বইয়ের নামঃ বামুনের মেয়ে
লেখকঃ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বইয়ের ধরণঃ সামাজিক উপন্যাস
প্রকাশনাঃ সুচয়নী প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশঃ ১৯২০
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৬০
গায়ের মূল্যঃ ৬০ টাকা
ধর্ম নিয়ে মানুষের উন্মাদনা বহু পুরোনো। মানুষের জীবনে এর চাইতে স্পর্শকাতর কোনো কিছু আছে বলে জানা নেই আমার। ভারত উপমহাদেশে এ উন্মাদনা তথা স্পর্শকাতরতা আলাদা এক মাত্রা লাভ করেছে। ধর্ম নিয়ে ভারতীয় মানুষের বাড়াবাড়ি সম্পর্কে ধারণা দিতে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তার বিখ্যাত "লালসালু" উপন্যাসে লিখলেন, "শস্যের চেয়ে আগাছা বেশি, ধর্মের চেয়ে টুপি বেশি।" এ উপন্যাসে তৎকালীন সময়ের মুসলিম সমাজে প্রচলিত ধর্মকেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তার ও নিজে�� আখের গোছানোর বিষয়টি দারুণভাবে স্থান পেয়েছে।
ঠিক একইভাবে, গোঁড়া হিন্দু সমাজের ধর্মের নামে অধর্ম পালনের কথা নিয়ে বাংলা সাহিত্যের অপরাজেয় কথাসাহিত্যিক বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে লিখলেন এক জনপ্রিয় উপন্যাস। তার নাম "বামুনের মেয়ে"। হিন্দু সমাজে প্রচলিত বর্ণপ্রথাকে কেন্দ্র করে এ উপন্যাসের মূল কাহিনী রচিত হয়েছে। ধর্মীয় দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের আড়ালে অনেকে যে নিজেদের পশুবৃত্তি চরিতার্থ করতে সদা তৎপর থাকে, তাদেরকে নিয়েই এ উপন্যাসের গল্প। পাশাপাশি উচ্চবর্ণের অধিকারী হবার চাইতে যে বিভিন্ন মানবিক গুণাবলীর অধিকারী একজন সত্যিকারের মানুষ হওয়াটা বেশি জরুরী, সে মর্মবাণী-ই যেন এ উপন্যাসের মাধ্যমে আরেকবার প্রস্ফুটিত হয়ে উঠলো। সর্বোপরি, সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের সমাজে মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শয়তানের লুকোনো চেহারা সমাজের কাছে দারুণভাবে উন্মোচন করে দিলেন শরৎচন্দ্র।
উপন্যাসের গল্পের সূচনা হয় উক্ত উপন্যাসের নায়িকার গল্প দিয়ে। গোঁড়া হিন্দু সমাজের প্রেক্ষাপটে একজন মুক্তমনা নারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ধর্মের খোলসে প্রচলিত সমাজে নিজেদের স্থান পোক্ত করে নিয়েছে। এদের বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসে একজন নারী। বর্ণের বিচারে উচ্চ বর্ণের ঘরের সন্তান হয়েও বর্ণপ্রথা নামক ঘৃণ্যপ্রথার বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার হয়ে ওঠে সে। কিন্তু রক্ষণশীল সমাজ তার এ প্রতিবাদ ভালো চোখে দেখে না। শুরু হয় তার বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র। তার বিরুদ্ধে নানা রকম পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা তদবির অনবরত চলতে থাকে। এ সময় তার সহযোদ্ধা হিসেবে অনেকেই এসে তার পাশে দাঁড়ায়। এক পর্যায়ে এক ঘাটের মড়ার বিয়ের পিঁড়িতে গিয়ে বসতে হয় তাকে। শুরু হয় আরেক গল্প। আর এভাবেই এগিয়ে যায় উপন্যাসের গল্প।
এবার উক্ত উপন্যাসের চরিত্র বিশ্লেষণের অংশে আসা যাক। নাম ভূমিকায় রাখা হয়েছে সন্ধ্যাকে। প্রতিবাদী এক নারীর প্রতিচ্ছবি হিসেবে তাকে উপস্থাপন করা হয়েছে। ধর্মের নামে যেসব অন্যায়, অবিচার করা হয় সমাজে, সেসবের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠে প্রতিবাদের ধ্বনি উচ্চারিত হয়। মজলুম মানুষের পাশে গিয়ে সে দাঁড়ায়। এসব কারণে সমাজের অধিপতিদের চক্ষুশূলে পরিণত হয় সে। সমাজের লোকের আরেক চক্ষুশূলের সাথে তার মেলামেশা বাড়লে এর মাত্রা দিন দিন বাড়তে থাকে। এর পাশাপাশি তাকে বাবার আদরের দুলালী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা আহামরি ভালো না হলেও মধ্যবিত্ত বলা চলে। সে অনুযায়ী সে ধনীর দুলালী না হলেও আদর-যত্নের কোনো ঘাটতি ছিল না তার। এ সূত্র ধরে বাবার সাথে দারুণ এক সম্পর্ক তৈরি হয় ছোটবেলা থেকেই। এ সুবাদে তার নিত্যকার সংগ্রামে সবসময় বাবাকে পাশে পায় সে। এভাবে এগিয়ে যায় উপন্যাসের গল্প তথা চিত্রপট।
আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছে অরুণ। প্রগতিবাদী মানসিকতার অরুণ ধর্মের নামে কুসংস্কারকে পায়ে ঠেলে বিলেতে পড়তে যায়। তখন থেকে তাকে ম্লেচ্ছ, অস্পৃশ্য বলে সমাজে একঘরে করে দেওয়া হয়। সমাজপতিরা নিজেদের স্বার্থের তাগিদে এ কাজ করে। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা-ই এমন ছিল। এ সংগ্রামে সে সমাজের বাকি সকলের বিরুদ্ধে লড়লেও তার পাশে পায় সন্ধ্যার পরিবারকে। ধীরে ধীরে এ পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। বস্তুত এ চরিত্রের মধ্য দিয়ে হার না মানা এক প্রতিবাদী, শিক্ষিত যুবককে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি একজন প্রগতিবাদী, সংস্কারমনা মানুষ হিসেবে তাকে উপস্থাপন করেছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এককথায়, অরুণ আধুনিক সমাজের একজন আধুনিকমনা মানুষের প্রতিচ্ছায়া।
উপর্যুক্ত দুইটি চরিত্র বাদেও আরো কিছু চরিত্র এ উপন্যাসে রয়েছে। যেমনঃ গোলোক মুখুর্য্যে, জগদ্ধাত্রী, প্রাণকৃষ্ণ, প্রিয় মুখুর্য্যে, জ্ঞানদা, রাসমণি, ত্রৈলোক্য, বিপিন ডাক্তার, ঠাকুরমা প্রমুখ। এসব চরিত্র গুরুত্বের দিক থেকে নামে গৌণ চরিত্র হলেও বস্তুতপক্ষে এ উপন্যাসের গল্পে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে এসব চরিত্র। পাশাপাশি, গল্পের প্রয়োজনে সৃষ্ট এসব চরিত্রের উপস্থিতির দরুন উপন্যাসের গল্পে আলাদা এক ব্যঞ্জনা যুক্ত হয়েছে। প্রত্যেকের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে আলাদা এক বৈচিত্র্যের সৃষ্টি হয়েছে উপন্যাসের পুরো গল্পজুড়ে। এগিয়ে গেছে উপন্যাসের গল্প।
এবার আসি ভাষার গল্পে। এ আলোচনার শুরুতেই বলে রাখা ভালো যে, শরৎচন্দ্রের লিখনী নিয়ে আলাদা করে বলবার মত কিছু খুঁজে পাইনা আমার এ ক্ষুদ্র জ্ঞানে। বরাবরের মত এ উপন্যাসেও পল্লীসমাজের প্রেক্ষাপটে বাস্তব জীবনের নানা চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এ বইটিতেও ঔপন্যাসিক তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে এক অনবদ্য লিখনী উপহার দিয়েছেন পাঠক সমাজকে। ভাষারীতির দিক থেকে এতে সাধুভাষা রীতিকে অনুসরণ করা হয়েছে বটে, কিন্তু কোথাও কোনো অতিরিক্ত আড়ম্বর ভাব আমার চোখে পড়েনি। গল্পের ধারাক্রম রক্ষার ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও গল্পের ধারা একটু এলোমেলো লেগেছে। ফলে, গল্পের ভাবধারা ধরতে পারাটা পাঠক হিসেবে তেমন সহজসাধ্য মনে হয়নি আমার। সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ভাষার প্রয়োগ হবার কারণে পড়তে তেমন কঠিন লাগেনি। তবে উপমা ও অন্যান্য অলঙ্কারের প্রয়োগ কম থাকায় শব্দচয়নে তেমন বৈচিত্র্য দেখতে পাইনি। অবশ্য এ কথাও একই সাথে সত্য যে, শরৎবাবু কিশোর বয়সী পাঠকদের কথা চিন্তা করে এ উপন্যাসটি রচনা করেছেন। এ কারণে হয়ত এসব বিষয়গুলো অসঙ্গতি হিসেবে ধরা দিয়েছে আমার চোখে। কমবয়সী পাঠক হলে হয়ত আমার অভিব্যক্তি অন্যরকম হত আজ।
সর্বোপরি, এ কথা বলতে চাই, বইটির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে বেশ ভালোই লেগেছে আমার। বিশেষত এর সহজবোধ্যতা ও সহজ-সরল ভাষাপ্রয়োগের বিষয়টি পাঠক হিসেবে নজর কেড়েছে আমার। সবমিলিয়ে, এককথায় অসাধারণ একটি বই। উপর্যুক্ত খারাপ লাগার বিষয়গুলো মাথায় রাখলে, আশা করি, আপনার-ও ভালো লাগবে এ বইটি।
পাঠের অনুভূতি সুখকর হোক!♥