ত্রিস্তান শব্দের একটি বাস্তব ও একটি কাল্পনিক অর্থ আছে। ফরাসী ধাতু ‘ত্রিস্ত’। শব্দটি কষ্টের সম্পদ। অব্যক্ত, তীব্র। এই শব্দ স্মৃতিকাতরতার সম্পদ। সুতীব্র স্মৃতিকাতরণ। স্মৃতিকা তোরণ। এমন কষ্ট ও কাতরতা পুঁজি করে যে মানুষ হয়ে ওঠে অতীব সামর্থবতী-সামর্থবান, শক্তিমতি-শক্তিমান, তাকে ডাকি—‘ত্রিস্তান’। কাল্পনিক অর্থটি এবার; সেই যে স্মৃতিকা তোরণ - তা যে শহরের তোরণ - ত্রিস্তান তার নাম। পুঁজির বিকাশে সে নিখাদ শহর, কিন্তু সে কি জানে সে ‘শহর’? সেখানে চোখ ভরা জল, কিন্তু সে জল উপচে পড়তে নেই। সে শহরে ভাসে প্রাচীন পৃথিবীর সুর। বুনো, অধিজাগতিক। সে সুর হত্যা করে, প্রেম জাগায়। ভাষায় তাকে ধরতে ইচ্ছে জাগে, ভয়ও হয়। ত্রিস্তানে স্বাগত।
শুরু করা যেতে পারে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা দিয়ে-
"পাতার ফাঁকে উঠছে শামুক, শিকড় কাটে উই আমার মতন একলা মানুষ দু'খান হয়ে শুই।"
এই দ্বিধাবিভক্ত, দ্বিখণ্ডিত মানুষ (কখনো আক্ষরিক, কখনো রূপক অর্থে) আর তাদের শহরকে নিয়ে লেখা "ত্রিস্তান। " ত্রিস্তান অর্থ দুঃখী ও শক্তিশালী। ত্রিস্তান শহরের নাম,যে শহরটা আমরা সবাই চিনি।একেক গল্পে ত্রিস্তানের একেক রূপ। কখনো সে বিধ্বংসী, কখনো সে মনোহর মায়া। একদিকে আছে রূঢ় বাস্তবতা, আরেকদিকে স্বপ্ন আর অবচেতনের আবেশজড়ানো জগৎ। হামিম কামাল এবারই এতো প্রত্যক্ষ সমকালীনতাতপ্ত আখ্যান রচনা করলেন। জাদুবাস্তবতা বরাবরের মতো উপস্থিত, কিন্তু নির্মম বাস্তবতাই "অশনি" বা "পাটখেতের লাশ" এর উপজীব্য। লেডি ম্যাকবেথ উন্মাদ হওয়ার প্রাক্কালে অনুশোচনা থেকে বলে, আরবের সমস্ত সুগন্ধি তার হাত থেকে রক্তের গন্ধ মুছে ফেলতে পারবে না। আমাদের জীবনেও এমন কিছু ঘটনা ঘটে যার অভিঘাত থেকে আমাদের মুক্তি নেই, শত চেষ্টাতেও। করোনাকাল আমাদের ও লেখকের জীবনের তেমনই এক অধ্যায়। সেই দুঃসহ শ্বাসরোধী সময় তার রক্তঅস্থিমজ্জাসমেত এজন্য হাজির হয় "অশনি"তে। অথবা পত্রিকার পাতার খুব সাধারণ একটা খবর, যার দিকে আমরা দ্বিতীয়বার দৃকপাত করবো না, সেরকম এক "তুচ্ছ ঘটনা"র তীব্র অভিঘাত লেখককে দিয়ে লিখিয়ে নেয় "পাটখেতের লাশ।"
স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে বলি, ইমতিয়ার শামীম দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, দক্ষিণ আমেরিকার জাদুবাস্তবতা দেশীয় লেখকদের এতো প্রভাবিত করেছে অথচ আমাদের লোকজ সংস্কৃতিতেই জাদুবাস্তবতার বিভিন্ন উপাদান ছড়িয়ে আছে, কেউ তা সঠিকভাবে ব্যবহার করলো না। হামিম কামাল তার উপন্যাস "জাদুকরী ভ্রম" এর মতো " আজিমউদ্দিন আউলিয়া"তে নিজস্ব ধরনে লোকজ জাদুবাস্তবতার সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন।
"কাছেই এক শহরে"তে মানুষজন শক্তির কবিতার মতো সত্যি সত্যি একজন থেকে দুজন হয়ে যায়। "বর্কিম্ময়ের ছবি" আর "সেতু আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী" ট্রেডমার্ক হামিম কামালীয় গল্প, স্বপ্ন ও বাস্তবতার দেয়াল যেখানে ভেঙে একাকার হয়ে যায়।সেইন্ট সামান্থা হাসপাতাল - যেখানে মানুষের মৃত্যু নতুন কোনো অর্থ বহন করে না, বিরক্তিকর লোকটার ঘ্যানঘ্যান শুনে বাদুড়ঝোলা হয়ে যেখানে বাসায় ফিরতে হয়, মানুষ যেখানে অবলীলায় জিঘাংসার শিকার হয় সেই ত্রিস্তান আর বর্কিম্ময়ের কুহকের জগত কি একই শহর? মানুষ তো শুধু বাস্তবতা নিয়ে বাঁচতে পারে না। তার জীবনে কল্পনার রঙ প্রয়োজন,প্রয়োজন কিছু স্বপ্নের। একটা শহরও মানুষের মতো জীবন্ত। তার তীব্র তুমুল ভয়াবহ কষ্টের দিনযাপনের মাঝেও আছে গল্প, কল্পনা আর কিছু মোহনীয় মিথ্যা - যা তাকে বাঁচিয়ে রাখে। শেষ গল্পের চিঠিতে যেমন আছে,
" আমি যদি মরে যাই, ত্রিস্তানেই যেন আমার সমাধি হয়। যত দুঃখেরই হোক, আমার জীবনে এর চেয়ে আপন শহর আর ছিল না।" এই বোধ থেকেই লেখা হয় "ত্রিস্তান",আরেকটু বেঁচে থাকার জন্য।
বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর সব গল্পই বলা হয়ে গেছে। মানুষের শোনার জন্য নতুন বা মৌলিক কোনো গল্প অবশিষ্ট নাই। এই গল্পহীনতার সমাধান হিসাবে সাহিত্যে ম্যাজিক রিয়েলিজমের প্রবেশ আদতে অনিবার্য ছিল। তো আমি মনে করি, একটা স্বার্থক ম্যাজিক-রিয়েলিস্টিক গল্প বা কাহিনি এমনভাবে এগোবে যাতে পাঠক ফিল করেবে, ন্যারেটর নিজে বিশ্বাস করে সেইসব লিখেছেন। যতই অদ্ভুত অবাস্তব হোক, ন্যারেটর পাঠকদের বোঝাবেন সবই বাস্তব।
হামিম কামাল ত্রিস্তান নামের এক শহর নিয়ে জাদুবাস্তব গল্প লিখেছেন। এদিকে আমার মস্তিষ্ক থেকে উড়ে যাচ্ছে বহুদিন আগে পড়া মাকান্দো'র সমস্ত অলৌকিক স্মৃতি। ত্রিস্তানে নতুন যাত্রা শুরু করতে আমার আপত্তি ছিল না। বরং আগ্রহ ছিল।
প্রথম গল্পে 'কাছেই এক শহরে' পড়তে অনেক সময় লাগলো৷ স্টোরিটেলিং ঠিকঠাক। আগাগোড়া ম্যাজিক। তবুও বুঝতে পারছি না গল্পে অন্য কিছু মিসিং ছিল কিনা।
'আজিমউদ্দিন আউলিয়া' স্কিলফুল হাতে লেখা গল্প। নদীর পানিতে এক লোক দেখতে পান মানুষের আসন্ন বিপদ আপদ। তিনি দিশাহারা হয়ে বাঁচাইতে চান বিপণ্ন সে মানুষদেরকে। স্ত্রী তাঁকে বলেন, উপায় আসবে কল্পনারও বাইরে। গল্পটা পড়ার শুরু থেকেই আশা ছিল, শেষে চমক থাকবে।
'পাটক্ষেতের লাশ' গল্পটার গঠনমূলক আলোচনা করলে নিজের হার্ট থেকে এ্যাম্পেথি জিনিসটা বাদ দিতে হবে। সেই রিস্ক নিতে চাচ্ছি না। সমাজের সবস্তরের মানুষের নারীদের প্রতি সিস্টেম্যাটিক ভায়োলেন্স, ডিহিউম্যানাইজেশন তুলে ধরা হয়েছে গল্পে। থিমটা গুরত্বপূর্ণ ছিল।
'বর্কিম্ময়ের ছবি' এই সংকলনে আমার প্রিয় গল্প। আর্টিস্ট তাঁর আঁকা ছবি দিয়ে কন্ট্রোল করতে পারছে মনোযোগী দর্শকদের। দর্শকেরা ইলিউশনের জগতে হারিয়ে যাবে। এই চিন্তাটুকু খুব রেটোরিক এবং কৌতূহলোদ্দীপক। এই গল্পে পাঠকদের ভাবনার জন্য প্রচুর স্পেইস আছে।
'সেতু আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী' গল্পের নামের মধ্যেই স্পয়লার দেওয়া আছে। বুদ্ধিমান পাঠক মাত্রই পড়ার আগে টের পাবেন ট্র্যাজেডির এসেন্স। এইখানে ম্যাজিক আর রিয়েলিটির ব্লেন্ডিং করা হইসে খুব সাবধানে। এই গল্পের এক্সিকিউশন ভালো লেগেছে। গল্পটা মনে থাকবে বহুদিন।
'ত্রিস্তান'এর বাকি গল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাবে বৈকালিক আসরে। বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডায় গল্পগুলোর এক্সটেনশন তৈরি করবো ভাবছি। মুখে মুখে এসব হবে জীবিত।
লেখকের জগৎ বাস্তব জগতের দূরে কিন্তু চলমান জগৎ এর সাথেই সম্পর্কিত। করোনার সময়কার চিত্র ও ত্রিস্তানের ঘটনার ধারার মধ্যে হসপিটালের প্রহরীগণের কথোপকথনে উঠে আসে নির্জীব হয়ে। জেনারেলের চুরুটে একাকী স্মৃতি হয়ে গল্প হয়ে উঠে কাতরতায় পূর্ণ। বার্তাকক্ষের পাটক্ষেতে রক্ত আছে বোধহয় যেখানে বর্তমান চলমানতার বাস্তবতাও আছে।
হামিম কামালের লেখার ভাষা আঁশটে এবং স্থির, বর্ণনাধর্মী বাক্য নয় ছোট কথোপকথনে সাবলীলভাবে বলতে চাচ্ছে চরিত্র, কিন্তু মাথায় গেঁথে থাকে না, সমস্যা একটু এখানেই। না গেঁথে থাকার কারণ বোধহয় স্থান, জগৎ অপরিচিত ঠেকে আর চরিত্রের নামের মৌলিকত্ব ঈর্ষণীয়। লেখক এতে কিছুটা দুর্বোধ্য হয়েও উঠেন বোধহয়।
ফ্ল্যাপ, লেখকের কথা কিংবা কৈফিয়ত ধরে যেতে যেতে হামিম কামালের 'ত্রিস্তান'এর প্রতি আগ্রহ জমাট বাঁধে আমার মাঝে। ৯ টি গল্পের রিভিউ লিখছি। যদিও গল্প বইয়ের রিভিউ লিখা মনের মাঝে নানামুখি দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে।
১) কাছেই এক শহরে
যদি লিখি আমাদের সবার মাঝেই দু'জনের অস্তিত্ত্ব আছে তাহলে শুনতে ক্লিশে লাগে অনেক। একজন সপ্রতিভ, অপরজন হতবিহ্বল। সমুদ্রের দুইজনে পরিণত হওয়াটা তাঁর শহরে মহামারীর মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে। গল্পে আছে এক বৃদ্ধ সেনাপতি, রেশমি, নিশিথিনী। মানুষের মধ্যে ঠিক কী ধরনের নাড়াচাড়া ঘটে গেলে এরকম একজন পরিণত হয় দু'জনে? সুন্দর গদ্যভাষায়, সাবলীল এবং মানবমনস্তত্ত্বে ভরপুর এক গল্প পড়া হলো।
২) অশনি
কোভিডের অশনিকালে হাসান ও নীলিমার জীবন যেন আমাদের অনেকেরই অভিজ্ঞতা ও ঘোরের সম্মিলন। করোনা মহামারীর সময়ে চিকিৎসক নীলিমার এক দীর্ঘ, বিষণ্ন, বিপন্ন জার্নি শুনিয়েছেন লেখক। অদ্ভুত সেই সময়ের গল্পে কীভাবে আমাদের উপর অশনি নেমে এসেছিলো তা স্মৃতির রিয়ার ভিউ মিররে আবার দেখা হলো।
৩) আজিমউদ্দিন আউলিয়া
দক্ষ গ্রাম্য চিকিৎসক লোকমান হেকিম। ঘটনাচক্রে এক গাইয়ের মালিকানা পেলে প্রতিজ্ঞা করেন সেই গাই-গরুর প্রথম দুধ খাওয়াবেন বিখ্যাত আজিমউদ্দিন আউলিয়াকে। আমরা শৈশব-কৈশোরে পীর-আউলিয়াদের কেরামতি নিয়ে যেসব সুন্দর গল্প শুনি হামিম কামাল একজন ভক্তের জীবনে নেমে আসা মহাবিপদের কথা এবং সেই পীরের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চমৎকার এক গল্প লিখেছেন। অনেকদিন পর একটু ভিন্ন প্লটের গল্প পড়া হলো। লেখক যেন পুনর্কথন করেছেন এবং সাথে মিলিয়েছেন নিজ কল্পনা।
৪) পাটখেতের লাশ
মফস্বল বিট করা সাংবাদিক মানিককে অনেক নারকীয় সংবাদ হজম করে চেপে যেতে হয়। কিন্তু এক রাতে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না মানিকের। এ গল্পে আছে অতিলৌকিক উপাদান, সেই সাথে প্রচন্ড মানসিক চাপ হতে মুক্তি পেতে মানিকের আকুতি। তাকে ছুটে যেতে হয় এক আপনজনের কাছে। বলতে হয় সেকথা যেকথা বলা হয় না, যায় না।
৫) বর্কিম্ময়ের ছবি
ত্রিস্তানের মাতৃছায়া আরোগ্যনিকেতনে অনেক সুন্দর সব পেইন্টিং আছে। এসবের মাঝে শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন চাপা দেয়া চিকিৎসক নিঝুম এক অদ্ভুত সুন্দর ছবির দেখা পায়। অঞ্জনের। প্রশ্ন হচ্ছে অঞ্জনের আর্টিস্ট কে? নিজের রুটিন জীবন বরবাদ করে নিঝুম নেমে যায় সুলুক-সন্ধানে। হামিম কামালের লেখনির নিজস্ব জমিন আছে। সেই জমিনে জাদুবাস্তবতার বয়ানে চলে এসেছে এক প্রেমের কাহিনি। যে প্রেম এ ভূবনের নয়।
৬) আলো ও তার অক্ষয় তূণীর
প্রকৃতি যখন নিজেই মানবজাতিকে নিঃশেষ করতে চায় ত্রিস্তানের এক জাদুকরি কোণে, তখন আলো ও তার অক্ষয় তূণীরের কিছু করার থাকে। গল্পের কনসেপ্ট ভালো।
৭) সেতু আমার অন্তসত্ত্বা স্ত্রী
পাগলদের মনের চারপাশ জুড়ে দেয়াল তোলা না থাকায় অনেকে সেটার সুযোগ নেন। বুধবারের ফকির গনির গল্পে আছে মানবচরিত্রকে ঘিরে থাকা এক দর্শন।
৮) বোকা লোকটা
টেম্পোযাত্রী এক বৃদ্ধের অনেক কথার-নীতিকথার বর্ণনা আছে এ গল্পে। এসব কথা আমাদের অনেকের কাছে বোকা-বোকা কথাবার্তাই মনে হবে। কিন্তু লোকটা কি আসলেই বোকা?
৯) ঝাঁপরজ্জু
সামান্য পতঙ্গ থেকে মহামারী ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে ত্রিস্তানে। এবার নগরপাল সেই পতঙ্গ ঠেকাতে শহরের বাস্তুতন্ত্রেই পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন। গল্পে হামিম কামাল অনেকগুলো দৃশ্য নিয়ে এসেছেন। ছাড়া-ছাড়া ফিল্মের মতো এগুলি এক সূত্রে গাঁথা।
নয়টি গল্পে হামিম কামাল পাঠককে গ্রিপ করে রাখার মতো স্টোরিটেলিং করেছেন। পাঠককে ধরে রাখার কারণ খুব সম্ভবত লেখকের এক ধরণের লিরিক্যাল গদ্যভাষা। সেই সাথে মানব মনস্তত্ত্বের পদে পদে প্রকাশটাও আকর্ষণীয় তাঁর লেখনিতে। লেখক জাদুবাস্তবতার আশ্রয়ে মানবমনের দুঃখকে শক্তিতে রূপান্তরিত করার গল্প বলে গেছেন। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে 'আজিমউদ্দিন আউলিয়া'।
ত্রিস্তান নামের দু্ঃখি শহরে কিছু মানুষের শক্তিমত্তা দেখতে পাঠককে স্বাগতম জানানোই যায়।
বই রিভিউ
নাম : ত্রিস্তান লেখক : হামিম কামাল প্রথম প্রকাশ : ডিসেম্বর ২০২৪ প্রকাশক : চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন প্রচ্ছদ : দেওয়ান আতিকুর রহমান রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ।
পড়তে পড়তে অবাক লাগে। তারপর একটু থামি। বইটা রেখে দিই। তারপর আবার ধরি। একটা শহরে একজন মানুষ আচমকাই দুজন হয়ে যাওয়ার গল্পটা বেশি চমকপ্রদ নাকি আজিমউদ্দিন আউলিয়ার গল্পটা। যে পীরসাহেব ধ্যানের ইশারায় একটা বাঘবন্দি মানুষকে উদ্ধার করে ফেলতে পারে সেই গল্পটাই বোধহয় বেশি ভালো। তারপর আবার মনে হয় প্রেমকে অভিশাপ ভেবে যে ত্রিস্তান শেষ হয়ে যাচ্ছিল, সেই গল্পটা মনে বেশি দাগ কেটেছে। এরকম করে একটার পর একটা মনে হতেই থাকে। হামিম কামালের গল্পগুলো কোমল, দৃশ্যমান, যেন চোখের সামনে ঘটছে, সেটা জাদুবাস্তবতার গল্প হোক কিংবা নিরেট বাস্তবধর্মী গল্প। চোখে আরাম লাগে, মনে বেদনা জাগে, মস্তিস্কে আলোড়ন তোলে। মনে হয় চরিত্রগুলো অনেক দূরের, কিন্তু হাত বাড়ালেই স্পর্শ করা যায় আর নিজেকে মনে হয় মহা শক্তিশালী কেউ যে অবলীলায় দূরের কিছুকে কাছে টানতে পারে। হামিম কামালের গল্পগুলো দর্শনে জড়ানো। দর্শন আবার গল্পকে ভারাক্রান্ত করে না, শক্তিশালী করে।
ছোটগল্পের প্রতি বিমাতাসুলভ যে মনোভাব মনে মনে পোষণ করি সেটা পরিবর্তন করার সময় এসে গেছে বোধহয়। এ বছর বেশ কয়েকটা গল্পসংকলন পড়া হলো, এটা নিয়ে হামিম কামালের দ্বিতীয় গল্পের বই পড়লাম এবং গল্পকার হিসেবে তিনি শক্তিশালী এ ব্যাপারে দ্বিমত করার সুযোগ নেই।
সবগুলো গল্পে 'ত্রিস্তান' শহর বা লোকালয়ের উল্লেখ আছে তবুও প্রত্যেকটা গল্পেই মনে হয় ত্রিস্তান বুঝি ভিন্ন কোনো শহর। ত্রিস্তানকে কেন্দ্র করে অদ্ভুত, অবাস্তব, সুন্দর গল্পগুলো বাতাসে ভাসছে, শুধু তাদের ধরতে পারা চাই!
গল্পের বইয়ের রিভিউ বা সামগ্রিকভাবে মতামত দেওয়াটা কঠিন, কারণ ভিন্ন ভিন্ন গল্প পড়ে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জাগাটা স্বাভাবিক। তবে ত্রিস্তানের বেশিরভাগ গল্পই ভালো লেগেছে।
আমাদের জীবনের প্রত্যেকের গল্প আছে। প্রত্যেকদিনের গল্প আছে। সুখ, দু:খ, প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি। এইসবকিছু নিয়েই গল্প। আর সেই গল্পগুলা দিয়েই আমাদের জীবন।
'ত্রিস্তান' একটা শহরের নাম। এই শহরকে কেন্দ্র করেই বইটা লেখা। এই শহরের রূপ একেক গল্পে একেকরকম। একেকসময় সে এমন শান্ত, যেনো সব শান্তি সেই শহরেই বিদ্যমান। আবার, একেকসময় মনে হয়েছে নৃশংস। একেকসময় মনে হয়, প্রাণশক্তিতে ভরপুর। আবার মনে হয়, এ যেনো এক মৃত্যুপুরী।
৯ টি সুন্দর গল্প দিয়ে লেখা হামিম কামালের এই সুন্দর বই 'ত্রিস্তান'। একেকটা গল্প একেকরকম অনুভূতি জাগায়। তবে, সবগুলাতেই যেনো বাস্তবতা একদম জেঁকে বসে আছে বলে মনে হয়। অত্যন্ত চমৎকার লেগেছে আমার কাছে। এই গল্পগুলা মাথায় ঘুরবে অনেকদিন। প্রচ্ছদটাও চমৎকার লেগেছে।
সবমিলিয়ে, অবশ্যই পড়বেন বইটা। না পড়লে অনেককিছু মিস করবেন।
ফরাসি ধাতু ত্রিস্ত, ত্রিস্ত থেকে ত্রিস্তান। ত্রিস্তান অর্থ দুঃখী, শক্তিশালী।
শক্তিমান গল্পকার হামিম কামাল আমাদের পরিচয় করিয়েছেন এক স্বপ্নময়ী-দুঃখী নগরী ত্রিস্তানের সঙ্গে। যেখানে আছে যুগপৎ বিভীষিকা-স্বস্তি; ধ্বংস-আশ্রয়; রূঢ়বাস্তবতা-পরাবাস্তবতার এক অনিন্দ্য মেলবন্ধন। ত্রিস্তানকে মনে হতে পারে আলো-আঁধারি আর কতকটা পরাবাস্তবতার মিশেলে ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে নৈঃশব্দ্যে মিলিয়ে যাওয়া চেলোর করুণ সুরের মত। অথচ আমাদের প্রতিটি শহরই একেকটা ত্রিস্তান কিংবা চেতনে-অবচেতনে আমরা নিজেরাই হয়ে উঠি একেকজন ত্রিস্তান যেনবা। ত্রিস্তান আমাদের ভেতরে পরতে-পরতে জমতে থাকা না বলা কথামালা; গলার কাছে দলা পাকিয়ে আটকে থাকা ত্রাস-অনুশোচনা, দ্বিধা-দ্ব্যর্থতার এক জাজ্বল্যমান আখ্যান!
চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন–এর চারটি বইয়ের যে সংগ্রহের মধ্যে এই বইটি রয়েছে, আমার কাছে এটি তারমধ্যে সেরা মনে হয়েছে। কারণ অন্য বইগুলোর তুলনায় “ত্রিস্তান” বেশি পরিণত এবং মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। এত গভীর ভাবনার গল্প হয়েও এটি বোঝা খুব কঠিন, এমন মনে হয়না… ধীরে ধীরে পড়লে গল্পগুলোর সাথে এক ধরনের রিলেটিভিটি তৈরি হয়। চরিত্রগুলো আপন লাগে, তাদের কষ্ট-দ্বিধা-আশা আমাদের জীবনের অংশ বলে মনে হয়।
ত্রিস্তান নামের যে শহরকে ঘিরে সব গল্প, সেটা কাল্পনিক। কিন্তু পড়তে পড়তে বারবার আমার মনে হয়েছে—এ তো আমাদেরই শহর! বিশেষ করে ঢাকা শহরের মানুষের জীবনের সঙ্গে এর অদ্ভুত মিল আছে। যান্ত্রিকতা, ক্লান্তি, সম্পর্কের টানাপোড়েন, টিকে থাকার লড়াই—সবকিছু যেন ঢাকার অলিগলিতে প্রতিদিন ঘটে চলেছে। তাই ত্রিস্তান কাল্পনিক হলেও তার ভেতরের মানুষগুলো একদম বাস্তব। এই বাস্তবতার কারণেই গল্পগুলোর সাথে সহজে রিলেট করা যায়। অন্য গল্পগুলোর সাথে বইটিতে মানব ইতিহাসের এক সংবেদনশীল সময়কেও স্পর্শ করা হয়েছে—কোভিড-১৯ মহামারির সময়, আমাদের জীবনের এক ভীতিকর, অনিশ্চিত অধ্যায়। সেই সময়ের নিঃসঙ্গতা, আতঙ্ক, মানুষে মানুষে দূরত্ব—এসব অনুভূতি লেখক খুব সংযতভাবে তুলে ধরেছেন। কোথাও বাড়াবাড়ি নেই, কিন্তু ভেতরে একটা চাপা কষ্ট কাজ করে। মনে পড়ে যায়, আমরা কীভাবে সেই সময়ে নিজেদের ভেতরে আরও বেশি গুটিয়ে গিয়েছিলাম। গল্পগুলোয় বড় কোনো নাটকীয় চমক নেই, লেখক নাটকীয়তা এড়িয়ে গেছেন—এই সংযম প্রসংশনীয়। ত্রিস্তান তার গল্প দিয়ে মানুষ ও সময়কে বোঝার জন্য আহবান করে… নিজের ভেতরটাকেও।
লেখকের ভাষা কাব্যিক, কিন্তু হালকা ও প্রাসঙ্গিক। এই বই পড়ে আমার মনে হয়েছে, তার আরও লেখা পড়া উচিত। গুদরিডসে লেখকের লেখা বইয়ের লিস্টে গিয়ে দেখলাম তার অন্য আর কোন বই আমার পড়া নেই। এবার আগ্রহী হলাম।
‘ফাইট ক্লাব’ সিনেমায় একটি বিখ্যাত সংলাপ আছে, "The first rule of Fight Club is you do not talk about Fight Club." ‘ত্রিস্তান’ বইয়ের প্রথম গল্প ‘কাছেই এক শহরে’ পড়তে গিয়ে ‘ফাইট ক্লাব’ সিনেমায় শোনা এই অসম্ভব প্রিয় সংলাপের কথা মনে পড়লো। এই মনে পড়ার পিছনে যৌক্তিক কোন কারণ হয়তো নেই, কিন্তু পাঠক আমি যখন বেলগাছের নিচে বসে থাকা অবসরপ্রাপ্ত নিঃসঙ্গ সেনাকর্মকর্তার দিনলিপি দেখতে পাই চোখের সামনে, তখন মনে হয়, এসব কথা কাউকে ঠিক বলা যায় না। ফলে, ক্লোনিংয়ের সব সূত্র অগ্রাহ্য করে আমরা একজন থেকে দুইজন হই, আমাদের অব্যক্ত কথাগুলো বলে ফেলার জন্যই তো। মনে পড়ে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ক্রন্দনরত কোন মানুষের কথা, যে প্রতিরাতে কথা বলে নিজের সাথে। তার বেদনা আমরা জানি না, তবে জানি, কাছেই এক শহরে তাঁর বাস, সে মনে মনে আমাদেরই মতো।
আর ঠিক তখনই কোথা থেকে অশনীর মতো উঠে আসে মহামারি। আমরা পাই এক অলিক জীবনের সন্ধান। আলো-অন্ধকারে গেলে মাথার ভেতর যে বোধ কাজ করে, সেও তো আমাদেরই পরিচিত। কথা বলে ওঠে লাশ, বিচারহীন এক জগতে বিচারকের মতো, অচেতনে আমাদের শুনে যেতে হয় লাশের কথা। কতো অভিযোগ, কিছু অভিশাপ, পরিচিত প্রশ্ন। আমরা বুঝতে পারি, উত্তর আসবে না, তুমি আসবেই আমি জানি। আমরা বুঝতে পারি, খু/ন হলে, পেশাদার খু/নীদের হাতে খুন হওয়াই ভালো।
আজিমউদ্দিন আউলিয়ার চেনা- অচেনা জগত খানিকের জন্য স্বস্তি দেয় বটে। অন্তর্জলি যাত্রা থেকে আমরা উদ্ধার করি বাড়ি ফেরার পথ। পুকুরঘাটে সন্ধ্যা নেমে আসে। দূরে তিরতির করে সন্ধ্যাতারা। কেউ আসবে, সকল বিপত্তি উপেক্ষা করে, আমরা অপেক্ষা করি। সমস্ত প্রস্তুতি নিয়েই বসে থাকে আজিমউদ্দিন আউলিয়া। তাইতো প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়, হাতে আঁকা ছবিতে। অঞ্জনের পাশে বসে থাকে নিঝুম। এখানেও সন্ধ্যা হয়। দুটো জগৎ যেন আঁকে একে-অন্যের ছবি।
এসবের বাইরে পাগল লোকটাকে পেয়ে বসে সক্রেটিস। মুক্তির আনন্দে কাটা ঘুড়ির মতো শূন্যে ডিগবাজি খায় ইউসুফ। বোকা লোকটাকেই মনে হয় সবচেয়ে প্রতিবাদী। আর গল্প হলেও সত্যি এমন এক শহর, ‘ত্রিস্তানে’ আমরা ঘুরেবেড়াই তক্ষকের মতো।
হামিম কামালের গল্পের বই, ‘ত্রিস্তান’ পড়তে পড়তে এমন অনেক এলোমেলো চিন্তা এসেছে মনে। গল্পের আড়ালে গল্প সঙ্গ দিয়েছে মেটাফোরের মতো। কখনও সুফিবাদ, কখনও প্রবল দর্শন, মাঝেমধ্যে স্টিম অব কন্সাসনেস, কখনও ভেঙে ফেলা হলো তৃতীয় দেয়াল, এভাবেই জাদুবাস্তবার এক অদ্ভুত রূপ নিয়ে গল্পগুলো তৈরি হয়েছে। চমৎকার ডিটেলিংয়ে পাওয়া গেছে লং শটের স্বাদ। সবমিলিয়ে ‘ত্রিস্তান’ পড়ার অভিজ্ঞতা এক শব্দে, ‘চমৎকার’।
বাস্তবতার সঙ্গে জাদুবাস্তবতার এক চমৎকার মিশেল পাওয়া গেল ত্রিস্তানের গল্পগুলোতে। জাদুবাস্তবতা নিয়ে আমার পড়া বইয়ের সংখ্যা খুব বেশি নয়। এ নিয়ে তাই খুব ভালো বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা তৈরি হয়নি বলেই ধরে রাখি। তবে যেকোনো গল্পেরই মূল ব্যাপার হচ্ছে তা পাঠকের কাছে উপভোগ্য হচ্ছে কতোটুকু। এক্ষেত্রে ত্রিস্তান সফল। গল্পগুলো পড়ে যেতে ভালো লেগেছে। একজন ব্যাক্তির দ্বৈত অবয়ব তৈরী হওয়া, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন পীর এবং তার সহধর্মিণী কিংবা পাটক্ষেতে পড়ে থাকা ধর্ষিতার লাশের ঘটনার বর্ণনাগুলো নিজস্ব আবেদন তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে।
নয়টি গল্প নিয়ে এই ছোটগল্প সংকলন "ত্রিস্তান "। ফরাসি ত্রিস্ত ধাতু থেকে এসেছে ত্রিস্তান। আর নয়টি গল্পে ঘুরে ফিরে একবার হলেও এসেছে এই ত্রিস্তান নামটি । প্রথম দিকের গল্প একটু বড় পরিসরে, তবে সবগুলো গল্প আলাদা আলাদা বিষয় বৈচিত্র্য নিয়ে। নিদিষ্ট একটা সময়, সামাজিক কোন সমস্যা, নীতি নৈতিকতাহীন বিবর্জত কোন মানুষ, মানুষ সুখ দুঃখে সাথে কিছু গল্পে মিশে আছে জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া। আমাদের এই চারপাশে ই আছে কতো রকমের গল্প, সেই সব উপাদান নিয়ে হামিম কামাল এর সুন্দর নয়টি গল্প নিয়ে " ত্রিস্তান "। গল্প গুলোর মত নাম ও প্রচ্ছদ ও চমৎকার।
ত্রিস্তান শব্দের অর্থ দুঃখী ও শক্তিশালী, যুগপৎভাবে। সংকলনের আখ্যানগুলিও ঠিক তেমনই।
লেখক আমাদের ত্রিস্তান নগরীর গল্প শোনান; যেখানে এসে এক হয়ে যায় জাগতিক বিপর্যয়, মহামারির ভয়াবহতা, সমাজের রন্ধ্রে বেড়ে ওঠা বিশৃঙ্খলা, জাদুবাস্তবতা ও অনিশ্চয়তাসহ আরও অনেক কিছুই। আমাদের চিরচেনা ধূসর মেট্রোপলিটন ঢাকার সাথে মিল খুঁজে পেয়ে আমরা অনুভব করি, এ তো আমাদের চারপাশেরই প্রতিদিনের গল্প। তাই সেগুলি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, আমরা এ শহুরে মানুষদের সাথে আরও একাত্ম হয়ে আমাদের জীবনেরই গল্প শুনি।
বর্কিস্ময়ের ছবি, পাটখেতের লাশ, আজিমউদ্দিন আউলিয়া ও ঝাঁপরজ্জু - বেশি ভালো লেগেছে।
ত্রিস্তান একটি জায়গার নাম। বইয়ের নয়টি গল্পেই কোন না কোনভাবে এসেছে ত্রিস্তানের নাম। ত্রিস্তান শহরের নানান জায়গার ও মানুষের কাহিনী উঠে এসেছে এই নয়টি গল্পে। কিছু গল্পে আছে জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া আর কিছু গল্প একদম রূঢ় বাস্তবতার। প্রতিটি গল্পে একবার মাত্র ছোট্ট করে মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে যে এটা ত্রিস্তানের গল্প। নয়তো সবগুলো গল্পই পাঠকের চোখে হয়ে পড়তো আলাদা মানুষের, আলাদা জায়গার গল্প। একই শহরের মানুষের কত রকম গল্প থাকে। আমরা চোখের সামনে যা দেখি তাই ত সবটা নয়। তার বাইরেও থেকে যায় শত শত গল্প। কাছেই এক শহরে : একজন মানুষ হঠাৎ করে দুজন হয়ে যায়। কি আশ্চর্য! সব আশ্চর্যই এক সময়ে সাধারণ হয়ে যায়। তখন বরং সাধারনেরাই হয়ে পড়ে আশ্চর্যের বিষয়। অশনি : করোনাকালের গল্প এটি। এটা পড়তে গেলে গল্পের চরিত্রের মতন পাঠকেরও দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। কি একটা সময় পার করেছে পৃথিবী। আজিমউদ্দিন আউলিয়া : পীর মুর্শিদদের নিয়ে এমন গল্প ছোটবেলায় শুনেছি অনেক। এই গল্পে তাই বেশি চমকাইনি। পাটখেতের লাশ : রূঢ় বাস্তবতার গল্প। পত্রিকার পাতায় এই খবর প্রাধান্য পায় না কিন্তু পাঠককে ছিন্নভিন্ন করে দেয় এমন সংবাদ। বর্কিম্ময়ের ছবি : এই গল্পটা ইন্টারেস্টিং। বুঝিয়ে বলতে গেলে স্পয়লার হয়ে যাবে। তাই চুপ থাকলাম। আলো ও তার অক্ষয় তূণীর : এই গল্পটা বিশেষ সুবিধা লাগেনি। সেতু আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী : এটা পড়ে পঙ্কজ উদাসের গানের লাইন মনে পড়েছে ‘যো বেরঙ হো উসপার কেয়া কেয়া রঙ জমাতে লোগ’। গল্পেও তেমনি একজন আছেন যার মন এতই পরিষ্কার যে অন্যের পাপকে নিজেরই পাপ বলে মনে করে কষ্ট পান। না কি নিজের পাপেই কষ্ট পান অন্য একজন এসে সেই পাপ নিজের নামে চালিয়ে দিয়ে তাকে মুক্তি দেয়! বোকা লোকটা : গল্পের এই লোকটার মতনই শত শত হাজার হাজার লোক দরকার এখন এই সমাজের। যে অন্যায় দেখলে কথা বলে, চুপ থাকে না। আমরা চুপ থেকে থেকেই আরো বেশি সর্বনাশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। ঝাঁপরজ্জু : জ্বর হলে কুইনাইন খাও। কিন্তু কথা হচ্ছে কুইনাইন জ্বর সাড়াবে কিন্তু কুইনাইনকে সাড়াবে কে? এই গল্পের মূল বিষয় এটাই। সবগুলো গল্পই চমৎকার। বইয়ের শুরুর দিকের গল্পগুলো একটু দীর্ঘ হওয়ায় ওগুলো পড়তে ভালো লেগেছে বেশি। বইয়ের প্রচ্ছদ খুবই সুন্দর। বাঁধাই ও কাগজও চমৎকার। সব মিলিয়ে সুখপাঠ্য বই।
"জীবিত ফুলের চেয়ে দুঃখী ও মৃত ফুলের চেয়ে শক্তিশালী কিছু নেই, সান্ত্বনা এই।" ত্রিস্তান কল্পিত এক শহর। এই শহর ঘিরে রচিত হয় নানা গল্প। আর প্রতিটা গল্পকে ত্রিস্তান তার বুকে জায়গা করে দেয়। ত্রিস্তান কখনো কখনো হয়ে ওঠে খুব জীবন্ত এক শহর, যে শহর হয়তো আমাদের পরিচিত, আমাদের জানাশোনা। গল্পকার হামিম কামাল গল্পের মধ্যে দিয়ে আমাদের নিয়ে যান তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যতে। যেখানে তার হাত ধরে পাঠকের যাওয়ার কথা। আমরা দেখতে পাই একজোড়া দ্বিধান্বিত মানুষকে, যারা আসলে একজনই। কেন তারা দ্বিখণ্ডিত হল তার জবাব খুঁজে ফিরছেন তারা নিজেরাই। অথবা বলা ভালো তাদের দ্বিখণ্ডিত হওয়ার মূল উৎস তারা নিজেরাই। এক আউলিয়ার কথা আমরা শুনি। তার কথা বলতে গিয়ে লেখক জাদুবাস্তবতার আশ্রয় নিয়েছেন। যদিও সমস্ত বই জুড়েই তার টুকটাক ছড়াছড়ি আছে। আজিমউদ্দিন আউলিয়ার মানবিকতার যে দ্বার আমরা দেখতে পাই তাতে মন জুড়ে নেমে আসে প্রশান্তি। সাথে দেখা যায় তার প্রবল ব্যক্তিত্বের একটা প্রভাব। 'পাটখেতের লাশ' গল্পটা ধাক্কা দিয়ে যায় প্রবল ভাবে। পড়তে পড়তে ইচ্ছে করে এই অত্যাচারের গল্প আর না পড়ি। মানুষের উপর জন্মে যায় বিষাদ। তবুও গল্পের শেষ পর্যন্ত যেতে হয়। এবার আসি এই বইয়ের সবচেয়ে পছন্দের গল্পটার কথায় যার নাম 'বর্কিস্ময়ের ছবি'। একজন আঁকিয়ে, যার নাম বর্কিস্ময়। একটা ছবি এঁকেছে, যে ছবি একজন মানুষকে মুগ্ধ করে অসাধারণ ভাবে। তারপর গল্পের জল গড়িয়ে যায়, যে স্রোত আপনাকে নিয়ে যাবে প্রার্থিত মোহনায়। হামিম কামালের লেখায় জীবনকে খুঁজে পাওয়া যায়। মনে হয় জীবনের হারিয়ে যাওয়া কোন এক ধাঁধা উঁকি দিচ্ছে তার লেখার কোন একটা কোণ হতে। জীবন এবং প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর তার লেখাগুলো। তিনি কখনো কখনো প্রবল মমতায় বলে ওঠেন, "শুক্লা চাঁদের আলোয় সাদা মাটির ওপর ফুলপাতার কালো নকশা পড়েছে। সেই নকশা মাড়িয়ে যেতে বুকে কেমন কষ্ট হয়।"
একটা লোকের দু’টো হয়ে যাওয়া গল্প 'কাছেই এক শহরে'। এ ধরনের গল্পে এক ধরনের মজা আছে। লেখক আর পাঠকের ভাবনা ঠিক কতটুকু মিলবে সেটাই নির্ধারণ করে দিবে পাঠকের কাছে এ কায়দার গল্প ভালোলাগার মানদণ্ড।
গল্প গুলো অতি সাবলীল না। ভাবনার অনেক জায়গা আছে। লেখক জাদু বাস্তবতা টেনে আনেন গল্পে। তাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবটা হারিয়ে যায় না।
সমাজ, নিয়মের বিচ্যুতিতে গড়ে ওঠা দুঃখী শহরের নাম ত্রিস্তান। শহরের নামে বই কিংবা বইয়ের নামে শহর। পরিচিত এই শহরের গল্পগুলোও জানাশোনা। যেমন: অশনি, পাটক্ষেতের লাশ। গল্পের বীভৎসতা প্রকট!
‘সেতু আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী’ গল্পটা ট্রিকি। আর ‘বোকা লোকটা’ গল্পটা মনে ধরেছে খুব। আরেকটু বড় হলে ভালো হত। তবে সব গল্পই বোধগম্য হবে এমনটাও আশা করা বোকামি।
লেখকের লেখা আগে অল্প পড়েছি। যত্ন করে লেখেন খুব। ভাষাশৈলীও চমৎকার। জাদুর মোচড়ে সৃষ্টি হওয়া দুঃখী শহরের মন খারাপ করা গল্পগুলো চাইলে পড়বেন।
ত্রিস্তান শব্দের অর্থ দুঃখী এবং শক্তিশালী একইসাথে। সহজেই মেনে নিলাম এমন একসাথে একই শব্দের দুটো অর্থ থাকা। দুঃখ তো আসলেই শক্তিশালী। নাম শুনে আমার মনে পড়ে গিয়েছিল কৈশোরে পড়া সোনালী দুঃখের কথা। ভিনদেশী কোন উপকথা কেমন দুঃখ নামটি ধরে আপন হয়ে গিয়েছিল।
বইয়ে ত্রিস্তান শিরোনামে কোন গল্প নেই। তবে সব গল্পই ত্রিস্তান শহরের গল্প। প্রচ্ছদে লাল রঙের পরে অমন সব কিছু দেখতে থাকা চোখ মনে করিয়ে দিচ্ছিলো অরওয়েলের ১৯৮৪ নয়ত দার্শনিক বেন্থামের প্যানোপটিকনের কথা, ফুকো যার প্রয়োগ খুঁজে পেয়েছিলেন হাসপাতাল, কারাগার, পাগলাগারদ এমনক�� বিদ্যালয়ে মানে শহর সভ্যতার সর্বত্র। সব জায়গায় নজরদারি। লাল রঙের অমন উপস্থিতি দুঃখের গল্প নয়, বরং যেন পূর্বাভাস দিচ্ছিলো নিপীড়ণের বুঝি। গল্প পড়তে গিয়ে ঐ চোখ আবার হয়ে ওঠে যেন মানুষের অন্তরের চোখ। যে বাস্তবতার পর্দার আড়ালে মহাপ্রকৃতির নিয়ম বুঝবে বলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। নিষ্পলক। তবু ঐ লাল রং খটকা লাগিয়ে রাখে। কিংবা অমন মেইজ কিংবা ধাঁধার মত টাইপোগ্রাফি।
প্রথম গল্পগুলো পড়তে গিয়ে দ্যাখা যায় গল্পগুলো দুঃখের। 'কাছেই এক শহরে' গল্পের কথাই বলি। সন্দীপনের একটা উপন্যাস পড়েছিলাম অনেকদিন আগে। আমি ও বনবিহারী। মনে হয়েছিল আমি আর বনবিহারী কখনো একই মানুষ কখনো আলাদা। এই গল্পের এমন মানুষের দুইভাগ হয়ে যাওয়ার মাঝে যথারীতি প্রতীকি কিছু একটা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। গল্পে সুন্দর কিছু মানুষের দ্যাখা পাই। নতুন কোন অস্বাভাবিকতার প্রতি মায়া আর সহানুভূতি নিয়ে তারা তাকায়। সমাজের অবজ্ঞা আর বিদ্রূপের দৃশ্যও আসে সেখানে। ধীরে ধীরে মানুষ তা গ্রহণও করতে শেখে। প্রতীকের বাইরে এসেও গল্পলোভী মন কিনারা করতে চায় রহস্যের। কীভাবে একটা থেকে দুইটা মানুষ হয়ে যায়? গল্পের শেষে এসে দেখলাম একেকটা দুঃখ মানুষকে কেমন দুইভাগ করে দিয়ে যায়, একটা ভাগ হয়ে থাকে আরেকটার ছায়া। বুঝতে পারলাম উৎসর্গের পাতায় বলে যাওয়া প্রমিথিউসের আগুনের সেই গুণ। মনে হলো এমনই তো হওয়ার কথা ছিল। দুঃখই তো একমাত্র এমন শক্তিশালী যুগপতভাবে হ'তে পারে। ত্রিস্তানের গল্প যে এটা।
অশনি গল্পেও দেখি দুঃখের কথা। মহামারির সময়কার অভিজ্ঞতা এসেছে গল্পটায়। মহামারি মানুষের ভালোবাসার পরীক্ষা নিয়েছে। সেই গল্প বলেছেন লেখক। বাস্তবতার দেয়াল ভেঙে প্রকৃতির অমোঘ কোন মহানিয়মকে অনুভব করতে চাওয়ার এক ধরণের তাড়না এই গল্পে ছিল। একই চেষ্টা দেখি 'আজিমুদ্দিন আউলিয়া' গল্পে। সত্যি বলতে সবকটি গল্পেই।
এরপরের তিনটি গল্প একাধারে আমার সবচেয়ে প্রিয়। পাটক্ষেতের লাশ, বর্কিম্ময়ের ছবি, আলো ও তার অক্ষয় তূনীর। গল্প জমানোর তাড়া নেই। মায়ার পিদ্দিমের আলোয় বসে লেখা যেন। রূপকথার গল্প বলার ভঙ্গিতে বলে যাওয়া। বড়োদের রূপকথা। পাটক্ষেতের লাশের সংবেদনশীল সম্পাদকের কথা মনে থাকবে। মনে থাকবে বর্কিম্ময়ের ছবিতে শিল্পীর অমন এক জোড়া সৃষ্টির দিকে চেয়ে ঈশ্বর হয়ে ওঠা কিংবা আলো ও তার অক্ষয় তূনীর-এর মঞ্চনাটকের আবহ।
"তবে সবার আগে খুউব যত্ন করে শেখাব তোকে দর্শন। দর্শন হলো চিন্তার দাঁত। দাঁত না থাকলে সামনের সব খাবারই বৃথা। আমি এ যাবত যতগুলোকে পেয়েছি কোনোটারই দাঁত ছিল না। ওরা সবাই বিরাট সব গিলবাজ, মানে শুধু গেলে।"
হামিম কামালের গল্পগ্রন্থ ত্রিস্তান পড়তে গিয়ে মনে হলো, কিছু অনুভূতি ভাষায় আনা যায় না, কিছু কথা বলা হয় না এবং এই না বলার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত সংযোগ। এই সংযোগ কখনও নির্জন শহরের নিঃসঙ্গ মানুষের সাথে, কখনও মহামারির ছায়ায় ঢাকা এক অচেনা জীবনের সাথে, কখনও বা লাশের নীরব অভিযোগের সাথে।
গ্রন্থের প্রথম গল্প 'কাছেই এক শহরে' পড়তে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে বেলগাছের নিচে বসে থাকা এক অবসরপ্রাপ্ত নিঃসঙ্গ সেনাকর্মকর্তার দিনলিপি। মনে হয়, এই নিঃসঙ্গতা, এই অব্যক্ত অনুভূতির ভার পাঠকেরও নিজের ভেতরে কোথাও জমে আছে। গল্পের গাঁথুনি যেন এক ধরনের আত্মস্মরণ—একটি শহর, যেখানে কেউ বাস করে, আর আমাদের মনের গোপন কোণে তার অস্তিত্ব অনুভূত হয়। আমরা এই শহরকে চিনি, কারণ আমরা সকলেই কোথাও না কোথাও নিঃসঙ্গ।
তারপর আসে মহামারি। জীবনের অনিশ্চয়তা, আলো-অন্ধকারের টানাপোড়েন, বিচারহীন এক পৃথিবীতে মৃতদের নীরব সাক্ষ্য এই সবকিছু মিলিয়ে এক অলীক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। গল্প এগিয়ে যায় অথচ কোথাও গিয়ে থমকে থাকে, পাঠক বুঝতে পারে, কিছু প্রশ্নের উত্তর কখনও আসে না, কিছু প্রতীক্ষা থেকে যায় চিরকাল। মনে পড়ে অ্যালব্যার ক্যামুর প্লেগ যেখানে মহামারির ছায়ায় আটকে পড়া মানুষ শুধু অপেক্ষা করে, প্রশ্ন করে, কিন্তু উত্তর আসে না।
আজিমউদ্দিন আউলিয়ার চেনা অচেনা জগতে সামান্য স্বস্তি মেলে, অন্তর্জলি যাত্রা থেকে পাওয়া যায় বাড়ি ফেরার পথ। পুকুরঘাটে সন্ধ্যা নামে, তারার আলোয় অপেক্ষার ছায়া পড়ে। কেউ আসবে, সকল প্রতিকূলতা পেরিয়ে, এবং এই আসার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক পরিত্রাণের অনুভূতি। এই বাড়ি ফেরা শুধুই শারীরিক স্থানান্তর নয়, বরং এক আত্মিক পরিক্রমা।মুরাকামি যেখানে বাস্তবতার ফাঁকে স্বপ্নের দরজা খুলে দেন, ত্রিস্তানের গল্পগুলোও তেমন এক বাস্তবতায় পৌঁছে দেয়, যেখানে নিখুঁত কোনো সমাধান নেই, শুধু অনুভূতি আছে।
এই গল্পমালা শুধু চরিত্র ও কাহিনি নির্মাণের খেলা নয়, বরং এটি দর্শন ও মেটাফোরের এক চমৎকার মিশ্রণ। সুফিবাদ, স্ট্রিম অব কনশাসনেস, এবং কখনও বা তৃতীয় দেয়াল ভেঙে দেওয়ার সাহসী চেষ্টা এই বইয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। জাদুবাস্তবতা এখানে কেবল অলৌকিক কোনো উপাদান নয়, বরং গল্পের গভীরে প্রবেশের এক প্রবাহ। ডিটেলিংয়ের মুন্সিয়ানায় কখনও দৃশ্যপট দীর্ঘ লং শটের মতো বিস্তৃত, কখনও আবার অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠ ক্লোজ-আপ।
তবে শুধু কাঠামোগত নতুনত্বই নয়, এই বইয়ের অন্যতম শক্তি এর আবেগঘন টান। কখনও মনে হয়, গল্পের প্রতিটি চরিত্র আমাদের চেনা, আমাদেরই এক অংশ। যারা সমাজের প্রান্তে দাঁড়িয়ে শুধু প্রশ্ন করে, ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকে, আর আমরা জানি, সেই বিচার আসবে না। তবুও, কোথাও এক আলো আছে, প্রতীক্ষার মধ্যে এক অনিবার্য সত্য আছে।
ত্রিস্তান শুধু পড়ার অভিজ্ঞতা নয়, অনুভবের একটি যাত্রা। গল্পের আড়ালে গল্পের যে ছায়া—তা থেকে পাঠক নিজেই আবিষ্কার করতে পারেন নিজের প্রতিচ্ছবি। কখনও কখনও মনে হয়, গল্পের চরিত্রগুলো পাঠকেরই একেকটি ছায়া, যারা নিজেদের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়ায়, কখনও পায়, কখনও পায় না। কিন্তু এই খোঁজের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সাহিত্যের সত্য।
একটি বই কেবল তার কাহিনির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং তার যে অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, সেই অভিজ্ঞতাই তাকে স্মরণীয় করে তোলে। ত্রিস্তান ঠিক তেমনই এক বই যা পড়ার পরও মনের ভেতর থেকে যায়, কল্পনার গহীনে আরও অনেক নতুন গল্পের জন্ম দেয়।
...প্রেম অকারণ পক্ষপাত জাগায়। কে যেনো বলেছিলো অন্ধত্বের লৌহশূলদন্ডে প্রেম এক রত্নখচিত অলংকরণ।
আলো ও তার অক্ষয় তূণীর, ত্রিস্তান।
ছায়াঢাকা কোনো শেকড়বাকড় ছড়ানো, যাকে জড়িয়ে রাখে এক হাহাকারের পিন্ড, যে পিন্ডের মাঝে লুকিয়ে রাখে গূঢ়চারী বিষন্নতার বোনা মায়াজালিক কাব্য, সেই শেকড়ের মাঝে গড়ে উঠে ছায়ার কোনো এক শহর। যে শহরের নাম হতে পারে যেকোনো, তবে তার শেকড়ে, রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকে এক ঝাক হতাশার বায়ুমন্ডল। অক্সিজেনের মত দীর্ঘশ্বাস ফুসফুস দখল করে, সিগারেটের ধোয়া দিয়ে বাতাসে মিশে যায় মৃত মানুষের শেষ নিশ্বাস। যে শহরে বাস করে ছায়ারা, যে ছায়াদের মাঝে থাকে রূঢ় নির্বচন স্বাভাবিকতা। যে শহর প্রানহীন, যেখানকার মানুষ কাব্যহীন, যেথায় মানুষ নয়, বাস করে রহস্যময় সমান্তরাল কোনো ত্রিবেদীর সুর, সেইরকম এক শহরের নাম ত্রিস্তান। যে শহরের আগাছায় বেড়ে উঠে নামহীন কিছু ক্রুঢ় গল্পের মালা, যা বুনার আগেই ছিড়ে গিয়ে হারিয়ে যায় সময়ের গহব্বরে, হয়ত কারো লেখবার অপেক্ষা না করেই৷
ত্রিস্তান মূলত একটি গল্পসংকলন, যেখানে ত্রিস্তান নামক এর শহরে ঘটে যায় গল্পের প্রেক্ষাপটের ঘটনাবলি, যেখানে গল্পগুলো তৈরি হয়। যেখানে গল্পগুলো এক বিষন্ন সুর গায় আর লেখকের দীর্ঘশ্বাসকে কোনো এক কোণে অন্ধকারের জন্ম দেয়। ত্রিস্তানের গল্পগুলো ত্রিস্তানের আধার প্রহরীর ছায়া, স্বাভাবিক জীবন কিংবা বেদনার ক্ষতের আখ্যা, যার মাঝে লুকিয়ে আছে কাব্যিক লেখনির অন্য মাত্রা।
চার লেখকের গল্পকারের গল্প সেটের হামিম কামাল সাহেবের একটি গল্পগ্রন্থ ত্রিস্তান। গল্পগুলোর মধ্যে একটি ইউনিক কানেক্টিভিটি তৈরি করেছেন একটি শহরের মাধ্যমে, এবং গল্পগুলো ত্রিস্তান নামক স্থানে ঘটে যায়। ফলে গল্পগুলোর মধ্যে আদতে কোনো সংযোগ না থাকলেও এক অদ্ভুত সংযোগ অনূভব করা যায়। গল্পগুলোর প্রাণ হলো লেখকের কাব্যিক লেখনি। গল্প লেখা আর গল্প বোনায় বেশ পার্থক্য দেখা দেয়৷ লেখক প্রতিটি গল্পকে যেনো বেশ যত্ন করে কাব্যিক ছন্দের মাধ্যমে বুনেছেন, গল্পগুলোর গভীরতা না থাকলেও তিনি যত্নের সাথে গল্পগুলো বলতে চান। শেষের দিকে ছোট গল্পগুলো কিছুটা গভীরতা হারিয়ে ফেললেও প্রথম দিকের গল্পগুলো লেখক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম। গল্পের মধ্যে অদ্ভুতুরে, প্রেম, বিরহ সব ধরনের উপাদানের উপস্থিতি দ���খা গিয়েছে। এবং তিনি সবগুলোকে বেশ দক্ষতার সাথে ব্লেড করে দাড় করিয়েছেন বেশ চমৎকার এক ছবি। ছোটগল্পের মাঝে ভিন্ন স্বাদ খোজার পাঠকদের জন্য এটি বেশ চমৎকার গল্পগ্রন্থ হতে পারে৷ গল্পের গভীরতা কিংবা প্লট আপনার মনে দাগ না কাটতে পারলেও গল্পের লেখনি আপনাকে জয় করতে সক্ষম হবে।
সব মিলিয়ে, বইটি পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে—এটা প্লটনির্ভর গল্পের সংকলন না, বরং গল্প বলার নিজস্ব ভঙ্গিমার উপস্থাপন। সবচেয়ে ভালো লেগেছে 'কাছেই এক শহরে' আর 'আজিমউদ্দিন আউলিয়া'। এ দুটি গল্প যেন একটিই নগর-সম্ভবনাকে দুই দিক থেকে উন্মোচিত করে, বাস্তবতার মতোই অবাস্তব, আবার অদ্ভুত রকম স্পর্শযোগ্য। এরপর উল্লেখযোগ্য ছিল, 'আলো ও তার অক্ষয় তূণীর' ও 'বর্কিম্ময়ের ছবি'। এই বইটা পড়তে গিয়ে মনে পড়ে যায় 'পাটক্ষেতের লাশ' গল্পটা আমি বেশ আগে পড়েছিলাম, সম্ভবত হামিম লিখেছিল এক অনলাইন পত্রিকায়, আবার 'বর্কিম্ময়ের ছবি' গল্পটা যে ঘন কোভিড সময়ের লেখা, সেটাও খুব স্পষ্ট মনে পড়ে গেল। এমন অনেক টুকরো স্মৃতি ভেসে উঠল বইটা পড়ার সময়। যেন হামিমের লেখার ভেতর দিয়ে নিজের পুরোনো সময়েও ঢুকে পড়েছি।
বইয়ের সব গল্প 'ত্রিস্তান' নামের এক দুঃখী শহরে এসে জুড়ে গেছে। কিন্তু শহরটা আসলে ভূগোল না, বরং একধরনের মানসিক পরিসর। প্রায় প্রতিটি গল্পে ব্যক্তিগত স্মৃতি, যাপনের ক্লান্তি আর আধা-ধূসর আবহ মিলেমিশে একটা ছায়াময় পটভূমি তৈরি করেছে। গল্পগুলোয় চমক নেই, তাড়াহুড়ো নেই, কিন্তু যে সহজ অথচ গভীর ভঙ্গিতে বলা হয়েছে—সেটাই আসল চমক। কখনোই মনে হয়নি গল্পকার ইচ্ছাকৃত নাটকীয়তা আনতে চেয়েছেন। এই আন্ডারস্টেটমেন্টটাই বইটার বড় শক্তি।
সবশেষে বলতে হয়, 'ত্রিস্তান' আসলে গল্পের চেয়ে গল্প বলার বই। হামিমীয় ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে শরীর আর মন নিয়ে একসাথে হাঁটে, ভেঙে পড়ে আবার গড়ে ওঠে, কুয়াশার মতো ছড়িয়ে পড়ে, আবার রোদ উঠলে নিজের প্রকৃত রংটা খুঁজে পায়। যেখানে গল্পকার ছাপোষা শহুরে বাস্তবতাকে বিভ্রম থেকে জাদু বাস্তবতার মোড়কে এমন এক আবহে ঢুকিয়ে দেন, যেখানে পাঠকের নিজস্ব স্মৃতিও লেখকের স্মৃতির মতো অনুরণিত হয়। আর এই নির্লিপ্ত, সংবেদনশীল ভাষায় গল্প বলাটাই বইটিকে আলাদা করে তুলেছে। করে তুলেছে ভালোলাগার...
এই গল্পগুলি হামিম কামালের, যে প্রকৃতিকে পাঠ করে মহানিয়মের সুত্র দিয়ে। সে জানে, আমরা যা কিছুই করি না কেন, সব একটা সুবিশাল পরম্পরার অংশ এবং আমরা কখনও মিশে যাব না শূন্যে। প্রবলভাবে যুক্তি আর নিয়মে বিশ্বাসী হওয়া সত্তেও সে জানে মহামারির সময়ে প্রকৃতি নিয়ম ভঙ্গ করে কখনও কারো ওপর বিশেষ পক্ষপাতদুষ্ট দাক্ষিণ্য দেখায়। পাটখেতে পড়ে থাকা বিভৎস লাশটা জৈবসার হয়ে যাওয়ার আগে তাই সে তাকে নতুন জীবন দেয় নিজেদের ভেতর থেকে।
ত্রিস্তান ছেড়ে চলে এসেছি, কিন্তু আসলে কি কখনও কোনো কিছু থেকে চলে আসা যায়?
একটি শহর অথবা একটি দেশ যেটাই বলুন না কেন। তার কিছু গল্প থাকে। কিছু ভাবনা থাকে। সব কিছুকে ছাপিয়ে মুখ্য ব্যাপার হচ্ছে মানুষের জীবন। জীবনকে দেখার ভাবনা। বেচে থাকার আকুতি ও আশা নিয়ে মানুষ সামনে এগিয়ে যায়।
ত্রিস্তান মুলত মানুষের ভাবনার জগত এবং বাস্তবতা কে এক বিন্দুতে নিয়ে এসেছে। সেই সাথে মানব জীবনের দর্শনকে ফুটিয়ে তুলেছে। ভাবনা, বাস্তবতা এবং জীবনের দর্শন যেন এক হয়ে আছে।
বইটি কিছুটা কঠিন বলা যায়। সবার জন্য না। যাদের এই ধরনের গভীর লেখা পড়ার অভ্যাস নেই তারা পড়ার পর আসলে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ হতে পারেন। তবে সময় নিয়ে পড়লে আনন্দ পাবেন।