পঁচিশ বছরের তরুণী মাঈশা প্রায় এক যুগ পর বাংলাদেশের সীমানার বাইরের আরেকটি দেশ থেকে বাবার সাথে দেখা করতে এসেছে। একসময় মাঈশা ছিল ওর বাবার অতি আদরের রাজকন্যা। কিন্তু এক দুর্ঘটনার কারণে দৃশ্যপট যেন চোখের পলকে পরিবর্তন হয়ে যায়।
বাবাকে ঘিরে অদ্ভুত এক অনুভূতি তৈরি হয় মাঈশার মনে। ওর বাবা কি ওকে দেখামাত্র বুকে জড়িয়ে নেবে? নাকি মাঈশার জন্য অপেক্ষা করছে ওর বাবার অনুভূতিশূন্য নির্বিকার এক চাহনি। এমন এক চাহনি যেখানে কোনো আবেগ নেই, আছে শুধু সীমাহীন নির্লিপ্ততা। মাঈশার ভীষণ ভয় কিন্তু তারপরও সে বাবার কাছে যেতে চায়। পরখ করতে চায় এই চাহনির সত্যতার? অথবা জানতে চায় তার এত কোমল বাবা কেন এই কঠিন বাবায় পরিণত হলো?
মাঈশার মনে অনেক প্রশ্ন। কিন্তু ওর বাবা আহাদ সাহেব ক্ষীণ কণ্ঠে বলেন, “ওই যে বললাম বাবারা কেমন হয় সেটাই ভুলে গিয়েছি।”
সুফাই রুমিন তাজিন আমার প্রিয় একজন গল্পকথক। উনার অন্ত:শূন্যে অন্ধ হিম এই বছর পড়া আমার প্রিয় বইগুলোর একটি। তো উনার নতুন বই পাওয়ার পর পড়ে ফেললাম অল্প কিছু দিনের মাথায়। সুখপাঠ্য।
দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যাওয়া পিটিএসডি আক্রান্ত স্বামী আহাদকে রেখে মেয়ে মাইশাকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করেন জয়া। প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর মাইশা দেশে আসে বাবার সাথে থাকতে, কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। একটু সাদামাটা শোনালেও এই কাহিনীকে লেখিকা খুব সুন্দর করে একটা পরিবারের প্রতিটা মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করেছেন, আর প্রায় সবগুলো চরিত্র ও তাদের আলাদা চিন্তাধারাকে এক সূত্রে গেঁথে উপন্যাস ফেঁদেছেন। তবে মাশাল আর মাইশা চরিত্র দুইটার চিন্তাভাবনা, মানসিক শক্তি, দৃষ্টিভঙ্গি (আলাদাভাবে) খুবই সুন্দর আর অনুকরণীয়, আশেপাশের মানুষের মাঝে খুব কম পাওয়া যায়।
ভাগ্যের লিখনে আমাদের জীবনে দুর্ঘটনা আসে, আবার বর্তমান সমাজে সেপারেটেড ফ্যামিলি প্রায়শঃই লক্ষ্য করা যায়। যাদের জীবনে আসে, তাদের সবকিছু ভেঙেচুরে নিয়ে যায়। এরকম একটা স্পর্শকাতর কনটেক্সটে লেখিকা সুন্দর একটা উপন্যাস লিখেছেন। ভবিষ্যতেও উনার ভালো লেখা আসতে থাকুক।
বুকস্ট্রীট থেকে প্রকাশিত হওয়া ৯টা বইয়ের লটে ৮টা বই পড়ার পরেও আপনি হয়তো ভাবতে থাকবেন কোন বইটা সেরা এই লটে (‘রক্তে লেখা বিপ্লব’কে সেরা বইয়ের বিচারের লিস্টের বাইরে রাখলাম কারণ ঐটা আসলে দলিল, বইয়ের চেয়েও বেশি কিছু, অর্থাৎ বই সংখ্যা ১০ হলেও আসলে কাউন্ট করছি ৯টা)? কিন্তু যখনই সুফাই রুমিন তাজিন এর ‘আমি এবং একটি বনসাই গাছ’ পড়ে ফেলবেন, আমি এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিতভাবে পেয়ে যাবেন আমার ধারণা। আজকে সেই বই নিয়ে আলাপ করছি।
প্রথমত বইটা বেসিক্যালি সমকালীন ড্রামা জনরার। ৯ বছর পরে প্রবাসে কৈশোর কাটানো মেয়ে মাঈশা আসছে বাবা আহাদ সাহেবের কাছে, সাথে আছে একটা প্রশ্ন। ১৬ বছর আগে যে ঘটনাটা ঘটেছিল সেটার পেছনে মাঈশার দায় কী? কেন ওর জীবনটা এমন হলো? কেন ওর সেই হিরো বাবা আগলে রাখতে পারলেন না ওকে, নাকি আসলে চাইলেন না?
এই বই আসলে প্লট নির্ভর বই না (অন্তত আমার কাছে)। এই বইয়ের পুরোটাই আসলে লেখকের শক্তিশালী লিখনশৈলীর শো-ডাউন। আর সে কাজটা লেখক করেছেন অতি সুনিপুণ দক্ষতায়। কথাসাহিত্য বা লিটারারি ফিকশন পড়ার শান্তিই এইখানে। গল্পের চাইতেও বড় হয়ে ওঠে বহমান স্রোতের মত কন্টিনিয়াস ভালো লিখনশৈলী। একইসাথে লেখকের জন্য এটা একটা চ্যালেঞ্জও বটে। তবে এ বইয়ে সে চ্যালেঞ্জ খুব সহজেই উতরে গেছেন লেখক।
যেটুকু প্লটে একটা সেরা গল্প লেখা যায় সেটুকু তো আছেই, সাথে এক্সিউকিউশনের দুর্দান্ত একটা উদাহরণ হয়ে থাকবে এ বইটা। ১২৫ পেজ এর বইতে ক্যারেক্টারাইজেশন শক্তিশালী করা খুব কঠিন কাজ। লেখক একটা না, প্রতিটা চরিত্রকে খুবই চমৎকারভাবে তৈরী করেছেন। একটা চরিত্রও ছিটকে যায়নি তার গতিপথ থেকে, এমনকি আপাত অগুরুত্বপূর্ণ বড় চাচী রাফিয়া চরিত্রটাও। স্রেফ এই ব্যাপারটাই অবাক করার জন্য যথেষ্ট। আর যে অ্যামবিয়েন্সটা দিয়েছেন, গ্রামের বাড়িতে কাজিনের বিয়ে, সবদিকে একটা উৎসব উৎসব অবস্থা, থুরথুরে বয়স্ক মায়াবতী দাদী; দারুণ একটা নস্টালজিক সেটআপ। তবে শুধু চমৎকার লেখার বাইরেও লেখক যাপিত জীবনের আপাত দর্শন অতি সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন। সাবলীল শব্দের ব্যবহারে আপনি টেরও পাবেন না কখন চোখে পানি চলে এসেছে; এই যে পাঠককে চরিত্রের মধ্যে একাত্ম করে ফেলার দক্ষতা, এটা সব লেখকের থাকে না। আর যখনি থাকে, তখন লেখক হয়ে ওঠে আমাদের পছন্দের কথা-সাহিত্যিক।
স্রেফ কয়েকটা জায়গায় একটু থার্ড আই পড়লেই আমার মনে হয়, এই বইটা নিয়ে আমার কোনো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অভিযোগও থাকতো না। যেমন : লেখকের লেখায় আগেও খেয়াল করেছি ক্রিয়াপদে উত্তম পুরুষ কখনো কখনো নাম পুরুষ চলে আসে, কখনো হয় এর উল্টোটা। এ বইতে সেটা অনেকটাই কমে গেছে, তবে অন্তত দুটো জায়গায় আমার চোখে পড়েছে (পারেনি লেখা আছে, হবে পারিনি; এই টাইপের আর কি)। তবে এর চাইতেও মেজর যে সমস্যাটা আমার চোখে পড়েছে সেটা হচ্ছে লেখক হুমায়ূন আহমেদ দ্বারা যে বেশ প্রভাবিত, সেইটা লেখায় উঠে আসা। এর আগে ‘অন্তঃশূন্যে অন্ধ হিম’ বইতে এই প্রভাবের ব্যাপারটা প্রবল ছিল, এবার অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছেন তবে ‘এসো নীপবনে…’ গানটা আবার সেই ফিলটা ফিরিয়ে এনেছে। ব্যাপারটা এমন না যে বইতে এই গানটা ব্যবহারের অধিকার স্রেফ হুমায়ূন আহমদেরই আছে, কিন্তু স্টিল বইটা যেখানে হুমায়ূন আহমেদের শুরুর দিকে পরিবার কেন্দ্রিক গল্পের ভাইব দেয় (এ ভাইবকে একদমই হুমায়ূন আহমেদের টোন ধরবেন না প্লিজ), সেখানে এই গানটা একটু হলেও অস্বস্তি জাগায়। আর সেটাতে ছাপ্পা মেরে দেয় বইতে ‘কচি কলাপাতা রঙ’ এর ব্যবহার। এগুলো বইটা পড়তে জেনারালি কোনো সমস্যা তৈরি না করলেও চোখে পড়লে একটু অস্বস্তি জাগায়, এই যা। তবে সেই সাথে এটাও ঠিক, যতই থার্ড আইকে দেখানো হোক না কেন সব পাঠককে ১০০% সন্তুষ্ট করা কোনো বইয়ের পক্ষেই সম্ভব না। তাই এ কথাগুলো আসলে অভিযোগ হিসেবে না নেয়ার অনুরোধ থাকলো। এ বইটা আমার মতে, এ যাবৎকালে লেখকের লেখা সেরা বই। লেখক যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়ায় আছেন, তাই তার কাছে অনুরোধ; আপনি থ্রিলার লেখেন বা না লেখেন সমকালীন জনরায় অবশ্যই লিখবেন।
বইটা আপনাকে বার বার কাঁদার উপলক্ষ তৈরি করে দিলেও আমি সাজেস্ট করবো ঐ আবেগকে একপাশে সরিয়ে রেখে বইটা পড়া শেষ করে অন্তত ৫টা মিনিট বইটা নিয়ে ভাববেন। হয়তো আবেগের বাইরেও বইটার অন্য ডাইমেনশন আপনার চোখে পড়বে। আর এই মর্মে শেষমেষ বই-বহির্ভূত একটা উক্তি দিয়ে শেষ করি,
“An ancient tribal proverb goes like that, Before we can see properly we must first shed our tears to clear the way.”
রেকমেন্ডেশন : স্রেফ দুই টাইপের মানুষকে। যারা বই পড়েন আর যারা বই পড়েন না।
আমার কাছে যদি জিজ্ঞেস করেন, 'পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা গল্প কি হতে পারে?'। আমি সোজাসাপ্টা উত্তর দিয়ে দেব, 'বাবা - মেয়ের বন্ধুত্বের গল্প, ভালোবাসার গল্প'। আমি তখন সদ্য কৈশোরে। একদিন উপহার হিসেবে পেয়ে গেলাম জাফর ইকবাল স্যারের 'বৃষ্টির ঠিকানা'। অদ্ভুতভাবে বইটা পড়ে আমি কেঁদেছিলাম। টুম্পার অনুভূতিকে নিজের অনুভূতির সাথে একাত্ম করে ফেলেছিলাম।
বাবা - মেয়ের সেই বন্ধুত্বের গল্প, ভালোবাসার গল্প এখনো আমার কাছে এক টুকরো টাটকা স্মৃতি।
হতে পারে সে কারণে কিংবা অন্য কোন অদ্ভুত কারণে এই বইটা আমার ভীষন ভালো লেগেছে। হুমায়ূন আহমেদের একটা ছাপ গল্পটিতে থাকলেও আমি সেটা উপভোগ করেছি। তাছাড়া আমি একটু আবেগপ্রবণ মানুষ। সমকালীন জঁরের বই পড়লেই মনটা বড্ড খারাপ হয়ে যায়। এক রকম যেচে মন খারাপের জন্যই বইটা হাতে নেওয়া। লেখিকা সত্যি বারবার আমার মনটা খারাপ করে দিয়েছে। এজন্য তাকে ধন্যবাদ ❤️।
সহজ, সোজাসাপটা বই। টানা পড়লে এক বসায় শেষ করা সম্ভব। চিন্তা ভাবনা করে পড়ার দরকার নেই আর কি।
আজকাল যারা বই লিখছে���, তাদের মধ্যে বেশিরভাগ লেখকের লেখার মধ্যেই হুমায়ূন আহমেদের একটা শক্তিশালী প্রভাব দেখা যায়। এই ব্যাপারটা কেমন যেন! প্রভাবিত হওয়া খারা�� কিছু না। কিন্তু সেটা যদি লেখকের স্বকীয়তাকে ঢেকে ফেলে, তাহলে সেটা একটা সমস্যা। সবাই যদি ঘুরেফিরে সেই একই প্যাটার্নে আটকে যাই, তাহলে আর নতুন কিছু কিভাবে সৃষ্টি হবে?
এখানেও অনেকটা সেরকম ঘটনাই ঘটেছে। গল্পের থিমটা সুন্দর ছিল। কিন্তু রূপবতী, মায়াবতী টাইপ নারী চরিত্রের আধিপত্যে সেটা অনেকটা ফিকে হয়ে গিয়েছে। বইয়ে এতোবার মায়াবতী শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে যে এটা উল্লেখ না করে পারলাম না।
প্রুফ রিডিং-এ আরেকটু যত্নবান হওয়া যেতো। কিছু জায়গায় মাশাল চরিত্রের নাম মাইশা হয়ে গিয়েছে। এই ছোটখাটো জিনিসগুলো পড়বার সময় বিরক্তি সৃষ্টি করে।
কুয়াশায় মোড়া ভাঙা একটা আয়নার নাম আমি এবং একটি বনসাই গাছ। সব আয়না সব সময় আমাদের প্রতিচ্ছবি দেয় না। কিছু আয়না হালকা ধোঁয়াচ্ছন্ন লাগে। মনে হয় যেন জানালার কাচে ভোরের শিশির জমে আছে। সেই কাচে তাকালে স্পষ্ট করে নিজের চোখ দেখা যায় না। দেখতে না পাওয়ার দরুণ একটা অস্পষ্টতা, শূন্যতা টের পাওয়া যায়। উপন্যাসটাতে একইভাবে শুন্যতাকে অনুভব করা যায়। অভিমানগুলো একটা বনসাই গাছ হয়ে বেড়ে ওঠে। আমাদের ছা-পোষা জীবনের মতোই সেই অভিমানগুলোকে জয় করেছে অবসাদ, স্থবিরতা, আর শূন্যতা।
মাঈশা বাড়ি ফেরে। এই গল্প বলার মতো কোনো গল্প না। কারন এই গল্পের মধ্যে প্রচন্ড অভিমান একটা গভীর ব্যথা হয়ে জমে আছে। মাঈশা ফিরে আসে পুরনো শহরে, পুরনো ঘরে, পুরনো আয়নায় মুখ দেখতে। কিন্তু আয়নার পেছনে জমে থাকে বাবার মুখ, মায়ের চুপ করে থাকা, আর একটা বনসাই গাছ। যেটা কথা বলতে পারে না, কাঁদতেও পারে না, শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। নিঃশব্দে।
মাঈশার ফিরে আসা যেন শুধু দেশে ফেরা নয়, বরং এক অনাবিষ্কৃত আত্মপরিচয়ের দিকে যাত্রা। বাবার প্রতি অপূর্ণ ভালোবাসা, দীর্ঘ অভিমান আর অমীমাংসিত এক সম্পর্কের টানাপোড়েন যেন বনসাইয়ের শেকড়ের মতো—ছোট, সংযত, তবুও গভীর ও অদৃশ্য জালবোনা।
বইটার প্রতিটা পৃষ্ঠা একেকটা থেমে থাকা সময়। সময়টা কেটে গেছে, কিন্তু ব্যথাটা রয়ে গেছে। আমার মনে হয় যে, আমরা অনেক সময় একটা নির্দিষ্ট গল্প পড়ি না। আমরা নিজের ভেতরের গল্পটাই পড়ি, কিন্তু অন্যের কলমে লেখা।
আচ্ছা, আমরাও কি কখনো কখনো বনসাই হয়ে যাই না? সমাজ, সম্পর্ক আর স্মৃতির ধারালো কাঁচিতে বারবার ছাঁটা হতে হতে একসময় আমরা আমাদের পূর্ণতা হারিয়ে ফেলি, অথচ বেঁচে থাকি, বেড়ে উঠি, ঠিক যেমন বনসাই।
বাবা-মায়েরাও তো একেকটা বনসাই। যত্নে কেটে ছেঁটে রাখা। ভালোবাসার নামে গড়ে তোলা একটা বন্ধ খাঁচা। তারা বড় হতে পারেনি। তারা তাদের সন্তানের কাছে ঠিকভাবে পৌঁছাতেও পারেনি। তারা শুধু দাঁড়িয়ে ছিলো। মাঝে মাঝে কিছু বলেছে, কিন্তু হৃদয়ের গভীর থেকে যেন মুখে আসতে পারেনি। মাঈশার বাবা কিছু বলেন না, কিন্তু তার না বলা কথাগুলো আমাদের গলা জড়িয়ে ধরে। এবং আমরা, পাঠক হয়ে, সন্তানের ভূমিকায় গিয়ে দাঁড়াই। আমাদেরও কত কিছু বলা হয়নি! কত কথাই তো বলা হয়নি, রয়ে গেছে গলার কাছে আটকে। এই উপন্যাস সেই আটকে থাকা কথাগুলোর দীর্ঘশ্বাস।
আমি এবং একটি বনসাই গাছ নিঃশব্দে এসে বসে পড়ে মনের নির্জন এক কোনায়, কথা বলে না—শুধু তাকায়। আর আমরা তাকিয়ে থাকি তার চোখে, যেটা একটানা ঝরে যাওয়া চোখের পানির মতো এক ধরণের নীরবতা।
মাইশার ফেরা যেনো কেবল তার শহরে ফেরার গল্প নয়, বরং নিজের ফেলে আসা ছায়াগুলোর মুখোমুখি হওয়ার একটা আত্মিক অভিযাত্রা। আমরা সবাই তো জীবনের কোনো এক বাঁকে দাঁড়িয়ে থেকেছি একবার। যেখানে সামনের পথ মুছে যায়, পিছনেরটা ঝাপসা হয়ে আসে, শুধু হৃদয়ের গায়ে লেগে থাকে একটা গন্ধ। পুরনো সময়ের, ভাঙা স্মৃতির, না বলা কথা আর হারিয়ে যাওয়া কারো হাতের ছোঁয়ার মতো।
মাঈশা যখন তার বাবার মুখোমুখি হয়—সেই মানুষ, যাকে একসময় সে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল, সেই মানুষ, যার সঙ্গে তার অমীমাংসিত ভালোবাসা ছিল। তখন পাঠক হিসেবে আমরাও নিজের জীবনের কোনো অসমাপ্ত পারিবারিক সম্পর্কগুলোকে মনে করতে বাধ্য হই। আমাদের সবার ব্যক্তিগত জীবনেই কেউ আছে যাকে আমরা কখনো কিছু বলতে পারিনি, অথচ বারবার বলতে চেয়েছি।
বাবা, হুইলচেয়ারে বন্দী। শুধু শারীরিক নয়, মনের দিক থেকেও। তিনি যেন এক বনসাই। ধৈর্যের কাঁচি দিয়ে ছাঁটা, স্মৃতির সূঁচ দিয়ে চিমটে রাখা এক জীবিত অথচ বিকৃত সৌন্দর্য। আমরা তাকে দেখি, অনুভব করি, কিন্তু ছুঁতে পারি না। মাঈশাও পারে না। কেবল পাশে বসে অনুভব করে। যেন কোনো ভোরের কুয়াশায় কেউ তাকে ছুঁয়ে গেলো, অথচ দেখা গেলো না।
মাইশার মতো আমিও সেই সন্তান, যে বাবার কাঁধে বসে ছোটবেলায় আকাশ দেখেছিল, কিন্তু বড় হয়ে তাকে আর চোখে চোখে দেখে না। আমিও সেই অস্বস্তিকর নীরবতা, যা জন্ম দেয় অপ্রকাশিত ভালোবাসার। সেই এক ধরনের সম্পর্ক, যা উচ্চারণ পায় না, অথচ হৃদয়ে লেগে থাকে বনসাইয়ের মতো। বেঁচে থাকে কিন্তু আর বাড়ে না। কত কথা আমরা বলি না—ভালোবাসা, অভিমান, ক্ষমা... অথচ ওই অমীমাংসিত কথাগুলোই যেন আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভারী স্মৃতি হয়ে থাকে। এই উপন্যাসটা সেইসব না বলা কথার প্রতিচ্ছবি। আমি যেন এক বনসাই হয়েই বসে ছিলাম বইয়ের পেছনের পাতায়।
লেখিকার কলমে একধরনের সংযত সৌন্দর্য আছে। যেটা এখনকার সাহিত্যে খুব কমই দেখা যায়। কোনো সংলাপ জোরে বলা হয়নি। কোনো অনুভূতি চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। সবটাই যেন হালকা ঝিরঝিরে বাতাসের মতো। চুলে লাগে, কানে বাজে, কিন্তু ধরা যায় না। এই ধরা না যাওয়ার মধ্যেই বইয়ের সবচেয়ে বড় গুণ। সবচেয়ে সার্থক দর্শন। চরিত্রগুলো আর্তনাদ করে নিঃশব্দে।
সুফাই রুমিন তাজিন এই বইতে কেবল গল্প বলেননি, তিনি পাঠককে জীবনকে ছুঁয়ে দেখার একটি আয়না দিয়েছেন। শব্দ ছিল না কোথাও বেশি, কোথাও কম—ছিল এক নিখুঁত ভারসাম্য। প্রতিটি চরিত্র যেন জীবনের প্রতিচ্ছবি, কোনো অতিনাটকীয়তা নয়, বরং এক নিস্তরঙ্গ আবেগ।
সুফাই রুমিন তাজিনের লেখা জলরঙে আঁকা অনুভূতি। শব্দ নেই অতিরিক্ত, কিন্তু প্রতিটি বাক্য যেন হৃদয়ে ঠেকে। আপনি যদি খুব মনোযোগী হন, তাহলে শুনতে পারবেন চরিত্রগুলোর নিঃশ্বাস, চিন্তার ছায়া, চোখের ভিজে কোণ, আর সেই দীর্ঘ নিঃশব্দতা, যেটা কোনো কথার থেকেও বেশি কিছু বলে।
আমাদের সমাজে "বাবা" মানেই শক্ত মেরুদণ্ড, অনড়, অপরিবর্তনীয়। কিন্তু এই বইয়ে সেই বাবার ভেতরেও ভাঙন আছে, একাকিত্ব আছে, অক্ষমতা আছে।
উপন্যাস ছোটো হলেও এক বসায় পড়ে ফেলার মতো নয়। বরং, প্রতিটি পৃষ্ঠায় থেমে যাবার মতো। শেষ পৃষ্ঠাটি পড়ার পর মনে হলো, সব কিছু বলার ছিল, কিন্তু কেউ কিছু বললো না। যেন একটা জানালা হঠাৎ খুলে গেলো ভেতরে, কুয়াশা ঢুকে পড়লো, আর আমি শুধু বসে রইলাম… চুপচাপ। এই শূন্যতায় কষ্ট নেই, বরং এক ধরনের আত্মিক পরিতৃপ্তি আছে। উপন্যাস টার শেষ অধ্যায় হয়তো আরেকটু স্লো হয়ে কিছুটা বড় হতে পারতো। মাঝখানের দিকে কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরি আরো ডিটেইলে শোনার আক্ষেপ থেকে যায়। তবু, এত মায়াবী একটা উপন্যাসের সমালোচনা করতে ইচ্ছে করে না।
উপন্যাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মাশাল। সফট-হার্টেড, মায়াবী একজন মানুষ হিসেবে দীর্ঘদিন মনে থাকার মতো একটা ব্যক্তিত্ব। লেখিকা মাশালের অস্থিরতা আর খেয়ালীপনা দারুণভাবে উপস্থাপন করলেও মাশালকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পর্দার পেছনে রেখে দিয়েছেন। অনেকগুলো মূহুর্ত গিয়েছে, মাশালের ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরি জানার কৌতূহল হয়েছে। সেই ক্ষেদটুকু লেখিকা রেখে দিয়েছেন শূন্যতার মতো।
ব্যক্তিগতভাবে...
বইটা পড়তে পড়তে আমি বারবার নিজের জীবনে ফিরছিলাম। আমার বাবার মুখ ভেসে উঠছিল, আমার নীরবতা, আমার অভিমান, আমার মায়ের কথাগুলো, যেগুলো কখনো বলা হয়নি। আমার ঘরে বনসাই নেই, কিন্তু আছে এক বোতলে পুরে রাখা শূন্যতা। সেই শূন্যতা যে অভিমানগুলোকে জন্ম দেয় সেগুলো আর কখনোই ঝেড়ে ফেলা সম্ভব না। আমি যেন বইটা পড়ছি না, বইটা আমাকে পড়ে ফেলছে। উপন্যাস শেষে মনে হলো, যেন কেউ আমার কাঁধে হাত রেখে ধীরে বললো—
"আমি খুব ভালো আছি। আনন্দ নিয়ে অপেক্ষা করছি। আমি আনন্দ নিয়ে অপেক্ষা করতে শিখে গিয়েছি।"
শেষে এসে...
সব ভালো কন্টেম্পরারি বই পড়ে কান্না পায় ব্যাপারটা এমন না। কিছু বই পড়ে বোবা হয়ে যেতে হয়। এই বইটা ঠিক তেমন। অনুভূতির ভেতরে বেঁচে থাকা, শব্দের গভীরে সাঁতার কাটা ব্যতীত হয়তো উপন্যাস টা আপনার মাঝে আর কোনো পরিবর্তন আনবেনা। কিন্তু হয়তো একটা রাত, একা বিছানায় শুয়ে, আপনি চোখ বন্ধ করে ভাববেন— "আমি কি সত্যিই ভালোবাসতে পেরেছিলাম?" আর সেই ভাবনাটাই কি যথেষ্ট না?
লেখিকার জন্য শুভ কামনা। প্রত্যাশা করি, কল্পনার জগত তৈরি করে লেখিকা যে তীব্র আনন্দ পান, সেই আনন্দের লোভে আরো বড় কলেরবে আরো ঢাউস সব ক্যানভাসে সমকাল নিয়ে লিখবেন।
৮ পৃষ্ঠায় সাদমান, আদনান হয়ে গেছে। ১২ পৃষ্ঠায় এই ক্ষনটির ও জন্য এর জায়গায় ‘’এই ক্ষনটির জন্য ও অপেক্ষা করছে’’ হবে। খুবই অল্পকিছু ত্রুটি আছে যা অবশ্যই ১০% এর নিচে। আগেই বলেছি, খুব ভালো বই এর সমালোচনা করতে ইচ্ছে করে না। এতটুক আগ্রাহ্য করা যায়, লেখিকার জন্য শুভকামনা...
নামেই আছে বনসাইয়ের কথা। একটু চিন্তা করে দেখলে বুঝবেন, বনসাই আর মানুষের জীবনের কিন্তু অনেক মিল। এই যেমন বনসাইয়ের শিকড় টবের মাটি আঁকড়ে থাকে, তেমনি মানুষের সম্ভাবনা, স্বপ্নগুলো আটকে যায় বাস্তবতার দেয়ালে। আমাদের জন্মস্থান, শরীর, সময় কিংবা পরিস্থিতি আমাদের পরিসর ঠিক করে দেয়। তবু দক্ষ বনসাই শিল্পী যেমন জানেন, পরিপূর্ণ মানুষও জানে, সীমার ভেতর থেকেও মহিমা বিকশিত করা যায়। বন্দিত্বে সে শুকিয়ে যায় না, বরং সীমার মধ্যেই নিজের সৌন্দর্য আবিষ্কার করে।
আবার একটা বনসাই গড়ে তুলতে অনেকসময় সুস্থ ডালও কেটে ফেলতে হয়। এটাও কি আমাদের জীবনের মতো না? সামনে এগিয়ে যেতে আমরা কত পুরোনো অভ্যাস পেছনে ফেলে আসি, নতুন পথ বেছে নেই।
গাছের গায়ে যেমন কাটার দাগ থেকে যায়, মানুষের মনেও তেমনই দাগ পড়ে। অনেকসময় দাগ পড়ে শরীরেও। আমাদের গড়ন তৈরি হয় ক্ষতির ধারালো কাঁচিতে।
বনসাই নিয়ে এত কথা বলার কারণ এই বইটা। এইটা পড়া শেষ হলেই বুঝতে পারবেন কেন বনসাই নিয়ে এত কথা বললাম। . .
লেখকের গল্প বলার ধরন খুবই সাবলীল ও সুন্দর। এক বসায় শেষ করা যাবে এমন লেখা। আর যেভাবে এত সুন্দর করে পুরো পরিবারটার কাহিনী এই ছোট কলেবরে তুলে ধরেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
কিন্তু আমি রেটিং-এ এক তারা কম দিবো। কারণ উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদের লেখার ছাপ আছে। পড়তে যেয়ে বারবার এই ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু লাগছিল। আমি জানি না কেন বেশিরভাগ বাংলাদেশী লেখকেরা এখনো এই ধরনের লেখা থেকে বেরিয়ে নিজস্ব লেখার ধরন বের করছেন না।
সুদূর পরবাসে মাঈশা বিয়ে করতে যাচ্ছে, তবে তার আগে সে চায় বাংলাদেশে থাকা তার জন্মদাতা পিতার সাথে আরেকটাবার দেখা করতে। যে বাবা তাকে ছোট বেলায় আদরে আদরে মাথায় তুলে রাখতেন, তিনি কেন তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে হবে তাকে। বাবা তাকে দেখলে কী করবেন? তিনি কি মাঈশাকে বুকে জড়িয়ে নিবেন? নাকি স্রেফ অনুভূতিহীন চোখে তাকিয়ে থাকবেন। এমন অনেক প্রশ্ন নিয়ে দেশে পা রাখল দূর্ভাগা মেয়েটা।
বন্ধু মহলে আমি অতিরিক্ত আবেগী হিসাবে পরিচিত। হুটহাট বইয়ে আবেগী দৃশ্য আসলে প্রায়ই চোখ ভিজে উঠে। বনসাই গাছ বইটা সেই তুলনায় আরো এক কাঠি সরেস। আমি নিশ্চিত কঠিন হৃদয়ের মানুষেরও চোখ ভিজে উঠতে বাধ্য বইটা পড়তে গিয়ে। তা কি এমন আছে বইয়ে?
চরিত্রায়ন
এই বইয়ের গল্পটা খুব খুব সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ গল্পটাই অসাধারণ হয়ে উঠেছে দুটো কারনে। এক, লেখিকার লিখনশৈলী। দুই, উনার কারেক্টারাইজেশন। বইয়ে আসা প্রায় প্রতিটা চরিত্রকে আপনি মানসচক্ষে দেখতে পাবেন, তাদেরকে অনুভব করতে পারবেন; এতোটাই বাস্তবভাবে তাদেরকে উপস্থাপন করেছেন লেখিকা। নিঃসন্দেহে বইয়ের সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র মাশাল। আমি নিশ্চিত এই বইটা পড়লে প্রতিটা মেয়ে মাশালের মতো হতে চাইবে। নামটা কিছুটা অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু ছাপার অক্ষরের এই মাশাল মেয়েটার কথা আমার দীর্ঘদিন মনে থাকবে।
এরপর মাঈশার কথা তো বলতেই হয়, যদিও সে বইয়ে ২৫ বছরের যুবতী। কিন্তু আমি তাকে দেখেছি তার সেই শিশুবেলার রূপে! যে সময়টায় সে তার বাবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। আহারে মেয়েটা!! কী কষ্ট! কী মায়া!! লেখিকা এই মেয়েটিকে এঁকেছেন প্রবল মায়াবতী রূপে। কিছুটা দ্বিধান্বিত, প্রচণ্ড দুঃখী আর খানিকটা বেপোরোয়া; কিন্তু সবটাই মায়া দিয়ে মোড়ানো।
এছাড়াও আছেন তহুরা বেগম, যে বৃদ্ধা সবচেয়ে বেশি কেঁদেছেন, সবচেয়ে বেশি কাঁদিয়েছেন। আছেন আজমেরি, আসাদ, রাফিয়া, এবং আহাদ। প্রতিটা চরিত্র অত্যন্ত যত্ন নিয়ে গড়া। কেউ প্রবল ব্যক্তিত্ববান, কারো কঠিন হৃদয়, তো কেউ বা কোমল হৃদয়ের। কেউ জীবন কাটাচ্ছে বৈষয়িক বিষয়াদি নিয়ে মিত্ত হয়ে, কেউ বা উড়নচণ্ডী, কোনো কিছুকেই পাত্তা দেয় না। এমনকি বইতে আসা যাওয়ার মধ্যে থাকা সামান্য সময়ের চরিত্রগুলোও নিজেদের অনেক কাছের মানুষ বলে মনে হবে। আর এ সবকিছু লেখিকা করে ফেলেছেন মাত্র ১২৫ পাতার মাঝে। এটা ইঙ্গিত করে লেখিকার লেখার হাত যথেষ্ট শক্তিশালী।
গ্রামের বাড়ির বিয়ে
শুধু কি চরিত্রায়ন? বইতে যে গল্পটা লিখতে চেয়েছেন তার পরিবেশটাও তৈরি করেছেন নিপুন দক্ষতায়। গ্রামের বাড়ির বিয়ে পড়তে গিয়ে যেন ফিরে গিয়েছিলাম নিজের শৈশব, কৈশোরের সময়টায়। বইয়ের শুরুটা একটু এলোমেলো। মানে কোন চরিত্র কে কোথায় আছে, বাবা কিংবা আব্বু জনিত বিভ্রান্তি আর কেন কি হচ্ছে তা বুঝতে একটুখানি সময় চলে যায়। কিন্তু এরপর বইটাতে যা আছে তা এমন একটা গল্প যার মাঝে হাসি, ভালোবাসা, দুঃখ, মায়া সবটাই খুঁজে পাবে পাঠক।
বইয়ের শেষটা নিয়ে মনে কিঞ্চিৎ হতাশা আছে। এন্ডিং হয়তো এমনই হতো, কিন্তু আহাদ সাহেবের আচরণ বা সিদ্ধান্ত আসলে মানার মতো না। মানুষ প্রবল দুঃখে পড়লে খড়কুটোর মতো পরিবারকে আগলে রাখতে চায়। আর এই লোক কি না...!! আরেকটা আফসোস হলো, যে আবেগের ফুলঝুরি গোটা বই জুড়ে ছড়িয়ে ছিল, শেষের দিকে সেটাও অনুপস্থিত থাকা। দুঃখের চাদরে মোড়ানো আবেগকে দারুণভাবে আনলেও, সুখের আবেশের আবেগটুকু ঠিকঠাক প্রস্ফুটিত হয়নি বলে মনে হয়েছে আমার কাছে।
ব্যক্তিগত রেটিং: ০৯/১০ (আমার মনের অনেক অনেক কাছের বই এটা। আমি দুঃখবিলাসী মানুষ।আর তাই আমি হয়তো প্রায়ই বইটা উল্টেপাল্টে পড়ব)
পুনশ্চ: এই বইটার জন্য লেখককে আন্তরিক ধন্যবাদ। কেন এই ধন্যবাদ, তা আমার মনেই থাকুক। আপাতত বইয়ের একটুখানি অংশ এখানে তুলে ধরি,
মাঈশা মাথা নিচু করে বসে। ওনারা বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকেন। স্বাভাবিক থাকার জন্য নিজেদের সাথে নিজেরা যেন যুদ্ধ করে যাচ্ছে। কেউ যেন কিছু বুঝে উঠতে পারছে না কী কথা বলবে। অনেক কষ্টে আহাদ সাহেব বলেন, "তুই আমার কাছে একটু আসবি।" মাঈশা অবাক হয়ে তাকায়। তারপর দ্রুত গতিতে ওর বাবার দিকে ছুটে যায়। ওনার কোলে মাথা রেখে শব্দ করে কেঁদে ওঠে। নিজের সাথে করা প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে যায়। মাঈশা কাঁদতে থাকে। এত বছরের অবরুদ্ধ চোখের পানি থামতেও চাইছে না। বন্যার স্রোতের মতো বয়ে যাচ্ছে। ও কান্না থামানোর চেষ্টাও করে না। চোখের নোনা পানিই হয়তো ওকে স্বাভাবিক হতে সাহায্য করবে। কান্নার মাঝে মাঝে অস্ফুট কণ্ঠে ও শুধু একটি শব্দই উচ্চারণ করছে, “বাবা...বাবা...।” কত কথা, কত প্রশ্ন ওর মনে জমা হয়ে আছে কিন্তু ও কিছুই বলতে পারে না। শুধু কাঁদতে থাকে। বিরামহীন কান্না। আহাদ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে শূন্যদৃষ্���িতে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
"আচ্ছা মানুষ কি সবসময় বুঝতে পারে আসলে সে কি চায়। ওর নিজের কী চাওয়া তা কি ও জানে? কখনও মনে হয় জানে আবার কখনও মনে হয় জানে না।"
শুক্রবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি রাত ২:১৮।
এই গভীর রাতে শেষ করে ফেললাম এমন একটা সাধারণ বই যা লেখনীর জন্যে সুন্দর লেগেছে। বাবা-মেয়ের একটা সুন্দর ছোট গল্প। যার প্রত্যেকটা শব্দে খুঁজে পেয়েছি মায়া।
পঁচিশ বছরের তরুণী মাঈশা প্রায় এক যুগ পরে বাংলাদেশে এসেছে তার বাবার সাথে দেখা করতে। বাবা মায়ের আলাদা হয়ে যাবার পরে কেটে গেছে বারোটা বছর। এই দীর্ঘ সময় পরে বাবার সামনে দাঁড়াতে কেমন লাগবে? তার বাবার প্রতিক্রিয়াটাই কিরকম হবে? সবকিছু সুন্দর হয়ে যাবে তো? সম্পর্কটা সাবলীলই থাকবে তো? বাবা-মেয়ের এই সুন্দর সম্পর্কের বিষয়ে জানতে হলে পড়তে হবে বইটা।
সুফাই রুমিন তাজিনের বই এর আগে কখনো পড়া হয়নি আমার। এইটাই প্রথম। বইটা কিনেছিলাম প্রচ্ছদ দেখে। প্রচ্ছদটা চমৎকার লেগেছিলো। বইটা পড়লাম। বইটাও বেশ সুন্দর। লেখার ধরনটা খুব সুন্দর। একটা আপন আপন ফিল পাওয়া যায় লেখার মধ্যে। পড়লে আরাম লাগে।
সবমিলিয়ে, বেশ সুন্দর গোছানো একটা বই। এক বসাতেই শেষ করে ফেলতে পারবেন। পড়ে ফেলেন। ভালো লাগবে।
হুমায়ূন আহমেদ অতি রুপবতী, মায়াবতী তরুণী শব্দগুলো এমনভাবে পাঠকের মাথায় গেথে দিয়েছেন যে কোন বইতে এই শব্দগুলো দেখলেই হুমায়ূনীয় প্রভাব মনে হয়। যাহোক এ বছরের প্রথম বই এটা। পড়তে বেস ভালোই লেগেছে। লেখার স্টাইল ভালো, গদ্য সুন্দর ও সাবলীল, ইমোশনাল কাহিনী। তবে একটা সংসার ভাংগার জন্য, একজন পিতার তার একমাত্র কন্যাকে দূরে ঢেলে দেওয়ার জন্য যেসরকম সিরিয়াস কারন থাকবে বলে আশা করেছিলাম শেষে গিয়ে কারনটাকে সেরকম সিরিয়াস লাগে নি। তবে যে কারন দেখানো হয়েছে সেটাও কম সিরিয়াস না। সম্পর্কের মধ্যে সমস্যা থাকলে মন খুলে আলাপ করুন। সেখানেই অর্ধেক সমাধান হয়ে যাবে। তবে বেকুবীর কোন সমাধান নাই।
❛কাটেনা সময় যখন আর কিছুতে বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না জানালার গ্রিলটাতে ঠেকাই মাথা মনে হয় বাবার মত কেউ বলে না, আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়।❜
এই দুনিয়ায় বাপ-বেটির সম্পর্ক হলো সবথেকে স্নিগ্ধ, মধুর। কন্যার প্রতি বাবার ভালোবাসার সাথে তুলনা চলে এমন কিছু এই জগতে নেই। বাবার রাজকন্যা হয়ে থাকে প্রতিটি মেয়ে। বাবার দুঃখে যেমন মেয়ে ছটফটিয়ে উঠে, তেমনি কন্যার যেকোনো প্রয়োজনে ঢাল হিসেবে থাকে বাবা। কিন্তু জীবন কখনো ধ্রুব এই সত্যকে বদলে দেয়। বাস্তবতা অনেক কঠিন। জীবন কখনো এমন মোড়ে এসে দাঁড়ায় যেখানে সম্পর্কগুলো বদলে যায়। সেটা কখনো ইচ্ছাকৃত আবার কখনো প্রকৃতির নিয়মের কাছে ইচ্ছাকে বিলীন করার মতো। পারিবারিক বন্ধন, ভালোবাসা একটা আশীর্বাদ। বাঙালির ঐতিহ্য একান্নবর্তী পরিবার। সেখানে সবাই মিলেমিশে কেমন কোলাহলে থাকে, এই কোলাহলের মধুরতা পৃথিবীর কোনো সঙ্গীত দিতে পারে না। কিন্তু সুন্দর এই অভিজ্ঞতা কি সবার জীবনে হয়?
মাঈশা বাইরে থেকে বেশ সুখী এবং পূর্ণতা ভর্তি জীবনের একটি মেয়ে। মা, আব্বু, দুই ছোটো বোন নিয়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে থাকছে। সম্পর্ক আছে খালাতো ভাই সাদমানের সাথে। সামনে তাদের মালাবদলের কথাও আছে। সুন্দর একটা পরিবার, একজন সঙ্গী আর কী লাগে সুখের জন্য? কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে বাইরে থেকে যাকে সুখী মনে হয় তার ভেতরে যে এক অসীম পরিমাণ শূন্যতা আর দুঃখের বাস হতে পারে সে খবর কেই বা রাখে? মাঈশার ছন্দের জীবনে একটা সুর কেটে গেছে সেই ছোট্টকালেই। মা-বাবা আর অন্যান্যদের নিয়ে বেহেশতী সুখের এক পরিবার ছিল তার। কিন্তু একটা দুর্ঘটনায় সব যেন তছনছ হয়ে গেল। যে বাবা মাঈশাকে কলিজার টুকরা মনে করতেন, দুর্ঘটনার পর সেই বাবাই যেন প্রাণাধিক প্রিয় কন্যাকে সহ্য করতে পারতেন না। অসহ্য ঠেকছিল এককালের মানিকজোড় উপাধি পাওয়া স্ত্রীকেও। কেন এই পরিবর্তন?
আট কিংবা নয় বছর বয়সে বাবাকে ছেড়ে মায়ের হাত ধরে নতুন এক জীবনের শুরু করেছিল সে। কিন্তু বাবার সেই অবহেলা ভুলেনি। তেমনি কমেনি বাবার প্রতি ভালোবাসা। যাকে সে আব্বু বলে আদতে সে মাঈশার সৎ বাবা। কিন্তু আপন সন্তানের থেকেও বেশি ভালোবাসা আর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি মাঈশাকে। তবুও র ক্ত তো র ক্তই। আব্বুকে সে সম্মান করে কিন্তু আপন বাবার জায়গাটা দিতে পারেনি। অনেক পরিকল্পনা করে মাঈশা এবার ঠিক করেছে বাবার মুখোমুখি হবে আবার। কেন সেই রাগ আর অবহেলা করেছিল তার পিতা তাকে? কারণ কী ছিল সেই আচরণের? তবে ভয় এখনো আছে গেলেই কি পিতা তাকে আপন করে নিবেন? সতেরো বছর অনেক বেশি দীর্ঘ এক সময়! মাঈশা দেশে এসেছে। ভেতরে কোনো আনন্দ বা উত্তেজনা নেই। আছে একরাশ শূন্যতা। দুঃখী এই মেয়েটির প্রতি বিধাতা কি এবার সদয় হবেন? পিতা আহাদ নিজেকে বন্দী করে ফেলেছেন একটা কক্ষে। যেখানে একটা হুইলচেয়ার, অসংখ্য বই আর বনসাই গাছ তার সঙ্গী। মেয়ের মুখোমুখি হবেন কি তিনি? পারিবারিক বন্ধন, ভালোবাসা সবকিছু ছাপিয়ে পিতা আর কন্যার পুনর্মিলনী কেমন হবে? নীরব বাড়িটা আবার প্রাণ ফিরে পাক, বন্ধ জানালা খুলে যাক এইতো চাওয়া।
❛আয়রে আমার সাথে গান গেয়ে যা নতুন নতুন সুর নে শিখে নে.... গরম কফির মজা জুড়িয়ে যায় কবিতার বইগুলো ছুঁড়ে ফেলি মনে হয় বাবা যদি বলতো আমায়, আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়।❜
এরকম একটা সময় কি পাবে মায়াবতী তরুণীটি? অতীত খুঁড়তে গেলে অনেক সত্য বেরিয়ে আসে যা অনেকসময় সুখের হয়না। তবুও মানুষ অতীত খুঁড়ে। সেই আশা নিয়েই হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। যে মানুষটা অনেক বিশালতা নিয়েও নিজেকে বনসাইয়ের মতো আবদ্ধ করে রেখেছে সে কি পাবে মুক্তির স্বাদ?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝আমি এবং একটি বনসাই গাছ❞ সুফাই রুমিন তাজিনের লেখা বিষন্ন সুন্দর একটা উপন্যাসিকা। উপন্যাসিকার কাহিনি সামাজিক, যাপিত জীবনের কোনো ঘটনাকে নিয়েই। কিন্তু সাধারণ ঘটনাও লেখার গুণে অসাধারণ হয়ে যায়। এতটাই অসাধারণ হয় যে পড়ার পর কেমন শূন্যতা বিরাজ করে। কিছুই ঘটেনি কিন্তু কী জানি একটা পরিবর্তন হয়ে গেল এমন অনুভূতি হয়। এই বইটিও তেমন। এক কন্যা যে সতেরোটা বছর তৃষ্ণার্ত ছিল পিতার আদরের, এক পিতা যে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন বছরের পর পর ধরে। এক মা যিনি সন্তানের জন্য কঠোর এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। উপন্যাসিকার শুরুটা খুব সুন্দর। মাঈশার বাবার প্রতি ভালোবাসা আর নিজেকে ফিরে পাওয়ার গল্প এত দারুণভাবে বর্ণনা হয়েছে যে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। কিছু গল্প আছে নিজের সাথে রিলেট করা যায়। এই উপন্যাসিকায় নিজের অতীত যেন ভেসে উঠেছিল। স্মৃতির পাতায় আমিও হারিয়ে গিয়েছিলাম বনেদী বাড়ির সেই কোলাহলে। পিতা কন্যার সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে এখানে এসেছে অসাধারণ সুন্দর এক পরিবারের বর্ণনা। যেখানে সবাই একত্র হয়ে আনন্দ করছে। নিশ��চুপ বাড়ি পরিবারের সদস্যেদের আগমনে গমগম করছে। পারিবারিক বন্ধন এত সুন্দর করে বর্ণনা করেছেন যেন সব নিজের চোখেই দেখছিলাম। উপলব্ধি করতে পারছিলাম নিজের ছেলেবেলা। একটা সময় আমার বাড়ি ছিল কোলাহলের কেন্দ্রবিন্দু। সপ্তাহান্তে পরিবারের সবাই আসতো ঈদ ঈদ একটা খুশি বিরাজ করতো। হাসি আনন্দে কেটে যেত। পরিবারের সবার মধ্যে মিলের সাথে কিছুটা টানাপোড়ন থাকে সেটাও এখানে খুব সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। প্রশংসনীয় একটা দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে। সৎ পিতা মানেই যেন অবহেলা করছে এই বিশ্বাসকে একদম বদলে দিয়েছেন। সৎ কন্যার জন্য নিখাঁদ ভালোবাসা আর তাকে গুরুত্ব দেয়ার অদ্ভুত সুন্দর চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন গল্পের মাধ্যমে। পরিবারের সকলের একত্র হওয়া, বহু বছর পর দাদীর তার নাতনিকে চোখের সামনে দেখার পরের অনুভূতি, কলাপাতা রংয়ের শাড়িতে দুই তরুণীর বাড়িময় বিচরণ এই দৃশ্যগুলো চোখের শান্তি, পড়ার তৃপ্তি।
YJHD এর bunny এর মতো ঐ বর্ণনা গুলোতে আমারও বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, ❛আগার মেরে পাস দিল হোতা তো পাক্কা ইয়ে সিন দেখকার রো দেতি❜ (মডিফাইড আরকি!)
একটা ভেঙে যাওয়া পরিবারের মধ্যেও যে বন্ধন থাকে, কুটিলতা বর্জিতভাবেও যে থাকা যায় তা এই ছোট্ট উপন্যাসিকার মধ্যে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। টানাপোড়ন সত্ত্বেও জাদুর মতো কারো উপস্থিতিতে যেন সবকিছু প্রাণ ফিরে পাচ্ছিলো। শেষটা খুব সুন্দর। সত্য তিক্ত হলেও সে সত্যির মাধ্যমে ইতি বেশ নির্মল। হয়তো বিধাতার ইচ্ছাই ছিল এটা।
চরিত্র:
মাঈশা চরিত্রটা খুবই সুন্দর। নির্মল, স্নিগ্ধ, মায়াবতী। এমন ভালোবাসায় ভর্তি চরিত্রের প্রতি গল্পে সুবিচার হয়েছে। তাকে কল্পনা করতে পারা গেছে। তার অনুভূতিগুলো উপলব্ধি করা গেছে।
গল্পের জাদুর কাঠির মতো এক চরিত্র ছিল মাশাল। এত প্রাণবন্ত এক তরুণী যে কিনা নিজের পরশে সবাইকে রাঙিয়ে দেয়। যে সবার বন্ধু। যার সামনে নিজেকে মেলে ধরা যায়। এই চরিত্রটা পুরো উপন্যাসের প্রাণ ছিল।
আহাদ চরিত্রটা রূপক সেই বনসাইয়ের মতোই ছিল। বিশালতার মাঝেও ক্ষুদ্র হয়ে ছিলেন। ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব, আবেগ আর অভিমানের মিশেলে তৈরি।
এখানে না বললেই নয় রাফিয়া চরিত্র নিয়ে। তাকে কিছুটা নেগেটিভ দেখালেও তার ব্যক্তিত্বের ভালো দিকগুলো হালকা ঐ খারাপ দিককে ঢেকে দিয়েছে। ওইটুক খারাপ কি যৌক্তিক ছিল না? মানুষ স্বার্থ ছাড়া ত্যাগ স্বীকার করে না। সেখানে রাফিয়ার আচরণ ভুল নয়। তাকে বেশ লেগেছে।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
বইটার প্রচ্ছদ স্নিগ্ধ। বইতে মুদ্রণ প্রমাদ লক্ষ্য করা গেছে। মাঈশা আর মাশার নামের ক্ষেত্রে অল্প জায়গায় পেঁচিয়ে গেছিলো।
❛পরিবার এক বন্ধনের নাম। এই বন্ধন কখনো সুর কেটে গিয়ে থমকে যায়। কিন্তু ইচ্ছা আর ভালবাসাই পারে সব বাঁধাকে টপকে সুখের সন্ধান দিতে। পরিবারের অনেকগুলো ভালোবাসার একক বন্ধন।❜
কিছু কিছু বই থাকে, যা শুধু গল্প বলে না—সে অনুভূতি ছুঁয়ে যায়, শূন্যতা জাগিয়ে তোলে, পুরনো কিছু প্রশ্নকে আবার নতুন করে সামনে এনে দেয়।সুফাই রুমিন তাজিনের "আমি এবং একটি বনসাই গাছ" পড়তে পড়তে মনে হলো, এটা যেন একটা নরম অথচ গভীর অনুভূতির গল্প, যেখানে সম্পর্কের জটিলতা, আত্মোপলব্ধি আর হারিয়ে যাওয়া দিনের দীর্ঘশ্বাস একসাথে জড়িয়ে আছে। বইটা পড়ার পর থেকেই মনে হচ্ছিল, এটা শুধু একটা উপন্যাস নয়, বরং একটা দীর্ঘ চিঠি—একজন মেয়ে তার বাবাকে লিখেছে, কিংবা একজন বাবা তার হারিয়ে যাওয়া মেয়ের উদ্দেশে রেখে গেছে।এ গল্পটা যেন আমাদের সবার, আমাদের বাবাদের, আমাদের ফেলে আসা শৈশবের।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মাঈশা, যে প্রায় এক যুগ পর বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এসেছে, একা, কিন্তু হৃদয়ে জমে থাকা হাজারো প্রশ্ন নিয়ে। ছোটবেলায় তার বাবা ছিলেন তার পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানুষ, কিন্তু একটা সময়ের পর সেই মানুষটাই যেন দূরের কেউ হয়ে গেল। কেন? কী এমন ঘটেছিল যে বাবা-মেয়ের মাঝে একটা অদৃশ্য দেয়াল গড়ে উঠল? সেই দেয়াল কি কখনো ভাঙবে? নাকি দূরত্বটা থেকে যাবে চিরকাল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই বইয়ের পাতায় হারিয়ে যেতে হয়। মাঈশা তার বাবার সামনে দাঁড়ানোর আগে বারবার ভাবতে থাকে, বাবা কি তাকে আগের মতো ভালোবাসবে? তাকে দেখেই কি বুকে টেনে নেবে, নাকি সেই চেনা গাম্ভীর্য আর কঠিন মুখাবয়ব নিয়েই বসে থাকবে? সম্পর্কের এই জটিলতার মধ্যে একটা ছোট্ট বনসাই গাছ বারবার উঠে আসে, যা প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় তাদের সম্পর্কের—বেঁচে আছে, কিন্তু পূর্ণ বিকাশ ঘটতে পারেনি, শিকড় গেড়েছে, কিন্তু বড় হতে পারেনি।
সুফাই রুমিন তাজিনের লেখার একটা চমৎকার গুণ আছে—তিনি খুব সাধারণ ভাষায়, কিন্তু গভীর আবেগে গল্প বলতে পারেন। এই বইতে তিনি খুব সহজভাবে বাবার-মেয়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখিয়েছেন। সম্পর্ক কখনো সরলরেখায় চলে না, মাঝেমাঝে বাঁক নেয়, কখনো বা থেমে যায়। মাঈশার গল্প আমাদের নিজেদের সম্পর্কগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়—আমাদের বাবাদের, মায়েদের, হারিয়ে যাওয়া শৈশবের কথা।
লেখক এক জায়গায় লিখেছেন: "ওই যে বললাম বাবারা কেমন হয়, সেটাই ভুলে গিয়েছি।" এই একটা লাইনই যেন পুরো গল্পের সারসংক্ষেপ। সময়ের সাথে সাথে আমরা বড় হই, দূরে চলে যাই, অথচ আমাদের বাবা-মায়েরা ঠিক সেখানেই থেকে যান, হয়তো একটু বদলে যান, কিন্তু মূলত তারা একই থাকেন। সম্পর্কগুলোও তাই—দূরত্ব বাড়ে, কষ্ট জমে, কিন্তু একসময় বোঝা যায়, ভালোবাসা আসলে কোথাও হারিয়ে যায় না, শুধু প্রকাশের ভাষাটা বদলে যায়।
এই উপন্যাস শুধু একটা বাবার-মেয়ের গল্প না, এটা আমাদের সবার গল্প। জীবনের ব্যস্ততায় আমরা অনেক সম্পর্কের যত্ন নিতে পারি না, অভিমান জমতে জমতে একসময় দেওয়াল হয়ে যায়। কিন্তু সম্পর্কের শিকড় থাকলে, একটু যত্ন নিলেই আবার সেটা নতুন পাতায় ভরে ওঠে।
"আমি এবং একটি বনসাই গাছ" পড়তে পড়তে আপনারও হয়তো নিজের বাবার কথা মনে পড়বে, হয়তো পুরনো কোনো সম্পর্কের কথা, যেটার যত্ন নেওয়া দরকার ছিল। বইটা শেষ করার পর একটা শূন্যতা কাজ করে, আবার একটা তৃপ্তিও আসে—কিছু গল্পের শেষ হয় না, শুধু মানুষ বদলায়, সময় বদলায়।এই বই পড়তে গিয়ে আমি বারবার থেমেছি, ভেবেছি, কিছু কিছু লাইন ফিরে গিয়ে আবার পড়েছি। মাঈশার মতোই হয়তো আমরাও জীবনের কোনো না কোনো মোড়ে দাঁড়িয়ে আমাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে ফাঁকা হয়ে যাওয়া দূরত্বটা অনুভব করেছি, কিংবা হয়তো এমন একসময় এসেছে, যখন অনুভব করেছি যে ভালোবাসা থেকেও যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। এই বই সেই অনুভূতিগুলোকে তুলে আনে খুব সহজ, কিন্তু হৃদয়গ্রাহী ভাষায়।
এক জীবনে মানুষের অপূর্ণতার গল্প শেষ হওয়ার নয়। যেখানে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মেলে না। মান-অভিমানের পাহাড় জমে। মানুষটার জীবনে যতটুকু যায়, তার অনেকটাই পাওয়া হয় না। কত প্রশ্ন জমে থাকে, যার উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না। তবুও মানুষকে চলতে হয় ভারসাম্য রক্ষা করে। কেউ কেউ খুঁজে পেতে চেষ্টা করে কাঙ্ক্ষিত ���ত্তর। হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব না। কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বোধহয় উচিতও না। তবুও নিজের জীবনের লক্ষ্য থেকে মানুষ এক পা-ও বিচ্যুত হয় না।
মাঈশা তেমনই এক লক্ষ্য নিয়ে যেন এগিয়ে চলেছে। আপাত দৃষ্টিতে মানুষকে সুখী মনে হলেও তার সুখ কতটা সেটা কেউ জানে না। জানা সম্ভব নয়। মনের মধ্যে গুমরে থাকা সুখের অসুখ যেন বাড়তে বাড়তে ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেহে ও মনে। মাঈশাকে দেখলে সুখী মনে হয়। সে দেশের বাইরে থাকে। তার একটা পরিবার আছে। মা আছে, আব্বু আছে, ছোট দুই বোন আছে। যারা তাকে খুব ভালোবাসে। মা আগলে রাখে, আব্বু স্নেহ করে, দুই বোন যেন বড় আপুর প্রতি অন্তঃপ্রাণ। তবুও কোথাও যেন কিছু একটা নেই। মাঈশার পৃথিবীতে এক শূন্যতার বিচরণ। যা পূরণ করার ক্ষমতা কারো নেই।
মাঈশা যাকে আব্বু বলে ডাকে, তিনি তার নিজের বাবা নন। সৎ বাবা হলেও আদরে কোনো কমতি রাখেনি। তবুও মাঈশা নিজের বাবাকে খোঁজে। জীবনের পঁচিশ বসন্ত পেরিয়ে তাই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। নিজের বাবার কাছে থাকার ইচ্ছা তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
মাঈশার যখন আট বছর, ঠিক তখন সে তার বাবাকে ছেড়ে চলে আসে। একটি দুর্ঘটনা সে সময়ে তার মা ও বাবার বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মা মেয়েকে নিয়ে তাই নতুন স্বামীর সাথে দেশ পেরিয়ে এই বিদেশে এসে থিতু হয়। ছোট্ট মাঈশার পুরো পৃথিবী ভেঙে পড়ে। সবার চাপিয়ে দেওয়া পৃথিবীতে সে একটু একটু করে বড় হতে থাকে। কেউ জানতেও চায় না মাঈশা কী চায়, তার পৃথিবী কীভাবে রাঙাতে চায়।
তাই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠা পরিপূর্ণ নারী মাঈশা নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশে ফেরার। বিয়ের আগে বাবার সাথে থাকার ইচ্ছে তীব্র। নিজের পৈত্রিক ভিটেমাটির স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু দ্বিধা এক জায়গাতেই। তার বাবা কি তাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেবে? কত বছর হয়ে গেল, একবারও যে দেখা পর্যন্ত করেনি। মেয়েকে বুকে টেনে নেয়নি। এত বছর পর আবেগ অনুভূতির যদি মৃত্যু হয়?
বাবার চোখের নির্লিপ্ততা যে সহ্য করতে পারবে না মাঈশা। তার দাদী, ফুফু, চাচা তাকে কি আগের মতো ভালোবাসবে? মাহিন ভাইয়া, মাশাল আগের মতো তাকে গুরুত্ব দেবে? শঙ্কা, উৎকণ্ঠায় যে সময়টা পার করছে মাঈশা সেই সময়টার মুখোমুখি তাকে হতেই হবে। সময়ই বলে দেবে তার এই পরিবারে জায়গা কতটুকু, আর কতটা দূরে সরে গিয়েছে।
◾পাঠ প্রতিক্রিয়া :
কিছু কিছু বই থাকে, যে বই শেষ করার পর অদ্ভুত ঘোরলাগা কাজ করে। এক ধরনের তৃপ্তি অনুভূত হয়। এই সময়টা অন্য কোনো বই পড়তে ইচ্ছা করে না। অন্য কোনো কিছু মাথায় রাখতে ইচ্ছা করে না। “আমি এবং একটি বনসাই গাছ” তেমনই একটি বই। গল্পটা খুবই সাধারণ। আহামরি কোনো কিছু ছিল না। তবুও এই সাধারণ গল্পটি অসাধারণ হয়ে উঠেছিল শুধু মাত্র লেখিকার লেখনশৈলীর শক্তিতে।
সুফাই রুমিন তাজিমের লেখনশৈলী দুর্দান্ত। খুবই সাধারণ গল্প তিনি যেমন অসাধারণত্বের মোড়কে জড়িয়ে ধরতে পারেন, তেমনি পাঠকের সাথে গল্পের এক ধরনের সংযোগ স্থাপন করতে পারেন। আর এই সংযোগের কারণে গল্পের সাথে পাঠকেরও আবেগে ভেসে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
“আমি এবং একটি বনসাই গাছ” আগাগোড়া আবেগ জড়ানো এক গল্প। বাবা-মেয়ের গল্প, পারিবারিক ভাতৃত্ববোধের গল্প। যে গল্প কখনও হাসায়, কখনও কাঁদায়। কখনও ভাবায় জীবনের এই পুরো পথ জুড়ে প্রাপ্তির সংখ্যাটা কী? প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতায় এই অপ্রাপ্তির সংখ্যায় কতটা ভুল মিশে আছে এই পথ জুড়ে। সুফাই রুমিন তাজিমের এই বইটা যেন ছড়িয়ে আছে মানুষের অনুভূতিতে, তাদের ভাবনাতে।
বাহ্যিক ব্যবহার ও দৃষ্টিতে একজন মানুষকে খুব সহজে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু তার মনের ভেতরে কী তোলপাড় চলে সেটা আমরা কেউ জানি না। এই সমাজে আমরা প্রত্যেকে অভিনয় করে টিকে আছি। এই অভিনয়ের যাত্রাটা ভিন্ন। মানুষ ভেদে ধরনও ভিন্ন হয়। বাবা-মায়ের সাথে যেমন অভিনয় করি, সন্তানের সাথে সেই অভিনয় অন্যরকম হয়। নিজেদের প্রকৃত অনুভূতি আড়ালে রেখে হয়তো জিতে যাওয়া যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পরাজয় এখানে অনুমেয়।
বইটির সবচেয়ে দুর্দান্ত যে বিষয় আমার লেগেছে সেটা হলো পারিবারিক মিলনমেলা। পরিবারের মেয়ে যে এতবছর দেশের বাইরে ছিল, তাও সৎ বাবার সাথে; তার সাথে বন্ধনের দৃঢ়তা দেখানো হয়েছে, আবেগ জড়ানো এ বন্ধন যেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। দূরত্ব সম্পর্কের বাঁধনে কখনও বাঁধা হতে পারে না। ভালোবাসা সবসময় একই থাকে। প্রকাশ হয়তো হয় না, তবুও ঠিকই প্রকাশ পায়।
সব ছাপিয়ে এই বইটির গুরুত্বপুর্ণ ছিল বাবা, মা ও মেয়ের অনুভূতি। বাবার প্রতি মেয়ের ভালোবাসা, অভিমান; মেয়ের প্রতি বাবার আবেগ, কেন মেয়েকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা; কেন মা তার মেয়ের প্রিয় বাবাকে ছেড়ে চলে গেল, করি ছিল এর কারণ — প্রতিটি মানুষের মনস্তত্ত্ব এখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। সৎ বাবা হলেই যে সে খারাপ হবে, কিংবা অবহেলা করবে; এই ধারণা ভুল। তারাও ভালবাসতে পারে, মায়ায় জড়াতে পারে। কিন্তু তারপরও নিজের বাবার জায়গা কি নিতে পারে? এখানে সূক্ষ্ম কিছু বিষয়, মানুষের অহংকার কিংবা ঈর্ষা যে কত বড় ভুলের কারণ হতে পারে বইটি যেন তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
সুফাই রুমিন তাজিমের লেখা পড়ে হয়তো মনে হতে পরে তার লেখায় হুমায়ূন আহমেদের প্রভাব স্পষ্ট। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের সাহিত্য জগতে এমন এক প্রভাব বিস্তার করেছেন, পাঠক হোক কিংবা লেখক— এই প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া বেশ কঠিন। তাই গল্পের নায়িকাকে মায়াবতী, রূপবতী বললেই আমরা হুমায়ূন আহমেদের ছাপ খুঁজে বেড়াই। লেখিকার লেখার কিছু অংশে হুমায়ূন আহমেদের ছাপ লক্ষ্যণীয় হলেও কিছু অংশে ভিন্নতা আছে। হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখাকে আমি অ্যাপ্রিসিয়েট করি। কারণ এখানে পাঠকের সাথে গল্পের চরিত্রগুলোর এক ধরনের আধ্যাত্মিক যোগাযোগ হয়। অন্যরকম মমতায় জড়িয়ে যায় চরিত্রগুলো।
ছোট্ট উপন্যাসিকার ক্ষেত্রে চরিত্রগুলোকে ফুটিয়ে তোলা একটু কঠিন মনে হয়। কিন্তু এই কাজ লেখিকা খুব দারুণভাবে করেছেন। অসংখ্য পারিবারিক চরিত্র এখানে উপস্থিত ছিল। কিন্তু প্রতিটি চরিত্রকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রতিটি চরিত্রই স্বল্প পরিসরে ফুটে উঠেছিল। কিছু বিষয় অবশ্য লেখিকা পাঠকের ভাবনার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। যদিও শুরুতে এত এত চরিত্রের ভিড়ে কার সাথে কার কী সম্পর্ক বুঝতে বেগ পেতে হয়েছে।
মাঈশার বাবা আহাদ, ও নিজে আর ওর মা জয়াকে এখানে দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রত্যেকের অনুভূতি, তাদের মনস্তত্ত্ব, ভাবনা এখানে ফুটে ওঠেছে। দাদী, চাচা, চাচী, ফুফু কিংবা কাজিনরাও এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। যদিও যাদের বিয়ের আয়োজন, উপলক্ষ্যে এই মিলনমেলা সেই দুইজনকে আরেকটু জায়গা দেওয়া যেত বলে মনে হয়েছে।
আমার কাছে মাশাল চরিত্রকে খুব ভালো লেগেছে। কিছু মানুষ এমন থাকে, যারা কখনও নিজের জন্য চিন্তা করে না। তাদের চিন্তা বাকিদের জন্য। সবার ভালো কিংবা আনন্দের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করে। আসর মাতিয়ে রেখে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। দিন শেষে ক্লান্তিতে শরীর ছেয়ে যায়। যা কারো চোখে ধরা পড়ে না। মাশাল যেন তেমন এক উচ্ছল চরিত্র। যার শেষটা হয় আইয়ুব বাচ্চুর গানের মতো, যেখানে সুরলিপিতে থেকে— দেখোনা কেউ হাসি শেষে নীরবতা।
শেষটা বেশ পছন্দ হয়েছে। এই জাতীয় বইয়ের ক্ষেত্রে সমাপ্তি নিয়ে কিছুটা দ্বিধা থাকে। তাড়াহুড়োর ছাপ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু লেখিকা যেন আগে থেকেই জানতেন তিনি কী করতে চান। এবং সেই কাজটিই করেছেন দক্ষতার সাথে। জীবনের গল্পের তো চলতেই থাকে। জীবনের অপূর্ণতার গল্পে পূর্ণতা পাওয়ার ��তো সমাপ্তি এক ধরনের তৃপ্তি দেয়।
পরিশেষে, মানুষ যে প্রশ্নের উত্তর খোঁজে সে প্রশ্নের উত্তর এক সময় ঠিকই পাওয়া হয়। এরপর? আরও প্রশ্ন মনে ভিড় করে। উত্তর হয়তো জানা থাকে, তবুও মন মানে না। নিজেদের জীবন তাই আবার বাঁক নেই অন্য কোনো উপাখ্যানে।
◾বই : আমি এবং একটি বনসাই গাছ ◾লেখক : সুফাই রুমিন তাজিম ◾প্রকাশনী : বুক স্ট্রিট ◾ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫
গল্পটা ভালো লাগসে। কিন্তু মেয়েরে দূরে সরায় দেয়ার বিষয়টা আমি ভাবসিলাম বিরাট কিছু হবে। আর মেয়েদের বারবার বিচিত্র, মায়াবতী ইত্যাদি বিশেষণগুলা হুমায়ুন আহমেদ ছাড়া ক্রিঞ্জ লাগে আমার। সবচেয়ে হতভাগা চরিত্র আশফাক। আশফাক হওয়া উচিত না।
গল্পের প্লট খুব সাধারণ। তবে এই সাধারণ প্লটকে অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন পাঠকদের সামনে।
বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা আমাদের দেশে বর্তমানে তেমন কোন ঘটনাই না। অন্য সব স্বাভাবিক ঘটনার মতো এটাকেও ধরে নিয়েছে। তবে বিবাহ বিচ্ছেদের ফলে একজন সন্তানের যে পরিমাণ মানসিক বিপর্যয় নেমে আসে, তা কি বাবা, মা বুঝতে পারে? যদি বাবা, মা বুঝতে পারতো তাহলে হয়তো অনিচ্ছা সত্ত্বেও সন্তানের জন্য এক সাথে থেকে যেত অনেকে।
ছোট বইটিতে বেশ কয়েকটি বিষয় খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। প্রথমত পঙ্গুত্ব। যে ছেলেটি ছোটবেলা থেকেই ছিল দূরান্ত প্রকৃতির। একা ছুটে বেড়ানো, নিজের বয়সের বড়দের সাথে পাল্লা দিয়ে মা'রা'মা'রি করা তার বড় ভাইকে বিনা কারণে মা'রা'র, স্কুল কলেজ মাতিয়ে ভার্সিটিতে ভর্তি, পড়াশোনা, গানবাজনা, বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়া, ভার্সিটির জুনিয়রের সাথে চুটিয়ে প্রেম করার পর একা একা বিয়ে করা, সংসার করা, তাদের ঘর আলোকিত করে কন্যা সন্তানের আগমন। সারা জীবন নিজেকে রাজা ভাবে, তার কাউকে লাগবে না কিন্তু সবার তাকে লাগবে এই মনোভাব পোষণ করে জীবন কাটিয়েছে।
আমার কাউকে লাগবে না মনোভাব পোষণ করা মানুষটি যখন দূর্ঘটনায় আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন তখন তার কাছে সবকিছু বিষাক্ত লাগে। যে মানুষ গুলো আদর, স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়ে পাশে থাকার চেষ্টা করেছে। তার কাছে মনে হয় তারা করুণা করছে। যেটা একেবারে সহ্য করতে পারে নি। যার কারণে হিংস্র হয়ে ওঠে আর নিজেকে গুটিয়ে নেন।
যে কোন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য শুধু মেনে নিলেই হয় না মানিয়েও নিতে হয়। জয়া সহ কিছু মেনে নিলেও মানিয়ে নিতে পারে নি। যার কারণে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। জয়া নিজের জীবন গুছিয়ে নিলেও আহাদ সাহেব নিজেকে গুটিয়ে রাখেন।
বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর অংশ হলো বাবা আর মেয়ের কা'টা'নো মুহূর্তগুলো। একজন পঙ্গু বাবা সব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলেও মেয়ের ভালোবাসার কাছে হেরে যায়। তাদের প্রতিটি মূহুর্ত আমার বেশ ভালো লেগেছে। বাবার সাথে মেয়ের সময় কা'টা'নো, মেয়ে নতুন নতুন রেসিপি রান্না করে খাওয়ায়, এক সাথে চায়ের কাপে আড্ডা দেওয়া প্রতিটি বিষয় খুব ভালো লেগেছে।
আরেকটি বিষয় ভালো লেগেছে। মানুষ বলে র'ক্তে'র সম্পর্কের আলাদা একটা টান থাকে। যেটা বইটিতে খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রায় এক যুগ পর মাইশা তার পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করতে এসেছে তারা এমন ভাবে মেনে নিয়েছেন যেন প্রতিটি তাদের সাথে দেখা হয়, কথাবার্তা চলে বহু দিন ধরে। পরিবারের সদস্যদের সাথে ছোট ছোট মূহুর্ত গুলো ভালো লেগেছে।
মাইশাকে কেন্দ্র করে লেখা হলেও আমার কাছে মাশালের চরিত্রটা অনেক ভালো লেগেছে। যে কিনা নিজের আগে নিজের প্রিয়জনদের কথা ভাবে। তাদের সবাইকে খুশি রাখতে চায়। যার জীবন অন্যদের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছেন।
লেখক দুই তিনটা জায়গায় মাশাল না লিখে মাইশা লিখে রেখেছেন। পড়তে গিয়ে বেশ কয়েকবার মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছিলাম। পরবর্তীতে বিষয়টি নজরে রাখলে ভালো হবে।
বই: আমি এবং একটি বনসাই গাছ লেখক: সুফাই রুমিন তাজিন
সুফাই রুমিন তাজিন দিনদিন নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। হ্যাটস অফ এত সাধারণ গল্পকে এত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্যে। বাই দ্য ওয়ে, 'একটি গাছকে কখনো শেকড় থেকে উপড়ে ফেলা যায় না'।
জীবনে উত্থান পতন আসবে এটাই স্বাভাবিক। জীবন তবুও জীবনের নিয়মে এগিয়ে চলেছে। আমরা সবাই শুধু সুখের পিছনে ছুটে বেড়াই। যেকোনো পরিস্থিতিতে স্বার্থপর হয়ে যাই। নিজের কথা ভাবতে গিয়ে অন্যের কথা ভাবার সময় কোথায়! কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু সিদ্ধান্ত ঝোঁকের বশে আমরা নিয়ে ফেললেও কখনো কী ভেবে দেখেছি তার ফলাফল বাকিদের উপর কী হতে পারে?
বহু বছর পর আবার জানতে ইচ্ছে করে সেদিন ওই মানুষটার অবহেলার কারন কী ছিল? কিংবা কেন তৈরি হলো দূরত্ব? আসলেই কী ছিল প্রয়োজন না কী সবাই শুধু স্বার্থপর। সবাই শুধু নিজের কথা ভাবে, নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেয়।
ছোটবেলায় খুব আদুরে মেয়ে ছিল মাঈশা। এখনো অবশ্য আদরের কমতি নেই। পঁচিশ বছরের এই মেয়েটি এখনো সবার কাছে দামী। দুই বোনের জন্য যা বাজেট থাকে, মাঈশার জন্য থাকে তার থেকেও বেশি। তেমনি চেষ্টা করা হয় তার যেন আদর যত্নের কমতি না থাকে। আম্মু, আব্বু আর দুই জমজ বোনের সাথে মাঈশার পরিবার দেখলে যে কেউ হিংসা করতে বাধ্য। সবাই যেন মাঈশাকে উজাড় করে ভালোবাসে।
বিদেশের মাটিতে এই মেয়েটি সব খুঁজে পেলেও একটা খটকা কিছুতেই মন মানতে চায় না। এখনো মায়ের সাথে ওই লোকটাকে মাঈশার সহ্য হয় না। লোক! হ্যাঁ সেটাই। মাঈশা তাকে আব্বু বলে ডাকে কিন্তু এই মানুষটা একসময় ছিল তার আঙ্কেল, মায়ের বন্ধু। ছোটবেলায় নিজের বাবার কাছে মাঈশা ছিল রাজকন্যা। আশফাক সাহেব তাকে ভীষণ আদর করেন কিন্তু ওই যে কোথাও গিয়ে রক্তের টানটা আসে না। সেটা বোধহয় ওই মানুষটার জন্য যাকে ছেড়ে আট বছর বয়সে সে বিদেশে চলে এসেছিল। মাঈশার ছিল ছোট্ট একটা পরিবার। সাথে দাদী, ফুপু, চাচা মিলিয়ে আরো অনেকজন। কিন্তু হঠাৎ করেই মাঈশার বাবা দূর্ঘটনায় আ হত হন। পা কে টে দুটোই বাদ দিতে হয়। আর মাঈশার বাবা মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল।
কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তার মনে কৌতুহল কেন তার বাবা তাকে দূরে সরিয়ে রাখলো? কেন মাকে চলে আসতে হলো, বাবা তো মাকে ভালোবাসতো।তাই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠা পরিপূর্ণ নারী মাঈশা নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশে ফেরার। বিয়ের আগে বাবার সাথে থাকার ইচ্ছে তীব্র। নিজের পৈত্রিক ভিটেমাটির স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু দ্বিধা এক জায়গাতেই। তার বাবা কি তাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেবে? কত বছর হয়ে গেল, একবারও যে দেখা পর্যন্ত করেনি। মেয়েকে বুকে টেনে নেয়নি। এই আশঙ্কায় পড়েছেন মাঈশার মা জয়া নিজেও। এত বছর পর আবেগ অনুভূতির যদি মৃ ত্যু হয় মাঈশার বাবার? মাঈশার এত প্রত্যাশা, আবেগ তো আঘাতে শেষ হয়ে যাবে।
মাঈশার বড় ফুপু আজমেরী মাঈশাকে দেশে আসলে নিয়ে গেলেন গ্ৰামের বাড়িতে। স���খানে চাচাতো ভা�� মাহিনের বিয়ের অনুষ্ঠান। উৎসবমুখর পরিবেশে মাঈশাকে মুখোমুখি হতে হবে তার বাবার। এই কাজটা যেন সহজে হয় দায়িত্ব পেয়েছে আরেক কাজিন মাশাল। এই মেয়েটাও বড় অদ্ভুত স্বভাবের। মাঈশার সামনে আবার কী ছেলেবেলার মতো হাসিখুশি বাবা থাকবেন নাকি আবারো আঘাতে ভাঙবে মন? কত অনুভূতি এখনো রয়েছে জানার।
🫑পাঠ প্রতিক্রিয়া :
“আমি এবং একটি বনসাই গাছ” বইটা আপনি যখন শেষ করবেন যদি এই জনরার সামাজিক উপন্যাস আপনার পছন্দের হয় একটা অদ্ভুত ঘোর লাগা কাজ করবে। সুফাই রুমিন তাজিমের লেখনশৈলী দুর্দান্ত। খুবই সাধারণ গল্প তিনি যেমন অসাধারণত্বের মোড়কে জড়িয়ে ধরতে পারেন, তেমনি পাঠকের সাথে গল্পের এক ধরনের সংযোগ স্থাপন করতে পারেন। আর এই সংযোগের কারণে গল্পের সাথে পাঠকেরও আবেগে ভেসে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। যেমনটা আমার ক্ষেত্রে হয়েছে। অনেকটা সময় একটা অদ্ভুত বিষাদে ডুবে ছিলাম।
“আমি এবং একটি বনসাই গাছ” আগাগোড়া আবেগ জড়ানো এক গল্প। কিন্তু লেখিকা গল্পটা বলেছেন খুবই সুন্দর ভাষায়। যেটা পড়তে ভালো লাগবে। মনে হতে পারে হুমায়ূন আহমেদকে অনুকরণ করে সাজানো। কিন্তু লেখিকা নিজের স্বতন্ত্র একটা ছাপ রাখতে পেরেছেন। গল্পটা এগিয়েছে নিজের গতিতে। এবং শুরু করলে পড়তে পড়তে দেখবেন যেন এই শুরু এই শেষ। আহামরি নয় তবে উপস্থাপনায় বেশ নতুনত্বের ছোঁয়া।
এই বইটির গুরুত্বপুর্ণ ছিল বাবা, মা ও মেয়ের অনুভূতি। বাবার প্রতি মেয়ের ভালোবাসা, অভিমান; মেয়ের প্রতি বাবার আবেগ, কেন মেয়েকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা; কেন মা তার মেয়ের প্রিয় বাবাকে ছেড়ে চলে গেল, করি ছিল এর কারণ — প্রতিটি মানুষের মনস্তত্ত্ব এখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। সৎ বাবা হলেই যে সে খারাপ হবে, কিংবা অবহেলা করবে; এই ধারণা ভুল। তারাও ভালবাসতে পারে, মায়ায় জড়াতে পারে। কিন্তু তারপরও নিজের বাবার জায়গা কি নিতে পারে? এখানে সূক্ষ্ম কিছু বিষয়, মানুষের অহংকার কিংবা ঈর্ষা যে কত বড় ভুলের কারণ হতে পারে বইটি যেন তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
সুফাই রুমিন তাজিমের লেখা পড়ে কিছুটা হুমায়ূন ছাপ পাওয়া যায়। এবং আরেকটা খুব পরিচিত বইয়ের সাথে গল্পের থিম বেশ মিল। বাবা মেয়ের সম্পর্কের গল্প। যদিও আমি বলবো লেখিকা নিজের লেখনী দিয়ে বইটিকে স্বতন্ত্র একটা জায়গা দিয়েছেন। যার ফলে বইটি পড়তে অবশ্যই আলাদা এবং মৌলিক লেগেছে। এবং বিভিন্ন চরিত্রের একে অপরের সাথে কানেকশন লেখিকা খুবই দারুন ফুটিয়ে তুলেছেন। মাঈশার বাবা আহাদ সাহেবের চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে লেখিকা বেশ চমৎকার কিছু দৃশ্যপট তৈরি করেছেন। খুব গভীরের কথা ছিল কিছু কিছু। আবেগের জায়গায় যখন বাস্তবতা হার মানে সেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করার সক্ষমতা অনেক আত্মপ্রত্যয়ী মানুষের মধ্যেও থাকে না।
অনেক অনেক চরিত্র শুরুতে তালগোল পাকিয়ে যেতে পারে। মাঈশার কাজিনের বিয়ে উপলক্ষে আয়োজন, অনেক মানুষের ভিড় তো চরিত্র আছে নানান সম্পর্কের। ভালো লাগবে মাঈশার দাদীকে। মাঈশার চাচীর আচরণ বেশ মজাদার লেগেছে। শাশুড়ির কাছে পদে পদে নাস্তানাবুদ হয়ে। বড় চাচা নির্ভরযোগ্য চরিত্র। এছাড়াও আছেন ফুপুসহ কাজের লোক। কাজিন মাহিন ও বউ আমরিনের উপস্থিতি সবচেয়ে কম। তবে লেখিকা চেষ্টা করেছেন সবগুলো চরিত্রকেই কম বেশি জায়গা দিতে।
মাশালকে উপস্থাপন ভালো লেগেছে। মাশালের উপস্থিতি ঝলমলে বেশ। মেয়েটা যেভাবে ম্যাজিকের মতো সব সমস্যা ঠিক করে দেয়! অথচ নিজেকে গুটিয়ে রাখে সবকিছু থেকে। দিনশেষে কেউ কী মাশালের কথা ভাবে? মেয়েটা কেন নিজেকে এমন গম্ভীর স্বভাবের করে রাখে।
সমাপ্তিটা লেখিকা যেভাবে দিলেন তাতে যেন পূর্ণতা পাওয়া যায়। এমন ধরনের বই কখনো সমাপ্তিতে আকাঙ্ক্ষা ভালো লাগে না। বরং পরিপূর্ণ লাগুক গল্পটি। চরিত্রগুলো খুঁজে পাক পূর্ণতা। পাঠকও সন্তুষ্ট চিত্তে বই রেখে মনে করতে পারবে সুন্দর সমাপ্তিটা। তবে বইয়ে ছাপার ভুল ছিল অনেক জায়গায়। এছাড়া কিন্তু অভিযোগের জায়গা নেই।
"জীবনটা যদি হয় একটা নদী তবে বলো তার লক্ষ্যটা কী?"
দিনশেষে জীবন এগিয়ে চলে পড়ে থাকে কিছু আবেগ, অভিমান। যা জমে জমে একসময় অনেক কঠিন হয়ে যায়। সুযোগ পেলে সম্পর্কে এমন কঠিন শিলা ভাঙা উচিত। অভিমানের প্রাচীর ভেঙে উঁকি দিক আবারো ভালোবাসার গল্প। জীবনে সবাইকে দরকার। র ক্তের টান উপেক্ষা করা যায় না।
🫑বইয়ের নাম: "আমি এবং একটি বনসাই গাছ" 🫑লেখক : সুফাই রুমিন তাজিম 🫑প্রকাশনী : বুক স্ট্রিট 🫑ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫
পুরো উপন্যাস জুড়েই যেন অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে আছে! মাকড়সার জাল বোনার মতো করেই লেখক অনেক যত্নে গল্প বুনেছেন। গল্পটা এমন এক মেয়ের যে নিজের বাবাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। গল্পটা এমন এক বাবার যে জীবনের করাঘাতে নির্লিপ্ত কিন্তু এই নির্লিপ্ততার মাঝেও তার বুকে মেয়ের জন্য জমানো এক আকাশ সমান ভালোবাসা। গল্পটা এমন এক মায়ের যে স্বামীকে হারিয়ে আঁকড়ে ধরেছিল নিজের একমাত্র মেয়েকে। বাবা-মায়ের একটা সিদ্ধান্তে থমকে গিয়েছিল সব, তিনটে মানুষের জীবন হয়ে গেছিল ছন্নছাড়া। বাবা-মা হয়তো নিজেদের পারস্পেকটিভ থেকে ঠিকই ছিল কিন্তু মাঝখান থেকে উল্টেপাল্টে গিয়েছিল ছোট্ট মাইশার সাজানো গোছানো সুন্দর জগৎটা! আহ, কী বিষণ্ণতাই না ছিল মেয়েটার জীবনজুড়ে! কিছু কিছু সিদ্ধান্তের ভবিষ্যৎ ফলাফল হয় ভয়াবহ। মানুষ হয়তো তাৎক্ষণিক সেটা বুঝতে পারে না ঠিকই কিন্তু জীবনের কোনো না কোনো এক পর্যায়ে সেই সিদ্ধান্তের জন্য আফসোস করতে হয়, মনে হয় এই সিদ্ধান্তটা না নিলেই ভালো হতো! জীবনের যে কোনো জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ঠাণ্ডা মাথায় তার ফলাফল নিয়ে ভাবা উচিত বিশেষ করে যদি সেই সিদ্ধান্তের ওপর কোনো ছোট্ট ফুটফুটে বাচ্চার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তাহলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে হাজারবার সিদ্ধান্তের ফলাফল নিয়ে ভাবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখকের লেখনী দারুন। শব্দের বুনন, বাক্যের গঠন থেকে শুরু করে আবেগের যথার্থ বর্ণন সবকিছুই যেন লেখক পার্ফেক্টলি ডিস্ট্রিবিউট করেছেন! কিছুটা হুমায়ূনীয় ঘরানার লেখা হলেও লেখকের নিজস্বতা দেখার মতো ছিল।
লেখনী বেশ আকড়ে ধরে রাখে গল্পে। ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করেনা। মাঝে একবার মনে হল বেশি কপচানো হচ্ছে লেবু তবে তা খুব ই ক্ষণিকের জন্য।তবে দ্রুতই রেশ কাটিয়ে ফেলেছে সেটার।
তবে আমার কাছে সবকিছু পার্ফেক্ট হতে হতে আটকে গেলো।
মাইশার মনে যে প্রশ্ন শেষতক রয়ে গেলো তা আমার ও রয়ে গেলো। আরেকটা কিন্তু হয়ত আছে এমন একটা ভাব রেখে শেষ হয়ে গেলো।
মানসিক ভাবে স্টাবল থাকা যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা উপলব্ধি করার জন্য পড়ে ফেলতে পারেন বই টি।
#পাঠচক্র_রিভিউয়ার্স ২০২৫ রিভিউ বিষয়: বই রিভিউ: ৫৮ বই: আমি এবং একটি বনসাই গাছ লেখক: সুফাই রুমিন তাজিন প্রকাশনী: বুক স্ট্রিট প্রচ্ছদ: নসিব পঞ্চম জিহাদী
মাঈশা, প্রায় এক যুগ পর নিজের ভিটেতে ফিরবে। সে বর্তমানে তার সৎ বাবা, মা আর সৎ দুই বোনের সাথে থাকে প্রবাসে। অনেক প্রশ্নের উত্তর জানতে সে দেশে পা রাখে।
মাঈশার বাবার মধ্যে অহং বা প্রবল ব্যক্তিত্ব ছিল না অন্য কিছু জানা যায় না। দুর্ঘ,ট/।নায় পঙ্গু হবার পর থেকে নিজের স্ত্রী বা মেয়েকেও সহ্য করতে পারতো না। সঙ্গী হল বই আর একটা বনসাই গাছ। বনেদী বাড়ির এক রুমে নিজেকে বছরের পর বছর আবদ্ধ করে রেখেছে। এক সাহায্যকারী আর মাঈশার চাচাতো বোন মাশাল ছাড়া কারো অধিকার নেই।
বনসাই গাছ যেমন, ছোট্ট বহরে থেকেও নিজের প্রভাব বজায় রাখে, সেভাবেই হয়তো মাঈশার বাবাও নিজের প্রভাব রেখেছেন মাঈশা আর মাশালের জীবনে। কিংবা হয়তো না।
মাশালের বড় ভাইয়ের বিয়েতে তহুরা বেগমের বাড়িতে সত্যিকার অর্থেই চাঁদের হাট বসেছে। মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হলেও শেকড় অস্বীকার করা যায়?
নিজের মধ্যে চেপে রাখা অনেক প্রশ্নের উত্তর জানতে মাঈশা ফিরছে।
এত কাল পর এসেও, কারো মনে হচ্ছে না, সবার মধ্যে এত কালের দুরত্ব ছিল। সব যেন উধাও।
মাঈশা একাকী বসে ওর বাবার কাছে, সেই যুগ আগের প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় বাবার কাছে। উত্তর মিলবে কী? প্রতাপশালী বাবা, মমতাময়ী মা, এত্ত মিষ্টি একটা পরিবার সময়ের স্রোতে আজ অনেক আলাদা।
পাজলের টুকরোর মত, বিয়ে বাড়িতে যখন সবাই জড়ো হল, সবাই যেন ১৫-১৭ বছরের দূরত্ব চোখের পলকে পার করে ফেলেছে। এই হয়তো রক্তের টান, অস্বীকার করতে কেউ পারবে না। এই টানে ফিরতে হবেই।
বাবা আর সন্তানের যে টান, তা আসলে মানুষ অস্বীকার করতে পারবে না। যতই সন্তান বড় হয়ে যাক কিংবা দূরে চলে যাক। যদি কেউ বাবা মায়ের ভালোবাসা অস্বীকার করে সে পশু বৈ নয়। মাঈশা তার নিজের বাবাকেও যেমন ভুলে যেতে পারেনি, সৎ বাবাকেও সে হেলা করেনি, কারণ সে জানে, অন্ধকারে কে পথ দেখিয়েছে।
উপন্যাস মাঈশা কে নিয়ে, কিন্তু উপন্যাসের প্রাণ কে জানেন? ওর চাচাতো বোন মাশাল। মাশাল চরিত্রকে যেন নিজের ছায়া মনে হল। হুবহু বলব না, কিন্তু মাশালের অনেক কিছু যেন আমার নিজের মনে হল। যেমন মাশাল সবার বন্ধু, কিন্তু কেউ মাশালের বন্ধু না। এই ব্যাপার অনেকেই রিলেট করতে পারবে।
বইটাতে মাশাল আর মাঈশা নামে কিছু উল্টাপাল্টা আছে। এইটুক বুঝে নিতে হবে। আশা করি পরের মুদ্রণে ঠিক হবে।
আমার খুব পছন্দের একটা গান, ভয় দেখাস না প্লীজ, আমি বদলে গিয়েই ঘরে ফিরতে চাই… প্রায় ১০ বছর হয়তো হবে আমার রিং টোন ছিল, আমি অন্য রিংটোন দিলেও আবার এই গানেই ফিরি। মাঈশাও হয়তো মাকে বলে ছিল মা, ভয় দেখিও না, আমি আমার ঘরে ফিরছি। ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানী মাঈশা বাবার জবাব নিয়ে ফিরতে চেয়েছিল, পেরেছিল কী?
লেখার ধাঁচে হুমায়ূন আহমেদের একটা ছায়া আছে। আসলে আমাদের জীবনে এত বড় জায়গা জুড়ে তার অস্তিত্ব, এ প্রভাব অস্বীকার কীভাবে করি?
বইটা শেষ, কিন্তু আছে এর রেশ। দিন শেষে, বনসাই গাছের মত হয়তো আমরা, কেউ আমাদের বন্দী করে রেখেছে। বিকশিত হতে দেয়নি। মাঈশা বা তার বাবা হয়তো সেই বট বনসাই কিংবা আমি। নিজের শেকড় খুব অল্প জায়গা জুড়েই আছি।
কিংবা হয়তো টেরোরিয়ামের আবদ্ধ জারের মত আমরাও আবদ্ধ।
বইটা পড়ে অনুভূতি জানি না, দম বন্ধ হয়ে আসছে। মন ভার। বইটা হুট করে এভাবে শেষ হল! জানিনা নিজে আমি আমার বাবা মায়ের জন্য কী করতে পারছি।
বইটাতে অনেক চরিত্র, সবার স্পেস বেশ ভালো ছিল। তবে মাঈশাকে নিয়ে গল্প হলেও মাশালকে কেন যেন শেষ অবধি বেশি মিস করছি।
জয়া -আহাদ দম্পত্তির সুখের সংসারে ঘর আলো করে আসে তাদের একমাত্র কন্যা সন্তান। সুখের সংসার যেনো দ্বিগুণ সুখ নিয়ে আসে মাইশা নামের কন্যাটি। কিন্তু সুখ এমন এক জিনিস যা স্থায়ী হয় না আজীবন, সুখের পর দুঃখ আসবে এটাই জীবনের নিয়ম। সেই নিয়ম মেনে চলতেই যেনো দুঃখ আসে তাদের জীবনে। আহাদ সাহেবের এক্সিডেন্টের ফলে বরণ করতে হয় পঙ্গুত্ব। ডানপিটে স্বভাবের এই মানুষটি পঙ্গুত্ব মেনে নিতে পারেনি, সেই পঙ্গুত্বের রেশ ধরে মানসিকভাবেও পঙ্গু হয়ে যায় মানুষটি। স্ত্রীর যত্নকে তার করুণা এমন হতে থাকে। দিনের পর দিন বাজে ব্যবহার করে, যার ফলে তাদের সম্পর্ক রূপ নেয় বিচ্ছেদে। এই বিচ্ছেদের ভুক্তভোগী হতে হয় মাইশাকে। মাইশার জীবন হয়ে যায় বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। একদিকে মা, নানাবাড়ি, অন্যদিকে বাবা, দাদার বাড়ি, কেউ তাকে কম ভালোবাসে না বলে সে কোনো একদিক বেছে নিতে পারে না। মায়ের নতুন সংসার হয়, সে সংসারেও তার আদরের কমতি ছিলো না কিন্তু তার মন পড়ে থাকে বাবার কাছে। তার বাবার দেওয়া কষ্টের কারণ সে বুঝতে পারে না। আবার সে ছোটোবেলার বাবার সাথে কষ্ট দেওয়া বাবার মিল খুঁজে পায় না।
তাই সে তার পচিঁশতম জন্মদিনে বাংলাদেশে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। তার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়ায়….
প্রশ্নের উত্তর কি সে জানতো না?
হয়তো জানতো..
তবু সে অভিনয় করে গেছে অবলীলায়..
প্রতিটি চরিত্র এতো আদুরে। এমন পরিবার এখন এক্সিস্ট করে কী না জানি না, কিন্তু প্রতিটি সন্তান এমনি পরিবার আশা করে। যেখানে চাচা, ফুফু বলতে আদরের হবে। কোনো বিষাক্ততা থাকবে না। যেখানে কাজিনদের মধ্যে ভেদাভেদ থাকবে না। যেখানে ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ থাকবে না।
লেখকের গল্প বলার ধরণ সুন্দর বলে হয়তো একটুও বিরক্ত লাগেনি, সাধারণ একটা গল্প কিন্তু পড়তে যে কী পরিমাণ ভালো লেগেছে! আর নামটাও যে অদ্ভুত সুন্দর, সাথে সুন্দর প্রচ্ছদটাও মন ভালো করে দেওয়ার মতো🌸
যদি প্রশ্ন করা হয়, একজন লেখক/লেখিকার লেখায় স্বার্থকতা কোথায়? আমি বলবো যখন তার লেখা পড়তে গিয়ে আপনি নিজেকে সেই চরিত্রগুলোর মাঝে খুঁজে পান। সেই কাহিনী পড়তে গিয়ে ঘোলা হয়ে আসবে চোখ, কখনও বা ফুটে উঠবে ঠোঁটের কোণায় হাসি। লেখিকা 'সুফাই রুমিন তাজিন' এর লেখা ৪ টা উপন্যাস পড়েছি। প্রতিটা উপন্যাস পড়তে গিয়েই সেই কাহিনীগুলোর মাঝে আমি খুঁজে পেয়েছি আমার শৈশব, পারিবারিক সম্পর্কের টানপোড়ন, ভালোবাসা-ঘৃণা, শূন্যতা অথবা পরিপূর্ণতার স্বাদ। এই বইটিতে প্রথমেই দেখা যায়, পঁচিশ বছর বয়সী মাঈশা প্রায় একযুগ পরে বাংলাদেশে আসছে তার বাবা আহাদ সাহেবের সাথে দেখা করতে। একসময়ে আহাদ সাহেবের সুখের সংসার ছিলো। কিন্তু এক দূর্ঘটনায় চোখের পলকে পালটে যায় তার সুখী সংসারের রূপ। আহাদ সাহেব নিজেকে গুটিয়ে ফেলেন কাছের মানুষগুলো থেকে ; হয়ে উঠেন অনুভূতিশূন্য এক মানুষ। সেই অনূভুতিশূন্য মানুষটির সাথে দেখা করতে আসা তার মেয়�� মাঈশা কি পারবে বাবার সীমাহীন নির্লিপ্ততা দূর করতে? জানতে হলে পড়ে ফেলুন দারুণ এই সমকালীন উপন্যাসটি।
বইঃ আমি এবং একটি বনসাই গাছ লেখিকাঃ সুফাই রুমিন তাজিন ধরণঃ সমকালীন উপন্যাস পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১২৫ প্রচ্ছদঃ নসিব পঞ্চম জিহাদী প্রকাশনীঃ Book Street
লিটারেরি ফিকশনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপারটা হচ্ছে, খুব সাধারণ একটা গল্প কখনও কখনও শুধুমাত্র লেখার জোরে অসাধারণ হয়ে ওঠে। হয়তো গল্পের কোন পরিণতি থাকে না; বুভুক্ষের মতো পৃষ্ঠা উল্টে রহস্য সমাধানের তাগিদ থাকে না- তবুও গল্প বলার অভিনব ধরণ পাঠককে আটকে রাখে চুম্বকের মতো। বাস্তব জগতের খুব পরিচিত দৃশ্য হয়ে ওঠে বিস্ময়কর।
আমি এবং বনসাই গাছ - এর গল্পটা খুব সাধারণ। পঁচিশ বছরের তরুণী মাঈশা প্রায় এক যুগ পর বাংলাদেশে ফিরে আসে বাবার সাথে দেখা করতে। যেই বাবা ওকে ছোটবেলায় পাগলের মতো ভালবাসতেন, রাজকন্যার মতো আগলে রাখতেন। অথচ এক দুর্ঘটনার পর হয়ে গিয়েছিলেন নির্লিপ্ত, অনুভূতিশূণ্য।
মাঈশার ফিরে আসার গল্পে আমরা একটা পরিবারের সদস্যদের পুনর্মিলনী দেখতে পাই। বিরাট বড় একটা বাড়িতে মাঈশার চাচাত ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে সাজ-সাজ রব লেগে যায়। কাজিনদের খুনসুটি থেকে শুরু করে বৃদ্ধা দাদীর সাথে পান সেজে খাওয়া - প্রতিটি ঘটনাই আমাদের পরিচিত নস্টালজিয়ায় ভোগায়। সেই সমান্তরালে এগিয়ে যায় একটি ভীষণ মনস্তাত্বিক গল্প। যে গল্পে মিশে আছে বিষণ্ণতা, অবসাদের দর্শন।
ঠিক আমার টাইপের গদ্য না, অর্থাৎ যেই ধরনের গদ্য পড়ি বা পড়তে চাই। বইয়ের নাম এবং প্রচ্ছদ দেখে আকৃষ্ট হয়েছিলাম কেন জানিনা। মাঝেমধ্যে হয়ত এমন হয়। সিরিয়াল নাটক ধরনের কাহিনী। বিস্তারিত বলার মত ভাষাও কিছু পাচ্ছি না৷ কষ্টেসৃষ্টে পড়লাম। থাক, অনেকের কাছে হয়ত ভালো লেগেছে। হয়ত ভালো বই-ই কিন্তু ব্যক্তিগত পছন্দে মিলল না, তাই বলে আক্রোশও নাই কোনো।
বাবা মেয়ের সাধারণ গল্প। কিন্তু কেন যেন লেখার ভঙ্গি আমাকে ছুঁতে পারে নি। পড়তে ভালো লাগে নি । গল্প টা emotional, but writing টা খুব নিম্নমানের কেমন যেন….