বইমেলার হিসেবে ফার্স্ট যে বইটা পড়ছি সেইটার নাম 'অল ইন', লেখক আলভী আহমেদ।
গল্পের স্টার্টিংটা দারুণ। ধরেন আপনে একজন লেখক, লেখার জন্য অ্যাডভান্স ট্যাকাও নিছেন কিন্তু মাগার গল্প নাই মাথায়। আপনের আবার ড্রিংক করলে মাথা খোলে, গল্পদেব আইসা প্লট দিয়া যায়। তো এই উদ্দেশ্যে আপনে গেছেন একটা বারে, ড্রিংক করার জন্য। ড্রিংক করতাছেন মাগার গল্পদেবের খোঁজ তখনতরি নাই। ঐখানে এক চ্যাংড়া পোলায় আপনার কাছে আপনার পাওয়ার ব্যাংক চাইল কারণ তার ফোনের চার্জ শেষ। চার্জ দেয়ার জন্য সে ফোন আর তার বডিসমেত আপনের টেবিলে আসলো। চাইলে তার টেবিলেও আপনার পাওয়ার ব্যাংক নিয়া যাইতে পারত কিন্তু ভদ্রতা দেখায়ে আপনার টেবিলে আসলো আপনার সাথে গল্পও করবে এই মর্মে। কিন্তু কীসের কী? আইসা একমনে মোবাইল টিপা যাইতেছে। পরে জানা গেল, সে ফোনে অনলাইনে পোকার খেলতেছে। মামুলি খেলা না, ট্যাকা পয়সার কেস আছে এইখানে। আপনে গল্পে গল্পে জিগাইলেন, এই গেম খেইলা সর্বোচ্চ কত পাইছে সে? চ্যাংড়া কয়, ৮৫ হাজার ডলার!
এইবার আপনে নইড়া চইড়া বসলেন। ৮৫ হাজার ডলার? খাইছে! এ তো বাংলা ট্যাকায় প্রায় এক কোটি ট্যাকা।
বুঝলেন গল্পদেব ব্যস্ত থাকায় এই পোলারে আপনার কাছে পাঠাইছে। এই পোলায় গল্পপ্রসব করব। ব্যস, আপনে পোলার সাথে আরো ৩ সিটিং দিলেন। ফলাফল হিসেবে যে গল্প আসলো আপনে সেইটারে ঐ পোলার ন্যারেটিভে কাগজে উঠায়ে ফেললেন।
এইবার আসি মূল গল্পে।
গল্পটা পোকার নিয়া। পোকার হইলো তাস/কার্ডের এক টাইপের গেম। কার্ড মানেই যে জুয়া এইটা আমাদের দেশে একটা প্রচলিত একটা মিথ। এই গল্পের গল্পকথক আর চ্যাংড়া পোলা সুমনও সেইটা বেশ কয়েকবার বলছে। তবে জুয়া ব্যাপারটা লাক এর, কিন্তু পোকার মোটেও লাক এর গেম না। এইখানে লাগে কঠিন ক্যালকুলেশন, ম্যাথের অ্যাডভান্সড নলেজ। সুমন ছোটোবেলা থেকেই ম্যাথে এক্সপার্ট। আর সেই নলেজটাই সে কাজে লাগায় আন্ডারগ্রাউন্ড হোমগেমে (মানে গোপনে বাসায় বইসা নিজেদের মাঝে খেলা আরকি)। আর সে সূত্রে পরিচয় হয় রাফির সাথে। এই রাফির মাধ্যমে সুমন আর আমরা পাঠকরা চইলা যায় ইন্ডিয়ার গোয়াতে। ঐখানে ভাসমান বিলাসবহুল বোটের মাঝে চলে ইন্টারন্যাশনাল পোকার টুর্নামেন্ট। আর সেইখানে পরিচয় হয় এক হোস্ট মেয়ের সাথে (হোস্ট মানে যে টেবিলে কার্ড বিলি করে)। আর ওখানেই শুরু হয় ম্যাজিকের।
গল্পের অনেকখানি বইলা দিলেও সমস্যা নাই। আলভী আহমেদের লিখনশৈলী মুগ্ধকর। কিছু লেখক থাকে না, যারা আল বাল যাই বকুক, পড়তে ভাল্লাগে? আলভী আহমেদ সেইরকম। তবে তার বই 'অল ইন' আল বাল বকে নাই। একদম এক্সক্লুসিভ গল্প। এই টাইপের গল্প আগে শোনেন নাই সম্ভবত। আমি একদম এক বসায় তার বইটা পড়ে ফেলছি। পড়তে নিয়ে একটানে শেষ করে দেখি আমি ১৪০ পৃষ্ঠায় আছি, যেখানে পুরা বইটা ১৭৬ পেজের। পোকার গেম তো বুঝি না, তাইলে কি এই বইয়ের মজাটা আমি পাবো? এইটা যদি ভাইবা থাকেন তাইলে বলবো, সমস্যা নাই। আলভী আহমেদ গল্পের ফাঁকে ফাঁকে পোকারের সকল রুল বুঝায়ে দিছেন। আর এতটা অল্প অল্প করে বুঝাইছেন যে একদমই ইনফো ডাম্পিং টাইপের বিরক্তির উদ্রেক করে নাই। আবার আরো ক্লিয়ার করতে বইতে বেশ কিছু ছবির সংযোজনও করা হইছে।
তবে লিখনশৈলীর সৌন্দর্যের সাথে সাথে সুন্দর তার উপন্যাসের এক্সিকিউশনও। গল্প কেমনে বলত�� হয় তিনি জানেন, কোথায় কোথায় ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরী ক্রিয়েট করে ক্যারেক্টারাইজেশন ইস্যুতে 'ডোন্ট টেল, শো' করতে হয় সেইটাও জানেন, জানেন কেমনে পাঠকরে আটকায়ে রাখতে হয়। এই গল্পে সুপার লেভেলের কোনো টুইস্ট নাই তবে সুন্দর ক্লাইম্যাক্স আছে।
আলভী আহমেদের ক্ষেত্রে একটা অভিযোগ শুনি। তার লেখায় হারুকি মুরাকামির প্রবল প্রভাব আছে। আমার কাছে প্রবল প্রভাব লাগে নাই, যা লাগছে তা হালকা। তা সত্ত্বেও আলভী আহমেদের লেখার সিগনেচার টোনটা আমি সম্ভবত ধরতে পারছি। আর সেই টোনটা আমার বেশ ভালো লাগছে।
আগাগোড়া সুন্দর একটা উপন্যাস পড়তে চাইলে আমার সাজেশান থাকবে আলভী আহমেদের 'অল ইন' বইটা। বইটা প্রকাশ করছে বাতিঘর চট্টগ্রাম।