Jump to ratings and reviews
Rate this book

মোগলনামা #২

মোগলনামা: দ্বিতীয় খণ্ড

Rate this book
মোগল শাসনের সময়কে পাঠকের সামনে স্পষ্ট করার উদ্দেশ্যে 'মোগলনামা'র প্রথম খণ্ডে বাবুর থেকে আওরঙ্গজেবের মৃত্যু পর্যন্ত মোগল শাসনামলের ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে মোগল ভারতের একটি চিত্র তুলে ধরার প্রয়াস করা হয়েছে। সাধারণভাবে মোগল আমল বলতে এই ছয় সম্রাটের শাসনকালই পরিচিত।

আওরঙ্গজেব পরবর্তী, অর্থাৎ ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দের পরের মোগল ইতিহাস কেবল মোগলদের ইতিহাস থাকেনি। এ সময়ের সঙ্গে মারাঠা, শিখ, বাংলা ও অযোধ্যার নওয়াবী, দাক্ষিণাত্যের নিযাম, ব্রিটিশদের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা এবং সর্বোপরি সিপাহী বিদ্রোহ জড়িত। তাই এই খণ্ডে উঠে এসেছে নাদির শাহ্‌র দিল্লী অভিযান, আবদালীর আক্রমণ এবং পানিপাতের তৃতীয় যুদ্ধ, এমনকি পলাশীর যুদ্ধ।

‘মোগলনামা'র দ্বিতীয় খণ্ডে, মোগল শাসনামলের দ্বিতীয়ার্ধ সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনার চেষ্টা করা হয়েছে। সময়ের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের বিশ্লেষণ এই বই।

320 pages, Hardcover

First published February 12, 2020

3 people are currently reading
148 people want to read

About the author

Mahmudur Rahman

13 books356 followers

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
14 (29%)
4 stars
28 (58%)
3 stars
6 (12%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 14 of 14 reviews
Profile Image for musarboijatra  .
291 reviews367 followers
September 16, 2024
ইতিহাসের পাঠ বাদ। নাটক-সিনেমায় আসি।

বাজিরাও মাস্তানি। 'পেশওয়া' বাজিরাও বল্লাল মারাঠা বাহিনী নিয়ে লড়াই করতেসেন। মারাঠা প্রধান কে? ছত্রপতি। তখন কিন্তু শিবাজী রাও ছত্রপতি না, তার নাতি সাহু তখন ছত্রপতি। মারাঠা বাহিনী কাদের সাথে টক্কর দিচ্ছে? মূলত মোগল বাহিনী। মারাঠাদের লক্ষ্য এখন দিল্লি, সেটা বাজিরাও তার পেশওয়া বা মুখ্যমন্ত্রী/সেনাপতি হবার পয়লাদিনই ঘোষণা দেয়। মাঝখানে হায়দরাবাদের 'নিজাম'-এর সাথে একবার কৌশলে জিতে গিয়ে নিজামকে মৈত্রী-তে বাধ্য করে পেশওয়া। এ-ও বুঝা গেল 'নিজাম' মোগল বাহিনীর অংশ না, অনেকাংশে আলাদা, এমনকি মোগল বাহিনী মারাঠাদের দ্বারা আক্রান্ত হলে মোগল পক্ষে না থাকার মতো আলাদা। এখানে বলে দেই, হায়দরাবাদ তথা দাক্ষিণাত্য কিন্তু আওরঙ্গজেবের আমলে মোগল এলাকা ছিল, যখন শিবাজী দাক্ষিণাত্যে লড়ছেন মোগলদের বিরুদ্ধে। আর পেশওয়া বাজিরাওয়ের সময়কাল হলো আওরঙ্গজেবের পর আরো ৬ সম্রাট পরের সময়কাল।

বেশ। এবার জানা ইতিহাসে আসি, বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব, সিরাজউদ্দৌলা। এই 'স্বাধীন নবাব', যাকে পরাজিত করে ইংরেজরা বাংলা দখল করে। এই জায়গায় দুটা প্রশ্ন করি। অতীতের দিকে : বাংলা কার কাছ থেকে স্বাধীন হয়েছিল? আমরা তো জানি ইংরেজরা আসার পরও মোগল শাসন চলছিল, যা নিশ্চিহ্ন হয় ১৮৫৭ সালে। তবে? বাংলা তাহলে মোগল-অধীন থেকে বেরোল কবে? দুসরা প্রশ্ন পরের কাহিনীর দিকে : ইংরেজ সিরাজকে হারায় ১৭৫৭ সালে। আর দিল্লিতে মোগল শাসনের অবসান ঘটায় ১৮৫৭ সালে। তাহলে কি বাংলা দখলের পরও ১০০ বছর লেগেছিল তাদের, ভারতবর্ষের অবশিষ্ট উল্লেখযোগ্য শাসকদের সরিয়ে দিতে? বাংলা দখল থেকে ভারত দখলের মাঝের যাত্রা আসলে কেমন ছিল তাদের?

শেষ। নাটক-সিনেমার কথা শেষ, এবার ইতিহাসে ফিরি। যে বই নিয়ে কথা, সেই 'মোগলনামা : ২য় খন্ড'-তে আসি তাহলে। "বাবার হইল একবার জ্বর, সারিল ঔষধে" বলে যে ৬ সার্থক মোগল সম্রাটের নাম মুখস্ত করেছি আমরা, তাঁদের পরও কিন্তু ১৪ জন মোগল শাসক আরো দেড়শ বছর শাসন করেছেন। আর এই ১৪ জনের সময়কাল নিয়েই মোগলনামার ২য় খন্ডের আবতারণা।

জানেন হয়তো, তাও বলি, শেষ ১৪ জনকে আমরা পয়লা ছয়ের মতো সূত্র ধরে মুখস্ত রাখি না তার একটা কারণ, এই চৌদ্দর ইতিহাস মোগল শাসনের ক্রমে ক্ষয়ের ইতিহাস। শেষদিকে এদের অনেকেই কেবল অন্য লোকের হাতের পুতুল-শাসক হয়েই ছিলেন। শেষদিকের মোগল শাসিত এলাকা ছিল দিল্লি মাত্র, অথবা সম্রাটের আবাস, লালকেল্লা।

এই দেড়শ বছরের ক্ষয়ের ইতিহাসের মজার ব্যাপার হলো, এই সময়টাতে স্পটলাইট মোগলদের চেয়ে অন্যদিকে সরার অনেক সুযোগ পেয়েছে। দাক্ষিণাত্য আর বাংলার মতো অযোধ্যা, পাঞ্জাবও স্বাধীনতা নিয়ে আলাদা হয়ে যেতে পেরেছে, তাতে মুরশিদকুলীর বাংলা আর নিজাম-উল-মুলক এর হায়দরাবাদের আলাদা গল্প বেরিয়েছে। ভারত দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে মারাঠাদের গল্প তৈরী হতে পেরেছে, আওরঙ্গজেব যাদের কোমর ভেঙে রেখে গেছিলেন মরার আগে। বাইরে থেকেও একে একে পারস্যের নাদির শাহ এসে দিল্লিকে দলে গেছেন। আবদালী ভারতের মাটিতে এসে 'রক্তাক্ত প্রান্তরে' লড়েছেন মারাঠাদের সাথে, যে লড়াইয়ে মোগল শাসকের উপস্থিতি ছিল একেবারে নগণ্য। আর শেষদিকে তো ইংরেজ, ডাচ, ফরাসীরা আছেই। সোজা কথায়, আমাদের অনেকাংশে চেনাজানা ইংরেজ-পূর্ববর্তী ভারতবর্ষ গড়েপিটে উঠেছে এই দেড়শ বছরেই। আর তাই, কেবল মোগলদের কেন্দ্র না করে, সর্বোপরি প্রেক্ষপট নিয়ে যদি এই সময়ের ইতিহাস পড়া হয়, তাহলে তা নিদারূন আনন্দ দিবে, অনেক 'রিলেটেবল'-ও হবে সাধারণ পাঠকের জন্য।

আশা করি মোগলনামা-২ পড়ার আগে আমার নিজের যে প্রশ্নটা ছিল, যে, "যেসব মোগল বাদশাহদের নামই মনে রাখা লাগে না তাঁদের নিয়ে পড়ার কি আছে?" - এহেন জিজ্ঞাসার জবাব দিতে পেরেছি এই অব্দি। মাহমুদুর রহমানের 'মোগলনামা'র সার্থকতা এখানেই, গল্পচ্ছলে তিনি 'মোগল আমল'-কে তুলে এনেছেন, 'মোগল শাসন' বা রাজবংশকে নয়। যারা অতো ইতিহাস পড়েন না, সহজে জানতে চান, দুই খন্ডের মোগলনামা বইটা তাদের উপযোগী।

লেখকের উপস্থাপনার গুণে একটা গল্পের বই পড়া হবে আপনার, পাঠদানের কচকচানি একদমই নাই সেখানে। ব্যক্তিগতভাবে আমার অবশ্য প্রথম খন্ডের চেয়ে দ্বিতীয় খন্ডে তথ্যের ভার বেশিই মনে হয়েছে। হতে বাধ্য। কারণ একে তো তিন-চার ভাই লড়াই করে একজন শাসক হয়েছেন এমন ঘটেছে অনেকবার, তাছাড়াও কে কাকে ঘাড়ে ধরে সম্রাট বানিয়ে গেছেন, এসবের উল্লেখেরও দরকার পড়েছিল। তাতে করে চরিত্র যত বেড়েছে, তথ্যও দিতে হয়েছে তত। ভুল ছাপা লক্ষণীয়। এসব সত্ত্বেও, দুয়েক অধ্যায় কষ্ট করার পর দ্বিতীয় খন্ডও উপভোগ করতে শুরু করেছিলাম। আর বলেছিই তো, একটা সময়ের ঘটনাগুলো সব নাটকে বা সিনেমায় দেখা/পড়া কাহিনী। তাতে করে পড়তে ভালো লেগেছে বেশি।

রেকমেন্ডেড? পাঁচ তারা।

মোগলনামা ২য় খন্ড
লেখক : মাহমুদুর রহমান
জনরা : ইতিহাস
প্রকাশক : আহমদ পাবলিশিং হাউজ
প্রকাশকাল : বইমেলা ২০২০
পৃষ্ঠাসংখ্যা : ২৪৮
মুদ্রিত মূল্য : ৪৫০ টাকা
Profile Image for Amit Das.
179 reviews118 followers
November 14, 2020
বাবুর, হুমায়ূন, আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহ্জাহান, আওরঙ্গজেব; মোগল আমল হিসেবে সাধারণত এই ছয় সম্রাটের শাসনকালই পরিচিত।
আওরঙ্গজেব-পরবর্তী সময়ে মোগল ইতিহাস শুধুমাত্র মোগলদের ইতিহাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই সময়ের সাথে মারাঠা, শিখ, বাংলা ও অযোধ্যার নওয়াবী, দাক্ষিণাত্যের নিযাম, ব্রিটিশদের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা এবং সর্বোপরি সিপাহী বিদ্রোহ জড়িত। মোগলনামার দ্বিতীয় খন্ডে মোগল শাসনামলের এই দ্বিতীয়ার্ধের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন মাহমুদুর রহমান।

প্রথম খন্ডের পর দ্বিতীয় খন্ড পড়েও মুগ্ধ হলাম। আসলে এত সহজ ও সাবলীলভাবে সবকিছু আলোচনা করা হয়েছে যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একবারও বিরক্তি লাগার সুযোগ তৈরি হয়নি।

মোগল সাম্রাজ্য নিয়ে আগ্রহ ছিলো অনেকদিন ধরেই, মোগলনামার এই দুই খন্ড পড়ে সেটা অনেকাংশেই মিটেছে। এজন্য লেখক মহাশয়ের একখানা বড়সড় ধন্যবাদ প্রাপ্য।
Profile Image for Aishu Rehman.
1,116 reviews1,096 followers
October 22, 2023
প্রথম খন্ডের চেয়ে এই খন্ডের উপর আগ্রহ একটু বেশিই ছিল। কেননা এই সময়ের ইতিহাসটা আমাদের সামনে একটু কমই এসেছে। সামগ্রিকভাবে সম্পূর্ণ ইতিহাস লেখক মশাই যেভাবে ঢেলে সাজিয়েছেন তা অত্যন্ত প্রসংসনীয়। আহমদ শাহ আবদালী আর ইব্রাহীম কার্দীর পানিপথের (এটাযে সত্যিকার অর্থে পানিপাত তা প্রথম জেনেছি) যুদ্ধ নিয়ে মুনীর চৌধুরীর 'রক্তাক্ত প্রান্তর' পড়া ছিল। কিন্তু সেটার যে এতো সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য ছিল তা তখন এতোটা উপলব্ধি করতে পারি নি। যুদ্ধের বর্ণনাটাও ছিল জোশ। নাদির শাহর আক্রমণ নিয়েও একটা ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করছিলাম। সেটারো বিস্তারিত একটা সমাধান পেয়েছি। সবকিছু মিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য এবং মনোরম ছিল এই বই পড়া যাত্রাটা।
Profile Image for Sanowar Hossain.
282 reviews25 followers
November 7, 2022
যে বাবর ঘোড়ায় চড়ে দিল্লির সিংহাসনে বসেছিলেন, তাঁর বংশেরই সর্বশেষ সম্রাট কিনা গরুর গাড়িতে চড়ে ক্ষমতা ত্যাগ করতে বাধ্য হন! ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস।

মোগল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ ছিল প্রথম ছয়জন শাসকের শাসনামল। তাঁদের পর আরো ১৪ জন মোগল শাসক একশো বছরের বেশি সময় শাসন করেছ��ন। তবে তাঁদের শাসনামলে রাজ্য বিস্তারের পরিবর্তে সংকুচিত হতে শুরু করে। পরবর্তী এই ১৪ জন শাসকের শাসনামলের বিবরণ স্থান পেয়েছে দ্বিতীয় খন্ডে। এই খন্ডতে মোগল সাম্রাজ্যের পাশাপাশি আশেপাশের বিভিন্ন রাজশক্তির উত্থান ও সংঘাত গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে মারাঠা সাম্রাজ্যের উত্থান মোগল সাম্রাজ্যকে বেকায়দায় ফেলে দেয়।

প্রথম খন্ডতে যেখানে মোগল সাম্রাজ্যের উত্থান ও স্বর্ণযুগের আলোচনা ছিল, সেখানে দ্বিতীয় খন্ডে শুধু হাহাকার এবং স্বর্ণযুগের পতন। পাশাপাশি ভারতবর্ষের অন্যান্য শক্তির উত্থানকেও এনেছেন লেখক। আওরঙ্গজেবের সময় হতেই মোগল সাম্রাজ্যের পতনের সূত্রপাত হলেও কফিনের শেষ পেরেকটা মারা হয় সিপাহী বিদ্রোহের পর শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে মায়ানমারে নির্বাসনের মাধ্যমে।

মোগলনামা দুই খন্ডে লেখক মোগল সাম্রাজ্যের একটি স্পষ্ট ইতিহাস দাঁড় করাতে চেষ্টা করেছেন। বই দুইটি পড়ার পর মোগল সাম্রাজ্য নিয়ে পাঠকের অনেকটা কৌতূহল মিটবে। এমনকি আরো বিস্তারিত ইতিহাস জানার আগ্রহ সৃষ্টি হবে। প্রথম খন্ডের তুলনায় দ্বিতীয় খন্ডটিতে ভুল ভ্রান্তি কম ছিল। লেখার মানও কিছুটা ভিন্নতর মনে হলো। লেখকের জন্য শুভকামনা। হ্যাপি রিডিং।
Profile Image for Abu Syed sajib.
147 reviews15 followers
February 29, 2020
পাঁচে পাঁচই দেওয়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু সাদামাটা প্রচ্ছদ আর প্রচুর বানান ভুলের কারণে দিতে পারলাম না...
Profile Image for Nusrat Faizah.
101 reviews38 followers
September 5, 2021
মোগল ইতিহাসের এনথুসিয়াস্ট হিসেবে আওরঙ্গজেব পরবর্তী সময়ে মোগল সাম্রাজ্যের দুরবস্থা পড়ে বেশ মন খারাপ ই হয়।বইয়ের শেষ দিকে এসে সেই সময়ে আমাদের বাংলার পরিস্থিতি কেমন ছিল তার খানিকটা হলেও বর্ণনা পেয়ে আমি তো বেজায় খুশি।লেখককে এই প্রচেষ্টার জন্য ধন্যবাদ।
This entire review has been hidden because of spoilers.
Profile Image for Shotabdi.
826 reviews206 followers
July 26, 2021
প্রথমটার চাইতে দ্বিতীয় খণ্ড তথ্যের দিক দিয়ে বেশি চমকপ্রদ। কারণ, এই বাদশাহদের সম্পর্কে এবং সম্পর্কিত ইতিহাস একটু কম আলোচিত, কম পঠিত।
গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সহজ ভাষায় মোগল ইতিহাস সম্পর্কে আদ্যোপান্ত জানতে হলে প্রথম এবং দ্বিতীয় খণ্ড দুটো মিলিয়ে মোটামুটি কমপ্লিট প্যাকেজ।
Profile Image for Md Shariful Islam.
258 reviews86 followers
June 22, 2021
আমাদের বেশিরভাগেরই মোগল যুগের ইতিহাস জ্ঞান আওরঙ্গজেবে পৌঁছেই শেষ হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। যদিও আওরঙ্গজেবের পর মোগল সম্রাটরা নখদন্তহীন বাঘে পরিণত হন, তবু ১৭০৭ এর পর আরও ১৪ জন মোগল প্রায় ১৫০ বছর মসনদে ছিলেন! হ্যাঁ, তাঁদের প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে আলোচনা হতে পারে কিন্তু মসনদে যে তাঁরাই ছিলেন তা অস্বীকার করার উপায় নেই। পূর্ববর্তী ৬ শাসক যেখানে বাংলা থেকে কাবুল পর্যন্ত শাসন করেছেন সেখানে পরবর্তী শাসকগণের কারও আওতায় ছিল শুধু দিল্লী, আবার কারও শুধু বাসস্থান লাল কেল্লা । এইসব কম আলোচিত মোগল শাসকদের নিয়েই মাহমুদুর রহমান লিখেছেন তাঁর মোগল ইতিহাস নিয়ে দ্বিতীয় বইটা।

বইটা শুরু হয়েছে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর ঠিক পর থেকে যখন বাবার সিংহাসন দখলের জন্য তিন ভাইয়ের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় আর শেষ হয়েছে শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের রেঙ্গুনে নির্বাসনের মধ্য দিয়ে। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল শাসন আর আক্ষরিক অর্থে মোগল শাসন থাকেনি কেননা ততদিনে ভারতবর্ষে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে শিখ, জাঠ, মারাঠারা ; প্রায় স্বাধীন নবাবী গড়ে উঠেছে বাংলা, অযোধ্যা আর দক্ষিণাত্যে ; বাইরে থেকে এসে জাঁকিয়ে বসেছে ইংরেজ আর ফরাসিরা ; ঘন ঘন আক্রমণ শুরু হয়েছে আফগানিস্তান থেকে। ফলে মোগল ইতিহাসের সরল রাস্তায় সৃষ্টি হয়েছে অনেকগুলো পার্শ্বরাস্তা, অনেক কানাগলি। এই বইয়ে লেখক আমাদের সেই মূল সরল রাস্তার পাশাপাশি বাকিসব পার্শ্ববর্তী রাস্তা আর কানাগলির গল্পও বলেছেন।

তো বইটা আমাকে কি দিল? সহজ কথায় বললে আওরঙ্গজেব পরবর্তী মোগল সম্রাটদের সাথে বইটা আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। এতদিন পরবর্তী মোগলদের সাথে সম্পর্কিত কেবল দুইটা বিষয়ই জানা ছিল ( পানিপাতের তৃতীয় যুদ্ধ এবং সিপাহী বিপ্লব), কিন্তু বইটা আমাকে এর বাইরে আরও অনেককিছু জানতে সাহায্য করেছে। আবার পানিপাতের যুদ্ধ বা সিপাহী বিপ্লব সম্পর্কে যা জানতাম না তা তেমন জানিয়েছে তেমনি জানা বিষয়গুলো নতুন আঙ্গিকে দেখতে শিখিয়েছে মোগলনামা। পানিপাতের যুদ্ধে আবদালীর পরিবর্তে মারাঠারা জিতলে যে পুরো উপমহাদেশের চিত্র ভিন্ন হয়ে যেত বা সিপাহী বিপ্লব যে আদৌ ঐ অর্থে ‘ স্বাধীনতা সংগ্রাম' ছিল না বা মোগলদের পতনের কারণ যে শুধু তাঁদের অযোগ্যতা আর সুরা, নারী নিয়ে মেতে থাকাই না বরং আরও গভীর কারণ বিদ্যমান বা সিরাজের পরই যে একদিনেই ভারতবর্ষ ব্রিটিশদের হাতে আসে নি – এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে জানিয়েছে বইটা। আর মোগলদের অন্তর্দ্বন্দ্ব, আমলাতন্ত্রের জেঁকে বসা এসব তো ছিলই।

ইতিহাসে কম আলোচিত বা অনালোচিত কিছু ব্যক্তির সাথেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছে বইটা। জাহাঙ্গীর – নুর জাহান বা শাহজাহান – মমতাজের কথা তো আমরা জানি কিন্তু জাহানদার – লাল কুয়ারের কথা কি জানি? বইটা আমাকে জানিয়ে এই অনালোচিত মোগল প্রেমোপাখ্যানের কথা। এছাড়া সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়, চেন কালিজ বা নিযাম, রণজিৎ সিং, বেগম সমরু, মণিকর্ণিকা প্রভৃতি চরিত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে বইটা।

বইয়ের ভাষার ব্যাপারে যদি আসি তো বলা যায় লেখক প্রথম পর্বের মতো সহজ ভাষাই ব্যবহার করেছেন। কখনও গল্পচ্ছলে, কখনও বৈঠকী আমেজে তিনি মোগলদের কাহিনী শুনিয়েছেন। কিন্তু যে ব্যাপারটা নজরে পড়েছে তা হলো লেখক প্রথম পর্বে মোগল শাসকদের সর্বনামে সম্মানসূচক চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার না করলেও এই পর্বে করেছেন। প্রথম পর্ব পড়ার সময় চন্দ্রবিন্দুর অনুপস্থিতি নিয়ে আমি ভেবেছিলাম কিন্তু সেই চন্দ্রবিন্দু যে এখানে পাব তা ভাবিনি। আরেকটা ব্যাপার হলো লেখক বেশ কয়েক জায়গায় সর্বনামে সে আর তিনি গুলিয়ে ফেলেছেন। একই ব্যক্তির সর্বনাম হিসেবে এক জায়গায় সে আর আরেক জায়গায় তিনি ব্যবহার করেছেন। এমনকি একই বাক্যে সে আর তিনির মিশ্রণও দেখা গিয়েছে।

ভূমিকাতে লেখক জানিয়েছেন যে পাঠকের চাপে বইটা তিনি দ্রুত শেষ করতে বাধ্য হয়েছেন। সেই কারণেই কি না জানি না, প্রোডাকশনে তাড়াহুড়ো আর অমনোযোগ নজরে এসেছে। প্রচ্ছদটা প্রথম পর্বের তুলনায় সাদামাটাই বলতে হবে। আর বানানের কথা কি আর বলব, প্রায় প্রতি পৃষ্ঠায় এক বা একাধিক ভুল বানান দেখা গিয়েছে, এমনি কোথাও কোথাও বাক্যের গঠনও এলোমেলো। প্রুফ রিডিংয়ে আরেকটু মনোযোগী হলে এই সমস্যা এড়ানো যেত।

যাহোক, মোটের উপর লেখকের বইদুটো নিয়ে আমি সন্তুষ্ট। লেখক যে মোগলদের নিয়ে আরও লিখতে ইচ্ছুক তা বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ পেয়েছে। তো আমি রইলাম সেই বইয়ের অপেক্ষায়, আর ততক্ষণে আপনারা যারা এখনও বইদুটো পড়েননি তারা শুরু করতে পারেন সেই মোগলদের ইতিহাস যাঁদের বংশের বিশজন সম্রাট ভারতবর্ষ শাসন করেছে তিনশত বত্রিশ বছর, যাঁরা ঘোড়া নিয়ে বীরের মতো এলেও ভারতবর্ষ ছেড়েছে গরুর গাড়িতে মুখ লুকিয়ে।
Profile Image for Himel Rana.
9 reviews
February 22, 2021
Exceeded expectation that was built after reading the first part. History not necessary have to be neutral always. It is often said to be a version written by the winners. But the writer here, tried his best to serve and discuss information from all the involving sides.

Similar with the first part - the only missing thing to me is more details. Of course it is a detailed book. But it triggered craving for more -- which is actually good.

I will recommend this one and wait for next books from the writer.
Profile Image for Moniruzzaman Monir.
55 reviews1 follower
January 20, 2023
বইয়ের নাম: মোগলনামা
লেখক: মাহমুদুর রহমান Mahmudur Rahman
প্রকাশনী: আহমদ পাবলিশিং হাউস

প্রতাপশালী দুর্দান্ত মোগল সম্রাট আকবর নিরক্ষর ছিলেন। পড়ালেখায় বেশ অসুবিধা হতো তার। অক্ষর চিনতে পারতেন না তিনি। ধারনা করা হয় তার ডিজলেক্সিয়া রোগ ছিল। আমির খান অভিনিত বলিউড মুভি “তারে জামিন পার” এর সেই ছোট্ট ছেলেটার মত। তার পরও এই সম্রাট তার বিচক্ষনতার চিহ্ন একে গেছেন ভারতবর্ষের ইতিহাসে। ভারতবর্ষে সতিদাহ প্রথা প্রথম রহিত করেছিলেন আকবর ১৫৮৫ সালে। সূচনা করেছিলেন বাংলা সনের। গোড়াপত্তন করেছিলেন এক নতুন ধর্ম দ্বীন-ই-ইলাহি। তার ছেলে শাহাজাদা সেলিম প্রেমে পরেছিল তারই রক্ষিতার যাকে সবাই আনারকলি নামে চেনে। যাকে দেয়ালে জীবন্ত গেথে ফেলার কাহিনি প্রচলিত আছে। শাহাজাদা সেলিম সিংহাসনে বসার পর তার নাম হয় জাহাঙ্গীর। নূরজাহান ছিলেন তার অন্যতম এবং প্রভাবশালী স্ত্রি। জাহাঙ্গীর রাজকর্ম চালনায় পারদর্শি ছিলেন না। তাই তার পেছনে কলকাঠি নাড়তো মূলত তার এই স্ত্রি। বাদশাহ জাহাঙ্গীরের মেজ ছেলে খুররমের সাথে নূরজাহানের ভাইয়ের মেয়ে আরজুমান্দ বেগমের বিয়ে হয়। আমরা তাদের শাহজাহান ও মমতাজ নামে চিনি। শাহজাহান কে আমরা ভালবাসার নিদর্শন তাজমহলের কারনে চিনলেও আসলে তিনি ছিলেন বেশ নিষ্ঠুর। সিংহাসনের অধিকার সমুন্নত রাখতে নিজের ভাই সহ আরো অনেককে হত্যা করেছেন তিনি। একই কাজ করেছে তার ছেলে আওরাঙ্গজেব। নিষ্ঠুরতায় সে তার বাবাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

ভারত বর্ষের উপর প্রভাব বিস্তারকারি শাসকগোষ্ঠির মধ্যে মোগলরা অন্যতম। ৩০০ বছরেরও বেশি ছিল তাদের শাসনামল। ফারগানা রাজ্য থেকে আগত বাবুরের দ্বারা ইব্রাহীম লোদিকে পরাজীত করে দিল্লি দখল মধ্য দিয়ে মোগল শাসন শুরু। কালক্রমে এই শাসনআমলে পটভুমিকায় আসেন হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গীর, আওরাঙ্গজেব সহ আরো অনেক জগদ্বিখ্যাত বাদশাহ। স্কুলে থাকতে সামাজিক বিজ্ঞান বা ইতিহাসের বই গুলো এবং মোগল শাষকদের নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমরা অনেকেই এদের সম্পর্কে জানি। কিন্তু কতটুকু জানি? মুখে মুখে ছড়ানো কিংবদন্তিগুলোই বা কতটুকু সঠিক?

লেখক তার এই দুই বইতে মোগল শাসনের জানা অজানা সেই সমস্ত ঘটনা ও তথ্যের সমন্বয় ঘটিয়েছেন যা হয়ত আমাদের বেশিরভাগ মানুষেরই অজানা। অনেকদিন থেকে ইচ্ছা ছিল এই দুই মাস্টারপিস বইয়ের একসাথে রিভিউ দেবার। স্কুল কলেজ ও অন্যান্য ইতিহাস বইগুলোতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন শাষকগোষ্ঠির সম্পর্কে যে টুকরো টুকরো তথ্য গুলো বিভিন্ন সময়ে জেনে এসেছি তার বেশিরভাগই সমন্বয় করতে পারিনি কখনও। কে কার ছেলে, কার পরে কে শাসনে এলো, কার অবদান ইতিহাসে কতটুকু এই নিয়ে ধোয়াশা থেকেই গেছে। তার উপর সচারচর যে ভাষায় বা ইতিহাসের যে কাঠখোট্টা ব্যাপারগুলো বেশি গুরুত্বসহকারে টেক্সটবুকগুলো তে পাওয়া যায় তা পড়ার আগ্রহ থাকেনা বেশিক্ষন।

সবসময় খোজ করতাম সহজ ভাষায় গল্পের মত পুরো ভারতবর্ষের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যাবে এমন বইয়ের। অবশেষে মাহমুদুর রহমানের এই বইদুটো আমার সেই আকাঙ্খা পূরন করেছে। প্রথম খন্ডে মোগল সাম্রজ্যের উথান, আর দ্বিতীয় বইতে আছে সেই সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস। প্রত্যেক সম্রাটের শাসনকাল ও বিশেষ বিশেষ ঘটনা ও ব্যাক্তি নিয়ে আলাদা আলাদা অধ্যায়ে খুব সুন্দর করে গল্পের মত সহজ ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। লেখকের লিখনশৈলি ও ঘটনার চমৎকার বর্ননার সাথে অধ্যায় শেষে রেফারেন্স নোট ও পাদটিকা বিষয়বস্তুকে করেছে আরো বোধগম্য।

মোগল ইতিহাস নিয়ে জানার ইচ্ছা আছে এমন সবাইকে এই বইদুটো খুব জোর দিয়ে রেকমেন্ড করবো। বাংলা সাহিত্যে এমন গবেষনা মূলক প্রাঞ্জল ভাষার বইয়ের বেশ অভাব। আশা রাখি লেখক শুধু মোগল আমল নয়. ভারতবর্ষের পূর্ণ ইতিহাস নিয়ে পর্যায়ক্রমে একটা সিরিজ লেখবেন। আমার ব্যাক্তিগত রেটিং ৫/৫।
29 reviews6 followers
March 16, 2022
মোগল বংশের ভারতবর্ষে উত্থানের শুরু থেকে পতন পর্যন্ত তিনশ বত্রিশ বছরের পুরো মোগল শাসনামলের ইতিহাস পড়ে ইতি টানলাম। বিষাদে চেয়ে গেছে মন। যে মোগল বলতেই আমাদের চোখের সামনে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি, জৌলুস চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তার আবার এমন করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে তাদের অবসান দেখতে গিয়ে সত্যিই বিষাদে চেয়ে গেছে মন।

মোগল ইতিহাস নিয়ে মাহমুদুর রহমানের মোগলনামা প্রথম খন্ড এবং মোগলনামা দ্বিতীয় খন্ড একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র। ১৯শে প্রকাশিত আমার পড়া বইগুলোর মাঝে সবচেয়ে বেশি সুখপাঠ্য বই ছিল মাহমুদুর রহমানের "মোগলনামা প্রথম খন্ড।" প্রথম খন্ডে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবুর থেকে সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামল পর্যন্ত, ছয়জন সম্রাটের শাসনামল উপস্থাপন করা হয়েছে। এবং দ্বিতীয় খন্ডে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকে শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের ইতিহাস পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে লেখক উপস্থাপন করেছেন।

আজ পড়ে শেষ করলাম মোগলনামা দ্বিতীয় খন্ড। কিন্তু ইতিহাসের বইয়ের রিভিউ লেখার সাহস অথবা যোগ্যতা আমার মতো ক্ষুদ্র পাঠকের এখনো হয়নি। আমি কেবল আমার নিজের মতো ভালো লাগা মন্দ লাগা বলতে চেষ্টা করবো।

মোগলনামা দ্বিতীয় খন্ড শুরু করার পর প্রথম ৬০/৭০ পৃষ্ঠা বেশ দ্রুত এগিয়েছে। এর কারণ হতে পারে প্রথম খন্ড পড়ার রেশ অনুযায়ী চরিত্র, মোগল প্রশাসন, সাম্রাজ্য ইত্যাদির সাথে মোটামুটি পরিচিত থাকায়। কিন্তু বইয়ের মাঝের অংশটা অনেকটা ধীরে এগিয়েছে। কারণ, এই মাঝের ইতিহাসটা সম্পর্কে আমাদের ধারণা কম। মূলতঃ ইতিহাসের এই অংশটা অনেকটা আমাদের মাঝে অনুপস্থিত। এর একটা পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়ার জন্য এই লেখাটার খুব প্রয়োজন ছিল। শেষ অংশটা খুব দ্রুত এগিয়েছে। শেষের অংশটার সম্পৃক্ত ইতিহাসের সাথে আমরা অনেক পরিচিত। পলাশীর পরাজয়ের থেকে সিপাহী বিদ্রোহ পর্যন্ত সময়টা আমাদের পাঠ্যবইয়ে অনেক পড়ার সুবাদে অনেকটাই পরিচিত জগতের মতো ছিল। তাই খুব দ্রুত এগিয়েছে এই টালমাটাল সময়টা।

আমরা ভারতবর্ষের মোগল ইতিহাস মাত্রই বাবুর থেকে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত পরিষ্কার বুঝি। তারপর থেকেই মোগলদের প্রভাব প্রতিপত্তি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কিন্তু এরপরেও মোগল সিংহাসন টিকে ছিল দেড়শো বছর। এই দেড়শো বছরে মহান সম্রাট আকবর কিংবা আওরঙ্গজেবের মতন কোনো প্রতাপবশালী সম্রাটের আগমন ঘটেনি। তাই আমরা দেখি ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলার শেষ স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যায়। কিন্তু এই পঞ্চাশ বছরের ভেতরে মোগল সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাংলাই বা কবে কিভাবে স্বাধীন হলো? আর এরপরেও মোগল সিংহাসন কিভাবে আরো একশত বছর টিকে ছিল? তারই পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে মোগলনামা দ্বিতীয় খন্ডে।

১৭০৭ সালে মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রতাপশালী সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ১৭১৯ সাল পর্যন্ত ১২ বছর সময়ে ছয় জন সম্রাট মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। কেউ তিন থেকে চার মাসের জন্যও সিংহাসনে বসেন। এ সময় সিংহাসন নিয়ে ভাতৃ বিরোধ, সৈয়দ ভাইদের মতো মোগল আমাত্যদের লোভ লালসা অনেক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। এমতাবস্থায় ১৭১৯ সালে মুহাম্মদ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর প্রথম কোন সম্রাট দীর্ঘদিন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত থাকেন। তিনি ১৭৪৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৯ বছর মোগল সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন। কিন্তু তার সময় থেকেই মোগল সাম্রাজ্যের ভাঙ্গনে শুরু হয়। এই সম্রাটের সময়ে বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শিতার অভাব মোগল সাম্রাজ্যকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

১৭৪৮ সালে সম্রাট মুহাম্মদ শাহর মৃত্যুর পর ১৭৬০ সাল পর্যন্ত ১২ বছর সময়ে আরও তিনজন সম্রাট সিংহাসন আরোহণ করেন। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট শাহ আলম সিংহাসন আরোহণ করলে। আবার অনেকটা সময়ের জন্য এই সম্রাটের সিংহাসন স্থায়ী হয়। তিনি সম্রাট ছিলেন ২৮ বছর। কিন্তু এই ২৮ বছরে এদিকে ঘটে গেছে অনেক কিছুই। কখনো মারাঠা আক্রমণ, কখনো আফগান আক্রমণ, এদিকে ইংরেজ, ফরাসি বেণিয়ারা পাল্লা দিয়ে শুরু করে মোগল ভারতবর্ষ কেড়ে অধিকার করে নেয়া। মোগল সাম্রাজ্য সংকুচিত হয়ে আসতে শুরু করে ধীরে ধীরে তা হয়ে উঠে দিল্লী কেন্দ্রীক মোগল শাসন। আর এদিকে বাংলা হয়ে উঠে ভারতবর্ষের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কেন্দ্র।

১৭৫৭ সালে পলাশীর পরাজয়ের একশত বছর পর ১৮৫৭ সালে প্রথমবার ইংরেজদের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহ অর্থাৎ সিপাহী বিদ্রোহ হয়। এই সিপাহী বিদ্রোহ ই এতো দিন টিকে থাকা নামে মাত্র মোগল সিংহাসনের বিলুপ্তি ডেকে আনে। লেখক সিপাহী বিদ্রোহসহ তৎকালীন ভারতবর্ষের প্রাসঙ্গিক আরো বিদ্রোহ, অন্যান্য অঞ্চলের অবস্থা বিস্তর আলোচনা করেছেন। সম্রাট বাবুর ছাড়া মোগল সাম্রাজ্যের সকল সম্রাটই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন ভারতবর্ষে। কিন্তু হতভাগা শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের জন্মভূমিতে মৃত্যুবরণ করার সুযোগ হয়নি। থেকে নির্বাসিত করা হয়েছিল সুদূর রেঙ্গুনে। নির্বাসিত দুর্বিষহ জীবনের সঙ্গী হয়েছিলেন তার স্ত্রী জিনাত মহল।

তৈমুর বংশধর বাবুর যে সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা তার বংশধরেরা চালিয়ে গেছেন গৌরবের সাথে। সাম্রাজ্যের বিস্তৃতিও করেছেন, ভারতবর্ষের উন্নতি করেছেন। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছেন আবার ধ্বংসের দিকে। এই মোগল সাম্রাজ্যের ধ্বংসের কথা আসলেই প্রথমে আমাদের যা বলা হয় তা হলো নারী এবং মদের আসক্তি। কিন্তু শুধুমাত্র কি নারী, মদের আসক্তিই এই সাম্রাজ্যের পতনের কারণ ছিল? নাকি সাথে ছিল অন্য কিছুও? এসবের উত্তরও লেখক দিয়েছেন গুছিয়ে। মোগল ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে বারবার মোগলদের সাথে সম্পৃক্ত পারস্য সম্রাট, মারাঠা দুস্য বাহিনী ও তাদের কয়েকজন প্রতাপশালী সৈনিক, উল্লেখযোগ্য বীর মোগল আমত্যগণ, শিখ বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহসহ আরো পারিপার্শ্বিক অনেক বিষয় এসেছে। যা ইতিহাসের পূর্ণতা দিয়েছে।

মোগলনামা প্রথম খন্ড পড়ে যেটা মনে হয়েছিল যে, মাহমুদুর রহমানের লেখায় ইতিহাস পড়া মানে যেন দাদুর কাছে বসে পুরনো দিনের গল্প শোনা। দ্বিতীয় খন্ড তার এই গুণটা অক্ষুন্ন রয়েছে। নন-ফিকশন ইতিহাসের কোন বই এত সুখপাঠ্য হতে পারে মোগলনামা দুই খন্ড এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কখনো কোথাও মনে হয়নি যে এই লাইনটি এখানে অপ্রয়োজনীয় বা এখানে আরেকটু বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন ছিল। পড়তে পড়তে যখনি মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তখনই দেখি লেখক পরে লাইনে সব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে হাজির।

বাংলা ভাষায় মোগলদের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নিয়ে মোগলনামা একটি অসাধারণ কাজ। লেখকের এটার জন্য প্রকৃতই অনেক প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার।

বইটা নিয়ে কিছু অভিযোগ আছে। মোগলনামা প্রথম খন্ড প্রকাশনী বেশ যত্ন নিয়ে ছাপালেও দ্বিতীয় খন্ডে বেশ অযত্নের ছাপ পাওয়া গেছে। কয়েক জায়গায় বানান ভুল, শব্দের মাঝের বর্ণ মিসিং, সালে ভুল পেয়েছি কয়েক জায়গায়। আর কাগজের কোয়ালিটি সম্পর্কে বলবো, এতে বইয়ের যদি দাম বেড়েও যায় তবুও ভালো মানের কাগজ দিয়ে ছাপানো উচিত। কারণ এসব বই সংগ্রহে রাখার মতো বই। বারবার পড়ার মতো বই।

সম্পূর্ণ মোগল ইতিহাস সম্পর্কে আপনার যদি অগ্রহ থাকে তবে আপনি মাহমুদুর রহমানের মোগলনামা দুই খন্ড নিয়ে বসে পড়ুন। আপনার আকাঙ্ক্ষা আশা করি এই বই দুটো পূর্ণ করতে পারবে। আপনাকে মোগল সাম্রজ্যে স্বাগত। আমি বিদায় নিচ্ছি আপাতত এই সাম্রাজ্য থেকে।

প্রকাশনীঃ আহমদ পাবলিশিং হাউস
মুদ্রিত মূল্যঃ ৪৫০ টাকা মাত্র
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ২৪৮
Profile Image for Zahid Hasan Mithu.
34 reviews2 followers
January 2, 2025
প্রথম খণ্ডের মতো দ্বিতীয় খণ্ডও উপভোগ্য ও সুখপাঠ্য। কিন্তু প্রকাশে তাড়াহুড়ো ছিল কিনা জানা নেই, প্রচুর বানান ভুল। তবে এই খণ্ড পড়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ হলাম। আওরঙ্গজেবের পরের মোগল ইতিহাস নিয়ে তেমন চর্চা হয় না। পতিত ইতিহাস নিয়ে কে বা আলোচনা করে। তবে এই বইতে মোগল সাম্রাজ্যের অস্তমিত সূর্যের চমৎকার বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে সিপাহী বিদ্রোহ সম্পর্কে বেশ ভালোভাবে জানলাম।

দুই খণ্ডের মোগলনামা ছিল এক সাম্রাজ্যের ভেতরে টাইম মেশিনে করে ভ্রমণের মতো। পতনের কালে যতটা হৃদয় বিদারকভাবে শেষ হওয়ার কথা ঠিক সেভাবেই শেষ করেছেন লেখক। 'ঘোড়ায় চড়ে বাবুর যে দিল্লিতে মোগল পতাকা তুলেছিলেন তার শেষ উত্তরসূরি এক সাধারণ গরুর গাড়িতে করে সে সাম্রাজ্য ত্যাগ করেন।' আহ! দমবন্ধ হয়ে আসলো।
Profile Image for Neel.
4 reviews2 followers
May 18, 2023
ভালো লেগেছে। তবে প্রচুর বানান ভুল। যা দৃষ্টিকটু।
Profile Image for Khalid Hasan Siam.
57 reviews19 followers
October 22, 2022
আওরঙ্গজেবের পরে মোগল বংশের এই ভরাডুবির কারণ কী? আসলে আওরঙ্গজেব স্বয়ং এই বংশের পতনের বীজ বপন করে গিয়েছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে যেমনই হন না কেন, শাসক হিসেবে অত্যন্ত চতুর-দক্ষই ছিলেন তিনি। পুরো ভারতবর্ষকে একসাথে শাসন করেছেন। কিন্তু তার হাতেই যে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা হয়! সেইসব নিয়েই এই বইটা। আওরঙ্গজেবের পর থেকে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ অব্দি কাহিনি। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরে ভারতেই এই শাসনব্যবস্থায় এক অদ্ভুত ভ্যাকুয়াম তৈরি হয়, আওরঙ্গজেবের পরে মূলত তাঁর কোনো যোগ্য উত্তরসূরীই ছিল না। সিংহাসন নিয়ে কত যে ষড়যন্ত্র! পাপেট রাজা বসিয়ে নিজের হাতে ক্ষমতা রাখার চেষ্টা, রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর অপচেষ্টা আরও নানানরকম ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে পার করতে হয়েছে সময়টুকু। এরই মধ্যে নাদির শাহের আক্রমণ যেন মড়ার উপর খড়ার ঘাঁ! এবং সেইসাথে বিভিন্ন ইউরোপীয় বণিকদের আগমন এবং তাদের এই অঞ্চলের রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ পুরো বিষয়টিকেই জটিল করে তোলে।

সেইসবই দুই মলাটে তুলে আনা হয়েছে দ্বিতীয় খন্ডে। একটা টাইমলাইন ধরে ইতিহাস জানার জন্য ভালো বই।
Displaying 1 - 14 of 14 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.