'বাঙালীর আত্মপ্রত্যয় নাই ইহা বলিলে অনেকরই আশ্চর্য্য ঠেকিবে, কারণ বাঙালীর সত্যকার অবস্থা যাহাই হউক সে মনে মনে সর্ব্বদাই নিজের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী, তাহার প্রমাণ আমরা প্রতিদিনই পাওয়া থাকি।এই ধারণাকে আত্মপ্রত্যয় না বলিয়া বরং আত্মপ্রীতি বলা উচিত। যে জাতি নিজের দোষ-ত্রুটি সাদা চোখে দেখিতে পারে না , দোষ-ত্রুটি স্বীকার করিলে আত্মাভিমানে এমন আঘাত লাগে যে আত্মসম্মান পর্যন্ত্য হারাইয়া বসে, তাহাকে আত্মবিশ্বাসী বলা উচিত নয়। সত্যকার আত্মপ্রত্যয় আরো ঘাতসহ।' - নীরদ সি চৌধুরী
নীরদচন্দ্র চৌধুরী লিখেছেন কম। তার মাদারি জবান বাংলায় তার লেখাজোখা আরও অপ্রতুল। সেই বিবেচনায় শ্রুত্যানন্দ ডাকুয়া মহাশয় নীরদ সি চৌধুরীর প্রথম জীবনে বিভিন্ন সাময়িকীতে ছাপা তার লেখাগুলোসহ বেশ কিছু লেখাকে গ্রন্থবদ্ধ করেছেন। যা আগে তার কোনো বইতেই স্থান পায়নি। বিশেষ করে, তরুণ নীরদচন্দ্র চৌধুরী লেখাগুলো এই বইয়ের প্রধান আকর্ষণ।
নীরদচন্দ্র চৌধুরী কস্মিনকালেও বাঙালির তুলাদণ্ডে নিজেকে উদারবাদী ও স্বদেশপন্থি দাবি করেননি। তার মননজুড়ে আছে ব্রিটেনসহ পশ্চিমা আদর্শ। তবে তিনি যাকে বলে, পশ্চিমাদের সবকিছু নেননি। যেমন: ব্রিটেনের ধর্মনিরপেক্ষতা তাকে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ। দিনশেষে নীরদচন্দ্র চৌধুরীর মতো ব্যক্তি হিন্দুত্ববাদের দাঁড়কাকের মতো কথা বলেছেন। সমর্থন করেছেন হিন্দুত্ববাদকে। এক্ষেত্রে তিনি রক্ষণশীলদের চাইতে এককাঠি সরেস।
আহমদ ছফা তার একটি লেখায় নীরদচন্দ্র চৌধুরীকে 'শনিবারের চিঠি'র 'দাঁড়কাক' বলেছিলেন। এই বইতে সজনীকান্তের সম্পাদিত 'শনিবারের চিঠি'তে প্রকাশিত নীরদচন্দ্র চৌধুরীর একাধিক লেখা স্থান পেয়েছে। সেই লেখাগুলোতে তিনি অপর লেখকদের ব্যঙ্গাত্মকভাবে আক্রমণ করেছেন। কাজ নজরুল ইসলামের সাহিত্য সম্পর্কে আলোচনায় তা শালীনতার গণ্ডি পেরিয়ে গিয়েছিল।
নীরদচন্দ্র চৌধুরীর বিদ্যাবত্তা নিয়ে কিংবদন্তির কমতি নেই। তার লেখা পড়লে মনে হয়, সেগুলো সত্য। তিনি বেসামরিক আদমি হয়েও ১৯৩৯ সালেই একটি লেখা লিখে দেখিয়েছিলেন হিটলারের জার্মানি কেন ব্রিটেনের কাছে পরাজিত হবে। সামরিক বিষয় নিয়ে তার পড়াশোনা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা নিঃসন্দেহে কাবিলে তারিফ।
বিমানবাহিনীর এই যুগেও নৌশক্তির জরুরত নিয়ে তার বিচার-বিশ্লেষণ পাঠককে মুগ্ধ করবে।
মোটকথা, নীরদচন্দ্র চৌধুরী যে কোনো লেখাই পাঠকের জন্য নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা। হতাশার জায়গা এটুকুই, তিনি ক্ষেত্রবিশেষে বড্ড বেশি রক্ষণশীল ও সাম্প্রদায়িক। তবে হ্যাঁ, নিজে যা বিশ্বাস করেন তা স্রোতের প্রতিকূলে বলার ক্ষমতা রাখেন। জনমতের মন যুগিয়ে কথা বলার লোক নীরদচন্দ্র চৌধুরী নন। এমন ঋজু ব্যক্তিত্বের লোক এখন দেবদুর্লভ।
তিনি বাংলায় চলিত ভাষায় সম্ভবত লেখেননি। বহুভাষায় তার দখল প্রশ্নাতীত। তাই তার গদ্যে ভিন্নরূপেই হাজির হয় নানান ধরনের প্রবাদ-প্রবচন ও বিভিন্ন ভাষার শব্দ। চমৎকারভাবেই পড়া যায় নীরদচন্দ্র চৌধুরীর বাংলা গদ্য।