আজ থেকে প্রায় ১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগেকার কথা। একটি ভয়াল বিস্ফোরণের মধ্যে দিয়ে যাত্রা শুরু আমাদের মহাবিশ্বের। সে থেকে আজ পর্যন্ত মহাবিশ্বে স্থান আর সময়ের একসাথে পথচলা। আর সেই সময়ের বাঁক ধরে প্রকৃতির এলোমেলো খেলার এক অনবদ্য রূপস্তত্বা আজ আমরা মানুষ। সৃষ্টি, মননে আর উৎকর্ষতায় সবার সেরা। নিজের উন্নত মস্তিষ্ককে কাজে লাগিয়ে আজ আমরা তাই বেরিয়েছি শিকড়ের সন্ধানে। মহাবিশ্বের শিকড়ের সন্ধানে। এই শিকড়ের খোঁজে বেরিয়েই একদিন আমাদের চোখে ধরা পড়ে গেলো মহাবিশ্বের সবচেয়ে আদিম জগতের ছবি। মহাবিশ্বের শৈশবের ছবি। তারপর একে একে বেরিয়ে এলো রহস্যের সব ধুম্রজাল। সময়ের সাথে মহাবিশ্বের বিবর্তন নিয়ে মানুষের চিন্তার এই ইতিহাস উঠে এসেছে তিন বিজ্ঞানপ্রেমী ভাইবোনের প্রাত্যাহিক কথোপকোথনে। ফেসবুক পাতা
সৃষ্টির একদম শুরুর দিকে মহাবিশ্বটা যখন একটা ছোট্ট বিন্দুর মত ছিল সে সময়ে শিশু মহাবিশ্বে ঠিক কী কী ঘটনা ঘটেছিল এমন একটা জিজ্ঞাসা আমাদের সকলেরই থাকে। মহাবিশ্বের সেই শুরুর দিকের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে বর্ণনা করে লেখা বই “মহাবিশ্বের শিকড়ের সন্ধানে” । আমরা মানুষেরা কেহই মহাবিশ্ব সৃষ্টির সে সময়টায় ছিলাম না। না থেকেও বিজ্ঞানের নানান বুদ্ধিমত্তায় জেনে নিতে পেরেছি সে সময়কার প্রকৃতি। আর আদি মহাবিশ্বের অনেকটা স্বরূপ বোঝা গেছে Cosmic Microwave Background Radiation [CMBR] বা মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ এর মাধ্যমে। এই CMB বিকিরণ নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে সম্পূর্ণ বইটিতে।
মাঝে মাঝে অনেকেই কাব্যিকভাবে একটা কথা বলে থাকেন “আমরা নক্ষত্রের সন্তান”। আমাদের চারপাশে শত রকমের মৌল যেগুলো আছে তাদের সবই সৃষ্টি হয়েছে নক্ষত্রের অভ্যন্তরে- আমাদের দেহগঠনকারী উপাদানগুলোও। নক্ষত্রে সবচে হালকা মৌল হাইড্রোজেন নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে ধাপে ধাপে ভারী মৌলগুলোকে তৈরি করে। একটা প্রশ্ন করতে কিংবা উত্তর জানতে সবসময়ই ভুলে যাই, নক্ষত্রে হাইড্রোজেনগুলো আসলো কোথা থেকে? কি কি প্রক্রিয়া শেষে সৃষ্টির শুরুর দিকে হাইড্রোজেন সৃষ্টি হল এমন প্রশ্নের চমকপ্রদ উত্তর দিতে চেষ্টা করেছেন লেখক।
তবে বইটার সবচে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে বইটার ঝকঝকে পরিষ্কার চিত্রগুলো। তার উপর আরো মাত্রা যোগ করেছে বইটা সম্পূর্ণই রঙ্গিন। বইটার পাতাগুলো উল্টালে সেগুলো দেখেই মন ভরে যায়।
আরও একটা মজার দিক হচ্ছে সম্পূর্ণ বইটিই ওঠে এসেছে ভাইবোনদের কথোপকথনের মাধ্যমে। ভাইবোনদের পারস্পরিক সম্বোধন একদম বাস্তবের সাথে মিশে যেতে সাহায্য করে। বইটি রাতের আকাশে আয় আয় চাঁদ মামা দিয়ে দিয়ে শুরু হয়েছে এবং কথোপকথনের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিরস গ্রাফের মত ব্যাপারগুলোও ওঠে এসেছে গল্পের ছলে। মোট ছয়টি ভাগে বিভক্ত বইটিতে অনেককিছুই আলোচনা করা হয়েছে গল্পের ছলে। যেমন রেডিও টেলিস্কোপ, পটভূমি বিকিরণ, বিগ ব্যাং, শিশু মহাবিশ্ব, শিশু মহাবিশ্বের আঁকার, তাপমাত্রা, ফোটন, মহাকর্ষ, মহাবিশ্বের আকৃতি, গোলকীয় জ্যামিতি, মহাবিশ্বের বক্রতা, মৌলিক কণার উৎপত্তি, নিউট্রিনো, মহাবিশ্বের বয়স, ডার্ক ম্যাটার ডার্ক এনার্জি ইত্যাদি। এই সবগুলোরই মূল সূর CMB বিকিরণ। CMB বিকিরণ নিয়ে অনেকেই লিখেছেন, তবে সেগুলো খুবই স্বল্প পরিসরের প্রবন্ধ। এই বিষয়টার উপর আস্ত একটা বই লিখে ফেলা প্রশংসার দাবী রাখে। এই বিকিরণ নিয়ে মোটামুটি বিস্তারিত সবই জানা যাবে এই বইটিতে।
বইটিতে কিছুটা সায়েন্স ফিকশনের গন্ধও পাওয়া যায়। লেখক এমন একটা সময়ের কথা কল্পনা করে নিয়েছেন যেখানে ‘দৈনিক বিজ্ঞান’ নামে পত্রিকা বের হয় এবং ছোট বোনের সেটা না পড়লে দিনটাই শুরু হয় না। এমন একটা সময়ের কথা বলেছেন যেখানে নিয়মিত বিজ্ঞান লেখক সম্মেলন হয়। আর মহাবিশ্বের গুরুগম্ভীর সিরিয়াস বিষয় নিয়ে গবেষণা করেন বাংলাদেশী বিজ্ঞানী এবং সেটা বিদেশের মাটিতে নয় বাংলাদেশেই। এমন দিন বেশি দূরে নয়, অদূর ভবিষ্যতেই এই দিন বাংলাদেশে চলে আসবে। এটা গাণিতিক বাস্তবতা।
রঙ্গিন ছাপার এই বইকে সাধুবাদ জানাই। বাংলা ভাষায় অহরহ এমন বই প্রকাশিত হোক। এই বই ও বইয়ের লেখকের জন্য শুভকামনা।
বইটাতে অনেক জটিল বিষয় লেখক গল্পের আকারে খুব সহজ ভাষায় বর্ণনা করেছেন। এ বইয়ে একেবারেই শুরু থেকেরা হয়েছে। বিগব্যাং থেকে বর্তমান সময়ের মহাবিশ্বের অবস্থা, আমাদের চারপাশের পরিবেশ এসব বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। কিভাবে একটা ক্ষুদ্র বিন্দু থেকে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হয়ে আজকের এই অবস্থায় এসেছে এবং তার এন্ট্রপি কিভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, মহাবিশ্বের বক্রতা কিভাবে নির্ণয় করা হয়েছে, আমাদের চারপাশের ডার্ক এনার্জির অস্তিত্ব যে আছে তা কিভাবে বোঝা যায় তা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে বইটিতে। এছাড়া রয়েছে মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরন সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ। লেখক জটিল মহাজাগতিক বিষয়গুলো গল্পের ছলে খুব সুন্দর উদাহরন দিয়ে সহজভাবে সাধারনের বোধগম্য করেছেন। আমি বইটা পড়ে মহাকাশ সম্পর্কে অনেক নতুন নতুন তথ্য জানতে পেরেছি। মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণের মাধ্যমে আমরা কিভাবে শিশু মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানতে পারি তা পড়ে আসলেই অবাক হতে হয়েছে। এছাড়া কোয়াসার পর্যবেক্ষণ করে কিভাবে ১০ বিলিয়ন বছর আগের মহাবিশ্ব সম্পর্কে ধারনা করা যায় তাও জানা যাবে বইটা পড়লে। অবশ্য বইয়ের কিছু বিষয় আমার মাথার উপর দিয়েই চলে গেছে। তবুও এই জটিল বিষয়টা সম্পর্কে জানতে পেরেছি এই বইয়ের কল্যাণেই। বইয়ের প্রায় ৯০% বিষয়ই আমি বুঝতে পেরেছি। সর্বোপরি বইয়ে লেখকের বর্ণনা ভঙ্গি ছিল খুবই সহজ ও সরল। বিশেষ করে বইয়ে ব্যাবহার করা ছবিগুলো ছিল খুবই দৃষ্টিনন্দন। এই ছবিগুলোর কল্যাণেই আরো সহজভাবে ব্যাপারটা বোঝা গেছে। কসমোলজির উপর এই বইটা আসলেই অসাধারন। বইটা নিশ্চিত ভাবেই পাঠকের জ্ঞান পিপাসা যেমন মিটাবে তেমনিভাবে এই বিষয়ে বাড়াবে পাঠকের আগ্রহ।