এখানে আনাগোনা হন্ত্রকদের - যারা যে কোনো শহরে আত্মহত্যার মহামারি আনে, উড়ে বেড়ায় প্রতিহিংসুক জিন, ওঁত পেতে থাকে দুপুরের ধাঁধা, শীতের অপেক্ষা করে এক খোলসবন্দী হতে থাকা ধর্মপ্রচারক, আছে প্রাচীন বংশের অভিশপ্ত টাইপরাইটার, ব্যাবিলনের আরও এক ঝুলন্ত বাগানের কথা যা মানব সভ্যতার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এ বইয়ের গল্পগুলো বর্তমানের সঙ্গে অতীতের সংযোগ খুঁজে ফেরে, আঁকতে চায় এমন এক আগামীর কথা যেখানে আমরা ইতোমধ্যেই বাস করছি।
হন্ত্রক এর গল্পগুলো ভিন্ন ভিন্ন সেটিং থেকে অভিন্ন 'এলিয়েনেশন'কে বোঝা। বিষয় কঠিন হলেও গদ্যের ভাষা বা ডিকশন বা ন্যারেটিভ খুব ওয়েলকামিং।
নামগল্পে দেখতে পাই হন্ত্রকেরা মানুষকে আত্মহননের পথ দেখিয়ে দিচ্ছে। যাকে একবার ধরছে, তার পরিত্রাণ নাই। নিঃসন্দেহে চমৎকার প্লট। বইয়ের নামকরণের গুরুতর ভার গল্পটা দিব্যি ধরে রেখেছে।
'শীতের অপেক্ষা করছি না' এই সংকলনে আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প। নামটা দুর্দান্ত। ভেবেছিলাম গল্প খুবই ডিপ্রেসিভ হবে, আমাকে অবাক করে দিলেন লেখক। সাদামাটা মন খারাপ আর নস্টালজিয়ায় ভরিয়ে রাখলেন কয়েকটা হলদে পাতা।
'এহসানের ট্রেন বিষয়ক গল্পে ঢুকে পড়ি'তে বিশুদ্ধ পরবাস্তবতার ছোঁয়া আছে, গল্পটা মাথার ওপর দিয়ে গেছে। অবশ্য আমি তো কখনো বুঝতে পারি নাই সালভাদর ডালি'র গলে যাওয়া ঘড়ি; পারসিসটেন্স অফ মেমোরি। ধরে নিচ্ছি, স্যুররিয়েলিজম ব্যাপারটাই এমন। পরিচিত দুনিয়ায় অদ্ভুত সব ঘটনা। না বোঝাতেই আনন্দ, বিস্ময়।
'মরচে' গল্পে টের পেলাম মেট্রোপলিটন জীবনের হতাশা। সাথে সম্ভাব্য কিছু দুর্যোগ, কিছু হেলুসিনেশন। রিলেট করতে পারি এমন না, তবে গল্পটা লার্জার দ্যান লাইফও না। এইটা ভালো ব্যাপার।
'একপাল সম্রাট' এক্সপেরিমেন্টাল ওয়ান। থার্ড পারসন ন্যারেটিভে লেখা, অথচ একটা চরিত্রের নামও নেই। এটার বিষয়বস্তু 'মেলাংকলিয়া' বললে খুব জেনারালাইজেশন হয়ে যায়।
'আউলিয়া' গল্পটা বোধগম্য। লিনিয়ার স্টোরিলাইন। এক লোক ধমকর্ম করতে করতে জনপ্রিয়তাবাদী হয়ে গেলো। বিবিধ ঝর ঝামেলার পর কোনো এক রাতে সে বিছানা পেতে ঘুমাতে শুরু করলো, শুরু হলো অন্য এক অপেক্ষার পর্ব। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব নিয়ে সুন্দর একটা গল্প। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মজিদের কথা মনে হলো বারবার।
এইতো, হন্ত্রকের এই গল্পগুলো ভালো লেগেছে। বইটা নিয়ে আশাবাদী ছিলাম। বেশ কড়া ব্রেক নিয়ে পড়েছি গল্পগুলো। এই বেলায় হতাশ হই নাই ঠিক, তবে আমার প্রত্যাশা ছুঁয়েছে কি?
"চারদিকে যেন মানুষ নয়, মানুষের ছায়ারা বসবাস করে।”
কখনো কখনো এমন অনেক লাইন পড়ি যেটা পড়ে মনে হয় এই লাইনটা আমার লেখার কথা ছিল বা এটা তো আমি অনেক আগে মনে মনে লিখে রেখেছি!! তেমনই উপরের লাইনটা লয়মন্তর গল্পে পেয়েছি…
শুরুটা হয়েছিলো কোনো একটা ঘোর লাগা দিনে তন্দ্রার সুরে হাত ছুঁয়ে আমি নাম গল্প হন্ত্রক পড়তে পড়তে মায়ানগরে ঢুকে ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুমে এনামুল রেজা আর হামিম কামাল বড় খালার পুরোনো বাড়িতে এসে তান্ডব চালালেন এবং হুমকি দিয়ে গেলেন আবার আসবেন, আরো খন্ড খন্ড কিছু মনে পড়ছে, তবে পুরোটা স্বপ্ন আমি মনে করতে পারি না। এনামুল রেজার চেহারাটা ঘুম থেকে উঠে ফেসবুকে চেক করলাম আসলেই চেহারার মিলে আছে; তবে ঘুমের ভেতরকার মানুশটাকে বাস্তবে দেখলে মরে যেতাম। মনে হলো ঘুম চোখে নিয়ে বই পড়ে যে অন্যায়টা করলাম সেটার হিশেব নিলেন৷ হামিম কামাল তো পারলে গুলি দিয়ে কুলি উড়িয়ে দেন। এমন উদ্ভট স্বপ্নের ব্যাখা নাই। তাই হন্ত্রক আবার পড়লাম আর মনে হলো বাস্তবের এই কাটখোট্টা সময়ে আমার হন্ত্রকদের ভীষণ দরকার ছিল!!
এমন একটা সময় পার করছি যখন হুটহাট আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না, মন করে জীবনদাশের এই বিষ্ময়ের রোগে আক্রান্ত জীবনবোধের তাড়ায় পোড় খাওয়া দিনমান সব মিথ্যে করে দিয়ে উধাও হয়ে যাই! নিজেকে হুট করে অদৃশ্য করে ফেলার শক্তি যদি থাকতো! একদম হুট করে যখন আমার ভালো লাগছে না, আমি পারছি না তখনই সময়টা থামিয়ে দিয়ে হয়তো কয়েকবছরের জন্য মরে গেলাম!! সেই বোধে পুড়তে থাকা জীবন বয়ে বেড়াতে গিয়ে আমি নস্টালজিক হয়ে মন নরোম করে বসে থাকতে থাকতে পড়তে বসি “শীতের অপেক্ষা করছি না” আর দারুণভাবে লুকিয়ে থাকা নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হই। দুপুরে চরকায় পড়তে গিয়ে মনে হলো আমাকে গল্পটা তাড়া করছে, পিছন ফিরে তাকালে আমিও গল্পে ঢুকে পড়বো আর আমাকে কেউ মেরে ফেলতে চাইবে কিংবা এনসানের গল্পের সাথে হুট করে নিজের গল্প গুলিয়ে খেই হারিয়ে আমরা যখন বুঝি না এবং সাথে সাথে কোথায়, কি এবং কেন শব্দের উৎপত্তি হয়, আমার ক্লান্ত চোখ জোড়া খুঁজে বেড়ায় কোথাও কি ব্যাবিলনের দ্বিতীয় বাগান আছে কিনা!! হুট করে শহুরের কানাগলিতে কোনো এওয়াজের ঘটনায় আমি অবাক হবো, তাও বিশ্বাস না করে পারবো না একটা গল্পকেও!! “আন্ডারউড মাস্টার ১৯৪০” আমার বেশ আরাম লেগেছে পড়তে হয়তো গল্পের ভিন্টেজ ভাবের জন্য কিংবা টাইপরাইটারটারের লোভে!! লয়মন্তর আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং স্বাচ্ছন্দ্যের গল্প। আমার নিজের পছন্দকে আমি ভীষণ ভীষণ যত্ন করি বারবার হাত বুলিয়ে!! আউলিয়া গল্প পড়তে পড়তে মজিদকে নিয়ে ইন্টারের ভয়ংকর সৃজনশীল লেখার স্মৃতি মনে পড়ে। অদ্ভুত রকমের ভালো লাগার ধরণ আবিষ্কার করি৷
রচনাকাল দেওয়ার কারণটা বুঝিনি,তবে একটা ধারণা ছিল লেখা ধীরে ধীরে ভালো হয়, প্রথমদিকের লেখা বোধহয় খুব বেশি ভালো নাও হতে পারে। ধারণাটা ভুল প্রমাণ হলো লয়মন্তর কিংবা দুপুরে চরকায় গল্প দুটো পড়তে গিয়ে। এই দুটো গল্প আমার সবচেয়ে ভালো লাগার!! গল্পের নামগুলো সুন্দর এবং আমার অগোছালো পড়ার স্বভাবে আমি "ব্যাবিলনের দ্বিতীয় বাগান" জমিয়ে রেখেছিলাম শেষে পড়ার জন্য। গল্প সংকলনের ক্ষেত্রে আমার গল্প মনে রাখতে বেশ অসুবিধে হয়, ভুলে যাই কোন গল্পের নাম কি! বেশ অনেক কবার করে গল্পগুলো পড়ার দরুণ আমার গল্পগুলো বেশ ভালোই মনে আছে। এনামুল রেজার বই পড়া আমাকে মুগ্ধ করে, সেই হিশেবে আমার expectations আকাশছোঁয়া ছিল। কিছু গল্পের ধার আমার চিন্তায় দাগ কাটেনি। কোনো গল্পই গভীরতায় পূর্ণ এমন কিছু না, তবে গল্পগুলো ফেলে দেওয়ার মতো না, মনে হয় এগুলো সব ঘটেছে, বিশ্বাস করি, এগুলো বাস্তব ঘটুক, ঘটবে!! "ডায়নোসরের পিঠ" বিশাল আগ্রহ নিয়ে পড়তে গিয়ে একটু বোধহয় হতাশ হয়েছি!!
শুরুটা হয়েছে 'হন্ত্রক' নামের গল্প দিয়ে এবং বলতে হবে শুরুটা দুর্দান্ত। হন্ত্রক গল্পটা ভালো লাগার পর বাকি গল্পগুলো নিয়ে প্রত্যাশা ছিল বেশি। কিন্তু প্রত্যাশার পালে হাওয়া তেমন একটা লাগেনি। পরের গল্পগুলো ঠিক জমলো না, ঠিক মনে রাখার মতো গল্প না। তবে শেষ দিকের ৪ টা গল্প বেশ ভালো, বিশেষ করে 'আন্ডারউড মাস্টার ১৯৪০' গল্পটা।
আর হ্যাঁ, এনামুল রেজার গদ্য চমৎকার, আমার বিশেষ পছন্দের। এ গল্পগুলোতেও তার স্বভাবজাত ছান্দসিক গদ্যের ব্যত্যয় ঘটেনি।
হন্ত্রক পড়লাম। মনে হলো কিছু কথা লিখে রাখি। রিভিউ নয়, সমালোচনা নয়, নোট বলা যায়।
প্রথমে লেখক সম্পর্কে। এনামুল রেজার কথা আমি জানতে পারি ২০২৩ এর মেলায় প্রকাশিত 'চায়ের কাপে সাঁতার' উপন্যাসের স্রষ্টা হিসেবে। এটি একটি বড় কলেবরের উপন্যাস। বইটি সম্পর্কে বেশ কিছু ভালো রিভিউ দেখে সংগ্রহ করি। বড় উপন্যাস পড়ার সময়/স্থিরতা জোটে না আমার আর। তাই বইটি জায়গা পায় বুকশেলফে অরুণ সোমের করা অনুবাদ মাস্টার ও মার্গারিতার পাশে। আনকোরা পাতা ন��� উল্টোনো। এরকম কিছু বড় উপন্যাস আছে যেগুলো আমি জমিয়ে রেখেছি মানসিকভাবে স্থির অবসরের জন্য। (থ্যাঙ্কসগিভিং বা ক্রিসমাসের ছুটি এসে চলে যায়। আমি পালিয়ে বেড়াই। সমকালীন তরুণ লেখকদের ভালো লেখা পড়তে গেলে মাঝে মাঝে খুব হীনমন্যতা জাগে।)
কী কারনে মাস্টার ও মার্গারিটার পাশে রাখার কথা উল্লেখ করতে ইচ্ছা হলো? কারণ হঠাৎ একদিন দেখি লেখক সোশ্যাল মিডিয়ায় ঐ বইটির (বুলগাকভের) কয়েকটি ইংরেজি অনুবাদের মাঝে তুলনা করে একটি পোস্ট দিয়েছেন। মনে হয়েছিল কেমন একটা কাকতালীয় পরমাণুগল্প তৈরি হয়েছে। এখন বইটা ওখানে রাখা আর লেখকের পোস্টের ক্রোনোলজি উল্টোও হ'তে পারে। হয়ত তার পোস্ট দেখে অবচেতন মনের কারসাজিতে বই দুটো পাশাপাশি রেখেছি। লেখকের প্রোফাইল ঘেটে পোস্টের সময়কাল বের করে বিষয়টার হেস্তনেস্ত করা যেতে পারে কিন্তু সে অনেক পরিশ্রমের ব্যাপার।
আরেকটা কথা বলে রাখি না পড়া 'চায়ের কাপে সাঁতার' নিয়ে। আগে বড় বড় লেখকদের বাংলা উপন্যাস পড়তাম যেগুলো আদতে ছিল বড়গল্প কিংবা নভেলা। নতুন একজন লেখককে এতটা সময় ধরে বড় একটা উপন্যাস প্রকাশ করতে দেখে মনে হয়েছে এটা অনেক বড় সাহসের কাজ। লেখক ও প্রকাশক দু'জনের জন্যই।
হন্ত্রকের আলাপে আসি।
এটা পুরনো অভ্যাস। কোন নতুন লেখকের বড় কাজ হাতে তুলে নেওয়ার আগে ছোটগল্প পড়ি। ওতে এক ধরনের প্রস্তুতি হয়। বর্তমান সময়ের বেস্টসেলার এক লেখকের এমনি এক ছোটগল্পের বই পড়ে বুঝেছিলাম তাঁর বিশাল বিশাল উপন্যাসগুলো না পড়লেও চলবে। এতে সময় বাঁচে। টাকাও।
এনামুল রেজার ভাষায় বাহুল্য পাইনি। মানে বাড়াবাড়ি, ফেনিয়ে তোলা, কিংবা পাইনি অহেতুক চাপিয়ে দেওয়া ভাব-ভঙ্গিমা-স্টাইলের কসরত। তাই বলে তার লেখা একেবারে ন্যাড়াও নয়। বেশ একটা ব্যালেন্স আছে। অনুভূতি জাগাতে পারে। গল্পগুলো খুব বড় নয় একটিও। ফলে বেশ মনোযোগবান্ধব।
কয়েকটা গল্প পড়ার সময় কিছু কথা মাথায় এসেছে তাই শুধু বলি।
মরচে গল্পটা যেমন। আমরা দেখি প্রেমিক প্রেমিকা বিয়ের কয়েক বছরের মাঝে একে অন্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মানসিকভাবে। এবং শারীরিকভাবেও। একে অন্যের কাছে যেন তাদের চাওয়াপাওয়া নেই। সন্তান আছে। সন্তানের জন্য ভালোবাসাও আছে। খুব সাধারণ একটি গল্প। কিন্তু ঘটনাক্রমে শিশুটি হারিয়ে যায়। এমন ঘটনার মুখোমুখি হলে মানুষ স্বাভাবিকভাবে অবশ হয়ে পড়ে। সে জানে না কী করতে হবে। সে দূর্যোগ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। এই দম্পতির ঠিক এমন মুহূর্তে স্ত্রী তার স্বামীকে বলে 'আমাকে আদর করো'। গল্পটি নিয়ে ভেবেছি তার কারণ হলো এই আদর চাওয়ার পরিস্থিতির যৌক্তিকতা পাঠকের জন্য তৈরি না করতে চাওয়া। এই চাওয়া আমাদের একটা ডিসকম্ফোর্ট দ্যায়। বাচ্চা হারায় গেছে তাদের। এই হারানোর মাঝে তারা দেখছে বাচ্চাটাকে হারিয়ে ফেলার এই পরিস্থিতিতে তারা দুজন সঙ্গী। আর কেউ নাই। একে অন্যকে আঁকড়ে ধরে সারভাইভ করা খুঁজে বের করার চেষ্টা ছাড়া তারা নিরুপায়। লেখক এখানে অলমোস্ট না লিখে লিখেছেন অনেকখানি।
আউলিয়া গল্পে আসা যাক। এটা আমার মনে হয়েছে সময়োপযোগী গল্প। আমাদের এক্সপ্লোর করা দরকার একটি বিশেষ চিন্তাচেতনার মানুষের মনস্তত্ত্ব যারা অনলাইনে এবং অফলাইনে মোরাল পুলিশিং করে, বিশেষ করে নারীদের উপরে। গল্পের বিষয়টা দারুণ নির্বাচন করেছেন লেখক। কিন্তু গল্পটার কাছে আমার প্রত্যাশা আরো বেশি ছিল। আমার মনে হয়েছে আমি নিজের চিন্তা ও ধ্যানধারণার মাঝে ঘুরপাক খেয়েছি। নতুন কিছু পাইনি। মনে হয়েছে লেখক আর আমি এই বিষয়ে যেন একই বুদবুদে ভেসে আছি চিন্তাভাবনায়। তবে দারূন সম্ভাবনাময় গল্প। হয়ত লেখক এই গল্পটা এখানে পরিত্যক্ত করে এগিয়ে গেলেও আরো লিখবেন।
এরপর ডায়নোসরের পিঠ। একটা ভ্রমণের গল্প। ভ্রমণে গল্পের প্রধান চরিত্র দেখে যায়। প্রাউস্তের ঐ উক্তিটির মত যা গল্পের শিরোনামের নিচে দিয়ে দেওয়া আছে। কিছুদিন আগে লাতিন আমেরিকান একটা গল্প পড়ছিলাম। গল্পটি যিনি লিখেছেন তার জন্ম আর্জেন্টিনার স্বৈরশাসনের শেষদিকে। গল্পটি মনে হচ্ছিল গরানুগতিক হরর। তার মাঝে কিভাবে যেন দেখিয়ে দেওয়া হলো ফেলে আসা আয়নাঘরের দিনগুলোর দুঃস্বপ্ন। এই গল্পে আমরা দেখি সামরিকবাহিনীর সদস্যদের ভিন্ন একটি দিক। মিষ্টি বানায় তারা, বেঁচেও। মূল চরিত্র এই বৈপরীত্যে কৌতুক খুঁজে পায়। কারণ আদিবাসীরা সেই ভূখণ্ডে বেশ জড়সড়। লাতিন আমেরিকান ঐ গল্পটির মতো আমিও ভাবি লেখক বুঝি আরো খানিকটা গভীরে যাবেন। নির্লিপ্ত চরিত্রের চোখ দিয়ে দেখবেন আরো কিছু বাস্তবতা। যদিও লেকে ভূত দেখা যায় কিনা এই প্রশ্ন মাঝিকে জিজ্ঞেস করে থেমে যান তিনি। এভাবে ছোটছোট পর্যবেক্ষণে লিখে এবং না লিখে গল্প বলেন এনামুল বেজা। তার লেখার একটি বৈশিষ্ট্য বুঝি না লেখাও।
ব্যাবিলনের দ্বিতীয় বাগান শুরুতে চমৎকৃত হলাম একটা রহস্য ঘন হয়ে উঠতে দেখে। খুব তাড়াতাড়ি সেই রহস্যের কিনারা হয়ে গেলো যেন। লেখক ইঁদুর বেড়ালের খেলা খেললেন না বেশিক্ষণ। শেষদিকে এসে মনে হলোঃ বাহ! দারুণ।
প্রায় সব গল্পের রচনাকাল থাকলেও নামগল্পে নেই। হন্ত্রক। তাহলে ধরে নিই এটা সবচেয়ে সাম্প্রতিক লেখা। কিন্তু এই গল্পটি ছিল খানিকটা যেন গতানুগতিক। অনেকটা এপোক্যালিপ্টিক গল্পের ফর্মুলায়। প্রায় ৮ বছর ধরে বিভিন্ন লেখা এই গল্পগুলো। একটা ইউনিভার্স আছে সেখানকার ভূগোলে। যে শহরে প্রথম পুরুষেরা থাকেন তার নাম মায়ানগর, ট্রেনে করে যে শহরে যাওয়া হয়, তার নাম খোলানগর, দক্ষিণের নিদাঘ(এটাও কি লেখকের শৈশবের খুলনা? শিরোমণি নামটা দেখে মনে হলো) আর তার আগের পশোহর (যশোহর নাকি?)।
শেষগল্পটি আন্ডারউড মাস্টার ১৯৪০। আলাদাভাবে এই গল্পের কথা বলতেই হবে। গল্পটি শেষ প্যারাগ্রাফে সমাপ্তি টানার ইচ্ছাটা বাদ দিলে আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প। দূর্দান্ত গল্পের প্লট!
গল্পগ্রন্থ হিসেবে হন্ত্রক উপভোগ করেছি। পড়তে পারেন।
শহরে হন্ত্রক আসে, আর মানুষ হাসতে ভুলে যায়। দিনের দুপুরে মানুষ এগিয়ে যায় হন্ত্রকের নির্ধারণ করে দেওয়া নিয়তির দিকে। শুরু হয় গল্পগ্রন্থটি, যার নাম গল্প হন্ত্রক। লেখক একে একে বলে চলেন বিভিন্ন গল্প। এভাবে 'চায়ের কাপে সাঁতার' এর রচয়িতা ঔপন্যাসিক এনামুল রেজার সাথে পরিচিত হতে গিয়ে তার আগে পরিচিত হয়ে যাই গল্পকার এনামুল রেজার সাথে। কিছু গল্প হয়ে ওঠে আমাদের পরিচিত মায়ানগরের। ঘুরে ফিরে বিভিন্ন গল্পে উঠে আসে এই নগরীর কথা। তাই মায়ানগরের গল্পগুলোও হয়ে ওঠে আমাদের গল্প। গল্পগুলিতে কেউ কেউ হারানোর ব্যাথায় প্রবল হয়ে ওঠেন আবার কেউ বা প্রেমিকার অপেক্ষায় অধীর হতে হতে আব্বার লেখা গল্প পড়েন। হন্ত্রকে থাকা গল্পগুলো সাবলীল, সহজ এবং সুপাঠ্য। তারপরেও পাঠককে নিয়ে যায় জাদুবাস্তবতা কিংবা অলৌকিকতার ভিন্ন কোনো দুনিয়ায়।
'হন্ত্রক' গল্পের কথা দিয়ে শুরু করা যাক। মায়া নগরে আগত একদল আগন্তুককে হন্ত্রক নামে ডাকা হয়। তাদের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে যতটুকু জানা যায় তাতে জানতে পারি তারা আসেন মৃত্যুর বাহক হয়ে। তাই তাদের আগমনে মায়ানগরের মানুষ হাসতে ভুলে যায়।
'শীতের জন্য অপেক্ষা করছি না' গল্পে প্রাগে বাসকারী এক যুবককে শীতের সন্ধ্যায় প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করতে করতে বাড়ির মায়া টানতে থাকে। বাড়ির স্মৃতিকাতরতায় দগ্ধ হয়ে সে খুলে ফেলে পিতার দেওয়া একটি খাম, যেখানে অপেক্ষা করছে তার জন্য এ��টি গল্প।
'যেভাবে এহসানের ট্রেনবিষয়ক গল্পে ঢুকে পড়ি' নামক গল্পে আমাদের গল্প কথক ঢুকে পড়েন তার সহকর্মী এহসানের ট্রেন বিষয়ক একটি গল্পে আর তার সেই সহকর্মীও একই সাথে আটকে যান কথকের গল্পে।
'শ্যাটাপের অসুখ' একটি অতিপ্রাকৃত গল্প। যে গল্পে শ্যাটাপের উপর ভর করে তাদের গ্রামে নেমে আসে এক দুর্যোগ।
"ব্যবিলনের ছিল দ্বিতীয় আরেক ঝুলন্ত বাগান। বলা হয় যে সেই বাগানটির সন্ধান গোপন রাখা হয়েছিল। কেউ জানত না কোথায়, কিংবা পৃথিবীর কোন প্রান্তে লুকানো আছে। এই গোপনীয়তার উদ্দেশ্য জটিল কিছু ছিল না। ব্যাবিলন ধ্বংস হয়ে গেলেও বাগানটি যেন থেকে যায়, এই ছিল নির্মাতাদের অভিলাষ; আর সেই গোপন বাগানে যেন টিকে থাকে এক গোপন ব্যাবিলন। লুপ্ত নামের বিশ্বকোষ, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭২৩"
- ব্যাবিলনের দ্বিতীয় বাগান
পরের গল্পটি আবর্তিত হয় আন্ডারউড মাস্টার ১৯৪০ টাইপরাইটারকে নিয়ে। যেই টাইপরাইটারের মাধ্যমে নিঘাদ শহরের কুখ্যাত ধন কুবের মির্জা তৈমুর পাকসরজমিনের সেনাদের গণহত্যার জন্য পূর্ব নির্দেশনা দিতেন।
এসব গল্পগুলোর মধ্য দিয়ে লেখক আমাদের টেনে নিয়ে যান তার সৃষ্টি করা রাজ্যে, যেখানে প্রতিটি গল্পের জন্ম হয় তার হাত ধরে।
অতঃপর আমরা জানতে পারি, "জীবনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে যা চায়, তাকে তাই দিতে। ভুলোমনা জীবন বেশিরভাগ সময়েই এই নির্দেশ গুলিয়ে ফেলত। কেউ আপেল চাইলে দুই বছর পর সে লবণের পাত্র পেত, কেউ বাইসাইকেল চাইলে বহুদিন পর নিজেকে আবিষ্কার করত জাহাজের কেবিনে। আর যে কিছুই চাইত না, জীবন নিজেই তার ঘাড়ে চড়ে বসতো ভূতের মতো। মূলত, এইভাবে তার ইতিকথা আমরা জানতে পারি।"
'চায়ের কাপে সাঁতার'এর কারণে এনামুল রেজা অনেক বইপড়ুয়ার কাছে সুলেখক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এখন এই ঔপন্যাসিক হাজির হয়েছেন গল্পকার রূপে। 'হন্ত্রক' বইয়ে লিখেছেন ১৫ টি গল্প। গল্পসংকলনের রিভিউ লিখা অনেক সময় কঠিন-ই। কারণ এক এক গল্প এক এক ভাবে ধরা দেয় পাঠকের রিডিং অ্যান্টেনায়। লিখার সময় আবার খেয়ালে রাখতে হয় স্পয়লায় বেশি হয়ে যাচ্ছে কি না। এত কিছু মাথায় রেখে গল্পগুলির রিভিউ লিখছি।
১) হন্ত্রক
মায়ানগরের নিঃসঙ্গ মানুষজনকে আত্ম*ত্যার কী এমন মন্ত্রণা দেয় হন্ত্রকরা? মানুষ জেনেবুঝে নিজেকে এমনিতেই একা করে দিচ্ছে আজকাল, তার উপর হন্ত্রকদের মায়াবী ফিসফিসানি একের পর এক সৃষ্টি করছে সুইসাইডের ঘটনা। এর মাঝে একজন থামাতে চায় এই মহামারীসুলভ আত্ম হত্যার চক্র। লেখক সুন্দর এক গল্প রচনা করেছেন।
২) মর্মরসম্ভব
শীতে কাতর আবার গ্রীষ্মে শরীর-মনে ফূর্তি থাকা ষাট বছর বয়সি আবদুল হামিদের নস্টালজিয়া এবং পুরো জীবনের সারকথা যেন এ ছোটগল্পে ফুঁটে উঠেছে।
৩) দুপুরের চরকায়
সরকারি কর্মকর্তা মতিন আলীর বাজার করতে গিয়ে পথ হারানোর গল্প এটি। সাথে চলে পিতা মঈন আলীর অনেকটা একইরকম বিপদে পড়ে পরিত্রাণসহ আরো কিছু স্মৃতি। দুপুরকে রহস্যময় এবং মানবমনস্তত্ত্বে ধরাছোঁয়ার বাইরে দেখানোর চেষ্টা কি এ গল্পে ছিলো? মোটামুটি লেগেছে 'দুপুরের চরকায়'।
৪) শীতের অপেক্ষা করছি না
প্রাগে বসবাসরত বোরহান লেখালিখিতে আগ্রহী। প্রচন্ড শীতের এক সন্ধ্যায় তাই বাবার লেখাপত্রের খাম খুলে তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠলো পূর্বপ্রজন্মের গল্প। এসব কি নিছকই গল্প নাকি বাস্তব ঘটনা? এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের আখ্যান চলে এসেছে এখানে।
৫) আউলিয়া
আওলাদ আল মিয়া ওরফে আউলিয়ার জীবনের নানা দ্বন্দ্ব, স্ববিরোধিতা নিয়ে এ গল্প রচিত হয়েছে। প্রথাগত পূর্ণাঙ্গ ধার্মিক হয়ে উঠতে আওলাদের দ্বিধা এবং গল্পের নাম আউলিয়া কেন, সেই প্রশ্নের উত্তরও খানিকটা এখানে পাওয়া যায়।
৬) যেভাবে এহসানের ট্রেনবিষয়ক গল্পে ঢুকে পড়ি
তুমুল বৃষ্টির মাঝে অফিসফেরত লেখক তাঁর কলিগ এহসানের ছাতার নিচে আশ্রয় পেতে গিয়ে এক গল্পে ঢুকে পড়েন। এহসানের ট্রেনবিষয়ক গল্প। যেন এক ঘোরের মধ্যে থেকে ট্রেনের ভিতরকার অবস্থার বর্ণনা লেখক নিজেই দিতে থাকেন। এহসানের রেলগাড়িযাত্রা হয়ে ওঠে লেখকের নিজের। ভালো লিখেছেন এনামুল, বিশেষ করে মানুষভর্তি ট্রেনের ভিতরের অবস্থার বর্ণনাটা। মানুষের জীবনটাই যেন এক রেলগাড়ি।
৭) মরচে
আটপৌরে যাপনে বিমর্ষ, বিধ্বস্ত এক তরুনের জীবনে মরচে পড়ে গেছে। এক ঘটনাবহুল দিন যেন সব পাল্টানোর সম্ভাবনা তৈরি করে দিলো। গল্প গতিশীল তবে আরেকটু বড় পরিসরে লিখা হলে বোধ হয় ভালো হতো।
৮) লয়মন্তর
অদ্ভুত এক গল্প, নাকি একাধিক? গল্পটি অপরাধের, ঈর্ষার, শূন্যতার, নিজের কাছে নিজে ফিরতে চাওয়ার ক্রমাগত ব্যর্থ প্রচেষ্টার।
৯) একপাল সম্রাট
ছয়তলা দালানের এক ছোট ফ্ল্যাটে ব্যাচেলর হিসেবে বসবাসরত চারজন নিয়ে এ গল্প। ব্যাচেলর মেসে সচরাচর যেরকম কথোপকথন, যাপন হয় তার সাথে এক ধরনের জাদুবাস্তবতার মতো ঘোর যেন তাদের বানিয়েছে একপাল সম্রাট।
১০) শ্যাটাপের অসুখ
গ্রামের গরীবঘরের ছেলে শ্যাটাপকে জিনে ধরেছে। বড় কাজী সাহেব ছুটে যান সারাতে। রহস্যে ঘেরা অলৌকিক গল্প 'শ্যাটাপের অসুখ'। পাঠককে বিভ্রান্তিতে রেখেই যে গল্প দে ছুট।
১১) ডায়নোসরের পিঠ
পাহাড়ি এলাকায় বন্ধু সিরাজীর সাথে লেখকের প্রকৃতিদর্শনের সুন্দর বর্ণনা আছে এখানে। আছে কিছু কথার ফাঁকের কথাও।
১২) ব্যাবিলনের দ্বিতীয় বাগান
মায়ানগর ছেড়ে নিখোঁজ কলিগ রিপনের শহর পীরের মহল্লায়। এমন এক আজব শহর যেখানে অতীত মুছে ফেলতে চায় বেশিরভাগ মানুষজন। সেই অতীত মুছার ব্যাপারটাও কেমন যেন ভীতিকর। যেন ব্যাবিলনের দ্বিতীয় বাগানের মতো নঈম ডাক্তারের বাসা খুঁজে ফিরছে লেখক সাহেব।
১৩) হাসপাতালে
ডিভোর্সড, একা বাস করা মিজানের গল্প এটি। যেন অনেকটা দইয়েস্তভস্কির আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান এই মিজান। তবে হাসপাতালে গিয়ে তাঁর ছোট জগত কীভাবে বড় হতে যাচ্ছে তা পড়া হলো। ভালো লেগেছে অনেক।
১৪) একটি শহুরে এওয়াজের ঘটনা
জাদুবাস্তবতার ব্যাপার-স্যাপার আছে গল্পে। আর একটি ব্যাঙ, একজন মানুষ। কোন কিছু পেতে হলে কিছু হারাতে হয় সেই কনসেপ্টের সাথে একটু দার্শনিকতা।
১৫) আন্ডারউড মাস্টার ১৯৪০
বহুবছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক টাইপরাইটারের খোঁজে নিদাঘে ছুটে যান লেখক। এমন এক টাইপরাইটার যেটার সাহায্য নিয়ে মির্জা তৈমুর পাকহানাদার বাহিনিকে গণহত্যায় সাহায্য করেছিলো। নিজের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া পৈত্রিক ভিটেমাটিতে পৌছে অন্যরকম এক আখ্যানের দেখা পান লেখক। হয়তো বুঝতে পারেন নিদাঘ জাদুঘর থেকে কেন ঐ টাইপরাইটার বারবার চুরি হয়! ইন্ট্যারেস্টিং এক গল্প বলেছেন লেখক।
বিভিন্ন সময়ে রচিত ১৫ টি গল্প পড়া শেষে প্রশ্ন উঠবে এনামুল রেজা কেমন লিখেছেন? গল্পসংকলনে এই এক প্যারাডক্স! গল্পভেদে মতামতের ভিন্নতা তীব্র হতে পারে। লেখক টুইস্টনির্ভর গল্প লিখতে চান নি এটি আমার ভালো লেগেছে। এনামুলের গদ্যভাষার জমিন পোক্ত হয়েছে। বিভিন্ন গল্পে আগ্রহোদ্দীপক বিষয় চোখে পড়ে। জাদুবাস্তবতার এক ধরনের ঘোরে থেকে যেন এনামুল লিখেন। তাঁর লেখনি সাবলীল, পাঠককে ভাবায়। আমার গল্প নাম্বার ১) ২) ৫) ১১) ১৩) ভালো লেগেছে। সবচেয়ে পছন্দ হয়েছে নামগল্প হন্ত্রক।
লেখকের প্রতি অনেক শুভেচ্ছা রইলো।
বই রিভিউ
নাম : হন্ত্রক লেখক : এনামুল রেজা প্রথম প্রকাশ : ডিসেম্বর ২০২৪ প্রকাশক : চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন প্রচ্ছদ : এনামুল রেজা প্রচ্ছদের জন্য ব্যবহৃত আর্টওয়ার্ক : মার্কাস ওয়ালিন্ডার রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ।
কিছু কিছু লেখক অদ্ভুত সব ‘ক্ষমতা’ পোষ মা���িয়ে চলে নিজ লেখায়। লেখাও এত গৃহপালিতও হয়—ভাবা যায় না। যেথায় সুচতুরতার সাথে লুকিয়ে থাকে চর্চায় শান দেওয়া প্রাচীন যুগের সুচালো তীক্ষ্ণতা। যে যুগ হতে মানুষ শুরু করেছিল দেব-দেবীর অর্চনা আর পূজা। যে যুগে মানুষ চিত্রলিপি দ্বারা সংরক্ষণ করত যাবতীয় লেখাজোখা। সেই তীক্ষ্ণতায় বিদীর্ণ করে দেয় সেইসব ভাবলেশহীন চিন্তা ভাবনার দ্বার—যা ঠেলে দেয় আমাদের প্রাচীন সময়ে কিংবা কিছু বছর পূর্বে ফেলে আসা দুঃস্বাপ্নিক অতীতে—যা কিছু আমরা ভুলতে চাই, জীবন্ত কবর দিয়ে সেখানে তুলে দিতে চাই একটি অযাচিত ভাবনার আসন কিংবা ইট-পাথরের বহুতল ভবন। কিন্তু তবুও আসন আর পাথর চাপা দিয়ে সব কি ভুলে যাওয়া যায়? বোধ হয়...
কালো কৌতুকে মোড়ানো ‘চায়ের কাপে সাঁতার’-এর ডুব শেষে লেখক ভুস করে ভেসে উঠে একদিন জানান দিলেন ‘হন্ত্রক’ আসছে। হন্ত্রক কী, কাদের বলা হয় হন্ত্রক? জানতাম না আমি। উত্তর খুঁজতে বের হলাম মহাকাব্যে রচিত বীর যোদ্ধার মতো। সাথে ঢাল-তরবারি নেই। কেবল প্রশ্ন বোধক একটি বাণ ছাড়া। যা ছুড়ে দেওয়া হয়েছে বহু আগে।
যে-কোনো কিছুর উত্তর সবসময় আমার নিকট ধরা দেয় একটি অপার সম্ভাবনার দ্বার হয়ে। প্রশ্নটা কেবল সংকল্প মাত্র। যে দ্বারে অতন্দ্রপ্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কোনো প্রাগৈতিহাসিক দানব। যাকে পরাস্ত করে এগোতে হয়। খুঁজে নিতে হয় ক্ষণপূর্বে ছোড়া প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হওয়া হারোনো তীরটিকে। সেই তীরটি যতক্ষণ অবধি আবারও তূণীরে গুঁজে না রাখা যায়—অশান্ত মন—মাখামাখি হয় নানান বিহ্বলতায়। সেই মাখামাখি অসহনীয়। অতুলনীয়। তখন অন্তর শান্ত করতে তীরটিকে পুনরায় পরানো হয় ধনুকে। এইবার লক্ষ্য বস্তু কেবল ঠিক করা হয় উত্তর পাওয়ার আশায়।
সেই আশার পুচ্ছে হাওয়া জোরদার করতে নিলাম হন্ত্রককে। খুললাম তার পাতা। পড়লাম। ফেলে আসা সেই উত্তর পেলাম প্রথম গল্পের কালো কালিতে ছাপানোতে অক্ষরের ভাঁজে ভাঁজে। ‘মায়ানগর’—আমাদের সেই চিরচেনা নগরী। যেটা খুঁজে পেয়েছিলাম, হেঁটেছিলাম সেই নগরীর আনাচেকানাচে গল্প কথকের সাথে। গল্পকথক কে চিনেছেন নিশ্চয়? হুম, যে চায়ের কাপে কেটেছিল ক্লান্তিকর অথবা হীন সাঁতার। আমরাও কি সেই সাঁতার কাটিনি অথবা কাটছি কি?
প্রশ্ন ভয়ংকর। তবুও দিতে হয় তার উত্তর। আমি খুঁজলাম ‘হন্ত্রক’ গল্পে হন্ত্রক কারা। খুঁজে পেলাম তারা নামহীন, অস্তিত্বহীন অথবা কোনো কায়া। ঠিক গল্প কথকের মতো। তবুও তাদের একটা নাম দেওয়া হয়েছে। হন্ত্রক। কীসের হন্ত্রক? গল্প শেষে যে উত্তর পেলাম। সেটা আমাকে বাধ্য করেছে ভাবতে। খুঁজে চললাম নিজের জীবনের হন্ত্রক কারা। কারা চায় আমাকে তাদের দলে টেনে নিতে। অথবা হাপিস করে দিতে কোনো জাদুকরের আস্তিনে।
‘আমরা মায়ানগরের মানুষেরা আজকাল আর হাসি না। মানে হাসার কথা সম্ভবত আমরা ভুলে গিয়েছি। অফিসে যাই, কাজ করি নিঃশব্দে। বুঝে নিই যে আমাদের খুব বেশি একা থাকা যাবে না। কারণ, নিঃসঙ্গ মানুষেরাই হন্ত্রকদের আকর্ষণ করে বেশি। কিন্তু অনেক বছর ধরে আমরা এই পৃথিবীতে একলা চলার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেছিলাম। নিঃসঙ্গতার একেকজন সম্রাট আমরা।’
পাঠক বোধ হয় এই একটি বাক্যে বুঝে নিবেন হন্ত্রক কারা। অথবা অবুঝ হয়ে বাঁচতে পারেন, ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ এই পৃথিবীতে, বেঁচে থাকার আরেকটু আশা নিয়ে। কেবল খেয়াল রাখবেন নিঃসঙ্গতায় মৃ ত্যু যেন না হয়।
এরপর হন্ত্রকদের ভুলে এগিয়ে যেতে যেতে দেখা হয় ‘মর্মরসম্ভব’-এর আব্দুল হামিদের সাথে। যাকে নিয়ে পাড়ি জমাতে হয় অতীতে। হারানো তীরটি খুঁজতে। তারপর ফিরি বর্তমানে। এসে জানতে পারি—
‘সুপ্রিয়া আসেনি সেই রাতটিতে। আর কোনো রাতেই নয়। অনেক দিন কেটে গেলে সে অন্য কারও ঘরে উঠেছিল আয়োজন করে। সারা জীবন আব্দুল হামিদ নিজেও তার কথা ভাববে না বলে পণ করেছিল। তাই যখন মাস দুয়েক আগে চন্দনীমহলে ফিরে এল সুপ্রিয়া, একবারের জন্যও তার মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করে নাই তার।’
কেন করে নাই তার একটি আক্ষেপ অথবা ক্ষোভ লুকানো আব্দুল হামিদের মনে গহিনে। যেটা অনুধাবন করে মিলাতে পারি আমাদেরই জীবনে অতিবাহিত হওয়া ক্ষোভের নদী আর আক্ষেপের সাগরের সাথে। শেষটা স্মৃতিকাতরতার গন্ধে ভরপুর। কিছুটা মুগ্ধকর।
ওদিকে হয়ে যায় দুপুর। গল্প লেখা হয় ‘দুপুরে চরকায়’ নাম দিয়ে। গল্পটির মুখ্য চরিত্র মতিন। বয়স চল্লিশ। বাদবাকি কিছু বলছি না। কেবল লেখক মতিনের টাক মাথায় কোথায় আরেকটি কালো কৌতুক লেপটে দিয়েছেন তা পড়েই বাস্তবিক মজা পেলাম। এখানে অতীত আর ভুলোমনা অতিপ্রাকৃতের ছাপ নিহিত। কোথাও একটা গিয়ে মতিন চরিত্রটি হয়ে উঠে আমাদের চেনা-জানা অথচ ফিল্মের ঘৃণিত চরিত্র। গল্পের পোট্রে বলুন আর কারুকাজ─দুটোই দুর্দান্ত।
‘শীতের অপেক্ষা করছি না’ করার পূর্বে জানিয়ে দিতে চাই, লেখক যতগুলো গল্প এই সংকলনে ঠাঁই দিয়েছেন তা পূর্ণ চন্দ্রের মতো সাহিত্যে ভরপুর। এতটাই বেশি যে কখন যে সেই গল্পগুলোর অন্তরালে সুর খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে যেতে হয়—ভেবে কূল করা যায় না। এক অদ্ভুত ঘোরলাগা কাজ করে। যেমনটা সংকলনের চতুর্থ গল্পের ক্ষেত্রেও করেছে। একটি গল্পের ধাঁধায় আরেকটি অতীত গল্প ঢুকে পড়ে বিনা দ্বিধায়। লিদা ইয়োরিস্কোভা আর বোরহানের যেখানে দেখা হয়—সেখানে পুবপাড়ার মতো হইচই কিংবা হল্লা থাকে না। বিপরীতে এক নিস্তব্ধ পরিবেশে মোলাকত হয় তাদের। যেখানে কখনও নেমে আসবে না অন্ধকার আর—
‘...কৃষ্ণপক্ষ। কিছু আগের নৈঃশব্দ ভেঙে দিয়ে ঝিঁঝির পাল ডাকতে শুরু করেছিল অদূরের ঝোপের আড়াল থেকে।’
‘আউলিয়া’ নিয়ে বেশিকিছু বলার নেই। ইহা এক দারুণ স্যাটায়ার। আধুনিক জমানার স্যাটায়ার। আউলিয়া হয়েও যে শেষ পর্যন্ত এক বুক আশা নিয়ে অপেক্ষা করে কারও সাথে এক বিছানার ঘুমানোর আশায়। বর্তমানে সময়ের জন্য একটি আদর্শ গল্প। অতি আবেগীরা একটু সাবধানে।
‘যেভাবে এহসানের ট্রেনবিষয়ক গল্পে ঢুকে পড়ি’ হয়তো সেই সুতা যেটা গড়িয়ে গড়িয়ে সৃষ্টি হয়েছে একটি ‘চায়ের কাপে সাঁতার’। অথবা তার পরবর্তী খুচরো কোনো গল্প। ট্রেন আর মায়ানগর—এ দুইয়ের সাথে লেখকের অদ্ভুত সন্ধি। যা টের পাওয়া যায় পুরো সংকলনের পাতায় পাতায়। এই গল্পে সেটাকে রীতিমতো উপস্থাপনা করা হয়েছে জাদুয়িক নিয়ম মেনে। এই অফিস থেকে বের হওয়ার পর খোলনগর থেকে মায়ানগরের ট্রেন যাত্রাটা লেখক বেশ জমিয়ে রচনা করেছেন। পড়তে পড়তে কখন নিজেও যে সেই ট্রেন যাত্রায় ঢুকে পড়ি, বুঝতে পারিনি। দুর্দান্ত।
‘মরচে’ গল্পটা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দিক থেকে বিবেচনায় দুর্ধর্ষ। লেখকের প্রতিটা গল্পে মনস্তত্ত্ব বেশ ভালোভাবে মিলমিশ খেলেও এই গল্পটার সমাপ্তি সব গল্পকে রীতিমতো ছাপিয়ে গিয়েছে। মানবিক আবেগ, অস্থিরতা, অসহায়ত্ব, একাকিত্ব, দূরত্ব—সব যেন উঠে এসেছে মরচে গল্পের বিশাল ক্যানভাসে। যে ক্যানভাসের একটা অংশ রঙের অভাবে মরচে পড়া ছিল অনেক দিন। যার সমাপ্তিটা হয়েছে মনমতোই।
প্যারাডাইস লস্ট। অর্থাৎ—স্বর্গপতন। না গল্পের কোনো নাম নয়। ‘লয়মন্তর’ গল্পের শুরুতে জন মিল্টনের একটি উক্তি জুড়ে দিয়েছেন লেখক।
‘সব হারায় নাই, অজেয় ইপ্সা এবং প্রতিশোধের পাঠ, অনিঃশেষ ঘৃণা, কভু পরাজয় স্বীকার না করার অহং।’
একটি বিজন ইস্টিশনের গল্প লয়মন্তর। যেখানে বিভৎসতা, ব্যতিক্রম, অদ্ভুত আর নামহীন যত শব্দেরা, গল্পেরা, ছায়ারা উঁকি মেরে যায়। গল্পটির চরিত্রে যারা উঠে উঠে আসা একটি ঘুমন্ত লা শ, একটি ছেলে, একটি বৃদ্ধ আর একটি মেয়ে তারা যেন কথক অথবা কথকের চরিত্রে থাকা ট্রেনের অপেক্ষামান ব্যক্তিটির আপন। চেনাজানা কেউ। অথবা ভ্রম। অথবা এই গল্পে কেবল মূ��� প্রোটাগনিস্ট কিংবা অ্যান্টাগনিস্ট কেবল ইস্টিশনটি। যেখানে ছায়ারা এসে তাদের জীবনের গল্প বলে যায়। উপলব্ধি করিয়ে যায় কঠিন বাস্তবতাকে। হতে পারে সেই ছায়াটি আপনার নিজেরও। এপিক রাইটিং।
‘...স্বর্গপতনের পর থেকে মানুষ চিরকাল শুধু নিজের কাছেই ফিরতে চেয়েছে।’ সেই নিজের অস্তিত্ব ঠিক কোথায়?
‘একপাল সম্রাট’ এক ব্যাচেলর অথবা আধ-ব্যাচেলর জীবনের অদ্ভুত গল্প। লেখকের ছোটো ছোটো গল্প পড়তে গিয়ে মনে হয় হুট করে কখন যেন বিশাল এক উপন্যাসের ছোটো একটা অংশে ঢুকে পড়ে বেরুনোর পথ খুঁজে পাওয়ার পাঁয়তারা করছি। বিষয়টা ভাবনার। এমন ফাঁদ পাতা এতটা সহজ না। এ গল্পেও অদ্ভুত সব সর্বনামের উৎপত্তি হয়। সেইসাথে আজব ও জানা সব কীর্তি। একটি ছয়তলা দালানের সর্বোচ্চ আর সর্বশেষ ফ্ল্যাটে এ গল্পের চিত্রপট রচিত। পড়ে দেখবেন, ভিন্ন আর অচিন্তনীয় কিছুর স্বাদ পাবেন অবশ্যই।
গ্রাম-বাংলায় ��্রচলিত একটি অসুখ কেন্দ্র করে লেখা ‘শ্যাটাপের অসুখ’। একটি অসুখের আগে-পরের আখ্যান মিলিয়ে অনন্য এক লোককথার সৃষ্টি। তিল থেকে যেভাবে বানানো হয় তাল, আর তাল থেকে যে কী কী হয় আর কীভাবে তার স্বাক্ষী গল্পটি।
‘ডায়নোসরের পিঠ’ পুরোপুরি আবেগিক প্রাকৃতিক একটি গল্প। কিছু সময়ের জন্য ‘অ্যালান পো’-এর ছিটকে পড়া কোনো একটি অতিপ্রাকৃত গল্প বলে ভ্রম হয়। এখানে বুদ্ধের মূর্তিকে প্রকৃতির সাথে মিশিয়ে যে কাব্যিক চিত্র ফুটানোর চেষ্টা করা হয়েছে—তাতে লেখক সফল।
‘ব্যাবিলনের দ্বিতীয় বাগান’ গল্পটি অনেকটা হুয়ান রুলফোর ‘পেদ্রো পারামো’ গল্পের একটি জমজ সংস্করণ মনে হয়েছে। অনুভূতিটা ঠিক তেমনই হলো। আবারও সেই ভ্রম-লাগানো রচনা। পড়ে একঘেয়েমি তো আসে না বরং আবেশে বারবার পড়তে বাধ্য হই। ইন্টারেস্টিং ওয়ান।
‘হাসপাতালে’ গল্পটি পরিপূর্ণ আক্ষেপের গল্প। এর প্রতিটি শব্দ আর বাক্য লেখক খুব যত্ন নিয়ে লিখেছেন। এতটাই যত্ন যে, খুব অশালীন কল্পনাগুলোকে বাস্তব মনে হবে। হাহাকার এক অনুভূতি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকবে, ঘিরে ধরবে। এমন দুর্দান্ত রচনা করতে যে সাহসের প্রয়োজন হয়, সেই সাহসিকতায় আমি মুগ্ধ। সংকলনের অন্যতম ভালো গল্পের একটি। মাঝে মাঝে সাহিত্যও যে এত বাস্তব হতে পারে—তা অকল্পনীয় মনে হয়।
‘একটি শহুরে এওয়াজের ঘটনা’ সেই প্রেক্ষাপটের রূপক, যেটা থেকে সদা আমরা বেঁচে ফিরতে চাই। কিন্তু পারি না, অসহ্যনীয় সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার কারণে। যান্ত্রিক জীবনের উপলব্ধিটুকু যখন একটি ব্যাঙের মাধ্যমে নৈকট্যে ধরা দেয়—তখন ঠিক কী করা উচিত আমাদের? জানতে হলে এওয়াজের ঘটানায় ঢুকে পড়তে হবে। উপায় নেই, মুক্তি নেই। আপাতত আমি নিজেও ক্লান্ত।
শেষটা রহস্যে মোড়ানো একটি ধাক্কা। ‘আন্ডারউড মাস্টার ১৯৪০’। চায়ের কাঁপের ডাটসন ব্লু’র কথা স্মরণে করিয়ে দিয়েছে কিছু সময়ের জন্য। দুটোর অস্তিত্ব নিয়ে সন্ধিহান। দুটোর সাথে একটি করে ইতিহাস জড়িত। অতীতের মুক্তিযুদ্ধ আর একটি টাইপরাইটারকে ঘিরে লেখা গল্পটি শেষ পর্যন্ত হুক করে রাখার অতন্দ্রীয় ক্ষমতা রাখে। শেষটা অবশ্যই ভালো। আর জানেনই তো, শেষ ভালো যার—সব ভালো তার।
‘চায়ের কাপে সাঁতার’-এর পর লেখক ‘হন্ত্রক’ দিয়ে বিন্দুমাত্র নিরাশ করেননি। প্রতিটা গল্পে রূপক, মনস্তত্ত্ব, জাদুবাস্তবতার ছাপ, রোমাঞ্চ, সাহিত্য—সবকিছু দারুণ উপভোগ করেছি। শুধুমাত্র লেখার মোহে পড়ে এ সংকলন আরও বার কয়েক পড়ে নেওয়া যাবে। হতে পারে ছোটো গল্প ঠিক কীভাবে সাহিত্যের সুতায় মোড়ানো যায় সেই গল্পও জানা যাবে ‘হন্ত্রক’ পড়ে।
লেখককে সাধুবাদ জানাতে হয়। তাঁর মায়ানগর আর ট্রেন জার্নিটা চলতে থাকুক এভাবেই। হোক সেটা অনিয়মিত, নিয়মিত, অযাচিত, অকল্পনীয়, অভাবনীয়ভাবে...
মাহমুদুল হক ওরফে বটুভাই বললেন, ' গল্প লেখা হচ্ছে না,নিজের কাছেই ভালো লাগছে না।' 'লেখাগুলারে এমন ভারি ভারি জামাকাপড় পড়ায়া রাখছো ক্যান মিয়া ? ল্যাংটা কইরা ফেলো এগুলারে। দেখবা সব ঠিক হয়া গ্যাছে।' শহীদ কাদরী বললেন।
চায়ের কাপে সাঁতার চব্বিশে আমার পড়া সেরা বই। এনামুল রেজার লেখায় মূসা আ. এর যুগের জাদুকরদের মতোন জাদু আছে, করোটিতে বিভ্রম সৃষ্টি করে। মোহাচ্ছন্ন হয়ে বসে থাকি কতক বিকেল। লেখকের সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুঁ মারি, বিভিন্ন দৈনিকে বের হওয়া গল্প পড়ি।আরও মোহগ্রস্ত হই। অপেক্ষা করি লেখকের পরবর্তী বইয়ের জন্য। তারপর প্রথাগত নিয়ম কিংবা অনিয়মে অপেক্ষার অবসান হয় একদিন। হন্ত্রকে'রা পা ফেলে পৃথিবীর বিষাক্ত মাটিতে!
নামগল্প হন্ত্রক শেষ করতে করতে উত্তপ্ত হয়ে উঠলো আমার আশার পারদ। একটার পর একটা গল্প শেষ হয় আর উত্তপ্ততা কমতে থাকে। শেষ গল্পে এসে উত্তপ্ততা নাতিশীতোষ্ণ অবস্থানে থাকে। মাথায় কাদরীর কথা ঘুরেফিরে আসে বারবার। 'শব্দগুলারে ভারি ভারি জামাকাপড় পরায়া রাখছো ক্যান, ল্যাংটা কইরা দেও। দ্যাখো তারপর একেকটা গল্প কেমন মাল হইয়া দাঁড়ায়।'
প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে কিন্তু জীবনের দিন হাতে গোনা এই উপলব্ধি থেকে আমি গত ক’বছর ধরে ইমপালসিভভাবে বই কেনা এবং পড়া কমিয়ে এনেছি। আমি বিভিন্ন জনের এবন গ বিভিন্ন জায়গায় রিভিউ দেখে বই পড়া প্রেফার করি এখন। চায়ের কাপে সাঁতার উপন্যাসের রিভিউ পড়ে এনামুল রেজার নামটার সাথে পরিচিত হই ২০২৩ সালে, বইটা কিনে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি নিচ্ছি করতে করতেই হাতে আসে গল্পসংকলন ‘হন্ত্রক। ভাবলাম, আগে ছোট গল্পের সংকলনটা পড়ে লেখকের মুন্সিয়ানা যাচাই করা যাক। শুরুটা হয় বইয়ের নামের গল্প ‘হন্ত্রক’ দিয়েই। মায়া নগরে আগত একদল আগন্তুক—যাদের ডাকা হয় হন্ত্রক নামে, তারা যেন মৃত্যুর বাহক হয়ে এসেছে। গল্পটার আবহ, রহস্য আর অস্বস্তিকর অনুভূতিটা শুরুতেই টেনে ধরে। বলতে হবে, শুরুটা দুর্দান্ত। এই গল্পটা পড়ার পর বাকি গল্পগুলো নিয়ে প্রত্যাশা তৈরী হল। কিন্তু সমস্যা হলো, সেই প্রত্যাশার পালে আর তেমন হাওয়া লাগেনি। পরের গল্পগুলো পড়তে পড়তে কেমন এক বিষন্নতায় ডুবে যেতে থাকলাম। এমন কোনো গল্প মনে হলো না যেগুলো পড়া শেষ করে দীর্ঘদিন মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়। বরং পড়তে পড়তে একধরনের ভারী অনুভূতি কাজ করছিল চাপ ধরা, হাসফাস করা অনুভূতি কিন্তু মিনিংফুল না। প্রায় প্রতিটা গল্পেই চরিত্ররা নিঃসঙ্গ বা জীবন নিয়ে ক্লান্ত। বাস্তব আর অলৌকিকের মাঝখানের সূক্ষ্ম পার্থক্য দূর করতে এমন আবহ সাধারণত কমন। বিষণ্নতা, বিচ্ছিন্নতা আর জীবনবোধের গভীরতা দিয়ে লেখক ম্যাজিক রিয়ালিজমের একটা স্তরে নিয়ে যান পাঠককে। যেটা উপভোগ্য হওয়া উচিৎ তবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়, গল্পগ্রন্থ হিসেবে ‘হন্ত্রক’ ঠিক করে উপভোগ করতে পারিনি। অনন্ত নেগেটিভ ফিলিংসটা আমাকে ঠিক স্বস্তি দেয়নি বরং এক অপেক্ষায় নিয়ে গেছে, বইটা শেষ হওয়ার অপেক্ষা। ডিস্টোপিয়া সাধারণত ভাল লাগে না, সব গল্পের মেটাফোর ধরতে পারিনি—এগুলোই হয়তো আমার না ভালো লাগার বড় কারণ। ঠিক এই কারণেই বইটা আমি একটানে পড়িনি। সময় নিয়ে, একটা-দুটো করে গল্প পড়েছি। কিন্তু একঘেয়েমি থেকে মুক্তি মেলেনি। সব মিলিয়ে বলতে গেলে, ‘হন্ত্রক’ শুরুতে মুগ্ধ করলেও শেষে এসে এক ধরনের ভালো না লাগা তৈরি করে। এটি খারাপ বই নয়, হয়তো নির্দিষ্ট ধরনের পাঠকের জন্য লেখা। যারা নিঃসঙ্গতা, বিষণ্নতা আর জাদুবাস্তবতার ধীর গতি পছন্দ করেন, তাদের কাছে বইটি আলাদা অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
আমার ক্ষেত্রে, পছন্দের দুটি গল্প হল প্রথম গল্প ‘হন্ত্রক’ ও শেষ গল্প‘আন্ডারউড মাস্টার ১৯৪০’ । হয়তো এটুকুই প্রমাণ করে—এনামুল রেজার গল্পগুলো পুরোপুরি না ভালো লাগলেও, কিছু কিছু গল্প নিঃশব্দে মনে দাগ কেটে যায়। পড়তে পারেন বইটা, পড়েই নির্ধারন করুন আপনার কেমন লাগলো।
'হন্ত্রক' শব্দটাকে কাটাছেঁড়া করলে আমরা এর একটা অর্থ দাঁড় করাতে পারি। যেমন: বিনাশকারী বা হত্যাকারী। বিষয়বস্তু আলাদা হলেও সবগুলো গল্প একই মোহনায় গিয়ে মিলিত হয়। 'হন্ত্রক' শব্দার্থের বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত হতে পারে সে মোহনা। কেউ বা কোন কিছু কোথাও গিয়ে বিনাশ হচ্ছে, প্রতিনিয়ত হত্যা করছে নিজেকে।
একজন অসাধারণ গল্প বলিয়ের লেখা পড়ার শেষে সন্তোষের ঢেকুর তুলতে হয়। এনামুল রেজাকে তাই সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে অসাধারণ বলতেও দ্বিধা নেই। চরিত্র গুলোয় তিনি যে শক্ত গড়ন দেন তাতে মনে হয় না যে তারা অবাস্তব বরং প্রানবন্ত।
'হন্ত্রক' গল্পটায় গুমোট ডেসপেয়ার জুড়ে যে সাররিয়েল অ্যাম্বিয়েন্স তাতে পরিষ্কার বোঝা যায় গল্পের নামের স্বার্থকতা। ব্যক্তিগতভাবে দুর্দান্ত স্টোরিটেলিং এর জন্য খুব পছন্দের একটা গল্প হচ্ছে 'মর্মরসম্ভব'। 'শীতের অপেক্ষা করছি না' ও তাই। এছাড়া 'আউলিয়া' ও 'শ্যাটাপের অসুখ' এর অন্তর্নিহিত ভাব বোঝাটা সাবলীল এবং জরুরি। 'ডায়নোসরের পিঠ' এর ন্যারেটিভ তৃপ্তি দেয়। আন্ডারউড মাস্টার ১৯৪০' শিরোনামের গল্পটার কথা না বললেই নয়; ভিন্টেজ এবং ট্রিকি। পছন্দের তালিকায় উপরে থাকবে এ গল্পগুলো। বেশিরভাগ গল্পে খুলনার আঞ্চলিক ভাষার কিছু ডায়লগ ছিল, যেটা বোনাস হিসেবে পেয়েছি; বেশ মজা লাগে পড়তে। তবে কিছু গল্প মনমতো হয় নি। আশা করেছিলাম আরেকটু বেশি!
প্রুফ রিড থেকে শুরু করে বইয়ের সম্পূর্ণ উপস্থাপনা (প্রোডাকশন কোয়ালিটি) খুব ভালো।
মানুষ হিসেবে খুবই অস্থির প্রকৃতির আমি। যেকোনো কাজ দ্রুত শেষ করতে চাওয়া বা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকবার প্রবণতাটা রয়েছে আমার মধ্যে। তবে, বইটই পড়বার ক্ষেত্রে নিজস্ব এই প্রকৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত এক দিক উদ্ভাসিত হয়। তখন, ছোটো গল্পের সংক্ষিপ্ততার চাইতে অনেকগুলো গল্প মিলে একসাথে বয়ে চলা উপন্যাস পড়াটা এনজয় করি বেশি। এর কারণ হতে পারে, ছোটো গল্পের হুট করে শুরু হয়ে হুট করেই শেষ হয়ে যাওয়াটা। খুব কম গল্পকারই পারেন, এই স্বল্প সময়ের জার্নির মধ্যে ঘুরতে থাকা প্রতিটা চরিত্রদের সাথে পাঠকদের কানেক্ট করতে।
সেক্ষেত্রে, উপন্যাসকে একটা সেফ জোন বলা চলে। পাঠক যেখানে অনেকটা সময় নিয়েই খুব ধীরে ধীরে সবার সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পান। গল্পের স্ট্রাকচারের মধ্যে ঠিকঠাক পূর্ণতা খুঁজে পাওয়া যায়।
লেখক এনামুল রেজার সাথেও আমার পরিচয় ঔপন্যাসিক হিসেবেই, “চায়ের কাপে সাঁতার ” বইটার সাথে। নিঃসন্দেহে আমার পড়া সেরা ফিকশনগুলোর তালিকায় উপরের দিকেই থাকবে বইটা। যেহেতু তার গদ্যশৈলীর সাথে আমার পরিচয় রয়েছে আর সেই পরিচয়টা মুগ্ধতার তাই “হন্ত্রক” হাতে তুলে নেই অনেকটা নিশ্চিন্ত মনেই। সাথে অবশ্যই এক্সপেক্টেশনের পারদটা ছিলো বেশ উচুতে।
প্রথমেই বলে রাখি, ঔপন্যাসিক হোক কিংবা গল্পকার, আমার কাছে প্রতিটা বইয়ের/লেখার ক্ষেত্রেই তার গদ্যশৈলীর প্রাঞ্জলতা নির্ভর করে বেশি। কারণ আমার বিশ্বাস, খুব সাধারণ কোনো প্লটও ভালো রাইটিং স্টাইলের ছোঁয়ার কারণে উঠতে পারে অসাধারণ। আর সেক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে হন্ত্রকের প্রায় প্রতিটা গল্পেই লেখকের সেই রাইটিং স্টাইলটা ছিলো দারুণ। “প্রায়” শব্দটার ব্যবহার করলাম, কারণ বেশ কয়েকটা গল্পেই এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যের প্রবেশ, চরিত্রদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয় কিংবা বিভিন্ন ঘটনার আকস্মিতায় তাদের রিয়াকশনের ক্ষেত্রে কেমন তাড়াহুড়োর একটা ছোঁয়া ছিলো। যার কারণে প্রাঞ্জলতা হারিয়েছে ওই জায়গাগুলো। বিশেষ করে, অনেক ক্ষেত্রে পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, তাদের সত্যিকারের অভিব্যক্তি ফুটে উঠছে না এখানে। পরিস্থিতির বিস্তৃত বাড়াতে হতো আরেকটু। তবু, সস্তির বিষয় এই যে, সামান্য কিছু পরিস্থিতি ছাড়া বাদবাকি জায়গা গুলো প্রাঞ্জল ছিলো খুব। বিশেষত, যে বিষয়টা সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে, কোনো লেখায়ই জোর করে কোনো টুইস্ট যোগ করার চেষ্টা করেন নি লেখক।
প্রায় প্রতিটা গল্পেরই মূল উপজীব্য চরিত্র গুলোর নিঃসঙ্গ জীবন, হতাশা। ম্যাজিক রিয়ালিজম (যদিও প্রতিটা গল্প এর অন্তর্ভুক্ত নয়) জনরায় এই নিঃসঙ্গতার টের পাওয়া নতুন কিছু নয়। আমার ধারণা, বাস্তব জীবন এবং জাদুবাস্তবতার জীবনের মধ্যে যে সূক্ষ্ম বাধাটুকু রয়েছে তা পার করবার জন্য এই ব্যাপারটা প্রয়োজনীয় খুব। বিষন্নতা, বিচ্ছিন্নতা বা জীবনবোধের গভীরতা অনুভবের মাধ্যমে এবং চরিত্রদের মানসিক বা আবেগগত অবস্থা প্রকাশের মাধ্যমে লেখক, চরিত্র এবং পাঠকেরা এমন একটি স্তরে চলে যায় যেখানে শুধুমাত্র খালি চোখে দেখা এই বাস্তবতা সত্য হয়ে থাকে না, বরং একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার সুযোগ থাকে যা বাস্তব এবং অলৌকিকের মধ্যে সীমানা ক্ষীণ করে তোলে। আর সেই সীমানা খুব সহজেই ডিঙিয়ে উপস্থিত হওয়া যায় নতুন আবিষ্কৃত জগতে। যা ঠিক নতুনও নয় তবে, বাস্তব হিসেবে উপস্থিত হয় আকস্মিকভাবেই।
গল্পকার এনামুল রেজার লেখায় এই সীমানা সত্যিই ক্ষীণ ছিলো খুব। এতই ক্ষীণ যে, সেখানে পাঠকদের আলাদা ভাবে জাদুবাস্তবতাকে ‘বাস্তব’ বলে ‘মনে করতে’ হয়না বরং তারা বাস্তব হয়েই ধরা দেয়। এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ানো নানান ভাবনাকে এক সূত্রে গেঁথে দিয়ে, চরিত্রদের সাথে নিজেকে যুক্ত করবার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
যেহেতু, সব লেখার প্যাটার্নেই কমন কিছু বিষয় রয়েছে তাই এই বইটা পড়েছি আমি অনেকদিন সময় নিয়ে। একটা দুটো করে গল্প। যাতে প্রতিটা লেখা ভালোভাবে উপলব্ধি হয়। একটার থেকে আরেকটা সহজেই টেনে আলাদা করতে পারি ভাবনায়। তবে, কাজটা বিশেষ সহজ বলে মনে হচ্ছেনা কারণ, লিখতে গিয়ে আলাদা ভাবে কারোর সম্পর্কেই বলতে পারছিনা, শুধু বিচ্ছিন্ন ভাবে মস্তিষ্কে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিছু চরিত্ররা, যারা সবাই নিজেদের আলাদা আলাদা জীবনের গল্পের পসরা সাজিয়ে বসেছে যেখানে হয়তো সবই রয়েছে তাদের। আবার সব থেকেও সকলেই বিচ্ছিন্ন সকলের থেকে। একই দিন, একই জীবন প্রতিনিয়ত টেনে নিয়ে চলছে সকলে।
যেমন, পছন্দের একটা গল্প ‘মরচের’ দিকে যদি দৃষ্টিপাত করি, তাহলে দেখতে পাই শিপন নামে এক যুবকের জীবন। যেখানে সবই রয়েছে তার। স্ত্রী সন্তানসহ সুন্দর একটা পরিবার, একটা চাকরি। স্বাভাবিক সুখী জীবনের জন্যে যা প্রয়োজন তার সবটাই। তবু, তার জীবনে মরচে ধরেছে। অদ্ভুত এক অনুভূতি এক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে সব কিছু থেকে। আর তার এই জীবনকে আবার সঠিক চক্রে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে তার মেয়ে পারিজা। কীভাবে তা না হয় উহ্য থাক। যদিও চক্রটা আদৌ সঠিক হয়েছিল কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
আবার, ‘আউলিয়া’ কিংবা ‘দুপুরে চরকায়” গল্প দুটোর কথা বলতে গেলে এর মূল চরিত্র মতিন কিংবা আউলিয়াকে আবিষ্কার করা যায়, সমাজের ঘৃণিত দুটো চরিত্র হিসেবে। যারা সকলের দৃষ্টিভঙ্গিতেই ঘৃণিত হলেও, বাস্তবে পেয়ে থাকেন অফুরন্ত সম্মান। তবু, নিজেদের মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে তারাও কি বিচ্ছিন্ন নন সবকিছু থেকে? এই গল্প দুটোকে কি কালো কৌতুক কিংবা স্যাটায়ার অন্তর্ভুক্ত বলা যায়? হতে পারে। জানা নেই।
“এ বইয়ের গল্পগুলো বর্তমানের সঙ্গে অতীতের সংযোগ খুঁজে ফেরে, আঁকতে চায় এমন এক আগামীর কথা যেখানে আমরা ইতোমধ্যেই বা��� করছি।” -বইয়ের ফ্ল্যাপে এ অংশ নিয়ে যদি একটু কথা বলি, তবে ‘মর্মরসম্ভব’ কিংবা ‘শীতের অপেক্ষা করছি না’ গল্প দুটোর দিকে দৃষ্টি আরোপিত করতে হয় বিশেষভাবে। বৃদ্ধ আব্দুল হামিদের কিংবা প্রবাসী বোরহানের জীবনের গল্পে। সুনিপুণ ভাবে যেখানে, অতীত আবেগ, পারিবারিক আবেগ ও বর্তমান বা ভবিষ্যতের সাথে সেসবের সংযোগ আঁকা হয়েছে। যেখানে, প্রথমটি একেবারেই ভালো লাগেনি। আবার, দ্বিতীয়টি পড়েছি একদম মুগ্ধ হয়ে।
বইয়ের নামগল্প ‘হন্ত্রক’ বা ‘যেভাবে এহসানের ট্রেনবিষয়গল্পে ঢুকে পড়ি’, ‘লয়মন্তর’ - এই তিনটি গল্পের সাথে, উপন্যাস ‘চায়ের কাপে সাঁতার’ এর বিশেষ মিল লক্ষ্য করা যায়। সাথে টের পাওয়া যায় মায়ানগর বা ট্রেনের সাথে লেখকের সম্পর্কও। বিশেষত, ‘লয়মন্তর’ গল্পটাকে মনে হয়েছে ‘চায়ের কাপে সাঁতার’ এর একটা বিশেষ অথবা টুকরো অংশ বলে।
সাধারণ তবু সুন্দর একটা গল্প হলো, ‘একপাল সম্রাট’। ব্যাচেলরদের জীবনের আংশিক একটা দিককে, বা রাতকে উপজীব্য করে লেখা হয়েছে গল্পটা। যেখানে টুকরো টুকরো ভাবে ঢুকে পড়েছে তাদের ব্যক্তিগত জীবনও। গল্পটা ভালো লেগেছে।
‘আন্ডারউড মাস্টার ১৯৪০’ এর ক্ষেত্রে প্রথমে মনে হচ্ছিল, মূল চরিত্রের অহেতুক ভিত্তিহীন উৎসাহের (কারণ এখানে তার অভিব্যক্তি ঠিকঠাক প্রকাশ পায়নি বলে মনে হয়েছে) বিষয়টার কারণে গল্পটা ভালো না লাগার তালিকায় উঠবে কিন্তু মাঝের দিক থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত কিভাবে যেন ভালো লাগার তালিকায় ঠাঁই করে নিয়েছে গল্পটা।
মোটা দাগে বলতে গেলে, এই গল্পগ্রন্থে থাকা প্রতিটা গল্পই মানুষের অন্তর্নিহিত জীবনকে আঁকতে চেয়েছে। যে জীবন, সমস্ত সময় মস্তিষ্কে বয়ে নিয়ে চলে তারা। হেসে খেলে জীবন পার করে দিলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যা তাড়া করতে থাকে সকলকে। ‘হন্ত্রক’ তার বুকে বয়ে নিয়ে চলা সকল গল্পকেই প্রকাশ করেছে ভালো ভাবেই। কখনো কারোর জীবনের এক ঝলক দেখানোর মাধ্যমে; আবার কখনোবা এক ঝলকে কারোর পুরোর জীবনকেই দেখানোর মাধ্যমে। আর তার প্রকাশের পরে, কিছু পরিণতি খুব ভালো লাগলেও, কয়েকটাকে আবার একদমই ভালো লাগেনি।
পছন্দের কয়েকটি গল্প হলো, লয়মন্তর, মরচে, শীতের অপেক্ষা করছি না, দুপুরে চরকায়, একপাল সম্রাট, শ্যাটাপের অসুখ, আন্ডারগ্রাউন্ড মাস্টার ১৯৪০।
গাছের কুচকাওয়াজ চলে সারাদিন, এমন এক স্থান আছে যেখানে কখনও মাটিতে পৌঁছায় না সূর্যের আলো। কেমন ছায়াঘেরা চারপাশ। গা ছমছমে। অপূর্ব লতাপাতার সংসার। এসবের মাঝেই লুকিয়ে আছে একটি পোড়োবাড়ি। এমন জঙ্গলে কে, কবে, কেন এমন চমৎকার বাড়ি নির্মাণ করেছিল, কে জানে! খসে পড়ছে পলেস্তারা। ধ্বসে গেছে বাহিরের দেয়াল। বহুকাল হলো, এ বাড়িতে পড়েনি কোন মানুষের পায়ের ছাপ। ধুলো জমে আছে। তবু, প্রতি সন্ধ্যায় এ বাড়ির বারান্দায় জ্বলে একটি হলদে বাতি। কীভাবে, কেউ জানে না! তবে, পথ ভুল করে কেউ এই পথে কখনও এলে, নিশ্চিত ঐ বাতির প্রেমে পড়বেই, পড়বে।
এনামুল রেজার ‘হন্ত্রক’ পড়তে পড়তে এমন এক বাড়ির ছবিই যেন ভেসে উঠলো মনে। গল্পের আড়ালে গল্প, পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ফুল কিংবা মশারির ভেতর আটকে পড়া কোন জোনাকির ভাষাই যেন রেজা ক্রমাগত অনুবাদ করে গেছেন পুরো বইয়ে। কোথাও কোন জড়তা নেই, নেই গোপন কোন কারসাজি.. খুব সহজ ভাষাতেই শব্দ নিয়ে তৈরি করেছেন অপূর্ব এক জগৎ।
ধরা যাক, নাম গল্প হন্ত্রকের কথা, গল্পের শেষে মনে হলো, আহা! এমন গল্পই তো পড়তে কিংবা লিখতে চাই। কিংবা কোন এক গোরস্তানে খুব মধ্যরাতে তবলার তালে প্রকাশিত হয় মর্মরস্বভাব। দুপুরে চরকায় কেউ হঠাৎই পিছু নেয় আমাদের, আমরা ভুলে যাই বাড়ি ফেরার পথ। শীতের অপেক্ষা করতে করতে পিতার সাথে দূরত্ব ক্রমশ বাড়তেই থাকে। সংসারের জন্য কাতর আউলিয়াও বিলীন হয়ে যায় ট্রেন বিষয়ক বেখেয়ালি গল্পে। প্রিয়তম শিশুকে হারালেই বুঝি ফিরে আসে হারিয়ে ফেলা দাম্পত্যের জীবন? লয়মন্তরে প্রশ্ন করতে করতে জেনে যাই, সেই পলাতক আসামির কথা, নিজের কাছ থেকে যে কখনওই পালাতে পারে না। শ্যাটাপেরও অসুখ হয় কিংবা হয় না তবু অশরীরী জ্বিনের প্রতাপে কেঁপে ওঠে আমাদের বোধ। ব্যাবিলনের দ্বিতীয় বাগানের মতো কিংবা অল্টারনেট কোন হিস্ট্রির মতো হারিয়ে যায় নঈম ডাক্তারের বাড়ি। কখনও হাসপাতালের করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে এই ছোট হয়ে আসা পৃথিবীকেও মনে হয় কত বড়! একটি কথা বলা ব্যাঙের উস্কানিতে টাইম ট্রাভেল করতে করতে ফিরে যাই সে’ই ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রন করা টাইপরাইটারের কাছে, চুরি হয়ে যাওয়াই নিয়তি যার!
‘হন্ত্রক’ বইতে আধুনিকতার সাথে পুরাণের এক অদ্ভুত সংযোগ তৈরি করেছেন এনামুল রেজা। ক্লান্তিহীনভাবে পড়ে যাওয়া যায় তাঁর গল্প। ভণিতা নেই কোন। শুরু থেকেই গল্পে ঢুকে যাওয়ায় অদ্ভুত ক্ষমতা তাঁর আছে.. আরও আছে গল্প বলার অপূর্ব ক্ষমতা। এসব গল্প পড়লে মনে হয়, কতদিন এমন গল্প পড়িনি, এসব গল্প পড়লে মনে হয়, এমন গল্পই তো পড়তে চাই, এসব গল্প পড়লে মনে হয়, সাহিত্য এখনও বেঁচে আছে, আমাদেরও আছে বহু কিছু বলা বাকি..
১৯৮৫ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যার মাত্র ১৮% শহরে বসবাস করতো। সংখ্যায় পৌনে দুই কোটির কাছাকাছি।
৪০ বছর পরে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৪২ ভাগ শহরে বসবাস করে। সংখ্যায় যা ৭ কোটির উপরে।
মাত্র চল্লিশ বছরে শহরের জনসংখ্যা চারগুণেরও অধিক হওয়ার বহুবিধ কারণ আছে। দেশ অগ্রসর হচ্ছে, দেশের অর্থনীতির চাকা যত চলছে তত তা মানুষকে শহরের দিকে টানছে। নতুন কর্মসংস্থান, গ্রামের অনগ্রসর পরিস্থিতি, কিংবা আরেকটু উন্নত জীবনের সন্ধানে মানুষ অনেক স্বপ্ন নিয়ে শহরে পা রাখছে।
এই আরবানাইজেশনের সাথে সাথে মানুষের জীবনেও ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। শহরাঞ্চলে বর্তমানে যে মিডল ক্লাসের অবস্থান তার প্রায় সবাই-ই প্রথম কিংবা দ্বিতীয় প্রজন্মের শহরের অধিবাসী। দাদা গ্রামে থাকতো, বাবা শহরে 'কর্মসূত্রে' এসেছে — যেজন্য শহরে থাকা। কেউবা আবার পরিবারের মধ্যেই প্রথম প্রজন্মের শহরের বাসিন্দা। বহুজনে জমিটমি বেচে, শহরে জমি কিনে নিজের রুট পার্মানেন্টলি ছেড়ে দিয়ে শহরে এসে উঠেছে।
এই উন্নয়নের প্রভাবে বাংলাদেশের মানুষের একটা বিরাট অংশই নিজেদের রুট, সামাজিক-পারিবারিক শৃঙ্খল ভেঙ্গে শহরের একাকী জীবনে নিজেকে অভ্যস্ত করে নিচ্ছে। আবার জন্ম থেকেই যারা শহরের বাসিন্দা, ছোট থেকেই তারা বাংলার সহজাত সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। উন্নয়ন যত বাড়ছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে দূরত্বও বাড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে মানুষ নিজেকে বহির্বিশ্বের সাথে যতই কানেক্টেড মনে করুক না কেন, একাকীত্বের বিচারে এতটা একা সে কখনোই ছিল না।
আমি খুব বেশি এক্সপ্লেন করবোনা, ডিটেইলেও লিখবনা। তবে আরবানাইজেশনের সাথে সাথে মানুষ যেভাবে ইন্ডিভিজুয়ালিস্টিক হয়ে পড়ছে তা এক নতুন ধরনের মানসিক টানাপোড়েনের জন্ম দিচ্ছে। বুকাওস্কির ভাষায় যাকে বলা চলে — And when nobody wakes you up in the morning, and when nobody waits for you at night, and when you can do whatever you want. what do you call it, freedom or loneliness?
এ মানসিক টানাপোড়েনকে আমি বলব এই শতাব্দীতে (বা ইউরোপের বিগত ১৮-১৯ শতকেই যা শুরু) মানুষের হাজার হাজার বছরের দলবন্ধ সামাজিক-পারিবারিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী কিন্ত স্বাধীন(?) জীবনযাপনের ��রুন মানবশরীরের বিবর্তনীয় এবং মানসিক প্রতিবাদের একটা ফলাফল। হাজার বছর ধরে মানুষ একভাবে জীবনযাপন করেছে, কখনোই এত দ্রুত ট্রান্সফরমেশনের শিকার তাকে হতে হয়নি। আজ মানুষ স্বাধীন, কিন্ত চর্তুদিকে অদৃশ্য সব শিকলে সে বন্দী।
তারপরেও, এ সিস্টেমের ভেতর দিয়েই যারা নিজেদের 'আপডেট' করে নিতে পেরেছে তারাই জয়ী হচ্ছে। সিস্টেমের সুবিধা তারা নিতে পারছে। বাকিরা অসহায়ভাবে সিস্টেমের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে চায় — কেউ পারে, কেউ পারে না কিন্ত মানসিক এই টানাপোড়েন লেগেই থাকে। একটা একাকীত্ব, বিচ্ছিন্নতা, কিছু থেকেও না থাকা তার মাঝে বয়ে চলে প্রতিনিয়ত।
"হন্ত্রক" নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। গল্পগুলোতে এই টানাপোড়েনকে তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের নিরন্তর ছুটে চলা, কিন্ত গন্তব্য কোথায়? — এ প্রশ্নটা উঠে এসেছে বিভিন্ন গল্পে বিভিন্নভাবে। কোনো গল্প খুবই ভালো লেগেছে, কোনোটা একেবারে ভালো লাগেনি। শহরের জীবনের যে যান্ত্রিকতা, নি:সঙ্গতাকে লেখক তুলে আনতে চেয়েছেন তা ক্রিয়েটিভ ছিল। পেছনের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় না এনে বইটা হাতে নিয়ে পাঠ শুরু করতে পারেন, খারাপ লাগবেনা।
"জীবনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যে যা চায় তাকে তাই দিতে। ভুলোমনা জীবন বেশিরভাগ সময়েই এই নির্দেশ গুলিয়ে ফেলত। কেউ আপেল চাইলে দুই বছর পর সে লবণের পাত্র পেত। কেউ বাইসাইকেল চাইলে বহুদিন পর নিজেকে আবিষ্কার করত জাহাজের কেবিনে। আর যে কিছুই চাইত না, জীবন নিজেই তার ঘাড়ে চেপে বসত ভূতের মত। মূলত, এইভাবে আমরা তার ইতিকথা জানতে পারি।"
এনামুল রেজার বই প্রথমবার পড়লাম।সাধারণত যেকোনো লেখকের লেখা প্রথমবার পড়ার ক্ষেত্রে আমি ছোটগল্প পাশ কাটিয়ে সবসময় উপন্যাসটা আগে বেছে নেই। কারণ একটাই - অধিকাংশ লেখকের ছোটগল্পই আমাকে হতাশ করে। এ জনরা নিয়ে খুবই খুঁতখুঁতে স্বভাবের বলা যায়। সেই বিবেচনায় আমার উচিত ছিলো লেখকের 'চায়ের কাপের সাঁতার' বইটা আগে হাতে নেয়া কিন্তু সংগ্রহে না থাকায় 'হন্ত্রক' দিয়েই শুরু করলাম।
১৫টি ছোটগল্পের সবগুলো মনঃপূত হয়নি তবে কয়েকটি গল্প বেশ ভালো লেগেছে। উল্লেখযোগ্য হলো - হন্ত্রক, মর্মরসম্ভব, শীতের অপেক্ষা করছি না, আউলিয়া, শ্যাটাপের অসুখ, হাসপাতালে, আন্ডারউড মাস্টার ১৯৪০। বাকি গল্পগুলো খুব একটা ভালো জমেনি। পরন্তু লেখকের লেখা সহজ আর সাবলীল হওয়ায় পড়ে আরাম পেয়েছি।
~ প্রথম গল্প 'হন্ত্রক' এর প্লটটা বেশ ভালো লেগেছে। মায়ানগরে আগত হন্ত্রকদের আগমন কিছুটা গা শিরশির অনুভব দিয়েছে।
~ শেষ গল্প 'আন্ডারউড মাস্টার ১৯৪০' কিছুটা রহস্য নিয়ে শুরু করে শেষে একটা ছোট টুইস্ট দিয়ে মুগ্ধ করেছে।
বাস্তবতা - পরাবাস্তবতার জালে মোড়ানো অদ্ভুত মেজাজের বেশ কিছু গল্প। আটপৌরে জীবনের গতানুগতিক ঘটনাপ্রবাহকে ভিন্ন চোখে দেখার, তার মধ্যে থেকে গল্প বের করার যে ক্ষমতা লেখক দেখিয়েছেন এই বইয়ে এবং তার অন্যান্য লেখায় তা প্রশংসনীয়।
This life is a hospital in which each patient is possessed by the desire to change beds. One wants to suffer in front of the stove and another believes that he will get well near the window. -Charles Baudelaire, Paris Spleen
আমি যেন এক অস্থির হাওয়া সবকিছুরই তাড়াহুড়ো, সব কাজ যেন এক নিশ্বাসে শেষ হোক এই ব্যাকুলতা নিয়ে বেঁচে থাকা আমার স্বভাব। অথচ বইয়ের পাতায় চোখ রাখলেই সেই হাওয়া থেমে যায়, ধীরে ধীরে ভেসে যেতে থাকে এক দীর্ঘ ভ্রমণের দিকে। তখন আর ছোট গল্পের ক্ষণিক ছায়া নয়, বরং অনেক গল্পের সমুদ্রে ডুবে থাকা উপন্যাসই ভালো লাগে বেশি। হয়তো তার কারণ, ছোট গল্প অনেকটা স্বপ্নের মতো হঠাৎ শুরু হয়, হঠাৎ ফুরিয়ে যায়। চরিত্রেরা যেন দরজায় এসে কড়া নাড়ে ঠিকই, কিন্তু ঘরে ঢোকার আগেই চলে যায়। সেই স্বল্প সময়ের ভেতর হৃদয়ের সুতোয় বোনা সংযোগ তৈরি করতে পারেন খুব অল্প কিছু লেখকই।
উপন্যাস, আমার কাছে যেন এক ধৈর্যের আশ্রয় যেখানে পাঠক ধীরে ধীরে চরিত্রদের সাথে পরিচিত হয়, একেকটা পাতা খুলে তাদের মনোজগতে প্রবেশের সুযোগ মেলে। গল্পের গঠন সেখানে সম্পূর্ণতার দিকে এগোয়, ঠিক যেন ধাপে ধাপে রঙে রঙে পূর্ণ হয় একটি জলরঙ চিত্র।
লেখক এনামুল রেজাকে আমি প্রথম চিনেছি উপন্যাসের মধ্যেই "চায়ের কাপে সাঁতার" হাতে নিয়েই। নিঃসন্দেহে, পড়া সেরা ফিকশনগুলোর একেবারে ওপরের সারিতে থাকবে সেই বইটি। তার গদ্যের ভেতর যে মুগ্ধতা লুকিয়ে আছে, তা-ই আমাকে "হন্ত্রক" হাতে তুলতে অনুপ্রাণিত করেছে, প্রায় নির্ভার নিশ্চিন্ততায়। তবে এইবার একটু প্রত্যাশার পারদও ছিল বেশ উঁচু।
আমার বিশ্বাস, লেখকের মুন্সিয়ানার আসল প্রমাণ তার গদ্যের স্বচ্ছন্দতায়। জটিলতাও সেখানে সহজ হয়, আর সহজ জিনিস হয়ে ওঠে গভীর। “হন্ত্রক” এর প্রায় প্রতিটি গল্পেই এনামুল রেজার সেই স্বচ্ছ গদ্যশৈলীর ছোঁয়া পাওয়া গেছে। "প্রায়" বলছি, কারণ কোথাও কোথাও দৃশ্যান্তরের মাঝে এক ধরনের তাড়াহুড়ো কাজ করেছে, চরিত্রের অভ্যন্তরীণ চেতনার প্রকাশ বা ঘটনার অভিঘাতে তাদের প্রতিক্রিয়ায় পড়েছে কিছুটা খামতি। ফলে কোথাও কোথাও প্রাঞ্জলতায় ছেদ পড়েছে। বিশেষত, কিছু অনুভূতি যেন আদৌ স্পষ্ট হয়ে উঠেনি। সেইসব দৃশ্যগুলোতে হয়তো আরেকটু প্রশ্বাস দরকার ছিল। তবুও স্বস্তির কথা, অধিকাংশ গল্পেই ভাষা ছিল অনবদ্য, আর লেখক কোথাও জোর করে চমক আনার চেষ্টা করেননি এটাই বড় শক্তি।
এই বইয়ের গল্পগুলো বারবার ফিরে গেছে একাকিত্বে, হতাশায়, কিংবা নির্জন এক মনস্তলে। ম্যাজিক রিয়ালিজমের ছায়ায় এই একাকিত্ব নতুন কিছু নয়, তবে এনামুল রেজার কলমে এই সীমানাটা হয়েছে এতটাই সূক্ষ্ম, যে কোথায় বাস্তব আর কোথায় অলৌকিক পাঠককে আলাদা করে ভাবতে হয় না। জাদুবাস্তবতা এখানে ‘যথার্থ বাস্তব’ হয়ে ধরা দেয়। এই পার্থক্যটাই লেখকের কল্পনার গভীরতা বোঝায়। চরিত্রেরা যখন বাস্তবতা ছেড়ে অন্য এক জগতে হেঁটে যায়, তখন পাঠকও সেই পথ ধরে হেঁটে যায় অজান্তেই।
বইটি আমি পড়েছি অনেকটা সময় নিয়ে, একেকদিনে একেকটা গল্প, যেন প্রতিটি লেখার আলাদা স্বর আর ছায়া টের পাওয়া যায়। তবে লিখতে বসে টের পাচ্ছি, আলাদা করে কোনো চরিত্রের নাম বা গল্পের কাঠামো বলাটা কঠিন। সবাই মিলে যেন একটা গদ্যময় ভিড় তৈরি করেছে মাথার ভেতরে একেকজন একেকটা জীবন নিয়ে বসে আছে, কেউ কারও মতো নয়, তবুও সবাই যেন কোথাও গিয়ে মিলে যায়।
যেমন ‘মরচে’ গল্পের শিপন যার জীবন বাহ্যিক দিক থেকে নিখুঁত, স্ত্রী, সন্তান, চাকরি সবই আছে। তবুও তার ভেতরে জমে আছে এক ধরণের মরচে, যা সময়ের সঙ্গে আরও ঘন হয়ে উঠেছে। সেই জীবনে এক আশ্চর্য আলো নিয়ে আসে তার মেয়ে পারিজা। তবে আদৌ সেই আলো কি সত্যি ছিল? না কি সেটা ছিল এক মুহূর্তের বিভ্রম? প্রশ্ন থেকেই যায়।
আবার ‘আউলিয়া’ আর ‘দুপুরে চরকায়’ গল্পদুটি এই দুটি চরিত্র সমাজে যেভাবেই দেখা হোক না কেন, তাদের ভেতরে রয়েছে এক নিভৃত কুয়াশা। তারা ��য়তো সকলের চোখে বিদ্বেষের প্রতিচ্ছবি, কিন্তু বাস্তবতায় পায় সম্মান, আদর আর নিজেদের মনস্তলে কি তারা আদৌ প্রশান্ত? এই প্রশ্নগুলো গল্প শেষে রয়ে যায়। এদের কালো কৌতুক বলা যায়, নাকি স্যাটায়ার? আমি নিশ্চিত নই।
বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা ছিল “এই গল্পগুলো বর্তমানের সঙ্গে অতীতের সংযোগ খুঁজে ফেরে, আঁকতে চায় এমন এক আগামীর কথা যেখানে আমরা ইতোমধ্যেই বাস করছি।” এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে ‘মর্মরসম্ভব’ কিংবা ‘শীতের অপেক্ষা করছি না’ গল্প দুটি বিশেষভাবে চোখে পড়ে। প্রথমটি, বৃদ্ধ আব্দুল হামিদের গল্প, আমার মনে দাগ কাটেনি তেমন। কিন্তু ‘শীতের অপেক্ষা করছি না’ এর প্রবাসী বোরহানের গল্প যেন এক নিঃশব্দ হাহাকার হয়ে রয়ে গেছে মনের ভিতরে।
বইয়ের নামগল্প ‘হন্ত্রক’, কিংবা ‘যেভাবে এহসানের ট্রেনবিষয়গল্পে ঢুকে পড়ি’, অথবা ‘লয়মন্তর’ এই গল্পগুলোতে ‘চায়ের কাপে সাঁতার’ উপন্যাসের রেশ যেন জেগে ওঠে। ট্রেন, শহর, নিঃসঙ্গতা সবকিছুর মাঝে লেখকের অভ্যস্ত ছায়া। বিশেষত, ‘লয়মন্তর’ তো যেন ‘চায়ের কাপে সাঁতার’ এরই এক অনুচ্চারিত অধ্যায়।
‘একপাল সম্রাট’ গল্পটি যেন রাতের শহরের হাইরাইজ ফ্ল্যাটের ব্যাচেলর ঘরে লুকিয়ে থাকা কোলাহল। টুকরো টুকরো একাকিত্ব, গল্পের ফাঁকে ঢুকে পড়ে ব্যক্তিগত কিছু চুপচাপ ব্যথা। সহজ হলেও, গল্পটা ছুঁয়ে গেছে।
‘আন্ডারউড মাস্টার ১৯৪০’ পড়তে পড়তে প্রথমে বিরক্তি জন্মেছিল, মনে হয়েছিল চরিত্রটির আনন্দ যেন ভিত্তিহীন। তবে গল্প এগোতে থাকতেই তার সেই অদ্ভুত রঙিনতা ছুঁয়ে যায় এক ধরনের বিষণ্নতা যা গল্পটিকে পাঠের শেষে হৃদয়গ্রাহী করে তোলে।
সব মিলিয়ে, ‘হন্ত্রক’ আসলে কিছু টুকরো জীবনের গল্প যা হয়তো কখনও এক ঝলকে কাউকে দেখিয়ে দেয়, আবার কখনও এক ঝলকে কারও পুরো জীবনটা। সেই প্রকাশে কোথাও কোথাও অভাব বোধ হয়েছে ঠিকই, তবে অধিকাংশ গল্পই রেখে গেছে দীর্ঘ রেশ। কেউ কারও নয়, তবুও সবার মাঝে এক অদৃশ্য সংযোগের অনুভূতি।
আমার প্রিয় কয়েকটি গল্প: লয়মন্তর, মরচে, শীতের অপেক্ষা করছি না, দুপুরে চরকায়, একপাল সম্রাট, শ্যাটাপের অসুখ, আন্ডারউড মাস্টার ১৯৪০।
This entire review has been hidden because of spoilers.
বই : হন্ত্রক ধরন: ছোটগল্প সংকলন লেখক : এনামুল রেজা প্রথম প্রকাশ : ডিসেম্বর ২০২৪ প্রকাশক : চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন প্রচ্ছদ : এনামুল রেজা
এক.
গল্প সংকলন নিয়ে লিখতে গেলে মনের মধ্যে দ্বিবিধ সংকট টের পাই। কোন জায়গা থেকে শুরু করবো এবং সবগুলো মিশ্র ভাবে দিবো নাকি প্রতিটা গল্পের জন্যে আলাদা আলাদা আলোচনা, এহেন সংকট আমার চিরায়ত আলসেমিকে আরও বেগবান করে। এনামুল রেজার "হন্ত্রক" গল্পটা নিয়েই ফেঁদে ফেলা যায় দীর্ঘ একটা আলোচনা। সেটা করতে গেলে বাকি গল্পগুলোর আলাপটা হয়ে পড়বে সংকীর্ণ। এই দুয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়েই শুরু করা যাক।
এই মাঝখানে দাঁড় করানোটা আমি দেখতে পাই "হন্ত্রক" গল্প-সংকলনের প্রথম গল্প হন্ত্রকে। গল্পকার যখন আমাকে (মানে পাঠককে) মিরপুর ১ এবং ২ এর মধ্যবর্তী মিরপুর আড়াই (মেইড-আপ) তে নামিয়ে দেন। অথবা রূপচাঁদার অল্টার ইমেজ "কালোচাঁদা"র (ধরে নিচ্ছি বারবিকিউ এর রূপ) সামনে। অথবা এই মাঝামাঝি জায়গা লিফটের শূন্য স্পেসটায় দাঁড়িয়ে দেখি।
"তুবা মিষ্টি করে হাসল। আমার মনে হলো, এত কাছে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা, অথচ ওর থেকে আমার দূরত্ব হয়তো নয় কোটি আলোকবর্ষ।"
মায়ানগরে সামান্য হাসিটুকুও যেন চরম বিস্ময় হয়ে ধরা দেয়। স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে মানুষকে হন্ত্রকরা। করে তোলে মানসিক বিকারগ্রস্ত। মৃত্যুচিন্তা মানুষকে বিচ্ছিন্নতাবোধ আচ্ছন্ন করে যে সামগ্রিক সমাজসংকটের কারন হয়ে উঠেছে সেটা আমরা "তুবা" ও "কথকের" মাঝে দাঁড়িয়ে টের পাই। মৃত্যুচিন্তা মানুষকে যতটা নিঃসঙ্গ করে তোলে, মনোবিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে তার আশেপাশের সবকিছু, সেখানে মানুষের চিরায়ত হাসিটুকুও হয়ে পড়ে এক্সট্রা-অর্ডিনারি।
শেষটায় এসে পাঠক হিসেবে আমি সেই দ্বিবিধ সংকটের মুখোমুখি। দরজার এপাশে কথকের বেঁচে থাকার ক্ষীণ আশা আর ওপাশে হন্ত্রকদের (অথবা অজানা কারও) পায়ের শব্দ - মাঝে নয় কোটি আলোকবর্ষ সমান একটি প্রশ্ন আমার সামনে - আমি কোন পাশে?
কৌতুহল নাকি কেলাসিত স্বপ্নের মাঝে?
দুই.
অর্ডিনারি যেটা সেটার নাম "মর্মরসম্ভব"। সবকিছু "ভালো" বা "মন্দ" এর বিশেষণে অলংকারিত হতে হবে তা নয়। মর্মরসম্ভব গল্পের পূর্বে আমরা "হন্ত্রক" বইয়ের প্রচ্ছদের ব্যাক পার্টটা দেখি। এক কথায় বলতে গেলে লেখকের বয়ানে, "অতীত+বর্তমান=ভবিষ্যত" এর চিত্র - যা মর্মরসম্ভব গল্পে উঠে এসেছে। খুব স্বল্প পরিসরেই গল্পে আব্দুল হামিদের অতীত, বর্তমান এবং হালকা একটা ভবিষ্যতের চিত্র আমরা বেশ স্পস্টভাবেই পাই।
তবুও ওই যে, পাঠক হিসেবে গল্পটা আমার কাছে বিশেষ কিছু লাগেনি। গল্পের শব্দ, বাক্য বা কাহিনির রোয়াবটুকু আলাদা করে নতুন কোন সুর বা ভালোলাগা তৈরী করেনি।
পরবর্তী গল্প "দুপুরে চরকায়" বেশ ইন্টারেস্টিং। দুপুরে চরকায় গল্পের অগ্রগতির সাথে সাথে আমরা দেখি লেখক বেশ সূক্ষ্ণ ও বিচ্ছিন্নভাবে অনেকগুলো সূত্র রেখে গেছেন, এবং আমরা সেটা থেকে সামগ্রিক একটা চিত্র পাই গল্পের চরিত্র মতিনকে নিয়ে। সেটার জন্যে পাঠককে মেধাবী অথবা পরিশ্রমী হতে হয় না, শুধু সামান্য কৌতুহল এনাফ। পার্টিকুলার এই গল্পটার পরিনতি যাই হোক - তা কোন পোস্ট এপোকেলিপ্টিক ইমেজ নিয়ে ডিল করছে না, বরং অনেকটা চেনা চিত্রের সাথে লেখকের কিছু কল্পনার প্রকাশ। বাস্তবিক। তবে পরিনতিটা হালকা আকস্মিক হলেও লেখক মেজর কোন টুইষ্টের ট্রোপ ব্যবহার করেননি।
পাঠককে হয়তো এমপ্যাথি, সিমপ্যাথি অথবা এরূপ কিছু বিশেষণের মাঝে ফেলে দিয়েছেন। গল্পে মতিনের সংকটগুলো যেমন নির্মোহভাবে তুলে ধরেছেন একই সাথে চরিত্রটা স্বরূপে উন্মুক্ত হয়েছে। শুধু তাকে কেউ ফলো করছে এবং সেই থেকে যে অজানা বা অনুমেয় অথবা কল্পিত ভয় - তা একটা আকস্মিক মিনিংলেস (অথবা মিনিংফুল) ক্রাইসিস তৈরী করে। তীব্র অভিঘাতটুকুর আভাস হালকা ভাবে টের পাওয়া যায়।
এর সাথে হয়তো সংযুক্ত আছে "সরকার পতন" এবং সময়বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে সংকটের একটা বিশেষ টানাটানি। গল্পের এই "সরকার পতন" অথবা "তিন মিনিট" কিন্তু নিছক গল্পের শব্দ না, বরং নতুন একটা গল্পের "বীজ" হয়ে উঠেছে। যেটা থেকে গল্পের মধ্যে নতুন একটা গল্প পাওয়া যায়, দেখায় জায়গাটুকু থাকে। সেখান থেকেই মতিন আর তার পিছু নেয়া "অজানা" এনটিটির মধ্যবর্তী জায়গায় একধরনের ডেসপারেশন তৈরী হয়।
স্পেসটুকু আলোকিত না, হয়তো ইলাবোরেট নাইটমেয়ারের প্রতিবিম্ব - মতিনের মনোবিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ার পরে সেই কনক্লুশন টানা বোধহয় অবিচার হবে না।
তবে এই গল্পে এসে একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম বা ভাবনায় এলো, এনামুল রেজার নিজাম (নেজাম) রা কি "শা/উয়ো শব্দের বৃত্তেই চিরায়ত হয়ে উঠছে?
এই পর্যায়ে এনামুলর রেজার লেখা নিয়ে কিছু বলে নেয়া দরকার।
তিন.
ছোটগল্পের খুব বড় সমঝদার আমি তা না,বরং নিজস্ব একটা পাঠের মাধ্যমে আমি চেষ্টা করি গল্পটাকে দেখতে বা বুঝতে। অনেকটা গল্পের বিপরীত পাশে দাঁড়িয়ে। (কখনও মাঝামঝি)। বিপরীত পার্শ্বে মানে এই না যে, গল্পের দোষ-ত্রুটি ধরতে। বরং বলা চলে অক্সিমোরন হিসেবে পড়তে।
কথাসাহিত্যের বাধাঁ সড়কের বাইরে নতুন পথে হাঁটছেন বেশ কয়েকজন গল্পকার। এনামুল রেজা সেই নতুন পথেরই একজন গল্পকার। "চায়ের ক���পে সাঁতার" তার উদাহরন। এনামুল রেজার নাম আসলেই চায়ের কাপে সাঁতার নামটা এসে যায়, এবং ব্যাপারটা হয়তো বিরক্তিকরও লাগতে পারে। এক্ষেত্রে "ফেভিকল" এর "ফেভিকল মেরিনকা মজবুত জোড়" জিঙ্গেলের কথা মনে রাখলেই হল।
যা বললিাম, এনামুল রেজার নিজস্ব মুদ্রা তৈরী করে নিয়েনে। নিজের গল্পের যে শিল্পরূপ তিনি তুলে ধরেছেন কয়েকটি লেখায় তা আপতত স্পষ্ট, সামনে যেয়ে আরও বোঝা যাবে তা কতটা বাঁকবদলের স্রোতে ভাসে বা ডোবে। বড় ধরনের কোন টুইষ্টের ট্রোপে তার লেখা আবদ্ধ না, বরং মিহিন শেলাইয়ের মত এগিয়ে চলে তার গল্প। পাঠক মাঝে মাঝে হয়তো কোন চমকপ্রদ মোটিফের সামনে এসে আলোড়িত হন।
বাস্তববাদিতা, কিছুটা ম্যাজিক রিয়ালিজম, নিজের অভিজ্ঞতা যা কখনও পত্যক্ষ কখনও পরোক্ষরূপে প্রতিভাস তার লেখায়। যতদূর পড়েছি সো-ফার, উৎসারিত জীবনের গভীরে তিনি ডুবুরির মতো চলাচল করেন না, বরং গভীরে তার পাতানো বড়শি সেই কাজটুকু সূচারুভাবে করে। যাপিত জীবনের সুরটুকু তিনি তুলে ধরেছেন নিজের মতো করে। দাবানলের মতো আগ্রসী নয় হয়তো, তবে স্লো-কুকের মতো অথবা ক্রক-পট।
ঠিক এই কারনেই আমরা এনামুল রেজার গল্পে "অতিমানবীয়" কোন চরিত্র দেখি না। তেমনি কাহিনি কোন গভীর পরিণতির দিকেও ধাবিত হতে দেখি না। শহরে, গ্রাশে, পাড়ায়, মহল্লায় বয়ে চলা জীবনগুলো অতীত, বর্তমান এবং কিছুটা ভবিষ্যত তাই তার গল্পের চর। সেখানে মানুষের জিহবা থেকে খসে পড়া শব্দগুলোই আক্ষরিক অর্থে হয়ে ওঠে গল্পের ভাষা এবং গল্পে-ভাসা।
অতি-শুচিবায়ুগ্রস্থ পাঠকের কাছে (পত্যক্ষ ও পরোক্ষ দেখা) হয়তো তার কিয়দংশ অস্বস্তির কারন হয়ে উঠতে পারে। তবে এটাও মনে রাখা উচিৎ একজন পাঠকের যে, সিনেমার সেন্সরবোর্ড ছাড়াও পাঠকেরও নিজস্ব একটা সেন্সর-সেন্স থাকা জরুরী। একদম বাতিল করে দেয়া শুচিবায়ুগ্রস্থতা ভালো-পাঠের লক্ষন না।
চার.
"শীতের অপেক্ষা করছি না" গল্পটা চেনা বাস্তবতার তথ্যচিত্র। পূর্ব-প্রজন্মের এক গল্প বাবার লেখা পান্ডুলিপির আকারে যেমন উঠে এসেছে, পাশাপাশি বর্তমানেরও ট্রাজিক (এবং বাস্তবিত) চিত্রটাও বেশ স্পষ্ট। পূর্ব-প্রজন্মের তবে প্রাচীন না। এ গল্প খুব চেনা আমাদের প্রতিটা মানুষের। বলতে গেলে নতুন কোন দৃশ্য নেই বরং চিরচেনা, কাছ থেকে দেখা ছবিটাই চলচিত্রের মতোই ভেসে উঠেছে গল্পে। তাহলে এর এ্যপিল কোথায়?
কিছু গল্প থাকে না, নানা-নানী, দাদ-দাদীর মুখে অনেকবার রিপিটেশন হলেও পুরানো হয় না - অনেকটা তেমন। চেনা গল্প হলেও এই কঠিন বাস্তবার ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে শেষটায় যেয়ে গল্পটায় কিছুটা কোমলতা আসে। অনেকটা যেন কঠিন হয়ে ধীরে ধীরে ক্লান্ত-ভারে কোমল। মায়া। তাই ট্রাজিক ফিলটুকু নিয়েই আমরা গল্পের শেষটা আশা করি; হয়তো গল্পটা মায়ার টানেই আমাদের কল্পনার দিকেই বেঁকে যাবে। যদিও সেটা হয় না।
গল্পটা বাস্তবিকই থাকে। তাই বিষন্নতার সাথে সাথে পেইনটাও নড়েচড়ে হয়ে ওঠে জীবন্ত বোরহানের অন্তর্গত ইনার্শিয়ার কারনে।
এবং সেখানেই গল্পের নামের একটা মাহার্ঘ্য ধরা পড়ে। "শীতের অপেক্ষা করছি না" এর "শীত"-টুকু প্রাগের ঠান্ডা হয়ে থাকে না, অন্তর্গত বিমর্ষতা - এবং অবস্থান বিশেষে মৃ/ত্যু অথবা অমোঘ একটি দুঃসংবাদের প্রতিনিধি হয়ে যায়। এক ধরনের প্রলেতারিয়ান রিয়েলিটি হয়েই দাঁড়িয়ে যায়। মায়া এবং Sanēsō bikha tī mōḍarēja nēbē এর শীতল দ্বৈরথটুকুও সেই রিয়েলিটির প্রতিচ্ছবি।
"আউলিয়া" গল্পটাও চিরচেনা এবং একি সাথে সেই প্রলেতারিয়ান রিয়েলিটি হয়ে ওঠে ধর্মীয় ন্যারেটিভের নানা স্ববিরোধিতা উপজীব্য করে। নানান সময়ে সেই ন্যারেটিভ কিভাবে ফাংশন করে, ভুল-ও-ঠিক ন্যারেটিভের মাঝখানে একদিকে যেমন ইনটেলেকচুয়াল কমনসেন্স এবং তার মুখোমুখি ধর্ম নিয়ে ট্যাবু-ঘটনার সংঘর্ষ - ফলতঃ আউলিয়ার ইনডেমনিটি-টা একটা প্রচ্ছন্ন কৌতুকের জায়গা হয়ে থাকে। একি সাথে বাস্তবিক। জোরপূর্বক আউলিয়ার গোঁফ কর্তন সেই রিয়েলিটির সূক্ষ্ম সংবেদনের উদাহরন হিসেবে জ্বলজ্বল করতে থাকে।
পাঁচ.
"যেভাবে এহসানের ট্রেনবিষয়ক গল্পে ঢুকে পড়ি" [রচনাকাল: ২০১৭] বাস্তব অবাস্তবের থিন মধ্যরেখায় দাঁড়িয়ে কথকের এবং সর্বোপরি লেখকের প্রত্যক্ষ দর্শনের সাথে কল্পনার মিশেলের কুশলতা। সূক্ষ্ণ ডিটেইলস এবং বর্ণনার দক্ষতায় তা পাঠকেরও প্রত্যক্ষ দর্শন হয়ে ওঠে অনায়াসে। এই গল্প পড়তে যেয়ে খুব সহজেই আমরা এনামুল রেজার "চায়ের কাপে সাঁতার" এর ছায়া পাই।
আদতে সেটা উল্টা হবে। কারন এই গল্পের রচনাকাল ২০১৭। চায়ের কাপে সাঁতার প্রকাশিত আরও পরে। যদিও প্রায় অর্ধযুগ ধরে লেখা উপন্যাসটি। তাই ট্রেনবিষয়ক গল্পটি চায়ের কাপের সাঁতারের মিনিচেয়ার ভার্সন নাকি এই গল্পের বীজ থেকেই চায়ের কাপের সাঁতারের জন্ম - সেটার স্পেসিফিক উত্তর জানা হয়তো লেখকের। পাঠকের কাছে তা একধরনের এনক্যাপসুলেশন মনে হওয়াই স্বাভাবিক বা হতে পারে।
এই গল্পের আরও একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে এনামুল রেজার লেখার ধরন সম্পর্কে সামান্য আলোচনার জায়গা আছে। তার পূর্বে নিজের প্রত্যক্ষ দর্শনের একটি দিনের সামান্য অংশ তুলে ধরি। কোন একদিন সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে ধোলাইখালে মটর-পার্টের সারি সারি দোকানের পাশ দিয়ে ক্রস করছিলাম। ধাতব-যন্ত্রপাতিও মেলা ও শব্দে আমার চোখে পড়লো ফিল্টার পানির ভাঙা জারে একটা ফুল মলিন হলেও ফুটে আছে। তার একটু পরেই মাগরিবের আযান।
খুব সম্ভবত আর্কিটেকচার ফিল্ডে এই ধরনের প্রজেকশনের এতটা গালভরা নাম আছে। এখন ঠিক মনে পড়ছে না। অনেকগুলো বৃহৎ-ভরাট বৃত্তেও মাঝে যদি খুব ছোট একটা বৃত্ত থাকে, তাহলে সেই ছোটটাই ফোকাসড হয়ে থাকে বেশি। ব্যাপারটা এরকম। "যেভাবে এহসানের ট্রেনবিষয়ক গল্পে ঢুকে পড়ি" গল্পে "মৃত্যুমুখী বসন্ত" - লেখক এনামুল রেজার এহেন কাব্যধর্মী এপিগ্রামগুলোও সেই প্রজেকশনের মতোই। নিটোল এবং সুন্দর।
"মরচে" গল্পটা যেভাবে এগুচ্ছিল, তা আগ্রহোউদ্দীপক এবং পাঠককে দ্রুত একটা ক্ল্যাইেক্সের দিকে ঢাবিত করার সম্ভাবনা ছিল। এর সমাপ্তিটাও অন্যরকম সুন্দর - তবে এখানে কথা থেকে যায় যে, সেটা খুব দ্রুত যেটা বোধগম্যও না কেন এতটা তাড়াহুড়া এবং একি সাথে বড্ড বেশি মেকি বা মেইড-আপ লাগে। বরং সেম সমাপ্তি আরও একটু সময় নিয়ে দিলে গল্পটা এনাদার অসাধারন গল্প হতো তার সমাপ্তির কারনে।
কোন ফুল সম্পূর্ন প্রস্ফুটিত হবার আগেই ছিঁড়ে নেবার মতো ব্যাপার। লীনার এই আকস্মিক আবদার বা আকাঙ্খাটুকু হয়তো তার উপর প্রয়োগকৃত সিডেটিভের প্রভাবে বুঝ দেয়া যায়। কিন্তু এত দ্রুত শিহাবের সেই আবদারে সাড়া দেয়াটা তো আনন্দ, ভুলে থাকা সব কিছু পাশ কাটিয়ে ট্রাজিক হয়ে দাঁড়ায়।
এই গল্প প্রসঙ্গে আরও একটা ব্যাপারে একটু বলে নেই। (আরও বেশ কিছু গল্পে আছে যতদূর মনে পড়ে..)। গল্পের কিছু চরিত্র হুটহাট "মৃ/ত" কোন চরিত্রকে দেখা এবং তার সাথে কথোপকথন। লেখক কি ব্যাপারটা একটা সেন্ট্রাল থিমে রিডিউস করে ফেলছে? অথবা পাঠক একটা পর্যায়ে যেয়ে হয়তো ঠিক সেই বৃত্তেই নিজেকে রিডিউস করে নেবে - এনামুল রেজার গল্পে এই রকম প্রেজেনটেশন ডিপলি রুটেড হয়েই থাকে? যদি হয়, দুটোই একটা পর্যায়ে গতানুগতিক হয়ে দাঁড়াবে।
ছয়.
"লয়মন্তর" অদ্ভুত এক গল্প। গল্পের প্রথম অংশ যে প্লাটফর্মে ঠিক তার পরে আমরা চলে যাই পাখি বিষয়ক গল্পে। পুনরায় আবার ফিরে আসে কিছু বিচ্ছিন্ন কথোপকথনে। এই গল্পটা নিয়ে আমার মতে সম্পূর্ন একটা আলোচনা করা যায়। বইয়ের অন্যতম এবং পলিশড একটা স্টোরি। এই গল্পটায় সেই স্ট্রেঞ্জ অক্সিমোরনের জায়গা থেকে দেখার ও ভাবার অনেক জায়গা আছে।
আপাতদৃষ্টিতে কয়েকটি গল্পের স��াহার ম���ে হলেও গল্পগুলো আর আলাদা থাকে না। এখানে গল্পের থেকে একটা লাইন তুলে দেয়াটা জরুরী বোধ করি আলোচনার সুবিধার্থে :-
"চারদিকে যেন মানুষ নয়, মানুষের ছায়ারা বসবাস করে।"
গল্প পড়তে পড়তে মাথায় ঘুরপাক করতেছিল "ছায়া" বিষয়ক ভাবনাটা। আদতে যে কোন লেখক তো যে কোন চরিত্রের আদলে সেই "ছায়া" নিয়েই খেলা করে। আমরা গল্পের যে চরিত্র দেখি - তা অনেকটা আমাদের চেনা বা স্বল্প চেনা অথবা অচেনা কারও ছায়ারই বিচরন।
পাখি বিষয়ক বর্ণনায় এসে আবার সেই অক্সিমোরনের জায়গাটা আরও জেঁকে বসে যখন লেখক ৪টা পাখির কথা বলে সেটাকে নিছক "পাখিগুলো" অথবা "পাখিরা" না বলে "চারজন" বলে ফেলে। সচেতন ভাবে নাকি মিসটেক? এই খানে এসে তখন "কালো পাখি"টাকে "নিজে" বলে ট্যাগ করে - ঠিক তখন প্লাটফর্মের কনভারশেসনরত চরিত্রগুলো (লাশটা সহ) যদি মিলাতে যাই - তার সংখ্যাও ৪। আদতে পুরো প্রগেসটাই লিঙ্কড।
এভাবে যে কানেকশনটা তৈরী হচ্ছে সেটা রূপকমাত্র এবং একই সাথে সেই "ছায়াসর্বস্ব"। পাখিগুলোর জন্মের মতো গল্পের কথকের ছায়াগুলোও তৈরী হচ্ছে। প্লাটফর্মে কথোপকথনরত ছেলেটি অথবা বৃদ্ধটি তখন আর আলাদা এনটিটি থাকে না। স্বাভাবিক থাকে না। কথকের সাথে ছেলেটির বা বৃদ্ধের কথাবার্তা স্বাভাবিকভাবে নেয়া যেত। কিন্তু গল্পের কথকের মনের ভাবনার যে প্রশ্নগুলো উদয় হয়, ছেলেটি বা বৃদ্ধ লোকটি যখন সেই প্রশ্নের উত্তর দেয় বা সেই ভাবনার মধ্যে এগ্জিস্ট করে - তখন আর সেটাকে স্বাভাবিকভাবে নেবার ওয়ে থাকে না।
মুভি রেফারেন্স টানলে "ফাইট ক্লাব" অথবা " রেয়ার উইন্ডো" এর মাল্টি-পারসনালিটির আদলে ভাবা যায় বৈকি। ষ্ট্যাইলিস্টিক ডিভাইসের "এ্যলিগরি"র ব্যবহার অথবা তার মতোই। লয়মন্তর প্লাটফর্মের বিভক্ত ছায়াগুলোর মিনিংলেস ক্রাইসিসটা আবার যেন মিনিংফুল কনক্লুশন হয়ে ওঠে - যখন ছায়ারা তার মূল-রুটে ঢুকে পড়ে। যেমন "মানুষ চিরকাল শুধু নিজের কাছেই ফিরতে চেয়েছে।"
সাত.
"একপাল সম্রাট" ব্যাচেলর জীবনের মেসবাড়ির (ফ্ল্যাটবাড়ির ছয়তলা) একদিনের (এবং নিত্যদিনের) যাপিত জীবনের জেরক্স। ব্যাচেলর লাইফের খুনসুটিগুলোকে শেইপ-আপ করার যে ন্যারেটিভ, তা দারুনভাবে আগাচ্ছিল। পড়তেও বেশ লাগছিল। গল্পের চরিত্রগুলোর নাম-ভূমিকায় "যার বউ ব্রাউন-পেপার মুখে....." / "যার বউ গ্রাম থেকে খিচুড়ি ....." কন্ট্রিবিউশনগুলো স্টং হয়ে উঠতে উঠেতে গল্পটা হুট করে যেন মুখ থুবড়ে পড়লো।
অলৌকিক ঘরনার গল্প "শ্যাটাপের অসুখ"। স্বল্পতায় অল্প ক্লাইমেক্সে গল্পটা আগ্রহের যে দিগন্ত বিস্তৃত করল, পাঠককে সেখানে একটা জিজ্ঞাসাচিহ্নের সামনে রেখে গল্প শেষ করলেন লেখক। গল্পে উদ্ধৃত অংশগুলো থেকে বুঝতে চেয়েছিলম সেখানে কোন উত্তর আছে কিনা। সেভাবে কিছু পেলাম না। যদিও "ভবিষ্যতের ধান শুকাবার" মতো করে হয়তো কাজীর মাজারও রোদ পোহাবে সামনে - অনুমেয় সম্ভাবনা - জরুরী কিছু না।
"ডায়নোসরের পিঠ" পাহাড়ি এলাকার গল্প। প্রাকৃতিক বর্ণনার ভালোলাগাটুকু ছাড়া গল্প মোটামুটি লেগেছে।
"ব্যাবিলনের দ্বিতীয় বাগান" বেশ ইন্টারেস্টিং গল্প। নঈম ডাক্তারের বাসা খুঁজে ফেরার রহসম্যময়তার ছাঁচে ফেলা ন্যারেটিভে রিপনদের বাসাটা হুট করে যেন আরটিসটিক ইনসার্শন হয়ে উঠলো। লেখকের নগরপিতা কর্তৃক (নাকি নিজের ডিপলি রুটেড টোন?) "কিউরেটর" হবার ঘটনাটা আরটিসটিক ইনসার্শন না স্বপ্রণোদিত হয়ে উঠবে - সেই কৌতুহলময়-প্রশ্নটা ডিল করার একটা স্পেস রেখে যায় গল্পটা।
"হাসপাতালে" গল্পটায় যখন মিজানের (এবং মানুষের) চিরায়ত আক্ষেপটুকু আঁকা হলো - "একটা বিশাল পৃথিবীর বাসিন্দা হতে পারলাম না" - তখন গল্পের এই জায়গা থেকে আমার মাথায় অন্য একটা ভাবনা ঘুরতেছিল। যাদের পৃথিবী বিশাল, তাদের পৃথিবী কি বেশি আলোকিত? একটা বড় জায়গা আলোকিত করতেও তো বড় রকমের এক্সটার্নাল-এনার্জি নীড হয়। যাদের পৃথিবী ছোট, সেখানে অল্প আলোতেও তো হয়ে থাকার কথা ঝলমলে। আক্ষেপ নামক সুইচটাকে অন আর অফ করেই কি ঝলমলের বদলে আমরা টলমলে করে রাখি? প্রসাঙ্গতরে না যাই, প্রসঙ্গে থাকি। "হাসপাতালে" গল্পটাও দারুন সুন্দর, বইয়ের অন্যতম ভালো গল্প।
ডিভোর্সড মিজানের জগত ও মনোজগতের গল্প। একাকিত্বকে ডিল করার একধরনের মধ্যমপন্থী (কখনও নির্লিপ্ত, কখনও সেমি-আক্রমানত্মক) অবস্থার মধ্যে দিয়ে মিজান কি একধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় নিজের প্রতি? নাকি তার পিতার শেষ নির্দেশটুকু মিজানের অবচেতন মনেরই প্রতিফলন? রেলিং এর ওপাশে কি পৃথিবী বড় হয়? সেটিসফাইড না আন-সেটিসফাইড হয়ে থাকে সেই বড় হওয়া?
গল্পের শেষটা মগজে কিছু প্রশ্ন রেখে যায় বা নিজেই তৈরী করে। বইয়ের অন্যতম সুন্দর গল্প "হাসপাতালে"। "একটি শহুরে এওয়াজের ঘটনা" গল্পের আত্ম/হত্যা-প্রবণতা বোধহয় সুনিশ্চিত ছিল। ব্যাঙ আর তৈয়ব তো একধরনের "চেতনার" পরিচায়ক। কনভারসেশনের মধ্যে দিয়ে যে ক্রাইসিস এনক্যাপসুলেট হয়ে যায় - ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের ক্রাইসিসগুলোকে ডিল করতে "ব্যাঙ" ও "তৈয়ব" ক্যাপসুল - যে কোন একটাকে বেছে নেবার পথই হচ্ছে মুক্তি। ঝুলে থাকা তো ক্রাইসসটাকে আরও ঘন করে তোলা।
জীবনানন্দ দাশের "বোলো নাকো কথা ওই যুবকের সাথে" অনুরোধ অমান্য করে জুয়েলরা মাঝে মাঝে তাই যুবকের সাথে কথা বলে। তবে - অধিকাংশই ট্রেনে ওঠে না। জুয়েল উঠেছে এবং ট্রেনের গন্তব্যের সাথে সাথে জুয়েলের গন্তব্যও গল্পটাকে দারুন একটা ছোট গল্পের প্ল্যাটফর্মে পৌছে দেয়।
"আন্ডারউড মাস্টার ১৯৪০" ও ইন্টারেস্টিং একটি গল্প। হারিয়ে যাওয়া এক টাইপরাইটারের খোঁজ এবং সেটাকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যার একটা হালকা চিত্রও তুলে ধরা হয়েছি। মূলত লেখকের অনুসন্ধানে টাইপরাইটারটি কেন বারবার চুরি হয়ে যা্চ্ছে সেই কনক্লুসনও দেখানো হয়েছে সাবলীল ভাবে।
এই গল্পটা পড়ার সময় লেখক যখন টাইপরাইটারের খোঁজে নিদাঘে যান, ভয় হচ্ছিল শেষে না আলাদিনের চেরাগের ন্যায় টাইপরাইটারটি লেখকের হাতে লেগে যায়। এনামুল হকের লেখার পরিমিতি বোধটা এখানেই সফল এবং পূর্বই বলেছি একবার যে, অতিমানবীয় এটমোস্ফিয়ার ক্রিয়েট করা থেকে তিনি বিরত থাকেন। একজন লেখক যখন জানেন "কোথায় থামতে হবে এবং কতটা টানতে হবে" - এর থেকে ভালো ব্যাপার আর হয় না।
আট.
এনামুল রেজার "হন্ত্রক" চন্দ্রবিন্দু থেকে প্রকাশিত ১৫ টি ছোটগল্পের সংকলন। প্রচ্ছদ শিল্পী লেখক নিজেই। দারুন প্রচ্ছদ। ১৫ টি গল্পের মধ্যে "মর্মরসম্ভব" এবং "ডায়নোসরের পিঠে" আহামরি কিছু লাগেনি। বাকি ১৩টি গল্পই পাঠককে অনাবিল আনন্দ দিবে। এনামুল রেজার সৃজনশীলতার বহ্নিবীজ ঔপন্যাসিকের পরিধি ছাড়িয়ে গল্পকার হিসাবেও উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। আড়ম্বরতা নেই; বরং সাবলীল এবং চটকদার টুইষ্টের বিপরীতে বাস্তবতার নিজস্ব প্রকরণে তৈরী করে নিয়েছেন তার গল্প। লেখায় বাস্তবতার বাইরের অংশটুকু নিজের মতো করে ডিল করে নিতে পারলে, দেখতে পারলে গল্পগুলো নিজের বলে মনে হবে। জীবন, যাপন এবং জীবনের ভেতরের জীবনের সাথে সাথে অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে থাকা মানুষের অতীত, বর্তমান গল্পের শব্দে সুষমবন্টন হয়ে থাকে।
হন্ত্রকদের আগ্রাসনে "হন্ত্রক" গল্পের রচনাকাল বোধহয় আত্নহ/ত্যা করেছে। শুধুমাত্র এই গল্পটির রচনাকাল নেই।
গল্পসংকলনের আলোচনা লেখা একে তো কঠিন লাগে। তার উপর লেখা যে বড় হবে আগেই সেটা অনুমেয়। সেই কারনে আলসেমিও পেয়ে বসে। আর এত বড় লেখা দেখে পড়তে ইচ্ছুক যারা তারা যে কোন সময় কানা নেজামরে ভূমিকায় অবতীর্ন হওয়ার সম্ভাবনা���াও নাকচ করা যায় না।
গুডরিডসে রিভিউতে ০.৫ যোগ করা যায় না। I would like to give it 3.5. হন্ত্রক এক গল্পসংকলন। মোটামুটি ভালো লেগেছে। তবে আগে লেখকের চায়ের কাপে সাঁতার পড়ায় বোধহয় expectations বেশি ছিলো। আন্ডারউড মাস্টার, ১৯৪০ ছাড়া কোনো গল্পই এই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তবে সব গল্পের মেটাফোর আমি ধরতেও পারিনি, এজন্যও হতে পারে
এ শহরে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ায় হন্ত্রকেরা, নগরের অধিবাসীদেরকে চিনিয়ে দেয় মৃত্যু। দুপুরের চরকায় বেপথু হয়ে অলৌকিক এক যাদু থিয়েটারের মুখোমুখি হয় কেউ কেউ। কেউ কেউ আবার গল্প শুনতে শুনতে এক সময় নিজেই ঢুকে পড়ে গল্পের ভেতর। শহরতলীর চিপাগলির কোন এক ছয়তলা ভবনে একপাল সম্রাট বিভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে উনিশ শো ষাট সনে আটকে থাকা সময়ের মুখোমুখি। মানুষকে পেয়ে বসে বানর স্বভাব, তারা অস্থির হয়ে ছুটে বেড়ায় ঘটনাবহুল সব শাখা-প্রশাখায়। অন্য মুখ ও মুখোশে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। সেই অলৌকিক যাদু থিয়েটার মঞ্চের কলেবর বাড়ে, ডালপালা ছড়াতে ছড়াতে তা নগরের হ্যালোজেন সজ্জা পেরিয়ে পৌঁছে যায় সলতে জ্বলা অন্ধকার জনপদের কাছাকাছি। সেই অন্ধকার নদীতে নোঙ্গর ফেলা কোন প্রাচীন জাহাজের হুইসেল শুনে পাগলপ্রায় কেউ বুক পকেটে ভরে নেয় প্রাক্তনের কবরের মাটি যা থেকে ছড়ায় স্মৃতি বিজড়িত মহুয়ার সৌরভ।
এনামুল রেজার সদ্য প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ “হন্ত্রক” পড়বার পর পাঠক হিসেবে প্রকৃত অর্থেই তেমনি এক ঘটনাবহুল যাদু থিয়েটার দেখবার অভিজ্ঞতা হয়। লেখক এনামুল রেজার গল্পের ভূগোল একেবারে নিজস্ব ও অকৃত্রিম। রাজধানী মায়ানগর থেকে তা কখনো কখনো প্রসারিত হয় পীরের মহল্লা, নিদাঘ কিংবা চন্দনীমহল বরাবর। লেখক আশ্চর্য দক্ষতায় নির্মাণ করেছেন এই ভূগোলের জনপদের আঙ্গিক ও সেখানকার অধিবাসীদের মনস্তত্ত্ব। সেখানে আধুনিকতার সাথে নিত্য সংঘাত হয় না চিরাচরিতের। সেখানে যুক্তি ও কুসংস্কার পাশাপাশি সহাবস্থান করে বিনাশ নয় বরং প্রকৃতিতে টিকে থাকবার শর্ত পূরণ করে। এই ভুগোলের পূর্নাঙ্গ মানচিত্রের অবয়ব প্রতিষ্ঠা করতেই সম্ভবত লেখক সচেতনভাবে নির্বাচন করেছেন গল্পের বিষয়বস্তু।
সর্বমোট পনেরোটি গল্প আছে এই গল্পগ্রন্থে। প্রতিটি গল্পের ভাষা মেদহীন, ঝরঝরে এবং বিষয়বস্তু অনুযায়ী লেখক গ্রহন করেছেন ভিন্ন ভিন্ন কৌশল। বর্ণনা কৌশলে বদলে যাওয়া পরিপ্রেক্ষিতের ভিন্নতায় অনেক চেনা গল্পও নতুন করে হয়ে উঠেছে আগ্রহজাগানিয়া। এর ভেতর আমার ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকায় রয়েছে -হন্ত্রক, মর্মরসম্ভব, দুপুরে চরকায়, আউলিয়া,একপাল সম্রাট, লয়মন্তর, শ্যাটাপের অসুখ ও মরচের মতো গল্প।
এনামুল রেজার মধ্যে চমক দেয়ার অভিলাষ নেই। গল্প আর চরিত্রকে তিনি শক্তমুঠোয় ধরেন আর ধীরে অবগুণ্ঠিত করেন। লাজলজ্জাহীন কর্কশ বাস্তব প্রদর্শন করেন নির্লিপ্তভাবে আবার কখনও তার সাথে ধরতে হয় মায়াবাস্তবের ট্রেইন আর জানালা দিয়ে দেখতে হয় অলীক দৃশ্যকল্প। এসবের সাথে কখনও যুক্ত হয় ড্রাই হিউমার।