‘ভয়’ নামের আদিম অনুভূতিটি মানুষের পিছু ছাড়ে না কখনোই। আলোকিত কফিশপে মুঠোফোনের অলস স্ক্রলিং থেকে শুরু করে গভীর রাতের নির্জন মহাসড়ক; ভয় আমাদের আক্রান্ত করতে পারে যে কোনো মুহুর্তে। আর ভয় হয়ে উঠতে পারে আতঙ্ক, যদি তা হয় ব্যাখ্যাহীন। আমাদের আটপৌরে জীবনের সাজানো ছকও মুহুর্তে বদলে যেতে পারে অমন ব্যাখ্যাহীনতার মুখোমুখি হলে।
কখনো ফ্যান্টাসি, কখনো অতি-চেনা প্রযুক্তি আর কখনো অতিপ্রাকৃত কিছুকে আশ্রয় করে এই সংকলনের গল্পগুলো খুঁজতে চেয়েছে তেমন কিছু ব্যাখ্যাহীনতার সম্ভাবনা।
Shuhan Rizwan is from Bangladesh. His debut novel, a historical fiction named 'সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ (Knight in the Oblivion)' was published in 2015; since then, he published 3 more full-fledged novels. His novels often centered around the geo-political nuances and predicaments of life in contemporary Dhaka.
Apart that, Shuhan is a screenwriter too, and the recipient of Chorki Best Screenplay Award-2022.
Being a Mechanical Engineering Graduate, Shuhan choose to be a fulltime writer since 2020. Now when he is not writing in his muddled studio, he spends most of his time reading, traveling with his wife and watching sports events.
৩.৫/৫ "নয়পৌরে " নিয়ে একটাই দুশ্চিন্তা ছিলো। দীর্ঘ (ও সিরিয়াস) উপন্যাস লেখায় অভ্যস্ত কথাসাহিত্যিক কি ছোটগল্পের আঁটসাঁট বাঁধুনিতে নিজেকে মেলে ধরতে সক্ষম হবেন? উত্তর হচ্ছে : হ্যাঁ। নিজের ঔপন্যাসিক সত্তাকে সুহান রিজওয়ান ঝেড়ে ফেলেছেন এখানে। মেদহীন খাঁটি হরর গল্প লিখেছেন তিনি। অল্প কিছু দুর্বল গল্প থাকলেও (যেমন - বাজি, দ্বিতীয় জন) সামগ্রিকভাবে পুরো গল্পগ্রন্থটি সুখপাঠ্য ও বিষয়বৈচিত্রে ভরপুর। কয়েকটা গল্পের পরিণতি রীতিমতো হতভম্ব করে দেয় (যেমন - ছুরি ধরা, সিডি-সংক্রান্ত জটিলতা।) স্বল্প পরিসরেও চরিত্র চিত্রণে ও তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা তুলে ধরতে লেখক বেশ সফল। ব্যক্তিগতভাবে, যেখানে সুহান সোশাল কমেন্টারি না দিয়ে নিখাদ হরর লিখেছেন, সে গল্পগুলো বেশি ভালো লেগেছে।
"এই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন এবং শক্তিশালী অনুভূতি হলো ভয়, আর সবচেয়ে শক্তিশালী ভয় হলো অজানার ভয়"— ক্লাসিক হরর লেখক এইচ.পি. লাভক্র্যাফটের বিখ্যাত একটি উক্তি। কিন্তু কেমন হবে, যদি সেই অজানা আতঙ্ক সৃষ্টি হয় আমাদের সাধারণ, আটপৌরে জীবনের চরম অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্য থেকেই? লেখক সুহান রিজওয়ান তাঁর হরর গল্প সংকলন বই ‘নয়পৌরে’-তে ঠিক এই ভাবনাটাকেই তুলে ধরবার চেষ্টা করেছেন। নয়টি অতিপ্রাকৃত গল্পের মধ্য দিয়ে তিনি দেখাতে চেয়েছেন, শহুরে জীবনের প্রতিদিনের চেনা কার্যকলাপের মধ্যেও গভীর থেকে নীরবে জন্ম নিতে থাকা, শিউরে ওঠা ভয়ের স্বরুপকে।
সুহান রিজওয়ানের ‘নয়পৌরে’ গল্প সংকলনের প্রতিটি ছোটগল্পই দক্ষভাবে গাঁথা। লেখকের লেখনী বেশ সহজপাঠ্য এবং প্রতিটি গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠকদের আগ্রহ ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট মসৃণ। যদিও গল্পের প্লটগুলোকে পুরোপুরি আনকোরা কিংবা ইউনিক বলা যায় না। লেখক বিভিন্ন বই, সিনেমা, সিরিজের কিংবা অনলাইনে পরিচিত অনেকগুলো কমন কনসেপ্ট, আইডিয়া, কন্সপিরেসি থিওরি নিয়ে কয়েকটা আলাদা রকমের হরর গল্প লিখেছেন। তারপরও ‘ডেড সোলস’, ‘জট’, ‘সিডি-সংক্রান্ত জটিলতা’ আর ‘মাছ বাজার’ গল্পগুলো বিশেষভাবে নজর কারে। কারণ এই গল্পগুলোতে বইয়ের মূল থিম সেইসাথে উইয়ার্ড আর অস্বস্তিকর হরর মুডটাও দারুণভাবে ফুটে উঠে। তবে সংকলনের সেরা গল্প নিঃসন্দেহে ‘সঙ্গী’। স্বতন্ত্র প্লট, সুন্দর ভাষা, পাহাড়ি জীবনধারা ও প্রথার চমৎকার বর্ণনা, অন্ধকারময় আবহ নির্মাণ, গল্পের ভেতরের বার্তা এবং দুর্দান্ত সমাপ্তি—সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি শক্তিশালী ছোটগল্পে পরিণত হয়েছে।
তবে ‘বাজি’ আর ‘ছুরি ধার’ গল্পগুলো তুলনামূলক গড়পড়তা মানের। গল্প দুটোর প্লট সেরকম আহামরি কিছুই হয় নি, তার উপর সেগুলো পড়ে মনে হয়েছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম 'চরকী'-এর কোনো অ্যান্থলজি সিরিজের জন্যে লেখা ব্যর্থ চিত্রনাট্য । অন্যদিকে, ‘স্বপ্ন’ আর ‘দ্বিতীয় জন’ হলো সংকলনের সবচেয়ে দুর্বল গল্প। এই গল্পগুলোতে ছিল না মনে রাখার মতো কোনো কনসেপ্ট বা উল্লেখযোগ্য কোনো চমক; ছিল কেবল দুর্বলভাবে প্রদর্শিত কিছু পরাবাস্তবতার ঝলক। ফলে, এই দুটি গল্প বিশেষ কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি, বরং বিরক্তি সৃষ্টি করেছে বেশী।
সামগ্রিকভাবে, ‘নয়পৌরে’ একটা মোটামুটি ভালো গল্প সংকলন, পাঠের অভিজ্ঞতা খারাপ ছিল না। তবে হাইপের তুলনায় বইটা অতটাও ভালো লাগে নি । সাম্প্রতিক সময়ে পাঠক মহলে এই ধরনের কনসেপ্ট ড্রিভেন স্পেকুলেটিভ গল্পের জনপ্রিয়তা বেশী দেখা যাচ্ছে (যেমন শিবব্রত বর্মণের 'বানিয়ালুলু' ও 'সুরাইয়া', মাশুদুল হকের 'অসচরাচর' )। মাতৃভাষায় লেখা সহজপাঠ্য এবং সহজে কানেক্ট করার মতো প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা ছোটগল্পে অত্যাশ্চর্য কল্পিত ধারণার ছোঁয়া বর্তমান সময়ের পাঠক বেশ পছন্দ করেন দেখা যাচ্ছে। আর এজন্য-ই বোধহয় এই ধারার বইয়ের চাহিদা দিন দিন এত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বছরের শুরুতে আগ্রহের তালিকার শীর্ষে থাকা বইটা পড়লাম।
নয়পৌরে নামের অতিপ্রাকৃতিক গল্প সংকলনে নয়টি ভিন্ন স্বাদের গল্প। অশরীরির উপস্থিতি, তন্ত্রমন্ত্রের জবজড়ং কিংবা জাম্প স্কেয়ারি নয়; গল্পগুলো আধুনিক, অস্বস্তিকর, চিন্তার উদ্রেক ঘটানোর মতো। নিশুতি রাতের অন্ধকারকে পুঁজি করে যে ভয়কে আমরা লালন করি সৃষ্টির আদিকাল থেকে, এই গল্পগুলোতে সেই গতানুগতিক ধারাকেই যেন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে সচেতনভাবে। যেকোন মুহূর্তে, যেকোন পরিস্থিতিতে অতিপ্রাকৃতের উপস্থিতিতে নির্মাণ করা হয়েছে ক্লাইমেক্স। শহুরে প্রেক্ষাপটে, নাগরিক জীবনের বলয়ে আমাদের চেনা-পরিচিত সংশয়গুলোই ঘুরে-ফিরে এসেছে অনৈসর্গিক রূপে।
তাইতো কখনও সোশাল মিডিয়াকে পুঁজি করে মানুষকে কুক্ষিগত করে রাখা কর্পোরেশন, কখনও শহরের ট্রাফিক জ্যাম, আবার কখনও নিষিদ্ধ বিনোদন থেকে জন্ম নিয়েছে নয়পৌরে গল্পরা। সবগুলো গল্পের প্লট ইউনিক বলা যাবে না; পরিচিত প্যাটার্নে কমন প্লটের কয়েকটা গল্প আছে বইতে। পছন্দের গল্প ডেড সোলস, সঙ্গী, সিডি সংক্রান্ত জটিলতা। ভালো লেগেছে জট এবং মাছ বাজার গল্পের গা শিউরে ওঠা মুহূর্ত।
পুরোপুরি কি মন ভরল? না। লেখকের নামটা সুহান রিজওয়ান বলেই বোধহয় প্রত্যাশা আরও অনেক বেশি।
গল্প আমি কম পড়ি আর পড়লেও সময় লাগে অনেক। ৫০০ পৃষ্ঠার উপন্যাস তিনদিনে পড়ে ফেলতে পারলেও ১৫০ পৃষ্ঠার গল্পগ্রন্থ পড়তে সময় লাগে ৪/৫ দিন। একটানে সবগুলো গল্প পড়ে ফেললে মাথায় গিট্টু লেগে যায়। গল্পের আমেজ জমে না। সেজন্য একদিনে দুইটার বেশি গল্প পড়ি না। সকালে একটি গল্প পড়ে সেটার আবেশ নিয়ে সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যায় আরেকটা গল্প পড়ি। সুহান ভাইয়ের বড় বড় উপন্যাস পড়েই অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু এই গল্পের বইয়ের কথা জানার পরই কেন জানি মনে হয়েছিল তিনি গল্পও ভালো লিখবেন। এবং নয়পৌরে একটুও হতাশ করেনি। আসলেই তিনি ভালো লিখেছেন।
ডেড সোলস : সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! এর শেষ কোথায়! এআই আর সোশ্যাল মিডিয়া মিলে কি মানুষকে আর মানুষ রাখবে। ফেবু স্ক্রল করতে গেলে এখন এই গল্প মাথায় ঘুরতে থাকে। জট : মারাত্মক গল্প এটা। শহর কি শুধু নাগরিক জীবনের সুবিধা দেয় নাকি সীমানা অতিক্রম করলে নাগরিকদের থেকেও কেড়ে নেয়। প্রকৃতি! প্রকৃতি! তার বাইরে যাওয়া যাবে না। ছুরি ধার : চরিত্রের আলাপচারিতায় গল্পটা কিছুটা প্রেডিক্ট করতে পেরেছিলাম। জুলাইয়ের কথা মনে করে ভাবতেছি এই পোকা কি প্রতিটি মানুষই তার রক্তে বহন করছে না! বাজি : এই গল্পের লজিকটা ঠিক মতন বুঝতে পারিনি। দ্বিতীয় জন : শেষ পরিণতিতে চমক আছে। আগেভাগে যেটা বুঝা যায় না। সঙ্গী : অভিশাপ হইতে সাবধান হে মানবকূল। তাহা ফলিবেই ফলিবে। ভিন্ন সমাজব্যবস্থার গল্প হলেও উপস্থাপনা সুন্দর ও সাবলীল। স্বপ্ন : আগেভাগে ভবিষ্যৎ জ���না খুব খারাপ তার থেকেও খারাপ সেই ভবিষ্যৎ বদলাতে চাওয়া। তাহলেই সব ভ্যাজাল লেগে যায়। মাছ বাজার : এটাকে অনেকটা সাইফাই গল্প মনে হয়েছে। এটা মন্দ না ক্যাটাগরিতে পরে। সিডি-সংক্রান্ত জটিলতা : মনে প্যাচ থাকলে জটিলতায় পরতেই হবেরে পাগলা। মাফ নাই, মাফ নাই। মন পবিত্র ত দুনিয়া সহজ।
বইটিতে গল্প আছে মোট নয়টি। লেখা, প্রচ্ছদ, কাগজ, বাঁধাই সব মিলিয়ে গল্পগ্রন্থটি চমৎকার লেগেছে। সুহান ভাইয়ের গদ্য এমনেতিই সুন্দর। তবে তিনি মাঝেমাঝে জটিল গদ্যও ব্যবহার করেন, এই বইতে তা একদমই করেননি সেজন্য ধন্যবাদ। নয়পৌরের গদ্য সাবলীল, ঝরঝরে।
আজকা ঈশিতা আপুর করা প্রচ্ছদ দেখে প্রথমে মনে হয়েছে বাহ সুন্দর। গল্পগুলো পড়ার পর মনে হয়েছে ওয়াওওও সুন্দর! কি অসামমম আইডিয়া। চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর প্রশংসা না করে পারা যাচ্ছে না। বইয়ের কাগজ ও বাঁধাই চমৎকার। ব্যক্তিগতভাবে এই হলদেটে কাগজটা খুবই পছন্দ করি। তবে সামান্য টাইপো রয়েছে আশা করছি পরবর্তী সংস্করণে এগুলোর দিকে দৃষ্টি দেবেন।
সিরিয়াস বিষয় নিয়ে লেখালেখি করা ঔপন্যাসিক সুহান রিজওয়ান এবার লিখেছেন হরর গল্প। নয়টি গল্পর সংকলন নয়পৌরে। গল্পগুলোতে তথাকথিত ভূত নেই, তবে গা শিউরে ওঠার মত ব্যাপার-স্যাপার বেশিরভাগ গল্পেই উপস্থিত। কয়েকটা আবার অ্যাবসার্ড ধরনের। নিখাদ ভালো লাগার মত গল্পগুলো হল জট, সঙ্গী, মাছ বাজার ও সিডি সংক্রান্ত জটিলতা। জটের গা শিরশির করা ব্যাপার, সঙ্গীর রহস্য ও বর্ণনা, সিডি সংক্রান্ত জটিলতার ভয়- এগুলোই গল্পগুলোতে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। যদিও সঙ্গীর এন্ডিংটা আরেকটু অন্যরকম আশা করেছিলাম। দ্বিতীয় জন গল্পটাকে আমার সুন্দর জাদুবাস্তব কিছু বলে মনে হয়েছে। বাকি গল্পগুলোর এন্ডিংগুলো আরেকটু অন্যরকম হলে পুরো সংকলনটার প্রতি মনোভাব আরও দারুণ হতে পারত। সুন্দরভাবে বিল্ডাপ করে হুট করেই দুয়েক লাইনে ইতি টানা হয়েছে ওই গল্পগুলোতে। সুহান রিজওয়ান সাহেবের লেখনশৈলী আমার অন্যতম পছন্দের। এখানেও এই ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন নেই। আরামে পড়া যায়। যাদের হরর, উদ্ভট ঘরনার গল্প পছন্দ তাদের ভালো লাগবে সংকলনটা।
গল্পগুলো পড়তে গিয়ে সবচেয়ে সহজে যে ব্যাপারটা লক্ষ্য করলাম সেটা হচ্ছে লেখক অনেক মুভি দেখেন। নয়পৌরে নাম দেখে ভেবেছিলাম কোনো গল্পই পড়ার সময় predict করতে পারবো না। একটাতেও হয়তো prediction মিলবে না৷ তবে আমাকে দারুণভাবে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে। টুকটাক মুভি দেখার অভ্যেস থাকলেই সব গল্পগুলো কোন দিকে যাচ্ছে সেটা সহজেই predict করা যায়। predict করতে পারলেই যে খারাপ এমন না। বরং উল্টোটাই বেশি মনে হয়৷ সচরাচর ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা করা বা ঠিকঠাক শব্দ জোড়া লাগিয়ে পাঠককে খুশি করা একটা বিশাল রকমের ঝাক্কির কাজ। লেখক সহজেই উতরে গেছেন এবং বেশ ভালোভাবেই করেছেন।
নয়পৌরের নয়ের কাটছাট -
এই বই পড়ার আগেই একটা বইতে আমি নিকোলাই গোগলের ডেড সোলস এর কাহিনী জানছিলাম। কাকতালীয়ভাবে নয়পৌরের প্রথম গল্পের নাম ডেড সোলস। এটাও একটা একটা নয়পৌরে ঘটনা। আমাদের সাত-পাঁচ গোনা দিনে কখনো কখনো কাকতালীয় ঘটনা ঘটে, unpredicted শব্দটার হুটহাট ঢুকে পড়ার অভ্যেসও আছে মানুশের জীবনে। এমন বৃত্তের বাইরের কিছু গল্পই লেখক বলবেন ভেবেছিলাম। যতো অলৌকিক, ব্যাখাতীত কিংবা ভয়ের গল্প থাকে সেগুলো হয়তো বৃত্তের বাইরের ঘটনা।
জট আর মাছ বাজার গল্প দুটো শেষটা কাছাকাছি। তবে মাছ বাজারে জেলি জাতীয় জিনিস থেকে একটা মহামারীর সৃষ্টি হওয়ার আইডিয়া বোধহয় একেবারেই নতুন না। আমি এই টাইপের কিছু মুভি দেখেছি (দুঃখিত, নাম বলতে পারছি না। আমার মনে থাকে না মুভির নাম।)। দ্বিতীয় জন, বাজি এই দুটা গল্প কেন জানি interesting মনে হয়নি। মনে হয়েছে এই গল্পগুলো তো জানিই!! স্বপ্ন গল্পটা পড়তে গিয়ে তাড়া খেয়েছি। থ্রিলার পড়তে গেলে যেমনটা হয় তেমনটা। একই তাড়া ছুরি ধার, ডেড সোলস, জটেও খেয়েছি। তবে একটু কম। সবচেয়ে interesting মনে হয়েছে সঙ্গী আর সিডি-সংক্রান্ত জটিলতা এই দুটো গল্প। সিডি-সংক্রান্ত জটিলতা পড়তে গিয়ে বেশ অস্বস্তিবোধ হচ্ছিলো। ঐ অস্বস্তিটাই গল্পের সার্থকতা। লেখক খুব গভীর কোনো গল্প বলতে চাননি হয়তো। খুব হালকা ধাঁচের নরোম শীতল কিছু গল্প। সেই শীতের সকালের রোদটা ১০/১১টার দিকে যেমন কড়া হয়ে জ্বালা ধরায় শরীরে তেমন কিছুই।
সমস্যাটা হয়েছে আমি আসলে অনেক বেশি ছোটগল্প পড়ে অভ্যস্ত। আমার পড়ার অর্ধেকটাই ছোট গল্প। তাই ছোট গল্পের ক্ষেত্রে আমার খুঁতখুঁতানিটাও বড্ড চোখে লাগার মতো। তাছাড়া আমি প্রথম সুহান রিজওয়ানকে পড়েছি। আমার expectations অনেক বেশিই ছিল- উনার অন্য বইগুলোর জন্য। তাই খুব বেশি satisfied হতে পারিনি। তবে জনরা শিফ্টিংয়ের দিক থেকে হিশেব করলে সুহান রিজওয়ানকে বাহবা দিতেই হয়। অনেক ক্ষেত্রে এক জনরায় ভালো লিখেন এমন লেখকের অন্য জনরার লেখা পড়তে গিয়ে বিরক্ত হয়েছি। এই বইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হয়নি। আমার বইটার নাম এবং ভূমিকা পড়েই ১০দিন অপেক্ষা করতে করতে expectations আকাশ ফুঁড়ে পৃথিবী ছেড়ে বের হয়ে গেছিলো বোধহয়। সেইটাই পড়ার সময় গোলমাল বাঁধালো।
ছোটগল্পের রেটিং দেওয়া বেশ মুশকিলের কাজ। তাই মাফ করবেন এই ব্যাপারে।
সবগুলো গল্পই ভালো লেগেছে। খুবই সতর্ক স্পেসিফিক ফ্রেমিং দিয়েছেন লেখক। সচরাচর ছোটগল্পের ক্ষেত্রে এমন দেখি না।
গল্পগুলোর নাম আটপৌরে। লেখনী বেশ ইজি। দীর্ঘ জটিল জবর বাক্য বা শব্দ নিয়ে বিশেষ নাড়াচাড়া হয় নাই। তাই পড়তে খুব আরাম।
প্লট এলোমেলো– হরর, ডিস্টোপিয়ান, অলৌকিক সেটিঙের নানান রূপ ও রঙ। ছোটগল্প পড়তে গেলে আশা থাকে চমকে যাওয়ার, আশা মোটামুটি ফুলফিলড। নয়পৌরে সংকলন হিসাবে ঠিকঠাক, আমার কোনো অভিযোগ নেই।
'নয়পৌরে' নিয়ে আলোচনার শুরুতেই আমি বইয়ের ব্রিলিয়ান্ট শিরোনামটার একটা প্রশংসা করতে চাই। রোজ দিনের নয়টা-ছটা শিডিউল, চিনি ছাড়া কফি, ৫০টাকা ভাড়া, বকচত্ত্বর মোড়, দুই আঁটি পালংশাক, মার্লবোরো অ্যাডভান্স শীর্ষক শব্দসমূহ যে একটা সাদামাটা আটপৌরে জীবনের ফ্রেম তৈরি করে, নয়টি গল্পে যদি সেই আটপৌরে জীবনকে একটা ধাক্কা দেয়া যায়, যার পর আর 'স্বাভাবিকত্ব'-কে সংজ্ঞায়িত করাটা মুশকিল হয়ে যায়, তখন জীবনটাকে আর আটপৌরে বলা চলেনা, নয়পৌরে নামকরণটাই সবচাইতে যুক্তিসঙ্গত লাগে।
দুটো গল্প, বাজি আর দ্বিতীয় মানুষ ছাড়া বাদবাকি প্রায় সবগুলো গল্পই আমার ভালো লেগেছে। ওই দুটো গল্প বর্ণণায় বা জার্নিতে ভালো হলেও প্লট ছিল পরিচিত। এখানে সহজবোধ্য, পরিশীলিত ভাষা আর পরিমিত ভাব গল্পগুলোকে প্লটের চাইতে বেশি সমৃদ্ধ করেছে। একজন পোক্ত লেখক থেকে সেজন্য থ্রিলার, সাইফাই বা হরর জনরার লেখা পাঠকের জন্য উপরি পাওয়া।
অতিপ্রাকৃত গল্পসংকলন বলা হলেও সবগুলো গল্প অতিপ্রাকৃত নয���। শিবব্রত বর্মনের মত মিক্সড কিছু গল্প লেখক উপহার দিয়েছেন পাঠকদের। হরর এলিমেন্ট হিসেবে বেছে নিয়েছেন নিত্যদিনের বিষয়াশয়, মিথ, মানসিকতা আর সম্ভাবণাকে। অশরীরী জ্বীন-ভূতের গল্প এসব নয়। যেমন প্রথম গল্প- ডেড সোলস, ডিস্টোপিয়ান গল্প। মৃত মানুষের আইডি নিয়ে বিগ ফিশ টেক কোম্পানিগুলোর অসহনশীল কাজকর্ম। গেল বছরের সিনেমা CTRL এর সাথে গল্পটার ভাইবে মিল আছে। এর পরের গল্প- জট একটা উইয়ার্ড ফিকশন। জ্যাম জটের মাঝে হঠাৎ করে প্যান্ডোরার বক্স খুলে বেরিয়ে আসা মহামারীর গল্প। ছুরি ধার গল্পটা ইন্টারেস্টিং। কোরবানি ঈদের সেই গল্পটা, সেই রিচুয়ালটা থেকে আধুনিক জামানার বডি হরর হয়ে গল্পটা মোড় নেয় A24 এর হরর সিনেমার কোনো ক্লাইম্যাক্সের মত। এই সংকলনের সবচাইতে চমৎকার গল্পের একটা হল 'সঙ্গী'। (ইনফ্যাক্ট শেষ চারটা গল্পই আমার সবচাইতে ভালো লেগেছে।) লেখক সুহান রিজওয়ানের লেখায় পাহাড়ি পটভূমির গল্প খুব চমৎকার লাগে যা বুঝলাম। পাহাড়ি মিথ কে ঘিরে লেখক একটা মনস্তাত্ত্বিক গল্প ফেঁদেছেন। এই গল্পের সবচাইতে ভালো দিক এর সংস্কৃতি, আচার, প্রকৃতির বর্ণণায় প্রাণ পাওয়া ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং। 'স্বপ্ন' গল্পটা অবশ্যই স্বপ্ন ঘটিত। ট্র্যাজিক হলেও 'ফাইনাল ডেস্টিনেশন' সিনেমার মত মজার, আনপ্রেডিক্টেবল। 'মাছ বাজার' গল্পটাকে সাইফাই বলা যেতে পারে। করোনা মহামারির একটা ব্যাকস্টোরি এই গল্পের সাবপ্লট হয়ে মনোযোগ ছিনিয়ে নিতে চাইলেও সিরাজগঞ্জ উল্লাপাড়ার এক চাইনিজ কনস্ট্রাকশন প্রোজেক্টের বাবুর্চি মনির হোসেনের গল্প বলার ধরণটা আমাকে ধরে রেখেছে। পুরো গল্পটাই মাহাতাব রশিদের আঁকা একটা কমিকের মত চোখে ভাসছিল। চমৎকার গল্প। নামের কারণে প্রথম থেকেই 'সিডি সংক্রান্ত জটিলতা' গল্পটা আমাকে টানছিল। শুরুর দিকটা ভার্সিটির হল জীবনের একটা কালচারকে তুলে আনায় মজা পাচ্ছিলাম। মূল ঘটনা শুরু হবার পর থেকে প্রচন্ড অস্বস্তিতে পরে গেলাম গল্পটা পড়তে গিয়ে। নিঃসন্দেহে উগ্র, বিকৃতরুচি নিয়ে এমন সাহসী আর ব্যতিক্রমী গল্প আগে পড়িনি। এমন একটা গল্প এভাবে পোর্ট্রে করতে পারাটাও একটা আর্ট। 'ব্ল্যাক মিরর' সিরিজের একটা এপিসোড এই টপিকে এমন অস্বস্তি দিতে পেরেছিল।
সুহান রিজওয়ান এই যুগের একজন প্রমিসিং লেখক, এবং বলাই বাহুল্য আমার অত্যন্ত পছন্দের। স্বাভাবিক দিনমানের এলিমেন্টগুলোকে ব্যবহার করে একজন স্বাভাবিক, কন্টেম্পোরারি লেখক হঠাৎ অস্বাভাবিক, অলৌকিক ছোটগল্প লিখবেন উপন্যাসের বিস্তৃত পটভূমি ছেড়ে; বিষয়টায় আর দশজন পাঠকের মত সন্দেহের চাইতে আমার কৌতূহলই বেশি হচ্ছিলো। সাধারণত দেখা যায় জনরা শিফটিং করতে গেলে বেশিরভাগ পোক্ত লেখকই খেই হারিয়ে ফেলেন, তাদের স্বভাবসুলভ রচনার বাইরের বইগুলো হয় খুব ভালো হয়, নাহয় ধরতে আর ইচ্ছা করেনা। লেখক এর আগে যে কটা বই লিখেছেন, তাতে হিস্টোরিকাল ফিকশন, ডিস্টোপিয়া, রাজনীতি, সমসাময়িক উপন্যাসের একটা বৈচিত্র লক্ষ্য করা গেছে। সেই বিচারে লেখকের এমন জনরায় ছোটগল্প দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট একদম ড্রাস্টিকও বলা যায়না বোধহয়। সচরাচর হরর জনরায় লিখে থাকেন এমন বেশিরভাগ বাঙালি লেখককেই উৎরে গেছেন লেখক এই নিরিক্ষাধর্মী বইয়ের সাথে। লেখকের থেকে তাই এই জনরায় আরও বই কাম্য।
নয়পৌরে। বাংলা অভিধানে অনুপস্থিত শব্দটি সুহান রিজওয়ানের প্রথম গল্পসংকলনের নাম হয়ে গেছে। কারণ মানুষের আটপৌরে জীবনে লেখক দিয়েছেন অতিলৌকিকতার মিশেল।
সমসাময়িক ঔপন্যাসিক হিসেবে ইতিমধ্যে খ্যাতির দেখা পাওয়া লেখক 'নয়পৌরে'তে গল্প বলেছেন ভয়ের। ভয়ের কিছু লিখতে গেলেই ভূতের প্রয়োজন সবসময় হয় না। মানবমনের গহীনে নিরবে কিলবিল করা আদিম ভয়ের অনুভূতি ছড়িয়ে পড়তে দরকার শুধুমাত্র আকস্মিক অচেনা কিছু ঘটে যাওয়ার।
মোট নয়টি গল্প বলেছেন সুহান। প্রায় সবগুলি-ই পাঠকের মনে সৃষ্টি করতে পারে অস্বস্তিকর অনুভূতি। নিচে যথাসাধ্য স্পয়লারমুক্ত আলোচনা করছি।
১) ডেড সোলস
গল্পের নাম এবং খানিকটা থিম গোগোলের কাছ থেকে ধার করা হলেও পুরো গ্রন্থে মৌলিকতার বিচারে আমার সবচেয়ে পছন্দ হয়েছে এটি। নিয়াজ নিজের মৃত বোনের ফেসবুক আইডি অনলাইন সেলিব্রিটি বন্ধু মোরশেদের কাছে বেচে দেয়ার পর এক নারকীয় ঝামেলায় পড়ে যায়। কর্পোরেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে সাধারণ একজনের তীব্র অসহায়ত্ব পাঠককে ভাবাবে, করবে বিষণ্ন। হয়তো লেখক ভবিষ্যতের গল্পই লিখেছেন।
২) জট
বহুদিন অফিসে অসুস্থতার কারণে যেতে না পারা এক কলিগের খোঁজখবর নিতে গিয়ে এমন এক জটের সাথে পরিচিত হন পারভীন ও সাদিয়া যা অনেকটা ঢাকার যানজটের এক বাস্তব শয়তানি রূপ যেন।
৩) ছুরি ধার
কোরবানীর সময় কে না ছুরি ধার করায়! নাফিসের পরিচিত ছুরিধারকারির জায়গায় এক ঈদের আগে আগেই হাজির হয় অদ্ভুত একজন, নাফিসের সাথে যার কথোপকথনও আজব ধরণের। স্টিফেন কিং যেমন অস্বস্তির একটা ড্রামা তৈরি করেন গল্পকথনে, লেখক অনেকটা এরকম কিছুই করেছেন।
৪) বাজি
হোটেলমালিক আফজাল মুন্সি কীভাবে ক্রিকেট জুয়ায় এত ভালো করছেন? ঠিক কোন উপায়ে জেনে যাচ্ছেন ভবিষ্যৎ? এতসব জানাটা তাঁর জন্য কতটুকুই বা নিরাপদ। হোটেলে পেটে-ভাতে কাজে রাখা একজনকে নিয়ে আফজালের মহাবিপদের গল্প এটি। শেষের দিকের ধাক্কাটা মন খারাপ করে দেয়।
৫) দ্বিতীয় জন
প্রাইভেট গোয়েন্দা সাজ্জাদ শরীফের কাছে অন্যরকম এক কেইস নিয়ে আসেন এক ভদ্রমহিলা। দিলশাদের মতে তাঁর স্বামী কামাল চৌধুরী আসলে ঠিক সেই ব্যক্তিটি নন। পড়ার সময় অবশ্য টুইস্টটা ধরে ফেলেছিলাম। তবে গল্পটি সুলিখিত।
৬) সঙ্গী
ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার এক পরিবারের নারীরা বয়ে চলছেন এক অপদেবতার ভয়ানক অভিশাপ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ অভিশাপ যেন ঐ পরিবারের জন্য স্বাভাবিক কিছু। বিভৎসতার ব্যাপারটাকে এরকম কোল্ড ব্লাডেড ওয়েতে সুহান যেভাবে দেখিয়েছেন তা প্রশংসার দাবী রাখে।
৭) স্বপ্ন
এক দুঃস্বপ্ন দেখে নাদিম তীব্র ভয়ে তাঁর যাত্রাপরিকল্পনা চেঞ্জ করতে চায়। ভয় একটাই, যদি সেই নাইটমেয়ার ফলে যায়। সংকলনের পাঁচ নাম্বারের মতো 'স্বপ্ন' টাইপ গল্প আমি আগেও পড়েছি মনে হয়। তবে গল্পকথন ভালো লেগেছে।
৮) মাছ বাজার
বন্ধু ফয়সালের অনুরোধে লেখককে অনেকের বিরক্তিকর কমন সব গল্প শুনতে হয়, নিজে আইডিয়া পাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু বাবুর্চি মনির হোসেনের গল্পটা আসলেই অন্যরকম। সুহান একইসাথে ঘেন্নাকর ও অস্বস্তির অনুভূতি সৃষ্টি করেছেন এ গল্পে।
৯) সিডি-সংক্রান্ত জটিলতা
হলরুমে পর্ণ দেখতে গিয়ে রঞ্জু, বাবলু আর ইরতিজা এমন কিছু দেখে ফেলে যা পরবর্তিতে তাদের জন্য সবচেয়ে লজ্জাজনক ও ভীতিকর কিছু বয়ে আনবে। ভালো লেগেছে। শেষের দিকে এরকম চমক আশা করি নি।
'সুহান রিজওয়ানের জার্নাল' এবং 'পদতলে চমকায় মাটি' আমার পড়া ছিলো। পরিচয় ছিলো তাঁর গদ্যভাষার শক্তির জায়গার সাথে। নয়পৌরেতে লেখক সুহান রিজওয়ান গতির দিক দিয়ে দ্রুতগামী, আবার আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ঘটনার সাথে উদ্ভট বিষয়বস্তুর মিশেলটা দিয়েছেন স্বতস্ফূর্ততার সাথে। হাত খুলে লিখলে এরকম ফলাফলই পাওয়া যায়।
ঠিক এ কারণেই নয়টি গল্পে বাস্তব ও প্রতিবাস্তব মিলেমিশে মানুষের আটপৌরে জীবনকে করেছে নয়পৌরে।
বই রিভিউ
নাম : নয়পৌরে লেখক : সুহান রিজওয়ান প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০২৫ প্রকাশক : ��ন্দ্রবিন্দু প্রকাশন প্রচ্ছদ : ঈশিতা জনরা : হরর, অতিলৌকিক রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ।
৯টি গল্প, সবগুলোই সুন্দর, কিন্তু কিছু গল্প বাকি গল্পগুলোকে এতটা ছাড়িয়ে গেছে যে, ভাল হওয়া সত্ত্বেও বাকিগুলো বইয়ের মধ্যে দুর্বল লেগেছে। লেখক তারা চিরাচরিত রীতি ভেঙ্গে হরর ঘরানার মেদহীন গল্প লিখেছেন, এইটা অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। নয়পৌরে হরর বা ডিস্টোপিয়া প্রেমীদের অবশ্যপাঠ্য।
সুহান রিজওয়ানের ছোটগল্পের বই আসবে শোনার পর থেকে আগ্রহ এবং শঙ্কা উভয়ই ছিল। তবে যে শঙ্কায় শঙ্কিত ছিলাম সেটা থেকে সুহান সাহেব মুক্তি দিয়েছেন। ভ���ন্ন ধরনের ৯ টা গল্প মোট, বেশিরভাগ গল্পই ভালো লেগেছে। 'জট' নামক গল্পের পটভূমি ঢাকার বিরক্তিকর জ্যাম, এবং কাকতালীয়ভাবে এই গল্পটা পড়েছি জ্যামে বসেই। গল্পের আধা-ভৌতিক পরিবেশটা রিলেট করতে সুবিধা হয়েছে বলা যায়।
ভাল লেগেছে সঙ্গী গল্পটা, প্লট ছাড়াও গল্পের পরিবেশ আর থিম এর জন্য। তারপর ডেড সোলস, জট, মাছ বাজার।
বাকিগুলো মোটামুটি। তবে সবগুলো গল্পেই ছিল সাসপেন্স, আরামদায়ক গদ্য, অলস ছুটির দিনে পড়ে সময় কাটানোর নিশ্চয়তা, তুলনা চলে সেবা পঞ্চরোমাঞ্চ এর গল্পগুলোর সাথে।
আমিই বোধহয় সবার দেরিতে বই পাওয়া প্রি-অর্ডারকারী! বই আসতে বিলম্ব হয়েছে বলে প্রকাশনীর উপর যে খাপ্পা হয়েছিলাম তা মিইয়ে গেল বই খুলে লেখকের অটোগ্রাফ দেখে।
ভয়ের হিসেবে প্রচার পেলেও অধিকাংশ গল্প আমার কাছে ভয়ের চেয়ে অস্বস্তির ছিল বেশি। কিছুদিন হয় টানা বেশি সময় বই পড়া যাচ্ছে না, চোখ বাগড়া দিচ্ছে, ভেবেছিলাম বইটা তাই অল্প অল্প করেই পড়া লাগবে, কিন্তু শুরু করে আর থামা যায়নি, একটানা পড়ে ফেলতে হয়েছে। গল্পগুলো ধরে রাখে। শুরু করলেই হলো, এরপর শেষ না করে উঠা যায় না। সুহান রিজওয়ানের নিয়মিত পাঠকরা অবাক হবেন এ বইয়ে তাঁর সরল গদ্যভাষা দেখে। বইয়ের ঘরানা অনুযায়ী হয়তো এই ভাষাটাই যথোচিত।
সুহান রিজওয়ান উপন্যাস লেখেন, এবং সেগুলো আকারেও হয় ভদ্রস্থ। কিন্তু, ছোটগল্প লেখতে গেলে মাথায় রাখতে হয় সাইজ। কারণ, বেশি বড় করা যায় না। আনা যায় না নানা আলাপ।
ঔপন্যাসিক সুহান রিজওয়ান তাই যখন গল্প লেখেন তখন তাকে গল্পকারই মনে হয়। সুন্দর শুরু দিয়ে তিনি পুরোটা সময় ধরে পাঠককে মনোযোগ রাখতে বাধ্য করে মানানসই সমাপ্তির মধ্য দিয়ে গল্পপাঠ করান। স্বপ্ন নামের গল্পটির অনুমিত সমাপ্তি বাদ দিলে আর বাকি সবগুলো গল্পই অত্যন্ত সুলিখিত।
অতিপ্রাকৃত, থ্রিলার নাকি ফ্যান্টাসি.. এই বইয়ের গল্পগুলো ঠিক কোন ঘরানার তা এক বাক্যে বলা কঠিন। জোর খাটিয়ে এক শব্দে বলা যেতে পারে, ‘অদ্ভুতুড়ে’। ছোটগল্পের পুরো আবহ ধরে রেখে অধিকাংশ গল্পই শেষ হয়েছে ক্লিপহ্যাঙ্গারে যেন গল্পের শেষেও মনে হয়, আরও কিছু বাকি রয়ে গেছে.. এই অপূর্ব খেদের মধ্যে পরিতৃপ্ত হওয়ার মতো যথেষ্ট রসদ এই বইয়ে আছে।
৯টি গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে ‘নয়পৌরে’র জগৎ। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে লেখা হলেও কোথাও যেন এক অদ্ভুত সুতোয় গাঁথা আছে এই গল্পগুলো। গল্পের প্লট সিলেকশন নান্দনিক। স্টোরিটেলিংয়ে আছে স্বতঃস্ফূর্তভাব। এমন গল্পের জন্য ভাষা যেমন হওয়ার কথা, এই বইয়ের গদ্যভাষা ঠিক তেমনই। এফোর্টলেস ল্যাংগুয়েজ, ওয়েলকামিং সুর। সবমিলিয়ে গল্পগুলো পড়তে পাঠককে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না। তারচেয়েও মজার ব্যাপার গল্পের প্লটের জন্যই পাঠক শুরুতেই হুকড হয়ে যাবে, শেষটা জানার জন্য।
‘ডেড সোলস’ থেকে ‘বাজি’ প্রতিটি গল্পের প্লটই নতুন, আছে আধুনিকতার ছোঁয়া। ‘দ্বিতীয়জন’ গল্পের যেমন অ্যালেন পো’র ভৌতিক আবহ আছে তেমনই ‘সঙ্গী’ গল্পে আছে প্রাচীন মিথের ছোঁয়া। নিজের মৃত্যুর খবর আগে থেকে পেয়েও নিয়তিকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারা নাদিম কিংবা ‘মাছবাজার’ গল্পের সে’ই উইয়ার্ড জেলির পরিচয় জানা না গেলেও, গল্প পড়তে পড়তে পাঠক আমরা বুঝতে পারি, অস্বস্তির জন্ম কোথায়! পুরো ভ্রমণ শেষে তাই অমীমাংসিত থাকা ‘সিডি সংক্রান্ত জটিলতা’ও আমাদের ভালো লাগে।
কোন ভণিতা নয় বরং প্রথম বাক্য থেকেই গল্প বলে যাওয়ার এই প্রসেস, পাঠক হিসেবে আমার বেশ লাগে। গল্পের ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই, সবই বেশ! তবু, কিছু গল্প পড়তে পড়তে পাঠক মন যেন পুরোপুরি তৃপ্ত হতে পারছিল না, মনে হচ্ছিল, কোথাও কোন মিসিং লিংক হয়তো আছে.. যে মিসিং লিংকের জন্য ২/১টা গল্পকে গিমিকধর্মীয় মনে হয়েছে বটে। তবে, সবমিলিয়ে, সুহান রিজওয়ানের গল্পের এই নয়া যাত্রা ভালো না লাগার বিশেষ কোন কারণ নাই, কারও থাকারও কথা না হয়তো!
সুহান রিজওয়ানের উপর দাবি বেড়ে গেল। গল্পগুলো একটা আরেকটাকে ছাপিয়ে গেছে জাস্ট। রাজধানীর তীব্র জ্যামে আটকে থাকতে থাকতে যদি জট গল্পটা পড়েন অস্বস্তিতে শিওরে উঠবেন মাস্ট! পুরোপুরি হররও বলা যায় না, ক্রিপি কিংবা কিছুটা উইয়ার্ড? আমি এই বইয়ের জনরার নাম ঠিকঠাকমতো বলতে না পারলেও ব্যাখ্যাহীন অতিপ্রাকৃতিক কিছু কিংবা ফ্যান্টাসি উপজীব্য করে লেখক যে নয়টা গল্প ফেঁদেছেন, সে বইয়ের নামকরণে যে কোন ভুল নেই, তা নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি। ভাল্লাগসে প্রচণ্ড।
ইনসমনিয়া এড়াতে স্বল্পকালীন সময়ের জন্য ঘুমের অষুধ খেতে গিয়ে, সেটার উপরে ডিপেন্ডেন্সি ক্রিয়েট হওয়ার মতো আমার একটা ডিপেন্ডেন্সি আছে।
সেটায় পরে আসছি, তার আগে অপরিচিত শব্দ নয়পৌরে গল্প সংকলন সম্পর্কে কিছুটা বলে নেই। লেখক সুহান রিজওয়ান এখানে নয়টা গল্পকে জায়গা দিয়েছেন। সেইজন্য বইটার নাম নয়পৌরে দিয়েছেন ভেবেছিলাম প্রথমে!
তবে লেখক এখানে আমাদের অতি সাধারণ, গৎবাঁধা, বোরিং, খুব রেয়ারলি ঘটে যাওয়া পরাবাস্তব ঘটনা ঘটে যাওয়া জীবনের বাইরে শুনিয়েছেন ভয়ের আরেক জগতের গল্প।
ভয় শুধু মাত্র অশরীরী থেকে আসে না, আমাদের বাস্তব জীবনের ভয় আসে অজানা থেকে, আনএক্সপেক্টেড পারসন আর ইনসিডেন্ট থেকে; লেখক সুহান রিজওয়ান এটাকে পুঁজি করে লিখেছেন নয়টি গল্প।
গল্পগুলোর লিখনশৈলী বেশ দ্রুতগতির। লেখকের উপন্যাসের খ্যাতি শুনেছি৷ গল্প সংকলন সম্ভবত এটিই প্রথম। এ বছর উপন্যাসে গ্রিপ বসাতে পারছিলাম না, গল্প সংকলনই এই অন্ধের যষ্ঠি।
উপন্যাসের মতো শক্তিশালী লিখনশৈলী কিনা সেটা বলতে পারছি না, তবে গল্পগুলো এগিয়ে যায় তরতরিয়ে, স্লো ওয়াইফাই নেটওয়ার্কে মুভি ডাউনলোডের মতো হঠাৎ থেমে যায় না কোথাও। কিন্তু, উপন্যাসগুলোর রিভিউ পড়ে যতটা আশা নিয়ে গল্পগুলো পড়েছি, ততটা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তবে এটা নেগলিজিবল৷ লেখক উপন্যাস আর ছোটগল্পে আলাদা লিখনশৈলী এপ্লাই করতেই পারেন।
গল্পগুলোর প্লটের ক্ষেত্রে যদি আসি, কিছুটা বোধহয় সাইফাই ভাইব, অতিলৌকিক অথবা পরাবাস্তব যাই হোক না কেন, নয়টি গল্পের কিছু প্লটে মনে হচ্ছিলো "এ আবার কী প্লট রে বাবা!" একটা গল্পের টুইস্ট প্রায় প্রেডিক্ট করে ফেলেছিলাম, শেষে গিয়ে প্রেডিকশন মেলেনি৷ খুব অদ্ভ��ত ঘটনা নয় এটা, তবে এটা লেখকের সার্থকতার হলমার্ক।
প্রথম গল্পেই লেখক আমাকে বাজিমাত করে দিয়েছেন। ডেড সোলস গল্পটা ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যেই অন্ধকার দিক আর ভয় আমার মধ্যে জাগিয়ে তুলেছেন, সেটার বাস্তবতা উপলব্ধি করে আসলেই ভয় হচ্ছে৷
ডেড সোলস একটা স্রেফ গল্প হতে পারে। আবার হতে পারে লেখক বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটা বার্তা দিয়ে গেলেন।
রিভিউটি শেষ হলো!!
গল্প সংকলনের সংক্ষিপ্ত রিভিউ লেখার এই ডিপেডেন্সি তথা বাতিকটা ছাড়তে পারব কিনা জানি না৷ একটা গল্প সংকলনের ৯/১০/১৫ টা গল্পের আলাদা আলাদা পরিচয় দিতে আমার ধৈর্য কুলোয় না।
প্রিয় উপন্যাস লেখক যখন কোনো বই বের করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটা এক্সপেক্টটেশন তৈতৈরি হয়ে যায়। আবার তা যদি উনি সচারাচর যেমন লিখেন সে ধারার বাইরে হয়, তবুও সেই এক্সপেক্টটেশন বাড়ে বই কমেনা। "ডেড সোলস" দিয়ে শুরু হয় গল্পের ধারা। একদিকে যেমন "AI" এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব উঠে এসেছে, তেমনি ক্ষমতার প্রভাবে যেকোনো কিছু করে পার পেয়ে যাবার ব্যাপারটাও উঠে এসেছে। এটা কী ক্ষমতা হাতে পাবার ক্ষমতাশীনদের যা ইচ্ছে তা করে পার পেয়ে যাবার ব্যাপারটা উল্লেখ করে না? এই গল্পটা একদিকে যেমন ডিস্টোপিয়ান ধরা যায়, তেমনি সমসাময়িক ধারাতেও ফেলা যায়। আমাদের দায়বদ্ধতার দিকেও তীক্ষ্ণভাবে প্রশ্ন করা হয়। এর পরে এসেছে আমার প্রিয় গল্প "জট"। ইদানীংকালের আমার সবচেয়ে বড় সমস্যাবিষয়ক গল্প এটা। যানজট। এই সমস্যাকেই হররে রূপান্তর করা, ঠিক গল্পের একই রকম সমস্যা না হলেও যানজট আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সময় নিয়ে ফেলছে, সেই বিষয়টি আমার চমৎকার লেগেছে। ৯ টা গল্পের নয়পৌরে যেনো খুব সাবলীল। একেভাবেই যেনো সহজ, রিলেটেবল সব বিষয়। যদিও বাজি গল্পের ধারা আমার মাথায় ডুকে নি। কিন্তু অন্যগুলো সব কমবেশি ভালো লেগেছে। আমাদের নিত্য দিনের অনেক গল্প উঠে এসেছে। তবে অল্প-সল্প টুইস্ট আছে। দেবতার অভিশাপ, কিংবা করোনাকে নতুন একটা গল্প দিয়ে দিয়েছেন।
নয়পৌরের বেশিরভাগ গল্পই চমৎকার। এই চমৎকারের যাত্রাটা শুরু হয় প্রথম গল্প 'ডেড সোলস' থেকে। 'মাছ বাজার', 'সিডি সংক্রান্ত জটিলতা'ও বেশ ভালো। তবে আমার কাছে সেরা লাগছে 'ছুরি ধার' গল্পটা। ইব্রাহিম (আঃ) এর কুরবানীর ঘটনার মর্ডান ডে অ্যাডাপ্টেশান জোস হইছে। কিছু গল্প মোটামুটি লাগছে আর একটা গল্প জঘন্য লাগছে (গল্পের নাম বাজি)। এই গল্প উনি লিখছে দেখে হয়তো পাবলিক কিছু বলবে না, নতুন কোনো লেখক বা আমি লিখলে পাবলিক যা তা বলতো আমার ধারণা।
গল্প সংকলন আমার পড়তেই মজা লাগে। ভীষণ উপভোগ করি। 'নয়পৌরে'-র বেলাতেও ব্যতিক্রম না।
'নয়পৌরে' পড়তে গিয়ে মনে হলো, বাস্তবের গায়ে কেউ অদ্ভুত ছায়া লেপে দিয়েছে যেনো। ঘোর লাগে। ৯ টা গল্প দিয়ে সাজানো বই। কোনোটা সাইফাই জনরার, কোনোটা ভৌতিক, কোনোটা ফ্যান্টাসি। কোথাও অতিপ্রাকৃতের ফিসফিসানি, কোথাও অচেনা অস্বস্তির ঠান্ডা বাতাস। যেগুলার ব্যাখ্যা আসলে হয় না।
সুহান রিজওয়ানের লেখা সহজ, ভাষা সহজ। কিন্তু বর্ণনায় রহস্যের ঘনত্ব আছে ব্যাপকভাবে। যা খুবই চমৎকার। অসাধারণ লেখনীশক্তি লেখকের। এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। প্রতিটা গল্পই শেষ হয় একটা ছোট ধাক্কায়, যা মাথায় চলতেই থাকে পড়া শেষ হবার পরেও। প্রত্যেকটা গল্প যে সমানভাবে চমৎকার হবে না, এইটা আশা করি বলে দিতে হবে না। তবে হ্যাঁ, নতুনত্ব পেয়েছি। এইটা জোশ লেগেছে।
সবমিলিয়ে, যারা অদ্ভুত, রহস্যময়, ডার্ক ঘরানার গল্প পছন্দ করেন, তারা অবশ্যই 'নয়পৌরে' পড়বেন। নি:সন্দেহে এক দারুণ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন। শুভরাত্রি!
"ভয়" বলব না, বরং বলব "cringe" এই গল্প গুলোর প্রধান উপজীব্য। যে কলম "গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে" আর "মুখোশের দিন বৃষ্টির রাত" এর মতো লেখা বের করে সে একই কলমে কী করে এর ধরনের বেশ অ্যাভারেজ বা বিলো অ্যাভারেজ গল্প লেখা যায় সেটা ভেবে খুব আশ্চর্য লাগল। তবে যতটুকু খেয়াল করেছি সুহান রিজওয়ান প্রতি বইতেই নতুন কিছু না কিছু করার চেষ্টা করেন - সেটা নতুন জনরা হোক বা নতুন আঙ্গিক - আর মানুষের সব এক্সপেরিমেন্টই যে সফল হবে এটা আশা করা যায় না। আমার কাছে এই বইটা তাঁর এরকমই অসফল একটা প্রচেষ্টা মনে হয়েছে।
এই বইয়ের একটা মাত্র গল্প শুধু আমার ভালো লেগেছে সেটা হল "ছুরি ধার"। ছোটবেলা থেকে ধর্ম বইতে পড়া কুরবানির ইতিহাস যা সবাই আমরা জানি সেটা নিয়ে লেখা একটা গল্প। শ্বাপদের দাঁত ওয়ালা একটা লোক নির্জন গ্যারেজে ছুরি ধার করছে - পড়তে পড়তে বেশ গা ছমছমে অনুভূতি হবে। ভৌতিক- আধিভৌতিক, সাই-ফাই ধরনের জনরা গুলোতে যখন এরকম মিথ-পুরাণ, ধর্মগ্রন্থের কোন ঘটনা বা লোককাহিনীর কোন উপদান থাকে তখন আমার মতে অন্য রকম সুস্বাদু হয়। তাছাড়া এ গল্পের শেষের মোচড়টাও বেশ অপ্রত্যাশিত ছিল। আবার আহামরি ইম্প্রেসিভ না হলেও "স্বপ্ন" গল্পটা একদম ফেলে দেয়া যায় না। এই গল্পটাও বেশ "off guard" পাঠককে ধরতে পারে। আমার মনে হয়েছে ভৌতিক বা সাই-ফাই বা যাই বলি না কেন genre fiction যে ধারাটা নিয়ে সুহান এই বইতে কাজ করতে চেয়েছেন সেটার গুরুত্বপূর্ণ একটা অনুষঙ্গ ছিলো সাসপেন্স। অন্তত এই দুটা গল্পের জন্য তাই দুটা স্টার।
চরম ভাবে হতাশ হয়েছি "বাজি" গল্পটা পড়ে। আমার এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না তবে এরকম একটা ক্লাসিক ঘরানার সুপারন্যাচারাল গল্প আমার নিজেরই পড়া আছে - একটা ছোট মেয়ে না দেখে ঘড়ির সময় বলতে পারত। তাদের ঘরের একটা ঘড়িতে যতটা বাজত সে না দেখেই ঠিক ঠিক বলে দিতে পারত। পরে একদিন দেখা যায় ঘড়িটা বন্ধ হয়ে যায় দম না দেয়ার কারনে আর সে মেয়েটা বার বার সেই বন্ধ হয়ে যাওয়া সময়টায় বলতে থাকে তাকে পরীক্ষা করতে আসা ডাক্তারদের কাছে। অন্য কোন লেখকের প্লট থেকে আইডিয়া মাথায় আসা দোষের কিছু না কিন্তু সেক্ষেত্রে নিজের কাজটায় কিছু ইনোভেশন আনা উচিত, কিছুটা নতুন বোতলে পুরান মদ টাইপের হওয়া উচিত। আর "সিডি-সংক্রান্ত জটিলতা", "দ্বিতীয় জন" এসব গল্পের প্লটেও বিন্দুমাত্র কোন অভিনবত্ব ছিলো না, এতো বেশি প্রেডিক্টেবল। এগুলো zee horror show বা sony tv এর "আহাট"এর এপিসোড গুলোর মতো একেবারে খেলো ধরনের লেগেছে আমার কাছে।
body horror গোছের লেখা বলা যায় "জট", "সঙ্গী" (জানি না এটার প্লটও Teeth(2007) সিনেমাটার থেকে ইন্সপায়ার্ড কি না!), "মাছ বাজার"। শুধু "মাছ বাজার" গল্পটা বডি হররের যে ঘিনঘিন ফীলটা ওইটা কিছুটা দিতে পেরেছে কিন্তু ওই সেই একই মিসির আলি কিসিমের সেটাপ - ভিক্টিম আসছে একজন জ্ঞানী লোকের সাথে আলাপ করতে ইত্যাদি ইত্যাদি। বাকি দুটা গল্পের মধ্যে "জট" তেমন টানেইনি। "ডেড সোলস" গল্পটা যে ডিস্টোপিয়ান হরর থিমে লেখা সেটা এতো এতো সিনেমা-সিরিজ-বইতে মানুষ দেখে ফেলেছে যে গল্পটা পড়ার সময় "same old, same old" ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।
তবে একটা অবজার্ভেশন যেটা না বললেই না, এই বইটার গল্পগুলোর ভাষা বা ন্যারেটিভের স্টাইল বেশ "অ-সুহানীয়"। মানে আগের পাঁচটা বইয়ের গদ্যের সাথে এর কোন মিল নেই - এখানে গদ্যকার সুহানের চেয়ে গল্প বলিয়ে সুহানকেই বেশি পাওয়া গেছে। অনেক সমালোচনা করলাম "নয়পৌরে" বইটার কিন্তু এই ব্যাপারটার জন্য প্রসংশা না করলে সেটা অন্যায় হবে৷
উপন্যাসিক সুহান রিজওয়ান এর প্রথম ছোটগল্প সংকলন ' নয় পৌরে'। মোট নয়টা ছোট গল্প নিয়ে এই বই।
উপন্যাসিক সুহান রিজওয়ান উপন্যাসের বিশাল ব্যপ্তির মধ্যে থেকে বের হয়ে দারুণ কিছু ভয়ের গল্প নিয়ে এসেছেন। উপন্যাসের বাইরে এসে এ আলাদারকম এক সৃষ্টি, বিষয়বস্তু ভয়ের হলেও বৈচিত্র্যময়। ভালো লেগেছে। দুই একটাতে একটু বেশী ভয় লেগেছে।
▪️আটপৌরে শব্দটার সাথে তো আপনারা পরিচিত। নয়পৌরে শব্দটা কি শুনেছিলেন এর আগে? শুনে না থাকলে, চলুন একটু আলাপ দিই।
সুহান রিজওয়ান আমার পছন্দের একজন ঔপন্যাসিক। তার উপন্যাসগুলো আমার ভীষণ ভালো লাগে। তিনি উপন্যাস লিখতে গিয়ে হয়তো ভাবলেন এবার গল্পে মনোনিবেশ করা যাক! ফলশ্রুতিতে প্রকাশ পেল “নয়পৌরে” গল্প সংকলন। একটি গল্প সংকলনের নামকরণ সাধারণ হয় সেই বইয়ের মধ্যে থাকা কোনো একটা গল্পের নামানুসারে। তবে এখানে একটা ব্যতিক্রম কিছু ভাবলেন লেখক। তিনি নয়টি গল্পের সমন্বয়ে যে সংকলনটি লিখলেন, তার নাম দিলেন “নয়পৌরে”। দিনের অষ্টপ্রহর শেষে নতুন এক প্রহর, যেখানে গল্প হবে ভয়ের। অতিপ্রাকৃত রহস্যের।
এই সংকলনের নামকরণ ছাড়াও গল্পগুলোর এক ধরনের বিশেষত আমার চোখে পড়েছে। লেখক এই সমাজ, চারপাশের গল্পের মধ্য দিয়ে রহস্য তুলে এনেছেন। এই যেমন জ্যামের শহর, প্রযুক্তির যুগ, ঈদের আনন্দ, পাহাড়ি কুসংস্কার, স্বামীকে নিয়ে দ্বিধা, নীল ছবির প্রতি আসক্তি, ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে বাজি ইত্যাদি। আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করেছি, লেখক কিছু গল্প ক্লিফহ্যাঙ্গার দিয়ে শেষ করেছেন। পুরোপুরি গল্প শেষ হয়নি। পাঠককে ভাবনার সুযোগ করে দিয়েছেন। যে জায়গায় গল্পগুলো শেষ হয়েছে, এখান থেকে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। পাঠক তার কল্পনাশক্তি দিয়ে কীভাবে গল্প এগিয়ে নিয়ে যাবে, সেটা তার ব্যাপার।
▪️এই সংকলনের প্রথম গল্প ‘ডেড সোলস’। একজন মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সামাজিক মাধ্যমে থাকা আইডিগুলোর কী হয়? কেউ হয়তো কিছুটা জনপ্রিয় থাকে, বেশকিছু ফলোয়ার থাকে। তাদের আইডি নিয়ে চাইলেই অনেক কিছু করা সম্ভব। হতে পারে তা ভালো, কিংবা খারাপ। এই গল্পটা মূলত এই থিমের উপরই দাঁড়িয়ে আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের অনেক উপকার করেছে, আবার অনেক ক্ষতিও করেছে। অর্থপ্রাপ্তির সুযোগে এখন অসংখ্য কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, ইনফ্লুয়েন্সার নিজেদের যোগ্যতার বাইরে অনেক কিছু করার চেষ্টা করে। ফলে এর ক্ষতিকর দিকগুলোই সামনে আসে।
এই গল্পে মূলত লেখক দেখানোর চেষ্টা করেছেন, সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে অসাধু মানুষ কত কী করতে পারে! আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্সকে ভালোর বিপরীতে খারাপ কাজেও লাগানো যায়। নিজের পকেট ভারি যেকোনো কিছু করতে পিছপা হয় না। এতে নিজের ক্ষতি হলে হোক! এই গল্পটা আমার ভালো লেগেছে। ভাবনার ভিন্ন মাত্রা উন্মুক্ত হয়েছে এখানে।
▪️বইয়ের দ্বিতীয় গল্প ‘জট’ বইটা ঢাকা শহরের যানজটে ঘটে যাওয়া এক অদ্ভুত ঘটনা নিয়ে। ধরুন আপনি কোনো এক জায়গায় জ্যামে বসে আছেন। একসময় দেখলেন এক কালো ধোঁয়া আপনাকে ঘিরে ধরেছে। মনে হচ্ছে অচ্ছুত কিছু আপনার শরীরকে অপবিত্র করে ফেলছে। এরপর যা হবে, আপনি তা ভাবতেও চাইবেন না। দেখলেন আপনার বয়স হয়তো ঠিকই আছে কিন্তু আপনার বাহ্যিক অবয়বে বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে। আপনাকে এই চেনার উপায় নেই। এটা কি কোনো রোগ? না অন্যকিছু?
এই গল্পটা পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, লেখক হয়তো বলতে চেয়েছেন জ্যামে বসে আমরা কত সময় নষ্ট করি। আমাদের যৌবন থেকে অনেক সময় হারিয়ে যায়। আমরা এগিয়ে যেতে থাকি বার্ধক্যের দিকে। কিন্তু সে সময় আর ফিরে পাওয়া যায় না। ভালোই লেগেছে গল্পটা। খুব বেশি ভালো, সেটা বলব না। আবার খুব খারাপও লাগেনি।
▪️‘ছুরি ধার’ বইটির তৃতীয় গল্প কুরবানীর ঈদকে ঘিরে। কুরবানীর ঈদকে ঘিরে এক ধরনের উৎসবের আমেজ ঘিরে ধরে। গরু কেনা, ছুরি ধার করা, সবাই মিলে গরু কাটাকুটি দেখা, বিলি বণ্টন করা! এই থিমের উপর ভিত্তি করে লেখক যে রহস্য এখানে জমিয়েছেন, এক কথায় দারুণ। গল্পে এক মায়ের অসহায়ত্ব দেখানো হয়েছে। ছেলে দুষ্টু হলে, অতিরিক্ত আবদার করলে মায়ের মেজাজ তিরিক্ষ হয়ে ওঠে।
তবে শেষটা ধোঁয়াশায় ঘেরা। এখান থেকে অনেক কিছুই হতে পারে। যা হয়তো আপনি পছন্দ করবেন না। মনে মনে প্রার্থনা করবেন, এমন কিছু যেন না ঘটে! কিন্তু লেখক গল্পের সমাপ্তি টানার পর কী ভাবছিলেন, তা হয়তো তিনিই জানেন। আমরা কেবল কল্পনা করতে পারি।
▪️‘বাজি’ গল্পটা আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। হয়তো ক্রিকেট বিষয়ক বলেই। ঠিক ক্রিকেট বিষয়কও বলা যায় না। ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে বাজি ধরার রমরমা ব্যবসা চলে। কেউ জেতে, কেউ হারে। কিন্তু আপনার কাছে যদি এমন এক অস্ত্র থাকে, যে আগেই ভবিষ্যতবাণী করে দিতে পারে কী হবে; তাহলে আপনাকে ঠেকায় কে? কিন্তু একই ধারায় বারবার জিতলে কোনো অসৎ মানুষের নজরে পড়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। তখন কী হবে?
ক্রিকেটে বাজি, জুয়া, ফিক্সিং মহামারি আকার ধারণ করেছে। এ নিয়ে লেখককে লেখার জন্য সাধুবাদ জানাতে হয়। আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে সমাপ্তি। একটা সূক্ষ্ম ভুল যেন এর উপজীব্য হয়ে উঠেছিল। ছোটগল্পে চরিত্র নিয়ে বেশি কাজ করার সুযোগ নেই। কিন্তু যে ছেলেটার এই অদ্ভুত ক্ষমতা আছে, এর কারণ উপলব্ধি হলো না। এই বিষয়ে আরেকটু গভীরে যাওয়া প্রয়োজন ছিল। যদিও লেখকের এই সংকলনের ধারা বজায় রাখার প্রয়াসেই হয়তো পাঠকের ভাবনা উন্মুক্ত রাখতে চেয়েছেন।
▪️‘দ্বিতীয় জন’ গল্পটাও তেমন খারাপ লাগেনি। একজন স্ত্রী যদি জানতে পারে তার স্বামী আগে যেমন ব্যবহার করত, তার অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে; কথাবার্তা, চালচলন, আচার ব্যবহারে; তাহলে এক ধরনের দ্বিধা কাজ করে। তাই সে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের স্মরণাপন্ন হতেই পারে। এরপর ডিটেকটিভ যে সত্য আবিষ্কার করে, তা কেবল চমকেই দিতে পারে। কিন্তু এর সত্যতা কী বলা যায়?
লেখক যেহেতু জটিল কোনো গল্পের অবতারণা করেননি, এই গল্পের শুরু থেকে শেষের আগ পর্যন্ত সাদামাটা ছিল। তবে শেষের অংশে যে চমকটা এনেছেন, ভালো ছিল। হয়তো এভাবেই আমরা কোথাও আবদ্ধ হয়ে যাই। হারিয়ে ফেলি নিজের সহজাত অস্তিত্বকে। তারপর আমাদের এই কেউ আগের মতো করে খুঁজে পায় না।
▪️‘সঙ্গী’ গল্পটা পাহাড়িদের নারী শাসিত সমাজের গল্প। স্বামী মারা যাওয়ার পর নতুন কোনো স্বামীকে খুঁজে নিতে হয়। কিন্তু যাকে পাওয়া যায়, সে কি সত্যিই যোগ্য হয়ে উঠতে পারে?
এই গল্পটা পাহাড়িদের কুসংস্কার, অভিশাপ, রহস্যের যে মিশেল লেখক করেছেন এক কথায় দারুণ। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে আরেকটু বেটার হতে পারত। যদিও ছোটগল্প হিসেবে সংক্ষিপ্ত পরিসরে লেখক রহস্যের আবহ তৈরি করতে পেরেছেন। গল্পের মাধ্যমে অভিশাপ বয়ান এলে ভালো হতো। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে, লেখক জোর করে অনেকটা আরোপিত ভঙ্গিতে অভিশাপের গল্প বলেছেন। আর সমাপ্তিটা বেশ শিরশিরে অনুভূতি দেয়।
▪️এই সংকলনে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে ‘স্বপ্ন’ গল্পটা। যদিও শেষের দিকে কিছুটা প্রেডিকটেবল ছিল, তারপরও খারাপ লাগেনি। আমরা তো হরহামেশাই এমন কিছু দুঃস্বপ্ন দেখি, যা আমাদের মনের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করে করে। কিছু স্বপ্ন এত বেশি বাস্তব হয়ে ওঠে! ধরুন আপনি একটা স্বপ্ন দেখলেন, কোনো এক দুর্ঘটনায় আপনার জীবনের সমাপ্তি ঘটছে। আপনি তখন কী করবেন? পালিয়ে বেড়াবেন সে স্বপ্ন থেকে?
নিয়তি বলে একটা বিষয় আছে। সেখান থেকে পালানো যায় না। একবার যদি আপনার ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়, তখন ঘুরেফিরে তা আপনার সামনে আসবেই। কিংবা কোনো অমোঘ টানে আপনি সেখানে চলে যাবেন। কতক্ষণ আর পালিয়ে থাকা যায়?
▪️এই গল্পটা বেশ ইরিটেটিং লেগেছে। তেমন ভালো লাগেনি। গল্পের নাম ‘মাছের বাজার’। এই গল্পের একটা বিষয় ইন্টারেস্টিং লেগেছে, করোনা যদি বাংলাদেশ ঠেকিয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তার কাল্পনিক যে গল্প লেখক লিখেছেন।
এই রোগের নাম কোভিড হলেও বাংলাদেশের কিন্তু করোনা-ই বলে। একজন শেফ কোভিড বলে রোগের সম্বোধন করছে, এটা বাস্তবসম্মত মনে হয়নি। তাছাড়া গল্পটাও কেমন যেন। মনের মধ্যে দাগ কাটতে পারেনি।
▪️ ‘সিডি সংক্রান্ত জটিলতা’ গল্পটিকে ১৮+ গল্প হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। নীল ছবির প্রতি যুবসমাজের আসক্তি অ্যালার্মিং পর্যায়ে চলে গিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে এ নিয়ে আসর জমে। অনেকেই এর প্রতি আসক্ত, কিন্তু প্রকাশ করতে চায় না। হয়তো পরিচিত কোনো মানুষের প্রতি ফ্যান্টাসি চলে আসাও অমূলক কিছু নয়।
গল্পটা পড়তে বেশ অস্বস্তি লেগেছে। তবে লেখক যুবসমাজের এই অন্ধকার দিক তুলে ধরেছে স্বভাবে, আচরণে। আর শেষটা হয়তো অনেকের জন্যই বাস্তব হয়ে উঠবে ভাবনা চিন্তায়।
▪️ “নয়পৌরে” গল্প সংকলন সময় কাটানোর জন্য ওয়ান টাইম রিড হিসেবে ঠিক আছে। কিন্তু ছোটগল্পকে আমি যেমনভাবে চাই, তেমনটা পেলাম না। ছোটগল্প লেখা আমার কাছে বরাবরই কঠিন মনে হয়। লেখক চেষ্টা করেছেন পাঠককে রহস্যে ডুবিয়ে রাখতে। রহস্য ছিলও ভালোই। লেখাও বেশ গতিশীল। তবে গল্পগুলো মিশ্র অনুভূতি দিয়েছে। এক দুইটা গল্প ছাড়া বাকি গল্পগুলো খুব বেশি আহামরি লাগেনি। গড়পড়তা মানের চেয়ে সামান্য বেশি হলেও হতে পারে তারপরও আয়েশিভাবে পড়তে পেরেছি লেখকের লেখার গতির কারণে। আর এক বসায় পড়ে ফেলা যায় বলেই।
নয়টি গল্পের এই সংকলনের বিশেষ দিক ঘটনাগুলোর ক্লাইমেক্সের সময়ে বিচিত্রতা। কোনো গল্পে ভোরবেলা, কোনোটায় ভরদুপুর, আবার কোনোটায় সন্ধ্যা-রাত-মধ্যরাতে 'অদ্ভুত' ঘটনা ঘটছে। সচরাচর আধো ভৌতিক রচনার রাতকেন্দ্রিকতা, কিংবা ভূত-জ্বীন-প্রেতাত্মার অনুপস্থিতি গল্পে নতুনত্ব এনেছে। সাধারণ সব বিষয়ে অসাধারণ সব ঘটনা ঘটছে।
যদিও, গল্পগুলো সুহান রিজওয়ানের লেখা বলেই এক্সপেকটেশন আরেকটু বেশি ছিল। সবথেকে ভালো লেগেছে 'দ্বিতীয় জন'। তবে 'ডেড সোলস' এর মতন এত সুন্দর একটা ভৌতিক-দার্শনিক প্লটকে লেখক ইহজাগতিক কর্পোরেশনে টেনে এনে নষ্ট করেছেন। AI এর ইথিক্যালিটি নিয়ে অসাধারণ একটা কাজ হতে যাচ্ছিলো গল্পটা।
"... ভেতরে, অনেক ভেতরে কোথাও কিছু একটা পুড়তে থাকে তার। শরীরজুড়ে বড্ড তোলপাড় লাগে। খালি মনে হয়, আপা বেঁচে থাকলে নিজেকে এইরূপে দেখলে তার কেমন লাগত? আপা তাকে কী বলত- 'টাকার জন্য তুই এভাবে আমাকে বেচে দিলি?"
ছোটগল্প পড়ার ক্ষেত্রে যে ঝাক্কি সামলাতে হয় তা হলো- এন্ডিং। লেখকের অতি জ্ঞানগর্ভের দরুনই হোক বা পাঠকের পাতলা জ্ঞানের জন্য বুঝতে না পারা সেই এন্ডিং এর চিরচেনা প্রথার বাইরে গিয়ে সুন্দর যবনিকা টানা হয়েছে প্রতিটি গল্পে। ভালো লেগেছে
নয়টা গল্প নিয়ে সংকলন। সেই কারণেই মনে হয় নাম নয়পৌরে। সুহান রিজওয়ান ভাই সম্ভবত তার রেগুলার লেখালেখির বাইরে হাত মকশো করতে চাইছেন। তবে গল্প পড়ে মনে হইল মকশো করার কিছু নাই। গল্প তার জনরা অনুসারে পরিণত।
গদ্য যাদের পরিণত, সেইসব লেখকের গল্প, উপন্যাস পড়তে ভালো লাগে। আর গদ্যের সাথে গল্প ভালো হইলে তো কথাই নাই। আর এই রকম হরর, অতিপ্রাকৃত, অপ্রাকৃত গল্প ভালো লাগে যখন তা 'ভূতের গল্প' থেকে সরে সময়ের অনুষঙ্গের সাথে মেলে। সেখানেই প্রথম গল্প 'ডেড সোলস' আমাদের ফেসবুকীয় বাস্তবতার গল্প বলে। 'বাজি'র মধ্যেও সেই ধাঁচ খানিকটা আছে। 'স্বপ্ন' তুলনামূলক প্রচলিত ধারার। পারসোনালি ভালো লাগছে 'ছুরি ধার', 'দ্বিতীয় জন' ও 'জট'। যানজট আমাদের কতটা ক্ষতি করতেছে তার একটা রূপক উপস্থাপন বলে আমি ধরতেছি গল্পটা। 'সিডি সংক্রান্ত জটিলতা'ও আমাদের মানস, গোপন কামনার নগ্ন উপস্থাপন। 'মাছ বাজার'-এর শেষটা অন্যরকম হতে পারত। 'সঙ্গী'তে আদিবাসী লোককথাকে ভিত্তি তৈরি করা গল্পটা ভালো। তবে গল্পের থেকেও গল্প বলার ভাষাটা ভালো লাগছে।
বইটার নাম নয়পৌড়ে।টাইটেল দেখেই বুঝেছিলাম নয়টা গল্প থাকবে সংকলনে বা এ জাতীয় কিছু একটা হবে।কতটা ভালো এই গল্পগুলো?নয়টা ভিন্ন স্বাদের সেরা মৌলিক গল্প পড়লাম।বইটা পড়ে অভিভূত।না সব গল্প ভালো লাগে নেই।কিন্তু একটা গল্প সংকলনের স্বার্থকতা তো সেখানেই যেখানে ৬০% এর বেশি গল্প ভালো লাগে। এই সংকলনের সবচেয়ে ভালো লাগার গল্প হচ্ছে স্বপ্ন গল্পটা।এরপরেই আসবে "সংগী" এবং "জট" গল্পটা।সবচেয়ে অপছন্দের গল্প "ডেড সোলস" এবং "দ্বিতীয় জন"। দ্বিতীয় জন গল্পটা শুরুতেই বুঝে গেছিলাম কি হবে।প্রেডিক্টেবল প্লট একটা।সবচেয়ে উদ্ভট এবং উইয়ার্ড জনরার বই হচ্ছে " সিডি সংক্রান্ত জটিলতা " গল্পটা।মূলত এই গল্পটার কারণেই বইটার ভালো লাগাকে দ্বিগুণ করে দিয়েছে আমার।সর্বোপরি হতাশ হতে হয় নি।
বইমেলা চলাকালীন বসে পড়ে শেষ করলাম বইমেলা থেকে কেনা সুহান রিজওয়ানের এ-বছরের বই। অতিপ্রাকৃত হওয়ায় মনে করেছিলাম জমজমাট ভুতের গল্প পেতে যাচ্ছি কিনা।
ঠিক ভুতের না - তবে অদ্ভুত/ অতিপ্রাকৃত গল্প। গল্পগুলো পড়ে পড়া পড়া মনে হয় কারণ গল্পের অনুষঙ্গগুলো বাস্তব জীবনের ক্ষেত্রে রিলেটেবল, আবার ঠিক পড়া নয়। ভাল। পড়তে ভাল লেগেছে। সুহান রিজওয়ানের লেখা ভাল তাই সাহিত্যগুণ নিয়ে আলাদা করে কথা বললাম না। তবে, এক দুইটা গল্পকে টেনে উপন্যাস করে ফেলা যেতে পারে। পড়বার জন্য রেকমেন্ডেড।