দীর্ঘ অনেকদিন যাবৎ সাউথার্ন আফ্রিকার পশ্চিম রোডেশিয়া আর বতসোয়ানাতে প্রত্নতাত্ত্বিক এক অশুভ আবিষ্কারের কাজে সঙ্গ দিয়েছিলাম ডক্টর বেঞ্জামিন কাজিন ও কোটিপতি লোরেন স্টারভেসান্টের সাথে। কথা বলছিলাম ১৯৭২ সালে প্রকাশিত উইলবার স্মিথের লিখা "দ্য সানবার্ড" উপন্যাস নিয়ে। এই বিশাল উপন্যাস বঙ্গানুবাদ করেছেন ‘অসীম পিয়াস’ এবং প্রকাশনী ‘চিরকুট’ উক্ত কাজে যুক্ত ছিলেন। এই উপন্যাস নিয়ে আমি যদি ছোট পরিসরে আলোচনার মেলা বসাতে যায় তাহলে লিখাটা শেষ হবে না। জানতে চাইবেন হয়তো এক কথায়, যে উপন্যাসটি কেমন ছিলো?
ধৈর্য কম যাদের তাদের বলে দিতে চাই, অসাধারণ থেকে বেশিকিছু! বাকি আলোচনা শুরু করবো চাইলে পড়তে পারেন অথবা স্কিপ করতে চলে যেতে পারেন। তবে আলোচনা হবে "স্পয়লার বিহীন" তাই ভয় নেই, আর যত বড় প্লটের কাহিনী আমি যদি এক ডজন স্পয়লার দিয়ে ফেলি তবুও আপনি টের পাবেন না।
"দ্য সানবার্ড" উপন্যাস মূলত ঐতিহাসিক থ্রিলার সেই সাথে আপনি উপভোগ করতে পারবেন মিথ, অ্যাডভেঞ্জার এবং সীমাহীন রহস্য। দুইটা টাইমলাইনের গল্প কিন্তু সমান্তরালে সেটাকে লেখক চালাতে চাইনি। তিনি বর্তমান ও অতীতের মাঝে যোগসূত্র ঘটিয়েছেন এমন কায়দা করে যে আপনি গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনা পুনরাবৃত্তি হতে থাকলেও আপনার আগ্রহ বিন্দু পরিমাণ কমবে না। আমি ধাপে ধাপে কিছু জিনিস ক্লিয়ার করে দিচ্ছি যাতে পড়তে সুবিধা হয় -
❂ টাইমলাইন -
উপন্যাসটি দুইভাগে বিভক্ত। অর্থাৎ প্রথম পর্ব বিংশ শতাব্দী থেকে শুরু হয়েছে, যেটাকে উপন্যাসের ব্যাসিসে "বর্তমান" বলে ভেবে নিতে পারেন। অন্যদিকে, দ্বিতীয় টাইমলাইন শুরু হয়েছে খৃষ্টপূর্ব ১৬৯ থেকে ৬০০ সালের মধ্যকার প্রেক্ষাপটে সেটাকে অতীত হিসেবে গণ্য করবেন। এই দুই টাইমলাইনে বিশেষ একটা যোগসূত্র রয়েছে যেটা উপন্যাস পড়লে সহজে বুঝতে পারবেন।
❂ প্রেক্ষাপট -
দুইটা টাইমলাইন যেহেতু তাই প্রেক্ষাপট হবে সাধারণত ভিন্ন হবে। প্রথম পর্বে উন্নত পৃথিবীর আধুনিকতার যে ছোঁয়া সেটা অনুভব করতে পারবেন, লেখক সে সময়ে এতো দারুন ভাবে প্রত্যকটা বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন যে অবাক হতে বাধ্য। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ব্যবসায়ী সংমিশ্রণে কিভাবে পুরানো একটা পরিত্যক্ত শহর খোঁজের অভিযান শুরু হয় সেটা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে আলোচনা করেছেন। দ্বিতীয় পর্বে "ওপেট" নামক একটা শহরের চিত্র বৈচিত্র্য সেই সাথে বাণিজ্য, রাজা, পুরোহিত ও প্রজাদের নিয়ে যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরি করে পাঠকরের রোমাঞ্চিত করেছেন সেইজন্য সাধুবাদ জানাতে হচ্ছে।
❂ চরিত্র -
দুই পর্ব মিলে মোট ৫০ এর অধিক চরিত্রের সাথে আপনাকে পরিচিত হতে হবে! কি ঘাবড়ে গেলেন? প্রথম পর্বে ২৩ টি ও দ্বিতীয় পর্বে ২৭ টি সম্ভবত। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে প্রথম পর্বে রয়েছেন, ডক্টর বেঞ্জামিন বাটন/বেন (আফ্রিকান অ্যানথ্রোপলজি অ্যান্ড প্রিহিস্টোরি ইনস্টিটিউট - পরিচালক), লোরেন স্টারভেসান্ট/লো (জোহানসবার্গের কোটিপতি বিনিয়োগকারী একই সাথে ডক্টর বেনের সহোদর), হিলারি স্টারবেসান্ট, ডক্টর স্যালি বেনাটর, টিমোথি মাগেবার, ঝাই, এলড্রিজ হ্যামিল্টনের মতো আরো বিশেষ চরিত্র উপস্থিত থাকবেন।
দ্বিতীয় পর্বটি কার্থেজিয়ান আমলের যখন ভাষা হিসেবে পিউনিক বেশ প্রচলিত ছিলো। কেন্দ্রীয় শহরের নাম ওপেট, সেখানের রাজা গ্রাই - লায়ন ওরফে লানন হাইকানাস, পুরোহিত ছিলেন হুই বেন - আমান, ভেন্ডির রাজা মানাতাসসি, রিব - আড্ডি, দৈবদ্রষ্টা তানিথ সহ আরো বিশেষ সব চরিত্রের সমাহার।
এই দুই সময়ের আসল রহস্য কি? লেখক কেনো দুইটা টাইমলাইনে যোগসূত্র স্থাপন করতে চেয়েছেন? সেটা জানতে হলে উপন্যাস মাস্ট রিড! উপন্যাসের সামান্য আখ্যান আমি তুলে ধরছি -
‘‘একটা হারানো সভ্যতা, একটা অভিশাপের পুনর্জন্ম’’
ডক্টর বেন কাজিনের হাতে আছে শুধু একটা ঝাপসা ছবি আর মনের ভেতর একটা খুঁতখুঁতানি যে বতসোয়ানার পাহাড়ের নিচে কোথাও একটা হারানো শহর খুঁজে পাওয়া যাবে। কাজ শুরু করার পরেই, একটা অভিশাপের গুজব আর স্থানীয় গোত্রের সাথে গোলাগুলি ওনাকে নিয়ে গেলো শহরটার ভিত্তির বাইরেও আরও অনেক কিছু আবিষ্কারের দিকে।
অভিশাপটা আদতে মনে হলো সত্যিই বোধহয়, আর সেটা বেন আর ওর সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধু, সেই সাথে যে মেয়েটাকে তারা দুইজনেই ভালোবাসে তাদেরকে সংযুক্ত করে দেবে প্রায় দুই হাজার বছরের পুরনো এক ভুলে যাওয়া রাজার সাথ। একটা সম্মানিত আর গৌরবের শহরের সাথে যেটা পরবর্তীতে বেমালুম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বাতাসে। কিন্তু কী হলো এই প্রাচীন সভ্যতা? আর সেটা কি এমন জিনিস যা এই হারানো সাম্রাজের সাথে বেন আর এই মারাত্মক বিপদটাকে সংযুক্ত করেছে যা ওকে বর্তমান দিনে মুখোমুখি হতে হচ্ছে?
➤ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা -
উপরে অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা করেছি। প্রতিক্রিয়া বলতে গেলে অনবদ্য ছিলো। ঐতিহাসিক উপখ্যান যখন আসে তখন উইলবার স্মিথ সেইখানে রাজত্ব করবেন এটা জানা। উপন্যাস পড়ে শুধু ভেবেছি মানুষটার জ্ঞানগর্ভ কতোটা গভীর। সংলাপ থেকে শুরু করে গল্প বলার যে আর্ট সেটাতে উনি আপ টু দ্য মার্ক। বিস্তারিত বর্ণনাভঙ্গি যখন করবেন তখন সেটা কল্পনা করতে বেশি সময় নিতে হবে না, তবে এক্ষেত্রে আমি বলবো ধীরেসুস্থে বইটা পড়া ভালো নাহয় এতো বিশাল ক্যানভাসের মজা আপনি দ্রুতপাঠে কখনো পাবেন না।
সর্বপ্রথম যে প্রশ্ন মাথায় আসবে, সানবার্ড কি? সানবার্ড হচ্ছে সূর্যের পাখি, আক্ষরিক অর্থে "শকুন" বুঝানো হয়েছে। উক্ত বইতে দুইজন মানুষকে এই উপাধি দেওয়া হয়েছে সেটা সাসপেন্স থাকুক।
লেখক বইতে আফ্রিকা মহাদেশের পূর্বযুগের কাহিনী নিয়ে সেটা সংগঠিত হওয়ার পিছনে কারণ গুলো অসাধারণ ভাবে উল্লেখ করেছেন। মিথলজিক্যাল বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ দৃশ্যমান না হলেও অনেক রেফারেন্স তিনি দিয়েছেন। বা - আল ও অ্যাসটার্টে নিয়ে যে ধর্মীয় অনুশাসন তৈরি করার চেষ্টা করেছেন সেটা সফল। বিশ্বাসের যে ভিত্তি সেটা শক্তপোক্ত ছিলো। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে ভালোবাসা ও অপূর্ণতার যে মেলবন্ধন সেটা বিশেষ আকর্ষিত করেছে।
বিশ্বাসঘাতকতা ইতিহাসের পরিচিত একটা অংশ, বলা যায় যেখানে বিশ্বাসঘাতকতা নেই সেইখানে মজা নেই! শব্দটা নেগেটিভ ও কুরুচিপূর্ণ হলেও একটা উপন্যাসে এই শব্দ বেশ ভালোই প্রভাব ফেলে। লোভ লালসা কতোটা হানি পৌঁছে দেই সেটাও দুইজন প্রতিভাবান মানুষের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হিসেবে ফুটে উঠে। উত্তেজনা একেবারে তুঙ্গে থাকবে এইটা মাথায় রাখবেন। পুনর্জন্মলাভের দিকটা লেখক সুনিপুণ ভাবে ফুটিয়েছেন উপন্যাসে এইটা আরেকটি স্ট্রং দিক ছিলো।
প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের কোন কমতি চোখে পড়েনি, ৬১৬ পৃষ্ঠার বিশাল উপন্যাসে প্রত্যকটা পরিচ্ছেদ বেশ সুন্দর ভাবে ফুটে তুলেছেন। ৩২৮ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ছিলো প্রথম পর্বের উত্থান। কিছু শব্দ ছিলো কিছুটা কঠিন যেমন - খলবল, বাতিকগ্রস্ত, কণ্টকময়, শিশ্নোদরপরায়ণ, কুক্ষিগত, আইডাই, যৎকিঞ্চিত, কায়ক্লেশ, বীতশ্রদ্ধ, মর্মন্তুদ, সনিবর্দ্ধণ ইত্যাদি। খুঁজলে অর্থ প���ওয়া যাবে কিন্তু পড়ার সময় খোঁজাখুঁজি করার ব্যাপারে অনীহা রয়েছে আমার। ভুলের সমাহার ঘটেছে প্রায় ১০/১২ জায়গায় কিন্তু সেটাকে চাইলে ইগনোর করা যায়।
বেশি কথা বাড়াবো না, বইটা হাতে নিয়ে পড়া অসুবিধা যদিও তাই ঢেলান দিয়ে পড়তে বসলে হারিয়ে যাবেন ঐতিহাসিক এক অজানা অন্ধকারে। প্রত্যকটা চরিত্রের মর্ম রয়েছে যেমন আছে তাদের আবেগের স্থান। পরিপূর্ণ জ্ঞানের যে ভাণ্ডার সেটা নির্দ্বিধায় অর্জন করতে পারবেন এই উপন্যাস থেকে। বিস্তারিত আলোচনা করছি না, বাকিটা নিজ দায়িত্বে পড়ে নিবেন।
➢ অনুবাদ, প্রচ্ছদ, মলাট ও বাইন্ডিং -
অনুবাদ নিয়ে বিন্দুমাত্র সমালোচনা হবে না। 'অসীম পিয়াস' ভাইয়ের প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ পড়া, সত্যি বলতে পূর্ণ তৃপ্তি পেয়েছি। কিছু জায়গায় ভুল খুঁজে পেলেও সেটা ছাড় দেওয়া যায় তবে কিছু শব্দকে চাইলে আরেকটু সহজবোধ্য করতে পারতেন। বুঝেছি ঐতিহাসিকের আঙ্গিকে লিখা তারপরেও অনেক সময় একটা শব্দের ঘাটতি পুরো বাক্যর উপরে প্রভাব ফেলে। সবশেষে অসাধারণ বইটি বঙ্গানুবাদ করে পাঠকরের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য বিশেষ ভাবে কৃতজ্ঞ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে টিকার ব্যবহার, অজানা শব্দের টিকা দিয়ে অনুবাদক বেশ উপকার করেছেন।
প্রচ্ছদ করেছেন 'সজল চৌধুরি' ভাই। সত্য বলতে এতোবড় উপন্যাসের প্রেক্ষাপট প্রচ্ছদে ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব। তবে পুরো উপন্যাস পড়ে যেটা বেশি উপলব্দি করতে পেরেছি সেটা ছিলো "শকুন কুঠার!" ফ্রন্ট পেইজের প্রচ্ছদে যেটা সজল ভাই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। পেছনের প্রচ্ছদে রয়েছে "ওপাট" শহরের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ের ব্যাখা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। সব মিলিয়ে ভালো ছিলো প্রচ্ছদখানা।
অভিযোগের পর্ব মাত্র শুরু করলাম, প্রথমে আসবে অস্পৃষ্ট ছাপার অক্ষরের জন্য। পুরো বইতে এই সমস্যা ছিলো। দ্বিতীয় পৃষ্ঠার মধ্যখানে দুই জায়গায় ছেঁড়া ৪৮১ থেকে ৪৮৮ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ছিলো সেটা। অস্পৃষ্ট লিখার জন্য কিছু শব্দ ভালোমতো ঠাহর করা যায় না। এই সমস্যা কেনো হয়েছে জানতে চাচ্ছি? এছাড়া বাইন্ডিং শক্তপোক্ত, মলাট ও প্রচ্ছদ দুটোই দারুন ছিলো। পৃষ্ঠার মান বেশ ভালো কিন্তু অস্পৃষ্ট লিখাটা খানিকটা ব্যথিত করেছে।
➥ অনুবাদ রেটিং - ৪.২৫/৫
➦ দ্য সানবার্ড - ৪.৮৫/৫
➠ বইঃ দ্য সানবার্ড | উইলবার স্মিথ
➠ জনরাঃ থ্রিলার, মিস্ট্রি, অ্যাডভেঞ্জার ফিকশন
➠ প্রথম প্রকাশঃ আগস্ট ২০২০
➠ অনুবাদঃ অসীম পিয়াস
➠ প্রচ্ছদঃ সজল চৌধুরী
➠ প্রকাশনীঃ চিরকুট | মূল্যঃ ৭০০ টাকা মাত্র