চরের নাম কেন্দুখালি। তার চারদিক ঘিরে বয়ে চলেছে গড়খালী নদী। সে নদীর দুই তীরে ঘন জঙ্গল। বিস্তৃত বনভূমির আকাশে ঝুলে থাকা পূর্ণিমার চাঁদের আলো গলে গলে পড়ছে যেন। চর, নদী আর নদী-তীরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষরাজির ওপর। মৃদু হাওয়া দিচ্ছে। সে হাওয়ায় মিশে আছে কেমন এক ধরণের আদিম সুবাস। এই সুবাস বনভূমির একান্ত নিজের। ভয় ধরানো। আবার, ভীষণ মোহময়। একবার যে এই মোহে আটকাবে, সে এই জল-জঙ্গল ছেড়ে আর কোথাও থিতু হতে পারবে না। অশরীরী কোনো সত্তা যেন তাকে চুপিসারে ডাকবে। আহ্বান করবে। অরণ্যের এই ডাক উপেক্ষা করা সাধ্যতীত।
'চন্দ্র চন্দ্র খুঁজে ফিরি' সুন্দরবন অঞ্চলে প্রচলিত একটা কিংবদন্তিকে ঘিরে লেখা দেখেই পড়ার আগ্রহ হয়েছিল। গাজী-কালু আর রাজা দক্ষিণ রায়ের কর্মকান্ড নিয়ে আমি সম্যক অবগত - যেহেতু এইসব আমার খুলনায় কাটানো শৈশবের দিনগুলোকে রঙিন করেছিল। বাঘের থাবায় মুখের এক পাশ নেই হয়ে যাওয়া ভিখিরিকেও দেখেছি বাসায় আসতে এক কালে। তবে যত দিন গেছে, বন আর বনের মানুষ থেকে আমরা দূরে সরে গেছে নাকি বন নিজেই ঢুকে গেছে সভ্যতার নাগাল ছেড়ে আরও গহনে - জানি না।
এই বইটা কিছু সময়ের জন্য হলেও আমাকে সেই মায়াবনের বিবিধ প্রান্তে টেনে নিয়ে গেলো। আগ্রহ জাগিয়েছে প্লট, থ্রিলার হিসেবে শেষ অঙ্কে বিশেষ গড়বড় হয় নাই। ন্যারেটিভের গড়ন ও ধরণ নিয়ে ভূমিকায় লেখক শাহরিয়ার জাওয়াদের একটা সৎ স্বীকারোক্তি ছিল, সে জন্যও ধন্যবাদ পাবেন তিনি।
চরিত্র নির্মাণের স্বকীয়তা, আঞ্চলিক ভাষার নিট ব্যবহার, সংলাপ - এসব জায়গায় কিছু সমালোচনা রইলো। আগামীতে শ্রাগের ব্যাপারটা ছেঁটে ফেলতে পারলেও ভালো লাগবে।
আরেকটা বিষয়, অহেতুক ডেটা ডাম্পিং এর প্রবণতা কম লেখকের, এটা প্রশংসার দাবি রাখে। প্রচ্ছদটা চমৎকার, টানে।
শাহরিয়ার জাওয়াদ ভার্সেটাইল একজন লেখক৷ এর আগে উনার লেখা নীল পৃথিবীর তরে পড়েছিলাম৷ ছিমছাম, উপভোগ্য উপন্যাসিকা৷ এটা অবশ্য আরেকটু বিস্তৃত আকারে৷ সুন্দরবনের পটভূমিতে মিথলজি আর রহস্যের মিশেলে একটা উপন্যাস৷ লেখনভঙ্গী সাবলীল, জড়তাহীন, মেদহীন৷ বেশ কেটেছে সময়টা৷ রিকমেন্ডেড৷
Yeah it totally felt like someone read some lore about Sundarban and tried to come up with something... and whatever the result turned out to be, 'Sundarban' was missing from it. এই গল্পটারে তুলে নিয়ে যে কোথাও বসায়ে দেন, চাই কি মায়ানেকড়ে'র ইওরোপেই, মানায়ে যাবে। কারণ গল্প আদৌ সুন্দরবনের প্রেক্ষাপটে গ্রাউন্ডেড-ই না, অথেন্টিক ফিল হয় না।
গল্পে থ্রিল ছিল। ঊর্ধ্বশ্বাসে পড়ে যেতে পেরেছি সেজন্য। 'পড়ার মতো' বিশেষ কিছু ছিল না এটাও কারণ। না সংলাপ, না চরিত্রায়ণ, না দৃশ্য নির্মাণ। মায়ানেকড়ে'র মিথ আর পুঁথির কাহিনী চয়ন বাদে লেখকের কন্ট্রিবিউশন কী ছিল, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
সুন্দরবন সম্বন্ধে ধারণা না রাখা শিশু-কিশোরদের ভালো লাগতে পারে। A good book in that regard.
হারাধন মালো ও তার দল সুন্দরবনের গভীর এক এলাকার নদীতে মাছ ধরছিলো। মাছও পাচ্ছিলো প্রচুর। হারাধনের তো বটেই, তার দলের সবারও মনে ভীষণ ফুর্তির ভাব। সেই ভাবটা কেটে যেতেও অবশ্য সময় লাগলো না। হঠাৎ-ই তারা নদীর জঙ্গলাকীর্ণ তীরে আবিস্কার করে ভ'য়'ঙ্ক'রভাবে আ'হ'ত এক মানুষকে। মানুষটার দেহের ক্ষ'তগুলো দেখে পরিস্কার বোঝা গেলো, বাঘে ধরেছিলো তাকে। কপালগুণে বেঁচে ফিরেছে।
আহত লোকটার নাম ছকু মিয়া। সুন্দরবনের এই এলাকার আশেপাশের লোকেরা তাকে চেনে ছকু পাইলট নামে। লোকটা সুন্দরবনের একজন দক্ষ ট্র্যাকার হিসেবে সুপরিচিত। নির্ভীক আর বুদ্ধিমান এই ছকু পাইলট বাঘের হাত থেকে বেঁচে ফিরে একটা অদ্ভুত গল্প শোনালো। যে গল্পের বাঁকে বাঁকে মিশে আছে পৈ'শা'চি'ক:তা আর র'ক্তে'র হো'লি'খেলা। সেই সাথে আছে এক ব্যাঘ্রদেবতার উল্লেখও।
ছকু পাইলটকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও নিখোঁজ হয়ে গেছে চারজন লোকসহ একটা আস্ত ট্রলার। এগুলোর সবই কি বাঘের কাজ? ব্যাপারটার তদন্তে নামলো এসআই মনসুর আলি। কনস্টেবল আনিসকে নিয়ে তিনি চষে বেড়াতে লাগলেন সুন্দরবনের নির্দিষ্ট একটা এলাকা। এদিকে মা'নু'ষ'খে'কো বাঘটার উৎপাত কিন্তু থেমে নেই। মাঝেমাঝেই নিরীহ মানুষজনের ওপর ঝাঁ'পি'য়ে পড়ছে ওটা। সুন্দরবনের এই অঞ্চলটা জুড়ে ওটা কায়েম করেছে আ'ত'ঙ্কে'র রাজত্ব।
উঠতি লেখক সিরাজুল হক এসেছে সুন্দরবন ঘুরে দেখতে। মূল উদ্দেশ্য লেখালেখির প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করা। ঘটনাচক্রে সিরাজ আর তার গাইড বানেশ্বরও জড়িয়ে পড়লো সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনের এই অঞ্চলে ঘটে চলা অদ্ভুত আর নৃ'শং'স ঘটনাগুলোর সাথে। এসআই মনসুরের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সিরাজও লেগে পড়লো রহস্যের সমাধানের খোঁজে। প্রাচীন কিংবদন্তি আর বর্তমান সময়ে ঘটে চলা ঘটনাগুলো কি এক রেখায় এসে মিলবে? সেটা সময়ই বলে দেবে।
মাঝে মাঝে আমি একদম ব্লাইন্ডলি কিছু বই কিনি। মানে, একদম সাতপাঁচ কিছু না ভেবে, বইটা সম্পর্কে কিছু না জেনে - জাস্ট কিনে ফেলি। হয়তো প্রচ্ছদ ভালো লেগেছে, শুধু এই জন্যে। 'চন্দ্র চন্দ্র খুঁজে ফিরি' আমার এমন ব্লাইন্ডলি কেনা একটা বই। বইমেলার পরপর বইটা কিনেছিলাম। আজ পড়ে শেষ করলাম। আর বইটা শেষটা করলাম একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে।
সুন্দরবনকে উপজীব্য করে শাহরিয়ার জাওয়াদের লেখা 'চন্দ্র চন্দ্র খুঁজে ফিরি' মূলত একটা সুপারন্যাচারাল থ্রিলার উপন্যাস। এর মূল কাহিনির সাথে তিনি সংযোগ ঘটিয়েছেন গাজী-কালু, বনবিবি আর রাজা দক্ষিণ রায়ের মিথ যা আবহমান কাল ধরে ভাটি অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। সেই সাথে সুন্দরবনের প্রেক্ষাপটে তিনি বলার চেষ্টা করেছেন একটা অতিপ্রাকৃত কাহিনি যার সাথে সম্পর্ক আছে একটা ওয়েস্টার্ন লিজেন্ডেরও। পশ্চিমা দেশগুলোতে যাকে বলা হয় ওয়্যারউলফ, সুন্দরবন অঞ্চলে তা হয়ে গেছে মায়াবাঘ। এই বিচিত্র ধরণের প্লটটার কারণে 'চন্দ্র চন্দ্র খুঁজে ফিরি' পড়তে গিয়ে বেশ উপভোগ করেছি আমি। তবে মায়াবাঘের কনসেপ্টের চেয়ে আমাকে যেটা বেশি আনন্দ দিয়েছে সেটা হলো শাহরিয়ার জাওয়াদের সৃষ্টি করা 'Whodunit' (ডিটেকটিভ উপন্যাসে 'খু'নি কে') টাইপ সাসপেন্স। একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমাকে এই সাসপেন্স আর মিস্ট্রিটাই টেনে নিয়ে গেছে।
শাহরিয়ার জাওয়াদের গল্প বলার ধরণ চমৎকার। সুন্দরবন নিয়ে লেখার আগে তিনি এর ইতিহাস, বিভিন্ন মিথ আর এর আশেপাশের মানুষদের কালচার সম্পর্কে বেশ ভালোভাবেই স্টাডি করেছেন। আর এই ব্যাপারটা 'চন্দ্র চন্দ্র খুঁজে ফিরি' পড়লে মোক্ষম বোঝা যায়। নির্মেদ, ঝরঝরে ঢঙে তিনি গল্প বলে গেছেন। সব মিলিয়ে উপন্যাসের প্লটটার এক্সিকিউশন ছিলো চমৎকার। পড়তে ভালো লেগেছে। এর ক্লাইম্যাক্সটাও বেশ ভালো লেগেছে আমার। কিছুটা সিনেম্যাটিক মনে হলেও মোটের ওপর স্যাটিসফেকশন এসেছে শেষে।
কিছু ভুল বানান লক্ষ্য করেছি বইটা পড়তে গিয়ে৷ যেমন বুঝতে পারা-কে বোঝতে পারা, সায় দেয়া-কে সাঁই দেয়া, সুনসান-কে সনসান, বিস্ফারিত-কে বিস্ফোরিত - এমন লেখা হয়েছে। এক/দুই জায়গায় সিরাজুল হক হয়ে গেছে সিরাজুল ইসলাম। ভবিষ্যতে এই ভুলগুলো শুধরে নেয়া হবে আশা করি। 'চন্দ্র চন্দ্র খুঁজে ফিরি' ভালো লাগায় শাহরিয়ার জাওয়াদের অন্যান্য ��ইগুলোও কখনও পড়ার ইচ্ছা রাখি সামনে।
যে জন্য বইটার প্রতি আমি আগ্রহী হয়েছিলাম সেই প্রচ্ছদটাও অসাধারণ লেগেছে, এটা বলাই বাহুল্য। মাহাতাব রশীদের আরো একটা চমৎকার কাজ। 'চন্দ্র চন্দ্র খুঁজে ফিরি' পড়ে ফেলতে পারেন। রিকমেন্ড করছি।
সচরাচর একদম নতুন, অপরিচিত লেখকদের বই নিয়ে মনের ভেতর কেমন জানি একটা খুঁতখুঁত কাজ করে।এই বইটি নিয়েও তেমন টাই লাগছিল।তবে মনে কোথাও একটু আশা ছিলো যে এত ভালো ভালো রিভিউ পাচ্ছি নিশ্চয়ই ভালোই হবে।এবং হয়েছেও তাই। সুন্দরবনের পটভূমি তে লেখা এই গল্পের শুরুটাই হয় একটা দেশীয় লোকগাঁথা দিয়ে এভাবেই একে একে আসে এডভেঞ্চার,থ্রিলার, রহস্য সবকিছু! এত কিছুর মিশেল থাকা সত্তেও কোথাও একফোঁটাও বিরক্তি আসে নাই। কোথাও একদমই অতিরঞ্জিত মনে হয় নাই,কোনো চরিত্র কেই অহেতুক লাগে নাই।বরঞ্চ মাথায় যে সকল প্লট ক্রিয়েট হচ্ছিল,যা যা প্রেডিক্ট করছিলাম আস্তে আস্তে যখন দেখছি নাহ মিলছে নাহ,তখন পড়ার আগ্রহ যেন আরোও বেড়ে গেলো।এন্ডিং এর সাসপেন্স টা তো অসাধারণ!শেষটুকু একদমই প্রেডিক্ট করতে পারি নি।আর এই জন্যই বইটি অবশ্যই পাঁচ তারকা ডিজার্ভ করে।এই ম্যাজিক রিয়েলিজম আর সাসপেন্স এর মধ্যে সুন্দরবন এর যে প্রাকৃতিক দৃশ্য লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন তার কারণে এখন ইচ্ছা করছে আঠারো ভাটির দেশ টা একবার ঘুরে আসতে।
বন জঙ্গল - সুন্দরবন এসব আমাকে খুব টানে, পড়তে বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করি। তাছাড়া লেখকের লেখার হাত যথেষ্ট ভালো ছিল। তাই পুরো গল্পটা তরতর করে পড়ে ফেলেছি। কাহিনী বেশ গতানুগতিক। তবুও লেখার গুণে বেশ উপভোগ করেছি।
নতুন পাঠক হিসেবে এরকম অতি প্রাকৃতিক বই পড়ে খুব ভালো লেগেছে। এটা আমার পড়া দ্বিতীয় অতিপ্রাকৃতিক বই, প্রথমটা ছিলো আরণ্যক। অল্প পেজে এমন সুন্দর উপন্যাস পরে যেনো আরো বেশি ভালো লেগেছে।
নতুন লেখকদের বই পড়ার ক্ষেত্রে আমার মাঝে এক ধরণের শঙ্কা কাজ করে। শঙ্কাটা সময় অপচয়ের, অর্থেরও। যদিও শাহরিয়ার জাওয়াদের আগের বইগুলোর মতো এই বইও সেটা উতরে গেছে, খুব ভালোভাবেই। ‘চন্দ্র চন্দ্র খুঁজে ফিরি’কে একটা ভালো বই-ই বলা যায়। ভালো বইয়ের ব্যাখ্যা অনেকে অনেকভাবে দেন। আমার কাছে সেটিই ভালো বই, যা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠকের আগ্রহকে বেঁধে রাখে এবং পাঠক যে আগ্রহে গল্পে প্রবেশ করে, তা শেষ পর্যন্ত মুগ্ধতায় পরিণত হয়।
‘চন্দ্র চন্দ্র খুঁজে ফিরি’ বইয়ের ঘোষণা আসার পর থেকেই বেশ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। কেননা শুনেছিলাম, বইটা সুন্দরবনের একটা লোকগাথার উপর ভিত্তি করে লেখা। সুন্দরবন নিয়ে আমার আগ্রহ সেই ছোটবেলা থেকে। ছোটবেলায় দেখেছি, আমাদের এলাকার একজন সুন্দরবনে বাঘের মুখ থেকে বেঁচে ফিরে এসেছেন। তার মুখ থেকেই শুনেছি তার বীরত্বের কথা। ডান হাতের কবজি আর কাঁধের খানিকটা মাংস চলে গেলেও তিনি দিব্যি বেঁচে ফিরেছেন। রাতারাতি আছর উদ্দীন মুন্সী থেকে তার নাম হয়ে যায় বাঘা মুন্সী।
গল্পের শুরুটা হয় নড়াইল থেকে সুন্দরবনে মাছ ধরতে আসা একদল মালোদের দিয়ে। আড়পাঙাসিয়া নদীতে তারা নৌকা ছোটায়। ভোঁদড় দিয়ে এক বিশেষ পদ্ধতিতে মাছ ধরে। মালোরাই বনের ভিতর থেকে ক্ষত-বিক্ষত এক লোককে উদ্ধার করে। সেই লোক আর কেউ নয়, চাঁদনীমুখা গ্রামের ছকু মিয়া। যাকে সবাই ছকু পাইলট নামেই চিনে। ভয়ডরহীন ঝানুলোক ছকু পাইলটের কাজ ইঞ্জিন নৌকা চালিয়ে বনজীবীদের নিয়ে সুন্দরবনের গভীরে যাওয়া। এ কাজে সে বেশ পারদর্শী। সেই ছকু পাইলট সারা শরীরে বাঘের কামড় আর আঁচড়ের দাগ নিয়ে ফিরে এসেছে, তাও আবার অন্যের নৌকায় চড়ে। তার সারা শরীর কাঁপছে। বিড়বিড় করে বলছে, “বনের জিনিস বনে ফেরত গেছে। বাঁদাবন তার বলি নিছে।” মূলত এখান থেকেই মায়াবাঘের টার্ম শুরু হয়। এরপর এক এক করে গল্পে প্রবেশ করে স্থানীয় থানার এস আই মনসুর আলি, গল্প খুঁজতে সুন্দরবনে ঘুরতে আসা তরুণ লেখক সিরাজুল হক। এক এক করে মায়াবাঘের আক্রমণে মারা যায় গ্রামের কয়েকজন। এস আই মনসুর খুঁজতে থাকে এইসব মৃত্যুর রহস্য, সিরাজুল হক একটা দারুণ গল্প।
গল্পের মাঝে লেখক সুন্দরবনের লোকগাথার সাথে পশ্চিমা লোকগাথার গিট বেঁধেছেন। গল্প এগোনোর সাথে সাথে সেই গিঁট আর ছুটেনি, বরং আরও মজবুত হয়েছে। আর শেষটা হয়েছে বেশ গোছানো। এই বইকে হরর, থ্রিলার, অ্যাডভেঞ্চার কিংবা গোয়েন্দা কাহিনী যেকোনো ক্যাটাগরিতেই ফেলা যায়। অল্প স্বল্প ম্যাজিক রিয়েলিজমও বিদ্যমান।
গল্পে লেখক সুনিপুণ ভাবে সুন্দরবনের বর্ণনা দিয়েছেন। পড়তে পড়তে যে কেউ আড়পাঙাসিয়া নদীতে নৌকা চালাবে, জয়ন্তর মতো অবাক দৃষ্টিতে দেখবে সুন্দরবনের প্রকৃতি। তবে গল্পটা বনের চেয়ে বেশি শহুরে হয়ে গেছে। আঞ্চলিক ভাষায় ব্যবহার আরও ভালোভাবে করতে হতো। নীলডুমুর বাজারের নৌ পুলিশ কার্যালয়ে এস আই মনসুর যখন ছকু পাইলটের জবানবন্দি নিচ্ছিলো, তখন তাদের কথা শুনে মনে হচ্ছিলো তারা সাতক্ষীরায় না, ঢাকায় বসে কথা বলছে, প্রমিত বাংলা ভাষায়। এস আই মনসুরের কথায় আঞ্চলিক টান থাকবে না, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ছকু পাইলটের কথা শুনে কিছুতেই বোঝার উপায় নেই, সে একজন ইঞ্জিন নৌকার মাঝি। হোক সে এইট পাশ কিংবা যতই সরকারি ট্রেনিং করে থাকুক, একজন মাঝির কথা এতটা শুদ্ধ হবে না। আঞ্চলিক টান থাকবেই।
গল্পের শুরু থেকেই একটা নারী চরিত্রের অভাববোধ করেছি। বনবিবি নিজেই নারী শক্তির প্রতীক তাই একটা শক্তিশালী নারী চরিত্র আশা করেছি। সেই নারী চরিত্র পেয়েছি অর্ধেক গল্পের পর, খুব অল্প সময়ের জন্য। ছকু পাইলটের স্ত্রী কুলসুম। অল্প সময়েই এই চরিত্রটি বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। হাতে বটি নিয়ে একাই লড়াই করেছে মায়াবাঘের সাথে। এই লড়াই যতটা না নিজেকে বাঁচানোর, তারচেয়েও বেশি স্বামী হত্যার প্রতিশোধের।
গল্পে লেখক একটা জিনিস মিস করে গেছেন। বাঘের আক্রমণ বেড়ে গেলে বনজীবীরা বনবিবি বা বনদেবীর পূজা দেয়। এই কালচার অনেক দিনের। এই পূজা দেওয়ার বিষয়টা গল্পে দেখানো যেত।
শাহরিয়ার জাওয়াদের গল্প বলার ধরন খুব ভালো। তিনি কোনো বিষয় ধরলে খুব গভীর থেকে ধরেন। আর উপস্থাপনও হয় চমৎকার। যার ফলে তার গল্প হয় সুখপাঠ্য। ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরা কিংবা নদীতে নৌকা চালানোর সময়ের পরিবেশ, প্রত্যোকটা ছোট ছোট বিষয় বেশ দারুণভা��ে বর্ণনা করেছেন। উপমা ব্যবহার করলে পড়তে আরেকটু আরাম লাগতো। ‘শ্রাগ করা’ শব্দ ব্যবহারের বহুলতা দেখা গেছে।
তবে সবকিছু মিলিয়ে, ‘চন্দ্র চন্দ্র খুঁজে ফিরি’ একটা ভালো বই। একটা ভালো সময় কাটালাম।
"প্রথমে আইল বাঘ নাম রূপচান্দা। সমুখের দাঁত তার সোনা দিয়া বান্ধা মারিয়া বনের হাতি যার ঘর বক্ষ। রাক্ষস পালায় ডরে কিবা ডানা দক্ষ কাশুয়া বাঘের মাশুয়া বেশ কালো সারা। দুটো চক্ষু জ্বলে যেন আকাশের তারা।"
হরর-মিস্ট্রি জনরার বই সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে লিখা। কিন্তু শুধু যে হরর, রহস্য এসবেই সীমাবদ্ধ তাও নয় সাথে দেখা যায় সুন্দরবনের পটভূমিতে মিথোলজিত আর পুরোনো লোকগাথা/রূপকথা।
বইয়ের গল্প শুরু হয় ছকু পাইলটের বেঁচে আসা থেকে। ছকুর বয়ানমতে সে তার আরো সঙ্গীর সাথে জীবিকার উদ্দেশ্য বনে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাস বাঘের আক্রমণে পড়ে সে কোনোরকমে বেঁচে ফিরলেও তার সঙ্গীসাথী কেউ আর ফিরতে পারেনি। এ কথাই তো বিশ্বাসযোগ্য! কিন্তু রহস্য শুরু হয় যখন ছকু পাইলটের সাথে সওগারেদ মিঠুকে পাওয়া যায়। ভাগ্যক্রমে সে বেঁচে যায় এবং তাকে উদ্ধার করে আনে ঢাকা থেকে আসা এক লেখক সিরাজুল ইসলাম। আর এই মিঠুর বয়ানমতে এই রহস্যের জাল তখনি বাঁধে। ক্রমে ক্রমে গল্পের সাথে সাথে একদিকে যেমন রহস্য পরিষ্কার হয় তেমনি অন্যদিকে অন্য রহস্য বাঁধতে শুরু হয়। এসব রহস্যের সমাধান করার দায়িত্ব আসে পুলিশ মনসুর আলীর উপরে। কিন্তু সাথে সেই লেখক সিরাজুল ইসলাম নিজেকে জড়িয়ে ফেলে এই রহস্যের জালে। এই রহস্যের সমাধান না পাওয়া পর্যন্ত সিরাজুল ইসলামের শান্তি হচ্ছে না। আর তখনি সিরাজুল ইসলামের মাধ্যমেই উঠে আসে অনেক পুরোনো মিথোলজি আর সুন্দরবনের সেই পুরোনো লোকগাথা। একে একে করে মনসুর আলী আর সিরাজুল ইসলাম মিলেই রহস্যের সমাধান করে।
বইটি পড়তে গিয়ে হঠাৎ করেই দেখা এক ডকুমেন্টারির সাথে কিছুটা মিল পেলাম। "The Sea Orphan" যা সত্যকাহিনী ভিত্তিক একটি ডকুমেন্টারি এর সাথে এই গল্পের একদম শুরুর দিকে যেদিক থেকে মূলত রহস্যের শুরু হয় ঐদিকটা মিল পাওয়া যায়। আর যেই সুপারন্যাচারাল কাহিনী গল্পে আছে এমন কিছু মুভি/সিরিজ আছে।
বইটি এমন টানটান উত্তেজনা তৈরি করে যে শেষ না করা পর্যন্ত শান্তি পাওয়া যাবে না। সুন্দরবনের বর্ণনাও এতো ভালোভাবে দেওয়া যে মনে হবে এই বুঝি সুন্দরবনে গেলে আমি নিজেই সব চিনে যাবো। শেষমেশ বইটা পড়ে অনেক ভালো লেগেছে। আসলেই পড়ার মতো একটা বই।
আমার মতো শহুরে মানুষের কাছে সুন্দরবনের বনবিবি-গাজী পীর-দক্ষীণ রাজার লোককথা পৌঁছে দেয়ার জন্য ভালো উদ্যোগ। লেখককে ধন্যবাদ।
তবে কন্সেপ্ট আর লেখার বুনন বড্ড এভারেজ। বিশেষ করে আমাদের জেনারেশন, যারা ভ্যাম্পায়ার কন্সেপ্ট গুলো সেই টিনেজ থেকে গুলে খেয়ে এসছে তারা গল্পের শুরুতেই ধরে ফেলবে এরপর কি হবে না হবে। এতে গল্পের আমেজটা আর থাকে না। আর লেখনীও যে পাঠক গল্প আন্দাজ করতে পারার পরেও শুধু লেখকের বলার মাধুর্য্যর জন্য পড়বেন সেরকম লাগে নি। একথা উল্লেখ করলাম এজন্য যে, সুন্দরবন কন্সেপ্টের উপর যেহেতু লেখা, সেখানকার প্রকৃতি, মানুষ, জনজীবন, ভাষা ইত্যাদি আরো ভালোভাবে তুলে ধরে পাঠককে আকৃষ্ট করার অনেক উপাদান ছিল। আশা করি লেখক এর পরের বইগুলোয় আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবেন তাঁর কথার বুননে।
A rounded 3✨ ওহ আর হ্যা! প্রচ্ছদটা সুন্দর! . . .
অফ-টপিক : গল্পটা পড়তে পড়তে কেন যেন বারবার সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর কথা মনে পড়ছিল আর ভাবছিলাম তিনি যদি লিখতেন তাহলে কীভাবে লিখতেন। তাঁর লেখা "চাঁদের অমাবস্যা" আমার তাঁর পড়া শেষ উপন্যাস দেখেই হয়তো। কি মায়া দিয়ে লেখা! আচ্ছা এ প্রজন্মে এমন সাহিত্যিক পাচ্ছি না কেন? কোথায় যেন খুব তাড়া আজকাল! সময় নিয়ে, যত্ন নিয়ে প্লট তৈরির ইচ্ছা কম... . . . জুন ২৫, ২০২৫ | ঢাকা, বাংলাদেশ
এই গল্প আকাশের গায়ে ঝুলে থাকা একফালি রুপালি চাঁদের। চাঁদকে খুঁজে ফেরার গল্প। চাঁদের আলোয় যে আততায়ী গা ঢাকা দেয়, তাকে খুজবার গল্প। বইটিতে থ্রিলার, হরর, রোমাঞ্চ অ্যাডভেঞ্চার বা গোয়েন্দাকাহিনী সকল জনরার স্বাদ রয়েছে। লেখক অসাধারণভাবে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলে ধরেন। বইয়ের প্রচ্ছদের মতো এর গল্পও চমৎকার। বইটি আামার দারুণ লেগেছে শুরু থেকে প্রতিটি পাতা টানটান উত্তেজনা নিয়ে বইটি শেষ করেছি। কিন্তু লোককথাগুলো একটু খাপছাড়া লেগেছে। এছাড়া পুরো বইটি অসাধারণ। প্রথম থেকে টানটান উত্তেজনা দিবে পরবর্তী রহস্য কি তা জানতে। গল্পটি সুন্দরবনের, সুন্দরবনের মানুষের জীবনযাপনের এবং সেই অন্ঞ্চলের লোককথার। গল্পের শুরু হয় একদল লোক নিখোঁজের মধ্য দিয়ে। তারা কি বাঘের শিকার হয় নাকি এমন কিছুর কবলে পড়ে যা মানুষ কিংবা মানুষের মতো? আপনি যদি ডিটেকটিভ এডভেঞ্চারপ্রেমী হন আপনি অবশ্যই বইটি ভালো লাগবে।
' বুকস উইথ অথৈ' নামক পেজ থেকে রিভিউ দেখে রকমারিতে অর্ডার করে কুড়ে নিলাম 'চন্দ্র চন্দ্র খুজে ফিরি'। সত্যি বলতে বইটি পড়ার সময় মনে হলো একটি জংগলের মধ্যে ছিলাম আমি আতংক নিয়ে। মায়াবাঘের ভয়ে। ভাষা, শব্দচয়ন এতোটা সুন্দর ছিল আকড়ে ধরেছিল বইটিতে। থ্রিলার এই বইয়ে আছে মায়াবাঘের কিছুটা মিথ। রুপকথার গল্প পড়তে কমবেশি সবার ই ভালো লাগে। বইটি পড়লে আপনারা একটু কনফিউজে থাকবেন আসলে কে কারে খুন করে যাচ্ছে! আর কনফিউজে থাকাটাই আমার পছন্দ কারণ এতেই বই পড়ার স্বাদ বাড়ে। লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ এই বইটির জন্য। যেহেতূ এই টাইপের প্লট নিয়ে অলরেডি ঝড় তুলে দিয়েছেন আশা রাখি আগামীতে আমাদের জন্য আরো বেশি বেশি ঝড় তুলবেন নতুন বই দিয়ে।
প্লট : ভালো প্রচ্ছদ : ভালো কেমন লেগেছে? : মোটামুটি তবে? : লেখকের স্টাইল সাবলীল। প্রচুর পড়ে ফেলা যায় একটানে। আমার বিশ্বাস উনি আগামী লেখাগুলোতে চমক দেবেন। খুব ভালো কাজ করার সম্ভাবনা আছে উনার লেখায়। শুভকামনা।
গল্পটা আসলে শুরু হয় খুব সাধারণভাবে—সুন্দরবনে হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষকে পাওয়া যায়, যার নাম ছকু পাইলট। সে ফিরে আসে শরীরের উপর ভয়াবহ আঁচড় নিয়ে, চোখেমুখে একরকম থরথর করা ভয়। ওর মুখে বারবার একটাই কথা—"বনের জিনিস বনে চলে গেছে"। কী সেই বন? কাকে সে দেখেছে? কেন সে এত আতঙ্কে?—এই প্রশ্নগুলো জমতে থাকে, আর এখান থেকেই গল্পের মোড় ঘুরতে থাকে, কিন্তু সেটি কোনো পেশাদার গোয়েন্দা গল্পের মত নয়—বরং এর ভেতরে একটা গা ছমছমে লোককথার স্বাদ, নিঃশব্দ প্রাকৃতিক আতঙ্ক আর মানুষের মনোজগতের গভীরতা আছে।
রহস্যের তদন্তে নামে এস আই মনসুর আলি, আর লেখক সিরাজুল হক এসে জড়ায় এই কাহিনির সাথে। তারা দু’জন ভিন্ন জগতের মানুষ—একজন নিয়ম-আইনের প্রতিনিধি, আর অন্যজন মুক্তচিন্তার অনুসন্ধানী। এই দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গি দুই দিকের দরজা খুলে দেয়—বাস্তব ও অতিবাস্তবের। এবং এই মিশেলটা আমার ভালো লেগেছে। লেখকের বর্ণনায় সুন্দরবন যেন একটা চরিত্র হয়ে উঠে এসেছে। গাছেরা কথা বলে না, কিন্তু ওদের চুপ থাকা গায়ে এসে লাগে। নদীর স্রোত শুধু জলে নয়, গল্পের গতিতেও প্রভাব ফেলে। আর বনের ভেতর যে ভয়—তা ঠিক চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায় প্রতিটা পাতায়।
গল্পে কোনোভাবেই অতিরিক্ত নাটকীয়তা নেই। বরং অনেক জায়গায় এক ধরনের কবিত্ব আছে। বিশেষ করে যেখানে লোককথার ছায়া পড়ে, সেখানে গল্প যেন একটু ধ্যানমগ্ন হয়ে যায়। লোককাহিনীর সাথে আধুনিক বাস্তবতা—এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব কিছুটা দ্বিধায় ফেলে দেয়। সত্যিই কি অদ্ভুত কিছু ঘটেছে? নাকি সবই মানুষের মনের তৈরি? এই প্রশ্নগুলো গল্পের শেষে এসেও পরিষ্কার হয় না, বরং আরও ঘোলাটে হয়ে যায়।
"চন্দ্র চন্দ্র খুঁজে ফিরি" এক অনবদ্য এডভেঞ্চার উপন্যাস, যেখানে মিথলজি, রহস্য, থ্রিলার, হরর ও গোয়েন্দা গল্পের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে। কাহিনির মূল প্রেক্ষাপট সুন্দরবন,লেখকের গদ্যশৈলীতে যার বর্ণনা এত জীবন্ত হয়ে ওঠে যে, পাঠকের চোখের সামনে বন যেন মূর্ত হয়ে ওঠে। অযথা জ্ঞান কপচানো হয়নি, যা পাঠকে করেছে সরল এবং গতিশীল।
গভীর অরণ্যের অন্ধকারে ছায়ার মতো বয়ে চলা নদী, কোথাও কোথাও জলের ওপর লুটিয়ে পড়া গরান আর কেওড়া গাছ, মায়া হরিণ, বাঘের গর্জন সব মিলিয়ে পাঠককে এক অন্যরকম শিহরণে আচ্ছন্ন করে রাখে গোটা উপন্যাসজুড়ে। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে এস.আই মনসুর, সিরাজ ও আনিস, যারা একের পর এক রহস্যের সম্মুখীন হয়। ঘটনাক্রমে যুক্ত হয় আরো নানা চরিত্র। দক্ষিণ রায়, বনবিবি ও গাজীপীরের কিংবদন্তি, পূর্ণিমা রাতে মানুষের মায়াবাঘে রূপান্তর এবং এক রহস্যময় হত্যাকারী শ্বাপদ মায়াবাঘের সন্ধান কাহিনীকে টানটান উত্তেজনায় পূর্ণ করে তোলে। কিংবদন্তিতে উল্লেখ থাকা মায়াবাঘ কী তবে ফিরে এলো কেন্দুখালি চরে? প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে উপন্যাসটি পড়তেই হবে। এটি নিঃসন্দেহে এক মাস্ট রিড এডভেঞ্চার উপন্যাস! হ্যাপি রিডিং :3
'চন্দ্র চন্দ্র খুঁজে ফিরি' বইটা পড়ার আগ্রহ জাগে যখন শুনি বইটা লিখা হয়েছে সুন্দরবন অঞ্চলের লোককথার উপর ভিত্তি করে। লোকগাথা , কিসসা-কাহিনি, রুপকথায় আমার আগ্রহ বরাবরই টানে খুব। বিস্তৃত বাংলায় লোককথা কিংবা মুখরোচক পৌরাণিক কাহিনির অভাব নেই। তবে সে-ই কাহিনী গুলো আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে– বলারও যেমন কেউ নেই শুনারও মানুষের অভাব। সভ্যতার চাপে আমরা বন্দি হচ্ছি চার দেয়ালে আর রুপকথা হারিয়ে যাচ্ছে লোকালয় থেকে লোকালয়ের আরও গভীরে। বইটায় এগিয়েছে সুন্দরবন ঘেঁষা একটি গ্রামের বনজীবী মানুষের জীবীকার তাগিদে সুন্দরবন গিয়ে ফিরে আসার শুধু ফিরে আসার নয় সাথে করে জনপদে নিয়ে আসা এক আদিম ইতিহাসকে। জেগে উঠেছে মায়াবন নামক এক ঘুমন্ত সত্তার, যার দরুন একের পর এক মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে লোকালয় থেকে। সুন্দরবনের বনবিবি, দক্ষিণ রায় কিংবা গাজী-কালুদের চমকপ্রদ কাহিনিতে ভর করে থ্রিলার,গোয়েন্দা কিংবা মিথলজির ছোঁয়া নিয়ে বইটা দারুন করেছন লেখক। যদিও ভাষাগত জটিলতা নিয়ে লেখক ভূমিকায় স্বীকারোক্তি দিয়েছেন– যা অবশ্যই প্রসংসার দাবিদার। বইয়ের নামকরণ কিংবা প্রচ্ছদের কাজ দারুণ করেছেন বলতেই হবে। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় জেগে ওঠা সত্তা যা কিনা চাঁদের আলোয় ঘুরে ঘুরে শিকার ধরে আবার চাঁদের আলো হারানোর সাথে সাথে পশু থেকে মানুষে ফিরে আসা কিংবা সুন্দরবনের বাঘের গায়ের ডোরাকাটা, প্রচ্ছদে বাড়তি আগ্রহ টানে– সত্যিই চমৎকার কাজ। অসাধারণ লেখনশৈলীর মাধ্যমে ফুটে তুলেছন সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সাথে ছড়িয়েছেন রূপকথার বিস্তার, ঠিক যেনো রূপকথা নয় আবার রূপকথা।
শাহরিয়ার জাওয়াদ এর সাথে প্রথম পরিচয়। তিনি হতাশ করেননি, তবে মুগ্ধতাও ছড়াননি যথেষ্ট পরিমাণে।
প্লট সুন্দর। গল্প প্রবাহ সরল, জটিলতা নেই। গতি শম্বুকো নয়, চিতাবাঘও নয়। এসেছে প্রকৃতি, রহস্য, পুরাণ। চরিত্রায়ন ঠিকঠাক, তবে মনে ছাপ ফেলে কম। বেশ কিছু জায়গায় লেখকের একটা বিশেষ ধরনের বাক্যগঠন (বলা উচিৎ বাক্যভাঙ্গন) আর দুয়েকটা বিশেষ শব্দের পর (যেমন: তারপর) কমার ব্যবহার কিছু জায়গায় বিরক্ত করেছে। প্রথমদিকে প্রবলভাবে চোখে পড়লেও পরের দিকে কমে এসেছিল। ভালো সম্পাদনা হলে এটা সমাধা হয়ে যাবার কথা; অথবা হয়তো লেখকেরই মর্জি, কে জানে! এন্টাগনিস্টের মোটিভ আর ব্যাকগ্রাউন্ড যথেষ্ট ডিফাইনড লাগে নি। ব্যাখ্যা দিয়েছেন লেখক, তবে আমি আরও চাচ্ছিলাম, প্রশ্ন রয়ে গেছে খানিকটা।
ভালো বই? বটে। খুব ভালো? না। দশে ছয় একটু কম হয়ে যায় হয়তো। মন খুলে সাত দিলাম। রেকমেন্ডেড? না পড়লে ক্ষতি নেই। চাইলে পড়েন। মানে, দেখেন, যা ভালো মনে করেন।
বইটা নিয়ে আগ্রহ জাগিয়ে তুলেছিল এর আবহ আর নাম। সংগ্রহ করতে বাধ্য করেছে মাহাতাব ভাইয়ের অসম্ভব সুন্দর প্রচ্ছদ। বউকে ধন্যবাদ, কিনে দেয়ার জন্য।
সুন্দর ছিল বইটি। লেখক শাহরিয়ার জাওয়াদ এর প্রথম পড়া বই এইটা, ভালোই লেগেছে।
বইটা এমনভাবে বিল্ড আপ করা হয়েছে যে মনে হয় বইটা থ্রিলার, কখনো মনে হয় মিস্ট্রিয়াস, কখনো মনে হয় ডিটেকটিভ, কখনো মনে হয় ফ্যান্টাসি। যেহেতু আমার বই পড়ার আগে কখনো ভূমিকা পড়া হয় না, তাই আমি ভেবেছিলাম যে শেষটা বাস্তব কিছু হবে, মানে একটা বড় টুইস্ট থাকবে এমন মনে করেছিলাম, কিন্তু লেখক ফ্যান্টাসি হিসেবে রাখছে সেজন্য আমি কিছুটা আশাহত হই, পরে অবশ্য ভূমিকা টা পড়ে বুঝলাম লেখক আগেই বলে রাখছিল।
সুন্দরবন নিয়ে আমার সবসময় ই একরকম ফ্যাশসিনেশন আছে।এই বই পড়ে তা বাড়লো বৈকি কমলো না।এই বই সুন্দরবন নিয়ে লেখা শুনেই উইশলিস্টে এড করেছি, ভিতরে কী কাহিনী সেটা জানতে চাইনি। না চেয়ে ভালোই করেছি কারণ এই মিথলজির সাথে আমি পরিচিত জেনে গেলে হয়তো আমি কিনতাম না বইটা মায়াবাঘ,নেকড়েমানুষ বা লাইকানথ্রপি টার্ম কিংবা মেডিকেলের ভাষায় যা এক ডিসওর্ডার নিয়েই এই গল্প সাথে আমার বনবিবির জীবন ভাল���ই লাগলো আর প্রচ্ছদ ইস জাস্ট ইনক্রেডিভেল