা পুরুষ ও নারীর সম্পর্ক— যাকে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় একেবারে প্রাগৈতিহাসিক বলে দিয়েছিলেন— ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। সেই সম্পর্কে চাওয়া ও পাওয়ার মাঝের ব্যবধান, তার অর্থ, সর্বোপরি মনের কোণে ঘন হওয়া অন্ধকার কীভাবে হিংস্র শ্বাপদের মতো আক্রমণ করে অন্যকে... এমনকি নিজেকেও— তারই গল্প বলেছেন লেখক। অভিষেকের লেখার হাতটি দুর্দান্ত। ধারালো ও স্মার্ট লেখনীর সঙ্গে মিশেছে পরিমিতিবোধ এবং বাস্তবানুগ চরিত্রচিত্রণের ক্ষমতা। প্লটের মধ্যেও আছে লেখাকে অতিলৌকিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মাঝেই দোলায়মান রাখার বিরল গুণ। তবে কয়েকটি গল্প বড়ো বেশি ওপন-এন্ডেড থেকে গেছে বলে একটু অপ্রাপ্তির অনুভূতিই রয়ে গেল ভেতরে-ভেতরে। বইটির ছাপা পরিষ্কার ও বানান নির্ভুল। অলংকরণগুলো লেখার আবহনির্মাণে যথাসম্ভব সংগত করেছে। তবে এর মুখ্য আকর্ষণ এই গল্পগুলো— যাদের নিঃসন্দেহে মৌলিক ও সার্থক বাংলা ডার্ক ফিকশনের উজ্জ্বল (নাকি অন্ধকার?) প্রতিনিধি বলা চলে। অন্ধকারের অনুরাগী পাঠকেরা বইটিকে আপন করে নিতে পারেন। আমার ধারণা, বইটা হতাশ করবে না।
অপরাধ কী? যে সমস্ত অপরাধ আইনের বই এ স্থান পায় সেগুলিই কি শেষ, সেগুলিই কি "অপরাধ" আর শাস্তিই বা কী? আইনের হাতে ধরা পড়ার পর আইন মেনে যেই বিধান দেওয়া হয় সেটাই কি আসল শাস্তি নাকি মনের ভেতর লুকিয়ে রাখা অপরাধ বোধ, যেটা মানুষকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়? সেটাই আসল শাস্তি! পাঠক হয়তো ভাবছেন বইয়ের প্রতিক্রিয়া লেখার শুরুতে এসব ভনিতার কী দরকার? তাই তো? কারন লেখক তার এই সৃষ্টির মাধ্যমে এই প্রশ্ন গুলিই তুলেছেন আমাদের সামনে আর সেইটাই এই বইয়ের উপজীব্য। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য এই ষড়রিপুর বশবর্তী হয়েই মানুষের মনে জন্ম নেয় বিকৃত কামনা, বাসনা এবং সেই বীজ থেকেই জন্ম নেয় অপরাধ প্রবনতা। তারপর? সেই গল্প জানতে হলে আপনাকে প্রবেশ করতে হবে এই অন্ধকার জগতে। প্রতিটা রিপুর অঙ্গুলিহেলনে জন্ম নেওয়া এক একটা অন্ধকার, কালো গল্প বলে এই বইটি। চলুন একটু একটু করে জেনে নিই সেই কাহিনী গুলি। ১. বার্টার ডিল: নিজের স্ত্রীকে নিয়ে হতাশ, তিতিবিরক্ত এক যুবক ক্ষনিকের দেহের খিদে মেটানোর জন্য খুঁজে বেড়ায় নতুন নতুন আশ্রয়, একসময় সেই খিদের তাড়নাই জন্ম দেয় এক ষড়যন্ত্রের। কিন্তু তার বিনিময়ে সে হারায় নিজের অন্যতম "প্রিয়" একটা বস্তু! কি সেই বস্তু? কিসের বিনিময় হয়েছিল সেই লেনদেনে? "কাম" নামক আদিম রিপু কি নিয়ে তৈরি হওয়া এক আঁধার আখ্যান। এককথায় দারুন। মাংসাশী: রবিবারের দুপুরের গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত আর কচি পাঠার ঝোল হোক বা পাড়ার দোকানের চিকেন রোল থেকে শুরু করে বিখ্যাত দোকানের মাটন বিরিয়ানি আর চিকেন চাপ, নামগুলি শুনলেই কেমন জিভে জল চলে আসে না? এই গল্পের নায়কেরও হয়েছিল! না সেটা দোষের নয়, কিন্তু সেটা যদি মাত্রা ছাড়িয়ে যায়? এই গল্প আসলে রূপকের আড়ালে বলা এক ভয়ানক কামনার গল্প। কিছুটা স্প্ল্যাটারপানক ঘরানার, ফলত একসময় গা শিরশির করে ওঠে। তবে অবাক করে চরিত্র গঠন ও তার বিবর্তন। লেখকের মুন্সিয়ানায় সত্যিই মুগ্ধ হতে হয়। এই বইয়ের অন্যতম সেরা execution! ছাতুরী: এই গল্পটা আসলে পেঁয়াজের মতো অথবা পেঁচানো সিড়ির মতোও বলা যায়। মূল চরিত্রের মনের ভেতরের অন্ধকার কিভাবে জমতে জমতে আস্ত একটা স্যাতসেতে আস্তাকুড়ের পাহাড়ে পরিণত হয় তার এক অত্যন্ত ভয়ানক সুন্দর পরিবেশনা হলো এই আখ্যান। গল্প যত এগোয় ততই নতুন নতুন করে যেন এক একটা জঞ্জালের স্তর জমতে থাকে নায়কের মনে। লা জবাব লেভেলের গল্পের layering ও execution! কাক ডাকা রাতে: ডারউইন তো কবেই বলে গেছেন survival of the fittest এর সূত্র। প্রকৃতিই যেখানে Best of the best কেই বেছে নেয় সেখানে একজন মানুষ হিসেবে আমরাও কি চাইতে পারিনা নিজের জন্য আরেকটু বেশি সুন্দর, আরেকটু বেশি স্মার্ট, আরেকটু বেশি স্বচ্ছল কাওকে? যাকে আশ্রয় করে লতিয়ে গেলেই সমস্ত জীবন আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। খুব কি অপরাধ হবে সেটা? নাকি যে সমস্ত কিছু জানার পরেও সারাজীবন আমাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করে তার কাছেই ফিরে যাওয়া উচিত? এই গল্প এক অদ্ভুত অপরাধবোধের, এক অদ্ভুত অন্তর্দ্বন্দ্বের।রূপক হিসেবে যেই জিনিসের ব্যবহার হয়েছে সেটা বহুল ব্যবহৃত হয়েও এই গল্পের ক্ষেত্রে যথাযথ। চর্বিত চর্বন মনে হয় না। ধূমপান নিষেধ: একজন যুবক, একজন যুবতী, একজন মাঝবয়সী মহিলা। এক অদ্ভুত সম্পর্কের সমীকরণ। তার সাথে জুড়ে যায় হঠাৎ ক্রোধের বশে বলে বসা একটা উক্তি। তছনছ করে দেয় এই তিনজনের জীবন, দুজন প্রাণ হারান আর একজন বেঁচে থাকেন অপরাধবোধকে পিঠে চাপিয়ে। সত্যিই কি পেছনে ফেলে আসা সম্ভব এই পিছুটান? বাকি গল্পগুলোর তুলনায় একটু জটিল তবে এই বইয়ের অন্য কাহিনীগুলির মতই অভিঘাত দিতে সক্ষম। সত্যি হলেও গল্প: এই গল্প এক পালিয়ে বাঁচতে চাওয়া যুবকের। তার মনে পুষে রাখা এক অদম্য ইচ্ছের কথা বলে এই গল্প।কিসের টানে সে বারবার ছুটে যায়, পাল্টে ফেলতে চায়, নিজের মত করে হিসেব বুঝে নিতে চায়। বেশ বেশ ভালো।
চিরাচরিত নারী পুরুষ নিয়ে এই গল্প গুলি গাঁথা হলেও অবাক করে কাহিনীর প্রেক্ষাপট ও তাদের ব্যবহার। লেখককে কুর্নিশ। ভদ্রলোকের লেখা বেশ কিছু ছোট গল্প পড়ে এবং শ্রুতিনাট্য মাধ্যমে শুনে ওঁর লেখার প্রতি একটা সম্ভ্রম এবং আগ্রহ ছিলই। বাকি জনরার গল্পে ওঁর বিচরন কেমন জানি না কিন্তু ডার্ক ফ্যান্টাসি ও ডার্ক ফিক্সন জনরায় ওঁর অবাধ বিচরন, ফলত খুব স্বাভাবিক ভাবেই ওঁর প্রথম বই এর প্রতি একটা আগ্রহ শুরু থেকেই ছিল। একথা জোর দিয়েই বলা যায় যে লেখক এই বিষয়ে সফল। প্রশ্ন হলো এই বই কি আপনার সময় ও অর্থ দাবি করে? এককথায় বলতে গেলে হ্যা, অবশ্যই করে এবং আপনি যদি প্রাপ্তমনস্ক ফ্যান্টাসি, ডার্ক ফ্যান্টাসি ও সাইকোলজিকাল থ্রিলারের ভক্ত হন তবে এই বইটি আপনার অবশ্যপাঠ্য। লেখক ও প্রকাশককে ধন্যবাদ আমাদের এরকম একটি বই পড়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য। লেখকের থেকে এরকম লেখার অপেক্ষায় থাকবো।
ডার্ক ফিকশন আমার খুব পছন্দের বিষয়। বর্তমান কালে ডার্ক লেখা জনপ্রিয় হয়েছে। খুব ভালো থেকে একদম বাজে সবরকম পাঠ অভিজ্ঞতাই হয়েছে এইরকম বইয়ের খোঁজে। বলতে দ্বিধা নেই, অভিষেক টিটো চৌধুরীর বই 'রিপুতাড়িত' বাংলা ডার্ক ফিকশনের জগতে এক উজ্জ্বল সংযোজনা। ষড়��িপুর ছয় প্রকারকে সঙ্গী করে এক চমৎকার গল্প সংকলন করেছেন। প্রত্যেকটি গল্পের মধ্যে অভিনবত্ব আছে। সে ন্যারেশন থেকে বিষয়বস্তু থেকে রিপুর প্রতিফলন, সব কিছুর মধ্যেই নূতনত্ব আছে। আমার বিশেষ ভাবে ভালো লেগেছে - এক্সেকিউশন। উত্তম পুরুষ কথনের ভীষণ ভালো নিদর্শন আছে এই বইটিতে। ভালো লেগেছে প্রত্যেকটি গল্পকেই অলৌকিক বা মনস্তাত্ত্বিক, দুই ভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়। লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মানুষের মনের গভীরতম অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরেছেন। ডার্ক ফিকশনের সমস্ত বাক্স টিক!
সংকলনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ:
১) বার্টার ডিল: একটি মানুষের কাম নামক রিপুর কারণে কী পরিণতি হলো সেই নিয়ে এই গল্পটি। শেষে একটি লাভক্রাফটের ছোঁয়াও পেলাম। বেশ ভালো গল্পটি।
২) মাংসাশী: লোভ মানুষকে কী কী করাতে পারে, সে খাবারেই হোক বা অন্য কিছু, জানতে এই গল্পটি পড়ুন। ভীষণ ভালো লেগেছে গল্পটি। তোফা! তোফা!
৩) ছাতুরী: দুই ভাইয়ের সম্পর্ক দিয়ে শুরু করে, একের পর এক চমক এসেছে গল্পতে। মাৎসর্যকে কেন্দ্র করে লেখা এই গল্পটি। কিছু জায়গায় একটু ড্র্যাগ লেগেছে। কিন্তু চমৎকার এক সাইকোলজিক্যাল হরর গল্প।
৪) কাক ডাকা রাতে: মদ নামক রিপু নিয়ে লেখা এই গল্পটি। একটি মেয়ে নিজের এক আত্মীয়র বাড়িতে এসেছে কিছুদিনের জন্যে, কিন্তু সেই থাকা সুখকর হলো না। মোটামুটি লেগেছে গল্পটা।
৫) ধূমপান নিষেধ: এই গল্পের ন্যারেশন ভীষণ ভালো লেগেছে। দুজনের কথোপকথন দ্বারা লেখা এই গল্পটি। এই গল্পের কেন্দ্রে আছে ক্রোধ। একটি ছেলে রোজ বিকেলে সিগারেট খেতে যায় ছাদে। কোনও কোনও দিন দেখতে পায় এক মেয়েকে। একদিন কী হয় তাদের মধ্যে? শেষের চমকটি বেশ ভালো। এই গল্পটি আমার শ্রেষ্ঠ লেগেছে।
৬) সত্যি হলেও গল্প: গল্পের নামেই অর্ধেক কিস্তিমাত করেছেন লেখক। মোহ নামক রিপু নিয়ে লেখা এই গল্পটি। একটি ছেলে উত্তর কলকাতার এক পাড়ায় থাকতে আসে। অদ্ভুত সেই জাগায়টা। রাতে কেউ বের হয় না সেখানে। কোনও এক মায়ায় আচ্ছন্ন সবাই সেখানে। গল্পের শেষ একদম আমার মনের মতো হয়েছে। কিন্তু শেষটা আরেকটু কম বোঝালে আরও বেশি খুশি হতাম। তাও বলবো, তোফা! তোফা!
ক্রাউন আকারের এই বইটির মধ্যে সবকটি অলংকরণ চমৎকার। সময় নিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করেছি বইটি। ডার্ক ফিকশন পছন্দ হলে পড়ে ফেলুন নির্দ্বিধায়। অলমিতি!