রহস্য। ভৌতিক। অলৌকিক। কিংবা নিছক ক্রাইম স্টোরি। গল্পের বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন, এই সংকলনের সব গল্প আসলে এক তারে বাঁধা। এদের সবার মূল বিষয় "অন্ধকার"। হোক না সে মানব মনের কালিমা, গভীর অন্ধকারের ঘুম, অতিলৌকিক তমসা অথবা ডিস্টোপিয়ান ডার্কনেস। আদতে গোটাটাই এক নিরবিচ্ছিন্ন আখ্যান। সঙ্গে পাতায় পাতায় রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা…‘তারপর কী হল?’ দুই মলাটে বন্দি রয়েছে অদ্ভুত এক আঁধার, নীল কস্তুরী আভার চাঁদ। শুধুমাত্র বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য। আফসার ব্রাদার্স থেকে।
জন্ম ১০ এপ্রিল, ১৯৮১, কলকাতা। স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পি. এইচ. ডি. তে সেরা ছাত্রের স্বর্ণপদক প্রাপ্ত। নতুন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া Bacillus sp. KM5 এর আবিষ্কারক। বর্তমানে ধান্য গবেষণা কেন্দ্র, চুঁচুড়ায় বৈজ্ঞানিক পদে কর্মরত এবং হাবড়া মৃত্তিকা পরীক্ষাগারের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। জার্মানী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা গবেষণাগ্রন্থ Discovering Friendly Bacteria: A Quest (২০১২)। তাঁর কমিকস ইতিবৃত্ত (২০১৫), হোমসনামা' (২০১৮),মগজাস্ত্র (২০১৮), জেমস বন্ড জমজমাট (২০১৯), তোপসের নোটবুক (২০১৯), কুড়িয়ে বাড়িয়ে (২০১৯),নোলা (২০২০), সূর্যতামসী (২০২০), আঁধার আখ্যান (২০২০) ও নীবারসপ্তক (২০২১) এই সব দিনরাত্রি (২০২২), ধন্য কলকেতা সহর (২০২২), আবার আঁধার (২০২২), অগ্নিনিরয় (২০২২), হারানো দিনের গল্প (২০২৪), সিংহদমন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪), আরও একটি প্রবন্ধ সংকলন (২০২৫), আতঙ্ক সমগ্র (২০২৫), তিমিরহনন (২০২৬) সুধীজনের প্রশংসাধন্য। সরাসরি জার্মান থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন ঝাঁকড়া চুলো পিটার (২০২১)। বাংলাদেশের আফসার ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে ম্যাসন সিরিজের বাংলাদেশ সংস্করণ (২০২২, ২৩), মৃত্যুস্বপ্ন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪) । সম্পাদিত গ্রন্থ সিদ্ধার্থ ঘোষ প্রবন্ধ সংগ্রহ (২০১৭, ২০১৮) ফুড কাহিনি (২০১৯), কলকাতার রাত্রি রহস্য (২০২০) সত্যজিৎ রায়ের জন্ম শতবর্ষে একাই একশো (২০২২), কলিকাতার ইতিবৃত্ত(২০২৩), বিদেশিদের চোখে বাংলা (২০২৪) এবং কলিকাতার নুকোচুরি (২০২৫)
ওপার বাংলার এই সময়ের জনপ্রিয় লেখক কৌশিক মজুমদারের হরর ও থ্রিলার ঘরানার ৩০টা গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে 'মৃত্যুস্বপ্ন'। এই সঙ্কলনের কয়েকটা গল্প নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি ব্যক্ত করেছি নিজের পাঠ প্রতিক্রিয়া।
স্ন্যাপচ্যাট: অফিস থেকে বাড়িতে ফিরে লেটারবক্সে অদ্ভুত একটা চিঠি পেলো অর্ণব দাশগুপ্ত৷ চিঠিটা খুলতেই চমকে উঠলো ও৷ এমন এক ব্যক্তি চিঠিটা লিখেছে, যার সাথে কিছুদিন আগে পালিয়ে গেছে অর্ণবের স্ত্রী সুজাতা৷ লোকটা আবার পুলিশে ভীষণ ভয় পায়৷ কি লিখেছে সে অর্ণবকে? আর কেনই বা লিখেছে?
ছোট্ট এই গল্পটা আমার বেশ ভালো লেগেছে। মজা করার ঢঙে লেখা হলেও বেশ ডার্ক ছিলো গল্পের এক্সিকিউশন। শেষটা প্রেডিক্টেবল, তবে পড়ার মজা নষ্ট হয়নি।
রোগ: হরবাবু লোকটা বেশ কৃপণ টাইপের। টাকাপয়সা খরচ করতে বড় বাধে তাঁর। সদ্য আমদানি হওয়া মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মরতে বসলেন তিনি৷ যমে-মানুষে অনেক টানাটানি চলার পর হরবাবু বেঁচে গেলেন বটে, কিন্তু ঘ্রাণশক্তি হারালেন। কিন্তু অদ্ভুতুড়ে একটা ক্ষমতাও কিভাবে যেন পেয়ে গেলেন তিনি। আর সেই ক্ষমতাবলে হরবাবু মানুষের নানা অনুভূতির গন্ধ পেতে লাগলেন। এমন অদ্ভুত ক্ষমতা দিয়ে তিনি কি করবেন?
'রোগ'-এ প্রচুর হাসির উপাদান আছে। শুরুর দিকে হরবাবুর আচার-আচরণে বেশ মজা পেয়েছি আমি। তারপর ধীরে ধীরে গল্পটা কেমন যেন সিরিয়াস একটা রূপ নিতে লাগলো। পড়ে বেশ ভালোই লেগেছে গল্পটা।
পিপহোল: কালিম্পং-এর একটা স্কুলে চাকরি নিয়ে সেখানেই এক পাহাড়ের ওপরের এক ব্রিটিশ আমলের বাংলো বাড়িতে উঠলো মৌসুমী আর নিধি নামের দুই বান্ধবী। গভীর রাতে ওদের পাশের ঘর থেকে ভেসে আসে নানা ধাতব শব্দ। মনে হয়, সেই বন্ধ ঘরের ওপাশে কেউ আছে। ব্যাপারটা আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিলো মৌসুমী আর নিধিকে।
মোটামুটি ভালোই লেগেছে আমার কাছে 'পিপহোল' গল্পটা। ছোট এই হরর গল্পে একটা ক্লাসিক হররের ভাইব পেয়েছি। লেখক দাবী করেছেন গল্পটা সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা।
অপদেবতা: স্বামী অরিন্দমের চাকরিসূত্রে মেদিনীপুর এলো রুষা। যে বাড়িটাতে উঠলো সেটার আগের মালিক নাকি বাড়িতে কুনি আর বুনি নামে দুই অপদেবতাকে পুষতেন। ওদেরকে নাকি তাড়ালে অমঙ্গল হয়। ঘোর অমঙ্গল। তারপর কি হলো?
প্লটটা চমৎকার এই গল্পের৷ তবে বিল্ডআপ আর ফিনিশিংটা আরো ভালো হতে পারতো বলে মনে হয়েছে আমার কাছে৷ কিছুটা তাড়াহুড়া করে লেখা মনে হলো শেষ করার পর।
কাঁটা: রণিতাদের বিল্ডিংয়ের পাশের ফ্ল্যাটের স্নিগ্ধা-সোহম দম্পতির মধ্যে সবসময় কলহ লেগে থাকে। একদিন রণিতা খেয়াল করলো, ওরা ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কৌতুহলী হয়ে খোঁজ নিতে গেলো ও। তারপর রণিতা আর ওর স্বামী দেবরাজ এমন কিছু দেখলো যেটাতে বিস্মিত হতে হলো ওদেরকে।
নন-ক্রাইম ক্রাইম ফিকশন ধাঁচের গল্প 'কাঁটা'। বাংলা সাহিত্যে এমন গল্প খুব কম৷ এক্সপেরিমেন্টাল ভাবে গল্পটা লিখেছেন কৌশিক মজুমদার। মোটামুটি ভালোই লেগেছে আমার কাছে।
পেডিকিওর: পার্লারে কাজ করা এক তরুণের সাথে এক রাতে দেখা হয় রত্না নামের এমন এক মেয়ের, যার ওই সময়ে ওখানে থাকার কথাই না। রত্না তার প্রেমিক অমরেশের সাথে ছেলেটার পরিচয় করিয়ে দেয়। একটা নতুন কাজের অফারও দেয়৷ কাজটা কি লাভজনক হয়েছিলো ছেলেটার জন্য?
'পেডিকিওর' মোটামুটি ভালো লেগেছে আমার। আরবান হরর জনরার এই গল্পে লেখক পেডিকিওর সম্পর্কে দারুণ কিছু তথ্যও দিয়েছেন। সেগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে আমার।
শেষ মেষ: কেনাকাটা করে বাড়িতে ফিরে নিজের স্বামীকে মৃত অবস্থায় আবিস্কার করলো মেরি৷ ভেঙে পড়লো সে। জানালো পুলিশকে। পুলিশ এসে তদন্ত শুরু করলো। খোঁজ পড়লো মার্ডার ওয়েপনের। মার্ডার ওয়েপন পেলেই খুনি কে, তা বের করা সহজ হয়ে যাবে। পুলিশ কি শেষমেষ খুনির পরিচয় বের করতে পারলো?
বিশ্বখ্যাত লেখক রোয়াল ডাল-এর বিখ্যাত গল্প 'ল্যাম্ব টু দ্য স্লটার'-এর বাংলা অনুবাদ 'শেষ মেষ'। গল্পটা পড়ার সময় মনে হলো এটা আমি আগেও কোথাও পড়েছি। সম্ভবত সেবা'র রহস্যপত্রিকা বা অন্য কোথাও। ঠিক মনে করতে পারছি না। যাই হোক, ভালো লেগেছে 'শেষ মেষ'।
রৌরবকাল: ভবিষ্যতের পৃথিবী। হঠাৎ-ই এক অস্বাভাবিক সূর্যগ্রহণের পর ধ্বসে পড়েছে সমগ্র পৃথিবীর যোগাযোগ ও অর্থনীতি ব্যবস্থা। মানুষ হিংস্র হয়ে উঠেছে। চারিদিকে চলছে নাশকতা। ঠিক এমনই সময় পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত এক গ্রামের ছোট্ট স্টেশনে একটা ট্রেন এসে থামলো। ট্রেনে কি আছে?
পোস্ট অ্যাপোক্যালিপ্টিক ও ডিস্টোপিয়ান ধাঁচে লেখা এই গল্পটা আমার বেশ ভালো লেগেছে। শুরুর দিকে বেশ রহস্য আর ভয়ের আবহ টের পেয়েছি৷ বেশ শক্তিশালী কিছু মেসেজও এই গল্পের মাধ্যমে দিয়েছেন কৌশিক মজুমদার। যে মেসেজগুলো সত্যিই চিন্তায় ফেলে দেয়।
অভিশাপ: বহুকাল আগে পানিহাটিতে এক অপদেবতার উৎপাত শুরু হয়েছিলো। এক রাতে সেখানকার মানুষজন এক বীভৎস আর ভয়ঙ্কর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলো। আজ এতোগুলো বছর পরেও কেন সেই ঘটনাকে মনে করা? আর সেটা মনে করতে গিয়ে কেন ভয় আর আতঙ্কে নীল হয়ে যাচ্ছেন একজন অশীতিপর বৃদ্ধ?
কিছু হরর গল্প থাকে, যেগুলোর জন্মই হয় রাতে পড়ার জন্য। মাঝরাতে না পড়লে এই গল্পগুলোর প্রকৃত ভৌতিক রস আস্বাদন করা সম্ভব হয় না। 'অভিশাপ' তেমনই একটা পারফেক্ট হরর গল্প। খুবই ভালো লেগেছে আমার কাছে কৌশিক মজুমদারের এই গল্পটা।
শ্রুতিবিশোধন: সুধাময় বাগচীর অফিসে নতুন একজন ম্যানেজার জয়েন করেছেন। মিনতি মুখার্জি নামের এই মহিলা একদম শুরু থেকেই সুধাময় সহ অন্যান্য সব অফিস স্টাফের জীবন ঝালাপালা করে দিলেন। দিনকেদিন মহিলার অত্যাচার বেড়েই চলছিলো। শেষমেষ এমন অবস্থা হলো যে চাকরি টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে উঠলো।
এটাও একটা নন-ক্রাইম ক্রাইম ফিকশন। গল্পটা আমাকে আমার পূর্ববর্তী অফিসের শেষের দিনগুলোকে মনে করিয়ে দিয়েছে। শেষটা বেশ স্যাটিসফাইং ছিলো। বেশ মজাও পেয়েছি গল্পটা পড়ে। কৌশিক মজুমদারের নন-ক্রাইম ক্রাইম ফিকশন নিয়ে আরো লেখালেখি করা উচিত।
নির্জন স্বাক্ষর: বিখ্যাত নাট্য পরিচালক রঘুনাথ শর্মার খুনের কেসটা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা সুকল্যাণ মিত্রের জীবনে একটা কালো দাগের মতো। রঘুনাথ শর্মাকে একটা বদ্ধ লিফটের ভেতরে খুন করা হয়েছিলো। রিটায়ারমেন্টের অনেকদিন পর সুকল্যাণ মিত্র তরুণ প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর তুর্বসু রায়কে সেই আনসলভড কেসের গল্প শোনান।
'নির্জন স্বাক্ষর' একটা লকড রুম মিস্ট্রি গল্প। বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে গল্পটা। এটা কৌশিক মজুমদারের বিখ্যাত ম্যাসন ট্রিলোজির প্রথম বই 'সূর্যতামসী'-এর স্পিন-অফ। প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর তুর্বসু রায়ের প্রথম আবির্ভাব এই গল্পেই।
সাজাঘর: ডমিনিক এক সাজাঘরে বন্দি। বিকৃতমস্তিষ্ক এক অত্যাচারী লোক সেখানে বন্দি মানুষদের নানাভাবে নির্যাতন করে। অসহায় মানুষগুলোকে অত্যাচার করে পিশাচটা মজা পায়। ঘুরে-ফিরে আবারও ডমিনিকের সাজার পালা এলো। এবার?
ডিস্টোপিয়ার ধাঁচের এই গল্পটা মূলত একটা আমেরিকান গল্পের অনুবাদ। গল্পের প্রথম আর মাঝের অংশটুকু ভালো লেগেছে। তবে শেষটা আমার কিছুটা দুর্বোধ্য লাগার কারণে পুরোপুরি উপভোগ্য হয়ে ওঠেনি।
পোস্টকার্ড: ইন্টার্ন সাংবাদিক ধৃতি রায়চৌধুরী এমন একটা ফ্ল্যাটে এসে উঠলো, যেখানে একটা সময় থাকতেন বিখ্যাত চিত্রনাট্যকার সুপ্রিয় বসু। ভদ্রলোক বেশ কিছুদিন আগে মারা গেছেন। একটা পোস্টকার্ডের সূত্র ধরে ধৃতির মাথায় জেগে ওঠে সুপ্রিয় বসুর মৃত্যুরহস্য ভেদ করার তাগিদ। ধীরে ধীরে রহস্যটা যেন আরো ঘনীভূত হতে থাকে।
চমৎকার একটা রহস্য গল্প 'পোস্টকার্ড'। এই গল্প সঙ্কলনের অন্যান্য গল্পগুলোর চেয়ে এটা একটু বড়। কৌশিক মজুমদার বেশ ধীরেসুস্থে মূল রহস্যের তলায় পৌঁছেছেন। পুরো গল্পটাই বেশ উপভোগ্য লেগেছে আমার কাছে।
বনফায়ার: জয়ন্তী নদীর ধারে ঘুরতে গেছে অসমবয়সী কয়েকজন মানুষ। সন্ধ্যা নামার পর বনফায়ার জ্বালানো হয়েছে। সেটাকে ঘিরে চলছে গল্প। এ গল্প সে গল্পের পর শুরু হলো ভূতের গল্প। একেকজন নিজেদের সাথে ঘটে যাওয়া নানা ভৌতিক ও অলৌকিক অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে লাগলো। এদিকে রাত বাড়ছে।
'বনফায়ার'-কে গল্প না বলে কয়েকটা গল্পের সমাবেশ বলাটাই বোধহয় যথাযথ হবে। এই গল্পের চরিত্রগুলোর বলা অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতাগুলোই একেকটা গল্প। সেগুলো কম-বেশি ভালোই লেগেছে পড়তে। মাঝেমাঝে মনে হয়েছে, কোন পাহাড়ি এলাকায় শীতের সন্ধ্যায় বনফায়ার জ্বেলে বন্ধুদের নিয়ে এমন আড্ডা দিতে পারলে মন্দ হতো না।
কেউ কোত্থাও নেই: কোরেল আর জুঁই থাকে অশোকনগরের ফরেস্ট এলাকায়। মূল টাউন থেকে এলাকাটা একটু দূরেই। শীতের এক বিকেলে সিনেমা দেখতে টাউনে গেলো ওরা। ফিরতে ফিরতে অনেক রাত। এদিকে গতো কিছুদিন ধরে এক সিরিয়াল কিলারের উৎপাত শুরু হয়েছে। তারা কি নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবে?
রে ব্র্যাডবেরির 'দ্য হোল টাউন ইজ স্লিপিং' গল্পের ভাবানুবাদ 'কেউ কোত্থাও নেই'। এই গল্পে বেশ লক্ষ্যণীয় মাত্রা একটা টেনশন ক্রিয়েট করেছেন কৌশিক মজুমদার। সাসপেন্স সাসপেন্স করার পর শেষটাও ভালো লেগেছে।
পাকড়ো ছোড়ো: একজন মাছশিকারী। সে আসলে পাকড়ো ছোড়ো শিকারী। অর্থাৎ, বড়শিতে মাছ বাধলে সেটাকে আবার পানিতে ছেড়ে দেয় সে। মেয়েদের ব্যাপারেও লোকটা এমন। যাকে ভালো লাগে, গাড়িতে তুলে নেয়। তারপর ছেড়ে দেয়। কিন্তু আগে লোকটা এমন করতো না। যাকে গাড়িতে তুলতো, তাকে খুনও করতো। এখন তবে পাকড়ো ছোড়ো খেলা খেলে সে কি মজা পায়?
আমেরিকান লেখক লরেন্স ব্লকের লেখা 'ক্যাচ অ্যান্ড রিলিজ'-এর অনুবাদ এই গল্পটা। পুরো গল্পটা জুড়েই একটা কি হয় কি হয় টাইপ সাসপেন্স ছিলো। এমন ভিন্ন ধাঁচের গল্প আগে খুব একটা পড়েছি বলে মনে পড়ে না। প্লটটাও বেশ পিকিউলিয়ার। ভালো লেগেছে।
জন্মদিন: জিতুর অষ্টম জন্মদিনের পার্টি চলছে। সাধারণ অতিথিদের পাশাপাশি একটা অনাথাশ্রমের বেশ কিছু অনাথ বাচ্চাও এই পার্টিতে এসেছে। এদেরই একজন গোটা পার্টির সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলো। এই বাচ্চা ছেলেটা কোন এক বিচিত্র উপায়ে মানুষের মৃত্যুর দিন বলে দিতে পারে।
মারাঠি লেখক ও পরিচালক রত্নাকর মটকারের একটা গল্পের অনুবাদ 'জন্মদিন'। গল্পটা বেশ ভালো লেগেছে আমার। বিশেষ করে শেষে যে ধাক্কাটা লেখক দিয়েছেন, তা একদম অভাবনীয় ছিলো।
এগুলো বাদে বাকি যে গল্প আছে সেগুলোও পড়েছি। সিরিয়াল মেনটেন করে পড়িনি। বরং র্যান্ডমলি পড়েছি। কৌশিক মজুমদারের বৈচিত্র্যময় গল্পগুলো কম-বেশি ভালো লেগেছে। মৌলিকের পাশাপাশি অনুবাদের ক্ষেত্রেও তিনি বেশ ইন্টারেস্টিং কিছু গল্প বেছে নিয়েছেন। লেখকের লেখার ফ্যান আমি সেই ম্যাসন ট্রিলোজির প্রথম দুটো বই 'সূর্যতামসী' ও 'নীবারসপ্তক' পড়ার পর থেকেই। তাঁর সহজ-সরল গল্প বলার ধরণ বেশ হৃদয়গ্রাহী। ভবিষ্যতেও তাঁর লেখা পাঠের আগ্রহ থাকবে।
'মৃত্যুস্বপ্ন'-এর প্রচ্ছদটা ভালো লেগেছে। বইটার প্রোডাকশন নিয়েও আমি স্যাটিসফায়েড। আগ্রহীরা চাইলে পড়ে ফেলতে পারেন বইটা।
থ্রিলার, হরর,ক্রাইম স্টোরি, ডিটেকটিভ থ্রিলার সহ বেশকিছু জনরার গল্প রয়েছে এই সংকলনে।সিংহভাগ গল্পের মান-ই খুভ ভালো। বাকিগু চলনসই। একবার ট্রাই করতে পারেন। সময়ের অপচয় হবে না।
কৌশিক মজুমদার রচিত গল্পগ্রন্থ 'মৃত্যুস্বপ্ন' বইটিতে মোট গল্প আছে ৩০ টি।
১. নির্জন স্বাক্ষর (৭/১০) লকড রুম মিস্ট্রি, সাবলীল সমাধান বলেই হয়তো এমন সমাধান কেউ ভাবতে যাবে না। তাই অনবদ্য গল্প না হলেও লেখনীর জোড়ে কৌতূহল সৃষ্টি হয়।
২. নিরভিসন্ধি (৭.৫/১০) আরো একটা লকড রুম মিষ্ট্রি, তবে একটু ভিন্ন পরিবেশে। এবারে বদ্ধ ঘরে ভিক্টিমের সাথে আছেন সন্দেহভাজনেরও উপস্থিতি। আগের গল্পের মতো সাসপেন্স এখানে নেই; কেসটা সমাধানের উপায় কি সেটা অনেকটা সরাসরি বলে দেয়ার মতো বিষয়। তবে সমাধানটা কী, সে আবার বেশ চালাকির বিষয় ছিল।
৩. স্ন্যাপচ্যাট (৮/১০) একটা চিঠি। স্ত্রীর কাছে প্রতারিত হওয়া কারো কাছে পাঠানো হয়েছে সে চিঠি। চিঠি পাঠিয়েছে পরকীয়া প্রেমিক নিজেই। গল্পে আমরা সেই চিঠিই পড়বো। কুৎসিত সম্পর্কটাকে আরো কুৎসিত করে ফুটিয়ে তুলতে দেখবো চিঠির প্রেরককে।
৪. কাঁটা (৯/১০) লেখকের ভাষ্যমতে একটা নন-ক্রাইম স্টোরি। প্রথমটা মনে হয়েছিলো, বৈবাহিক কলহে জড়িয়ে থাকা স্বামী, তার স্ত্রীকে হত্যা করে পালাচ্ছে এমন একটা গল্পই লেখক সরাসরি পাঠককে হজম করে নিতে বলছেন। তবে শেষটা মুহূর্তে পাল্টে দেয়ায় ইমপ্রেসডই হয়েছি।
৫. পোস্টকার্ড (৯/১০) অবশেষে এমন একটা গল্প, যেমনটা শুরুতেই লেখকের কাছ থেকে আসা করে বসে ছিলাম। নিখুঁত, সরল, দারুন। একজন চিত্রনাট্যকার রহস্যজনকভাবে মার গেলেন; তারপরেও তার ঠিকানায় চিঠি আসলো। কীসের চিঠি, কে পাঠালো আর কেনো?
৬. রোগ (৮/১০) করণাকালীন সময়ের একটা গল্প; প্রথমটা স্বাভাবিক, তবে ধীরে ধীরেই গল্পটা অস্বাভাবিক মোড় নিতে শুরু করে। চীনা এ রোগের ভুল চিকিৎসার পর হরবাবুর ঘ্রাণ স্বাদের তুমুল পার্থক্য দেখা দেয়। হরবাবু স্বাভাবিক ঘ্রাণ পান না, তবে তিনি জীবন, মৃত্যু, আশা-ভরসার ঘ্রাণ বুঝতে পারেন; সুখ দুঃখের স্বাদ অনুভব করতে পারেন। বিষয়টা আরো সাসপেন্স তৈরি করে যখন তিনি এক অপ্রীতিকর ঘটনার সাক্ষী হয়ে উঠেন।
৭. টেলিপ্যাথি (৮/১০) জাদুকরের সম্মোহনের পর থেকেই কুহুর সাথে এক টেলিপ্যাথিক সম্পর্ক জন্মেছে মলয়ের। তারপর থেকেই একে অপরের মস্তিষ্কে জায়গা করে নিচ্ছে দু'জন। কিন্তু ঘটনা মোড় নিলো এক হত্যাকাণ্ডের পর। সত্যি বলতে, এমন প্লট যে কখনও মাথায় আসেনি তা নয়। সাসপেন্সটা হয়তো আরো জোরদার হতে পারতো; তবে সমাপ্তি কিভাবে হয় তার জন্য যেকোনো পাঠকই অপেক্ষা করতে চাইবে।
৮. পিপহোল (৬/১০) পাহাড়ি এলাকায় এক বাড়ির রহস্যময় ঘর; তার পাশের ঘরেই ভাড়া নিয়েছে মৌসুমী ও তার বান্ধবী। পাশের ঘর থেকে শব্ধ ভেসে আসে। অস্বাভাবিক শব্দ, অনিয়মিত। এর পেছনের গল্পটা জানা যায় বাড়ির আড়ত মালিকের কাছে। গল্পের লেখনি বরাবরের মতই ভালো লেগেছে, তবে প্লটটা লেগেছে গতানুগতিক।
৯. শল্পের নাভি (৮/১০) ক্লাসিক হরর ধাঁচের গল্প। গল্পটার প্রতি ভালো লাগা কাজ করবে সেটা শুরুতে মনে হয়নি, তবে ধীরে ধীরেই আগ্রহী হওয়া। লেখকের লেখার ধাঁচ গল্পটাকে ক্লাসিক কোনো লেখকের গল্পের মতোই অনুভূতি দিয়েছে।
১০. অভিশাপ (৭/১০) রিভেঞ্জ এবং অভিশাপের মিশ্রণ এ গল্পটা মন্দের উপর ভালো কিছু, চমক দিয়ে সমাপ্তি।
১১. মরণের পরে (৬/১০) ডোমঘরে লাশ কাটতে আসা দুই যুবকের দৃষ্টিকোণ এবং মদের বিষক্রিয়ায় মার যাওয়া এক ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ মিলিয়ে এ গল্প। রহস্য ও হররের ছাপ রেখে একটা ক্ষণস্থায়ী মোচড় দেয়া চলনসই গল্প।
১২. প্রেতিনী (৭/১০) হোস্টেল ফেরত এক ছেলে বাবা মায়ের সাথে গভীর রাতে ফিরছে। পথিমধ্যে সাহায্য চাইলো এক মহিলা। সেখানে বিপত্তির শুরু। সত্যি বলতে, বইয়ের আগের গল্পগুলো পড়ার পর এর সমাপ্তি আমার কাছে অকল্পনীয়ই লেগেছে।
১৩. বারো মিনিট (৮/১০) সাইন্স ফিকশন। প্রতিবেশী গ্রহ মঙ্গল এবং এ গ্রহের মানুষের মাঝে এক কোল্ড ওয়ার ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গল গ্রহের মানুষেরা সংকর জাতের সৃষ্টি করতে চাচ্ছে মানুষের মাঝে। কন্সেপ্ট খুব নতুন হয়তোবা না, তবে লেখনি এর মাঝে নতুনত্ব এনেছে। লেখকের ভাষ্যমতে যদিও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখার অভ্যাস নেই, তবে আমার অনুভূতি বলে, লেখক অভিনব কোনো সাইন্স ফিকশন লিখতে চাইলে মন্দ করবেন না।
১৪. রৌরবকাল (১০/১০) ডিস্টোপিয়ান ওয়ার্ল্ড এর গল্প। বর্তমানে যাবতীয় অর্থ লেনদেনের কাজ অনলাইন ভিত্তিক হয়ে যাচ্ছে। কী হবে যখন সম্পুর্ণ ইকোনমিই যখন একসময় অনলাইন হবে? কী হবে যদি সেই অনলাইন ভিত্তিক সময়েই বন্ধ হয়ে যায় সব সার্ভার? নিঃসন্দেহে বইয়ের ভালো গল্পগুলোর মাঝে অন্যতম বলা যায়।
১৫. বনফায়ার (৬/১০) বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিচ্ছে, সেই থেকেই একেকজনের ভৌতিক অভিজ্ঞতা শেয়ার করা। গল্পগুলো খুব একটা অপরিচিত না, তাই ভয় কিংবা রোমাঞ্চের অনুভূতি খুব একটা প্রকট হয়নি। কিশোর গল্প হিসেবে তকমা লাগানো যায়।
১৬. পেডিকিওর (৬.৫/১০) শুরুতে ভালোই সাসপেন্স কাজ করছিলো, কিন্তু শেষের দিকে লেখক কেমন তাড়াহুড়ো করলেন। হরর ধাঁচের টুইস্ট দিতে গিয়েই হয়তো এমন চেষ্টা; তবে সে চেষ্টা খুব একটা সফল হয়েছে বলা যাচ্ছে না।
১৭. অপদেবতা (৭/১০) এ গল্পটা ভয়ের পাশাপাশি গা গুলিয়ে আসা কিছু দৃশ্য উপস্থাপন করেছে। ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার বদলে বাড়ির সুরক্ষার জন্যই পেত্নী পোষার বিষয়টা ইউনিক লেগেছে। লেখক বিষয়টাকে গল্পে আরো বিস্তর রূপে আনতে পারতেন; জানিনা কেনো আনলেন না।
১৮. নজরদার (৭/১০) এক অদৃশ্য ব্যক্তিকে প্রতিনিয়তই দেখতে পায় স্কুল পড়ুয়া এক বালক। পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা উক্ত বালককে ধাবিত করেছে ভুল পথে। অদৃশ্য ব্যক্তিকে নিয়ে গড়িয়েছে কৌতূহল।
১৯. শ্রুতিবিশোধন (৭/১০) অফিসে নতুন নারী ম্যানেজার। সে স্ট্রিক্ট, ডিসিপ্লিনড, নির্দয়। সাথে আছে বসের কানে কথা লাগানোর অভ্যাস। বদলির অর্ডারের পর ধৈর্য্যের বাধ ভেঙে যায় সুধাময়ের। ম্যানেজারের প্রতি প্রতিশোধের ছক কষে সে।
২০. অন্তরের অমীমাংসিত মৃত্যু ও অন্যান্য ঘটনা (৭/১০) অল্পবিস্তর টুইস্টেড একটা গল্প। প্লটটা বলছি না, তবে গল্পে হত্যা ও পরিতাপের একটা দারুণ এঙ্গেল আছে।
২১. নিজবাড়ি (৮/১০) অচেনা স্টেশন। নাম নিজবাড়ি। গল্পকথক অজানা এ জায়গায় নেমে পড়লেন এডভেঞ্চারের খোঁজে। দ্রুতই সেই এডভেঞ্চার রূপ নিলো থ্রিলে।
২২. শেষ মেষ (৭/১০) ঠান্ডা মাথার খু*ন। গল্পটা অনেক পাঠকের কাছেই পরিচিত মনে হতে পারে। অনুবাদ হিসেবে অবশ্য মন্দ নয়।
২৩. সে এক অদ্ভুত পার্টি (৭/১০) দুই বন্ধু মিলে পার্টির উদ্দেশ্যে অপরিচিত এক বাড়িতে ঢুকে পড়া। উক্ত বাড়ির বাসিন্দারা কেউ এখানকার নয়, তাদের হাবভাবও ভিন্ন ধাঁচের। অতঃপর?
২৪. পাকড়ো ছোড়ো (৭/১০) এক সিরিয়াল কিলার, যার মাছ ধরার শখ। শুধু যে মাছ ধরে তা না বরং ধরা মাছ আবার ছেড়েও দেয়।
২৫. সাজাঘর (৭/১০) গল্পটা এক কয়েদিকে ঘিরে, যে তার সাজঘর তথা জেল থেকে পালানোর চেষ্টা করছে। তার সাথে গল্প উঠে এসেছে কয়েদির অত্যাচারের উপসর্গ। কে সেই কয়েদি এবং কী তার অপরাধ? মেটাফরিকাল গল্প, সাথে লেখক হরর তকমা লাগিয়েছেন।
২৬. সৎ মানুষের গল্প (৭/১০) কিছুদিন আগে ফিলোসফি লেকচারে একটা ল' সম্পর্কে পড়লাম। ইউনিভার্সাল ল'। অর্থাৎ, আমি কারো সাথে এমন ব্যবহার করবো, যেমনটা আমি নিজেও মানুষের থেকে প্রত্যাশা করতেছি। যেমন: আমি কারো বাড়িতে চুরি করলে, অন্য কেউও আমার বাড়িতে চুরি করবে, এ বিষয়টা মেনে নিতে হবে। এমনি চৌর্যবৃত্তির এক রাজ্যকে নিয়ে এ গল্প। অনুবাদ হিসেবে যথেষ্ট ভালো হয়েছে। শেষটায় মনে হয়েছে এটাও বুঝি মেটাফোরিকাল।
২৭. ভোজ কয় যাহারে (৮/১০) ফ্রি জিনিসের প্রতি মি. অ্যাওর্টার এক বিশেষ আকর্ষণ, যেনো বিনামূল্যে দিলে বিষও খাবেন। একদিন কবরস্থানের ময়লা বিনামূল্যে নেয়ার সুযোগ পেলেন তিনি।
২৮. নরকযাত্রা (৮/১০) অনেক আগে ছোটবেলায় 'এক থি ডায়ান' মুভিটা দেখা হয়েছিল। এই গল্পের মাধ্যমে তারই নস্টালজিয়া অনুভূত হলো।
২৯. জন্মদিন (৯/১০) এক কথায় দুর্দান্ত এক গল্প। পুত্রের জন্মদিনে উপস্থিত এক আধ্যাত্বিক বালক; জন্মদিন জেনে যে মৃত্যুর তারিক বলে দিতে পারে। গল্পের সাসপেন্স ও টুইস্ট যথার্থই লেগেছে।
৩০. কেউ কোথাও নেই (৯/১০) কোনো এক বনজ অঞ্চলে নতুন সিরিয়াল কিলারের উৎপাত; কিশোরী মেয়েদের ধরে ধরে হত্যা করছে সে। এমনই এক অন্ধকার রাতে দুই কিশোরীর সিনেমা দেখে ফেরার পথের ভয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে এই গল্প। লেখক চমৎকার সাসপেন্স যুক্ত একটা গল্প দিয়ে বইয়ের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। পড়ার সময় মনে হয়েছে যেনো ওই রাস্তায় আমিই আছি।
লেখকের ম্যাসন ট্রিলজি শেষ করার পর বেশ প্রত্যাশা ছিলো। হয়তো ম্যাসন সিরিজের বইগুলো এতোটাই উৎকৃষ্ট মানের হয়েছে যে, সেই প্রত্যাশা সম্পূর্ণ পূরণ হয়নি। তবে বইটির বেশি কিছু গল্পই ভালো এবং সম্পূর্ণ আলাদা ধাঁচের। বিশেষ করে অনুবাদিত গল্পগুলো আমার মনোযোগ কেড়েছে বেশি। লেখকের অনুবাদের দক্ষতার ভালোই প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কৌশিক মজুমদারের ম্যাসন ট্রিলজি পড়ার পর থেকেই তাঁর লেখার প্রতি একটা আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, আর সেই প্রত্যাশা নিয়েই হাতে তুলে নেওয়া এই ত্রিশ গল্পের সংকলন "মৃত্যুস্বপ্ন"। বলে রাখা ভালো, ম্যাসন সিরিজের মান এতটাই উঁচু ছিল যে সেই তুলনায় এই সংকলনের প্রত্যাশা পুরোপুরি মেটেনি, তবে তার মানে এই না যে বইটা দুর্বল। বরং এটি এক ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতা, যেখানে হরর, থ্রিলার, নন-ক্রাইম ক্রাইম ফিকশন আর বেশ কিছু চমৎকার অনুবাদ গল্প মিলেমিশে তৈরি করেছে এক বৈচিত্র্যময় সংকলন।
সংকলনের ৩০টা গল্প নিয়ে সংক্ষেপে বলি:
১. নির্জন স্বাক্ষর একটা লকড রুম মিস্ট্রি, যেখানে নাট্য পরিচালকের খুনের রহস্য সমাধানে নামেন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর তুর্বসু রায়। এটি লেখকের বিখ্যাত ম্যাসন ট্রিলজির প্রথম বইয়ের একটা স্পিন-অফ গল্প।
২. নিরভিসঙ্গ আরেকটা লকড রুম মিস্ট্রি, তবে এবার প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন, সন্দেহভাজনদের সংখ্যাও বেশি। সমাধানের পথটা কিছুটা সরাসরি হলেও পুরো গল্পে একটা কৌতূহল বজায় থাকে।
৩. স্ন্যাপচ্যাট এক রহস্যময় চিঠি এসে পৌঁছায় এক ব্যক্তির হাতে, যা লিখেছে এমন কেউ যার সাথে তার স্ত্রী পালিয়ে গিয়েছিল। চিঠির পেছনের সত্যিটা জানতে জানতে গল্পটা এক অন্ধকার বাঁক নেয়।
৪. কাঁটা পাশাপাশি ফ্ল্যাটের দুই দম্পতির মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে লেখা এক অস্বাভাবিক গল্প। একদিন একজন দম্পতি হঠাৎ উধাও হয়ে যান, আর তার পেছনের সত্যিটা বেশ চমকপ্রদ।
৫. পোস্টকার্ড মৃত এক চিত্রনাট্যকারের ফ্ল্যাটে থাকতে আসা এক তরুণ সাংবাদিকের হাতে আসে একটা রহস্যময় পোস্টকার্ড। সেই সূত্র ধরে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় প্রয়াত মানুষটির মৃত্যুর আসল কারণ।
৬. রোগ করোনাকালে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে যাওয়া এক কৃপণ মানুষ হঠাৎ পেয়ে যান অদ্ভুত এক ক্ষমতা, মানুষের মনের ভেতরের অনুভূতি বুঝে ফেলার। এই ক্ষমতা দিয়ে তিনি কী করবেন, তা নিয়েই গল্পের মোড় ঘোরে।
৭. টেলিপ্যাথি এক জাদুকরের সম্মোহনের পর দুই মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে এক অদ্ভুত টেলিপ্যাথিক সংযোগ। এই সংযোগ পরবর্তীতে জড়িয়ে পড়ে এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সাথে।
৮. পিপহোল এক স্কুলশিক্ষিকা তার বান্ধবীর সাথে ওঠেন পাহাড়ি এক পুরনো বাংলোয়, যেখানে পাশের ঘর থেকে ভেসে আসে অদ্ভুত সব শব্দ। ধীরে ধীরে তাদের মনে জন্ম নেয় গভীর এক আতঙ্ক।
৯. শব্দের নাভি একটা ক্লাসিক হরর ধাঁচের গল্প, যেখানে লেখক পুরনো ধারার ভৌতিক রসকে নতুন করে তুলে ধরেছেন। গল্পের গঠন কিছুটা চেনা মনে হলেও লেখনীর গুণে তা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
১০. অভিশাপ বহুকাল আগে ঘটে যাওয়া এক ভয়ংকর ঘটনার স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে এক বৃদ্ধকে। সেই পুরনো অভিশাপের রহস্য উন্মোচনেই গড়ে ওঠে এই নিখুঁত হরর গল্পটি।
১১. মরণের পরে এক মৃতদেহ কাটতে আসা দুই তরুণের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা এই গল্পে মিশে আছে রহস্য আর হররের ছোঁয়া। ক্ষণস্থায়ী হলেও গল্পের মোচড়টা বেশ কার্যকর।
১২. প্রেতিনী গভীর রাতে বাবা-মায়ের সাথে হোস্টেলে ফেরার পথে এক ছেলে সাহায্য চাওয়া এক রহস্যময়ী মহিলার সম্মুখীন হয়। এই সাক্ষাতের পরিণতি পাঠককে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে।
১৩. বারো মিনিট এক প্রতিবেশী গ্রহের প্রাণীদের সাথে মানুষের সংঘর্ষ নিয়ে লেখা এই সাইন্স ফিকশন গল্পে ধারণাটা বেশ নতুন। লেখকের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির চর্চা নিয়মিত না হলেও, প্রচেষ্টাটা প্রশংসনীয়।
১৪. রৌরবকাল হঠাৎ এক অস্বাভাবিক সূর্যগ্রহণের পর ভেঙে পড়ে সারা পৃথিবীর অর্থনীতি আর যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই ডিস্টোপিয়ান প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রামে থামা একটা ট্রেন ঘিরে তৈরি হয় গভীর রহস্য।
১৫. বনফায়ার বন্ধুদের এক আড্ডায় একে একে সবাই শেয়ার করে নিজেদের ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা। প্রতিটা গল্পই কিছুটা চেনা ছাঁচের হলেও একসাথে পড়তে বেশ ভালো লাগে।
১৬. পেডিকিওর পার্লারে কাজ করা এক তরুণের সাথে এক রাতে দেখা হয় রহস্যময়ী এক তরুণীর, যার সেখানে থাকার কথাই না। তার প্রেমিকের সাথে পরিচয় করানোর পর সামনে আসে এক লোভনীয় প্রস্তাব।
১৭. অপদেবতা নতুন চাকরির সূত্রে মেদিনীপুরে বসবাস শুরু করা এক দম্পতি জানতে পারেন তাদের বাড়ির আগের মালিক দুই অপদেবতাকে পুষতেন। তাদের রাগান্বিত করলে যে ভয়ংকর পরিণতি হতে পারে, তা নিয়েই গল্পের উত্তেজনা।
১৮. নজরদার এক স্কুলপড়ুয়া ছেলে প্রতিনিয়ত অনুভব করে তাকে কেউ একজন লক্ষ্য করছে, যদিও কাউকে দেখা যায় না। পারিবারিক ও সামাজিক চাপে ছেলেটি ধীরে ধীরে ভুল পথে চালিত হয়।
১৯. শ্রুতিবিশোধন এক অফিসে নতুন যোগ দেওয়া কড়া স্বভাবের এক নারী ম্যানেজার কর্মীদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলেন। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এক কর্মী পরিকল্পনা করেন এক নীরব প্রতিশোধের।
২০. অন্তরের অমীমাংসিত মৃত্যু ও অন্যান্য ঘটনা একটা ছোট কিন্তু বেশ মোচড়ানো গল্প, যেখানে হত্যা আর অনুশোচনার এক গভীর সংমিশ্রণ দেখা যায়। সংক্ষিপ্ত হলেও গল্পটা মনে দাগ কেটে যায়।
২১. নিজবাড়ি এক অচেনা স্টেশনে নেমে পড়েন গল্পকথক, নাম যার "নিজবাড়ি"। খুব দ্রুতই তার এই অ্যাডভেঞ্চার রূপ নেয় ভয়ংকর এক থ্রিলারে।
২২. শেষ মেষ একটা ঠান্ডা মাথার খুনের গল্প, যা বিদেশি সাহিত্যের এক জনপ্রিয় গল্পের বাংলা অনুবাদ। মূল গল্পের সাথে অপরিচিত থাকলেও অনুবাদ হিসেবে এটি বেশ উপভোগ্য।
২৩. সে এক অদ্ভুত পার্টি দুই বন্ধু মিলে এক পার্টির উদ্দেশ্যে ভুলবশত ঢুকে পড়ে অপরিচিত এক বাড়িতে। সেই বাড়ির বাসিন্দাদের অদ্ভুত আচরণ ঘিরেই তৈরি হয় গল্পের রহস্য।
২৪. পাকড়ে ছোড়ে এক সিরিয়াল কিলারের অদ্ভুত শখ, মাছ ধরে আবার তা ছেড়েও দেওয়া। এই একই প্রবণতা তার মানুষ শিকারের ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়, যা নিয়ে গল্পের মূল রহস্য গড়ে ওঠে।
২৫. সাজাঘর এক বন্দিকে ঘিরে লেখা এই গল্পে বিকৃতমস্তিষ্ক এক অত্যাচারী মানুষের নির্মমতার চিত্র ফুটে ওঠে। ঘুরেফিরে আসা প্রতিশোধের চক্রটাই এই মেটাফরিক্যাল গল্পের মূল আকর্ষণ।
২৬. সৎ মানুষের গল্প এক অদ্ভুত সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে লেখা এই গল্পে দেখা যায় মানুষ নিজে যেমন আচরণ করে, তেমনটাই প্রত্যাশা করে অন্যদের কাছ থেকেও। দার্শনিক এক ধারণার চমৎকার অনুবাদ এটি।
২৭. ভোজ কয় যাহারে বিনামূল্যের জিনিসের প্রতি আকর্ষণ থেকে এক ব্যক্তি একদিন গ্রহণ করে বসেন কবরস্থানের ফেলে দেওয়া কিছু জিনিস। এরপর যা ঘটে, তা পাঠকের জন্য এক অপ্রত্যাশিত চমক।
২৮. নরকযাত্রা ছোটবেলায় দেখা এক ভৌতিক সিনেমার নস্টালজিয়া জাগিয়ে তোলে এই গল্পটি। পুরনো সেই ভয়ের স্মৃতি নতুন করে ফিরে আসে গল্পের পরতে পরতে।
২৯. জন্মদিন এক ছেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া এক আধ্যাত্মিক বালক নাকি মৃত্যুর তারিখ বলে দিতে পারে। গল্পের শেষে থাকা চমকটা সত্যিই অভাবনীয়।
৩০. কেউ কোথাও নেই এক অরণ্য অঞ্চলে নতুন এক সিরিয়াল কিলারের উৎপাত শুরু হয়, যে কিশোরী মেয়েদের টার্গেট করে। এক অন্ধকার রাতে দুই কিশোরীর বাড়ি ফেরার পথের ভয়ের অভিজ্ঞতা নিয়েই গড়ে ওঠে এই টানটান সমাপনী গল্পটি।
সব মিলিয়ে ত্রিশটা গল্পের মধ্যে মান কিছুটা ওঠানামা করলেও, সামগ্রিকভাবে এটি একটা উপভোগ্য সংকলন, বিশেষ করে যারা হরর আর থ্রিলার জনরা পছন্দ করেন তাদের জন্য। প্রচ্ছদ, ছাপা আর প্রোডাকশন কোয়ালিটিও বেশ ভালো। ম্যাসন ট্রিলজির মতো মাস্টারপিস প্রত্যাশা না করে, বরং একটা বৈচিত্র্যময়, ভিন্ন স্বাদের পাঠ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখলে "মৃত্যুস্বপ্ন" নিরাশ করবে না।
কিছু মৃত্যু স্বপ্নের মতো লাগে, তেমন কিছু স্বপ্ন মৃত্যু।
গল্পসমগ্র আমার খুবই পছন্দের জনরা বা ধারা। প্রথমবার কৌশিক মজুমদারের কোনো গল্পসমগ্র পড়ার সুযোগ হলো। ধন্যবাদ কে বইটি প্রকাশের জন্যে। বইটি তে মোট ৩০টি গল্প রয়েছে। তার মাঝে কিছু গোয়েন্দা বা অনুসন্ধ্যান ধর্মী আবার কিছু অশরীরী বা অন্ধকার সময় নিয়ে যা ব্যাখ্যাতীত এবং কিছু অনুবাদ। কিছু গল্প সত্যি মনে রাখার মতন। আলাদা করে প্রতিটি গল্প সম্পর্কে বলা নিষ্প্রয়োজন। আমার মতে, অনেকদিন পর বলতে ইচ্ছে হলো কোনো গল্প পড়ে " শেষ হয়েও হইলো না শেষ!"
লেখকের অনুবাদ পড়ে মুগ্ধ। তার মৌলিক গল্পগুলো পড়ে যত না ভালো লেগেছে তার চাইতে অনুবাদ গল্পগুলোর নির্বাচন ও অনুবাদ ছিল অসাধারণ। বইটা পড়লে লেখকের লেখার অনন্যতা বোঝা যায়। প্রথম শ খানেক পাতা পড়ে দ্বিধা ছিল কিন্তু সমাপ্ত করে বেশ ভালো লাগলো।
বিভিন্ন ভারতীয় পত্র পত্রিকা ও সংকলনে পূর্ব প্রকাশিত পুরোনো গল্প গুলোকেই আবার নতুন মোড়কে প্রকাশ করা হয়েছে। যারা নিয়মিত বাংলা পত্র পত্রিকা পড়েন তাঁরা এই বই স্বচ্ছন্দে বাদ দিতে পারেন।
লেখকের কাছে প্রত্যাশার মাত্রা অনেক বেশি বলেই ৩ দেয়া হলো। আবার 'হরর' ঠিক আমার পছন্দের ধারা নয়, সেজন্যও একটু কম হতে পারে। তবে পাঠকের সময় ভাল কাটবে এটা বলাই যায়; পয়সা দিয়ে কিনলে ঠকবেন না।