ইউক্রেনের মাটিতে মুখোমুখি আমেরিকা আর রাশিয়া-তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগার প্রস্তুতি। সেই তুলকালাম যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক কষ্টে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিলো একজন বাঙালি বংশোদ্ভুত আমেরিকান সিআইএ এজেন্ট, যার কাছে আছে দুনিয়া কাঁপিয়ে দেয়া এক বিস্ফোরক তথ্য। এর মধ্যে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হলো যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে আর দেশসেরা স্পাই বাজিকর জনিসহ ইউক্রেনের আকাশ অপহরণ করা একটা যাত্রিবাহী বিমান। জিম্মি উদ্ধারের দায়িত্ব পড়লো ছ'জন এসপিওনাজ এজেন্টের ওপর। তাদের পাঠানো হলো কিন্তু ইউক্রেনের মাটিতে নামতেই হলো বিপত্তি। গোটা মিশনের দায়িত্ব এসে পড়লো সর্ব কনিষ্ঠ সদস্য যে কিনা শুধুমাত্র একজন অপারেটিভ, যার ট্রেনিং এখনো অসম্পূর্ণ, যার নাম আহাদ। প্লেনটা হাইজ্যাক করলো কে? শত্রুসেনার দলপতির গ্যাসমাস্কের পেছনে আছে কার চেহারা? এক মহাশক্তিধর গোপন সংস্থা নাকি পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে? তারা কে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-আহাদের মিশনের আসল উদ্দেশ্য কি? আহাদ কি পারবে এসবের উত্তর বার করতে? এই মিশনের উদ্দেশ্যের পেছনেও কি রয়েছে আরও কিছু যা আরও রোমহর্ষক? নাবিল মুহতাসিমের লেখায় এবং এড্রিয়েন অনীকের আঁকায় গ্রাফিক বাংলা পাবলিকেশনের প্রথম এসপিওনাজ থ্রিলার দুনিয়ায় আপনাদের স্বাগতম।
সাল ২০১৪, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে বেনামে ঢুকে পড়ে রাশিয়ান বাহিনী। সেইসাথে সে অঞ্চলের রুশ ভাষী সংখ্যাগুরুর সহযোগিতায় গঠিত হয় মিলিশিয়া বাহিনী। ইউক্রেনে তখন যুদ্ধের দামামা বাজছে। যে যুদ্ধের অন্ধকার ছায়ায়, বিশ্ব রাজনীতি এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়। দেশের সীমান্তে উত্তেজনা, গুপ্তচর সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের জালে, পৃথিবীজুড়ে অস্থিরতা। এই বিপর্যস্ত অবস্থায়, বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় নেয় বাংলাদেশ বংশোদ্ভূত এক সিআইএ এজেন্ট, কার্ল হাসান সেভার্স, যার কাছে এমন কিছু গোপন তথ্য আছে যা সারা বিশ্বের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে।
এই সময় ইউক্রেনের আকাশ থেকে একটি বিমান হাইজ্যাকের ঘটনা গোটা পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে তোলে। বিমানের মধ্যে আটকা পড়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কন্যা আনিলা আর দেশসেরা স্পাই বাজিকর জনি। অন্যদিকে দৃশ্যপটে আসে এক ভয়ানক ও রহস্যময় চরিত্র কর্নেল সেবাস্তিয়ান, যে কিনা পৃথিবীর বড় বড় রাজনৈতিক নেতা আর ইউক্রেন যুদ্ধের দখলদারদের কাছে আতঙ্কের নাম। তার এমন ভয়াবহ ক্ষমতা, কৌশল এবং অবস্থানের উৎসটা কি? মহাশক্তিধর গোপন সংস্থা ‘দ্য অক্টোপাস’এর ছায়ায়, কোথাও এক বিশাল পরিকল্পনা চলছে। শুরু হয় ৩য় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি।
জিম্মি উদ্ধারে বাংলাদেশ থেকে একটি গোপন অপারেশন শুরু হয়। 'দ্য এজেন্সি' থেকে পাঠানো হয় ছয়জন কভার্ট এজেন্টকে। কিন্তু এই অভিযান কি সফল হবে? কারা জিতবে, এবং কারা হারবে? অপারেশনটি শুরু হয়, কিন্তু এটি অপ্রত্যাশিতভাবে এক ফাঁদে পরিণত হয়, যেখানে সব কিছু হুমকির মুখে পড়ে। পুরো মিশনের গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে তরুণ অপারেটিভ আহাদের ওপর। যুদ্ধরত দোনেৎস্ক অঞ্চলে একা কর্নেল সেবাস্তিয়ান আর তার ভয়ংকর দল, রাশিয়াপন্থি মিলিশিয়া বাহিনী ডিপিআর (দোনেৎস্ক পিপল'স রিপাবলিক) এর বিরুদ্ধে কি করে লড়বে আহাদ?
মাত্র তিনমাসের পরিচয়ের বন্ধু, দ্য এজেন্সির এজেন্ট সাব্বিরের কাছে আশ্রয় নেয় কার্ল। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই প্রতিকূলে যেতে থাকে। এক দানবীয় শক্তির ক্ষমতাবলে তার বিরুদ্ধে হতে থাকে একের পর এক ষড়যন্ত্র, যেখানে বিশ্বাস করার উপায় নেই কাউকে। নীতিবান প্রধানমন্ত্রী সোবহানুল ইসলাম কার্লের নিরাপত্তার ব্যাপারে আপোষ করতে রাজি নন কোনো আন্তর্জাতিক পরাশক্তির সাথে। কিন্তু নিজের মা-হারা মেয়ের দুশ্চিন্তা কি তাকে তার অবস্থান ধরে রাখতে দেবে? মৃত্যুপুরীতে দাঁড়িয়ে একজন সাধারণ অপারেটিভ আহাদের পক্ষে কি শক্তিশালী অজ্ঞাত শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে অদৃশ্য ভূরাজনৈতিক জাল ছিন্ন করা সম্ভব? সব উত্তর পাওয়া যাবে নাবিল মুহতাসিমের লেখা বই অবলম্বনে শিল্পী এড্রিয়েন অনীকের আঁকা স্পাই-অ্যাকশন থ্রিলার জনরার গ্রাফিক নভেল 'বাজিকর'এ।
অনেকদিন ধরে কালেকশানে নেওয়ার ইচ্ছে ছিল এমন কিছু মাংগা আর গ্রাফিক নভেল রিসেন্টলি কিনেছি। তখনই হুট করে 'বাজিকর' এর গ্রাফিক নভেল প্রকাশ হওয়ার খবরটা পাই। নাবিল মুহতাসিমের বই থেকে এর আগেও গ্রাফিক নভেল বের হয়েছে। আস্ত উপন্যাস অবলম্বনে বিরাট পরিসরের কমিকস বাংলায় প্রকাশ হচ্ছে দেখে কেনার আগ্রহ ছিল আগে থেকেই, তবে সেগুলো সহজলভ্য ছিল না দেখে সংগ্রহ করতে পারি নি। আর আগের গ্রাফিক নভেলগুলোর মূল বই পড়া হয় নি দেখে সেগুলো নিতে আর ইচ্ছেও করে নি।
তবে বাজিকর বইটা পড়া থাকায়, সেটার অবলম্বনে বানানো গ্রাফিক নভেলটা কেনার লোভ সামলাতে পারি নি। তাই গ্রাফিক বাংলা পাবলিকেশন্স থেকে তাদের 'বাজিকর' সেইসাথে 'সসেমিরা' বইটিও কিনে নেয়। বাজিকর কে ঘিরে এতো আগ্রহের কারণ কি? প্রথমত নাবিল মুহতাসিমের লেখা পুরো 'বাজি ট্রিলজি'ই আমার পড়া। একটা লার্জার দ্যান লাইফ স্পাই সিরিজ হিসেবে সেটা খারাপ না। প্রচুর ওভার দ্য টপ অ্যাকশন দৃশ্য আছে যা অনেক উপভোগ্য। সিরিজের প্রত্যেক বইয়ে লেখনশৈলী আর এক্সিকিউশনে লেখক উন্নতি করলেও শেষের দুটো বইয়ে কাহিনী ক্রমেই অসঙ্গতিপূর্ণ হয়েছে, ট্রিলজির এন্ডিংটাও ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ হয় নি।
তবে গল্প বিবেচনায় সিরিজের সবচেয়ে ভালো বই 'বাজিকর', বলাই বাহুল্য। প্রকাশকাল বিবেচনায় একটা ফ্রেশ প্রেক্ষাপট, গতানুগতিক মালমশলার মোটামুটি গোছানো গল্প, লার্জ স্কেলের বর্ণময় অ্যাকশন দৃশ্য, ভালোভাবে চিত্রিত কিছু চরিত্র আর গল্পের প্রাথমিক বিল্ডআপের পর ননস্টপ থ্রিল; সবমিলিয়ে 'বাজিকর' বইটা আমার বেশ লেগেছিল আর সেটাকে গ্রাফিক মিডিয়ামে ভালো মতো অ্যাডাপ্ট করতে পারলে যে অসাধারণ কিছু সৃষ্টি হবে, তা ভেবেই এই গ্রাফিক নভেলটার প্রতি বেশী আগ্রহী ছিলাম।
তো 'বাজিকর (গ্রাফিক নভেল)' কি আমার এক্সপেক্টেশন পূরণ করতে পেরেছে? উত্তর : এই গ্রাফিক নভেল পড়ে আমি সম্পূর্ণ তৃপ্ত। শুধু সন্তুষ্টিই পাই নি, বাংলা ভাষায় এমন একটা কাজ পড়তে পেরে সত্যি বলতে আমার অনেক আনন্দ হচ্ছে, যেন বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ হলো। আসলে অনেকদিন ধরে আমি এমন কাজের জন্যই তৃষ্ণার্ত ছিলাম, যেই কমিকস (আচ্ছা আচ্ছা গ্রাফিক নভেল) এ একটা পরিপূর্ণ আনফোল্ড হওয়া ভালো গল্প থাকবে, থাকবে সেটার জন্য যথার্থ বিল্ডআপ, ভালো চরিত্র, সংলাপ, আর্টওয়ার্ক আর যেটা সিরিজ আকারে অনির্দিষ্টকালের জন্য অপেক্ষা করে শেষ করতে হবে না, যতোদিনে সব এক্সাইটমেন্টই শেষ হয়ে যায়।
অবশ্যই বাজিকর বইটা একটা গ্রাফিক নভেলের জন্য অসাধারণ একটা সোর্স ম্যাটেরিয়াল। সেটাকে ভালোমতো ব্যবহার করাটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আঁকিয়ের উপর। এই গ্রাফিক নভেল এঁকেছেন শিল্পী এড্রিয়েন অনীক। And he just nailed it. জানি সবার আর্টওয়ার্ক আলাদা স্টাইলের, কারও সাথে কারও তুলনা করা উচিত না। তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে সিনেমাটিকভাবে ডিটেইলড আর রিয়েলিস্টিক আর্টওয়ার্কযুক্ত অ্যাকশন থ্রিলার কমিকস বেশী ভালো লাগে, যা আমি তৌহিদুল ইকবাল সম্পদের কমিকসগুলোতে বেশী পেতাম, তাই কমিক জগতে তাকেই সবচেয়ে ভালো লাগতো (ভালো লাগার আরও কারণ আছে অবশ্যই)। প্রায় আড়াই বছর আগে ইব্রাহিম কমিকসের ৬ নাম্বার পর্বটাতে এড্রিয়েন অনীকের আর্টওয়ার্ক দেখেও আমি অনেকটা সেরকম ফিলই পেয়েছিলাম। ঢাকা কমিকসের পিশাচ কাহিনি আর ইব্রাহিম সিরিজের বইগুলোতে তার কাজ যেভাবে ক্রমেই উন্নত হচ্ছিল, বুঝেছিলাম অনেক ভালো কিছু করবে। কিন্তু এরপর গ্রাফিক বাংলা পাবলিকেশন্স থেকে তার এই আড়াই বছরে চারখানা বিশাল আকারের গ্রাফিক নোভেল বের করা দেখে হতবাক হয়ে যেতে হয়। বাংলাদেশী কোনো আর্টিস্টের পক্ষে এটা করা কি করে সম্ভব! His works clearly show deep dedication and mastery. আর বাজিকর গ্রাফিক নভেলের স্বাদ নিয়ে বুঝেছি, নাবিল মুহতাসিম আর এড্রিয়েন অনীক যুগল বোমা ফেলেছেন একেকটা। বাজুকা হতে নির্গত বোমা 💣💣💣
সম্পূর্ণ বাজিকর বইটাই হুবহু অ্যাডাপ্ট করা হয়েছে গ্রাফিক নভেলে, আমার যদ্দুর মনে পড়ে একটা বিশেষ দৃশ্য ছাড়া আর কোনোকিছুরই পরিবর্তন করা হয় নি। এটা একদিক থেকে ভালো, বইটা থেকে কোনোকিছু কাটছাট করা হয় নি, ফলে গল্পকে অসম্পূর্ণ মনে হয় না। বইয়ের মিনিমালিস্টিক বর্ণনা, সংলাপ আর মনোলগগুলোকে ভালোভাবেই গ্রাফিক নভেল আকারে কনভার্ট করতে পেরেছেন অনীক। মূল গল্পের প্রথম এক তৃতীয়াংশের মতোই এই বইয়েরও প্রায় প্রথম ১৫০ পাতা ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং এর জন্য বেশ স্লো। ক্রমাগত দৃশ্য পরিবর্তন আর প্রচুর চরিত্রের আগমনের কারণে একটু বিরক্তি আসতে পারে। তবে এর পরের অংশটা মূল গল্পে�� মতোই ফাস্ট পেসড, যার পুরোটা জুড়ে বেশ ভালো পরিমাণে প্লট টেনশন আর সাসপেন্স আছে। মূল বইয়ে নাবিল মুহতাসিমের লেখা সংলাপগুলো ভালোই বলতে হবে, গ্রাফিক নভেলে তা পড়তে আরও ভালো লাগে।
অঙ্কনে আর্টিস্ট গল্পের কন্সিস্টেন্সি ভালোমতোই বজায় রাখতে পেরেছেন। আর আর্টওয়ার্ক তো এক কথায় অসাধারণ। বইয়ের সব দৃশ্যগুলোকে অসাধারণভাবে ভিজ্যুয়ালাইজ করা হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের বেহাল দশা কিংবা অ্যাকশন দৃশ্যের লার্জ স্কেলের দৃশ্যপট সবই দূর্দান্ত ডিটেইলের সাথে আঁকা হয়েছে। আর প্রতিটা দৃশ্যের ব্যাকগ্রাউন্ড কিংবা খুটিনাটি ডিটেইলগুলোও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে অনেক দক্ষতার সাথে। ক্যারেক্টর ডিজাইনও দারুণ, বেশিরভাগ চরিত্রগুলোকে আর্টিস্ট তাদের শারিরীক গঠন আর চেহারার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়ে গড়ে তুলেছে। আর সেটাকে পুরো বই জুড়ে ধরে রাখতে পেরেছেনও ভালোভাবে। বিষয়টা চ্যালেঞ্জিং কারণ এই গল্পের বেশিরভাগ চরিত্রই ভিন্ন দেশের আর ভিন্ন জাতের।
সাদা কালো ইলাস্ট্রেশনে এড্রিয়েন অনীক শেডের ভালো ব্যবহার, আলো-ছায়ার কন্ট্রাস্ট, লাইন ওয়ার্কের কোয়ালিটি আর প্যানেলের স্বচ্ছতা সবই ভালোমতো করতে পেরেছেন পুরো গ্রাফিক নভেলে। প্যানেলগুলোর লে-আউট, কানেক্টিভিটিও ভালো ছিল, ফলে বইয়ের আর্টওয়ার্কগুলোকে গ্রাফিক বাংলা পাবলিকেশন্স এর চমৎকার প্রোডাকশন কোয়ালিটির পৃষ্ঠাগুলোয় দেখলে চোখের আরাম হয়। এবার আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, অ্যাকশন দৃশ্যগুলোর ইলাস্ট্রেশন কেমন হয়েছে? আমি বলবো –ভালো. এভাবে হুবহু বইয়ের বর্ণময় অ্যাকশনগুলোকে ভিজ্যুয়ালাইজ করা এতো সোজা ছিল না। তবে এড্রিয়ান অনীক এইক্ষেত্রেও ফাটিয়ে দিয়েছেন।
অনীক অ্যাকশন দৃশ্যের লার্জ দৃশ্যপটগুলোকে তো ভালোভাবে এঁকেছেনই, সেইসাথে চরিত্রগুলোর অঙ্গভঙ্গি, অস্ত্রশস্ত্র আঁকা আর দৃশ্যগুলোকে গতিময় করতে ব্যাকগ্রাউন্ডে মোশন লাইনের ব্যবহার সবকিছুই এক কথায় পারফেক্ট হয়েছে। তাই আমার মতো যারা বাজিকর বইয়ের অ্যাকশন দৃশ্যের ভক্ত তাদের জন্য এই গ্রাফিক নভেলটা একটা ভিজ্যুয়াল ট্রিট হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমার সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য হলো আমেরিকান ড্রোনের সাথে ফাইট সিনটা। আর আহাদের পার্কুরের দৃশ্যগুলোকেও দারুণ ভাবে এঁকেছেন এড্রিয়েন অনীক। তাই সবমিলিয়ে বাজিকর গ্রাফিক নভেলটা আমার অনেক ভালো লেগেছে।
তবে কিছু জিনিস খারাপও লেগেছে। প্রথম সমস্যাটা মূল বাজিকর গল্পেরই। আধ ডজন ভিলেইনের সবাই আলাদা আলাদা ফাইট সিনে নায়ক আহাদের যাতে সুবিধা হয় তাই বারবার ঠিক একই রকম বোকামি করে। নায়ক আহাদও মাইর, ছুরি, গুলি, বোমার শত আঘাতে আহত হইলেও শক্তি একটুও কমে না; আর অতিনাটকীয়তা আর মেলোড্রামা তো আছেই। তবে ট্রিলজির পরের দুই বইয়ে সমস্যাগুলা (বিশেষ করে ভিলেইনেরটা) এতো বেশী যে, বাজিকরের সমস্যাগুলোকে আর সমস্যা বলে মনে হয় না।
আবার মূল বইয়ে ছিঁচকাঁদুনে প্রোটাগনিস্ট আহাদের আবেগকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। তবে লেখনির মাধ্যমে সৃষ্ট ইমোশনকে ভিজ্যুয়ালি অতটাও দেখানো যায় না। আর আর্টিস্ট যেহেতু তেমন নতুন কিছু যুক্ত করেন নি, তাই সেই আবেগগুলোও সেভাবে ফুটে উঠে নি। তবে 'সূর্যের তৃতীয় গ্রহ' অধ্যায়ে আহাদের ইমোশনগুলো দেখানো হয়েছে মোটামুটি ভালোভাবেই। তাই পরে বিষয়গুলোর পুনরাবৃত্তি না হওয়াতে একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। আরেকটা বিষয়, কিছু ফ্ল্যাশব্যাক দৃশ্যকে না এঁকে বরং বর্তমান দৃশ্যটাতে মূল বইয়ের ফ্ল্যাশব্যাকের বর্ণনাগুলোই বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা একটা গ্রাফিক মাধ্যমে দেখা খুবই হতাশাজনক। নতুন কিছু দৃশ্য যোগ করে, আর কিছু না হোক ফ্ল্যাশব্যাকের জন্য দুয়েকটা প্যানেল এঁকেও সমস্যাটা দূর করা যেতো। আর বইয়ের নারী চরিত্রগুলোর ক্যারেক্টর ডিজাইন একটু দূর্বল লেগেছে।
সেইসাথে প্যানেল টু প্যানেল দৃশ্যগুলো কিছু ক্ষেত্রে খুব আলাদা হয়ে যাচ্ছিল, ভালোমতো ফ্লো হচ্ছিল না। আর আহাদের সাথে কর্নেল সেবাস্তিয়ানের প্রথম হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাটের অ্যাকশন দৃশ্যটার গঠন খুব দূর্বল ছিল। আর্টিস্ট জাস্ট আলাদা আলাদা মারামারির ছবি এঁকে সেগুলোকে এক করে দিয়েছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে অতিরিক্ত মোশন লাইন ব্যবহার করে গতিশীল দেখানোর চেষ্টা করা হলেও ছবিগুলো মিলে একটা পূর্ন অ্যাকশন সিক্যুয়েন্সকে ফুটিয়ে তুলতে পারে নি। যদিও একটা বাংলাদেশি গ্রাফিক নভেল হিসেবে বাজিকর আমাকে যা প্রোফাইড করেছে, বছর দুই আগেও তা আমার কাছে অচিন্তনীয় ছিল। আশা করা যায় সব দূর্বলতাগুলো কাটিয়ে ভবিষ্যতে এড্রিয়েন অনীক আর গ্রাফিক বাংলা পাবলিকেশন্স আরও অসাধারণ সব কাজ উপহার দেবে। আপাতত আমাদের উচিত এইধরনের কাজকে বেশী করে সাপোর্ট করা। সবশেষে এটাই বলবো –স্পাই থ্রিলার, অ্যাকশন থ্রিলার পরিশেষে বাংলা কমিক জগতের শ্রেষ্ঠ কাজ এখন পর্যন্ত বাজিকর আমার মতে। 'সসেমিরা'টাও ধরবো শীঘ্রই।
২০১৪ সাল। ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়া বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারন করছে। এর মাঝে ঘটে গেছে দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একদিকে এক অত্যন্ত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গুপ্তসঙ্ঘের খোলনলচে জেনে সিআইএ এজেন্ট কার্ল হাসান সেভার্স পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে। আধা মার্কিনি - আধা বাংলাদেশি এই এজেন্ট আশ্রয় নিয়েছেন মাত্র তিনমাসের পরিচয়ে পরিচিত 'দ্য অ্যাজেন্সি' এজেন্ট সাব্বিরের কাছে, শ্রীমঙ্গলে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ঘাড়-ত্যাড়া সৎ প্রধানমন্ত্রি গাজী সোবহানুল হকের একমাত্র মেয়ে আনিলা বাজিকর জনিসহ উধাও হয়েছেন। ধারনা করা হচ্ছে ঐ প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্রের শহর দোনেৎস্ক বিমানবন্দরে আঁটকা পড়েছেন তারা।
বিনিময়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রির মেয়ের বিনিময়ে 'অক্টোপাস' নামক সঙ্ঘ যেটা অনেক রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে 'হায়ার পাওয়ার' নামে পরিচিত, যে অক্টোপাশের শুঁড় ছড়িয়ে আছে বিশ্বের সকল সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থায়, কিলবিল করছে বৃহৎ সব ষড়যন্ত্র করতে অক্টোপাশের এজেন্ট নামের মানবশুড়গুলি, চায় কার্ল সেভার্সকে। কারণ সিআইএর এই এজেন্ট ইউক্রেনে কর্মরত অবস্থায় এমন কিছু জানতে পেরেছেন যা বিশ্বে অক্টোপাশ বিষয়ে হাঁটে হাড়ি ফাটানোর কিংবা হুইসলব্লো করার বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে তাকে।
বাজিকর। উপমহাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ এসপিওনাজ এজেন্টকে ব্রিটিশ ভারতে 'বাজিগর' বলা হয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এদেশের সেরা এসপিওনাজ এজেন্টকে 'বাজিকর' উপাধীতে ডাকা হয়। যারা নাবিল মুহতাসিমের বাজিকর ত্রয়ী ( বাজিকর, বাজি ও বাজিমাত ) পড়েছেন, তারা জানেন। একজন বাজিকর অবসরে গেলে কিংবা তাকে অন্য একজন হারিয়ে বাজিকরের টাইটেলটা নিয়ে নেয়। বাজিকর জনিকে হারানোর পর কোমায় থাকা দ্বিতীয় সেরা বাবুকে ঠিকঠাক মতো জাগাতে ব্যর্থ হয়ে 'দ্য অ্যাজেন্সি' তৃতীয় সেরা আলী হায়দারকে দলনেতা বানিয়ে ছয়জনের এক টিম পাঠায় দোনেৎস্কে। কারণ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রি কোন বন্দিবিনিময় চুক্তিতে রাজি নন।
দ্য অ্যাজেন্সি। এমন এক গোয়েন্দা সংস্থা যাদের প্রতিটি এজেন্ট যেন এক একটি এটম বোমা। ভয়ানক, নির্মম এবং ক্ষমাহীন ট্রেনিঙে গড়ে ওঠা ছয়জনের টিম ইউক্রেনের লক্ষ্যস্থলে পৌছালে অনাকাঙ্ক্ষীত এক বিশাল ধাক্কা খায়। পূর্ণ এজেন্ট না হওয়া একজন হাই পার্ফর্মেন্স অপারেটিভ আহাদের সামনে এক বিশাল মিলিশিয়া বাহিনীর পাশাপাশি ছয়জন বিভিন্ন দক্ষতার ভাড়াটে সৈন্য পড়ে যান, চরম প্রতিপক্ষ হিসেবে। রহস্যময় কর্নেল সেবাস্তিয়ান যেখানে টিম লিডার।
টানটান উত্তেজনাময় উপন্যাস 'বাজিকর' যা ২০১৭ সালে বাতিঘর প্রকাশনী হতে বের হয়েছিলো, যেখানে নাবিল মুহতাসিমের অত্যন্ত গ্রাফিক ঘরানার লেখনি থ্রিলার পাঠকদের মনে জোড়ে সাড়া দিয়েছিলো, সেই উপন্যাসের গ্রাফিক নভেলে রূপান্তরের অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কাজটি করেছেন কমিক্স শিল্পী এড্রিয়ান অনীক। নাবিলের লেখার স্টাইল এম্নিতেই যথাযথ "ডোন্ট টেল, শো" টাইপের, সেখানে এরকম এসপিওনাজ থ্রিলার যেখানে ইউক্রেনের ঐ যুদ্ধাক্রান্ত শহরকে ফুটিয়ে তুলার চ্যালেঞ্জ, আহাদের পার্কুর দক্ষতা চমৎকার স্কিলের সাথে কমিক্স ফরম্যাটে অঙ্কন করা, কিংবা পুরো উপন্যাসটির গ্রাফিক নভেলে অ্যাডাপ্ট করতে যে পরিমাণ যত্নের প্রয়োজন, যেরূপ ডিটেইলিং এ আঁকা দরকার এবং বাজিকর উপন্যাসের সেই রোলার কোস্টার রাইড যেখানে একবার বইটি নিয়ে বসে পড়লে উঠতে ইচ্ছা করে না, সেই একই অনুভূতি পাঠকমনে 'বাজিকর : গ্রাফিক নভেল' সৃষ্টি করতে সক্ষম, আমার মতে।
তাছাড়া 'শ্বাপদ সনে' 'সসেমিরা' গ্রাফিক নভেলগুলির সাথে পরিচিতদের জন্য এই ৪৩৪ পৃষ্ঠার গ্রাফিক নভেলে আছে কিছু চমক। খুব সঙ্গত কারণে নাবিল ও এড্রিয়ান গ্রাফিক নভেলে মূল উপন্যাসের দুয়েকটি ঘটনা পরিবর্তন করেছেন। অ্যাডাপ্টেশনে এরকম অনেক সময় করা লাগে। গ্রাফিক নভেল শেষে বুঝতে পেরেছি বাজিকর ত্রয়ী নিয়ে কাজ করবেন নাবিল মুহতাসিম ও এড্রিয়ান অনীক। বাংলাদেশে মানসম্পন্ন পূর্ণাঙ্গ গ্রাফিক নভেলের এক নবযুগ শুরু করার পথিকৃৎ হিসেবে এ দুজন ক্রেডিট পেতেই পারেন।
বই রিভিউ
নাম : বাজিকর - গ্রাফিক নভেল প্রকাশক : গ্রাফিক বাংলা পাবলিকেশন মূল বই 'বাজিকর'-এর লেখক নাবিল মুহতাসিম মূল বই থেকে গ্রাফিক নভেলে রূপান্তরে এড্রিয়েন অনীক সংলাপ : নাবিল মুহতাসিম ও এড্রিয়েন অনীক প্রচ্ছদ : এড্রিয়েন অনীক কনসেপ্ট আর্ট সমগ্র - এড্রিয়েন অনীক জনরা : এসপিওনাজ থ্রিলার রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ।
'বাজিকর' উপন্যাসটা বেশ আগে পড়া হয়েছিল, এটার গ্রাফিক নোভেল অ্যাডাপ্টেশনটা সম্প্রতি পড়ে শেষ করলাম একটু একটু করে। আর এটা পড়তে গিয়ে আবারো আবিস্কার করলাম যে আমি শব্দের প্রতি বেশি আসক্ত, শব্দেরা আমাকে বেশি টানে। গ্রাফিক নোভেলে যদিও শব্দের তুলনায় ছবিই বেশি থাকে ডিটেইলড বর্ণনা ফুটিয়ে তোলবার জন্য কিন্তু আমি পড়তে পড়তে একটা সময় গিয়ে সচেতন ভাবেই লক্ষ্য করেছি যে আমার চোখ ছবির তুলনায় ডায়ালগ বক্স, যেখানে ছবির চরিত্রগুলির সংলাপ বা ছবির বর্ণনা বা ঘটনা উল্লেখ করা থাকে সেদিকেই বেশি গেছে ঘুরে-ফিরে সেটা মূল উপন্যাসটিতে লেখক নাবিল মুহতাসিম এর অসামান্য বর্ণনা ভঙ্গির কারণেই হোক বা বাংলা অক্ষরের প্রতি সহজাত টান থেকেই হোক। এতে গ্রাফিক নোভেল পড়ার পুরো মজাটা সবসময় নিতে পারিনি বটে তবে যতটুকু নিতে পেরেছি তার আলোকে বলতে পারি Graphic Bangla Publications এর কাজগুলি যথেষ্ট পরিণত। একটা কাজ যখন অন্য আরেকটা মাধ্যমে রুপান্তরিত হয় তখন কিছু সংযোজন-বিয়োজন হয়েই থাকে তবুও পাঠকের মনের সহজাত নষ্টালজিয়া পূর্বে উপভোগ করে আসা কাজটির প্রতি স্বভাবতই ঝুঁকে থাকে বা সেটার সাথে তুলনা করে বসে নতুন ফর্মের কাজটির সাথে। তাই কিছুটা অপ্রাপ্তি থেকেই যায়। তবে সে কারণে গ্রাফিক নোভেলটির কলাকুশলীদের দিকে অভিযোগের তীঁর ছোড়বার খুব একটা অবকাশ আছে বলেও আমি মনে করি না কারণ তারা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন এবং তাদের যে লেখকের শব্দমালাকে চিত্র হিসেবে ভিজ্যুয়ালাইজ করার বিষয়ে যথেষ্ট মুনশিয়ানা আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না, বিশেষ করে অ্যাকশনের দৃশ্যগুলিতো জবরদস্ত। জীবন্ত। পরবর্তীতে যদি এ গল্প থেকে যদি সিনেমা-ওয়েব সিরিয হয় সেক্ষেত্রে এই ছবিগুলো বেশ কাজে দেবে দৃশ্যায়নের ক্ষেত্রে যেমনটা আমরা প্রয়াত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের লেখার সাথে সাথে ইলাস্ট্রেশন পেয়েছি, ক্যারেক্টার স্কেচ পেয়েছি যেগুলো পরবর্তীতে সিনেমা করার ক্ষেত্রে কাজে দিয়েছে। গ্রাফিক নোভেলটি পড়তে গিয়ে পাতায় পাতায় সিনেমাটিক ফিল পেয়েছি।
বইয়ের প্রোডাকশন গ্রাফিক বাংলার আগের কাজগুলির মতোই টপ নচ। মনোমুগ্ধকর। তাদের থেকে এই লেখকের এ নিয়ে তিনটি কাজ পেলাম। সামনে এড্রিয়ান অনিক-নাবিল মুহতাসিম জুটির আরো অনেক কাজ পাবো এই আশাবাদ ব্যক্ত করে আজ এখানেই ইতি টানছি।