হতে চাওয়া কবিদের প্রতি কোন দরদী মহান কবির কিছু নসিহত পড়েছিলাম। কবিতার ধরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেনঃ কখনো কখনো কবিরা কাচের জানালার এপাশ থেকে দুনিয়া দেখতে বসে। বাইরের আলো কমে এলে জানালার কাচে যখন ঘরের ভিতরটা ভেসে ওঠে বিম্ব হয়ে, তখন কবিতা কবির নিজের ঘর কিংবা নিজের মন অর্থাৎ ভীষণ ব্যক্তিগত ও দারুণ ইন্টিমেট বিষয়গুলোর কথা বলে। আর যখন ঘরের আলো কমে আসে আর বাইরের আলো উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে, কবি তখন কাচের ওপাশের পৃথিবীকে দ্যাখে। সেই দ্যাখা কবিতা হয়ে ওঠে। পৃথিবীর মুখোমুখি হ’তে গিয়ে স্যানিটি ধরে রাখতে যখন মুহূর্তের গায়ে কান পেতেছি, ফিসফাস যা কিছু শুনেছি, তা ভেতর আর বাইরের আলো বাড়িয়ে কমিয়ে বলতে চেয়েছি। কবিতা হয়েছে কিনা জানি না। এই বিক্ষুব্ধ পৃথিবীতে এইসব পংক্তি লিখে কখনো কখনো গ্লানিবোধ করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কবিতা লেখার স্বপ্নই বাঁচিয়ে রেখেছে যেন।
3.5 জানুয়ারির এক হিম ধরা দিনে ডাকবাক্সে এলো কবিতাবই 'জোনাকির বায়োলজি'। বাইরে পোলার ভরটেক্সের চিরশীতল পরিবেশ উপেক্ষা করে এক বসায় পড়ে ফেললাম কবিতাগুলো। যদিও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আহসানুল করিমের অনুবাদ ও পাঠ প্রতিক্রিয়া পড়া হয়েছিল আগে, তবে তাঁর কবিতা পড়ার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। কবিতাগুলোতে বারবার উঠে এসেছে পপ কালচারের প্রবল উপস্থিতি, ব্যক্তিগত স্বগতোক্তি, স্মৃতিচারণ, সাহিত্য জগতের আবছা অবয়ব, এবং কিছুটা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ। লেখার ভেতর দিয়ে এটা স্পষ্ট যে আহসানুল করিম মূলত সহজাত ভাষায় মানসিক মুক্তির জানালা খুঁজতে এসেছেন শব্দের জগতে। ফলে, তাঁর এই যাত্রায় এক গভীর স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতা অনুভব করা যায়।
মনে পড়ে গেলো, আজ থেকে প্রায় একযুগ আগে বাংলা বই ও সাহিত্য বিষয়ক আলাপেই তাঁর সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছিল। এই দীর্ঘ সময়ে পাঠক ও পর্যবেক্ষক হিসেবে তাঁর আরও স্পষ্ট ও পরিণত আত্মপ্রকাশ দেখেছি। আহসানুল করিমের বই ও সাহিত্যের পথে যাত্রা আরও দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ হোক—এই কামনা রইলো।
বইয়ের 'গণকবর,’ ‘ডাহুক ও ডুমুরের গল্প,’ ‘বাইশে জুন,’ 'সোশ্যাল মিডিয়া,' ‘নৈঃশব্দ্য,’ এবং ‘এপ্রিলে নিউইয়র্ক’ কবিতাগুলো ভালো লেগেছে।
কিছু জিনিস তার মধ্যে অন্তর্গত দ্বন্দ্ব তৈরি করে — মাঝে মাঝে সেটা সমসাময়িক অস্থিরতা, কখনো কখনো সেটা মহাকালীয় অমীমাংসিত জিজ্ঞাসা। প্রায়শই সেটা দৈনন্দিন অভ্যস্ততার মাঝে অসারতার আবেশে। দ্বন্দ্ব থেকে আসে বিষাদ, তবে তা পূর্ণতা পায় উপলব্ধিতে। টানাপোড়েনের মধ্যেও সে উপলব্ধি করে মানবিকতা কিংবা প্রেমের মৌলিক বুনন। নিত্যদিনের উপলব্ধির উত্তাপ বেরিয়ে আসে কাব্য হয়ে। কিছু কিছু উত্তপ্ত পংক্তি তাই মনে গেঁথে যায়, আলোড়ন তোলে। যেমন,
যে ফিরে আসে সে ফিরে আসে না, কিছুটা রেখে আসে ফেলে আসে অন্য কোথাও। (অবান্তর গতিবিদ্যা)
তোমাকে ভাবলে আজও কখনোই শুধু তোমাকেই ভাবতে পারি না। (তোমাকে ভাবলে)
কেননা তোমাকে না পাওয়ার বেদনা না চিনে তোমাকে পাওয়া আমার পূর্ণ হবে না। (তোমাকে পাওয়া)