অতিপ্রাকৃত ১ম খণ্ড’ কোনো গল্পের বই নয়। এই বই মূলত বাংলার অলিগলিতে হেঁটে বেড়ানো পৌরাণিক সত্তাদের নিয়ে তৈরি একটি ভিজ্যুয়াল এনসাইক্লোপিডিয়া।
সময়ের ইতিহাস বলে, বাংলার মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো গল্পের দলকে বহুভাবে বহুজন লিপিবদ্ধ করে গেছেন। আর সেই মৌখিক গল্প-কাহিনির রেখে যাওয়া সূত্র ধরেই বাঙালি ও আদিবাসী চিত্রশিল্পীদের আঁকা ১০০টিরও বেশি চিত্রকর্মে ভরপুর এই বইটিতে রয়েছে পুঁথি সাহিত্য, হিন্দু পুরাণ এবং সাতটি স্বতন্ত্র আদিবাসী সংস্কৃতির লোককথার বিভিন্ন চরিত্রের কথা।
এখানে থাকে সাঁওতালি ঘোরমুহা, মণিপুরী লম্বা হাতওলা পেত্নী কিংবা পাশের বাড়ির শ্যাওড়া গাছের শাঁকচুন্নি। চাইকি দেখা মিলে যাবে বিপদজনক সব ভূত-প্রেত, জ্বীন-পরীরও। তবে ভয় নেই, বইয়ের ভেতর থেকে কেউই ঘাড় মটকে দেবে না আপনার।
ছবি ও বর্ণনায় ভরপুর আমেজের এই বইতে হারিয়ে যেতে আপনি প্রস্তুত তো?
আমাদের জীবনের অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানো অনেক কাল্পনিক স্বত্তা সহ আরো অজানা অনেক পৌরানিক চরিত্র নিয়ে এই এনসাইক্লোপিডিয়া। অনেক গুলো সত্তা নস্টালজিক করে দিয়েছে। ফিরিয়ে নিয়েছে শৈশবে। অহ হ্যা যারা লেখালেখি করেন তাদের অনেক সাহায্য করবে এই বইটা। ৯৭ টা চরিত্র থেকে বাছাই করে দারুণ দারুণ গল্প লেখাই যায়।
পক্ষিরাজ ঘোড়া, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী, শাঁকচুন্নী কিংবা চাঁদের বুড়ি অথবা স্কন্ধকাটা, মামদো ভূত, গেছো ভূত, বেঁশোভূত–কত শুনে এসেছি এসমস্ত কাল্পনিক সত্তাদের কথা। রুপকথার রাজ্য আর ভূতেদের সমাহার দিয়ে সাজানো এ বইয়ের সেসব বর্ণনা আছে সংক্ষিপ্ত আকারে। এক কথায় বললে–ভিজ্যুয়াল এনসাইক্লোপিডিয়া।
'অতিপ্রাকৃত ১ম খন্ড' তে বাঙালি ও আদিবাসী লোককথা, পৌরাণিক উপকথা–সমগ্র অতিপ্রাকৃত সত্তাকে এক মলাটে আবদ্ধ করা হয়েছে। সঙ্গে কাল্পনিক সত্তাদের চিত্রকর্ম বইটিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।
পড়তে বেশ মজা লেগেছে, ছোট পরিসরে লেখা। সংরক্ষণ করে রাখার মতন তো অবশ্যই কারণ বাংলায় আমি এ ধরনের বই আগে পড়িনি। প্রচ্ছদ একেবারে টেন অন টেন! তবে লেখার মান আরো ভালো হতে পারতো, আরো পরিণত হতে পারতো..
আমি ঠিক জানি না এমন ধরনের কোনো বই বাংলাতে কেনো অন্য কোনো ভাষাতেও আর লেখা হয়েছে কি না। এনিম্যাল এনসাইক্লোপিডিয়া নিয়ে তো আমরা অনেকেই শুনেছি তবে আপনারা কি কোনো সময় শুনেছেন ভূতের এনসাইক্লোপিডিয়া? এই বইটা বলতে গেলে সকল ভূতদের পরিচয় বৃত্তান্তের সমগ্র। এতো এতো ভূতের তাদের কাহিনি তো দূর তাদের নামও আমার এর আগে জানা ছিলো না। গলাশী, দামোরি, চকোর, দেও, ধনকুদ্রা আরো কতো কতো ভূতের পরিচয় জানতে পারলাম বইটা পড়ে। সব গুলো গল্প পড়েই বেশ মজা পেয়েছি কারণ সাথে ছিলো খুবই দারুন দারুন ইলাস্ট্রেশন। আমার তো বেশ ভালো লাগে যেসব বইয়ে ইলাস্ট্রেশন থাকে সেসব বই পড়তে। ইলাস্ট্রেশন ছাড়াও বইয়ের যে দিকটা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে তা হচ্ছে আদিবাসী উপকথা। আদিবাসীদের নিয়ে জানতে আমি এমনিতেও খুবই ইচ্ছুক তার উপর তাদের যে এসব ব্যাপারেও আলাদা কিছু রয়েছে তা জানতে পেরে খুবই মজা পেলাম। অনেক অনেক ধন্যবাদ @ আর @ ভাইয়াকে আমাকে বইটা পাঠানোর জন্য। নাহলে আমার জানাই থাকতো না এমন কোনো বই বা ভূতদের এনসাইক্লোপিডিয়া থাকতে পারে।
বিভিন্ন মুভি বা গেমে গ্রিক,রোমান বা নর্ডিক মিথের প্রভাব, ক্যারাক্টার ইউটিলাইজেশন দেখে সব সময় আমি বিস্মিত হয়েছি।সাথে অভাববোধও করেছি আমাদের ফোকলোর এর মর্ডান কালেকটিভ একটা এডাপটেশন এর। মাঝে একবার ভেবেছিলামও ফোক ফ্যান্টাসি বেজড কিছু গান বানালে কেমন হয়? ঘাটাতে গিয়ে আমার মনে হয়েছিলো আমাদের ফোকলোর গুলা ওই ভাবে গুছানো না।পুরাণ ভিত্তিক গল্প গুলা একটা লেভেলে গুছানো থাকলেও একদম গ্রাম্য গল্পকথা বলতে যা বুঝায় তা আসলে অনেক ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় আছে। অবশেষে এমন একটা বই আসলো যা আমাদের ফোকলোর ক্যারাক্টারদের একটা ব্যাসিক এনসাইক্লোপিডিয়া হিসেবে কাজ করবে। অতিপ্রাকৃত কোনো গল্পের সমগ্র নয়,এই বইতে কোনো গল্পও নেই। তবে? তবে কেন বইটা গুরুত্বপূর্ণ? কারন প্রায় শ-খানিক ফোকও মিথিকাল ক্যারাক্টার দের নিয়ে প্রচলিত উপকথা,তাদের ক্যারাক্টার ডিজাইন নিয়ে আইডিয়া দেয়া হয়েছে। যা কাজ এ লাগিয়ে অন্য ক্রিয়েটিভ ফিল্ডের মানুষেরা হয়তো গল্প,মুভি বা গেম এর আইডিয়া পেতে পারে। ঠিক যেমনটা আমরা জাপানিজ হরর এনিমগুলাতে দেখে থাকি।
আসলে, ৩.৫/৫। খুব ইউনিক একটা বই পড়ে শেষ করলাম। বইটা যদিও কেনা হয়েছে আরো মাসখানেক আগে, কিন্তু রিডারস ব্লকের কারণে শুরু করতেই দেরী হল। তবে শুরু করার পর শেষ করতে বেগ পেতে হয় নি একটুও। এত উদ্ভট সব চরিত্র, আর তাদের গল্পগুলোও এত মজার, বেশ ভাল সময় কেটেছে! আর বইয়ের ফন্টটা বেশ পরিচ্ছন্ন, পড়তে গিয়ে ভাল লেগেছে। ইলাস্ট্রেটররা সকলেই এত ভাল কাজ করেছেন...তাদের আঁকা ছবিগুলো বইটিকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলেছে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। সাথে আমি দুটো বুকমার্কও পেয়েছিলাম, যেগুলো আমার পরের বইগুলোর ক্ষেত্রেও পড়ার সঙ্গী হয়ে থাকবে। নুহাশ হুমায়ূনের উচিত এই বইটি থেকে ক্যারেক্টার আইডিয়া নিয়ে "পেট কাটা ষ" এর ৩য় সিজন বানানো। সিজিআই ব্যবহারের কথা বলব না, তবে গল্পগুলো এত ইউনিক যে আসলেই প্রতিটি চরিত্রকে আরো কল্পনার রঙ মিশিয়ে আরো কয়েকখানা গল্প লিখে ফেলা যাবে! ২য় খণ্ডের জন্য অপেক্ষায় থাকব।
পার্থিব ভুবনে মানুষ কিংবা অন্যসকল প্রাণী বা জীব ব্যতীত অপার্থিব ছায়ার উপস্থিতি টের পাওয়া অকল্পনীয় কিছু নয়, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এদের অস্তিত্ব আঁচ করা যেতেই পারে। আর বাংলার ত্রিসীমানায় তো এদের সত্তাকে গল্প কিংবা বাস্তবে ভালো করেই উপলব্ধি করা যায়।
ঠিক যেমনটা আমরা দেখতে পাই বাংলার লোককথায় যেখানে আছে চাঁদের বুড়ির অস্তিত্ব যার চরকায় সুতো কাটতে ক্লান্তি নেই আদৌ, আছে পক্ষিরাজ ঘোড়ার অস্তিত্ব যার দু'ডানায় নির্ভর করে রাজপুত্রদের কতো জায়গায় বিচরণ ঘটে, আছে রক্তচোষা ডাইনীর অস্তিত্ব, আছে অতি বুদ্ধিমতী পাখি হীরামনের অস্তিত্ব, আছে ধন কুদ্রার মতো বেঁটে প্রাণের অস্তিত্ব যাকে তুষ্ট করতে সক্ষম হলে সে এনে দিবে কারি কারি ধনসম্পদ, আছে জনপ্রিয় শাঁকচুন্নির অস্তিত্ব যার সংসার করার কতো না সাধ, আবার দুধ-মাছি চুরি করে এমন সত্তার নজিরও পাওয়া যায়। এদের মধ্যে প্রাণনাশকারীদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়।
এছাড়া হিন্দু পুরাণে, বাংলার মুসলমান, আদিবাসীদের মাঝেও অতিপ্রাকৃত জগতের নানান সৃষ্টি নিয়ে কানাঘুষা শুনতে পাওয়া যায়। অপার্থিব এই ছায়াগুলোর মনের খবরাখবর রাখাটা বড্ড দুষ্কর। তুষ্ট করলে হয়তো এদের মন বদল হলেও হতে পারে তবে চটে গেলে প্রাণ চলে যাবে সোজা পরপারের দ্বারে। এতে অবশ্য এদের জন্য ভালোই, দলটা যে ভারি হবে।
সোজা ভাষায় এটা সংগ্রহ করে রাখার মতো একটা বই। বিশেষ করে চিত্রলংকরণগুলো এককথায় নজরকাড়া। বাংলার সব অপার্থিব সত্তাগুলোকে একত্র করার দারুণ প্রয়াস এটি যার জন্য এর সাথে জড়িত সকলকে সাধুবাদ জানাই। তবে যে বিষয়টি আমার ভালো লাগেনি তা হলো বইয়ের ৩৫+ পেইজ ফাঁকা, একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন অনুসরণ করতে গিয়ে বোধ হয় এমনটা হতে পারে কিন্তু দেখতে খুবই দৃষ্টিকটু লেগেছে আমার কাছে। এই ব্যাপারে প্রকাশনী আগামীতে খেয়াল রাখবে বলে আশা করি। আপাতত অতিপ্রাকৃত দ্বিতীয় খন্ডের অপেক্ষায় রইলাম।