হামিম কামালের গল্পগ্রন্থ ত্রিস্তান পড়তে গিয়ে মনে হলো, কিছু অনুভূতি ভাষায় আনা যায় না, কিছু কথা বলা হয় না এবং এই না বলার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত সংযোগ। এই সংযোগ কখনও নির্জন শহরের নিঃসঙ্গ মানুষের সাথে, কখনও মহামারির ছায়ায় ঢাকা এক অচেনা জীবনের সাথে, কখনও বা লাশের নীরব অভিযোগের সাথে।
গ্রন্থের প্রথম গল্প 'কাছেই এক শহরে' পড়তে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে বেলগাছের নিচে বসে থাকা এক অবসরপ্রাপ্ত নিঃসঙ্গ সেনাকর্মকর্তার দিনলিপি। মনে হয়, এই নিঃসঙ্গতা, এই অব্যক্ত অনুভূতির ভার পাঠকেরও নিজের ভেতরে কোথাও জমে আছে। গল্পের গাঁথুনি যেন এক ধরনের আত্মস্মরণ—একটি শহর, যেখানে কেউ বাস করে, আর আমাদের মনের গোপন কোণে তার অস্তিত্ব অনুভূত হয়। আমরা এই শহরকে চিনি, কারণ আমরা সকলেই কোথাও না কোথাও নিঃসঙ্গ।
তারপর আসে মহামারি। জীবনের অনিশ্চয়তা, আলো-অন্ধকারের টানাপোড়েন, বিচারহীন এক পৃথিবীতে মৃতদের নীরব সাক্ষ্য এই সবকিছু মিলিয়ে এক অলীক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। গল্প এগিয়ে যায় অথচ কোথাও গিয়ে থমকে থাকে, পাঠক বুঝতে পারে, কিছু প্রশ্নের উত্তর কখনও আসে না, কিছু প্রতীক্ষা থেকে যায় চিরকাল। মনে পড়ে অ্যালব্যার ক্যামুর প্লেগ যেখানে মহামারির ছায়ায় আটকে পড়া মানুষ শুধু অপেক্ষা করে, প্রশ্ন করে, কিন্তু উত্তর আসে না।
আজিমউদ্দিন আউলিয়ার চেনা অচেনা জগতে সামান্য স্বস্তি মেলে, অন্তর্জলি যাত্রা থেকে পাওয়া যায় বাড়ি ফেরার পথ। পুকুরঘাটে সন্ধ্যা নামে, তারার আলোয় অপেক্ষার ছায়া পড়ে। কেউ আসবে, সকল প্রতিকূলতা পেরিয়ে, এবং এই আসার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক পরিত্রাণের অনুভূতি। এই বাড়ি ফেরা শুধুই শারীরিক স্থানান্তর নয়, বরং এক আত্মিক পরিক্রমা।মুরাকামি যেখানে বাস্তবতার ফাঁকে স্বপ্নের দরজা খুলে দেন, ত্রিস্তানের গল্পগুলোও তেমন এক বাস্তবতায় পৌঁছে দেয়, যেখানে নিখুঁত কোনো সমাধান নেই, শুধু অনুভূতি আছে।
এই গল্পমালা শুধু চরিত্র ও কাহিনি নির্মাণের খেলা নয়, বরং এটি দর্শন ও মেটাফোরের এক চমৎকার মিশ্রণ। সুফিবাদ, স্ট্রিম অব কনশাসনেস, এবং কখনও বা তৃতীয় দেয়াল ভেঙে দেওয়ার সাহসী চেষ্টা এই বইয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। জাদুবাস্তবতা এখানে কেবল অলৌকিক কোনো উপাদান নয়, বরং গল্পের গভীরে প্রবেশের এক প্রবাহ। ডিটেলিংয়ের মুন্সিয়ানায় কখনও দৃশ্যপট দীর্ঘ লং শটের মতো বিস্তৃত, কখনও আবার অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠ ক্লোজ-আপ।
তবে শুধু কাঠামোগত নতুনত্বই নয়, এই বইয়ের অন্যতম শক্তি এর আবেগঘন টান। কখনও মনে হয়, গল্পের প্রতিটি চরিত্র আমাদের চেনা, আমাদেরই এক অংশ। যারা সমাজের প্রান্তে দাঁড়িয়ে শুধু প্রশ্ন করে, ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকে, আর আমরা জানি, সেই বিচার ���সবে না। তবুও, কোথাও এক আলো আছে, প্রতীক্ষার মধ্যে এক অনিবার্য সত্য আছে।
ত্রিস্তান শুধু পড়ার অভিজ্ঞতা নয়, অনুভবের একটি যাত্রা। গল্পের আড়ালে গল্পের যে ছায়া—তা থেকে পাঠক নিজেই আবিষ্কার করতে পারেন নিজের প্রতিচ্ছবি। কখনও কখনও মনে হয়, গল্পের চরিত্রগুলো পাঠকেরই একেকটি ছায়া, যারা নিজেদের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়ায়, কখনও পায়, কখনও পায় না। কিন্তু এই খোঁজের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সাহিত্যের সত্য।
একটি বই কেবল তার কাহিনির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং তার যে অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, সেই অভিজ্ঞতাই তাকে স্মরণীয় করে তোলে। ত্রিস্তান ঠিক তেমনই এক বই যা পড়ার পরও মনের ভেতর থেকে যায়, কল্পনার গহীনে আরও অনেক নতুন গল্পের জন্ম দেয়।