জীবনের যাত্রা কখনোই শেষ হয় না। তাই মহাযাত্রার পরে কোনো এক নতুন কোনো যাত্রার শুরু হয়। অসিত যে লক্ষ্যে অন্য বিভুঁইয়ে গিয়েছিল, সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। সাথে ছিল রুদ্রদেব। এখন নিজ দেশে ফেরার তোড়জোড়। সময় অনেকটাই পেরিয়ে গিয়েছে। নিজের দেশে কী চলছে, জানে না ওরা। কী দেখবে, সেটাও জানে না। তবুও যখন নিজের মাটি ডাক দেয়, এক অন্যরকম অনুভূতি হয়। নাড়ির টানে যেকোনো যাত্রাই সুখকর।
চোলা রাজ্য স্বাধীন হয়েছে কিছুদিন হলো। অনেক কিছুর বিনিময়ে এই স্বাধীনতা। একই সাথে চেরা রাজ্যকেও হাতের মুঠোয় রেখেছে চোলা। তবে অন্য রাজ্য শাসন করার ইচ্ছা নেই চোলা সম্রাট কারিকালার। তাই ধাপে ধাপে সৈন্যদের সরিয়ে নিচ্ছেন। এখানে একজন স্বপ্ন দেখছে নিজে রাজা হওয়ার। রাজা গত হয়েছেন। পরাজয়ের অপমান সহ্য করতে না পেরে নিজেই আত্মাহুতি দিয়েছেন। ফলে নতুন সম্রাজ্যে মাথায় মুকুট পড়ার প্রতীক্ষায় আছে ভেরাপ্পন। কিন্তু পথে বিশাল বাঁধা রাজার উত্তরসূরি নাবালক রাজপুত্র। তাহলে কী করতে হবে? পথের কাঁটা সরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু কীভাবে?
সাতবাহন রাজ্যের রাজা সাতকর্ণী এখন আর নিজ রাজ্যে থাকে না। শক রাজ্যের বিশাল প্রাচুর্যে তার মন ডুবে আছে। এমন অর্থ বৈভবে বিভোর সে, শত্রুপক্ষের একজনকে ক্ষমতা দিতেও কার্পণ্য করেননি। যা পছন্দ হচ্ছে না মহামন্ত্রীর গিরিধারীর। রাজ্য জয় ও দখলের খেলায় যখন ক্ষমতা অর্জিত হয়, তখন কাউকে বিশ্বাস করতে হয় না। কখন কে পেছন থেকে আঘাত করবে, বলা শক্ত। তাই সবসময় সচেতন ও চোখকান খোলা রাখতে হবে। নাহলে ঘোর বিপদ।
যুদ্ধ শেষে যখন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস, তখন জীবন নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে হয়। কারিকালা এবার নিজের রানী খুঁজতে মশগুল। ভেল্লীর শহরে অবশেষে খুঁজে পেয়েছেন তার স্বপ্নের রানীকে। তবে একটা বাঁধা, যে বাঁধা তাকে তার ভুলগুলো সামনে তুলে আনছে। ভুল, না বিশ্বাসঘাতকতা। যে যুদ্ধ জয়ের গর্বে বিভোর সে, তার পেছনে যে ছলনার আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল, তা তাকে শুধু লজ্জিত-ই করেনি, ক্রোধে আক্রান্ত করেছিল। যার অন্যতম কুশীলব পাণ্ড্য রাজা। প্রতিশোধের শুরুটা হোক তাকেই দিয়ে।
বিহান একটা উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে। নিজের চেরা রাজ্যের ভার কোনো অমানুষের হাতে যেন না থাকে। তার বাবা ছিলেন চেরা রাজ্যের রাজার অন্যতম আমত্য। তার কথাতে বিহান রাজ্যের ভাগ্য নিয়ে খেলতে চলেছে। খুঁজে বের করেছে নাগা গোত্রের প্রধানকে। নাগানিকাসহ চলে চোলা রাজ্যের রাজার কাছে। এরপর প্রধান কাজ রাজপুত্রকে খুঁজে বের করা। রাজপুত্রকে একবার পেয়ে গেলে সবকিছু সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু প্রতিপক্ষ যে ছক কষছে রাজপুত্রকে সরিয়ে দেওয়া। এই ছক ভেদ করে লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারবে তো?
নিজগ্রামে গিয়ে অসিত দেখতে পেল সব কেমন ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। এমন নীরব গ্রাম তো সে কোনোদিন দেখেনি। তাহলে কী এমন হলো? রাধা ঠিক আছে তো? নতুন রাজা না-কি ক্ষমতা নিয়েছে। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ প্রজারা। মেয়েদের সম্মান নেই এখানে। রাধার জায়গা হয়েছে রাজার রংমহলে। শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় অসিত। যে রাধার জন্য ফিরে আসা, তাকেই যদি না পায়! রুদ্রদেবের সাথে থেকে অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে ভুলে গিয়েছে অসিত। এখন সে আর আগের অসিত নেই। তাই সে প্রতিজ্ঞা করেছে এর শেষ দেখে ছাড়বে। প্রয়োজন হলে গ্রামের সবাইকে নিয়ে যুদ্ধ করবে। অত্যাচারী শাসককে আর মেনে নেওয়া হবে না। রাধা সহ সকল মেয়েকে ফিরিয়ে আনা হবে। অসিত কি সফল হবে?
আর রুদ্রদেব? সে এখন কোথায়? নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নেই তার। তাই সে ঘুরছে একটা লক্ষ্যের খোঁজে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে। কিন্তু তার ভাগ্যটাই হয়তো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার। আবারো এই ভারতবর্ষের রাজনীতিতে বড় প্রবর্তন আসবে। আর সেখানে কেন্দ্রবিন্দুতে রুদ্রদেবকে থাকতেই হবে। কেননা দিব্যস্ত্র পাওয়া আরও কয়েক যোদ্ধাও এখানে শামিল। তাদের প্রতিহত করতে হবে। অন্যায়কে মেনে নেওয়া হবে না কিছুতেই।
প্রতিটি অঞ্চলে এমন একটা দেশ বা রাজ্য থাকে, যারা নিজেদের সর্বেসর্বা মনে করে। আর্যবতে সাতবাহন তেমনি এক রাজ্য। যুদ্ধ করে শক দখল করেছে। রাজনীতির মারপ্যাঁচে দক্ষিণ ভারতকেও নিজেদের পদতলে রাখার চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু যে ছলনার পর্দা চোখের সামনে ধরে রাখা হয়, তা একদিন সরে গেলে সবকিছু দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। তাই নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের পেছনে অনেকেই অনেকভাবে আক্রমণের নকশা আগে। ক্ষমতা দিয়ে বা ছলনায় সব দখল করলে সমীহ আদায় করা যায়, কিন্তু বন্ধু পাওয়া যায় না। একসময় ভয় কেটে যায়। তখন প্রবল প্রতাপে তীব্র আক্রোশ আছড়ে পড়ে। আর সেই সময়? খড়কুটোর মতো ভেসে যেতে হয়। শেষ হয়ে যায় সবকিছুই।
এভাবেই মহাকাল তার গল্প লিখে, মহাযাত্রা শেষে মহপ্রস্থানে প্রকৃতি তার হিসেব নিকেষ ফিরিয়ে দেয়। যার কাছে সবকিছুই নস্যি…
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
একটি ট্রিলজি সিরিজের শেষ বই থেকে আপনি কী প্রত্যাশা করে��? যে ঘটনাপ্রবাহ প্রথম বই থেকে শুরু হয়েছে, তারই যবনিকাপাত ঘটবে। শেষ হবে সকল রহস্যের। কাহিনির পরিসমাপ্তিতে এক ধরনের তৃপ্তি পাওয়া যাবে। অথচ “মহাপ্রস্থান” শুরুর পর একটা দীর্ঘ সময় ধরে মনে হয়েছে বইটির কোনো নির্দিষ্ট ভিশন নেই। লেখক কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে লিখছেন না। মনে হয়েছে তিনি কেবল দায় মেটাতে চান। একটি ট্রিলজি লিখছেন, তা শেষ করতে হবে। ফলে কিছু একটা লিখে নিলেই হলো। অনেক প্যাঁচালো ঘটনার প্রায় অনেকটাই কেন এসেছে তার দিশা পাইনি।
যদিও শেষের দিকে এসে লেখক কী করতে চেয়েছেন সেটা অনুমেয়। বিশেষ করে শেষ দেড়শ পৃষ্ঠা খারাপ লাগেনি। তখন মনে হয়েছে, না একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে এ কাহিনির। এতকিছু করার পর লেখক যদি আগে থেকেই মনস্থির করে রাখেন এমন কিছু ঘটনার সূত্রপাত ঘটাবেন, তাহলে আমি বলব, ৮০০ পৃষ্ঠার বইটাকে অনায়াসে ৪০০ বা তারও কম পৃষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যেত। অনেক বাড়তি কাহিনি, ত্যানা প্যাঁচানোর মতো করে ঘটনাগুলো বাড়িয়ে তোলা, অতিরিক্ত দর্শনতত্ত্ব, প্রয়োজন নেই এমন ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া মাথার মধ্যে চাপ সৃষ্টি করেছে। আমার মতন গতিশীল পাঠকও এগুলো পড়তে রীতিমতো হিমশিম খেয়েছে। বিশ দিনের এই দীর্ঘ যাত্রা যখন শেষ হয়েছে, তখন কেবল হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছি।
এই বইয়ে অনেকগুলো ঘটনা সমান্তরালে ছুটে চলেছে। যার মুখ্য দুই কুশীলব অসিত ও কারিকালা। অসিত তার গ্রামের জীবন খুঁজতে ছুটছে, অন্যদিকে কারিকালা তার জীবনে নতুনত্ব খুঁজতে ব্যস্ত। এছাড়া আরো অনেক ঘটনা পাশাপাশি ছুটে চলেছে। ভেরাপ্পন ছক কষছে রাজা হওয়ার, বিহান খুঁজছে প্রতিশোধ নেওয়ার উপায়। অন্যদিকে সাতবাহন রাজ্যের রাজা ও মহামন্ত্রী নতুন দখলকৃত অঞ্চলে ঘাটি গেড়ে বসেছে। বিশাল মহাযজ্ঞ ও কলেবরের এই বইয়ে এত এত ঘটনা উঠে এসেছে, সবগুলো মাথার মধ্যে জায়গা দেওয়াটা কঠিনই মনে হয়েছে।
আমার মনে হয়েছে, লেখক প্রয়োজনীয় ঘটনাগুলোর চেয়ে অপ্রয়োজনীয় ঘটনাগুলো বর্ণনার ক্ষেত্রে বেশি সময় দিয়েছেন। বিশেষ করে কারিকালার নিজের রানী খোঁজার যে অভিযান, অসিতের নিজের গ্রামে গিয়ে যে পরিণতি সচক্ষে দেখা বা তারপরে তার পরিকল্পনা; এগুলো বর্ণনার ক্ষেত্রে বেশি সময় নিয়েছেন। অধ্যায়গুলো বড় করেছেন, যার আসলে কোনোই প্রয়োজন ছিল না। বরং বর্ণনাগুলো সংক্ষিপ্ত করে আরো অনেক কিছুর উপর নজর দেওয়া যেত।
যেমন একটা ঘটনা বলা যায়, রুদ্রদেব যখন একা একা চলছিল তখন তার সামনে একটা ঘটনা সামনে আসে। সেখানে একটা আক্রমণ, প্রতি আক্রমণের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কিন্তু এখানে লেখক বর্ণনার মতো সুবিচার করতে পারেনি। রুদ্রদেবের প্রতিহত করার ঘটনা আর দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা যেত। অথচ লেখক এখানে ব্যর্থ হয়েছেন।
তাছাড়া ঘটনাপ্রবাহ বেশ স্মুথলি চলছিল। যেটা ভালো লাগেনি। মানে সহজেই সবকিছুর সমাধান হয়েছে যাচ্ছে, সব ঘটনা সহজভাবে ঘটে যাচ্ছে, কিংবা ঘুরিয়ে পেচিয়ে কঠিন করে একটি নির্দিষ্ট কিছু করতেই ঘটনা লেখক এগিয়ে নিচ্ছিলেন। সেটা পড়তে গিয়েই বোঝা যাচ্ছিল। কী হবে অনুমান করা যাচ্ছিল। পাঠকের মস্তিষ্কের সাথে লেখক খেলতে পারেননি। বরং যান্ত্রিকভাবে ঘটনাগুলো এগিয়ে চলেছে।
একটা সামন্ত রাজা ও তার সৈন্যের সাথে কিছু অনভিজ্ঞ গ্রামবাসীকে নিয়ে একটা পুরো রাজ্যের সৈন্যকে হারিয়ে দেওয়া, প্রসাদ দখল করা কী পরিমাণ হাস্যকর লেগেছে আমার কাছে! এতগুলো প্রশিক্ষিত সৈন্যকে ঘোল খাইয়ে রাধার পালিয়ে যাওয়াও অতিরঞ্জিত লেগেছে আমার কাছে।
এই বইতে লেখকের ভাবনাচিন্তা আমার কাছে বিরক্তিকর লেগেছে। আমার মনে হয়েছে, লেখক তার চিন্তাগুলো আগেই বইয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এটা অবশ্য ঠিক, একটি বইয়ের প্রতিটি ঘটনা লেখকের ভাবনার-ই প্রতিফলন। তবে এখানে লেখক যেভাবে ভাবনার প্রতিফলন, সেটা যুতসই মনে হয়নি। আমার প্রতিপক্ষ একটা চিন্তা করে ঘটনাপ্রবাহ সাজাচ্ছে, আমি অপরপ্রান্তে বসে তার ভাবনা বুঝে গিয়ে তা প্রতিহত করার ছক কষছি, বিষয়টা একবার হতে পারে। কিন্তু বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে লেখকের কল্পনার সংকীর্ণতা প্রকাশ পায়। লেখক প্ল্যান এ ছাড়া প্ল্যান বি ভাবতে পারছেন না বলেই প্রতীয়মান হয়।
সবকিছুই এভাবে চলমান ছিল। ফলে পড়তে যেমন বিরক্ত লেগেছে, তেমন উপভোগ করতে পারিনি। সিরিজের আগের দুইটা বই এই বইটার চেয়ে ঢের ভালো ছিল। একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে কাহিনি এগিয়েছে। এখনই লক্ষ্যটা কী, কাহিনি কেন ও কীভাবে চলছে সেটা বুঝতেই আমার বেগ পেতে হয়েছে।
আমি আগের দুইটা বইয়ের ক্ষেত্রে বলেছিলাম লেখকের বর্ণনা ও সংলাপের দুর্বলতা আছে। ট্রিলজির তৃতীয় বইয়ে এসে যেন তা মাত্র ছাড়িয়েছে। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। অনেক আগে “অনার্যদেব” নামে একটা বই পড়েছিলাম। সেই বইয়ের শেষের আক্রমণ দৃশ্যে মূল এক চরিত্রের মৃত্যু হয়। সেই বর্ণনা পড়ে আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল। এখানেই শেষের দিকে এক মূল চরিত্র লড়াই করতে গিয়ে মারা যায়। লেখক সেই বর্ণনায় কোনোভাবেই আবেগ জাগ্রত করতে পারেনি। মনের মধ্যে কোনো অনুভূতিই জাগ্রত হয়নি। ফ্ল্যাট বর্ণনা রোবটের মতো পড়ে গিয়েছি শুধু। এই যে পাঠকের সাথে লেখক তার লেখা দিয়ে যে সংযোগ করতে পারেননি, এই বিষয়টা পুরো বইয়ের চিত্র।
লেখকের বর্ণনা এমনই ছিল। কোনো রকমের আগ্রহ জাগানিয়া কিছু পাইনি। ফলে পড়তে গিয়ে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছি। লেখকের রোমান্টিক দৃশ্য বর্ণনার ক্ষেত্রেও দুর্বলতা লক্ষ্য করেছি। এখানেও ইমোশন ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ। ১৮+ লেখা ছাড়াও ভালোবাসাকে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। লেখক এখানে ১৮+ বর্ণনা তুলে আনেননি বলে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হয়। তবে বেশকিছু ভালোবাসার মুহূর্ত আরও প্রাণবন্তভাবে উপস্থাপন করতে পারলে পড়তে ভালো লাগত।
এখানে সাতবাহন রাজ্য নিয়ে কিছু বলা প্রয়োজন। আর্যবতে সাতবাহন এমন এক রাজ্য, তাকে বর্তমানে ভারতের সাথে তুলনা করা যায়। যারা পুরো অঞ্চলকে নিজেদের কব্জায় রাখার জন্য ছলচাতুরির আশ্রয় নেয়। একসময় তাদের এই ছলনায় অন্য রাজ্য ঠিকই ডুবে থাকে। কিন্তু একসময় ভেসে উঠলে ঠিকই ভুল ভাঙে। তখন সেই মহাপ্রতাপশালী রাজ্যের সাথে বাকি সব রাজ্যের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়।
এই বইয়ে নতুন নতুন অসংখ্য চরিত্রের আনাগোনা ছিল। সাথে পুরোনো সব চরিত্র চলেছে সমানতালে। এই দিকটা ভালো যে লেখক সবগুলো চরিত্রকেই সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কোনো চরিত্র ফেলনা নয়। কোনো না কোনো মূল্যায়ন প্রত্যেকের আছে। মাঝে মহাভারতের কিছু চরিত্র এনেছেন, সেটাও ভালো। তবে বিষয়টা আরও খোলসা করা যেত।
বইতে লেখক সবকিছু প্রিমেডিটেডেড হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন। এই কথাটা আগেই বলেছি। যেমন, যে চরিত্র মারা যাওয়ার, সে মারাই যাবে। যার বেঁচে থাকার সে বেঁচেই থাকবে। এই বদ্ধমূল ধারণা লেখকের লেখায় ভালোভাবেই টের পেয়েছি। যার ফলে দৌড়ঝাঁপ ও সাসপেন্সের পরও কোনো বিস্ময়কর অনুভূতি হয়নি। কারণ আমি জানি, এই চরিত্র আর যাই হোক কিছুতেই শেষ হবে না। বা এই চরিত্র কাকতালীয়ভাবে অন্তিম পরিণতি বরণ করবে।
বইটার শেষটা অবশ্য ভালো লেগেছে। শেষে রুদ্রদেবের সাথে যা হতে চলেছে, সেটা তার ভবিতব্যই বোধহয়। নিজের যা হয় হোক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি প্রয়োগ করাই রুদ্রদেবকে ভিন্ন চরিত্রের কাতারে ফেলেছে। তাছাড়া পুরোটাই চুইংগামের মতো দীর্ঘায়িত করার প্রয়াস ছিল। বরং মনে হয়েছে তৃতীয় বই না লিখলেও হয়তো চলত। চেপেচুপে দুইটা বইয়ে কাহিনি শেষ করলে এমন ধৈর্যের বাঁধ ভাঙত না। কিছুটা হলেও উপভোগ করতাম।
▪️বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
চিরকুট প্রকাশনীর এই ট্রিলজির প্রচ্ছদ আমার ভালো লাগে। একই ধরনের প্রচ্ছদের মধ্যে সিরিজ সিরিজ ভাব আছে। আর প্রকাশনীর প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়ে অভিযোগ করার সুয���গ নেই। এত মোটা বই খুলে পড়তে অসুবিধা হয় না। মোটা বইগুলোর ক্ষেত্রে রাউন্ড বাইন্ডিং খুব কার্যকরী। এখানে তার দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়েছে।
বানান ভুল, ছাপার ভুল ছিল। তবে এত মোটা বইয়ের ক্ষেত্রে সেগুলো আমলে নেওয়ার মতো নয়। তবে কিছু বানান, যেমন উদ্যাপন সবক্ষেত্রে উদ্যাপন হয়ে গিয়েছিল। এখানে একটা শব্দ ছিল সত্রী। এটা শস্ত্রী হবে কি না জানি না। হতে পারে আমার ভুল।
ওভারঅল বানান, সম্পাদনা, প্রোডাকশন নিয়ে আমি তৃপ্ত।
▪️পরিশেষে, গুডরিডসে এই বইয়ের রিভিউতে একজন লিখেছে, সে এই বইটা পড়েছে কেবল এর শেষটা দেখতে চায় বলে। আমিও একই কারণে বইটা পড়েছি। সিরিজের দ্বিতীয় বই পড়ার পরই বুঝেছিলাম এ জাতীয় লেখা আমার হজম হবে না। তবুও কেন পড়লাম? কারণ আমার চিন্তাভাবনার সাথে গল্পের মিল আছে কি না দেখতে। পরিণতি আগেই অনুমান করেছিলাম। তারপরও নতুনত্ব খুঁজছিলাম। কিন্তু নতুনত্ব কিছুই পাইনি। বরং সিরিজের প্রথম দুই বইয়ের তুলনায় কাহিনি আরও নিম্নগামী হয়েছে। ভীষণ হতাশাজনক অনুভূতি দিয়েছে। এই যা....
▪️বই : মহপ্রস্থান
▪️লেখক : দিবাকর দাস
▪️প্রকাশনী : চিরকুট প্রকাশনী
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ২.৫/৫