▪️আটপৌরে শব্দটার সাথে তো আপনারা পরিচিত। নয়পৌরে শব্দটা কি শুনেছিলেন এর আগে? শুনে না থাকলে, চলুন একটু আলাপ দিই।
সুহান রিজওয়ান আমার পছন্দের একজন ঔপন্যাসিক। তার উপন্যাসগুলো আমার ভীষণ ভালো লাগে। তিনি উপন্যাস লিখতে গিয়ে হয়তো ভাবলেন এবার গল্পে মনোনিবেশ করা যাক! ফলশ্রুতিতে প্রকাশ পেল “নয়পৌরে” গল্প সংকলন। একটি গল্প সংকলনের নামকরণ সাধারণ হয় সেই বইয়ের মধ্যে থাকা কোনো একটা গল্পের নামানুসারে। তবে এখানে একটা ব্যতিক্রম কিছু ভাবলেন লেখক। তিনি নয়টি গল্পের সমন্বয়ে যে সংকলনটি লিখলেন, তার নাম দিলেন “নয়পৌরে”। দিনের অষ্টপ্রহর শেষে নতুন এক প্রহর, যেখানে গল্প হবে ভয়ের। অতিপ্রাকৃত রহস্যের।
এই সংকলনের নামকরণ ছাড়াও গল্পগুলোর এক ধরনের বিশেষত আমার চোখে পড়েছে। লেখক এই সমাজ, চারপাশের গল্পের মধ্য দিয়ে রহস্য তুলে এনেছেন। এই যেমন জ্যামের শহর, প্রযুক্তির যুগ, ঈদের আনন্দ, পাহাড়ি কুসংস্কার, স্বামীকে নিয়ে দ্বিধা, নীল ছবির প্রতি আসক্তি, ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে বাজি ইত্যাদি। আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করেছি, লেখক কিছু গল্প ক্লিফহ্যাঙ্গার দিয়ে শেষ করেছেন। পুরোপুরি গল্প শেষ হয়নি। পাঠককে ভাবনার সুযোগ করে দিয়েছেন। যে জায়গায় গল্পগুলো শেষ হয়েছে, এখান থেকে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। পাঠক তার কল্পনাশক্তি দিয়ে কীভাবে গল্প এগিয়ে নিয়ে যাবে, সেটা তার ব্যাপার।
▪️এই সংকলনের প্রথম গল্প ‘ডেড সোলস’। একজন মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সামাজিক মাধ্যমে থাকা আইডিগুলোর কী হয়? কেউ হয়তো কিছুটা জনপ্রিয় থাকে, বেশকিছু ফলোয়ার থাকে। তাদের আইডি নিয়ে চাইলেই অনেক কিছু করা সম্ভব। হতে পারে তা ভালো, কিংবা খারাপ। এই গল্পটা মূলত এই থিমের উপরই দাঁড়িয়ে আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের অনেক উপকার করেছে, আবার অনেক ক্ষতিও করেছে। অর্থপ্রাপ্তির সুযোগে এখন অসংখ্য কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, ইনফ্লুয়েন্সার নিজেদের যোগ্যতার বাইরে অনেক কিছু করার চেষ্টা করে। ফলে এর ক্ষতিকর দিকগুলোই সামনে আসে।
এই গল্পে মূলত লেখক দেখানোর চেষ্টা করেছেন, সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে অসাধু মানুষ কত কী করতে পারে! আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্সকে ভালোর বিপরীতে খারাপ কাজেও লাগানো যায়। নিজের পকেট ভারি যেকোনো কিছু করতে পিছপা হয় না। এতে নিজের ক্ষতি হলে হোক! এই গল্পটা আমার ভালো লেগেছে। ভাবনার ভিন্ন মাত্রা উন্মুক্ত হয়েছে এখানে।
▪️বইয়ের দ্বিতীয় গল্প ‘জট’ বইটা ঢাকা শহরের যানজটে ঘটে যাওয়া এক অদ্ভুত ঘটনা নিয়ে। ধরুন আপনি কোনো এক জায়গায় জ্যামে বসে আছেন। একসময় দেখলেন এক কালো ধোঁয়া আপনাকে ঘিরে ধরেছে। মনে হচ্ছে অচ্ছুত কিছু আপনার শরীরকে অপবিত্র করে ফেলছে। এরপর যা হবে, আপনি তা ভাবতেও চাইবেন না। দেখলেন আপনার বয়স হয়তো ঠিকই আছে কিন্তু আপনার বাহ্যিক অবয়বে বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে। আপনাকে এই চেনার উপায় নেই। এটা কি কোনো রোগ? না অন্যকিছু?
এই গল্পটা পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, লেখক হয়তো বলতে চেয়েছেন জ্যামে বসে আমরা কত সময় নষ্ট করি। আমাদের যৌবন থেকে অনেক সময় হারিয়ে যায়। আমরা এগিয়ে যেতে থাকি বার্ধক্যের দিকে। কিন্তু সে সময় আর ফিরে পাওয়া যায় না। ভালোই লেগেছে গল্পটা। খুব বেশি ভালো, সেটা বলব না। আবার খুব খারাপও লাগেনি।
▪️‘ছুরি ধার’ বইটির তৃতীয় গল্প কুরবানীর ঈদকে ঘিরে। কুরবানীর ঈদকে ঘিরে এক ধরনের উৎসবের আমেজ ঘিরে ধরে। গরু কেনা, ছুরি ধার করা, সবাই মিলে গরু কাটাকুটি দেখা, বিলি বণ্টন করা! এই থিমের উপর ভিত্তি করে লেখক যে রহস্য এখানে জমিয়েছেন, এক কথায় দারুণ। গল্পে এক মায়ের অসহায়ত্ব দেখানো হয়েছে। ছেলে দুষ্টু হলে, অতিরিক্ত আবদার করলে মায়ের মেজাজ তিরিক্ষ হয়ে ওঠে।
তবে শেষটা ধোঁয়াশায় ঘেরা। এখান থেকে অনেক কিছুই হতে পারে। যা হয়তো আপনি পছন্দ করবেন না। মনে মনে প্রার্থনা করবেন, এমন কিছু যেন না ঘটে! কিন্তু লেখক গল্পের সমাপ্তি টানার পর কী ভাবছিলেন, তা হয়তো তিনিই জানেন। আমরা কেবল কল্পনা করতে পারি।
▪️‘বাজি’ গল্পটা আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। হয়তো ক্রিকেট বিষয়ক বলেই। ঠিক ক্রিকেট বিষয়কও বলা যায় না। ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে বাজি ধরার রমরমা ব্যবসা চলে। কেউ জেতে, কেউ হারে। কিন্তু আপনার কাছে যদি এমন এক অস্ত্র থাকে, যে আগেই ভবিষ্যতবাণী করে দিতে পারে কী হবে; তাহলে আপনাকে ঠেকায় কে? কিন্তু একই ধারায় বারবার জিতলে কোনো অসৎ মানুষের নজরে পড়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। তখন কী হবে?
ক্রিকেটে বাজি, জুয়া, ফিক্সিং মহামারি আকার ধারণ করেছে। এ নিয়ে লেখককে লেখার জন্য সাধুবাদ জানাতে হয়। আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে সমাপ্তি। একটা সূক্ষ্ম ভুল যেন এর উপজীব্য হয়ে উঠেছিল। ছোটগল্পে চরিত্র নিয়ে বেশি কাজ করার সুযোগ নেই। কিন্তু যে ছেলেটার এই অদ্ভুত ক্ষমতা আছে, এর কারণ উপলব্ধি হলো না। এই বিষয়ে আরেকটু গভীরে যাওয়া প্রয়োজন ছিল। যদিও লেখকের এই সংকলনের ধারা বজায় রাখার প্রয়াসেই হয়তো পাঠকের ভাবনা উন্মুক্ত রাখতে চেয়েছেন।
▪️‘দ্বিতীয় জন’ গল্পটাও তেমন খারাপ লাগেনি। একজন স্ত্রী যদি জানতে পারে তার স্বামী আগে যেমন ব্যবহার করত, তার অনেকটাই ��রিবর্তন হয়েছে; কথাবার্তা, চালচলন, আচার ব্যবহারে; তাহলে এক ধরনের দ্বিধা কাজ করে। তাই সে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের স্মরণাপন্ন হতেই পারে। এরপর ডিটেকটিভ যে সত্য আবিষ্কার করে, তা কেবল চমকেই দিতে পারে। কিন্তু এর সত্যতা কী বলা যায়?
লেখক যেহেতু জটিল কোনো গল্পের অবতারণা করেননি, এই গল্পের শুরু থেকে শেষের আগ পর্যন্ত সাদামাটা ছিল। তবে শেষের অংশে যে চমকটা এনেছেন, ভালো ছিল। হয়তো এভাবেই আমরা কোথাও আবদ্ধ হয়ে যাই। হারিয়ে ফেলি নিজের সহজাত অস্তিত্বকে। তারপর আমাদের এই কেউ আগের মতো করে খুঁজে পায় না।
▪️‘সঙ্গী’ গল্পটা পাহাড়িদের নারী শাসিত সমাজের গল্প। স্বামী মারা যাওয়ার পর নতুন কোনো স্বামীকে খুঁজে নিতে হয়। কিন্তু যাকে পাওয়া যায়, সে কি সত্যিই যোগ্য হয়ে উঠতে পারে?
এই গল্পটা পাহাড়িদের কুসংস্কার, অভিশাপ, রহস্যের যে মিশেল লেখক করেছেন এক কথায় দারুণ। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে আরেকটু বেটার হতে পারত। যদিও ছোটগল্প হিসেবে সংক্ষিপ্ত পরিসরে লেখক রহস্যের আবহ তৈরি করতে পেরেছেন। গল্পের মাধ্যমে অভিশাপ বয়ান এলে ভালো হতো। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে, লেখক জোর করে অনেকটা আরোপিত ভঙ্গিতে অভিশাপের গল্প বলেছেন। আর সমাপ্তিটা বেশ শিরশিরে অনুভূতি দেয়।
▪️এই সংকলনে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে ‘স্বপ্ন’ গল্পটা। যদিও শেষের দিকে কিছুটা প্রেডিকটেবল ছিল, তারপরও খারাপ লাগেনি। আমরা তো হরহামেশাই এমন কিছু দুঃস্বপ্ন দেখি, যা আমাদের মনের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করে করে। কিছু স্বপ্ন এত বেশি বাস্তব হয়ে ওঠে! ধরুন আপনি একটা স্বপ্ন দেখলেন, কোনো এক দুর্ঘটনায় আপনার জীবনের সমাপ্তি ঘটছে। আপনি তখন কী করবেন? পালিয়ে বেড়াবেন সে স্বপ্ন থেকে?
নিয়তি বলে একটা বিষয় আছে। সেখান থেকে পালানো যায় না। একবার যদি আপনার ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়, তখন ঘুরেফিরে তা আপনার সামনে আসবেই। কিংবা কোনো অমোঘ টানে আপনি সেখানে চলে যাবেন। কতক্ষণ আর পালিয়ে থাকা যায়?
▪️এই গল্পটা বেশ ইরিটেটিং লেগেছে। তেমন ভালো লাগেনি। গল্পের নাম ‘মাছের বাজার’। এই গল্পের একটা বিষয় ইন্টারেস্টিং লেগেছে, করোনা যদি বাংলাদেশ ঠেকিয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তার কাল্পনিক যে গল্প লেখক লিখেছেন।
এই রোগের নাম কোভিড হলেও বাংলাদেশের কিন্তু করোনা-ই বলে। একজন শেফ কোভিড বলে রোগের সম্বোধন করছে, এটা বাস্তবসম্মত মনে হয়নি। তাছাড়া গল্পটাও কেমন যেন। মনের মধ্যে দাগ কাটতে পারেনি।
▪️ ‘সিডি সংক্রান্ত জটিলতা’ গল্পটিকে ১৮+ গল্প হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। নীল ছবির প্রতি যুবসমাজের আসক্তি অ্যালার্মিং পর্যায়ে চলে গিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে এ নিয়ে আসর জমে। অনেকেই এর প্রতি আসক্ত, কিন্তু প্রকাশ করতে চায় না। হয়তো পরিচিত কোনো মানুষের প্রতি ফ্যান্টাসি চলে আসাও অমূলক কিছু নয়।
গল্পটা পড়তে বেশ অস্বস্তি লেগেছে। তবে লেখক যুবসমাজের এই অন্ধকার দিক তুলে ধরেছে স্বভাবে, আচরণে। আর শেষটা হয়তো অনেকের জন্যই বাস্তব হয়ে উঠবে ভাবনা চিন্তায়।
▪️ “নয়পৌরে” গল্প সংকলন সময় কাটানোর জন্য ওয়ান টাইম রিড হিসেবে ঠিক আছে। কিন্তু ছোটগল্পকে আমি যেমনভাবে চাই, তেমনটা পেলাম না। ছোটগল্প লেখা আমার কাছে বরাবরই কঠিন মনে হয়। লেখক চেষ্টা করেছেন পাঠককে রহস্যে ডুবিয়ে রাখতে। রহস্য ছিলও ভালোই। লেখাও বেশ গতিশীল। তবে গল্পগুলো মিশ্র অনুভূতি দিয়েছে। এক দুইটা গল্প ছাড়া বাকি গল্পগুলো খুব বেশি আহামরি লাগেনি। গড়পড়তা মানের চেয়ে সামান্য বেশি হলেও হতে পারে
তারপরও আয়েশিভাবে পড়তে পেরেছি লেখকের লেখার গতির কারণে। আর এক বসায় পড়ে ফেলা যায় বলেই।
▪️বই : নয়পৌরে
▪️লেখক : সুহান রিজওয়ান
▪️প্রকাশনী : চন্দ্রবিন্দু
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৩/৫