জীবনবৃক্ষের প্রবাহ এক আশ্চর্য ঘটনা। দীর্ঘ সময়ের যাত্রাপথে কে কার সঙ্গে কীভাবে যে যুক্ত হয়ে পড়ে, কোন ভালবাসা কীরূপে আমাদের কাছে ফিরে আসে, তা কেউ বলতে পারে না। চার ভাগে বিভক্ত এই কাহিনি পঁচিশ বছরের সময়কালকে ধারণ করে আছে। আর তার প্রবাহে আমরা দেখি হাওয়াদাদুকে। দেখি সর্বগ্রাসী ক্ষমতার লোভে অন্ধ বীরেন্দ্রকে। আবার দেখি গ্রাম্য রাজনীতির নেতা জগন্নাথকেও। এবং তারপর একটি খুন বদলে দেয় বহু মানুষের জীবনের গতিপথ ও লক্ষ্য! আর সেই সূত্র ধরেই এই কাহিনি আমাদের চিনিয়ে দেয় দরিদ্র যুবক কবিকে। দেখায়, উর্জা ও রাজুর প্রেম ও তার পরিণতি। সেই প্রবাহেই জানা যায় কাজের মানুষ লালু আর বিন্দিকে! জানা যায় ইউনিভার্সিটিতে পড়া জিনি কেন ভালবাসে কবিকে! আর দেখি আশ্চর্য এক চরিত্র, ঝিরিকুমারকে। কে এই ঝিরিকুমার? সেকি আনন্দের উৎস নাকি মৃত্যুর অন্ধকার? এরা ছাড়াও কাহিনির বাঁকে বাঁকে এসে পড়ে সেতুদা, গুরান, লীলা, মাধু, বাচ্চু, অঞ্জনা, নিধি-সহ আরও নানান চরিত্র! বহু আগের দুটি ঘটনা প্রভাব ফেলে সময়ের ওপর, নানান মানুষের ওপর। আলো-ছায়ার এইসব মানুষরা ভাবে তাদের জীবনের শূন্য পথে কবে ফুটবে ভালবাসার মল্লিকা! ‘শূন্য পথের মল্লিকা’ অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে আলোয় পৌঁছনোর উপাখ্যান। হিংসা থেকে ভালবাসায় পৌঁছনোর যাত্রা। সুখপাঠ্য এই উপন্যাস মনের অন্ধকারে আলো জ্বালিয়ে রাখার কথা বলে। ভালবাসার মধ্যে যে ত্রাণ আছে, তার কথা বলে।
স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর জন্ম ১৯ জুন ১৯৭৬, কলকাতায়। বর্তমানে দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা। পৈতৃক ব্যবসায় যুক্ত। প্রথম ছোটগল্প ‘উনিশ কুড়ি’-র প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত। প্রথম ধারাবাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত। শৈলজানন্দ স্মৃতি পুরস্কার ২০১৪, এবিপি এবেলা অজেয় সম্মান ২০১৭, বর্ষালিপি সম্মান ২০১৮, এবিপি আনন্দ সেরা বাঙালি (সাহিত্য) ২০১৯, সানডে টাইমস লিটেরারি অ্যাওয়ার্ড ২০২২, সেন্ট জেভিয়ার্স দশভুজা বাঙালি ২০২৩, কবি কৃত্তিবাস সাহিত্য পুরস্কার ২০২৩, উৎসব পুরস্কার ২০২৪, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড ২০২৪, আনন্দ পুরস্কার (উপন্যাস: '‘শূন্য পথের মল্লিকা') ২০২৫ ইত্যাদি পুরস্কারে সম্মানিত ।
বহু বছর পরে পড়লাম স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর লেখা। তাও আবার সেই ছেলেবেলার মতো রাত জেগে। কঠিন কিছু সমালোচনা করতে ইচ্ছে করছে না, কিন্তু মোটের উপর উপন্যাসটা আমার ভালো লাগেনি। এত বড় পরিসরে লেখা হলেও, গদ্যের শৈলীটি বেশ ঝরঝরে হলেও, আনন্দ পুরস্কারের উজ্জ্বলতা লেগে থাকলেও, শূন্য পথের মল্লিকা আমার মনের গভীরে প্রবেশ করতে পারেনি।
স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর শূন্য পথের মল্লিকা নিছক একটা উপন্যাস নয়—এ যেন গত পঁচিশ বছরের সামাজিক, রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত ওঠাপড়ার এক মোজাইক, যেখানে মানুষের আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা, ক্ষমতার লোভ, নৈতিক অবক্ষয় ও সম্পর্কের জটিলতা একত্রে মিশে আছে। সরলরৈখিক আখ্যানের ভেতরে লেখক এমন এক টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছেন, যা পাঠককে প্রথম পাতা থেকেই শেষ অবধি ধরে রাখে।
গল্পের কাঠামো সর্বমোট চার ভাগে বিভক্ত, কিন্তু তার অন্তঃস্রোত আসলে তিনটি সময়সীমায় (১৯৯৫, ২০০০, ২০২০) বোনা। এই সময়বিভাগ গল্পে শুধু কালক্রমিক পরিবর্তন আনে না—বরং চরিত্রদের বিবর্তন, সম্পর্কের টানাপোড়েন, এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনস্তত্ত্বের পরিবর্তনকে গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলে। জগন্নাথ, বাচ্চু, অঞ্জনা, মাধু, রিপা, লীলা, রতি, সেতু, সুন্দর, বীরেন্দ্র ত্রিবেদী, হাওয়া দাদু, শিউলি, বিশু, হারুঘোষ, কবি, জিনি, উর্জা, বিন্দি, লালু, নিধি, গুরান, রানা, কৌশানি, পাখিদা, ঝিরি—প্রতিটি চরিত্রই রক্তমাংসের, পাঠকের আশেপাশের পরিচিত মানুষের মতোই। কেউ রাজনীতির মঞ্চে, কেউ গ্রামের পুকুরপাড়ে, কেউ বা শহরের ব্যস্ত রাস্তায়—সবাই যেন কোনো না কোনো অদৃশ্য সুতোর টানে বাঁধা।
লেখকের ভাষা ঝরঝরে, কিন্তু তার মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। প্রেম এখানে নিছক রোমান্টিক মোহ নয়—এখানে প্রেমের সঙ্গে হিংসা, ঈর্ষা, প্রতিহিংসা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, এমনকি রক্তের সম্পর্কেরও সংঘাত জড়িয়ে আছে। তাই হয়তো এই উপন্যাসের রং লাল—প্রেমের, বিপদের, রক্তের। রাজনীতির ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার নোংরা খেলা, শ্রেণী ও লিঙ্গের টানাপোড়েন—সবকিছুর মাঝেই লেখক রেখে দেন এক আলোকরেখা, যা শেষমেষ প্রেম ও মানবিকতার দিকে নিয়ে যায়।
তবে কিছু জায়গায় প্রশ্নও ওঠে। কিছু ঘটনার যৌক্তিকতা নিয়ে পাঠকের মনে খটকা তৈরি হতে পারে—যেমন বিন্দির ওয়েলিংটন প্রসঙ্গ বা চূড়ান্ত দৃশ্যে ভেজা পিস্তল থেকে গুলি ছোড়ার বাস্তবতা। এগুলো হয়তো আখ্যানের আবেগী প্রবাহে ঢেকে যায়, কিন্তু মনোযোগী পাঠকের চোখ এড়ায় না। তা সত্ত্বেও, এগুলো মূল গল্পের শক্তিকে খর্ব করে না, কারণ লেখক যেভাবে চরিত্রদের টানাপোড়েন, ব্যর্থতা, ক্ষোভ, আকাঙ্ক্ষা এবং হঠাৎ পাওয়া শান্তির মুহূর্তগুলো আঁকেন, তা এই উপন্যাসকে স্মরণীয় করে তোলে।
এই উপন্যাস মূলত আঁধার থেকে আলোয় যাত্রার গল্প। এখানে ঝরে পড়া মল্লিকারা প্রতীক হয়ে ওঠে সেই মানুষদের, যারা হয়তো অনেক কিছু হারায়, কিন্তু তবুও ভালোবাসার, ন্যায়ের, আর মুক্তির সম্ভাবনা ধরে রাখে। হাওয়া দাদুর সেই উক্তি—"তোর আমার চাওয়ার কিছু হবে না। যা হবার তাই হবে। যা হওয়ার তা হয়েই আছে। আমরা শুধু তার মধ্য দিয়ে যাত্রা করছি মাত্র"—উপন্যাসের সারতত্ত্ব যেন এই এক বাক্যেই ধরা আছে।
শূন্য পথের মল্লিকা প্রেমের বহুমাত্রিক রূপ—রাজনীতি, সামাজিক পরিবর্তন, ব্যক্তিগত ক্ষত, এবং নৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে জড়ানো এক বিশাল ক্যানভাস। এই দিক দিয়ে এটি গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের Love in the Time of Cholera-র মতোই প্রেমকে সময়, রোগ, ও সমাজের অবক্ষয়ের ভেতর দিয়ে টিকিয়ে রাখার গল্প। মার্কেস যেমন ফ্লোরেন্তিনো ও ফারমিনার সম্পর্ককে দীর্ঘায়িত করে যুগের পরিবর্তন দেখিয়েছেন, তেমনই চক্রবর্তী জগন্নাথ, অঞ্জনা, ও অন্য চরিত্রদের তিন দশকের যাত্রাপথে ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি এক দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক মানচিত্র এঁকেছেন।
তবে শূন্য পথের মল্লিকা মার্কেসের রোমান্টিক জাদুবাস্তবতার পথে হাঁটে না। এর স্বর অনেক বেশি বাস্তববাদী—কখনো কখনো ফিওদর দস্তয়েভস্কির The Idiot বা লিও টলস্টয়ের Anna Karenina-র মতো, যেখানে প্রেম নৈতিকতা, সামাজিক বিধি, এবং ব্যক্তিগত দুর্বলতার সঙ্গে লড়াই করে। Anna Karenina-তে যেমন অন্না আর ভ্রনস্কির সম্পর্ক এক বৃহত্তর সামাজিক সংকটের প্রতীক হয়ে ওঠে, তেমনই এখানে প্রেম কেবল ব্যক্তিগত নয়—এটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, শ্রেণীসংঘাত, এবং গ্রামীণ-শহুরে সংস্কৃতির সংঘর্ষের সঙ্গে গাঁথা।
ইংরেজি সাহিত্যে যদি তুলনা টানি, জেন অস্টেনের Persuasion-এ যে দেরিতে আসা প্রেম, সুযোগ হারানোর বেদনা, এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিণত হওয়া অনুভূতির কথা আমরা পাই, শূন্য পথের মল্লিকা-তেও তার প্রতিধ্বনি আছে—বিশেষত সেইসব চরিত্রদের মধ্যে যারা একসময় একে অপরকে হারিয়ে ফেলে, কিন্তু ভাগ্যের জটিল পথে আবার মুখোমুখি হয়। তবে অস্টেনের জগৎ যেখানে পরিচ্ছন্ন ও শিষ্টাচার-আবদ্ধ, চক্রবর্তীর জগৎ সেখানে কাদা, রক্ত, আর গুলির আওয়াজে ভরা।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যেই যদি দেখা যায়, সেলিনা হোসেন বা সেলিনা চৌধুরীর কিছু উপন্যাস যেমন ব্যক্তিগত প্রেমকে রাজনৈতিক অস্থিরতার পটভূমিতে স্থাপন করে, তেমনি চক্রবর্তীও প্রেমকে এক বৃহত্তর ন্যারেটিভের অংশ করেন। পার্থক্য হল—তার ভাষা অনেক বেশি সিনেমাটিক, দ্রুতগামী, এবং পাঠককে ধরে রাখার মতো সাসপেন্সে ভরা।
অবশেষে বলা যায়, শূন্য পথের মল্লিকা বিশ্বসাহিত্যের বড় প্রেম-উপন্যাসগুলির মতোই প্রেমকে সময়, নৈতিকতা ও সমাজের পরীক্ষাগারে নিয়ে যায়। তবে এর শক্তি হলো—এটি কোনো রূপকথার সুখী পরিসমাপ্তি দেয় না; বরং দেখায়, প্রেম টিকে থাকতে পারে, কিন্তু সেটি প্রায়শই ক্ষতবিক্ষত, অসম্পূর্ণ, তবুও সুন্দর। আর এই তীব্র বাস্তবতাই একে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস থেকে টলস্টয় পর্যন্ত নানা ঐতিহ্যের সঙ্গে বসিয়ে দেয়, আবার আলাদা করে তোলে সমকালীন বাংলা উপন্যাস হিসেবে।
সবশেষে বলা যায়, এটি সমকালীন বাংলা সাহিত্যের একটি শক্তিশালী সংযোজন। যারা এখনও মনে করেন স্মরণজিৎ কেবল প্রেমের গল্প লেখেন, তাদের জন্য এই উপন্যাস এক বড় জবাব। এখানে প্রেম আছে, কিন্তু আছে রাজনীতি, সহিংসতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, মানুষের অবক্ষয় এবং তার মধ্যেও জেগে থাকা আলোর প্রতি এক অনমনীয় টান। ত্রুটি থাকলেও, তার চেয়ে অনেক বড় তার মানবিকতা ও আখ্যানের শক্তি। পাঠকের মনে এই মল্লিকারা দীর্ঘদিন সুবাস ছড়াবে—শূন্য পথে, অনন্তের দিকে।
'মানুষ চেয়েছে কিবা? পেয়েছে কি? - কিছু পেয়েছে কি!--- হয়তো পায়নি কিছু - যা পেয়েছে, তা-ও গেছে খ'সে অবহেলা করে করে, কিংবা তার নক্ষত্রের দোষে,---'
'শূন্য পথের মল্লিকা' শেষ করার পর জীবনানন্দ দাশের এই চারটে লাইন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। মানুষ তার জীবনে কত কিছুই চায়, কত কিছুই পাওয়ার আশা করে, অপেক্ষা করে কারোর, ভুলে যেতে গিয়েও ভুলে যেতে পারেনা কাওকে - কত কিছুই সে হারায় অলক্ষ্যে, আবার জেনে বুঝেও - কে যে তার জীবনে আসে আর কারাই বা চলে যায় - তা না তো সে বুঝতে পারে আর না সে জানতে পারে - শুধু ঝরে যাওয়া মল্লিকারা তার শূন্য পথ তাদের পাপড়ির নরমে সাদা করে রাখে আজীবন।
উপন্যাসটির একদম শুরুতে লেখক বলছেন, এক অদ্ভুত, অপার্থিব টানের কথা; এমন এক বন্ধন বা আকর্ষণ - যার জন্যই মহাজগৎ থেকে মাটির পৃথিবী একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হৃদ্যতায় জুড়ে থাকে। "...এর ব্যাখ্যা নেই। স্পষ্ট কারণ নেই। নেই কোনো সঠিক পদ্ধতি। শুধু জ্বলে ওঠা তারা আর হারিয়ে, মিলিয়ে যাওয়া তারার আলোর মাঝে ভারী অদ্ভুত ভাবে গড়ে ওঠে এই বন্ধন"। উপন্যাসটি পড়তে শুরু করলে বোঝা যায়, এই টানই উপন্যাসটির আত্মা। প্রত্যেকটি চরিত্র তাদের পাওয়া, না - পাওয়া, অভিমান, আকাঙ্ক্ষা, প্রেম, বিদ্রোহ নিয়ে এক অমোঘ টানে জড়িয়ে আছে একে অপরের সঙ্গে।
উপন্যাসটি তিনটি সময়কাল ধরে এগিয়ে চলে। ১৯৯৫, ২০০০, ২০২০। আর এই দীর্ঘ সময়কালের পরতে পরতে লেখক বোনেন এক কাঠামোগত সূক্ষ্মতা। সরলরৈখিক গল্প বলার ভিতরেও তিনি নির্মাণ করেন বহুস্তরীয় বোধ। চরিত্ররা তাদের প্রেক্ষাপট, মনস্তত্ত্ব আর অস্তিত্বের কন্ঠস্বর নিয়ে রক্তমাংসের ছবি হয়ে ওঠে। আমরা দেখি, ক্ষমতার লোভে অন্ধ বীরেন্দ্রকে, দেখি গ্রাম্য রাজনীতির নেতা জগন্নাথকে। দরিদ্র যুবক কবিকে। উর্জা আর রাজুর অফুরান প্রেম ও তার পরিণতিকে। অমোঘ এই টানে আমরা দেখি, লালু আর বিন্দিকে। জানি, কবিকে ভালবাসে জিনি। আর দেখি ঝিরিকুমারকে। কে এই ঝিরিকুমার? এছাড়াও কাহিনীর প্রবাহে একে একে উপস্থিত হয়, বিশু, গুরান, রতি, রিপা, মাধু, বাচ্চু, অঞ্জনা হাওয়াদাদু আর আরও অনেকে। আর জানতে পারি বহু বছর আগে হওয়া একটা খুনের কথা। যে খুন বদলে দিয়েছিল অনেক মানুষের জীবনের গতিপথ ও লক্ষ্য।
পড়তে পড়তে লেখকের কলমকে একসময় যেন নিজেই এক পথিক বলে মনে হয়, যে শূন্য পথ ধরে এগিয়ে চলে পাঠকের অন্তর্গত বিষাদের দিকে। প্রেমের, জীবনের, ক্ষোভের, লাঞ্ছনার মাঝে তিনি নিয়ে আসেন এক সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্য। ক্ষমতা, যৌনতা, শ্রেণী, লিঙ্গ ও নৈতিকতার জটিলতা - সবই নিপুণভাবে তিনি ছড়িয়ে রেখেছেন গল্পের সুতোয়।
তবু, এত কিছুর মধ্যেও শেষ পর্যন্ত এসে মনে হয় এই উপন্যাস আসলে মানুষের অসহায়তারই কথা বলে। মানুষ ভাবে, সে তার ক্ষমতায়, আগ্রাসনে, হিংসায়, বুদ্ধিমত্তায় পেয়ে যাবে সব কিছু। অধিকৃত করে নেবে যা কিছু সে চায়। কিন্তু সে শুধুই মানুষ। তাই সে পায়না কিছুই। এক মুঠো বালিও সে ধরে রাখতে পারেনা। আলো - ছায়ার জগতে নিঃস্ব, একাকী মানুষ হয়ে সে অপেক্ষা করে মল্লিকা ফুল ফোটার। "তোর আমার চাওয়ায় কিছু হবে না। যা হবার তাই হবে। যা হওয়ার তা হয়েই আছে। আমরা শুধু তার মধ্যে দিয়ে যাত্রা করছি মাত্র" - হাওয়াদাদুর বলা এই কথাই সে অনুভব করে ধীরে। আর ভাঙ্গাচোরা, নশ্বর সেই মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ঝরে পড়া মল্লিকাদের দিকে, তার শূন্য পথের দিকে - যে পথ তাকে নিয়ে যায় উত্তরণে। অন্ধকার থেকে আলোয়, বিচ্ছেদ থেকে প্রতিগ্রহণে, ঈশ্বরে, মুক্তিতে, প্রেমে।
বই : শূন্য পথের মল্লিকা লেখক : স্মরণজিৎ চক্রবর্তী প্রকাশনা : আনন্দ মূল্য : 600
সুস্থ ও সভ্য মস্তিষ্কের মাথায় সহ্য করা কঠিন, এমনই একটা বিকৃত সাহিত্যের বই "শূণ্য পথের মল্লিকা"।
পুরোটা দূর্বল গঠনের চটি বলতে গেলে, কোনো এক দায়ে শুধু পরিপক্ক চটি লিখতে পারেনি। ভাবি-দেবর, অন্যের স্ত্রীর সাথে রাজনীতির বস, অন্যান্য সাময়িক ও দীর্ঘ চরিত্রগুলোর মনোরঞ্জন, এগুলোর তাৎপর্য ফুটাতে গোপন ভাবে হলেও যেনো প্রকাশ্যে চটির মতো পরিবেশ তৈরি করেছে গল্পের ভিতর। goodreads এ রিভিউ ভালো পেয়ে নিয়েছিলাম, কিন্তু পড়া শেষে আমার বিবেকে বাঁধলো পশ্চিমবঙ্গের মানুষেরা বইয়ের বিষয়বস্তু গুলোকে কি করে এত্তোটা স্বাভাবিক করে চললো... আগেকার সময়ে টিভিতে ক্রাইম প্যাট্রোল আমরা অনেকেই দেখেছি, এখন নজর দিলে পার্থক্য পাই কাজের-বুয়ার পোষাক খুব খোলামেলা (আশপাশ বলা থেকে বিরত থাকলাম)। জি বাংলা অথবা এরকমই ধরণের আরো নানান আছে, সেগুলোর অতিরঞ্জিত ঘটনা কমেডির মতো। শুধু কমেডির লক্ষণটা বাদ দিয়ে ক্রাইম প্যাট্রোলের চেয়ে কয়েকগুণ-বেশি উত্তেজনা মূলক সুরসুরির প্রেক্ষাপট, দুইটাকে গুলিয়ে বানালে যে বজ্য উৎপাদন হয় সেটাই হচ্ছে "শূণ্য পথের মল্লিকা"।
তবে স্বীকার করছি সামাজিক ও রাজনৈতিক কিছু বিষয়ের সঠিক দৃষ্টান্ত বইটাতে লিখেছে। ব্যাপারটা হচ্ছে, "পানি তো পানিই যেটা উপকারী। কিন্তু ড্রেনের পানিতে যেসব রাসায়নিক পদার্থ থাকার কারণে অনুপযোগী হয়ে যায়, তাই বলে একান্ত পানির গুণটাকে লক্ষ্য করে বলতে পারি না যে - ড্রেনের হলেও এটার ভিতর পানির তরল উপস্থিত আছে তাই কিছুটা হলেও ব্যবহারের জন্য উপযোগী"। কিন্তু হ্যা বিশুদ্ধ করলে ড্রেনের পানিও উপযোগী হবে অবশ্য। তেমনই বইটা থেকে নষ্টামিগুলো বিশুদ্ধ করলে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ের সঠিক দৃষ্টান্তগুলোও মূল্যায়ন করা যাবে।
সাহিত্য শিল্পের নামে সুরসুরি মার্কা অশ্লীলতা। "দেবরের সাথে ভাবির অবৈধ সম্পর্ক এবংকি বাচ্চাও হয়েছে, স্ত্রীর আপন স্বামী বিষয়টা জানে। অন্যের বউয়ের ওপর কামনার দৃষ্টি বরং মেয়েটাও অনুমতি দেয়। হস্তমৈথুন করা"... মানে কি সব যা-তা লিখেছে! কোন দায়ে শুধু দূর্বল-চটি লিখেছে, পরিপক্ক চটি লিখেনি আরকি। উদাহরণ দিলে - "রতির দুটো বুক, মেঘ ভেদ করে ভেসে ওঠা চূড়ার মতো ভেজা শাড়ির মধ্য থেকে জেগে ছিল"। এখানে বুক বলতে কি বুঝিয়েছে, আর যাবতীয় বলাতে কি বুঝানো হচ্ছে এর-জন্য অধিকাংশ পাঠকেরা এখন কচি-খোকা নয়। উদাহরণে উল্লেখ করা বাক্যের চাইতেও আরো গম্ভীর ও তীব্র পর্যায়ের অনেক উক্তি আছে- "সবার মধ্যে বসেও 'ও' শক্ত হয়ে উঠত। কাঁধের ব্যাগটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে কোলের উপর রাখতে হতো ওকে"। বাক্যের মধ্যে শুরুতে 'ও' বলতে মূলত কি শক্ত হওয়াকে ইঙ্গিত করছে তা বুঝার বাকি নেই। "ব্লাউজ খুলে ফেললো/ স্খলন হওয়ার মুহূর্তে (অর্থাৎ বীর্য পরার আগে)", পুরো বই জুড়ে এসব আবোল-তাবোল লিখা। আমার ক্ষমতা থাকলে লেখকটাকে জুতা পেটা করে বিদায় করতাম সাহিত্য থেকে, জুতার মালা পরিয়ে ফ্রেম-বন্ধি দলিলের নজির রাখতাম।
গল্পের ছন্দে ও লেখন শৈলীর উপরোক্ত বাজে-হাল দেখে অন্যান্য রাজনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপটের মর্মার্থ আমার বোধে টিকেনি।
পাইরেটেড থাকতেও শখ-বসত ১০০০৳ দিয়ে অরিজিনাল এই বা* কিনেছি আমি। বিক্রেতা বইটার সম্পর্কে জানলে, আমি কিনে নিয়ে আসার সময় নিশ্চয়ই মনে-মনে আমার লক্ষ্যে তামাশা করেছে। বাংলাদেশের বিক্রেতারা কোন রুচিতে এমন বইয়ের পাইরেটেড প্রকাশ করছে! ছোট জাতের মানুষ হলো কি বংশগত, পারিবারিক ভাবে নাকি বন্ধুমহলের দোষে কিংবা আত্মকেন্দ্রিক বৈশিষ্ট্যে...তা কেই বা জানে!
🍁🌸সদ্য পড়ে শেষ করলাম প্রিয় লেখক স্মরণজিৎ চক্রবর্তী মহাশয়ের লেখা ‘শূন্য পথের মল্লিকা’ বইটি। লেখক এই উপন্যাসের কাহিনীকে চারটি ভাগে বিভক্ত করে ভীষণ সুন্দর ভাবে উপস্থাপনা করেছেন। উপন্যাস যখন-ই দীর্ঘ হয় সেখানে উঠে আসে অসংখ্য চরিত্র, যা এই উপন্যাসেও ব্যাতিক্রম হয়নি। উপন্যাসের মূখ্য চরিত্রে রয়েছে বীরেন্দ্র, ও কবি। কলকাতা শহরে বীরেন্দ্র একজন ক্ষমতাশালী ব্যক্তি। আর অন্য দিকে কবি গ্ৰাম থেকে উঠে আসা এক যুবক মাত্র, এর মাঝে রয়েছে উর্জা, রাজু, জিনি, বিন্দি, লালু, অঞ্জনা, হাওয়া দাদু, লীলা, জগন্নাথ, বিশু, ঝিরি, রিপা, শিউলি আরও অনেকেই......
🍁🌸'শূন্য পথের মল্লিকা' উপন্যাসে প্রত্যেকটি চরিত্রে মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় শূন্যতা। সেই সব চরিত্র-দের চলার পথে অল্প সময়ের জন্য হলেও ‘মল্লিকা’ এসে আবার ও শূন্য পথেই রেখে গিয়েছে তাদের জীবনকে! আর উপন্যাসের মধ্যে লেখক ‘ছত্রে ছত্রে ফুটিয়ে তুলেছেন গভীর জীবনবোধ’। সেই সাথে মিশে রয়েছে রাজনীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহার, যা এই উপন্যাসের কাহিনী কে এগিয়ে নিয়ে চলে.......
🍁🌸উপন্যাসের শুরুটা হয় গ্রাম থেকে, সেই গ্রামের নেতা হলো জগন্নাথ। এই জগন্নাথ খুন হয়ে যায়। আর এই একটি খুনের প্রমাণ না রাখতে গিয়ে খুন হয় আরও এক ব্যক্তি। আর সেই গ্ৰাম থেকেই উঠে আসে কবি, কবি কে এই গল্পের মূল নায়ক ও বলা যায়। কবি গ্ৰাম থেকে চলে আসে কলকাতায় কাজের জন্য। এরপর বীরেন্দ্রের বাড়িতে কাজ ও পেয়ে যায়। যেহেতু বীরেন্দ্র একজন ক্ষমতাশালী নেতা, তাই তার বাড়িতে সারাক্ষণই কাজের জন্য কিছু লোক উপস্থিত থাকে। আর সেই সব উপস্থিত থাকা চরিত্র-দের নিয়েই উপন্যাস সমান তালে এগিয়ে চলে বিভিন্ন টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে....
🍁🌸এখানে দেখা যায় বীরেন্দ্রের মেয়ে উর্জা, তার প্রেমিক রাজু ও তাদের প্রেমের ভয়ানক পরিনতি। সেই সাথে দেখা যায় কাজের লোক লালু, ও তার প্রেমিকা অঞ্জনা এদের জীবন বয়ে চলে অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে.... লালু চেষ্টা করে পরিস্থিতি পরিবর্তনের, লালু কি পারবে এই অদ্ভুত পরিস্থিতি থেকে বেড়িয়ে নতুন জীবনে প্রবেশ করতে? এদিকে ইউনিভার্সিটিতে পড়া জিনি ভালোবেসে ফেলেছে কবিকে, সেই কথা জিনি কবি-কে জানিয়েছে। কিন্তু কবি এতোটাই চুপচাপ যে কোনো প্রতিক্রিয়া-ই দেয়নি। কবি মনে মনে ভালোবেসে ফেলেছে উর্জা-কে, শেষ পর্যন্ত এই ত্রিকোণ প্রেমের পরিণতি কেমন হবে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে অবশ্যই উপন্যাসটি পড়তে হবে.......
🍁🌸উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, সমস্ত চরিত্রই যে টানাপোড়নের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে শেষে এসে সবাই শূন্য পথেই ফিরেছে। দীর্ঘ ৩৮৭ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসে লেখক তুলে ধরেছেন সম্পূর্ণ নিজের কল্পনাকে..... এই উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা অবশ্যই মিলে যায় উপন্যাসের শেষে এসে। আসলে এটি একটি সাধারণ মানুষদের নিয়ে লেখা রাজনৈতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রেম, সম্পর্কের টানাপোড়েন , আশা - আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গড়ে তোলা এক অনন্য কাহিনী। মানুষের মনের বিভিন্ন স্তরগুলো নিয়ে যে জীবনবোধের বিবরণ দিয়েছেন সত্যিই অকল্পনীয়!
"শূন্য পথে কার জন্য ঝরে পড়ছে মল্লিকা? কেউ কি আসবে? নাকি এসেছিল কেউ অলক্ষ্যে? সে-ই চলে যাওয়ার সময় ফুলে ফুলে রেখে গিয়েছে তার চিহ্ন! অলক্ষ্যে কত কী যে ঘটে যায় জীবনে! কত কে যে আসে, আবার চলে যায় কত কত মানুষ! সব আসা কি আমরা বুঝতে পারি? নাকি মেনে নিতে পারি সব চলে যাওয়া?? তবু জীবন চলে। ওই পথের বাঁক ঘুরে কেউ আসবে এই ভরসায়, এই আনন্দে একটা করে দিন পার করে মানুষ। বেঁচে থাকে সব সহ্য করে..."
মানুষের মন বড়ই বিস্ময়কর। সে যতই নিজেকে সময়ের কাছে সমর্পণ করতে চায়, তবু তার ভিতরে জমে থাকে বহু অচেনা আলো-ছায়া। কিছু স্মৃতি সে মুছে ফেলতে চায়, অথচ পারে না; কিছু মানুষকে সে আঁকড়ে রাখতে চায়, অথচ ধরে রাখার ক্ষমতা তার নেই। জীবনের পথে হাঁটতে হাঁটতেই সে টের পায়—ঝরে পড়া মল্লিকার মতো সময়ও নিঃশব্দে রেখে যায় কিছু চিহ্ন, যা তাকে অকারণে স্নিগ্ধ করে, আবার শূন্যও করে দেয়।
উপন্যাসের প্রথম পাতাতেই লেখক যে টানের কথা বলেন—সে অদ্ভুত, ব্যাখ্যাতীত টান—তা যেন মহাজগতের হৃদস্পন্দন। তারার নিভে যাওয়া আর জ্বলে ওঠার আলোয় জন্ম নেয় যে রহস্যময় আকর্ষণ, সেটিই এই বইয়ের রক্তস্রোত। চরিত্রেরা যেন অপ্রাপ্তি, অগ্নিদাহ, আকাঙ্ক্ষা আর দুর্বোধ্য প্রেমের অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা।
উপন্যাসটি এগোয় তিনটি সময়কে কেন্দ্র করে—১৯৯৫, ২০০০, ২০২০। এই তিন সময় যেন নদীর তিন ঘাট: একটিতে আলো, অন্যটিতে হাওয়ার নরম স্পর্শ, আর শেষটিতে সন্ধ্যার দোলাচল। এই ঘাটগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে বীরেন্দ্র, জগন্নাথ, কবি, উর্জা, রাজু, বিশু, গুরান, রতি, রিপা, বাচ্চু, মাধু এবং ঝিরিকুমারের মতো আরও কত নামহীন চেনা মুখ। প্রত্যেকে বহন করে নিজের ক্ষত, নিজের ইচ্ছা, আর এক পুরনো খুনের ছায়া, যা নিঃশব্দে বদলে দিয়েছে তাদের জীবন।
লেখকের ভাষা কোথাও তাড়াহুড়ো করে না। এটি হাঁটে—ধীরে, নিঃশব্দে। প্রেমের ক্ষত, ক্ষমতার ধুলো, অবহেলার বৃষ্টি—সবকিছুকে তিনি ছুঁয়ে দেখেন গভীর মানবিকতা দিয়ে। কখনো রাজনৈতিক, কখনো দার্শনিক, আবার কখনো কেবল একজন মানুষের দীর্ঘশ্বাসের মতো।
শেষমেশ গল্প এসে দাঁড়ায় মানুষের চিরন্তন অসহায়তার সামনে। মানুষ ভাবে, তার শক্তিই তাকে কাঙ্ক্ষিত সবকিছুর কাছে পৌঁছে দেবে; অথচ শেষ পর্যন্ত সে নিজের দুই হাতে বালুকণা ধরে রাখারই চেষ্টা করে। আলো ও অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করে একটিমাত্র ফুলফোটার মুহূর্তের—যা তাকে আবার বাঁচতে শেখাবে।
হাওয়াদাদুর বলা সেই চিরাচরিত সত্য— “তোর আমার চাওয়ায় কিছু হবে না। যা হবার তাই হবে। যা হওয়ার তা হয়েই আছে। আমরা শুধু তার মধ্যে দিয়ে যাত্রা করছি মাত্র।” গল্পের শেষে এটি পাঠকের মনে জেগে ওঠে এক নীরব উপলব্ধি হয়ে। ঝরে পড়া মল্লিকার পথেই মানুষ খুঁজে পায় মুক্তির দরজা, অন্ধকার থেকে আলো, বিচ্ছিন্নতা থেকে ফিরে আসা, এবং শেষমেশ এক পুনরুদ্ধারকৃত, অনিবার্য প্রেম।
কিছু কিছু বই থাকে যেগুলি পড়ার পরে , সেগুলিকে প্রকাশ করার কোন ভাষা সেভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। এটি তেমনি একটি বই। বইটির সূত্রপাত হয় মুক্তদহ নামক গ্রামের রাজনৈতিক পটভূমিকে কেন্দ্র করে মুক্তদয়ের রাজনৈতিক দলীয় নেতা নেতা জগন্নাথ খুবই বিখ্যাত ছিল সে থাকাকালীন সেখানে অন্য কোন দল কোনভাবেই রাজনৈতিক শক্তিতে বলিয়ান হতে পারত না তাই পরিকল্পনা করে তারই খুব কাছের মানুষেরা তাকে খুন করে, অন্যদিকে বিরোধী দলের এক উঁচু মাপের নেতা কলকাতা থেকে মুক্তদহে আসে নিজের দল প্রতিষ্ঠা করতে সেখানে সে না চাইতেও জড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত সম্পর্কের। তার প্রায় অনেক বছর পর কবি তার মায়ের কথামতন মুক্তদহ থেকে আসে কলকাতায় এক শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের নেতা বীরেন্দ্রর কাছে কাজের জন্য এবং খুব অদ্ভুতভাবেই কোন কিছু জিজ্ঞেস না করে বীরেন্দ্র তাকে কাজে নিয়ে নেয় এবং তার সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে তাকে থাকার জায়গা দেয়। এরপর এই সার্ভেন্ট কোট এর কিছু চরিত্র উপন্যাসে নিজেদের মতন করে আবর্তিত হতে থাকে। সেই সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে পরিচিয় হয় কবির বীরেন্দ্রর কেয়ারটেকারের মেয়ের জিনির সাথে, জিনি তাকে পছন্দ করে জেনেও কবি কোনোভাবেই তার প্রস্তাবে মেনে নিতে পারে না অন্যদিকে বীরেন্দ্রের একমাত্র মেয়ে ঊর্জাকে কোনভাবেই বিয়েতে রাজি করাতে পারে না কেন? কবি কেন সব বুঝেও যিনি থেকে দূরত্ব রেখে চলে কবি কার চোখে নিজের সর্বনাশ দেখতে পেয়েছে ?বা রাজু কি কখনো নিজে�� মতন করে সৎ ভাবে রাজনীতি করতে পারবে? কবিকে কেন বীরেন্দ্র কোন প্রশ্ন না করেই কাজে নিয়েছিল? এই প্রশ্নের সব উত্তর আছে এই উপন্যাসে। এই গেল উপন্যাসের কথা এবার আসা যাক উপন্যাসটি পড়ে আমার কেমন লাগলো ,বর্তমান পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে এবং বর্তমান সমাজের অনেক সমস্যার প্রেক্ষাপটে উপন্যাসটি লিখেছেন এবং সত্যি বলতে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে বাকিটা আপনাদের উপর। তাদের পড়া হয়ে গেছে জানাবেন কেমন লেগেছে
আজ প্রেমের দিন,আজ ভালোবাসার দিন।তাই আজই শেষ করলাম 'শূন্য পথের মল্লিকা'। স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর উপন্যাস মানে একটা অদৃশ্য ভালোলাগা ঘিরে ধরবে চারিপাশ থেকে,ভালোলাগার পাশাপাশি থাকবে গলায় আটকে যাওয়া দলাবদ্ধ এক কান্নার রেশ।
আমাদের জীবন শূন্য থেকে শুরু আবার শূন্যতেই শেষ। এই যাত্রাপথে ঝড়ে পড়ে ফুল,কাঁটা আরও কত কিছু অথচ লেখক বেছে নিলেন মল্লিকা ফুলকে।পথে ছড়িয়ে পড়ে মল্লিকা,চারিদিক ভেসে যায় সু-ঘ্রাণে; সেভাবে ভেসে যায় মানুষের জীবন। আমরা আসলে নিজেরাও জানি না আমরা কীভাবে মায়ায় জড়িয়ে পড়ি,ভালোবাসি,পুরনো যন্ত্রণাকে দূরে সরিয়ে আবার ভালোলাগায় ভেসে যেতে চাই।কিন্তু সেসব চাইলেই তো হয় না,জীবন তো সহজ না।এখানে কত না পাওয়া,কত হারিয়ে যাওয়া মানুষ আছে, কত ভালোবাসার ঘৃণাতে পরিণত হওয়া আছে তবুও তো অন্তত জাগে।আমাদের চোখ থেকে টুপ করে জল পড়ে, আমরা বুঝি আমরা আজও মানুষই। গল্পের পথ ধরে আসে অনেক চরিত্র।দুটো সময়কালের রেখে ধরে জগন্নাথ,লীলা,বীরেন্দ্র,বিশু,শিউলি, হাওয়া দাদু,বাচ্চু প্রমুখের হাত ধরে একে একে কবি,জিনি,বিন্দি,লালু,অঞ্জনা, ঝিরি,রিপা আরও কত কে আসে! মানুষ পাশাপাশি থেকেও কি কাছাকাছি থাকে?মানুষ দূরে দূরে থাকেও কি দূরেই থাকে? প্রত্যেক মানুষের একটা আলাদা করে শূন্য পথ থাকে,সেই পথে থাকে মল্লিকা ফুল।একজনের শূন্যপথ মিশে যায় আরেকজনের শূন্য পথে যেভাবে উর্জার পথ মিশে যায় রাজুর পথে। তবুও মানুষ পাশবিক হয়,মানুষ ক্ষমতার জন্যে ভুলে যায় সব কিছু!মানুষ মানুষকে মারে,মানুষ মানুষকে ন্যুনতম মূল্যটুকু দেয় না,জাতপাত নিয়ে অহংকারে মানুষ ভুলে যায় সে মানুষ আসলে।
তবুও মহাকাব্যের পথ জুড়ে ছড়িয়ে থাকে না না শূন্য পথ! কারোর শূন্য পথের সাথী হয় অন্য কেউ,কারোর শূন্য পথ জুড়ে শুধুই না ছোঁয়া মল্লিকা। উপন্যাসের শেষ অংশ মিশ্র অনুভূতি দেয়।প্রেম আসলে কী?ভালোলাগার অনুভূতি নাকি আরও অন্য কিছু?মানুষ কেন মানুষের জন্যে আকুল হয়,মানুষ কেন মানুষের জন্যে ঝুঁকি নেয়?কেনই বা প্রাণ ও দিয়ে দেয় পথের শেষে? এ গল্প আসলে কার?শুধুই চরিত্রদের?নাকি আমাদের সবার যারা আজও ভালোবাসতে চাই।
Smaranjit Chakraborty’s শূন্য পথের মল্লিকা is a meditative and emotionally resonant journey through the lanes of longing, loss, and fragile human connection.
a political thriller, where human emotions and aspirations interspersed in between. people of Bengal who are acquainted with the horrors of politics will certainly relate to it.