১৯৬৮ সালের ২৭ মার্চ সকালে মস্কো শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে নোভাসিলেভা গ্রামে প্রায় চোদ্দো হাজার ফুট উঁচু থেকে আছড়ে পড়ে একটি ফাইটার জেট। দেশের তৎকালীন দৈনিক সংবাদের বিবরণ অনুযায়ী জেট বিমানে ছিলেন দুই আরোহী চালক, ‘স্টালিনের বাজ’ অভিধায় ভূষিত রেড আর্মির কলোনেল ভ্লাদিমির সেরেগিন এবং বিশ্বের প্রথম মহাকাশচারী কলোনেল ইউরি অ্যালেক্সিভিচ গ্যাগারিন।
ছেচল্লিশ বছর ধরে এই মৃত্যুরহস্য অজানা ছিল। এটি দুর্ঘটনা নাকি পূর্বকল্পিত হত্যা। গ্যাগারিন কি মারা গিয়েছেন নাকি নিজের হত্যাকাণ্ড রচনা করে আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছেন? কারণ ঠিক পরের বছর চাঁদের যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল আমেরিকা। ২০১৪ সালে কিছু গোপন ফাইল প্রকাশিত করে আমেরিকা যার সত্যতা নিয়ে বিশেষ কিছু বলতে চায়নি আজকের রাশিয়া। গ্যাগারিনের মৃত্যু আজও রহস্যাবৃত যেমনভাবে গোপনীয়তার খামে বন্দি থেকে গিয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পেস মিশনের ইতিহাস। স্পুটনিক, ভস্টক, ভসখোদ, সোইউজ, কসমস, মলনিয়া, জোন্দ একটার পর একটা স্পেসশিপের ডিজাইন করে গিয়েছেন যিনি, যাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেরিয়েছে শক্তিধর দেশের মাথারা তাঁর সম্পর্কে জানা গিয়েছে মাত্র কয়েক বছর আগে। মৃত্যু যাবতীয় গোপনীয়তার অবসান ঘটায় না, তবে বহু রহস্য চাপা দিয়ে দেয়। যদি তা না হত তা হলে কী হত? ইউরি গ্যাগারিনের মৃত্যু এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের একুশ বছরের স্পেস মিশন নিয়ে রচিত কল্পিত বাস্তবতার এক আখ্যান।
মৈত্রী রায় মৌলিকের জন্ম কলকাতায়। পেশায় ভূবিজ্ঞানী। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ভূবিজ্ঞানে বিএসসি। ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি, বম্বে থেকে এমএসসি ও এমটেক। বর্তমানে ফিল্ড জিয়োলজিস্ট হিসাবে কাজ করছেন। পরিবেশ বিজ্ঞানে গবেষণার কাজ করছেন নিউজার্সির রাটগার্স স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে। কর্মসূত্রে ভারতবর্ষের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরেছেন। গল্প, কবিতা রচনার পাশাপাশি অনুবাদ-কর্মে নিযুক্ত। মহাত্মা গাঁধী সর্বোদয়া মণ্ডল সংস্থা থেকে প্রকাশিত পুস্তক সেবাগ্রাম টু সোধগ্রাম বাংলা অনুবাদ করেছেন। তাঁর লেখা কবিতা, গল্প ও উপন্যাস সানন্দা, উনিশকুড়ি সহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া বিশিষ্ট কিছু লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে যুক্ত।
সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন মহাশূন্য অভিযানের ইতিহাসকে উপজীব্য করে উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলেন লেখিকা। কিন্তু না হলো ইতিহাস, না হলো উপন্যাস। যা হলো তাকে লবণহীন বিস্বাদ ল্যাটকা খিচুড়ি বলা যেতে পারে।
ইউরি গ্যাগারিন এর নাম শোনেন নাই এমন কেউ আছেন? আমার মনে হয় না এমন কেউ আছেন। সবাই জানেন প্রথম মহাকাশচারী মানুষ হচ্ছেন এই ইউরি গ্যাগারিন। প্রথম মহাকাশচারী মানুষ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বাসিন্দা; এই দুইটা তথ্য জানা থাকলেও অনেকেই ছোটোবেলার সাধারণ জ্ঞানের বইতে পড়া ইউরি গ্যাগারিনের সেই মহাকাশযাত্রার তারিখটা ভুলে গেছেন। ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। সেই তারিখটা হচ্ছে ১৯৬১ সালের ১২ই এপ্রিল। বুকভরা স্বপ্ন আর নভোচারীর বসার জন্য মাত্র ২ মিটার দৈর্ঘ্যের ক্যাপসুল নিয়ে ভোস্টক - ১ নামের সেই মহাকাশযান, ইউরিকে নিয়ে রওনা করেছিল ভোর ৬:০৭ মিনিটে।
এই দিনের প্রায় ৫৩ বছর আগে মানুষ সর্বপ্রথম জমিন থেকে তার পা উঠিয়ে যাত্রা করেছিল আকাশপানে। মাত্র ৫৩ বছর পরে সেই মানুষই যে কখনো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে নীল-সবুজের পৃথিবী চক্কর মেরে আসবে তাও আবার মাত্র ১০৮ মিনিটে, উপরন্তু সেই ঘুরে আসা মহাকাশযান নিয়ন্ত্রণ করা হবে পৃথিবীর এক কোণায় থাকা কন্ট্রোল সেন্টার থেকে, এটা যদি রূপকথা না হয় তবে কোনটা রূপকথা?
ইউরি গ্যাগারিন সেদিন সৃষ্টি করেছিলেন ইতিহাস৷ পৃথিবীর বুকে নেমে আসার এক্সপেরিয়েন্স ইউরি শেয়ার করেছিলেন এভাবে, 'আমাকে নামতে হয়েছিল প্যারাস্যুটে। ল্যান্ড করেছিলাম এক ভুট্টাখেতে। একটা বাচ্চা মেয়ে তার ঠাকুমার সঙ্গে খেতে কাজ করছিল সে-সময়। বাচ্চাটা তো ভেবেছে আকাশ থেকে পরি নেমে এসেছে বোধহয়!'
পরি নেমে আসুক আর দেবদূত নেমে আসুক, সেদিন মানুষের পক্ষ থেকে ইউরি প্রমাণ করেছিলেন, মানুষের পক্ষে আসলে অসম্ভব কিছুই নেই। জিতে নিয়েছিলেন দুনিয়াজোড়া মানুষের মন আর সেই সাথে জিতেছিলেন অসংখ্য পদক, সম্মাননা। তবে সেই সম্মাননা বেশিদিন উপভোগ করতে পারেননি ইউরি। ইতিহাস গড়ার মাত্র ৭ বছর পর মিগ১৫ বিমানক্র্যাশে জীবনাবসান ঘটে ৩৪ বছর বয়সী ইউরি গ্যাগারিনের। যে লোক কিনা পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে এলো জীবন হাতে নিয়ে, তাকে মরে যেতে হলো একটা মামুলি ট্রেইনিং ফ্লাইটে? রূপকথার সে হিরোর শেষ গন্তব্য তাহলে এই ট্রাজেডির মধ্য দিয়ে?
ভাই, বইয়ের গল্প শোনাইতে গিয়া আজাইরা গপ্পো শুরু করছেন? এলা থামেন। বইয়ের কোনো গল্প থাকলে কন।
একটু বেশি প্যাঁচাল পাইড়া ফেললে ক্ষমাপ্রার্থী। এখনি মূল ঘটনায় যাচ্ছি। আমাদের আলোচ্য বই 'শূন্য দৃশ্যমানতা'র গল্প শুরু হয় ইউরির জীবনাবসানের সেই দিনটি অর্থাৎ ১৯৬৮ সালের ২৭ মার্চ থেকে। গল্পের নায়ক ৩ জন। তার মাঝে একজনের নাম শুনেই ফেললেন, দ্বিতীয় জন হচ্ছেন ঐ মিগ১৫ এ থাকা আরেক হতভাগ্য মানুষ, ভ্লাদিমির সেরিওগিন। তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীতে ইউরির বিমান চালনার শিক্ষক। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতার শীর্ষে ছিল প্রতিরক্ষা বাহিনী। আর সেই সাথে প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা ছিল ভয়ানক নিষ্ঠুর। দেশের সব ভালো মন্দ বোঝার দায়িত্ব নিয়ে নেয়া এই প্রতিরক্ষা বাহিনীর মানুষও সিভিলয়ানদের অনেক অবজ্ঞা করতেন। অবজ্ঞা করতেন জুনিয়র অফিসারদেরও। তবে তা সত্ত্বেও ইউরিকে অনেক স্নেহ করতেন ভ্লাদিমির।
সফলতার খাতায় দুজনের পরিচয় লেখা থাকলেও লেখা ছিল না আমাদের গল্পের তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নায়কের নাম। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষ জানত না ইনিই সোভিয়েত ইউনিয়ন-আমেরিকার কোল্ড ওয়ারের সময়ে দু'দেশের মধ্য হওয়া রাজনীতির চালে সোভিয়েতকে এগিয়ে রেখেছেন সবসময়। তিনিই ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের সকল মহাকাশযাত্রার বাহনের ডিজাইনার। তার নাম 'সের্গেই পাবলোভিচ কলোরভ'। বেঁচে থাকতে পাননি কোনো রিকগনিশন, কেউ জানতোই না মহান এই ব্যক্তিটির নাম, অন্তত ১৯৬৬ সালের আগ পর্যন্ত (সে বছর মৃত্যুবরণ করে কলোরভ)। সোভিয়েত ইউনিয়ন বেশ সফলতার সাথে লুকিয়ে রেখেছিল তাকে, পাছে না আমেরিকা জেনে ফেলে। বইটা কি তাহলে এনাদের মহাকাশযাত্রার সাফল্যের কচকচানি? আজ্ঞে না, আবার হ্যাঁ ও। মানে এনাদের মহাকাশযাত্রার ইতিহাসই তবে বইয়ের লেখক 'মৈত্রী রায় মৌলিক' স্রেফ উইকিপিডিয়ার মতো গড়গড় করে ইতিহাস বলার রাস্তায় হাঁটেননি। তিনি হেঁটেছেন অনেকটা শাহাদুজ্জামান এর 'আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সাথে'র পথে।
বইটা মূলত এগিয়েছে মৃত্যুর পরে তাদের তিনজনের একত্রে বসে করা বাতচিতের মধ্য দিয়ে। এখানে লেখক কল্পনার আশ্রয় নিলেও তাদের কন্ঠ দিয়ে যে গল্প উঠে এসেছে সেগুলো সব বাস্তব। আর ইতিহাস এ বইয়ের অর্ধেকটা হলেও বাকি অর্ধেকে উঠে এসেছে এই বইয়ের নায়কদের নিজস্ব দর্শন, তাদের আত্মত্যাগ, সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন অবস্থা, নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রযন্ত্রের তাদেরকে ব্যবহার করার করুণ ফিরিস্তি, কোল্ড ওয়ারের গল্প, স্বপ্নভঙ্গ; বলে শেষ করা যাবে না এমন অনেক কিছু।
মাত্র ১৪৪ পাতার মাঝে লেখক যে দারুণভাবে আমাদেরকে গল্পটা শুনিয়ে গেছেন এটাকে সরলীকরণ করে স্রেফ ইতিহাসের বই বা নন-ফিকশন বই বলতে আমি নারাজ। 'শূন্য দৃশ্যমানতা' তার চাইতেও বেশি কিছু। লেখকের সুনিপুণ লিখনশৈলী আমাকে বারবার নারায়ণ সান্যালের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। নারায়ণের সান্যালের জাদুকরী শব্দ, বাক্যের ব্যবহার না থাকলেও গল্প বলার ভঙ্গিটা একদম কপি করে নিয়েছেন লেখক। এখানে আসলে কপি ব্যাপারটা আমি নেগেটিভ অর্থে বুঝাইনি। এই যে নন-ফিকশনের মাঝে ফিকশনের স্বাদু মশলা ঢুকিয়ে দেয়া, সেভাবে গল্প বলা; এটা আসলে চাইলেও কপি করা যায় না। এর জন্য চাই প্রচুর ইতিহাসভিত্তিক নলেজ রাখা, গল্পটা কীভাবে বলা হবে সেটার আউটলাইন টানা এবং পুরো বই ঝুলে না যাওয়ার মতো কঠিন এক্সিকিউশন করা। এটা সবার কাজ না। আর এখানে মৈত্রী রায় মৌলিক দারুণ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। এই একটা বইয়ের মাধ্যমেই উনি আমাকে ওনার পাঠক বানিয়ে ফেলেছেন। কাজটা একদম সহজ না। শূন্য দৃশ্যমানতা বা মেঘের মাঝে জিরো ভিজিবিলিটির কারণে সেদিন মিগ১৫ ক্র্যাশ করার কারণেই কি বইয়ের নাম 'শূন্য দৃশ্যমানতা'? নাকি ইউরি, কলোরভ আর ভ্লাদিমির যে সারাজীবন ধরে তাদের খুব কাছে কিছু সত্য থাকলেও সেটা দেখতে পারেননি (কিংবা তাদেরকে দেখতে দেয়া হয়নি), সেটাই এ বইয়ের নামকরণের পেছনের কারণ? পড়ে দেখুন, হয়তো উত্তরটা আপনার কাছে ক্লিয়ার হবে।
বইটা আনন্দ পাবলিশার্সের, তাই ইন্ডিয়া থেকে বই আনায় এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে পেয়ে যাবেন।
১৯৬৮ সালের ২৭শে মার্চ নোভাসিলেভার আকাশ থেকে আছড়ে পড়ে এক জেট।মৃত্যু হয় ইউরি গ্যাগরিন ও ভ্লাদিমির সেরেগিনের।অথচ বহু বছর ধরে এ মৃত্যু ছিল রহস্যাবৃত। ২০১৪ সালে আমেরিকা কর্তৃক কিছু গোপন ফাইল প্রকাশ পায় যা নিয়ে চুপ থেকেছে আজকের রাশিয়া। উপন্যাসে উঠে আসে সোভিয়েতের ২১বছরের যুগান্তকারী স্পেশ মিশন ও তার মাস্টারমাইন্ড চিফ কারোলেভের কথা,অথচ তার নাম প্রকাশ্যে এসেছে বহু বছর পরে।গোপনীয়তার বেড়াজালে কেমন ছিল সেই সফর,সেই জীবন তা নিয়ে সুন্দর এক আখ্যান লিখেছেন লেখিকা।