ম্যাসন সিরিজের ধারা বেয়ে ডিটেকটিভ তারিণীচরণের চারটি একেবারে নতুন কাহিনি- মৃগতৃষ্ণা, ভস্মবহ্নি, ইয়ান জি হং-এর মুক্তো আর গোধুলীসন্ধিকে দুই মলাটের মধ্যে নিয়ে প্রকাশিত হল "ডিটেকটিভ তারিণীচরণ" বইখানি। ম্যাসন সিরিজ পড়েননি, এমন পাঠকের কি এই বই পড়তে সমস্যা হবে? এই চারটি কাহিনিতেই বেশ কিছু সত্যি আর কাল্পনিক চরিত্ররা এসেছেন। তবে হাতেগোনা কয়েকটি চরিত্রকেই চারটি কাহিনিতে ঘুরে ফিরে দেখা যাবে। মুখ্য চরিত্রপরিচয় বিভাগে তাঁদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। এই চরিত্রগুলো বাদে কাহিনিগত দিক থেকে প্রত্যেকটি উপন্যাস স্বতন্ত্র এবং ম্যাসন সিরিজের সঙ্গে এদের কোনও সম্পর্ক নেই। তাই ম্যাসন সিরিজ পড়া না থাকলেও এদের স্বাদ গ্রহণ করতে পাঠকের কিছুমাত্র সমস্যা হবার কথা না। তবে পড়া থাকলে তো পোয়াবারো।
জন্ম ১০ এপ্রিল, ১৯৮১, কলকাতা। স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পি. এইচ. ডি. তে সেরা ছাত্রের স্বর্ণপদক প্রাপ্ত। নতুন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া Bacillus sp. KM5 এর আবিষ্কারক। বর্তমানে ধান্য গবেষণা কেন্দ্র, চুঁচুড়ায় বৈজ্ঞানিক পদে কর্মরত এবং হাবড়া মৃত্তিকা পরীক্ষাগারের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। জার্মানী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা গবেষণাগ্রন্থ Discovering Friendly Bacteria: A Quest (২০১২)। তাঁর কমিকস ইতিবৃত্ত (২০১৫), হোমসনামা' (২০১৮),মগজাস্ত্র (২০১৮), জেমস বন্ড জমজমাট (২০১৯), তোপসের নোটবুক (২০১৯), কুড়িয়ে বাড়িয়ে (২০১৯),নোলা (২০২০), সূর্যতামসী (২০২০), আঁধার আখ্যান (২০২০) ও নীবারসপ্তক (২০২১) এই সব দিনরাত্রি (২০২২), ধন্য কলকেতা সহর (২০২২), আবার আঁধার (২০২২), অগ্নিনিরয় (২০২২), হারানো দিনের গল্প (২০২৪), সিংহদমন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪), আরও একটি প্রবন্ধ সংকলন (২০২৫) সুধীজনের প্রশংসাধন্য। সরাসরি জার্মান থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন ঝাঁকড়া চুলো পিটার (২০২১)। বাংলাদেশের আফসার ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে ম্যাসন সিরিজের বাংলাদেশ সংস্করণ (২০২২, ২৩), মৃত্যুস্বপ্ন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪) । সম্পাদিত গ্রন্থ সিদ্ধার্থ ঘোষ প্রবন্ধ সংগ্রহ (২০১৭, ২০১৮) ফুড কাহিনি (২০১৯), কলকাতার রাত্রি রহস্য (২০২০) সত্যজিৎ রায়ের জন্ম শতবর্ষে একাই একশো (২০২২), কলিকাতার ইতিবৃত্ত(২০২৩), বিদেশিদের চোখে বাংলা (২০২৪) এবং কলিকাতার নুকোচুরি (২০২৫)
ম্যাসন সিরিজ থেকেই শ্রী তারিণীচরণ আমার ভীষণ পছন্দের তালিকায় উঠে এসেছিল। তারপর 'আবার আঁধার' নামের একটা সংকলনে পাই তারিণীর আরেকটা গল্প -'ভষ্মবহ্নি'। বিশ্বাস করুন, একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে শেষ করেছিলাম গল্পটা। ওরকম অসম্ভব একটা ক্রাইমের সমাধান আমাকে হতভম্ব করে দিয়েছিল। তারপর এই যে ভষ্মবহ্নির সাথে আরো দুটি গল্প নিয়ে একটা বৃহৎ সংকলন। এটাতেও আমি মুগ্ধ।
ম্যাসন ট্রিলজির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রী তারিণীচরণ রায়, পেশায় প্রাইভেট ডিটেকটিভ। সিরিজটি পড়া থাকলে দুর্দান্ত এই গোয়েন্দার সাথে আপনাদের পরিচয় আগেই আছে।
"ডিটেকটিভ তারিণীচরণ" বইটায় চারটি গল্প আছে। এর মধ্যে একটি বাদে বাকি তিনটিকে আসলে গল্প/বড় গল্প বলার উপায় নেই। এগুলো সাইজে নভেলার সমান। তাতে করে উপন্যাসের আমেজ অনেকটাই পাওয়া গেছে।
ম্যাসন ট্রিলজিতে লেখক সুনিপুণভাবে পোর্ট্রে করেছেন বৃটিশ ভারতের কোলকাতা শহরকে। সাথে দারোগা প্রিয়নাথ, সাইগারসন নামের আমাদের আপাত পরিচিত এক চরিত্র আর দুর্দান্ত মেধাবী ডিটেকটিভ তারিণীচরণ।
"ডিটেকটিভ তারিণীচরণ" বইটায় দারোগা প্রিয়নাথ আর তারিণীচরণের উপস্থিতি কনস্ট্যান্ট। কোলকাতা শহরের বাইরে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলার ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক অবস্থার বেশ সুন্দর এক সিনারিও পাওয়া যায়। বিশেষ করে নেটিভ ইন্ডিয়ানদের সাথে শাসকশ্রেণীর ব্যবহার, তাদের চলাফেরা কথাবার্তা, স্থানীয় জমিদারদের হালচাল, এবং গণপতি থাকায় সেসময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিনোদন ম্যাজিক এবং সার্কাসের বেশ বিস্তারিত এবং গভীর এক চিত্রপটের উপস্থিতি পূর্ণিমার চাদের মতোই উজ্জ্বল।
নভেলাগুলোর প্লট কিংবা চরিত্রের বিশদ আলোচনায় যেতে চাই না। চরিত্রায়নের ক্ষেত্রে শুধু বলি, ম্যাসন ট্রিলজিতে যেই তারিণীচরণকে দেখা যায়, তার চেয়ে এখানকার তারিণী কিছুটা ভিন্ন। এখানকার তারিণী একটু বেশিই মেধাবী, নিজের মগজাস্ত্রে ঝড় তুলে গভীর ভাবনায় হারিয়ে যাওয়া তারিণী, প্রিয়নাথের সাথে কোনো তদন্তে গিয়ে-কোনো ক্লু পেয়ে বাচ্চাদের মতো "দারোগা বাবু দেখুন...." বলে ওঠা তারিণী। আরডিজে অভিনীত শার্লক হোমসকে যেমন খানিকটা অদ্ভুত মনে হয়, এই তারিণীচরণ খানিকটা অমন।
এটার কারণ কী?
এক লাইনে বলি, ম্যাসন ট্রিলজিতে যেই তারিণীচরণ ছিল- সে ছিল নবিশ এক ডিটেকটিভ। এই তারিণীচরণ আরও পরিপক্ক, আরও জ্ঞানী। তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানে।
° বইয়ের গ্রুপগুলোতে কিছু পোস্ট আসে, কে ভালো ডিটেকটিভ? ফেলুদা নাকি ব্যোমকেশ?
এই পোস্টে একটা কনস্ট্যান্ট কমেন্ট করতাম। "ফেলুদা ইজ আ পারফেক্ট প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর, বাট ব্যোমকেশ ইজ মোর দ্যান আ প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর।"
আলোচ্য বইটির তারিণীচরণ একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের ঊর্ধ্বে। আক্ষরিক অর্থেই। এখানে খু-নিকে ধরতে পেরেও আমাদের গোয়েন্দা তদন্ত চালিয়ে যায় খু-নের মোটিভ জানতে।
একটা খু-ন যখন সাধিত হয়, খু-নি ছাড়াও আরও কিছু মানুষ জড়িত থাকে অপরাধে। এরা ভালোও নয়, খারাপও নয়- এরা ধূসর চরিত্র।
তারিণীচরণ খু-নিকে ধরিয়ে দিয়ে, মাইনর ক্রিমিনালকে ভালো হওয়ার একটা সুযোগ দেয়। অথবা বাধ্য হয়েছে ক্রাইম করতে, এরকম ক্রিমিনালকেও তারিণী একরকম ইনডেমনিটি দিয়েছে৷ শেষ নভেলাটার শেষ অংশে গণপতি সম্ভবত তারিণীকে একবার প্রশ্ন করে, "আমার জায়গায় থাকলে আপনি কী করতেন?"
শ্রী তারিণীচরণ স্রেফ তদন্ত করে না, খু-নিকে ধরার আগে তার মোটিভ যাচাই করে, অপরাধীকে ধরিয়ে দেবার আগে তার জায়গায় দাঁড়িয়ে বিচার করে পরিস্থিতি। তারপর সিদ্ধান্ত নেয়৷
বইটা রেকমেন্ডেড। রেটিং ৫/৫।
লেখকের গুডরিডস ফ্রেন্ডলিস্টে আছি খুব সম্ভবত। এই রিভিউ লেখকের চোখে পড়লে তার কাছে আহ্বান থাকবে, তারিণীচরণকে নিয়ে আরেকটা বই লিখতে।
(পাঠ প্রতিক্রিয়ায় যতটুকু লিখলাম, এতটাও লেখার ইচ্ছা ছিল না। এরপরও বেশ সংক্ষিপ্ত একটা পাঠ প্রতিক্রিয়া হয়ে গেলো।)
মেসন সিরিজের মতো সেরা একটা ট্রিলজি উপহার দেয়ার পর একই গোয়েন্দার নতুন গল্পের ঘোষণা এলে স্বভাবতই পাহাড়সম প্রত্যাশা জড়ো হয় তার উপর। এরই সাথে ফেলুদা, বোমকেশ, কাকাবাবু, মিতিনমাসির পর তারিণীচরণ নামের নতুন এক ডিটেকটিভ ফিগার সুযোগ পায় বাংলা সাহিত্যে তার স্থান পাকাপোক্ত করার। তবে এখনি সেটাকে অতোটা শক্তিশালী বলা যাচ্ছে না কারণ সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো হয় নি এই বইতে।
তো "ডিটেকটিভ তারিণীচরণ" বইটা তিনটি উপন্যাসিকা ও একটি গল্প নিয়ে সংকলিত। এর মাঝে উপন্যাসিকা তিনটাই লকড রুম মিস্ট্রি ঘরানার। বলে রাখা ভালো, বাংলাদেশের আফসার ব্রাদার্স এর করা বইটার প্রচ্ছদ "বাজে" হইছে।
প্রথমে "মৃগতৃষ্ণা" । প্লেগের হাত থেকে বাঁচতে সদ্য বিবাহিত তারিণী সস্ত্রীক দার্জিলিং যায় হাওয়া বদলের আশায়। সেখানে গিয়ে দেখে এক ইংরেজ মহিলা মারা গেছেন দ্বাররুদ্ধ অবস্থায়। এরপর তারিণী সেটার রহস্য উন্মোচন করলেন, করতে গিয়ে কিছু জায়গায় অতিমানবীয় চিন্তা শুরু করলেন, আর আমার মন্দ লাগা শুরু হলো। কিছু ক্লু একদম চোখের সামনে ধরিয়ে দেয়া, আবার কিছু ক্লু মঙ্গল গ্রহ থেকে আমদানী করা। তাই এইটা অতো ভাল্লাগে নাই।
দ্বিতীয় "ভষ্মবহ্নি": এটার প্রেক্ষাপট হচ্ছে একটা সার্কাসের ম্যানেজার বাবুর নিজের ক্যারাভানে বন্দী অবস্থায় মৃত্যু। এটাতেও অতো ভালো করে জমাতে পারেন নি লেখক। আর দারোগা প্রিয়নাথ বাবুকে এখানে তারিণীর চেয়ে বেশি ভাইব্র্যান্ট মনে হয়েছে। ক্লু গুলো বেশি চোখের সামনে, আর কিছু গাঁজাখুরি। এই যা।
তৃতীয় "ইয়ান জি হংয়ের মুক্তো" (গল্প): এটা স্রেফ একটা গল্প হিসেবে ভালো বলা যায়। ডিটেকটিভ কাহিনীর ছিটেফোঁটা নেই। তারিণী সাহেব এখানে পুরোই ডাকসাইটে। শার্লক হোমস যেভাবে ডক্টর ওয়াটসনের ঠিকুজি বলে দেন, অনেকটা সেই সূত্র মেনে একটা ফিরিস্তি পাওয়া যায় শুধু তারিণীর কাছ থেকে। বাকি গল্পটুকু স্বতন্ত্র কাহিনী।
চতুর্থ "গোধূলীসন্ধি": এইটা সেরা একটা কাজ হইছে। স্বদেশী বিপ্লব, বিউবনিক প্লেগ, গণপতির সার্কাস, ইংরেজ দুঃশাসন, বিদেশী কাল্ট, সব মিলিয়ে সাঁওতাল পরগনার সেটে সুন্দর একটি ডিটেকটিভ কাহিনী ফেদেছেন লেখক। মেসন সিরিজের দুর্দান্ত তারিণীকে এখানে আবার স্বরূপে দেখা যাবে। এই একটা উপন্যাসিকার জন্যে বইটা পড়া worth it.
যাই হোক, ডিটেকটিভ তারিণীচরণ সিরিজে আরো লেখা হোক। আরো একটি ক্লাসিক গোয়েন্দা ফিগার আসুক বাংলা সাহিত্যে, এই প্রত্যাশা থাকবে লেখকের কাছে।
ম্যাসন সিরিজের মেইন কোর্সের পর মিষ্টিমুখ হিসাবে এই বইয়ের আবির্ভাব। সেই ব্রিটিশ রাজের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে তিনটে উপন্যাসেই: দার্জিলিং, কলকাতা (সার্কাস) আর ছোটনাগপুর ভ্রমণ। দ্বিতীয় উপন্যাসের শেষে একটা ছোট "পরিশিষ্ট" রয়েছে, নাম "ইয়াং জি হং-এর মুক্তো"। সেটাকে আলাদা করে পূর্ণাঙ্গ লেখা হিসাবে ধরা সম্ভব ���য়, সেটা গোয়েন্দা গল্পও নয়। বইয়ে সেই লেখার উপস্থিতিই একটা বড় রহস্য। বইয়ের বপু বাড়ানোর জন্যেও এই লেখার কী প্রয়োজন ছিল, তাও বুঝতে পারলাম না।
তিনটে মূল উপন্যাস বেশ টানটান। প্রথম দুটো আগেই অন্তরীপে পড়েছি, অতিরিক্ত ভাল না লাগলেও, লকড রুম মিস্ট্রি হিসাবে বেশ সন্তোষজনক। "ভস্মবহ্নি"-এর রহস্য আর খুনের পদ্ধতি অভিনব লেগেছে। শেষ উপন্যাস, "গোধুলিসন্ধি"-এর শুরুটা অত্যন্ত ভাল হলেও, শেষে দুটো ঘটনা কেমন প্যাঁচ খেয়ে গুবলেট হয়ে গেছে। আগের দুটো গল্পের মত নির্মেদ হতে পারে নি। তবে ছোটনাগপুরের নৈসর্গিক বিবরণ থেকে সামাজিক কিছু সমস্যার কথা খুব সুচারু ভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই উপন্যাসে।
সত্যি বলতে তারিণীচরণ বা তুর্বসুকে নিয়ে আরেকখান দীর্ঘাঙ্গ উপন্যাসের অপেক্ষা করছি আমরা। সেটা পাওয়ার আগে, এই বই ভক্ষণ করতে বিন্দুমাত্র খেদ নেই। কৌশিকবাবু খুব সূক্ষ্ম ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং করে চলেছেন বইগুলোর মধ্য দিয়ে, সেটা প্রশংসনীয়।
প্রথমেই যেটা বলব সেই বিষয়টিও বইয়ের প্রথমেই ছাপা। বইটির প্রস্তাবনা অংশটি একেবারে ভালো লাগেনি। আমি খুবই নগণ্য এক পাঠক এবং বেশিরভাগটুকুই বাংলাতেই পড়ি। আন্তর্জাতিক লেভেলের মঁসিয়ে প্যাঁ, লর্ড ব্যাডমিন্টন, মাদাম কাজুবাদাম, ব্যারন বোর্নভিটা-সুলভ এত তত্ত্বকথা ভালো লাগে না। কৌশিক মজুমদার হচ্ছেন এই সময়ের সেই অল্প কয়েকজন লেখক/লেখিকাদের মধ্যে অন্যতম একজন যাঁর বই কিনি প্রকাশের প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই। এইরকম খুব কম সমকালীন লেখক/লেখিকার ক্ষেত্রেই হয়। আমি একটু পুরোনো দাদা, দিদি, মাসি, মামা জাতীয় গোয়েন্দা কাহিনি যেমন উপভোগ করি, তেমন ম্যাসন সিরিজও উপভোগ করেছি। আমার কাছে দুটোর মধ্যে কোন তুলনামূলক ভাবনা কাজ করে না। করতে নাই পারে। লেখকের সার্বিক পরিচয় তাঁর বইয়ের দুই মলাটে বদ্ধ হয়ে থাকা শব্দগুলি। সেটাকে আলাদা করে মেনশন করা অনেকটা ভাইটাল মেডিসিনের টিভিতে বিজ্ঞাপন ব্রডকাস্ট করার মতোন। দরকার নেই। পাতালপুরী থেকেও মানুষ দরকারে নিজেই খুঁজে নেবে। ম্যাসন সিরিজের পর লেখকের ক্ষেত্রেও এই একই কথাই প্রযোজ্য।
তবে সব গলে জল হয়ে যায় পরবর্তীতে "লেখকের কথা" সেগমেন্টের শেষ অংশটুকুতে - "এই বই আসলে আপনাদের..."।
প্রথম উপন্যাস "মৃগতৃষ্ণা"-তে তারিণী তার সদ্যবিবাহিত স্ত্রী মাখনলতাকে নিয়ে চলেছে দার্জিলিং-এ, সেখানে গিয়ে অভিশাপ ও প্রেতঘটিত একের পর এক হত্যাকান্ডের সমাধান কীভাবে করে সেই নিয়েই কাহিনি। এটি একটি লকড রুম মিস্ট্রি। তবে লকড রুম মিস্ট্রি ছাড়াও আরও আনুষঙ্গিক কিছু রহস্য সমাধানের ব্যাপার রয়েছে। লকড রুমের সমাধানটি বেশ বুদ্ধিদীপ্ত হলেও একটু একটু ধরতে পারা যায় রেগুলার রহস্য কাহিনি পড়ার অভ্যেস থাকলে। তবে পুরোটা নয়। কিন্তু আনুষঙ্গিক রহস্যগুলির সমাধানের কয়েকটি একটু বেশিই সমাপতন বা প্রশ্নের খোঁজে উত্তরের মতোন মনে হল। যেন রহস্য এবং রহস্যের সমাধান ঠিক ওই ওইভাবেই সংঘটিত হওয়ার জন্য সজ্জিত হয়েই ছিল। Luck factor যেখানে manual efforts-কে কিছু পরিমাণে অতিক্রম করে যায়। এটা যদি আরও বড় আকারে লেখা হত এবং এইভাবে কাহিনি এগোত যে তারিণী প্রথমবার গিয়ে আংশিক সমাধান করে। প্রেতঘটিত কিনা সেই নিয়ে সম্পূর্ণ ক্ল্যারিফিকেশন আসবে না তখনই। ফিরে আসে সেইভাবেই। বেশ কিছুটা সময় পরে গিয়ে বাকি অপরাধ সংঘটিত হয়। আবার ডাক পড়ে তারিণীর। দ্বিতীয়বার গিয়ে ফাইনাল শো-ডাউন করে এবং এই পয়েন্টে এসে আগেরবারের সঙ্গে এইবারের তদন্তের তুলনা করে মিসিং লিঙ্ক খুঁজে বার করে যে না আদতেই প্রেতঘটিত নাকি অন্যকিছু। পাঠক রহস্য গল্পের প্লটের বুদ্ধিদীপ্ততার থেকেও অনেকসময়ই গোয়েন্দাপ্রবরের স্ট্রাগলটাকে বেশি এঞ্জয় করে। সেটি শারদীয়া উপন্যাসের সীমাবদ্ধতায় যতটা সম্ভব ততটা লেখক চেষ্টা করেছেন তা বোঝা যায়। এটি যদি একটা বই আকারে উক্ত বিস্তারে (বা, অন্যরকম বিস্তারে) লেখা হত প্রথম থেকে তাহলে অকল্পনীয়ভাবে পাঠকদের বোকা বানিয়ে রাখার আরও কয়েকশো ফন্দি সাজিয়ে ফেলতে পারতেন লেখক। এটা প্রশ্নাতীত। ভূতের সঙ্গে লেখকের জুটি সবসময়ই সরেস।
দ্বিতীয় উপন্যাস "ভস্মবহ্নি"-ও একটি লকড রুম মিস্ট্রি। কলকাতা শহরের বুকে হচ্ছে সার্কাস। সেই সার্কাসে বাঘের খেলা দেখাতে গিয়ে বাঘের হাতে নিহত হয় সার্কাসেরই এক খেলোয়াড়। তারপরেই নিহত হয় সেই সার্কাসের ম্যানেজার পান্নালাল বসাক (নিজের পদবী দেখে পুলকিত হয়েছিলাম)। পান্নালালের মৃত্যুটাই লকড রুম মিস্ট্রি। মৃগতৃষ্ণার তুলনায় এই লকড রুম মিস্ট্রির সমাধান অনেক বেশি বুদ্ধিদীপ্ত এবং শেষ অংশ পড়ার আগে খুব কম আভাস পাওয়া যায় যে কীভাবে কী হয়েছিল সেই বিষয়ে। তবে কাহিনিতে কিছু গলদ চোখে পড়ল। এক জায়গায় একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে পান্নালালের বসাক পদবীটি বর্ধন হয়ে গেছে। সংবাদপত্রের সংবাদের অ্যাকিউরেসির অভাব বোঝাতে এটা ইচ্ছাকৃত এমন লেখা হয়েছে কিনা জানি না। আরেক জায়গায় টমাস সাহেব বলে একটি চরিত্রকে কিছুক্ষণের জন্য পিটার সাহেব অভিহিত করে একটি চরিত্র। পিটার ও টমাস অভিন্ন? নাকি আমিই কোন রেফারেন্স মিস্ করে গেলাম? তবে সবমিলিয়ে এই কাহিনিটি দারুণ। সমাধানের যুক্তির গুণমান একেবারে ম্যাসন সিরিজ লেভেলের। প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজেছে এই কাহিনি, উত্তরের প্রশ্ন খোঁজার চেষ্টা হয়ে দাঁড়ায়নি শেষ অবধি।
তৃতীয় কাহিনিটি একটি ছোটগল্প। নাম - ইয়ান জি হং-এর মুক্তো। এটি ভস্মবহ্নির পরিশিষ্ট হিসেবে বলা হলেও ভস্মবহ্নির মূল কাহিনি বা রহস্যের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই। ভস্মবহ্নির কয়েকটি চরিত্রগুলির সহযোগে গঠিত একটা ছোট্ট জামাই ঠকানো কাহিনি। এটির দরকার ছিল কি? উত্তরে "না" বলা স্বাভাবিক। তবে এই কাহিনির প্লটের বুদ্ধিদীপ্ততা এত ছোট পরিসরেও এতটা সারপ্রাইজ বহন করে যে এই কাহিনির উপস্থিতি শ্রীবৃদ্ধিই করেছে বইটির। সঙ্গে তুর্বসুকে একেবারে বাদের খাতায় রাখতে দেয়নি এই দুই মলাটের মধ্যে থেকে। ফোর্থ ওয়াল ব্রেকিং-এরও একটি প্রচেষ্টা রয়েছে কিন্তু তা পড়ে মুচকি হাসিই পেল।
চতুর্থ কাহিনি "গোধূলিসন্ধি" এই বইয়ের দীর্ঘতম উপন্যাস। কলকাতা থেকে দূরে তামাটুলি নামক জায়গায় জাদুর শো দেখাতে এসে তারিণীর বন্ধু জাদুকর গণপতি জড়িয়ে পড়ে একাধিক খুনের মামলায়। ভিক্টিমদের একজন আবার ইংরেজ কর্তাব্যক্তি। গণপতিকে বাঁচাতে প্রিয়নাথ এবং নিজের পরিবারের সঙ্গে তামাটুলিতে আসে তারিণী। একটা ক্ষীণ আভাস মেলে আবার একটি লকড রুম হত্যাকান্ডের। অনুসন্ধান করতে করতে জানা যায় এক আন্তর্জাতিক মাপের ঘটনাচক্র। এই কাহিনিতেই সেই পুরোনো ম্যাসন সিরিজের স্বাদ আবার ফেরত পাওয়া গেল। একই সঙ্গে তৎকালীন বিপ্লব তথা স্বদেশী সিচুয়েশনের রেফারেন্সগুলো গল্পের ভিতকে মজবুত করেছে। এই উপন্যাস আর আর সত্যিই কিছু বলার নেই। এই রহস্য কাহিনি পড়ার জন্য, পড়ে এঞ্জয় করার জন্য। প্রতিটি কাহিনিতেই ঐতিহাসিক বা সেই সময়ের তৎকালীন সামাজিক রেফারেন্স দিয়ে কাহিনির ভিত একইভাবে মজবুত করা হয়েছে। এটা সমস্ত বইটারই প্লাসপয়েন্ট।
বইটির মেকিং ভালো। যেমনটা বুকফার্ম করে প্রতিবার। তবে মলাটে যে মেটেরিয়াল ব্যবহার করা হয়েছে তার touch-feel ভালো লাগল না। আগাগোড়াই এরকম মেটেরিয়াল ভালো লাগে না, আর আঙুল বোলালে যে চুড়ুক-চাড়াক আওয়াজ হয় তাও ক্রিঞ্জ ক্রিয়েট করে মস্তিষ্কে। তবে এ আমার ব্যক্তিগত সমস্যা। বইটি দেখতে ভালো হয়েছে এ অবশ্য ঠিক। আরেকটা বিষয় হচ্ছে অধ্যায়ের নামের বর্ণসংস্থাপনের জায়গায় ফন্টের সাইজ একটু বড় রাখলে ভালো নয়তো বোল্ড করলে। অধ্যায়ের নাম কিছু সময়ে অধ্যায়ের লেখার সঙ্গে ভিস্যুয়ালি কোলাইড করে যাচ্ছে।
আর কী? তারিণীচরণকে আবার পড়ার জন্য আরও অপেক্ষা। তবে এরপরে লকড রুম, ভূত এসব ছেড়ে অন্য টপিক এক্সপ্লোর করার অনুরোধ রইল লেখককে। তারিণীচরণ নাহলে অচিরেই "আনলকার" তকমা পাবে যে।
I started this book in May 2025 and read the first 3 stories but I never finished the last one. It stayed on hold and I slowly lost interest. I enjoyed the author’s main series, but I didn’t enjoy this book as much. Locked-room mystery is not my genre so I don’t blame the author. The same kind of things kept happening and I felt bored while reading the last story.
The third story was short and good. It changed my mood and was a little motivating. That’s all I can say.
গত বছর দশেকের মাঝে দুই বাংলা মিলে যত মিস্ট্রি-থ্রিলার লেখক এসেছেন, তাদের মাঝে কৌশিক মজুমদারকে একদম ওপরের দিকে রাখবো। আর যদি নন-ফিকশন লেখক ধরা যায়, তাহলে রাখবো একদম প্রথমেই। তথ্যবহুল লেখা, কিন্তু কোথাও লেকচার দেয়ার প্রবণতা নেই। আর যদি ইতিহাসভিত্তিক ফিকশন হয়, চমৎকারভাবে ইতিহাসের ঘটনা আর চরিত্রের সাথে গল্প মিলিয়ে দেন তিনি। এর আগে সূর্যতামসী সিরিজে সেটা করেছেন, কাজেই প্রত্যাশা বেড়ে গিয়েছিল। একই সিরিজের স্পিনঅফ 'ডিটেকটিভ তারিণীচরণ', ভয় ছিল আগের চমৎকারিত্ব ধরে রাখতে পারবেন কিনা। বলা যায়, প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। পয়সা দিয়ে যদি ডিটেকটিভ বই কেনা হয়, তো এমন লেখনী আর কাহিনীর সম্মিলন হলে পয়সা উশুল হয়ে বোনাসও মিলে যায়। বইটা ৪টা গল্পের সঙ্কলন, তবে প্রতিটা গল্পের মাঝে খানিকটা যোগসূত্র আছে। তুর্বসু রায়ের পূর্বপুরুষ তারিণীচরণ আছেন, আছেন প্রিয়নাথ দারোগা-ও। ৩টাই হত্যারহস্য, কখনো কলকাতার সার্কাসে, কখনো দার্জিলিংয়ে। আছে বিপ্লবীদের রেফারেন্সও। এতসব মিলিয়ে লেকচার দেয়া বা গল্প খাপছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, কিন্তু এখানেই লেখক জিতে গেছেন। ইতিহাসের চরিত্রভিত্তিক থ্রিলারের বদলে মনে হয় ইতিহাসের গল্পই পড়ছি। পড়া শেষে ৫ তারা দেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই।
আসলে সমস্যাটা হলো আপনি যদি আগে ম্যাসন ট্রিলজি টা পড়ে নিয়ে থাকেন তাহলে সেই ঘোর আপনাকে এই বইটাকে দুর্দান্ত বলতে কিছুটা হলেও আটকাবে। তবে সেই উনবিংশ আর বিংশ শতাব্দির সন্ধিক্ষণে ভারতীয় ইতিহাস ও সমাজের বাঁক টাকে নিখুঁত ধরেছেন লেখক। তারিণী আর প্রিয়নাথের রসায়ন টাও জব্বর। প্রথম টা ভাল, দ্বিতীয়টা চলবে, তবে লেখকের কলমের সেই ভানুমতির খেলের কিছুটা ঝলক দেবে শেষ গল্পটা। তারিণী চলতে থাকুক, তুর্বসু দৌড়তে থাকুক, আর সম্ভব হলে সাইগারসন সাহেব ফিরুন। অপেক্ষায় থাকলাম।
সেই মজা পেয়েছি। একেবারে পয়সা উসুল। ট্রু ডিটেকটিভ কাহিনী বলতে যা বোঝায় ইহা তাই। বুদ্ধির খেলা, প্রচুর চরিত্র, অল্পস্বল্প হিউমার, টুইস্ট, থ্রিল, সেই সাথে যেহেতু বাঙালি ডিটেকটিভ তাই কিছু বাঙালিয়ানা সব মিলিয়ে ভরপুর প্যাকেজ। তিনটে গল্পই (ইয়ান জি হং এর মুক্তো - এটার কি দরকার ছিল বুঝলাম না। এটাতো কিছুই না) ভালো লেগেছে। আমি তো বলব বইপ্রেমিদের এটা অবশ্য পাঠ্য। তবে বাংলাদেশি সংস্করণে অলংকরণ গুলো ছিল অকার্যকর। তাই একতারা কম।
বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের মহাসভায় যখন প্রতিটি চেয়ারে এক একজন বসে গেছেন—ফেলুদা তার যুক্তিপূর্ণ বাঙালিয়ানায়, ব্যোমকেশ তার বিশ্লেষণী অন্তর্দৃষ্টিতে, কাকাবাবু তার অ্যাডভেঞ্চারে, মিতিনমাসি তার নাগরিক ন্যায্যতায়—ঠিক সেই মুহূর্তেই এক ছায়া-গলির ধারে এসে দাঁড়ালেন তারিণীচরণ। এক অচেনা নাম, এক সুপরিচিত চেতনা। কৌশিক মজুমদারের "ম্যাসন ট্রিলজি"-র ছায়াপথে হাঁটতে হাঁটতে, পাঠক হঠাৎই খুঁজে পান এক নতুন নায়ককে—যিনি কেবল একজন গোয়েন্দা নন, বরং এক সময়বিশেষের প্রতিচ্ছবি, এক মনস্তাত্ত্বিক অভিযান, এক প্রেতস্নাত জাতীয় সত্তার জ্যামিতি।
'তুর্বসু'র পূর্বপুরুষ তারিণীচরণ গোয়েন্দাগিরির সনাতন পরিসরকে অতিক্রম করেন—তাঁর মধ্যে আছে শার্লক হোমসের clinical হিমশীতল বিশ্লেষণ, ফেলুদার বাঙালি যুক্তিবোধ, আর হেমেন্দ্রকুমারের বর্ণনাত্মক পরাবাস্তবতা। তবে তারিণীর চোখে দেখা ভারতবর্ষ কোনো "crime scene" নয়, বরং এক পোস্টমর্টেম টেবিল, যেখানে মৃতদেহ নয়—মরে যাওয়া আশা, দগ্ধ স্মৃতি আর আত্মপরিচয়ের ছিন্ন মাংসপিণ্ডগুলি পরীক্ষা করেন তিনি।
“What is history? An echo of the past in the future; a reflex from the future on the past.” —Victor Hugo এই উক্তির ব্যঞ্জনা এ বইয়ের মর্মস্থলে অনুরণিত—তারিণীর গোয়েন্দাগিরি মূলত ইতিহাসের layered autopsy। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ছায়া, ইউরোপীয় racial superiority-র ধোঁয়া, স্বদেশী আন্দোলনের গোপন সুর, আর ভৌতিক বিশ্বাসের আবছা ছায়া—সব মিলিয়ে লেখক তৈরি করেন এমন এক প্রেক্ষাপট, যেখানে প্রতিটি খুন একটি দর্শন, আর প্রতিটি clue এক সমাজচিন্তার নির্যাস।
এই শ্লোক যেন তারিণীচরণের দৃষ্টিভঙ্গির অদৃশ্য সূত্র। তাঁর অনুসন্ধান কেবল অপরাধ-সমাধানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা প্রসারিত হয়ে পড়ে সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক অচেতনের দিকে। তাঁর গোয়েন্দাগিরি একমাত্র ধাঁধার উত্তর নয়—তা একধরনের আত্মজিজ্ঞাসাও।
তারিণীচরণের গোয়েন্দা-জীবন শুরু হয় না একটি হত্যার মধ্য দিয়ে, বরং এক আত্ম-স্মরণ ও দেশ-স্মরণের ভিতর দিয়ে। "To be a detective in a colonised land is to be a cartographer of loss." এ কথা তারিণীর প্রতিটি পর্যবেক্ষণ, প্রতিটি বিস্ময়, প্রতিটি অনুধাবনকে এক অনন্য মর্যাদা দেয়।
অতএব, কৌশিক তাঁর এই বইটিকে কেবল এক রহস্যোপন্যাস করে রাখেননি। বরং এক তাত্ত্বিক সাহসিকতা, এক ঐতিহাসিক মনোবিশ্লেষ, এক কল্প-বাস্তবের শৃঙ্খল গাঁথা গড়ে তুলেছেন। অতীত এখানে নিছক গল্প নয়, এক প্রেতছায়া; এবং তারিণীচরণ সেই ছায়ায় আলো ফেলার একমাত্র প্রদীপ।
এই আলো কখনও সরল নয়। কখনও তা ফ্ল্যাশলাইটের মতো, কখনও দীপশিখার মতো, কখনও জোনাকির মত ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু আলো তো আলো—যতক্ষণ তা আছে, অন্ধকার পিছু হটে।
কাহিনির বিন্যাস: চার গল্পে চার গন্ধ
১. মৃগতৃষ্ণা – ছায়ার ছায়ায়: ১৯১৮, দার্জিলিং। ব্রিটিশ শাসনের শেষবেলায় দাঁড়িয়ে, উপনিবেশের ক্লান্ত পাহাড়ি শহর যেন নিজের গোপন ব্যথা চেপে কুয়াশা মুড়ি দেয়। সদ্যবিবাহিত তারিণীচরণ, সঙ্গে মাখনবালা, এক নির্দোষ মধুচন্দ্রিমার উদ্দেশ্যে এসে পড়ে যায় অন্ধকারে ঢাকা এক দ্বাররুদ্ধ হত্যাকাণ্ডের কেন্দ্রে। এক ইংরেজ মহি���ার মৃতদেহ—ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ, ভিতরে কেউ নেই, অথচ মৃত্যু সন্দেহজনক। ভূত? প্রেত? নাকি নিখুঁত হত্যা?
এই গল্পটি একদিকে একটি ক্লাসিক লকড-রুম মিস্ট্রি, কিন্তু তার থেকেও বেশি—এ এক নরমদৃষ্টির মৃত্যুবীক্ষণ, এক অলৌকিকতার প্রতিসরণ যা ইতিহাসের আর সমাজের গহ্বরে মিশে থাকে।
ছায়া, এখানে ছায়া সৃষ্টি করে। গল্পের ক্লুগুলো কোথাও স্পষ্ট, কোথাও ইচ্ছাকৃতভাবে কুয়াশাময়। কখনও মনে হয় তারা ঠিকঠাক জায়গায় বসেছে, আবার কখনও তারা যেন নিজেরাই নিজেদের ছায়ায় ধরা পড়ে যাচ্ছে। এই বিভ্রান্তিই "মৃগতৃষ্ণা"—একটা এমন অনুসরণ যেখানে ঠিক কোথায় পৌঁছোতে চাইছি, সেটাই পরিষ্কার নয়।
পাহাড়ি বাতাস, পুরনো ব্রিটিশ বাংলো, রাত্রির নিঃশব্দে অদৃশ্য পায়ের শব্দ— সবকিছু মিলে একটি layered ambience গড়ে তোলে। যা পাঠকের মনে প্রশ্ন তোলে: এই রহস্য কি কোনও external agency-র কাজ, না কি মানসিক এক “projection of fear”?
—James Deacon এই উক্তিটি যেন তারিণীচরণের গোটা পদ্ধতিকে ধরতে চায়। তিনি শুধু প্রমাণ দেখেন না, প্রেক্ষাপটের অন্তরালে দৃষ্টিভঙ্গির দোলাচলও ধরেন। মৃগতৃষ্ণা-তে তিনি গোয়েন্দার থেকেও যেন এক মনোবিশ্লেষক, যে মৃতের কথা কম, জীবিতের ছায়া বেশি খোঁজে।
“सर्वं ज्ञानं मया दीप्तं, सर्वं संशयं हन्यते।” (“Through insight, all is illuminated; through reasoning, all doubt is slain.” —Bhagavad Gita 18.73)
এই দর্শন তাঁর অনুসন্ধানে অদৃশ্যভাবে কাজ করে—লজিক ও প্রজ্ঞার দ্বিমুখী আলোয় তারিণী খোঁজেন রহস্যের শিকড়।
তবে... গল্পটির শেষে এসে একটি সূক্ষ্ম অতৃপ্তি থেকে যায়—সমাধানটি কিছুটা চটজলদি, কিছু ক্লু যেন লাইটপোস্টের মত স্পষ্ট, আবার কিছু গোঁজামিল বলে মনে হয়। পাঠকের অভ্যেস থাকলে সমাধান ধরতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু সেটাই তো আসল "মৃগতৃষ্ণা"—যে জলের স্বাদে পৌঁছোবেন, কিন্তু জানতে পারবেন না আপনি কি সত্যিই জল খেলেন, না মরীচিকা।
২. ভস্মবহ্নি – ছাইয়ের নিচে আগুন: “যে আগুন নিভে গেছে ভেবে চুপ করে আছো, সে যদি হঠাৎ জ্বলে ওঠে?” —এই ভাবনারই কাহিনীকেন্দ্রিক রূপ ‘ভস্মবহ্নি’। এটি একদিকে সংক্ষিপ্ত, অন্যদিকে সবচেয়ে দহনশীল। গল্পের প্রেক্ষাপট সুদূর অতীতে নয়, তবে অতীত তার ছায়া ফেলে রেখেছে বর্তমানের প্রতিটি ছায়াচিত্রে।
গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল একটি শারদীয়া পত্রিকায়, পরে এই বইতে পুনর্লিখিত এবং পরিমার্জিত রূপে এসেছে। এখানেই লেখকের মুন্সিয়ানা বোঝা যায়—যেখানে একবার লেখা হয়ে যাওয়া কাহিনিকেও তিনি আরও ধারালো করে তোলেন।
একটি ম্যানর, একটি মৃত্যু, একটি নিখোঁজ বস্তু, আর তারিণী।
গল্পের কেন্দ্রে এক বিধবা মহিলা—তাঁর সম্পত্তি সংক্রান্ত জটিলতা, আত্মীয়স্বজনের লোভ, আর এক অপূর্ব মুক্তোর খোঁজ, যেটি হারিয়েছে একদা চীনা বণিক ইয়ান জি-হং-এর উত্তরসূরি। এই মুক্তো আসলে এক MacGuffin—অজুহাত। তার ছায়াতেই ঘটে যাচ্ছে হত্যাকাণ্ড।
লেখক এখানে ‘রেড হেরিং’ ব্যবহার করেছেন সূক্ষ্মভাবে। পাঠক যখন ভাবেন তারা ঠিক পথে এগোচ্ছেন, তখন গল্প মোড় ঘুরিয়ে দেয় অন্যদিকে। তারিণী এখানে যেন একটি শারীরিক তদন্তের পাশাপাশি এক মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা দেখি—তাঁর তদন্তের ধরন আরও মেদহীন, আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে।
“The fire that appears extinguished is the most dangerous.”—Pliny the Elder এই উক্তি যেন ‘ভস্মবহ্নি’-র হৃদয়। কারণ খুন, রহস্য, আর লোভ—এগুলো কখনোই নিভে যায় না। শুধু কিছু সময়ের জন্য ছাইয়ের নিচে অপেক্ষা করে।
অতীত এখানে দংশন করে, কিন্তু চিৎকার করে না।
চরিত্রদের সম্পর্ক এবং তাদের মানসিক অবস্থা—যেমনটা একসময় হেমেন্দ্রকুমার রায় দক্ষভাবে আঁকতেন—ঠিক সেভাবেই এখানে layered, বহুস্তরীয়। কে খুনি, কে শুধু কৌতূহলী, আর কে নিজেই নিজের ছায়ায় আত্মগোপনকারী—তা বুঝতে পাঠককে নিজের বিশ্বাস ও সন্দেহের মাঝে দোল খেতে হয়।
“न हि कश्चित्क्षणमपि जातु तिष्ठत्यकर्मकृत्।”(“No one ever remains even for a moment without performing action.” —Bhagavad Gita 3.5) এই সত্য তারিণীর চরিত্রের মধ্যেও বর্তমান—তিনি যেমন অনুসন্ধান করেন, তেমনি প্রশ্নের মধ্যে দিয়েই নিজেকে খুঁজে পান। ‘ভস্মবহ্নি’-তে তাঁর চরিত্রে আরও আত্মবিশ্বাস, আরও গবেষণালব্ধ শার্পনেস দেখা যায়।
একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিস্তৃত মন্তব্য: এই গল্পের পরিশিষ্ট হিসেবে যে ছোট গল্পটি যুক্ত হয়েছে—‘ইয়ান জি-হং-এর মুক্তো’—তা যেন মূল কাহিনির সঙ্গে যুক্ত একটি appendix, আবার একটি পৃথক ঐতিহাসিক অলংকার। এর মধ্যে লেখক এমন এক বিন্দুতে পৌঁছে যান, যেখানে ইতিহাস ও রহস্য একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ায়।
৩. গোধূলিসন্ধি – লাল আলোয় রক্তের ছায়া: “গোধূলি” বললেই যেমন মনে পড়ে পশ্চিমাকাশে রঙ বদলানো আকাশ, তেমনই এই গল্পেও দৃশ্যপটে আসে এক রঙবদল—আলো থেকে অন্ধকার, বাস্তব থেকে বিভ্রম, নির্দোষতা থেকে অপরাধ।
এটি বইয়ের দীর্ঘতম, আর নিঃসন্দেহে জটিলতম উপন্যাসিক কাহিনি। এখানে তারিণীচরণ একা নেই—ফিরে এসেছে তার সেই রহস্য-সঙ্গী, মগ্ন জাদুকর, গণপতি। তবে এবার গণপতির আগমন একেবারেই বিপরীতরূপে—একটি খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে।
এই দ্বিধায় ভরা সূচনার মধ্য দিয়েই লেখক সৃষ্টি করেছেন এমন এক আবহ, যেখানে ঘটনা আর অনুভূতির ভেদরেখা মুছে যায়, যেমন গোধূলিতে আলো-আঁধারির মিশ্র রং।
ঘটনাস্থল: কলকাতা থেকে সাঁওতাল পরগণার এক অজানা গ্রাম—তামাটুলি। এক ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে গণপতি, যার মধ্যে রয়েছে প্রাচীন মিথ, সন্ন্যাসী, রেনিগেড বিপ্লবী, আর এক লুকিয়ে থাকা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র।
এই কাহিনিতে লেখক যুক্ত করেছেন একাধিক subplot—চাপেকার ব্রাদার্সের গোপন সম্পৃক্ততা, আমেরিকার গুন্ডা ‘Paul Kelly’-এর ছায়া, এবং বাঙালির অস্থির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। এ যেন গোয়েন্দা গল্পের ছদ্মবেশে এক postcolonial ghost story, যেখানে ভূত মানে অতীত, আর প্রেত মানে অবদমিত ইতিহাস।
“Darkness cannot drive out darkness; only light can do that.”—Martin Luther King Jr.
কিন্তু এই আলো আসবে কোথা থেকে, যখন সত্য নিজেই বিষণ্ণ হয়ে পড়ে?
“दृष्टं श्रुतं च यद्भूतं मनसैवानुचिन्तयेत्।” (“One must reflect upon what is seen and heard with the mind.” —Mahabharata, Shanti Parva)
তারিণীচরণ সেই মানসিক প্রতিফলনের প্রতীক। সে দেখছে, শুনছে, এবং...অনুভব করছে। এই কাহিনিতে তার চরিত্র পেয়েছে এক অলৌকিক পরিপক্বতা—গণপতির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিশ্বাস, আর তথাকথিত যুক্তির দ্বন্দ্বে পড়ে তারিণী যেন প্রশ্ন করে—“আস্থা না অভিজ্ঞতা, কোনটা বড়ো?”
‘গোধূলিসন্ধি’ একটি লকড-রুম মার্ডার হলেও, এটি আসলে এক Locked Soul Mystery।
খুনের রহস্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকেও বড়ো এখানে ব্যক্তির আত্মপরিচয়, উপনিবেশের মধ্যে ব্যক্তিত্বের টিকে থাকা, আর এক গভীর রাজনৈতিক মায়াজাল। লেখক সফলভাবে রেড হেরিং ব্যবহার করেছেন, তবে আরও বেশি ব্যবহার করেছেন ঐতিহাসিক প্রতীকের—ব্রিটিশ কারাগার, বিপ্লবী সংকেত, গোপন ফাঁসি—সব মিলিয়ে এক layered resonance।
গণপতির চরিত্রে এক ধরনের Macbeth-esque দ্বন্দ্ব আছে। সে কি খুনি, না শুধু সময়ের শিকার? তারিণীর প্রশ্নও যেন প্রতিধ্বনি তোলে: “Is this a dagger which I see before me?”
রহস্যের সমাধান যথেষ্ট চমকপ্রদ, তবে এটি ক্রিস্টি-ঘরানার মতো পড়ে পাওয়া আপেল নয়। এটি একেবারে Doyle-ঘরানার—যেখানে গোয়েন্দা জানেন বেশি, কারণ তার রয়েছে অতিরিক্ত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান।
এই কারণে পাঠক হিসেবে আমাদের যতটা রোমাঞ্চ, ততটাই এক ধরনের ঈর্ষা—আমরা পারি না, কারণ তারিণী জানে।
এই গল্প পড়ার পর, পাঠকের মনে একটাই কথা বাজে— “This is not a whodunit, it’s a whydunit wrapped in a what-the-hell-is-going-on!”
এই বইয়ের মেরুদণ্ড ‘গোধূলিসন্ধি’। নামটির মধ্যেই একটা poetic dusk আছে, আর তারিণীচরণ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আলো ও ছায়ার ভেতর দিয়ে আমাদের নিয়ে যায��� ইতিহাসের এক চূড়ান্ত বিবর্তনে।
এটি একটি ছোট গল্প, কিন্তু তার আয়তনের তুলনায় প্রভাব অনেক গভীর। বলা হয়, “Great things come in small packages,” আর এই গল্প তার নিখুঁত প্রমাণ।
এই কাহিনি ‘ভস্মবহ্নি’র পরিশিষ্ট, কিন্তু একে পরিশিষ্ট বললে একরকম অন্যায় হবে। এটি যেন সেই শেষ টান, যা ক্যানভাসে একটি চিত্রকর্মকে সম্পূর্ণ করে। এখানে তারিণী পৌঁছয় আরেক রহস্যের কেন্দ্রে, যেখানে ইতিহাস, চীন-ভারতের সাংস্কৃতিক বিনিময়, চোরাচালান, অলংকার, ও নারীর আকাঙ্ক্ষা মিলেমিশে তৈরি করে এক semi-mythical micro-thriller।
“Pearls lie not on the seashore. If thou desire one, thou must dive for it.” —Oriental Proverb
এই ‘Pearl’ শুধু বস্তু নয়, এটি এক ধরনের symbolic longing—একদিকে সাংস্কৃতিক লোভ, অন্যদিকে ব্যক্তিগত প্রলোভন। গল্পে চীনা ব্যবসায়ী ইয়ান জি-হং-এর যে “মুক্তো”-কে ঘিরে এত উত্তেজনা, সেটি যেন প্রাচীন সভ্যতার ঐশ্বর্য, যার দিকে সবাই হাত বাড়ালেও তা হয়তো কাউকেই ধরা দেয় না।
“लुब्धो नाशं लभते लुब्धः शत्रुमपि प्रियं ब्रुवन्।”(“A greedy person invites ruin; he considers even his enemy dear if it brings profit.” —Panchatantra)
গল্পটি এই প্রবচনের প্রতিধ্বনি। মুক্তোর আকর্ষণে কেউ খুন করে, কেউ প্রতারণা করে, আবার কেউ তার অতীতকে মুছে ফেলতে চায়। লেখক এখানে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে greed vs guilt দ্বন্দ্বটি তুলে ধরেছেন।
তারিণীর তদন্ত এই গল্পে কম বিশ্লেষণ, বেশি পর্যবেক্ষণনির্ভর—এখানে যুক্তির থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে “মানুষকে পড়ার” ক্ষমতা। পুরো গল্পে লেখক একরকম ‘Zen’-like calm বজায় রেখেছেন, যেন রহস্য নিজেই ধীর��� ধীরে খুলে যেতে চায়।
“The pearl is the queen of gems and the gem of queens.” —Grace Kelly
এই গল্পেও মুক্তোটা শুধু রত্ন নয়, এক মহিলার আত্মপরিচয়, এক সমাজের মুখোশ, এক গোয়েন্দার নীরব শ্রদ্ধা।
উপসংহার: এক মুক্তোর ভিতর বহু ছায়া
‘ইয়ান জি-হং-এর মুক্তো’ অনেকটাই Fellini-ঘরানার ছোট ছবি—যেখানে কাহিনি যত না বলা, তার চেয়ে বেশি অনুভব করা। এই গল্পটি ‘ডিটেকটিভ তারিণীচরণ’
সংকলনের শেষ ছায়াপতন—যেখানে ধ্বনির চেয়ে প্রতিধ্বনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এবং তারিণীচরণের গোয়েন্দাগিরি যেন এইখানেই পৌঁছয় এক ধ্যানস্ত স্তরে—যেখানে তথ্য নয়, উপলব্ধিই আসল চাবিকাঠি।
বইটির নির্মাণ ও ডিজাইন: চোখে ও মনে রঙ ছড়ানো কাঠামো
“Books are not made for furniture, but there is nothing else that so beautifully furnishes a room.” —Henry Ward Beecher
‘ডিটেকটিভ তারিণীচরণ’-এর কাহিনি যেমন বহুস্তরীয় ও ইতিহাসগর্ভ, বইটির নির্মাণশৈলিও তার উপযুক্ত এক বাহ্যিক আবরণ নির্মাণ করেছে। বুকফার্ম-এর প্রোডাকশন ডিজাইনে সেই পরিপাটি ও নিপুণতার ছাপ স্পষ্ট—যদিও ছোটখাটো কিছু সূক্ষ্মতা এখনও উন্নতিসাধ্য।
প্রথমেই বলতে হয় বইটির আকৃতি, বাঁধাই ও পাতা-রঙ নিয়ে। ম্যাট ফিনিশ কভারের একটি অলৌকিক ধূসর-হলুদ টোন পাঠকের মনোযোগকে প্রথমেই গ্রাস করে। তবে, কিছু পাঠকের কাছে এই ম্যাট র্যাপারটি একটু বেশি মসৃণ বা হাত-চ্যুতি সম্ভাবনাময় মনে হতে পারে—বিশেষত যারা বই পড়েন বিছানায় আধশোয়া হয়ে বা চায়ের কাপ হাতে।
অধ্যায়ের নামকরণ, শিরোনামের ফন্ট, ও অভ্যন্তরীণ অলঙ্করণ—এইখানে খানিক সূক্ষ্মতা আরও আশা করা যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিত্রনির্মাণ ও টাইপোগ্রাফির ভারসাম্য হারিয়ে যায়, বিশেষত যখন পাঠ্যাংশের সঙ্গে ছবির ছায়াপাত ঠিকঠাক খাপে খায় না। কিন্তু এসব minor hiccups ছাপিয়ে যায় একটি অসাধারণ সংযোজন—প্রথম পাতায় থাকা বিশ্লেষণী ম্যাপ ও ইনফোগ্রাফি।
বইয়ের ম্যাপ একটি অনন্য সংযোজন—যেখানে লেখক (বা প্রকাশক) কেবল পাঠকের চোখ নয়, তার চিন্তার গতিপথকেও দিকনির্দেশনা দেন। এটা একটি নিছক অলঙ্করণ নয়, বরং এক ধরনের detective cartography—যা পাঠককে কাহিনির ভৌগোলিক ছায়ায় অন্বেষণ করতে শেখায়।
“Design is not just what it looks like and feels like. Design is how it works.” —Steve Jobs
এই বইয়ের ডিজাইনও ঠিক সেই ভাবেই কাজ করেছে—একটি নিখুঁত বয়ান ও পাঠ-রসায়নের নেপথ্য অবলম্বন হিসাবে।
এছাড়া বেশ কিছু পৃষ্ঠার চিত্রাঙ্কনে রয়েছে নস্টালজিয়ার ছোঁয়া—পেন-স্কেচ ঘরানার পরিপাটি রেখা, যেগুলি যেন গল্পের সঙ্গে ছায়ার মতো মিশে যায়।
শেষে বলা যায়, 'ডিটেকটিভ তারিণীচরণ' শুধু একটি পাঠ নয়, একটি স্পর্শযোগ্য অভিজ্ঞতা। এই বইটিকে শেলফে রাখা যায়, কিন্তু বারবার হাতের কাছে টেনে আনার মতো তার “ট্যাকটাইল গ্র্যাভিটি” প্রবল। একে পাঠযোগ্যতার চেয়েও বেশি—একটি রেট্রো-ইনটেলেকচুয়াল চর্মানুভূতির রচনাবস্তু বলাই ভালো।
কিছু গলদ ও সম্ভাবনার রেখাচিত্র
"Perfection is not attainable, but if we chase perfection, we can catch excellence." —Vince Lombardi
‘ডিটেকটিভ তারিণীচরণ’-এ কৌশিক মজুমদার ম্যাসন ট্রিলজির তুলনায় অনেক বেশি সংযত ও গঠিত লেখনী উপস্থাপন করেছেন। তথ্যে ভারাক্রান্ত (infodump-heavy) সেই আগেকার প্যাসেজগুলো এইখানে অনেকটাই পরিমিত, কিন্তু পুরোপুরি নির্মূল বলা যায় না। Sporadic জায়গায় এখনো দেখা যায় clue overexposure, অর্থাৎ পাঠক আগেভাগেই অনুমান করে ফেলতে পারেন কী হতে চলেছে। আর কিছু ক্ষেত্রে coincidence-driven revelation গল্পের জাদুকে কিছুটা খোঁচা মারে।
‘মৃগতৃষ্ণা’ ও ‘ভস্মবহ্নি’, দুটি গল্পেই রহস্যগঠন তুলনামূলকভাবে কিছুটা ঢিলেঢালা—যেন কাহিনির প্রেক্ষাপট ও আবহমণ্ডল গল্পের কাঠামোর চেয়ে বেশি শক্তিশালী। বিশেষ করে লকড রুম পাজলগুলি যতটা অনুরণিত হওয়ার কথা, বাস্তবে সেগুলি অনেক ক্ষেত্রেই ওভারএক্সপোজার ও অতিনাটকীয় মোচড়ে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে।
তার উপর, লকড রুম রহস্যের দার্শনিক গুরুত্ব ও ভৌতিকতার হালকা রঙ কখনও কখনও পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে যায়। ভৌতিক আবহের স্বাভাবিক আতঙ্ক যখন যুক্তির ভারে চূর্ণ হয়, তখন কল্পনার রসায়নে খানিকটা ফাটল পড়ে।
“A good mystery is not just about the crime, but about what the crime reveals.” —P.D. James
এই প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতিটি মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি রহস্য কেবল “কে খুন করলো” তাতেই শেষ নয়—তাতে কী অনাবিষ্কৃত সত্য উদ্ঘাটিত হলো, সেটাই আসল প্রশ্ন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বললে, ‘গোধূলিসন্ধি’-র তুলনায় প্রথমদুটি কাহিনির গভীরতা খানিকটা কম।
তবে এখানেই ‘সম্ভাবনার আভাস’—যদি লেখক ভবিষ্যতে এই মেজাজ ও ধাঁচ বজায় রেখে, ইনফো-ডাম্প ও কাকতালীয়তা এড়িয়ে আরও শৈল্পিক tight plotting করেন, তাহলে ‘তারিণীচরণ’ হয়ে উঠতে পারেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গভীরচিন্তক গোয়েন্দা।
উপসংহার: প্রায় গোয়েন্দার এক পূর্ণজন্ম
“ডিটেকটিভ তারিণীচরণ” সংকলনটি নিছক তিন-চারটি গোয়েন্দা গল্পের সংগ্রহ নয়; বরং এটি এক নবীন গোয়েন্দার মননশীল আত্মপ্রকাশের অনবদ্য দলিল। ম্যাসন সিরিজের ছায়াঘন আখ্যান থেকে বেরিয়ে তারিণীচরণ এবার এগিয়ে এসেছে আলোতর পথে—নিয়ন্ত্রিত আলো, যেন বার্নার্ড শ’র ভাষায়, “a candle flickering against the dark winds of colonialism and disbelief.”
তারিণীর চরিত্র এখানে যেন পরিণতির এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—কিছুটা বাঙালি যুক্তিবাদের প্রতীক, কিছুটা ঔপনিবেশিক ছায়ায় বেড়ে ওঠা মননের দ্বন্দ্ব। গোয়েন্দাগিরি তার কাছে কেবল পেশা নয়; এক ধরণের সন্ন্যাস, যেখানে প্রতিটি প্রশ্ন এক আত্মানুসন্ধান, প্রতিটি রহস্য এক যুগান্তকারী প্রতিচ্ছবি।
“असतो मा सद्गमय।” — বৃহদারণ্যক উপনিষদ (“Lead me from the unreal to the real.”)
এই মন্ত্রই যেন তারিণীর গোটা যাত্রার অন্তরস্বর। অলৌকিকতার ঝাপসা পর্দা সরিয়ে দিয়ে সত্যের নির্মম আভায় সে পৌঁছতে চায়। He doesn’t just chase shadows—he interrogates them, with patience and philosophy.
পাঠের প্রেক্ষাপট: ম্যাসনের বাইরেও আলাদা এক মহাকাব্য
যারা ম্যাসন সিরিজ পড়েননি, তাঁদের জন্য এই বইটিতে চরিত্র-ভিত্তিক প্রাসঙ্গিক ভূমিকা রয়েছে, ফলে বুঝতে বা উপভোগ করতে অসুবিধা হয় না। প্রতিটি কাহিনি আপন গতিতে এগোয় এবং পাঠককে টানে নিজস্ব রসায়নে। আর যারা পুরোনো পাঠক—তাঁদের জন্য এটি এক ধরণের পুনর্মিলন। পুরনো চরিত্রেরা এখানে ফিরে এসেছে নতুন রূপে, যেন “The same river, but not the same water.”
শেষ কথা: একটি চরিত্র, একটি সময়ের দর্পণ
তারিণীচরণ নিছক একটি গোয়েন্দা চরিত্র নয়—সে এক ঐতিহাসিক সংবেদনের প্রতিচ্ছবি, এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীক। বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যে যখন বহু চরিত্র জৌলুস হারিয়ে ফেলে নিছক রুটিন হয়ে যায়, তারিণী ঠিক তখনই এক ভিন্ন পথ বেছে নেয়। তার ত্রুটি আছে, কিন্তু সেই ত্রুটি তাকে আরো মানবিক করে, তাকে ফেলুদা বা ব্যোমকেশের অতিমানবীয়তার থেকে আলাদা করে তোলে।
“He who opens the locked door of the past, must be ready to face the ghosts that linger behind it.”
এই লাইনটি শুধু গল্পের নয়, এই গোটা সিরিজের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। কৌশিক জানেন—প্রতিটি ইতিহাস-নির্ভর রহস্যের গভীরে ঘুমিয়ে থাকে অজস্র ভূত, আর একজন সত্যিকারের গোয়েন্দা সেই ভূতের চোখে চোখ রাখতে সাহস করে।
ইদানীং বাংলা গোয়েন্দা গল্পের স্পেসটা কৌশিক মজুমদারের তারিণীচরণ মোটামুটি ক্যাপচার করে ফেলেছে বলা চলে। "মেসন সিরিজ" আমার ব্যক্তিগতভাবে পোষায়নি। প্রথম বইটায় ("সূর্যতামসী") ইনফো-ডাম্পিং থাকলেও হোমস-প্যাসটিশ হিসাবে তাও চলে যায়, যদিও মূল রহস্যটা একদম plain as pikestaff। তারপর ইনফো-ডাম্পিং ব্যাপারটা হাতের বাইরে চল��� গেলো। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো এক বুক প্রায় জমে আসা কাদা ঠেলে এগোতে হচ্ছে; এক-এক সময় মনে হচ্ছিলো নিকুচি করেছে রহস্যের, সব শালা একধারসে টেঁসে যাক, রেহাই পাই। তারপর একটা পূজাবার্ষিকীতে পড়ি "ভষ্মবহ্নি"। এতে ইনফো-ডাম্পিং এর জ্বালা ছিল না, কারণ পরিসর কম, কিন্তু লকড-রুম মিস্ট্রিটিও ছিল নেহাতই জোলো। মানে এতই জোলো যে একটু ডিটেলে বলতে গেলেই স্পয়লার হয়ে যাবে।
এই নতুন "ডিটেক্টিভ তারিণীচরণ" বইটা যখন বেরোয়, কাটিয়েই দিয়েছিলাম, কিন্তু গুডরিডস-এ পড়লাম, তৃতীয় গল্পটা নাকি দারুন লিখেছেন কৌশিকবাবু। কিনেই ফেললাম লোভের বশবর্তী হয়ে। বইতে তিনটি নভেলা: "মৃগতৃষ্ণা", "ভষ্মবহ্নি", আর "গোধূলিসন্ধি" (এ'ছাড়াও "ইয়ান জি-হং-এর মুক্তো" বলে একটি ছোটগল্প "ভষ্মবহ্নি"-র পরিশিষ্ট হিসাবে গোঁজা রয়েছে)। "ভষ্মবহ্নি" কেমন লেগেছে আগেই বললাম, "মৃগতৃষ্ণা"-ও তথৈবচ। লকড-রুম মিস্ট্রি একটু-আধটু পড়া থাকলেই রহস্য উদ্ঘাটন করতে বিশেষ মাথা খাটাতেও হয় না। দ্বিতীয় খুনের সমাধানটাও একেবারেই গোঁজামিল। তবে দার্জিলিং যাত্রা ও দার্জিলিং শহরের বর্ণনা পড়তে ভালো লাগে।
"গোধূলিসন্ধি" সত্যিই এখনো পর্যন্ত তারিণীচরণের সেরা রহস্য। এখানে গণপতির পুনরাবির্ভাব ঘটে, ও বলতে গেলে তার তত্বাবধানেই ঘটে যায় একটি খুন। এর সঙ্গে জোড়ে ইংরেজ পুলিশ অফিসারের খুন, যেটা আবার লকড-রুম মার্ডার। এর সঙ্গে আছে চাপেকার ব্রাদার্স আর আমেরিকার কুখ্যাত গুন্ডা পল কেলির কিস্সা। রেড-হেরিংয়ের ব্যবহার এই গল্পে চমৎকার, আর রহস্যের সমাধানটা বেশ চমকপ্রদ। যদিও দ্বিতীয় খুনের লকড-রুম টা খুনের পরও কীভাবে লকড থাকলো, এই ব্যাপারটা একটু গোঁজামিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্রিস্টি-ঘরানার ভক্ত, যেখানে রহস্য সমাধানের জন্য সমস্ত তথ্য গল্পের মধ্যেই সুচারুভাবে ছড়ানো থাকে, খুঁজে নিতে হয়। এই গল্পের সমাধান একেবারেই হোমস-ঘরানার। তারিণীও তার স্রষ্টার মতো প্রচুর রিসার্চ করেছে, ও তাই একমাত্র সেই ম্যাডাম এলার উল্কি, পল কেলির রেফারেন্স, ইত্যাদি ধরে রহস্য সমাধান করতে পারে। বাকিদের পক্ষে এসব বিষয়ে পড়াশুনা না থাকলে রহস্য সমাধানের ধারকাছ দিয়েও যাওয়া সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে ৫/১০ দেওয়াই চলে। এর পর থেকে বড় উপন্যাস না লিখে এই ধরণের ছোটগল্প বা নভেলা লিখলে যাতে ইনফো-ডাম্পিংয়ের স্পেস না থাকে, আর এই লকড-রুম মিস্ট্রির ঝোঁকটা (এই ব্যাপারটা কিছুতেই দাঁড়াচ্ছে না) কাটিয়ে উঠতে পারলে হয়তো তারিণী আরো পাকা গোয়েন্দা হয়ে উঠতে পারবে।
প্রথমেই জানিয়ে রাখি, আমার এই প্রতিক্রিয়ায় গল্পের মজা বিনষ্টকারী, অর্থাৎ spoiler আছে, তাই যারা বইটা পড়েননি, দয়া করে এড়িয়ে যান।
আজ ছুটির দিনে পড়ে শেষ করলাম বিশিষ্ট লেখক কৌশিক মজুমদারের ইতিমধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠা “ ডিটেকটিভ তারিণীচরণ” প্রথমে বইটার ব্যপারে কিছু কথা বলি। এটি বুক ফার্ম প্রকাশনীর নতুন একটা বই। হার্ডকভার, অসাধারণ বাঁধাই এবং পেজ কোয়ালিটি। দাম ডিসকাউন্ট নিয়ে প্রায় ৩৫০ টাকার কাছাকাছি এবং বইয়ের মান নিজের দামের সঙ্গে যথাযোগ্য। বইটি হাতে নিলেই একটা সুন্দর অনুভূতি হয়। বইয়ের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মানানসই কভার এবং যথাযত ভেতরের আর্টওয়ার্ক। প্রকাশককে ধন্যবাদ। এবার আসি বইয়ের মূল বিষয়ে। এই বইতে তিনটে উপন্যাসিকা এবং একটা ছোট গল্প আছে। উপন্যসিকাগুলো যথাক্রমে মৃগতৃষ্ণা, ভষ্মবহ্নি এবং গোধূলিসন্ধি। প্রথমে আসি গোধূলিসন্ধি উপন্যাসিকাটিতে। এই বইতে এই উপন্যাসিকা আমার সব থেকে ভালো লেগেছে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কিছু টুকরো গল্প, এবং প্লেগের মহামারির প্রভাব দুটোই খুব সুন্দরভাবে রহস্যকাহিনির সঙ্গে ব্লেন্ড হয়েছে। লেখকের গুন হচ্ছে তিনি গদ্যনির্মাণে সুদক্ষ। তার পারদর্শীতায় আপনি বই হাতে আগ্রহ সহকারে বসে থাকবেন যতক্ষণ না উপাখ্যান শেষ হচ্ছে। আরও একটা ব্যাপার বুঝেছি যেটা, লেখক ভারত তথা বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং তৎকালিন জীবনশৈলির গল্পগাথা গুলে খেয়েছেন। এই বইটিতে নিজের সেই সমস্ত গুনাবলি মেলে ধরেছেন তিনি। তবে মূল যেটা বিষয় অর্থাৎ গোয়েন্দা গল্লটিতে কিছু কিছু জায়গায় আমার মতে আরও যত্নশীল হয়ে লেখা যেত। গোধূলিসন্ধি উপন্যাসিকাতেই কয়েকটি জায়গা আমার একটু দুর্বল লেগেছে। যেমন, এক ব্যাক্তি খুন হন, কিন্তু সেই ব্যাক্তি মরার আগে Shakespeare-র একটি বইতে, টেম্পেস্ট নাটকের একটা ছবিতে রক্তের দাগ দিয়ে যান ক্লু হিসেবে। সেই ছবিতে শেক্সপিয়রের টেম্পসেট নাটকের চারটি চরিত্র ছিল এবং তাদের একজনের নামের সঙ্গে উপন্যাসিকার একজন চরিত্রের নামের মিল খুব সহজ ভাবেই পাওয়া যায়। বোঝাই যায় তিনিই খুন করেছেন। যারা শেক্সপীয়ার পড়েছেন বা নিদেনপক্ষে একটু ইন্টারনেট ঘাঁটবেন তারাই ধরে ফেলবেন, তাই এই জায়গাটা অর্থাৎ ভিক্টিমের ক্লু রেখে যাওয়ার ব্যপারটা আরও পোক্ত করা যেত। তবে মোটের ওপর গল্পের গতি এবং শেষ পরিণতি আমার মন ছুঁয়ে গেছে।
মৃগতৃষ্ণা উপন্যাসিকা মোটামুটি লেগেছে। শুরুটা যদিও ভালো হয়েছিল। তবে তারিণীচরণ এবং তাঁর স্ত্রী মাখনবালা দেবী, এই দুজন ছাড়া আর কোনো চরিত্র ঠিক ভাবে গঠিত হয়নি। অহেতুক কিছু বর্ণনা এবং তথাকথিত ইনফো ডাম্পিংয়ে সময় নষ্ট না করে ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট করলে লেখাটা ভালো হত বলে আমার মনে হয়। তাছাড়া খুনের পদ্ধতিগুলোও দুর্বল ভাবে ব্যাখা করা হয়েছে। প্রথমে একটি মেমসাহেব খুন হন বন্ধ ঘরে। যখন তাঁর দুজন পরিচারক ঘরের দরজা ধাক্কা দেয় তারা দেখে ভেতর থেকে শিকল তোলা এবং একটা ভারি সোফা অর্থাৎ কৌচ দরজার মুখে রাখা। স্পষ্ট বলা হয়েছে দুজন জোয়ান পরিচারক খুব কষ্ট করে কৌচটা সরিয়ে ঘরে ঢোকে, কিন্তু শেষে তারিণীচরণ সমাধান করতে গিয়ে বলছেন, খুনি মেমসাহেবকে খুন করে ঘর থেকে বেরিয়ে সোফার পায়ে দড়ি বেঁধে সেটাকে দরজার পাশ থেকে টেনে দরজার মুখে বসিয়ে তারপর প্লায়ার্স গলিয়ে শিকল এঁটে পালিয়ে যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে সোফা দুজন লোকের পক্ষে নড়ানো কষ্টসাধ্য, সেই সোফা কী করে একজন মানুষ পায়ায় দঁড়ি বেঁধে দরজার পাল্লার নীচের ফাঁক দিয়ে টেনে সরিয়ে দিলেন? আবার এই খুনিটিকেই একদম শেষে গিয়ে আরেক ব্যক্তি খুন করেন, কিন্তু সেই খুনের মোটিভ যেটা লেখক দেখিয়েছেন সেটা একেবারেই ধোপে টেকে না। কেবলমাত্র ভয়, আতঙ্ক বা অচম্ভিত হয়ে কেউ কাউকে ছুরি মেরে খুন করে দেয় না, বা দিলেও আক্রান্ত ব্যাক্তি প্রতিঘাত বা চিৎকার না করে চুপচাপ মরে যাবেন সেটা হয় না। তাছাড়া তারিণীচরণ বুঝলেন কী করে খুন সেইভাবে হয়েছে সেটারও যথাযথ ব্যাখা নেই..তাই জমল না শেষে গিয়ে..
ভষ্মবহ্নি উপন্যাসিকাটিও সত্যি বলতে কী তেমন একটা মনে দাগ কাটেনি। এখানে সার্কাসের এক ম্যানেজার বন্ধ একটি ক্যারাভানের ভেতর খুন হয়ে যান। ক্যারাভানের দরজা ছিল বন্ধ, কিন্তু মাথার পিছনে ছিল একটা ছোট্ট ঘুলঘুলি। ভদ্রলোক মরেওছেন মাথায় আঘাত পেয়ে, কিন্তু তাকে মারল কে? ঘুলঘুলি দিয়ে মানুষের পক্ষে ঢোকা সম্ভব না। কি দিয়ে মারা হয়েছে তাও পাওয়া যায়নি বন্ধ কারাভ্যানটিতে। কয়েক পাতা পড়ার পরেই জানা গেল সার্কাসে একজন তীরের খেলা দেখানোর লোক আছেন। মোটামুটি তখনই বুঝলাম ভারি কিছু তীরের ডগায় আটকে ঘুলঘুলির মধ্যে দিয়ে ছুড়ে দেওয়া হয়েছিল ( এটা যে কেউ আন্দাজ করতে পারবে), মানে তীরন্দাজ ব্যাক্তিটিই খু���ি, কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না মার্ডার ওয়েপনটা বের করে আনল কী ভাবে, দূর থেকে কারও মাথা লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করলে সেই তীর তার মাথায় ঢুকে বসে যাওয়া উচিত! মোটামুটি হলও তাই, তারিণীচরণ শেষে গিয়ে তীরন্দাজকেই ধরলেন, গভীর রাতে তিনিই একটা শিশার আগা বিশিষ্ট লাঠিকে ধনুকের মাধ্যেমে তীরের মত নিক্ষেপ করেন এবং সেটা ঘুলঘুলির মধ্যে দিয়ে গিয়ে লাগে ম্যানেজারের মাথায়, কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেটি নাকি মাথায় আঘাত করে বাইরে পড়ে যায়! এটা তখনই সম্ভব যদি তীর গিয়ে খুবই আস্তে লাগে আর নয়ত ভদ্রলোকের টাক টাইট্যানিয়াম দিয়ে তৈরি! মাইরি…পুরো অবাস্তব এবং হাস্যকর ব্যাখা!
এছাড়াও একটা ছোটগল্প আছে, মোটামুটি লেগেছে। গল্পটিতে তারিণীচরণ আছেন কিন্তু তিনি কেবল শ্রোতা।
যাইহোক, বইটি পড়ে যা বুঝলাম যারা সচারাচর ডিটেকটিভ পড়েন না, ফেলুদা বা ব্যোমকেশের ওপর কখনো যাননি, তারা পড়ুন, ভালোই লাগবে। কিন্তু একটু হার্ডকোর ডিটেকটিভ থ্রিলার যারা পছন্দ করেন, বিশেষকরে যারা আগাথা ক্রিস্টি বা জন ডিকসন কার পড়েছেন তাদের মনে দাগ কাটবে না।
পবিত্র ঘোষ
This entire review has been hidden because of spoilers.
সদ্য প্রকাশিত লেখক কৌশিক মজুমদার প্রণীত বুকফার্ম থেকে প্রকাশিত ডিটেকটিভ উপন্যাস সন্দর্ভ "তারিণী চরণ" প্রকাশ পাওয়ার ঠিক ১৩ দিনের মাথায় হাতে আসার পরেও কিছুদিন নিজেকে বইটা পড়া থেকে ইচ্ছে করেই বিরত রেখেছিলাম , তার কারণ কিছু কাহিনী থাকে যা পড়ার আগে নিজেকে আলাদা করে প্রস্তুত হতে হয়। কারণটা যারা আমার মত সূর্যতামসী, নিবার সপ্তক ,অগ্নি নিয়ে পড়েছেন তারা ভালো করেই বুঝবে।
লেখক কৌশিক মজুমদারের লেখনী তার চিন্তা ভাবনার বিস্তৃতি কতটা সেটা তার লেখাতেই প্রকাশ পায় , ম্যাসন সিরিজ হোক কিংবা তার লেখা বাকি বই সবেতেই লিওনার্দো ডা ভিঞ্চির কাজের মতোই বিশাল তার বিস্তৃতি এবং সুগভীর, যতই বলা যায় ততই কম ।। আসলে কিছু মানুষ থাকে যারা পাঠকদের শুধু ভালো বই উপহার দেন না পাঠকদের মনে কিভাবে "পেনিট্রেট" করে পাকাপাকি ভাবে জায়গা করে নিতে হয় নিজের কাজের মাধ্যমে সেটা খুবই ভালো করে জানেন। লেখক কৌশিক দা সেই জায়গা থেকে আমার মতই বাকি পাঠকদের কাছে স্বর্ণ পদক দাবি করতেই পারে।।
✨এবার আশা যাক বইয়ের ব্যাপারে , ডিটেকটিভ তারিণী চরণ বইয়ে তিনটি ছোট গল্প ও একটি বড় উপন্যাস রয়েছে 💥 স্বাধীনতা পূর্ববতী দার্জিলিং এর প্রেক্ষাপটে লেখা মৃগতৃষ্ণা , যেখানে বিবাহ পরবর্তী সময়ে তারিণী সস্ত্রীক গিয়েছেন মধুচন্দ্রিমায় গিয়েই সম্মুখীন হলেন এক অদ্ভুত হত্যা কাণ্ডের ।। 💥 এছাড়াও রয়েছে পূর্বে প্রকাশিত গল্প ভস্মবহ্নি , যাহা এই বইতে নতুন আঙ্গিকে ও কিছুটা পরিবর্ধন রূপে । 💥 এছাড়াও ভস্মবহ্নি_র পরিশিষ্ট রূপে এসেছে " ইয়ান জি হং এর মুক্তো।। 💥 আর রয়েছে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি বড় কাহিনী গোধূলী সন্ধি যাহাতে তারিণীর ভ্রাতৃ সম বন্ধু "যাদুকর গণপতিকে" আমারা আবার ফিরে পাবো তবে খুনের অভিযোগে ফাঁসির আসামি হয়ে।।
পাঠ প্রতিক্রিয়া – বাস্তব আর অবাস্তবের মেলবন্ধনের এই মেলায় কখন যে একটি চরিত্র মনে এভাবে মনে জায়গা করে নেবে ভাবই নি ।। তারিণীর ডিটেকটিভ হয়ে ওঠার গল্প যত সময়ের তরী ধরে এগিয়েছে ততই পাঠক হিসেবে মনে হয়েছে আরও চাই এত অল্পতে কি আর সাধ মেটে লেখক কৌশিক মজুমদার সেই আশা পূরণ করে চলেছেন এবং আগামীদিনে ও চলবেন এই আশাই রাখি ।।
✨ যে বিষয় গুলি ভালো লাগলো – সময়ের টাইমলাইন ধরে একটি চরিত্রের ব্যাপ্তির বৃদ্ধি , খেয়াল রাখতে হবে এই বইয়ের সব কাহিনী কিন্তু স্বাধীনতার আগে সেক্ষেত্রে একজন নেটিভ বাঙালি ভারতীয়কে কতটা ডিটেকটিভ হিসেবে ব্রিটিশ পুলিশ কর্তৃপক্ষ মেনে নেবে সেদিকেও যথেষ্ট লক্ষ রেখেছেন লেখক।।
একজন পুলিশি ইনফরমার থেকে ,ঘটনা সূত্রে এটি বিরাট বড় ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার ফলে , একজন সাধারণ মানুষ কিভাবে অসাধারণ চরিত্রে পরিণত হয় এখানে সব গল্পের মূল নির্যাস কিন্তু সেটাই।।
হিলির ভূত ঘুমিয়ে গেলেও লেখক কিন্তু তারিণী কে ঘিরে থাকা ভৌতিক আবহকে মাথায় রেখেই সব গল্প লিখেছেন।। " দানো বা ভূত" এটাই কিন্তু সব গল্পের মেইন "থিম" .. সব গল্পই "locked room mystery" কিন্তু প্রত্যেক গল্পের শুরুতেই ভৌতিক আবহের ছোঁয়া স্পষ্ট ।।
প্রত্যেক গল্পের স্ট্রাকচার দুর্দান্ত ভাবে সাজানো , কম শব্দের মধ্যে লেখক পাঠককে তদন্তের প্রয়োজনে অতীত , বর্তমান, খুনী সম্পর্কে ক্লু এবং বলতে গেলে কিছু ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ প্রেডিক্ট করারও জায়গা দিয়েছেন।।
পাহাড় যাত্রার বর্ণনা হোক কিংবা কতগুলি নারী চরিত্রের আড়ালে সামাজিক অবস্থা ও ব্যবস্থার বর্ণনা সবইতেই লেখক লেখনীর মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। একধারে যেমন খুন তার ওপর মহামারী তাকে কেন্দ্র করে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই , কিছু মানুষের স্বার্থের সংঘাত কিংবা শরীরের লোভে সর্বস্ব খোয়ানো বা আবার অচেনা মানুষের সাথে ঘর বাঁধার গল্প একটি ডিটেকটিভ গল্পের বইতে এর চেয়ে বেশি আর কত।
শার্লক হোমস বা বলা ভালো সাইগারসনের ছোঁয়ায় একজন ছাপোষা বাঙালী লোকের observesion and deduction ক্ষমতার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ও তার ব্যবহারিক প্রভাবে বিরক্ত তথা বিস্ময়ের একটা আবছা আবাস লেখক খুব সূক্ষ্ম ভাবে তুলে ধরেছেন ।।
তারিণী আদতে একজন ব্রাউন পরাধীন দেশের লোক আর শার্লক হোমস সেখানে একজন ইংরেজ " যেই অ্যাবসার্ড পর্যবেক্ষণে শার্লকের ক্ষেত্রে বাহবা জোটে তারিণী ক্ষেত্রে সেখানে ঠিক উল্টো" তবুও নিজেকে সংযত ও মার্জিত স্বভাবের আড়ালে রেখে একজন বাঙালি কিভাবে নিজের ডিটেকটিভ সত্তার জাত চেনাবে লেখক সুন্দর করে তা তুলে ধরেছেন।।
ক্রাইম সিন , মোটিভ , ব্যাক স্টোরি , ফলস্ অ্যাঙ্গেল, সাসপেক্ট এমন কি স্টোরি রিভিল সবই দুর্দান্ত লেগেছে ।। শেষ গল্পের ক্লাইম্যাক্স টুইস্টিং is something to worth buying ...
গণপতির চরিত্র কে শুধু মাত্র ম্যাজিশিয়ান না রেখে আলাদা শেডস দেওয়ায় দুর্দান্ত ফুটে উঠেছে ।। ( চরিত্রের ভালো খারাপ বিচার না হয় ভগবান করুক)
বই মেলার আগে , এরকম দুর্দান্ত একটা বই পাঠকদের উপহার দেওয়ার জন্যে লেখক ও প্রকাশককে ধন্যবাদ।।
প্রিয়নাথের রিটায়ারমেন্ট এখনও ১০ বছর বাকি আছে আশা রাখি ,বইয়ের প্রথমে যে ম্যাপ রয়েছে সেই অঞ্চল ঘিরে আবার কোন রহস্য উন্মোচন তারিণী ও প্রিয়নাথের যুগলবন্দি দেখতে পাবো।। সময় লাগুক তবে এবার এলে বড় পরিসরে আরও জটিল ভাবে আসুক।।।
✨ বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই , তবে আমার ১২৫ নম্বর পাতার ছবিটি নিয়ে সিরিয়াস অভিযোগ থাকবে। ওটা না থাকলে বা ওটাকে পরের যে ছবিটি রয়েছে তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে করা উচিত ছিল।।
ডিটেকটিভ তারিণীচরণ বইটিতে আমরা তারিণী ও প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের জুটিকে সেই ব্রিটিশ আমলের ভারতে ঘটে যাওয়া তিনটি অদ্ভুত ভুতুড়ে রহস্যের কিনারা করতে দেখি। সেই যুগের ভারতবর্ষ, তদন্তের প্রক্রিয়া ( যে সময় কিনা ক্যামেরা বা ফোন দূরের কথা, এখানে তারিণী প্রথমবার আঙুলের ছাপ নেওয়ার প্রক্রিয়া দেখলো) মানুষের মনে কুসংস্কার, ইউরোপিয়ানদের দ্বারা ভারতীয়দের ওপর করা বর্ণবৈষম্যের অত্যাচার, তদন্তের সাথে সাথে প্রসঙ্গক্রমে এই ব্যাপারগুলো উঠে এসেছে। কাহিনীর ভাষ��� খুব সহজ, ঝরঝরে ও গতিশীল। একদিকে Unputdownable কাহিনী, অন্যদিকে ছবি, ম্যাপ, কভারপেজ : সব মিলিয়ে এই বইটি সংগ্রহে রাখার মত একটি বই। শুনেছি লেখক নাকি এই বইয়ের কিছু ছবি নিজেই ডিজাইন করেছেন। আর এই বইয়ের কভার পেজ ও সামনে কয়েক পাতার ডিজাইন তো শিল্পের পর্যায়ে গেছে। ম্যাসন সিরিজ পড়া না থাকলেও এই বই আপনি পড়তে পারবেন। এই বই ছোটদের জন্য নয়। আরেকটা কথা। যারা দারোগা প্রিয়নাথ পড়েননি, এই বইটি আরো বেশি উপভোগ করতে দারোগার দপ্তর থেকে কিছু গল্প পড়ে বা ইউটিউবে অডিও বুক শুনে এই বইটি হাতে নিন।
শারদীয়া পত্রিকায় আগেই পড়েছিলাম মৃগতৃষ্ণা ও ভস্মবহ্নি, এবার দুই মলাটের মধ্যে আরও পেলাম গোধূলীসন্ধি উপন্যাস - যেটি আয়তনে এই বইয়ের দীর্ঘতম এবং রহস্যে জটিলতম উপন্যাস।
মৃগতৃষ্ণা এবং গোধূলীসন্ধিতে তারিণীর সঙ্গী হয়েছে স্ত্রী মাখনবালা; আবার ভস্মবহ্নি এবং গোধূলীসন্ধিতে তারিণী রহস্য সমাধান করেছে দারোগা প্রিয়নাথের সঙ্গে । লেখক এই বইয়ের মাধ্যমে সস্ত্রীক, সবান্ধব, এবং সপরিবারে তারিণীকে (এবং তার সাথে পাঠককেও) ভ্রমণ করিয়েছেন দার্জিলিং থেকে কলকাতা হয়ে সাঁওতাল পরগণার তামাটুলি অবধি। ফলে রহস্যভেদের সাথে উপরিপাওনা হয়েছে স্থানবৈচিত্র (যেমনটা আমরা ফেলুদার গল্পে পেতাম) ।
শীতের দুপুরে রোদে পিঠ দিয়ে কমলালেবুর সাথে এই বই অতি উপাদেয়।
ডিটেকটিভ তারিণীর পরবর্তী রহস্যকাহিনী পড়িয়া মুগ্ধ হওয়ার অপেক্ষায় রইলাম...
বইটির প্রচ্ছদ – outstanding বললেও কম বলা হবে। বিভিন্ন ধাঁচের রহস্য – খুন, চুরি, প্রতারণা – সবই আছে, তবে উপস্থাপন একেবারে স্বতন্ত্র।
✍️ কৌশিক মজুমদারের সাবলীল ও প্রাণবন্ত ভাষা, যা কিশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক – সবার উপযোগী। এক অনন্য গোয়েন্দা চরিত্র যিনি অতিরিক্ত নাটকীয়তা নয়, বরং ঠান্ডা মাথায় যুক্তি দিয়ে রহস্যের জট ছাড়ান। Detective tarinicharan is a very good compilation of stories which are unique and Kaushik sir writing style makes it unputdownable
ভয়াবহ এক রিডিং স্ল্যাম্প থেকে বের হওয়া দরকার ছিল। কৌশিক মজুমদারের লেখনী বরাবরই বেশ গ্রিপিং এবং পরিপক্ব। যদি লেখনী আর গল্পের মান নিয়ে র্যাংক করা লাগে, ১। গোধূলিসন্ধি ২। ভস্মবহ্নি ৩। মৃগতৃষ্ণা ৪। ইয়ান জি হং
আশা থাকবে, তুর্বসু আর তারিণীচরণ এর আরো ইন্টারেস্টিং গল্প আমরা পাবো আনার তরফ থেকে।