লেখকের প্রথম উপন্যাস, তবে লেখা এতো পরিশীলিত যে প্রথমের ছাপই নেই বলতে গেলে। অবশ্য গদ্যের মায়াময় ধরণের কারণে একে উপন্যাস কম স্মৃতিকথা বেশি লাগে।
কিশোর বয়সী বাবু, যার বেড়ে উঠা যৌথ পরিবারে। বাবুর চিন্তা-চেতনা এবং কর্মকান্ড আমার ছেলেবেলার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল যখন কঠোর শাসনের মাঝেই প্রচুর খেলাধুলা ও দুরন্তপনায় ব্যস্ত থাকতাম। বাবু অবশ্য অতোটা দুরন্ত নয়, তবে ভাবনার জগতে সে নিজের একটা অল্টার ভার্সন তৈরি করে। মিলন নামের সেই ভার্সনে তার চেপে রাখা ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেয়। নম্র-ভদ্র, পড়াশোনায় মনোযোগী বাবুর বিপরীতে মিলন ডানপিটে, বখাটের সাথে ঘুরে বেড়ায়, যৌনতার ব্যাপারেও অবাধ বিচরণ তার। নিজের সাথেই তর্কে জড়িয়ে পড়ার মতো বাবু ও মিলনের দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রও উপস্থিত হয় কয়েকবার। কিন্তু নিজের সাথে তর্কে কেউ জিততে পারেনা বলে যেসব দ্বন্দ্ব অমিমাংসিতই থেকে যায় সর্বদা।
বাবুর বয়ানেই বেশিরভাগ বর্ণনা আসলেও মূল গল্পটা তার পরিবারের। তাদের বনেদী পরিবারের উপর চেপে বসা এক অদ্ভুত অভিশাপের। এই পরিবারের কোনো পুরুষেই চল্লিশ বছর অতিক্রান্ত করতে পারেনা। ঠিক নির্দিষ্ট কোনো প্যাটার্ন না থাকলেও চল্লিশ হলেই কোনো না কোনোভাবে যমদূত এসে হাজির হয়ে পড়ে। এই অভিশাপের গ্যারাকলে একের পর এক বাবুর পূর্বপুরুষ হারিয়ে গেছে। সেই গল্প শুনতে পেছনপানে ফিরতে হয়। এভাবে বর্তমান এবং অতীতকে নিয়ে সমানতালে এগুতে থাকে গল্প।
এই বইয়ের প্লট সেরকম অর্থে দুর্দান্ত কিছু নয়। তার চেয়ে বরং বর্ণনাশৈলীই এর উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য। নানানরকম পরিস্থিতি এবং জীবনবোধের উপলব্ধির বয়ানে লেখক বেশ মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন।
মন খুলে প্রশংসা করতে গিয়েও করতে না পারার ব্যাপারটা সুখকর নাহলেও মাঝেমাঝে থেমে যেতে হয়, রাশ টানতে হয় কথার। মন খুলে কথা বলতে গিয়ে অনেক কথা বলা হলেও আসল কথা বলা হলো কি না, বলা হলেও তা কতটা যুক্তিযুক্ত হলো সেটা নিয়েও ভাবনার জায়গা থেকে যায়। এ যাত্রায়ও তাই উজানযাত্রা নিয়ে বেশি কিছু বলতে পারছি না।
আমার কাছে নতুন কোনো লেখককে আবিষ্কার করা মানে নতুন কোনো চিন্তাভাবনার সন্ধান পাওয়া, যে গল্প এখনো কেউ বলেনি তেমন কোনো গল্প আবিষ্কার করা (যদিও এটা সবসময় হয়ে ওঠে না)।
উজ্জ্বল সিনহার লেখায় নতুন কী পেলাম এটা জিজ্ঞাসা করলে এক কথায় বলা বেশ মুশকিল হয়ে যাবে।
গল্পের ভীত খুব জটিল নয়, তবুও গল্পকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা বিভিন্ন চরিত্র এবং সেই চরিত্রদের কেন্দ্র করে আবর্তিত হওয়া ঘটনাগুলোকে সহজ বলা যায় না, বেশ জটিল একটা আবরণ সেঁটে আছে তাদের গায়ে। যৌথ পরিবারের গল্প, কৈশোরে নিজের আলাদা জগতে কাটানো বালকের গল্প, নকশালপন্থীদের জীবনের আবছা গল্প এর অনেক আগেই শোনা হয়ে গেছে আমাদের৷ তবুও এখানে নতুন কী পেলাম? এখানে পেলাম আফিমের খেয়ালে হোক বা বাস্তবেই হোক, যমের সাথে বীণাপানি বসুর নিত্য বচসা, দেনদরবার। জানলাম ডুবতে থাকা মানুষও দেখতে পায় তার আশেপাশের সৌন্দর্য, দেখতে পায় আগে না দেখা অনেক ঘটনার সমাবেশ।
এখানে পেলাম ব্যস্ত জীবনকে ফাঁকি দিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পুকুরপাড়ে গাছ হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা অনেকগুলো মানুষের সন্ধান। সেইসাথে পেলাম একটা সুপ্ত বাসনা, এভাবে আসলেই পালিয়ে যাওয়া যায়? গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যায়??