সাপ্তাহিক ‘অমৃত’ সাহিত্য পত্রিকাটি প্রকাশিত হত কলকাতার বাগবাজার অঞ্চল থেকে। ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৮০ সাল অবধি পত্রিকাটির যাত্রাকাল বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা দেবী, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, শেখর বসু, তারাপদ রায়, ভগীরথ মিশ্র... আরও কত এমন বরেণ্য সাহিত্যিকদের লেখায় সমৃদ্ধ।
বর্তমান সংকলনটি সেই পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পগুলির মধ্যে কমল চৌধুরীর সম্পাদনায় ৩৫টি নির্বাচিত গল্প নিয়ে তৈরি। বাংলা ছোটোগল্পের ধারাটি যে কী পরিমাণে শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময়, তা গল্পগুলি পড়লে বোঝা যায়। প্রতিটি গল্পই গল্পনির্মাণের মুন্সিয়ানা ও কলমের স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল।
এ বই পড়তে গিয়ে আরেকটা কথা মনে হয়েছে, সময়ভেদে আমাদের জীবনযাত্রার ধারা, এবং স্রষ্টাভেদে ভাবনাচিন্তার গড়ন, গল্প বলার ভঙ্গিমা কত বিভিন্ন, তার খুব ইন্টারেস্টিং দলিল এই সংকলনটি। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দীপার প্রেম’ এর সরল স্পষ্ট চলন থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘তিস্তা টাইগার’এ মানুষের জটিল মনস্তত্বের উপর গাঢ় ও তির্যক আলোকপাত – যেন দুই আলাদা ভুবনের কথা। আবার একইসঙ্গে, প্রতি ক্ষেত্রেই গল্পের চরিত্রগুলি কিন্তু পাঠকের সঙ্গে কথা বলতে পারার মতো জীবন্ত ও চেনা হয়ে উঠেছে। প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর ‘বংশী ভুনাওয়ালা’, আর নবনীতা দেবসেনের “তেওয়ারীজি”, কাউকেই আমাদের অপরিচিত লাগে না। আবার আশাপূর্ণা দেবীর ‘পারত্রিক’ কিংবা অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভালোবাসার সুসময়’ চমকে দেয়, এমন আধুনিকের চেয়েও আধুনিক, বলিষ্ঠ লেখা আজকের দিনেও দুর্লভ।
প্রত্যেকটি লেখা অবশ্যপাঠ্য, তবে তার মধ্যে একটি লেখার কথা আলাদা করে না বলে পারছি না। হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘আশ্রয়’। যত বাস্তব, তত ধারালো এবং ততটাই সহজভাবে বলা এই গল্পটি এতটাই মনে দাগ কেটেছে, যে আমি এটির কথা কোনওদিনও ভুলতে পারব না।
পত্রভারতীর অন্য সব বইয়ের মতোই সুমুদ্রিত বইটি; রুচিসম্পন্ন সুদৃশ্য প্রচ্ছদও আমার খুব পছন্দ হয়েছে। ছোটোগল্পে আগ্রহী পাঠকদের অবশ্যই এই বইটি পড়ে দেখতে বলব।