এই বইয়ের বিকল্প এবং বেটার নাম হইতে পারে পোকার খেলার ১০১টি কৌশল। অথবা গল্পে গল্পে পোকার।
আলভী আহমেদের অল-ইন আদতে তাঁর আগের সবগুলো ছোটগল্প, উপন্যাস আর মুরাকামি অনুবাদের সবকিছু মিলিয়ে মিশিয়ে একটা অদ্ভুত অহেতুক ফিউশান। এইখানে নতুন বলতে শুধু খেলাটাই। রাইটিং, স্টোরি বিল্ডিং, বোহেমিয়ান প্রোটাগনিস্ট; মন খারাপ হইলে তারা মদ খায়– সব রিপিটেড। শুধু ভিন্ন মোড়কে পড়েছি। কোনো মানে হয় না।
পোকার নিয়ে নন-ফিকশন লিখতে চাইলে সেভাবেই বই লিখতে পারতেন। বইয়ের মাথামুণ্ডু কোনো কাহিনি নাই ; সেখানে পুরা উপন্যাসেই লেখক আপনাকে পোকার শেখানোর জন্য পাগলামি করতে থাকবে। 'সুপার কুল ড্যুড' থিওরি স্পোর্টস ফিকশনে মিক্সচার করতে গিয়ে ল্যাটকায়ে স্রেফ অখাদ্য খিচুড়ি হয়েছে। বইমেলার অন্য কোনো বই পড়ে এতটা বিরক্ত হইনি।
আমরা হরহামেশাই গল্পের মধ্যে থাকি। মাঝে মাঝে মনে হয় জীবন থেমে আছে, সময়টা বোধহয় একটু ধীর তবে কিছুই থেমে থাকে না এবং সাথে সাথে গল্পও উৎপাদন হতে থাকে। আমার বই পড়ার কারণগুলোর একটা নতুন কিছুর খোঁজ পাওয়া বা জানাশোনা সেটআপে বসে ভিন্ন তালে গল্প করার ওয়েটা জানা। এই বই পড়তে গিয়ে হতাশ হইনি বরং ভীষণ বিরক্ত হয়েছি। আমি expectations বলতে কিছু রাখিনি (স্বভাবতই বর্তমান লেখকদের বই পড়ার সময় রাখিও না), তাও এতো বিরক্ত হবো বুঝতে পারিনি। এই বইটা প্রকাশ করার কোনো কারণ লেখক আদতেও খুঁজে পেয়েছেন কিনা জানার আগ্রহ আছে!! একজন লেখক তখনই তো বই প্রকাশ করেন যখন সে confident থাকে যে সে পাঠকদের ভালো কিছু দিচ্ছে। এই সেইম সেটআপের গল্প আলভী আহমেদের কাছে বারবার শুনে এসেছি। আলভী আহমেদের স্টোরি বিল্ডিং বা ক্যারেক্টার বিল্ডিং আমার ভালো মনে হয়েছিলো "গোস্টরাইটার" পড়ে। সে বইয়ের প্লট অসাধারণ তবে শেষটা জঘন্য ছিল। এই বই পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিলো আমি বোধহয় পোকার শিখতে বসেছি। হঠাৎ হঠাৎ মনে হচ্ছিলো বাংলা কমার্শিয়াল সিনেমা দেখছি।
একটা তারা দিতেও আমার কষ্ট হচ্ছে, কারণ আমি সময় দিয়ে পড়েছি এবং বইটা শেষ করার জন্য নিজেকে পুশ করেছি।
পোকার বা কার্ড খেলার ওপর খুব বেশি ধারণা না থাকলে বইটা একদমই ভালো লাগার কথা না। জনরা স্পোর্টস ফিকশন বললেও আসলে ‘পোকার’ ফিকশন বলা ভালো। পোকার খেলার হ্যান্ডবুক হিসেবে মন্দ না অবশ্য। এককথায় উপন্যাস হিসেবে মানানসই হয়নি, বড় গল্প পর্যন্ত ঠিক ছিল। এন্ডিংয়ে ট্র্যাজেডি আরও গাঢ় করা যেত। ভালো দিক হল আলভি আহমেদের লেখা। একটানে পড়া যায় বলেই শেষ করতে সমস্যা হয়নি আরকি। তবেমে দাগ কেটে যাওয়া বা ভাবনার খোরাক যোগানোর মত কিছু নেই। লেখকের যে একটা দর্শন আছে সেটা অগভীর। যাইহোক, সামনে আরও ভালো কিছুর অপেক্ষায় মাকড়সার মত জাল পেতে রইলাম।
বইমেলার হিসেবে ফার্স্ট যে বইটা পড়ছি সেইটার নাম 'অল ইন', লেখক আলভী আহমেদ।
গল্পের স্টার্টিংটা দারুণ। ধরেন আপনে একজন লেখক, লেখার জন্য অ্যাডভান্স ট্যাকাও নিছেন কিন্তু মাগার গল্প নাই মাথায়। আপনের আবার ড্রিংক করলে মাথা খোলে, গল্পদেব আইসা প্লট দিয়া যায়। তো এই উদ্দেশ্যে আপনে গেছেন একটা বারে, ড্রিংক করার জন্য। ড্রিংক করতাছেন মাগার গল্পদেবের খোঁজ তখনতরি নাই। ঐখানে এক চ্যাংড়া পোলায় আপনার কাছে আপনার পাওয়ার ব্যাংক চাইল কারণ তার ফোনের চার্জ শেষ। চার্জ দেয়ার জন্য সে ফোন আর তার বডিসমেত আপনের টেবিলে আসলো। চাইলে তার টেবিলেও আপনার পাওয়ার ব্যাংক নিয়া যাইতে পারত কিন্তু ভদ্রতা দেখায়ে আপনার টেবিলে আসলো আপনার সাথে গল্পও করবে এই মর্মে। কিন্তু কীসের কী? আইসা একমনে মোবাইল টিপা যাইতেছে। পরে জানা গেল, সে ফোনে অনলাইনে পোকার খেলতেছে। মামুলি খেলা না, ট্যাকা পয়সার কেস আছে এইখানে। আপনে গল্পে গল্পে জিগাইলেন, এই গেম খেইলা সর্বোচ্চ কত পাইছে সে? চ্যাংড়া কয়, ৮৫ হাজার ডলার! এইবার আপনে নইড়া চইড়া বসলেন। ৮৫ হাজার ডলার? খাইছে! এ তো বাংলা ট্যাকায় প্রায় এক কোটি ট্যাকা।
বুঝলেন গল্পদেব ব্যস্ত থাকায় এই পোলারে আপনার কাছে পাঠাইছে। এই পোলায় গল্পপ্রসব করব। ব্যস, আপনে পোলার সাথে আরো ৩ সিটিং দিলেন। ফলাফল হিসেবে যে গল্প আসলো আপনে সেইটারে ঐ পোলার ন্যারেটিভে কাগজে উঠায়ে ফেললেন।
এইবার আসি মূল গল্পে।
গল্পটা পোকার নিয়া। পোকার হইলো তাস/কার্ডের এক টাইপের গেম। কার্ড মানেই যে জুয়া এইটা আমাদের দেশে একটা প্রচলিত একটা মিথ। এই গল্পের গল্পকথক আর চ্যাংড়া পোলা সুমনও সেইটা বেশ কয়েকবার বলছে। তবে জুয়া ব্যাপারটা লাক এর, কিন্তু পোকার মোটেও লাক এর গেম না। এইখানে লাগে কঠিন ক্যালকুলেশন, ম্যাথের অ্যাডভান্সড নলেজ। সুমন ছোটোবেলা থেকেই ম্যাথে এক্সপার্ট। আর সেই নলেজটাই সে কাজে লাগায় আন্ডারগ্রাউন্ড হোমগেমে (মানে গোপনে বাসায় বইসা নিজেদের মাঝে খেলা আরকি)। আর সে সূত্রে পরিচয় হয় রাফির সাথে। এই রাফির মাধ্যমে সুমন আর আমরা পাঠকরা চইলা যায় ইন্ডিয়ার গোয়াতে। ঐখানে ভাসমান বিলাসবহুল বোটের মাঝে চলে ইন্টারন্যাশনাল পোকার টুর্নামেন্ট। আর সেইখানে পরিচয় হয় এক হোস্ট মেয়ের সাথে (হোস্ট মানে যে টেবিলে কার্ড বিলি করে)। আর ওখানেই শুরু হয় ম্যাজিকের।
গল্পের অনেকখানি বইলা দিলেও সমস্যা নাই। আলভী আহমেদের লিখনশৈলী মুগ্ধকর। কিছু লেখক থাকে না, যারা আল বাল যাই বকুক, পড়তে ভাল্লাগে? আলভী আহমেদ সেইরকম। তবে তার বই 'অল ইন' আল বাল বকে নাই। একদম এক্সক্লুসিভ গল্প। এই টাইপের গল্প আগে শোনেন নাই সম্ভবত। আমি একদম এক বসায় তার বইটা পড়ে ফেলছি। পড়তে নিয়ে একটানে শেষ করে দেখি আমি ১৪০ পৃষ্ঠায় আছি, যেখানে পুরা বইটা ১৭৬ পেজের। পোকার গেম তো বুঝি না, তাইলে কি এই বইয়ের মজাটা আমি পাবো? এইটা যদি ভাইবা থাকেন তাইলে বলবো, সমস্যা নাই। আলভী আহমেদ গল্পের ফাঁকে ফাঁকে পোকারের সকল রুল বুঝায়ে দিছেন। আর এতটা অল্প অল্প করে বুঝাইছেন যে একদমই ইনফো ডাম্পিং টাইপের বিরক্তির উদ্রেক করে নাই। আবার আরো ক্লিয়ার করতে বইতে বেশ কিছু ছবির সংযোজনও করা হইছে। তবে লিখনশৈলীর সৌন্দর্যের সাথে সাথে সুন্দর তার উপন্যাসের এক্সিকিউশনও। গল্প কেমনে বলতে হয় ত���নি জানেন, কোথায় কোথায় ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরী ক্রিয়েট করে ক্যারেক্টারাইজেশন ইস্যুতে 'ডোন্ট টেল, শো' করতে হয় সেইটাও জানেন, জানেন কেমনে পাঠকরে আটকায়ে রাখতে হয়। এই গল্পে সুপার লেভেলের কোনো টুইস্ট নাই তবে সুন্দর ক্লাইম্যাক্স আছে।
আলভী আহমেদের ক্ষেত্রে একটা অভিযোগ শুনি। তার লেখায় হারুকি মুরাকামির প্রবল প্রভাব আছে। আমার কাছে প্রবল প্রভাব লাগে নাই, যা লাগছে তা হালকা। তা সত্ত্বেও আলভী আহমেদের লেখার সিগনেচার টোনটা আমি সম্ভবত ধরতে পারছি। আর সেই টোনটা আমার বেশ ভালো লাগছে।
আগাগোড়া সুন্দর একটা উপন্যাস পড়তে চাইলে আমার সাজেশান থাকবে আলভী আহমেদের 'অল ইন' বইটা। বইটা প্রকাশ করছে বাতিঘর চট্টগ্রাম।
আলভী আহমেদের লেখা এর আগেও পড়েছি। কোন রাখঢাক না করে খুব সহজেই একটা গল্প গুছিয়ে বলে যেতে পারেন বলে তার বইগুলো পড়তে আমার ভালোই লাগে। কোন নির্দিষ্ট জনরায় যে গল্পগুলো লিখেন তেমন না বরং আমাদের চারপাশের গল্পগুলোই যেন নিজ থেকে উঠে আসে তার লেখা বইয়ের পাতায়!
'অল-ইন' বাতিঘর থেকে প্রকাশিত এবারের বইমেলার বই। জনরা নিয়ে বলতে গেলে এই বইটি মূলত স্পোর্টস ফিকশন। এক গল্পকার গল্পের খোঁজে মরিয়া আর সেই গল্পকারের গল্পের মূল চরিত্রের সাথেই তার হঠাৎ দেখা এবং মূল চরিত্র মেজবাহ সুমনের জীবনের গল্প এই বইয়ের মূল বিষয়বস্তু।
এক শখের দাবাড়ূ থেকে কিভাবে সুমন পোকার চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠল, কেমন ভাবে স্বপ্নের মত তার জীবন পাল্টে গেল, গণিতের কঠিন হিসাব-নিকাশের মারপ্যাচেঁ তার জীবনের অংকগুলো কতটা মেলাতে পারলো তারই প্রশ্ন- উত্তর, সম্ভব-অসম্ভব এবং সম্ভাবনা সব মিলিয়েই এই বইটি অর্থাৎ 'অল-ইন'।
পোকার খেলা সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। প্রথমে মনে হচ্ছিল আমি গল্পটা পড়ে কিছুই বুঝবো না কিন্তু গল্প কথকের সাবলীল বর্ণনা, ডিটেলস, ছবি ইত্যাদি জিনিসগুলো গল্পটি বুঝতে সাহায্য করেছে। (তবে আপনার কার্ড সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকলে বা আপনি যদি কার্ডগুলোর নাম না জানেন তাহলে হয়তো আপনি গল্পটা বুঝবেন না। আপনার গল্পটা ভালো না লাগার সম্ভাবনাই বেশি) কোন একটা কাজ শখের বসে করতে চেয়ে যখন তা পেশা হিসেবে বেছে নিতে হয় তখন তা হয়ে ওঠে বেশ চ্যালেঞ্জিং। আর এই চ্যালেঞ্জিং ব্যাপারটাকে সাদরে গ্রহণ করলেও নিজেদের নেয়া খুব ছোট ছোট ডিসিশনগুলোও যে জীবনে কত বড় পরিবর্তন আনতে পারে সেই গল্পটি যেন লেখক আমাদের বলতে চেয়েছেন।
নানা ব্যস্ততায় বই পড়ার সময় পাচ্ছি না বলে বেশ সময় নিয়েই বইটা পড়লাম। লেখকের বর্ণনা, গল্পের ভাষা সহজ ও সাবলীল হওয়ায় মনে হচ্ছিল ঘটনা বা পারিপার্শ্বিক পরিবেশ চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি এবং বইটি পড়লে পোকার নিয়ে যে কেউই বেশ ভালো ধারণা পাবেন বলে আমার মনে হয়। খেলা, ক্যাসিনো, প্রেম, বিচ্ছেদ, বন্ধুত্ব,ধোঁকা সবই এক এক করে গল্প যত আগায় ততই এক একটা বিষয় গল্পে আবির্ভাব হতে থাকে। বাতিঘরের প্রোডাকশন কোয়ালিটি বরাবরের মতোই দারুণ এবং বইয়ের প্রচ্ছদটা সিম্পল এবং সুন্দর।
আলভী আহমেদের লেখা যারা আগে পড়েছেন তারা হয়তো খেয়াল করবেন প্রধান চরিত্রের কিছু কমন বৈশিষ্ট্য থাকে এই বইয়ের প্রধান চরিত্রের মধ্যেও সেই বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যমান। এছাড়াও গল্পের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় সুমন ও নমিতার প্রেম যা পরবর্তীতে বিচ্ছেদের রূপ নেয় কিন্তু বিচ্ছেদের যে কারণ তা আমার কাছে খুব বেশি অদ্ভুত লাগল। লেখক যে দর্শণ থেকে গল্পটি বলতে চেয়েছেন তাতে হয়তো তিনি ঠিক তবে চিন্তার খোরাক জাগানোর মত আসলে তেমন কিছু নেই বরং পোকার খেলা সম্পর্কে আপনার আগ্রহ থাকলে বা এই খেলা সম্পর্কে যদি বিস্তারিত জানতে চান তাহলে বইটি পড়ে বেশ ভালো ধারণা পাবেন। গল্পের স্টার্টিংটা দারুণ হলেও গল্পের শেষটা আসলে জমলো না। অন্যরকম কিছু আশা করেছিলাম। লেখকের জন্য শুভকামনা।
লেখকের ধারণা বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ পোকার খেলার নামই জানে না, খেলতে পারা তো দূরের কথা। লেখক তাই পাঠককে শুধু জানানোই নয়, খেলাটা শেখানোর দায়িত্বও নিজ কাঁধে তুলে নিলেন! তারপর শুরু হলো নিয়ম-কানুন সহকারে খেলার বিরক্তিকর বর্ণনা। লেখায় ইংরেজি শব্দ নয় শুধু, ম্যান্ডারিন ভাষার শব্দেও আমার সমস্যা নেই। তবে ব্যবহারটা হতে হবে স্বতঃস্ফূর্ত, এই উপন্যাসে যার লেশমাত্র নেই।
আলভী আহমেদের আগের বইগুলো সময় কাটানোর জন্য ভালো। (বইগুলো অবশ্য বের হয় প্রথমা বা বাতিঘরের মতো দামী প্রকাশনী থেকে, যাদের বইয়ের দাম হয় অনেক, আর এই অনেক টাকা দিয়ে শুধু টাইম পাসের জন্য বই কেনা কতটা লাভজনক সেই প্রশ্ন মনে আসে স্বাভাবিকভাবেই।) কিন্তু ‘অল-ইন’ সময় কাটানোর জন্য তো নয়ই, বরং সেধে বিরক্ত হতে চাইলে পড়া যেতে পারে। উপরন্তু টাকা গচ্চা যাওয়ার ব্যাপারটা তো আছেই।