ইতিহাস আর পুরানের মধ্যে মূল তফাত হল ইতিহাস প্রামাণ্য এবং পুরান নয়। কিন্তু ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা ঠিক এতটা সরলরৈখিক নয় কারন ভারতের সুপ্রাচীন সভ্যতায় বহু যুগ পর্যন্ত জ্ঞানের চর্চা ছিল শ্রুতিনির্ভর। তার উপর বহু শাস্ত্রের ভাষা সাংকেতিক। এমতাবস্হায় কেবলমাত্র লিখিত ইতিহাসের উপর ভরসা করে ভারতীয় সভ্যতার আত্মার অনুসন্ধান করা সম্ভব নয়। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে যে প্রশ্ন আমাদের সবাইকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় সেটা হল, “তাহলে কী…
এ আখ্যানের বিস্তার কৈলাশের পাদদেশ থেকে কচ্ছের রান, উত্তরপ্রদেশ থেকে ইরান। এ কাহিনী বয়ে যায় যাযাবরী জীবনের আপাত সারল্য থেকে নাগরিক সভ্যতার জটিলতার আবর্ত অবধি। লেখকের অনবদ্য ভাষা, পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা এবং নিখুঁত চরিত্রচিত্রণে রাজনীতি থেকে প্রণয়, কূটনীতি থেকে বাৎসল্য, সমর্পন থেকে পুরুষকার, সবটাই জীবন্ত হয়ে উঠেছে বইয়ের প্রতিটি পাতায়। এ কাহিনীর মূল চরিত্র সৃষ্টি, স্হিতি আর ধ্বংস।
মোহিনী: দেবায়নের প্রথম স্তবক—এক পৌরাণিক পুনর্জন্মের গাথা
“It is not down in any map; true places never are.” – Herman Melville
(১) ভূমিকা: এক পৌরাণিক স্বপ্নচারণ
“Myth is the collective dream of a culture.” — Joseph Campbell
পুরাণ কখনও অতীত নয়। পুরাণ হলো সেই চেতনার অন্তঃসলিলা ধারা, যা আমাদের ইতিহাসের ছায়ায়, কল্পনার ছাদে, বিশ্বাসের ভিত্তিতে অনন্তকাল ধরে সঞ্চারিত। মোহিনী, সেই ধারা থেকে উঠে আসা এক জ্যোতির্ময় রেখা, এক অনুপ্রবেশ—যা নিছক পুনরাবৃত্তি নয়, বরং পুনর্পাঠে আত্মরহস্যের অনুসন্ধান।
আমাদের পুরাণগুলো যেন এক নিষ্প্রভ জ্যোৎস্নার আলেখ্য, ধূলিমগ্ন পুরাকাব্যের পাতায় নিদ্রিত। কিন্তু প্রতিবর্তের কলমে মোহিনী সেই নিদ্রার চোখে স্বপ্ন ছিটিয়ে দিয়েছে। শাশ্বত শব্দেরা যেন আবার হাঁটতে শুরু করেছে পাঠকের চেতনার পথে। ভাষা এখানে শুধু বাহন নয়—এখানে ভাষা মন্ত্র, ছন্দ হচ্ছে ছায়া, আর প্রতিটি পৃষ্ঠা এক নবযুগের দ্বার।
“या देवेषु हव्यं शृणोति, सा कथम् न भवेत् मोक्षदायिनी?” যিনি দেবতার আহ্বান শুনতে পান, তিনিই তো মোক্ষদাত্রী।
এই উপন্যাস সেই আহ্বান—যেখানে রক্তমাংসের চরিত্রেরা প্রায় ঈশ্বর, অথচ ঈশ্বরত্বের নামে অধিকারহীন।
এখানে মোহিনী এক চরিত্র নন—তিনি এক দর্শন।
রক্তবাহু এক নায়ক নন—তিনি এক প্রতীক।
ত্রি, প্রহ্রাদ, শ্রী, কেতু—এরা ইতিহাস নয়, এরা সম্ভাবনা।
এবং প্রতিটি পদক্ষেপ যেন বলে—
“Myth is not what happened. Myth is what happens.”
এই আখ্যান কেবল দেবতা ও অসুরের দ্বন্দ্ব নয়, এটি হল এক আধ্যাত্মিক রাষ্ট্রের বিনির্মাণ; যেখানে অমৃত শুধু রসায়ন নয়, এক ধ্যান, এক দেহতত্ত্ব, এক চেতনা-সঙ্কলন।
এটি সেই উপাখ্যান— যেখানে “daiva” ও “daitya” শুধু শত্রু নয়, বরং দুই বিপরীতবাহু, যাদের সংঘাতেই সৃষ্টি হয় সভ্যতার ভারসাম্য।
এটি সেই মহাযাত্রা— যেখানে প্রতিটি চরিত্র যেন নিজস্ব গ্রহপথে ঘূর্ণায়মান, তবু কোথাও গিয়ে মিলিত হয় এক দৃষ্টিপাতে, এক তপোবলে, এক অন্তর্জাগতিক আকাঙ্ক্ষায়। এটি সেই পাঠ— যেখানে কালচক্র নিজেই নিজেকে উন্মোচন করে, যেখানে প্রশ্ন আসে— “Who am I in the myth I inherit?”
মোহিনী শুধু কাহিনি নয়, এটি এক ধ্রুবতারা— যা জ্বলে উঠে বলে, “Shadows are not lies. They are merely the truth the light cannot hold.”
এই বই, দেবায়ন— নির্বাসিতদের জন্য নয়, বরং তাদের জন্য, যারা অরণ্যে ভ্রমণ করে আত্মার নকশা আঁকে মেঘের মতো।
এখন বই খুলো, চোখ মেলে তাকাও— এ এক পুরাণ নয়, এ এক শূন্যগর্ভ ঋতু, যেখানে প্রতিটি পৃষ্ঠা একটি যজ্ঞ, আর তুমি—তুমি সেই পাঠক, যিনি পাঠ করছেন শুধু নয়, বরং প্রতিপাঠে নিজেকেও সৃষ্টি করছেন।
আর তখনই বুঝতে পারবে—এই পাঠ এক সরল ভ্রমণ নয়। এ এক অন্তর্জগতের অলৌকিক সেতুবন্ধন। Welcome to Devaayan. Welcome to Mohini.
(২) কাহিনির অন্তঃস্থ সুর: যাত্রা চার দিকে
“Time is the substance I am made of.” — Jorge Luis Borges
চারটি সময়। চারটি জগত। চারটি বর্ণময় জাল।
মোহিনী কেবল এক আখ্যান নয়—এ এক সময়মালার প্রত্নতাত্ত্বিক খনন। এই কাহিনির পটভূমি কোনও একক স্থান বা তিথি নয়—এখানে কাল নিজেই একটি চরিত্র। সে কখনও পথপ্রদর্শক, কখনও প্রতারণাকারী; কখনও নীরব স্রোত, আবার কখনও ঝড়ের মতো ধেয়ে আসা শ্লোকপুঞ্জ।
“Time is not the enemy,” wrote Ursula K. Le Guin, “It is the medium.”
এখানে কাল রক্তমাংসের মতো স্পর্শযোগ্য—সে বহন করে ব্যথা, প্রতিশোধ, বিস্মৃতি, আশাভঙ্গ, প্রেম, প্রলয়। এক একটি পর্ব যেন এক একটি যাত্রাশীর্ষ, যেখানে সময়ের রেখা না সামনে যায়, না পেছনে—বরং ঘুরপাক খায়, কুন্ডলীর মতো, পুরাণের মতো।
চারটি সময়রেখা:
*২১৬ বরাহবর্ষ — এক ভূমিদাস শিশুকে কোলে নিয়ে পালাচ্ছে মরুর ধুলোয়, জানে না সে দিগন্তে কী অপেক্ষা করছে, শুধু জানে—এই ক্ষুদ্র যাত্রা এক মহাযুদ্ধের বীজ।
*৩২০ বরাহবর্ষ — কৃষ্টয়দের ধূলিমাখা প্রান্তর, এখানে দেবতারা কেবল মূর্তি, আর প্রার্থনা উঠে আসে অপূরণীয় শূন্যতার গলা দিয়ে।
*হিরণ্যপুর — অভিজাত নগর, যেখানে রাজপুত্র প্রহ্লাদ প্রশ্ন তোলে উত্তরহীনতার দেয়ালে, আর রাজা ইন্দ্র তৈরি করছেন এক নৈঃশব্দ্য-অস্ত্র, যা পরিণতির আগে প্রতিধ্বনি করে না।
*রাতুল নগরী — সমুদ্রের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অলৌকিক শহর, যেখানে ভবিষ্যতের দ্বার উন্মোচিত হয় এক কিশোরীর চোখে, আর নীলপুরুষের পদস্পর্শে ক্লাইম্যাক্স হয়ে ওঠে এক দেবায়নিক বিস্ফোরণ।
“कालः पचति भूतानि...” (Time cooks all beings into what they must become.) — Bhagavata Purana
এখানে সময় তাপস, আবার জল্লাদ। সে স্মৃতি বুনে, আবার চিহ্ন মোছে। মোহিনী, ত্রি, শ্রী, রক্তবাহু—সবারই ভিতরে সময় ঢুকে পড়ে, তাদের চরিত্র নয়, আত্মা পাল্টে দেয়।
সময় এখানে রৈখিক নয়—সাইক্লিক। চক্রবৎ পরিভর্তন্তে।
যেন শিবের ডামরুর ধ্বনি—প্রতিটি শব্দে সৃষ্টি, প্রতিটি স্তবকে ধ্বংস।
মোহিনী, একসময় যার নামই ছিল বিভ্রম—সে আজ ইতিহাসের আয়নায় দেখে নিজেরই অবচেতনের প্রতিফলন।
“In myth, time folds like silk.” — Jeanette Winterson
আমরা পাঠকেরা যেন দাঁড়িয়ে আছি স্মৃতির একটি পুরনো দরজায়, ঝিঁঝিঁর ডানার নিচে কাঁপা কাঁপা ইতিহাস ঝরে পড়ছে কাহিনির পাতায় পাতায়।
আমরা দেখি— প্রহ্রাদের স্বপ্ন গলে যাচ্ছে রক্তবাহুর চোখে, ত্রি’র দীর্ঘশ্বাসে মিশে যাচ্ছে হিরণ্যপুরের আগুন। শ্রী’র দুর্বার শৈশব এসে আলিঙ্গন করছে মোহিনীকে, আর মোহিনী—সে তো 'সময়' স্বয়ং , বিভ্রান্তির ছায়ামূর্তি।
“We do not remember days, we remember moments.” — Cesare Pavese
এই উপন্যাস তাই দিন, মাস, বর্ষ নয়—এ এক অনন্ত মুহূর্তের পুঞ্জ। যেখানে প্রতিটি দৃশ্য যেন কোনও পূর্বজ পাণ্ডুলিপি থেকে উঠে আসা চিত্রকল্প, যেখানে ঋতু নেই, শুধু চিহ্ন।
আর সময়? সে তো নিঃশব্দে লিখে চলেছে, তার কালচক্রে— “The moving finger writes; and, having writ, moves on.. ” — Omar Khayyam
মোহিনী-র সময় এক অনন্ত কাব্য, যেখানে প্রতিটি স্তবক এক একটি যুগ, প্রতিটি চরিত্র এক একটি যাত্রাপথ, আর আমরা?
আমরা সেই যাত্রার তীর্থযাত্রী, যারা ছায়া আর শিখার মাঝখানে দাঁড়িয়ে শ্রবণ করি—পুরাণের মৌনগান।
(৩) চরিত্রের সংমিশ্রণ: রক্ত, আত্মা ও বেদনার চিত্র
“Character is destiny.” — Heraclitus
কিন্তু ‘মোহিনী’-তে চরিত্র মানে কেবল নিয়তির রেখা নয়, তারা নিজেই নির্মাণ করে এক অলৌকিক ভূগোল—যেখানে অস্তিত্ব আর ব্যাখ্যার মাঝের সীমারেখা ঘোলাটে হয়ে যায়।
ত্রি, শ্রী, প্রহ্লাদ, রক্তবাহু, হিরণ্য, হোলিকা, কুভা, শক্র—তাঁরা কেউ নিছক মানব নন, তেমনই দেবত্বের সোনার খাঁচাতেও বন্দি নন। তাঁরা হলেন “liminal beings”—সীমান্তের বাসিন্দা। পুরাণ ও বর্তমানের, ঈশ্বর ও অসুরের, পৌরুষ ও করুণার, রাজনীতি ও প্রেমের মাঝখানে দাঁড়ানো ছায়াপুতুল—যারা তাদের নিজ নিজ ছায়া দিয়েই গড়ে তোলে এক বহুত্ববাদী মহাকাব্য।
ত্রি—এক নারীর নির্বাসন, এক মানবীর জন্ম। সে যেন Jane Eyre, আবার কখনও দ্যুতি-পূর্ণ দ্রৌপদী, যাকে সমাজ ‘মিথ’ বানিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়, অথচ সে নিজের চরণেই রচনা করে দৈবত্ব।
“She was fire. A survivor. She had walked through flames and emerged forged.” — Rupi Kaur
শ্রী—ত্রয়োদশীর বয়সে যে ভাবে নিজের মেধা, প্রজ্ঞা ও কৌশল দিয়ে রণনীতির ছকে ছুড়ে দেয় এক নতুন বিপ্লব, সে যেন বিদুষী বিদ্যাধরীর ছদ্মবেশে এক অসমাপ্ত দেবী।
প্রহ্লাদ—ভক্তি ও যুক্তির মিলনবিন্দু। সে কেবল এক শ্লোকপাঠী রাজপুত্র নয়, বরং ভারতীয় চিন্তার দ্বৈততার এক মূর্ত রূপ, যে simultaneously ঈশ্বরেও বিশ্বাস করে, আবার ঈশ্বরের নামে হওয়া রাজনৈতিক অস্ত্রায়নকেও প্রত্যাখ্যান করে।
রক্তবাহু—নীল, অলৌকিক, গা-ছমছমে, কিন্তু আদতে এক দর্শনশীল প্রেমিক। সে যেন “Bhīṣma” ও “Shiva”-র মাঝামাঝি কোনো তপস্বী। তার অস্তিত্বে আমরা পাই ‘रागं विहाय शोकं विहाय’—সে ত্যাগ করে সব মোহ, অথচ সেই মোহই যেন তার খোলা দরজা।
শক্র, কুভা, হিরণ্য, হোলিকা—তাঁরা মন্দ নয়, তাঁরা মানব। তাঁদের মধ্যে ঈর্ষা আছে, উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু তাদের পিছনেও আছে ইতিহাসের চাপ, উত্তরাধিকার আর অপূর্ণতা। হোলিকার অস্তিত্ব যেন প্রশ্ন তোলে—কি আসলে নারীঋদ্ধি? আগুনে প্রবেশকারী ভগ্নিনাকি সেই আগুন নিজেই?
লেখক এই চরিত্রদের গড়ে তুলেছেন ঠিক যেন আলিবাবার গুহার গোপন রত্নের মতো। এক একটি উন্মোচিত হলে বাকিরা আবছায়া হয়ে ওঠে—দৃশ্যপটে আসার জন্য প্রস্তুত। পাঠকেরাও ধীরে ধীরে চেনেন তাদের, বোঝেন না এক দৃষ্টিতে—কারণ এরা প্রত্যেকেই বহুমাত্রিক।
এরা সবাই “अहम् ब्रह्मास्मि” (আমি ব্রহ্ম) উচ্চারণ করতে পারতেন, যদি সময় দিত। কিন্তু সময় যে এ কাহিনিতে নিজেই এক ষড়যন্ত্রকারী। তাই চরিত্ররা খুঁজে ফেরে—আত্মার দিক, রক্তের গন্ধ, এবং মুক্তির রাস্তা।
এই উপন্যাসে চরিত্র মানেই উপমা নয়, তারা একেকটি উপপদ—যাদের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকে এই উপাখ্যানের আত্মা।
(৪) ভাষা ও অলংকরণ: সাহিত্যিক ভাস্কর্যের পরতে পরতে
“शब्द एव ब्रह्म” — শব্দই ব্রহ্ম।
এই উপন্যাসে শব্দ কেবল বাহন নয়, বরং এক অলৌকিক আখ্যানের জীবন্ত দেহ। প্রতিবর্তের কলমে ভাষা হয়ে ওঠে যেন কোনও রুদ্র বংশীয় তপস্বীর শ্বাস—আগ্নেয়, অথচ ধ্যানী; প্রাঞ্জল, অথচ প্রতিস্পন্দিত।
এই গদ্যরীতি এক আধুনিক বর্ণমালার কাঞ্চনরেখা—যেখানে তৎসম শব্দগুলো কখনও হয়ে ওঠে ত্রিশূলের ফলার মতো টনটনে, কখনও আবার এক সরস গীতবিন্যাস।
লেখকের অলংকরণ যেন অভ্যন্তরীণ মূর্তির মতো—তা চেঁচায় না, চোখে আঙুল দেয় না; বরং পাশে বসে, ধূপের ধোঁয়ার মতো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে পাঠকের মনোপ্লাবনে। আপনি বুঝতেই পারবেন না কখন আপনার মস্তিষ্ক রাতুল নগরীর রাজপ্রাসাদের মানচিত্র গুনছে, কিংবা কখন হৃদয় কেঁপে উঠেছে কোনও প্রাচীন মন্দিরের নিষিদ্ধ অলিন্দে প্রবেশে।
লেখক এমনসব বাক্য রচনা করেন যা আলাদা করে ‘উদ্ধৃতিযোগ্য’ নয়, কিন্তু প্রতিটি প্যারাগ্রাফে যেন রয়ে যায় এক নিঃশব্দ অভিঘাত। কখনও ত্রির চোখ দিয়ে দেখা এক শুষ্ক প্রান্তর, কখনও শক্রর ক্রোধে আগ্নেয় ভাষা, আবার কখনও রক্তবাহুর অভ্যন্তরে চুপচাপ প্রলয়—সবকিছুতেই মিশে আছে শব্দের অতন্দ্র ইন্দ্রজাল।
এ ভাষা পাঠককে শুধু গল্প বলে না; পাঠককে শিখিয়ে দেয় অনুভব করতে, যেমন— “Language is not the frosting, it is the cake.” — Toni Morrison
তবে, এই ভাষার ভাস্কর্য যখন সম্পাদনার উন্মার্জন ছাড়া প্রকাশ পায়, তখন মাঝে মাঝে পাথরে ধরা খসখসে দাগটি চোখে লাগে। কিছু পাঠ্যচিহ্নিত শব্দের ফুটনোট অনুপস্থিত, পাঠপ্রবাহে সংযোগহীন superscript গুলো যেমন ১৪ বা ২২ নম্বর, পাঠককে বারবার থামিয়ে দেয় এক অকারণ দৃষ্টিভ্রান্তিতে।
এছাড়াও, প্রচ্ছদ নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে হতাশ—পুরাণের অন্তরাত্মা নিয়ে গঠিত এক অসামান্য ফ্যান্টাসিকে মুখবন্ধ করা হয়েছে এক আপাতপশ্চিমা, প্রায় random কল্পবিশ্বের কভার চিত্রে। যেন ছেঁড়া কাপড়ে মোড়া রাজকন্যা, যার সৌন্দর্য বোঝাতে কেবল গুড়ের গন্ধই ভরসা।
তারপরও, ভাষা এখানে সর্বদা উচ্চাসনে— “অঙ্গ অঙ্গ জ্বলে ওঠে ছন্দে ছন্দে, শব্দে শব্দে আগুন খেলে যায়।”
এই গদ্যের দেহে অলংকার নেই এমন নয়, কিন্তু অলংকার যেন রক্তের মতো—অন্তর্মুখী, প্রবহমান, নিজের প্রয়োজনমতো কখনও গাঢ়, কখনও অনুচ্চারিত।
সত্যি বলতে, এই বইয়ের ভাষা এক অভিনব কাব্যিক নাটমণ্ডল—যেখানে পাঠকের মনে হয়, সে আর কাহিনি পড়ছে না; সে এক সুর শুনছে—যার নাম, মোহিনী।
(৫) মহৎ থিমগুলি: অমৃত, দেবতা, মানবতা ও ধর্মচেতনা
“मृत्योर् मा अमृतं गमय।” Lead me from death to the deathless. — Bṛhadāraṇyaka Upaniṣad, 1.3.28
এই উপন্যাসে পুরাণ কেবল উপকরণ নয়—এটি এক অস্তিত্বের পরীক্ষা, এবং অমৃত তার কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্ন তোলে যা বারবার মনুষ্যজাতিকে আলোড়িত করেছে—
What is Amrita? Is it a potion? A promise? Or a perilous dream dressed as deliverance?
এই প্রশ্নের ঘূর্ণিতে জড়িয়ে পড়ে চরিত্রেরা—ভগ, রাহু, কেতু, ত্বষ্টা, এমনকি হিরণ্য কিংবা শ্রী, যারা কেউই শুধু দেবতা নয়, কেউ কেবল দানব নয়—তারা সকলেই প্রবেশ করে এক দার্শনিক আলো-আঁধারির ভিতরে, যেখানে নীতির সীমারেখা সরে যায় বারবার।
এই বইয়ের সবচেয়ে গাঢ় থিম — অমৃতের তৃষ্ণা।
কিন্তু কিসের তৃষ্ণা সেটা? Is it the hunger for immortality, or the refusal to surrender to time? Is it spiritual liberation, or political hegemony with a divine label?
এই দ্বিধার মধ্যেই প্রতিবর্ত রচনা করেন এক অভিঘাতময় দর্শন: অমৃত মানে অমর হওয়া নয়, অমরত্বের দায় নিতে পারা।
একদিকে যখন চরিত্রেরা অমৃতের খোঁজে ধ্বংস করে নগর, হত্যা করে ঋষি, ভাঙে মন্দির—তখনই উপন্যাস আমাদের নিয়ে যায় এক গভীর প্রশ্নে: Are we worthy of Amrita? Or do we merely want it because we fear the void?
এই মুহূর্তে মনে পড়ে যায় T.S. Eliot-এর সেই বিস্ময়কর পর্যবেক্ষণ— “Humankind cannot bear very much reality.”
এই অমৃতপ্রত্যাশা আসলে সেই অক্ষমতা থেকেই জন্মায়, যেখানে মানুষ মৃত্যুর থেকে নয়, অর্থহীনতার ভয় থেকে পালাতে চায়।
এই কাহিনিতে ধর্ম কোন অমোঘ বিধান নয়; বরং এক দৃষ্টিভঙ্গি, এক সামাজিক নির্মাণ, এক আইডিওলজি। দেবতা এখানে ধ্যানী, কিন্তু নরপিশাচও হতে পারে। আর অসুর—তাদের ভেতরেও থাকে প্রেম, স্বপ্ন, করুণা, দ্বন্দ্ব।
সেই জন্যই লেখক যেন মনে করিয়ে দেন— “Dharma is not what you do for the gods, but what you do despite being human.”
এই বইয়ের মূল চালিকাশক্তি হল এই দ্বন্দ্বই—দেবতা বনাম দানব নয়, বরং পবিত্রতার আকাঙ্ক্ষা বনাম আধিপত্যের প্রলোভন।
ত্রি হোক বা রক্তবাহু, শ্রী হোক বা প্রহ্লাদ—সবার পথ এসে ঠেকে এই প্রশ্নে: Who deserves the nectar? And what happens to those who do not drink, but carry it?
শেষ পর্যন্ত মোহিনী এক প্রতিফলন— পৌরাণিক শিখরে দাঁড়িয়ে আত্মিক প্রশ্নে ঝুঁকে পড়া এক কাহিনি, যার ভিতর দিয়ে শোনা যায় এক পুরোনো প্রার্থনা:
"असतो मा सद्गमय । तमसो मा ज्योतिर्गमय । मृत्योर् मा अमृतं गमय ।" — Bṛhadāraṇyaka Upaniṣad, 1.3.28
বলা বাহুল্য, এই বই পুরাণ নয়, পুরাণচেতনা। এটি ধর্ম নয়, ধর্মবোধ।
এটি অমৃত নয়, অমৃতলোভের আয়না।
(৬) পৌরাণিক রিটেইলিং ও পুনর্গঠন: Mythopoeia done right
“Those who do not learn legend are condemned to banal fantasy.”
মিথলোজি না জানলে ফ্যান্টাসি হয় গা-গন্ধহীন, খোসা-চাকচিক্য ছাড়া ফাঁপা কিছু। আর মিথ জানলেই হয় না—তাকে অনুভব করতে হয়, রক্তে শোষণ করে শিল্পে পরিণত করতে হয়। মোহিনী–প্রতিবর্তের কলমে–তেমনই এক রক্তবাহু মিথলোজি, যেখানে দেবতা, দানব, অমৃত ও অস্পষ্টতা সব মিলে গড়ে উঠেছে এক পৌরাণিক কসমস।
এখানে রিটেলিং (Retelling) একঘেয়ে পুনরাবৃত্তি নয়—এ এক রিকনস্ট্রাকশন (Reconstruction)। যেখানে চরিত্রেরা বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসে, হেঁটে যায় আমাদের চেতনার রাজপথে।
"Myth is the secret opening through which the inexhaustible energies of the cosmos pour into human cultural manifestation." — Joseph Campbell
প্রতিবর্ত সেই উন্মুক্ত দ্বারটি আমাদের সামনে মেলে ধরেন। তাঁর মোহিনী কেবল ‘অমৃত-দাত্রী রূপসী’ নয়, সে হয়ে ওঠে—
✦ ভয়ঙ্করী, কারণ সে ভ্রান্তি বোঝে। ✦ সহৃদয়া, কারণ সে স্মৃতি বয়ে বেড়ায়। ✦ ধর্মদ্রোহিনী, কারণ সে প্রশ্ন তোলে দেবত্ব সম্পর্কে। ✦ ঋষি, কারণ সে ধর্ম ও বিষাদের মধ্যবর্তী সীমারেখা চিনতে শেখে।
এখানে মোহিনী সেই সত্ত্বা— “Though she is clad in gold, she bears the burden of void.”
এই কাহিনিতে মোহিনী সেই অস্তিত্ব, যাকে পুরাণ পুরুষেরা “ব্যবহার” করেছিল, কিন্তু যাকে একজন লেখক অবশেষে ভাষা দেন। তিনি আর নন শুধু সেই “অমৃত-বিভ্রান্তি-তরঙ্গিণী”; তিনি হলেন সেই বেদনার ভূগোল, যে জানেন—যা দেবতাদের দেয়, তা মানুষেরও নেয়।
এই উপন্যাসে:
*কশ্যপ শুধু সৃষ্টির পিতা নন, তিনি বিভাজনের স্থপতি।
*ভৃগু শুধু ব্রাহ্মণ নন, কূটকৌশলের চালচিত্র।
*শ্রী শুধু রাজকুমারী নয়, সভ্যতার প্রতীক—উন্মেষ ও প্রলয়ের মাঝের ক্ষণ।
*রক্তবাহু শুধু নীল বীর নয়, মহাসংকেত—শক্তির, ক্ষোভের, এবং মায়ার।
প্রতিবর্ত যে কাজটি করেছেন, তা মিথলোজির মৌলিক দায়িত্ব: সংস্কারের নাড়িভুঁড়ি খুলে, সাহিত্যের শল্যবিদ্যার মাধ্যমে তার নতুন জন্ম দেওয়া।
এখানে ভগবত পুরাণ, রামায়ণ, উপনিষদ, লৌকিক কাহিনি—সব একাকার হয়ে গিয়েছে। মোহিনী এখানে এক ধরনের "mythic inversion"—পুরাতন কাহিনির বিপরীত অক্ষরগাথা।
যেন এক “Lajja” লেখা হচ্ছে “Shakti Purana”-র ভেতর দিয়ে। যেন এক “Arya Stark” দেখা দিচ্ছেন “Devī Māhātmya”-র পাতায়।
শেষমেশ, এই পৌরাণিক পুনর্গঠন পাঠককে মনে করিয়ে দেয়: “The past is never dead. It’s not even past.” — William Faulkner
আর মোহিনী? সে ভবিষ্যতের রূপে, অতীতের আর্তনাদ হয়ে ফিরে আসে। সে চিহ্ন রাখে, পদচিহ্ন নয়— তৃষ্ণার চিহ্ন।
(৭) পাঠ-অভিজ্ঞতা: কল্পলোক থেকে ফিরে আসার বিষণ্ণতা
“All great literature leaves us homesick for a place we’ve never been.” — Walter Benjamin
মোহিনী শেষ হলে, পাঠকের মনে পড়ে না কেবল কিছু চরিত্রের নাম, কিছু ঘটনার পরম্পরা—মনে পড়ে একটা লোক, একটা স্থির জলরাশির কল্পদৃশ্য, যেখানে আমরা কদাচিৎ ছিলাম, হয়তো কখনো যাবো না—তবু যার জন্য হঠাৎ বুক ধড়ফড় করে ওঠে।
রাতুলের রাজ্য, ত্রিপিষ্টপের সুর, হিরণ্যপুরের দণ্ডায়মান রাজনীতি, শ্রী’র সেই এক অদ্ভুত চুপ করে তাকিয়ে থাকা, রক্তবাহুর নিঃশব্দ যন্ত্রণা—সবকিছু যেন পাঠকের মনে রেখে যায় কোনও পূর্বজন্মের অর্ধস্মৃতি।
ত্রি-র চোখ দিয়ে দেখি সমাজের নির্মম বর্জন, শক্র-র চোখ দিয়ে দেখি এক অসুখী বীরত্ব, আর প্রহ্লাদ—তাকে দেখে মনে হয়, কেউ বুঝি “নিঃসঙ্গ সাধু” নামে এক চরিত্রের পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু ছাই গায়ে মেখে সে ফিরে এসেছে আমাদের মাঝে।
এ বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় এসে মনে হয়— আমরা কি ফিরে এলাম বাস্তবে? নাকি বাস্তবই হারিয়ে গেল ওই কল্পলোকের মাঝে?
"विषयेभ्यः परावृत्तः, आत्मानं च आत्मनि एव अवस्थितम्।" (যিনি বিষয় থেকে সরে গিয়ে আত্মাকে নিজের ভিতরেই স্থাপন করেন, তিনিই প্রকৃত দৃষ্টি লাভ করেন।) — কাঠোপনিষদ
এখানে কল্পনা মানে নয় ছয় নয়—এটা একটা অন্তর্জগৎ, এক ধ্রুপদী অনুরণন, যেখানে পুরাণ শুধু গল্প নয়, তা দার্শনিক জরিপ।
শেষ পৃষ্ঠায় এসে পাঠক যেন এমন এক অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হন— "Some books you finish. Others finish you."
মোহিনী দ্বিতীয় শ্রেণির বই—যে পাঠককে শেষ করে। তাকে পুনর্গঠিত করে। তার বিশ্বাসে, তার কল্পনাশক্তিতে, তার অন্তর্দৃষ্টিতে।
এই বই আমাদের শিখিয়ে দেয়—ফ্যান্টাসি কেবল পালানোর পথ নয়, ফ্যান্টাসি হলো সেই আয়না, যেটা ধরে আমরা দেখি বাস্তবকে, আর চিনতে পারি সেই চেহারা— যা আগে কোনওদিন দেখা হয়নি।
“Perhaps, this too is a kind of moksha—not from life, but from forgetting.”
এই বই শুধু পড়া যায় না—এটা মনের ভেতরে বাজে। একবার বাজা শুরু করলে, সে শব্দ থামে না। সে রয়ে যায়, ত্রি-র চোখে, রক্তবাহুর যন্ত্রণায়, শ্রী’র দুর্দান্ত অশ্রুত উচ্চারণে, আর সবচেয়ে বেশি—তোমার নিজের মধ্যে।
(৮) উপসংহার: পাঠের শেষে, এক মহামন্ত্রের উচ্চারণ
এই উপন্যাস পাঠ করতে করতে যেন আমরা হাঁটছিলাম এক পুরাণ-অরণ্যে—প্রতিটি পাতায় ছিল পুষ্প, বিষ, অমৃত আর ধাঁধা। শেষ লাইনে এসে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে যায় কিরাতিনীর সেই রক্তভেজা পিঠ, সেই মায়াজালের ভিতরেও বেঁচে থাকার স্পর্ধা।
আর তারই মুখে উচ্চারিত এক চিরন্তন বাণী— “পথই বর, মোহিনী। পথই ঘর।”
"श्रद्धावान् लभते ज्ञानम्।" (যার মধ্যে আস্থা আছে, সেই-ই জ্ঞানলাভ করে।) — গীতা
এই উপন্যাস সেই আস্থারই রচনা—পুরাণে, কবিতায়, নারীর মধ্যে দেবীকে ও মানুষের মধ্যে অসুরকেও দেখার আস্থায়।
মোহিনী কেবল একটি চরিত্র নয়, একটি অনুভব— একটি উন্মোচন, একটি ইনভোকেশন, একটি দৃষ্টিভঙ্গি—
“Who are the real gods? The wielders of weapons, or the dreamers of words?”
এটি সেই বই যা শেষ হয় না; এটি এক মহামন্ত্রের সূচনা। এখানে যুদ্ধ আছে, প্রেম আছে, বিশ্বাসঘাতকতা আছে, কিন্তু তারও উপরে আছে—এক মহৎ শিল্পের গাথা, যার বর্ণময় সুরে, পাঠক ভুলে যায় সময়ের অস্তিত্ব।
রেটিং: 4.5 / 5
পাঠ-প্রস্তাবনা: যাঁরা “কালদক্ষিণা” পড়ে বন্য আনন্দে ডুবে গেছেন, যাঁরা “The Silmarillion”, “The Book of Lost Tales”, কিংবা Devdutt Pattanaik-এর গভীর পুনর্কথনে প্রেম খুঁজে পান— তাঁদের জন্য মোহিনী এক অভিসার।
এক্কেবারে শেষের কথা: “In the map of myth, Mohini is not a detour. She is the path.”
मोहिन्या पन्थाः एव।
Let the scroll remain unrolled. Let the saga resound. Let Devayan II descend— Let there be Shree.
Because some legends are not told. They are remembered.