Jump to ratings and reviews
Rate this book

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা

Rate this book
হুগলি আর সরস্বতী নদীর মধ্যবর্তী মাছের আকারে ভূমি, অতীতের বন্দরনগরী সাতগাঁ। কত শত বছর ধরে আরব চিনা ফিরিঙ্গিরা এসেছে মৌসুমি হাওয়ায় পাল তুলে। পর্তুগিজ দিনেমার ওলন্দাজ ফরাসিরা ডেরা বেঁধেছে। বহুবর্ণ সংস্কৃতির তাঁতে বোনা ভূখন্ডে রামের মন্দির ঘিরে এক কনৌজি বৈদিক পরিবারের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হল দেশভাগে উৎপাটিত হয়ে আসা প্রত্নতত্ত্ববিদ যুবকের। সেই বিবাহের ফল বাপ্পাদিত্য, ছেলেবেলা থেকে মায়ের সঙ্গে মার্টিন্স কোম্পানির ছোটো রেলগাড়ি চেপে এসেছে এই জাদুভূমিতে, যেখানে রেলের চাকায় বাজে কেরেস্তান-গোরস্তান ধ্বনি, হাওয়া দিলে গির্জার চালে ম্যাও বেড়ালের কান্নার মতো শব্দ হয়, যেখানে নারীরা নদীতে ডুব দিয়ে দূরবাসিনী আত্মীয়ার সঙ্গে জলে-জলে বার্তাবিনিময় করে, নৈয়ায়িকেরা কুয়োর পেত্নির শাপে ব্যাঙ হয়ে যায়, প্যারিস থেকে তরুণ কবি এসে খুঁজে পায় তার ক্লেদজ কুসুম, সার্জেন-পাদরি নদীর খাত ঘুরিয়ে দেয়, দুর্দম তুর্কী যোদ্ধা এসে মায়াবী ভূমিতে বাঁধা পড়ে, সংস্কৃত শিখে গঙ্গাস্তোত্র লেখে, পুরুষেরা পুনর্জন্ম নিয়ে বংশে ফিরে আসে, এমনকি এক ফিরিঙ্গিও ফিরে আসে কাকাতুয়ারূপে...

স্মৃতির বিপুল ছিটমহল, রাষ্ট্রের নতুন আইনে সেখান থেকে নির্বাসনের খাঁড়া ঝুলছে বাপ্পাদিত্যর মাথায়। ইতিহাস, পুরানকথা আর স্মৃতির সুতো দিয়ে হাওয়ার তাঁতে বোনা হলফনামা কি তাকে বাঁচাতে পারবে?

সাড়ে সাতশো বছর, একটি পরিবারের ন'টি প্রজন্ম ও ঊনপঞ্চাশটি মুখ্য চরিত্র (যার মধ্যে একটি কাকাতুয়া, একটি ঘোড়া ও একটি মোটরবাইক) নিয়ে বাংলা উপন্যাসের ধারায় এ এক অভূতপূর্ব কুহকী উন্মোচন।

648 pages, Hardcover

First published January 1, 2025

9 people are currently reading
85 people want to read

About the author

Parimal Bhattacharya

14 books40 followers
পরিমল ভট্টাচার্য বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখেন। স্মৃতিকথা, ভ্রমণ আখ্যান, ইতিহাস ও অন্যান্য রচনাশৈলী থেকে উপাদান নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক নতুন বিশিষ্ট গদ্যধারা, নিয়মগিরির সংগ্রামী জনজাতি থেকে তারকোভস্কির স্বপ্ন পর্যন্ত যার বিষয়-বিস্তার। ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। কলকাতায় থাকেন।

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
24 (92%)
4 stars
1 (3%)
3 stars
1 (3%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 13 of 13 reviews
1 review1 follower
August 2, 2025
আমাদের সাহিত্যে 'Macondo' ছিল না, এই বইয়ের মাধ্যমে আমরা 'সাতগাঁ' কে পেলাম।

আমার বিশ্বাস এই বই বাংলার কালজয়ী সাহিত্যের মধ্যে অচিরেই জায়গা করে নেবে।
Profile Image for Agniva Sanyal.
26 reviews2 followers
July 29, 2025
এ কাহিনীর ভিতর বাঙালির গর্ভজলের ধ্বনি, শৈশবছাতিমের ঘ্রাণ, জীবনমহালয়ার ভোরের আলোর পরশ আছে। নিকানো উঠোন দিয়ে এই কাহিনীর অন্দরমহলে একবার ঢুকে পড়লে ধীরে ধীরে কাহিনীই পাঠকের ভেতরে ঢুকে যায়। তখন কে কথক, কে পাঠক, কার কাহিনী কিছুই খেয়াল থাকে না। দীর্ঘ দেড় মাস পাঠের অনন্ত বৃত্তে কালযাপনের পর মনে হচ্ছে আমিই বুঝিই মজে আসা সরস্বতী নদী, আমার শরীর থেকে খসে যাচ্ছে পোড়ামাটির ফলক, চর্যাপদের কবিরা বুঝি আমারই ছায়ায় বসে কবিতা লিখেছিল, চৈতন্যের পায়ের ছাপটুকু নিয়ে আমি শুয়ে আছি জনপদের ধারে, আমার পেটের ভেতর থেকে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার গবেষকেরা তুলে আনছে সময়ের ভ্রূণ, আমার বুকের ওপর ওষধিবাগানে বেদির ওপরে বসছেন হিমালয় থেকে আসা দরবেশ, আমিই অনাদি-অনন্ত সপ্তগ্রাম, গোটা বাংলাদেশ, আমিই হাওয়াতাঁতি, নিজেরই যৌথ অচেতনার তল থেকে তুলে আনছি অক্ষর, তারপর ছেঁড়া জ্যাকেট পড়ে কাঠবেড়ালি আর পিঁপড়েদের গল্প শোনাচ্ছি... আর কিছু লেখা সম্ভব নয়, আপাতত। ২৫ বছরের জীবনের শ্রেষ্ঠ পাঠ-অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়ে রইলাম।
Profile Image for Trinamoy Das.
104 reviews8 followers
November 8, 2025
এই বইটার অস্তিত্বই অনেকটা প্যারাডক্সের মত, কারণ আজকাল নাকি ভালো, কালজয়ী বাংলা সাহিত্যের বই লেখা হয় না। কথাটা আমি না, সামাজিক মাধ্যমের আর্মচেয়ার সমালোচকেরা বলছেন। সাহিত্য অ্যাকাডেমিতে গতবছর বাংলায় লেখা কোনও বইয়ের স্থান ছিল না। সেই হাহাকারের পোস্টসমূহে এই সমালোচকেরা হাহা রিয়্যাক্ট দিয়েছিলেন, এবং দুঃখবিলাসে সিঞ্চিত কমেন্টে জানিয়েছিলেন, “এখন সবাই তন্ত্র, ডিটেকটিভ, আর সানডে সাসপেন্স নিয়ে ব্যস্ত।” কথাটা আংশিক ভাবে সত্যি… হয়তো অনেকটাই সত্যি, কিন্তু সেটাকে ভর করে বর্তমান সাহিত্যকে বাতিল করে দেওয়াটা খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ কি?  তাহলে তো সন্মাত্রানন্দ, মণিশঙ্কর, শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য, দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য, জয়দীপ ঘোষ থেকে শুরু করে অসংখ্য লেখক লেখিকাদের শ্রমকে অবজ্ঞা করা হবে।

কিন্তু ভুলে যাচ্ছি, এই দলগুলো অবজ্ঞা আর টিটকিরি করতেই সবথেকে বেশি ভালবাসে, সঠিক মূল্যায়ন করার ইচ্ছে এবং/অথবা ক্ষমতা তাদের নেই।

“সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা” উপন্যাসে ফিরে যাওয়ার আগে একবার পিবি স্যারকে নিয়ে কয়েকটা কথা বলে নিই। মাস্টার্সের প্রথম সেমই হবে হয়তো, ক্লাসে এসে পিবি স্যার  “ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিটিউড”-এর উপর আলোচনা করছিলেন। সিলেবাসে উপন্যাসটি ছিল না, তাই ক্লাস ঝিমুচ্ছিল। পিবি স্যার মাকোন্দো শহরের ভূগোল আর জাদুবাস্তবতা বিষয়ক তাত্ত্বিক কিছু কথা বলতে বলতে, হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিলেন ক্লাসে কে কে মার্কেজের বইটা পড়েছে। পিন-পতন নীরবতা।

তারপর প্রথম দিকের সারি থেকে একজন ছাত্রী হাত তুলে জানিয়েছিল, সে কিছুটা পড়েছে, কিন্তু বুয়েন্দিয়া পরিবারের চরিত্রদের ভিড়ে সে মাকোন্দো শহরে হারিয়ে গেছে, বারংবার। পিবি স্যার সেদিন অনেকক্ষণ ঝেড়েছিলেন আমাদের, সাহিত্যচর্চা আমাদের দ্বারা হবে কিনা, সেই বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। এইরকম বিরক্তি প্রফেসরের মধ্যে আরেকবার দেখেছিলাম, যখন জেনেছিলেন ক্লাসের একজনও ইঙ্গমার বার্গম্যানের সিনেমা দেখা তো দূরের কথা, নামও শোনে নি । তবে সেইসব কথা থাক।

আমার কাছে, এই পিবি স্যার আর লেখক পরিমল ভট্টাচার্যের মধ্যে প্রায় ১০০০ পাতার দূরত্ব রয়েছে (“শাংগ্রিলার খোঁজে” + “দার্জিলিং” + “সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা” = ?)। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় এক দশক কেটে গেছে। ইংরেজি সাহিত্যে গোল্লা পেয়ে কর্পোরেটের বাইনারি জগতের ফাঁকে বাংলা লেখালিখির তটে ভিক্ষে করতে নেমেছি।

লেখক পরিমল ভট্টাচার্যের সাথে সেই প্রফেসরের কোনও মিল ছিল না। তিব্বত আর দার্জিলিং-এর মায়ায় জর্জরিত একজন মানুষ হিসাবেই প্রথমজনকে চিনি। সেই স্বপ্নালু লেখক যে ফিকশনের দিকে হাত বাড়িয়েছেন, সেটা জানার পর থেকেই “সাতগাঁর হাওয়াতাঁতির” প্রতি আকর্ষণ বোধ করেছিলাম। বইটা হাতে পেয়েই প্রথম পাতায় যখন আদিরামবাটি বংশতালিকাটা চোখে পড়ল, তখনই এক ঝটকায় সেই ক্লাসে ফিরে গেলাম, যেখানে বুয়েন্দিয়া পরিবারের সদস্যদের নাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করার জন্য পিবি স্যার সামান্য হতাশ হয়েছিলেন। পিবি স্যার আর পরিমল ভট্টাচার্যের মধ্যে তাই ওভারল্যাপ হয়ে গেল, ঠিক একটা ভেন ডায়াগ্রামের মত, ওভারল্যাপের জায়গায় মার্কেজ আর জাদুবাস্তবতার স্থান হল।

“সাতগাঁর” ডিএনএ-তে পরবাস্তবতার নিউক্লিওটাইড রইলেও এটি “সলিটিউড”-এর বঙ্গীকরণ নয়। বিদেশী উপন্যাসের কোনও ছায়া নেই এতে। সত্যি বলতে, “সাতগাঁর” মত আদ্যোপান্ত “বাংলা” উপন্যাস এই যুগে বিরল (আলোচনার একদম শুরুতে “কালজয়ী কথাটা কিন্তু ভেবেচিন্তেই লিখেছি)।  যদি “সেই সময়”-এ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতার ইতিহাসকে তুলে এনেছেন ধরা হয়, এই কাহিনীর উপজীব্য হল সপ্তগ্রাম। সপ্তগ্রামের ইতিহাস, তার বর্তমান, এবং কিছুটা হলেও ভবিষ্যৎ।

সময়ের কথা উঠে এসেছে বারংবার। সময়কে লিনেয়ার হিসাবে বোঝা যে কতখানি অসম্ভব তা উপন্যাসের শুরুতেই বলে দেওয়া হয়েছে-- “হিয়ার দা পাস্ট অ্যান্ড দা প্রেজেন্ট আর সো ইনেক্সট্রিকেবলি লিংকড দ্যাট সীকিং এ প্রপার ক্রনোলজিকাল সিকোয়েন্স ইজ অ্যাজ গুড অ্যাজ চেজিং আ মিরাজ। হা হা হা! বুঝলে চ্যাটার্জি, আমরা এখানে মরীচিকার পেছনে ধাওয়া করছি।” আদিরামবাটির মন্দিরে সেই মোটিফটা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পোড়ামাটির প্যানেলের মাধ্যমে। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার চিত্রাবলীর পাশে মহাকাব্য আর কলোনিয়াল ইতিহাসের স্থান পেয়েছে, মঙ্গলকাব্যের সাথে ফিরিঙ্গিদের বন্দুক মিশে গেছে। রামাই পণ্ডিতের সময়ে সৃষ্ট সেই “ইতিহাসের বিকারগ্রস্ত চিত্ররূপ”-ই যেন উপন্যাসের কেন্দ্রে নিজেকে স্থাপিত করে এক আশ্চর্য আখ্যানের কথা বলে চলেছে প্রায় ৬০০ পাতা জুড়ে। বর্তমান অতীতের সাথে গড়িমসি করেছে, ফুটিয়ে তুলেছে এক পরিবারের নটি প্রজন্মের মহাকাব্য।

ইতিহাস আর সময়ের পাশাপাশি স্মৃতির কথাও উঠে এসেছে। কীভাবে স্মৃতি আর সময়ের জারণ প্রক্রিয়ায় শুধু ইতিহাস নয়, ভূগোলও যে বদলে যেতে পারে, সেটা সবথেকে স্পষ্ট বোঝা যায় রথীনের পরিবারের স্মৃতিচারণের মাধ্যমে— “শুরু হয় এক বিচিত্র স্মৃতির খেলাঃ কোনো একজন পরিচিতের নাম, তাকে কেউ চিনতে না পারলে তার কোনো আত্মীয়ের নাম, তার কোনো আত্মীয়ের আত্মীয়ের নাম… কোনো একটি বিশেষ ঠিকানা, সেই ঠিকানাটিকে চিহ্নিত করার জন্য একটি গলি, একটি রাজপথ, সুরমা নদীর ওপর একটা সেতু, একটি ফেরিঘাটের কথা বলতে বলতে, স্মৃতির ঝাঁপি হাতবদল করতে করতে ক্রমশ ফুটে ওঠে এক অলীক শহরের মানচিত্র, তাতে জড়িয়ে থাকা স্মৃতির গলিপথ, বাড়ি, চেনা আধোচেনা মানুষের বংশলতিকা পাটে পাটে খুলে আসতে থাকে কলুটোলা লেনের অপরিসর মেঝের উপর।”

উপন্যাসের সাতগাঁরও যেন শুধু একটি “অলীক মানচিত্র” রয়েছে। স্মৃতির মাধ্যমেই আমরা সাতগাঁকে চিনি বলেই কি পরিচিত নামগুলো বদলে জন্ম নিয়েছে কোয��াসঁভিল (চন্দননগর?), দিনেমারডাঙা (ফ্রেডরিক নগর?), ওলন্দাজডাঙা (চিনসুরাহ?) প্রভৃতি স্থানগুলো?

এই সমান্তরাল জগতে ইতিহাসের হাত ধরে জাদুবাস্তবতা গান গায়, তাই হয়তো চেনাকেও সামান্য অচেনা করতে ভালবেসেছেন পরিমল ভট্টাচার্য। শ্রীঅরবিন্দ হাজির হয়েছেন অ্যাক্রয়েড ঘোষ হিসাবে।  এশিয়াটিক সোস্যাইটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম জোনস তাঁর অন্য নাম ইউনুস আক্সফার্দি ব্যবহার করেছেন নিজের পরিচয় দেওয়ার সময়। আলফানসো আমের নাম হয়েছে পাদরি আম। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ওনার সৃষ্ট চরিত্রকে মাথায় তুলে নিজেকে ক্রাইসচেন করেছেন রাজামোহন চ্যাটার্জি নামে। লেখিকা মারী বেলক আর তাঁর চরিত্র হারকিউল পোপ্যু তাদের পদবি বদলাবদলি করে নিয়েছে।  এ যে আলোছায়ার জগত।

ইতিহাসে কাঁচা বলে হয়তো অনেক চরিত্রের নাম ধরতে পারি নি, তবে আশা করি উপন্যাসের সুবিশাল ব্যপ্তি সম্পর্কে সামান্য ধারণা দিতে পেরেছি।  প্রায় সাতশো বছরের ইতিহাস যা সর্বদা সরস্বতীর তীরবর্তী বন্দরনগরেই সীমাবদ্ধ থাকে নি, ছড়িয়ে গেছে কলকাতার অলিতেগলিতে (চীনাটাউনে সসের স্বাদ), পূর্ব বাংলায় (কাঁচা সিদলের “রূপকথা” কারণ বাপ্পার কাছে সেই দেশ সাতগাঁয়ের থেকেও অলীক, অজ্ঞেয়)। ৬০০ পাতার উপন্যাস জুড়ে বাংলার ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ  ছুঁয়ে গেছেন লেখক। রসগোল্লার জন্ম, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির জীবন আর পুনর্জীবন, আলুর মত ম্লেচ্ছ কন্দের আবির্ভাব, শ্রীরামপুরের ছাপাখানায় বাংলা টাইপফেসের সৃষ্টি, আনন্দমঠ উপন্যাসের উপজনন। বিচিত্র ইতিহাস আশ্চর্য লেখনীর ছোঁয়ায় বিচিত্রতর হয়েছে, ঘোরের সৃষ্টি করেছে আমার মনে।

আর ইতিহাসের এই ঘূর্ণাবর্তের মাঝে রয়েছে আদিরাম পরিবার, বাপ্পার মায়ের তরফের জ্ঞাতি গুষ্টি।  এই আলোচনার শুরুতে প্যারাডক্সের কথা বলেছিলাম না? এই পরিবারও একটা আস্ত প্যারাডক্স, সময়ের সাথে সাথে যারা ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় বিস্মৃতির ডোবায় নিমজ্জিত হতে শুরু করেছে (কানাই যেভাবে মন্দিরের পোড়ামাটির প্যানেলগুলো ঢেকে ফেলেছে টালি দিয়ে)। এই পরিবারে গোঁড়ামি আর উদারনীতির অদ্ভুত সহাবস্থান রয়েছে, যা ঠিক ডিএনএর দুই স্পাইরালের মত বর্তমান থেকে সুদূর অতীত পর্যন্ত চলে গেছে। নন-লিনেয়ার ভাবে এই পরিবারের পরিচয় আমরা পাঠকেরা পেয়েছি, অতীত বর্তমানের ঘোলে তাদের সুখ দুঃখের লম্বা ফিরিস্তি বাংলার ইতিহাসের সমান্তরালে অবস্থান করা হয়েছে অত্যন্ত সুচারুভাবে ("মিডনাইট’স চিলড্রেন" ভালবাসতেন পিবি স্যার, মনে পড়ল)।

“সেই সময়”-এর মত “সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা”-ও সময়ের জীবন্ত নথি। উপন্যাসের শেষে বাপ্পা যেভাবে নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলে, ঠিক সেইভাবে যেন বাংলার পরিচিতি হারিয়ে যাচ্ছে। আংশিক সত্যকে ঘিরে মিথ্যার জাল অবশেষে আমাদেরকেও গিলে ফেলবে, ঠিক যেভাবে বাপ্পাকে গিলে ফেলেছিল। তাই চেনা ইতিহাসকে পুনর্বিচার করতে হলে উপন্যাসটা হাতে তুলে নিন, পাতা উল্টিয়ে বাংলার আলো-ঘ্রাণ-শব্দের স্বপ্ন দেখে নিন এখনই। হয়তো ভবিষ্যতে আর সময় হবে না।
Profile Image for Dipankar Chowdhury.
28 reviews6 followers
January 27, 2026
|| ষষ্ঠীঠাকরুণ ও বানরের দিব্যচক্ষুর আখ্যান ||

“But I am young, O Rustum; and the strong Are not always victorious. I am of Persian blood, And thou art Rustum, whom I have sought so long.”
— Matthew Arnold, Sohrab and Rustum

...কিন্তু আমাদের আজকের এই আখ্যানের নায়কের তো কোনো বনেদী পারসীক রক্তের উত্তরাধিকারের গর্ব ছিল না, বরং সে এই সাড়ে ছয়শত পৃষ্ঠাব্যাপী ক্লাসিকটির সারা অঙ্গ জুড়ে মাথা চাপড়ে গেছে না-জানি-সে-কোন্‌ অবন ঠাকুরের আঁকা চতুর্ভুজা ‘ভারতমাতা’-র এজলাসে...যে ‘মি-লেডি’ শেষাবধি তার সাতশ’ বছরের মাতুলবংশের বঙ্গীয়ধারা মেনে নিলেন না সিলেট-আগত ‘বিদেশী’ বলে দাগড়ে দিলেন তাকে— তারও মীমাংসা হল না, যদিও বঙ্গসাহিত্যের আঙিনায় পাকাপাকি এক আসন করে নিল এই হাওয়াতাঁতি।

সেই দেড় হাজার বছর আগে মহাকবি ফিরদৌসীর কলমে পারসীক-বীর সোহরাব যেমন খুঁজে ফিরেছে বাপ রুস্তমকে, আজকের ভারতবর্ষের নব্য-নাগরিকত্ব আইনের ফাঁদে পড়ে আজকের বাপ্পাদিত্যেরা খুঁজে চলেছে তার পিতা বা মাতার পূর্ব-পূর্বজদের— সেই সেনরাজাদের কালে কান্যকুব্জ নগরী থেকে যাঁদের বঙ্গদেশে পদার্পণ।

কিন্তু হাওয়াতাঁতিরা? তাঁরা কে বা কারা?

তিনটি নদী দিয়ে বাঁধা বেণী—যার দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি, যমুনা ও সরস্বতী আজ অপ্রত্যক্ষ হয়েছেন—গঙ্গাতীরবর্তী সেই ত্রিবেণীর অদূরস্থ নদীবেষ্টিত এক ভূখণ্ড, আকাশ থেকে দেখলে মনে হবে যেন এক পূর্ণ মৎস্য শোয়ানো আছে,—এককালে ছিল দক্ষিণবঙ্গের এক প্রধান বন্দর: সপ্তগ্রাম। লোকমুখে ‘সাতগাঁ’।

অষ্টম শতক থেকে ক্রমে ক্রমে আদিবঙ্গের তাম্রলিপ্তি বন্দরের অধোগতির সাথে সাথে হুগলীজেলার সাতগাঁর রমরমা! সুলতানী ও মোগল আমলে, পরে বিশেষত পর্তুগিজদের হাতে সাতগাঁ (এবং হুগলী) হয়ে উঠল এক প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র, যে সব গল্প পরিমলের এই অতীব সুখপাঠ্য ও গতিময় উপন্যাসে সজীব হয়ে জেগে উঠেছে। বঙ্গ-ইতিহাসের পর্তুগিজ অধ্যায় সাধারণত উপেক্ষিত থাকে বঙ্গসাহিত্যে, যে ফাঁকটা ভরেছে এই উপন্যাসে।

কিন্তু এ’গল্পের আসল নায়ক-নায়িকারা তো এক প্রাচীন কোবরেজ-বংশ, যার আদিপুরুষ রামাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ দিল্লি-আগত লুটেরা দরপ খানের, যিনি ততদিনে সাতগাঁর আলো-হাওয়ায় বাঙালি হয়ে পড়েছেন, এ’দেশেই বাস।

কিন্তু হাওয়াতাঁতিরা?

কে হাওয়ায় হাওয়ায় বুনল তাঁত? কে তার রংরেজ?

সে বা তারা তো সেই ফরাসি-পর্তুগিজ সংস্কৃতি প্রভাবিত সাতগাঁর ম্যাওবিড়ালের গীর্জের ঘন্টাধ্বনি শোনে, তাদের ঘরে এক তিনশ’ বছর বয়সী কাকাতুয়া-এন্টনী পর্তুগালীভাষায় মুখখিস্তি করে। আবার যেখানে নবতিপর শাকম্ভরী পিসিমার গঙ্গাযাত্রা হয়। সাতশত বৎসর পূর্বের আদিরামের থেকে প্রতিষ্ঠা হলেও সময় এখানে থেমে গেছে, যেখানে এই সেদিনও মার্টিন কোম্পানীর ডিসকার্ডেড এক ট্রেন ঝিক্‌ ঝিক্‌ করে চলত, আর ইস্টেশনে অপেক্ষা করত একটি পালকি। এ’বংশের এক প্রাচীন লক্ষণা ঠাকুমা সতী হয়েছিলেন, যার সত্যাসত্য যাঁচতে শ্রীরামপুর থেকে এলেন স্বয়ং উইলিয়ম কেরি। ওড়িশা থেকে পাওয়া এক প্রায়-অজ্ঞাতভাষার পাঠোদ্ধার করতে ‘ইউনুস অক্সফোর্ডি’ উপনামে চলে আসেন স্বয়ং স্যর উইলিয়ম জোন্স….


আব্ব্যুলিশ! লেখক কিন্তু গপ্পের গোড়াতেই ঘোষিয়ে দিয়েছেন,

এটি একটি কল্পকাহিনি। এখানে বর্ণিত সকল নদী, মধ্যবর্তী জনস্থান, জাহাজঘাটা, ঘড়িঘর, গির্জা, ট্যাভার্ন, আদালত, মানুষ, পাখি, বিগ্রহ, শিয়ালের ডাক, জোনাকির মিটমিটে আলো, মার্টিনস রেলের চাকায় কেরেস্তান-গোরস্তান ধ্বনির অস্তিত্ব কেবলমাত্র এই বইয়ের দুই মলাটের মাঝেই রয়েছে,

….কিন্তু এই মানের ও এই ব্যপ্তির উপন্যাস গত তিরিশ বছরে বাংলাসাহিত্যে লেখা হয়নি।

তার আগেও কি হয়েছিল?

এ’ উপন্যাস পড়তে পড়তে অনেকবার মনে হয়েছে ‘ইছামতী’ পড়ছি। ঐতিহাসিকতার ঘনঘটায় কখনও আবার আসে বঙ্কিমী ঝংকার! বস্তুত, পরিমলের এই হাওয়াতাঁতিরা বঙ্গীয় উপন্যাসধারার দেড়শ’ বছরের প্রয়াসের নির্যাস!

***

ইতিহাস তো হলো।

এই উপন্যাসের ভাষাভঙ্গিমার কথায় মনে পড়ে ‘উপমা কালিদাসস্য, ভারবেরর্থগৌরবম্‌’ ইত্যাদি। বস্তুত, পাতায় পাতায় এত এত সুপ্রযুক্ত উপমার প্রাচুর্য যে শুধু তাই নিয়েই একটা নিবন্ধ লেখা যেতে পারে।

আর চরিত্র চিত্রণ?

এন্টনী কাকাতুয়ার মতো হার্লে ডেভিডসনের জবরদস্ত্‌ বাইকটাও কি উপন্যাসের এক প্রিয় চরিত্র নয়? বা কলার ভেলায় ভেসে আসা সাপে-কাটা কিশোরী মান্দাসী, যার ���োমরে পর্তুগালী দাস-ব্যবসায়ী কোম্পানীর ত্রিভুজাকৃতি সিলমোহর! স্বাধীনতাসংগ্রামী-টার্নড-কম্যুনিস্ট হেমন্তমামার প্রসঙ্গে বরোদা থেকে লুকিয়ে সাতগাঁয়ে চলে আসছেন অরবিন্দ ঘোষ, তখনও ‘ঋষি’ হননি।

আর কত বলব? বলতে বলতে ঝাঁপি যে আর ফুরোবে না!

***

দার্জিলিং নিয়ে, তিব্বত নিয়ে, ওড়িশার আদিবাসীদের নিয়ে অতি অতি মনোজ্ঞ লিখন পরিমলের কলম থেকে বেরিয়েছে আগে, কিন্তু উপন্যাস?

প্রায় ষাট বছর বয়সে পৌঁছে প্রথম উপন্যাস লিখে এতখানি মাতাতে আর কে পেরেছেন, জানি না। এত বড় ক্যানভাসে বাংলা উপন্যাসও সম্ভবত আগে লেখা হয়নি।

এ’ উপন্যাস না পড়লে আধুনিক বাংলাসাহিত্যের পাঠ অপূর্ণ থেকে যাবে।

পুনঃ

প্রথম পাতায় লেখাঃ

“ষষ্ঠীঠাকরুণ বানরের চোখে হাত বোলালেন, বানরের দিব্যচক্ষু হল।”
—অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ক্ষীরের পুতুল’

কোনো গ্রন্থের উৎসর্গপত্রী দেখে এতোটা অনির্বচনীয় আনন্দ আগে কখনও পাইনি।।

Profile Image for Shotabdi.
827 reviews206 followers
April 4, 2025
'পিতাপুত্র, দুই পুরুষ, অনেক পুরুষের মাঝে বসে কফি খায়।' বইয়ের ৪৭১তম পৃষ্ঠায় এই লাইনটি যখন লেখা হচ্ছে, তার আগে ঘটে গেছে অসংখ্য ঘটনা। বাপ্পার মায়ের কুলের এই গল্পে এসে গেছেন কত আদি মানব। বুনে চলেছেন এক কুহকী জাল। এই দুই পুরুষের জীবনে একটা সংকটকাল। 'মনে হয় যেন ওরা দুজনে ওল্ড স্পাইসের বোতলে আঁকা পালতোলা জাহাজে চেপে পাড়ি দিয়েছে। অচেনা বিক্ষুব্ধ সমুদ্র, তার ওপরে কেবল ওরা দুজন।' আরো অনেক পরে যেখানে এক পুরুষকে হারিয়ে একাকী পরিচয় সংকটে পড়ে বাপ্পা বুনবে এই কথার মায়াজাল।

নন-ফিকশন লেখক পরিমল ভট্টাচার্য এর ফিকশন 'সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা' পড়ার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা পোহাতে হয়েছে আমাকে। হাতে আসার ধীরে ধীরে ডুব দিয়েছি বাস্তব-অবাস্তবের ঠিক মাঝামাঝি এক খেয়ালি রূপকথার জগতে।

দেশভাগের উপর মোলায়েম আঁচড় কেটে বইয়ের শুরুটা আমায় ভাবিয়েছে যে বইটা হয়তো সিলেট-আসামের কোন অঞ্চলের কল্পিত কোন আখ্যান হতে চলেছে। নিজে সিলেটি তাই শুঁঁটকি আমারও প্রিয়, ওসমানী মেডিকেলের নাম দেখে চমকে ওঠা এই আমি কতটা উন্মাদনা ঐ মুহূর্তে অনুভব করেছি রক্তে তা জানবেন না ওসমানী, জানবে না ইট-কাঠের বিশাল স্থাপত্যটি আর জানবেন না পরিমল ও। কেবল বুঝব আমি যার অন্যতম প্রিয় লেখক পরিমল ভট্টাচার্য আর যার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাঙ্গন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ, যেন আমারই দুহাতে ব্যালেন্স হয়ে আছে দুটো ভিন্ন জগৎ।

এরপরের চ্যাপ্টারেই সাতগাঁয় গিয়ে যখন পড়ল গল্পটা তখন সম্পর্ক বোঝার জন্য বংশলতিকাটা আবার উল্টাতে হলো আমাকে। বুঝলাম বংশলতিকাটি শিউলির দিকের আর শিউলির ছেলে বাপ্পা মায়ের দিক থেকেই গল্পের কথক/নায়ক বা পাঠক।

বাপ্পার সাথে একাত্ম হয়ে তাই দেখলাম হোমিওপ্যাথি আর আয়ুর্বেদিক জ্ঞান এর পাশাপাশি অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন এক পিতাকে, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন শিউলিকে, দৃঢ় স্নায়ুর রথীনকে, কলুটোলা লেনের আড্ডাকে, তিতলিকে, নতুন বৌকে, অ্যান্টনি কাকাতুয়াকে, বামুনদিকে। জাদুবাস্তবতার পরশে যেখানে অ্যান্টনিও হয়ে ওঠে পিতা! শাকম্ভরী দেবী জন্ম দেন উনিশটি মৃত সন্তানের, সরোজা নদীর জলে ডুব দিয়ে কোন তার ছাড়া বহুদূর থেকেই আলাপ করতে পারেন নিজ বাড়ির দাইবুডির সঙ্গে, একই বাড়িতে ঘোড়াও থাকে হার্লে ডেভিডসন ও থাকে, হেমন্তও থাকেন যিনি কমিউনিস্ট ছিলেন এক কালে আর বনলতা নামে এক বিপ্লবী অপার্থিব তেজস্বী নারী।

রাজমোহন চাটুজ্যের রূপ ধরে অতি চেনা মনীষী দেখা দিয়ে যান। কলকাতা বিরিয়ানির ইতিহাস, ভূপেন্দ্রলালের আদলে মহেন্দ্রলাল আর ওয়াজিদ আলি শাহ মিলেমিশে এক হয়ে যান। প্রসাদ শাস্ত্রী যে আদিরামবাটিতে পুঁথি খুঁজতে যান, তিনি যে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আর চর্যাপদ খুঁজে বেড়াচ্ছেন- এই আবিষ্কার উদ্দীপিত করে। ব্রিটিশ পিরিয়ড পার হয়ে 'দাবায়ে না রাখার' স্বাধীনতার গল্প আসে। এইসব সত্য চরিত্রের পাশাপাশি বাঁটুল দি গ্রেট এক আশ্চর্য আলোছায়া সৃষ্টি করে। প্রাচীন ইতিহাস থেকে উনিশ শতকের আলোড়ন হয়ে মন্থরগতিতে প্রতিটি চরিত্রের সার্থকতা বজায় রেখে উপন্যাসটি এগুতে থাকে সমাপ্তির দিকে।

অসম্ভব প্রিয় আরেক বই মার্কেজের নি:সঙ্গতার একশ বছর কি একটু একটু মনে পড়ে যায় না? ওই সুবিশাল প্রভাবশালী উপন্যাসটি যে পরিমলকে মুগ্ধ করেছে সেটা জানা থাকলেও এই উপন্যাস একান্তই পরিমলীয়। নন ফিকশনের ভাষাকে একটু সরলীকরণ করেছেন লেখক এতে কিন্তু তাঁর ভাষার প্রায়োগিক দক্ষতা এবং উচ্চতা কোনটাই বিনষ্ট হয়নি বরং উপন্যাসে এইই দরকার ছিল।

৬৪৮ পৃষ্ঠার বড় এই গ্রন্থে অসংখ্য চরিত্র, কিন্তু সকলেরই রয়েছে আলাদা গল্প। আবার রয়েছে ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা কিংবদন্তি, চরিত্ররা। সাতগাঁর গল্প তাই কখন হয়ে ওঠে আন্তজার্তিক পাঠক টেরও পান না। ধীরে ধীরে এ গল্প হয়ে উঠে বাঙালির ইতিহাসের, বদলগুলো যেন বইয়ের পাতায় পাতায় পাঠকের সামনে আসতে থাকে। তুঘলকি মোহর ক্ষয় হয়ে যায়, ইতিহাসের বিনির্মাণ চলতে থাকে, ফাঙ্গাস পড়ে নষ্ট হতে থাকে জটিল আচাররীতির ওপর গড়ে ওঠা একটি বর্ণ সমাজ।

গৌড়, লখনৌতি কিংবা সাতগাঁর কেন্দ্র ছেড়ে মানু্ষ হতে থাকে কলকাতামুখী, যে কলকাতাতে গেলেই জাতনাশ হয় কিন্তু সেই কলকাতাই একদিন হয়ে উঠবে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী থেকে পরবর্তীতে অন্যতম ইতিহাসমণ্ডিত সাংস্কৃতিক শহর।

ক্রমে বাপ্পাদিত্য রূপকথার চরিত্র হয়ে ওঠে, পরিচয় হারিয়ে, পরিচয় খুঁজতে গিয়ে। কিন্তু পঞ্চইন্দ্রিয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নাসিকা- যার কাজ ঘ্রাণ নেয়া, সেটা সিদলের হোক আর স্মৃতির হোক, প্রমাণ রেখে যায় কি? বাপ্পা তাই তার গোটা জীবন এবং তারও আগের জীবন ঢুঁড়ে বের করে এক আশ্চর্য অবিনশ্বর সত্য- 'সিমিলিয়া সিমিলিবাস কিউরেন্টার, অর্থাৎ যা অসুস্থ করে তাই সারিয়ে তোলে, এর একটিই মাত্র উপমান পৃথিবীতে আছে: তার নাম ভালোবাসা।'
Profile Image for piya  Sarkar.
1 review
August 18, 2025
বাংলা বলতে যা বুঝি, হাজার হাজার বছর আগের এক সজীব সবুজ তৃণভূমি আর তার ইতিহাস, সেই ইতিহাসের গৌরবময় বৃত্তান্ত, আর স্রোত মরে যাওয়া এক নদীর মত, সেই নদীর পথ ধরে ধরে চলে এমন এক প্রেক্ষাপটে উপস্থিত হওয়া, যার বিবরণে হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকা, স্থির করতে না পারা, অতীত না বর্তমান, কে বেশি বাস্তব; আর তারপর মূঢ়তায় অবিচল হয়ে এই সিদ্ধান্তে আসা, যা দেখেছি, যা জানি এবং যা দেখছি ও দেখব--এসবের সংযোগ আসলে বয়ে নিয়ে চলেছে সময়। সময় একখানি নৌকার মতো, যেন সে স্থির, তার দু'ধারে শুধু কালস্রোতে ভেসে ভেসে আসে শতাব্দী ব্যাপী সমাজ, লোকায়ত জীবন, মানুষের হাসি, কান্না, যন্ত্রণা, হাহাকার। এই উপন্যাসের মূল চরিত্র কোনো এক মানুষ নয়, একাধিক মানুষও নয়, এই উপন্যাস আদতে একটি বিস্তৃত সমাজদর্পণ। সুলতানি আমলের বঙ্গভূমি থেকে এন আর সির বঙ্গভূমি, আর তার মধ্যিখানে দোলায়মান ক'জন ভাগ্যতাড়িত মানুষের নির্বাক জীবনপান।
অনেকেই সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিকে মার্কেজের জনপ্রিয়তম উপন্যাস হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচিউডের সঙ্গে তুলনা করেছেন, কয়েকটি ক্ষেত্রে আমার নিজেরও তা মনে হলেও, সবথেকে বেশি মনে পড়েছে রবীন্দ্রনাথের কথা।
"হেথায় দাঁড়ায়ে দু-বাহু বাড়ায়ে

নমি নর-দেবতারে,

উদার ছন্দে পরমানন্দে

বন্দন ক���ি তাঁরে।"
: সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা নর-দেবতার আখ্যান। জীবন তাড়িত, পীড়িত, অথবা সময়ের ডোঙায় বয়ে যাওয়া এক জাতির গল্প। সাতগাঁ বা সপ্তগ্রামকে ঘিরে রচিত এই উপন্যাসের আখ্যান এক লুপ্তনদী সরস্বতী আর তার কিনার ঘিরে গড়ে ওঠা বসতির শতাব্দীর পর শতাব্দীর ধরে ভাঙন ও উত্থানের ইতিহাস। ইতিহাস যা বইয়ের পাতায় হয়ত আছে, কিন্তু অক্ষরলিপির নিগড় থেকে নিজেকে মুক্ত করে উড়াল দিয়েছে লেখকের অবিস্মরণীয় বোধভাষ্যে। কতকিছু তুলনীয় মনে হয়। আবার কতকিছু অতুলনীয়। সময়কে আকর করে বাংলায় কী আর এরম আখ্যান রচিত হয়নি? সুনীলবাবুর সেই সময়? অতীন বাবুর নীলকন্ঠ পাখি? তবে এই উপন্যাস কেন এত অনিবার্য? তার একটি কারণ হতে পারে এর বিস্তৃতি। ১৪০০ শতাব্দীর সুলতানি যুগ থেকে শুরু করে বর্তমানকে ছুঁয়ে, নন লিনিয়ার ন্যারেটিভে এমন মায়াময় ইন্দ্রজাল তৈরি করা লেখকের অগাধ অতল বোধের পরিচয়। বোধ আর জ্ঞানের যে অনতিক্রম্য পার্থক্য, তাই আসলে এই সাহিত্যকর্মটির এত অনিবার্য হওয়ার রসদ বলে আমার মনে হয়েছে।
কতকিছু মনে পড়ে গেছে পড়তে পড়তে। শৈশবের ক���া, যৌবনের কথা, মাতৃত্বের কথা, নারীত্বের কথা। বেনারসের বিধবা মহিলাদের কথা পড়েছি, জীবন উপান্তে এসে কিভাবে সমস্ত শুচিবাই, আচার মুছে গিয়ে জীবনকে সরেস আইসক্রিমের মতো চেটে নিতে চেয়েছেন তারা। নিজের কথা মনে পড়েছে। সাংঘাতিক শুচিবাইগ্রস্ত শাশুড়ি মার যাবতীয় সংস্কারপ্রিয়তা ধীরে ধীরে চোখের সামনে মুছে যেতে দেখেছি। পা ছুঁয়ে প্রণাম করলে যিনি এয়োস্ত্রী হও, এবাদে আর কোনো আশীর্বাণী দেননি, জীবন উপান্তে এসে দেখি আমার সিঁদুর না পরা নিয়েও বিরূপ নন। অদ্ভুত ঘাত প্রতিঘাতের কথা মনে পড়িয়ে দিয়েছে সাতগাঁ। তাতে অতি প্রিয়জনের দেওয়া বিষ বা অমৃত দুই-ই আছে। আছে যৌথ পরিবার‍যাপন থেকে ছিটকে আসা সময়ের স্মৃতি। মানুষের পরিচিত বা অপরিচিত মুখের আদলে সেই নরদেবতা, যার স্পর্শ পেতে একমাত্র অধীর হয়েছি এই সামান্য জীবনে, সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা তাঁদের সকলকে তাঁদের আলো ছায়া কুহক আর বাস্তবে মুড়ে আমার সম্মুখে রেখেছে এমন ভাবে যেন চাইলেই তাঁদের সঙ্গে দেখা হতে পারে।
পরিমল ভট্টাচার্যের গদ্যভাষা তাঁর অন্য বইগুলোর মাধ্যমে, এযাবৎ আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা বোধহয় গদ্যভাষা অতিক্রম করে ওঁর কাজের সঙ্গে চিরন্তন এক সম্পর্কে বেঁধে ফেলল আমায়-- যার কথা লেখক নিজেই সর্বশেষ বাক্যে লিখেছেন
"এই একটিই জন্ম মানুষের হাতে আছে, এবং সিমিলিয়া সিমিলিবাস কিউরেন্টার, অর্থাৎ যা অসুস্থ করে তাই সারিয়ে তোলে, এর একটিই মাত্র উপমান পৃথিবীতে আছে; তার নাম ভালোবাসা।"
Profile Image for Bratik Bandyopadhyay.
23 reviews
December 30, 2025
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা: এক অসীম সময়ের মহাকাব্যিক প্রবাহ

পরিমল ভট্টাচার্যের 'সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা' (২০২৫, অবভাস প্রকাশনা) বাংলা সাহিত্যের দৃশ্যপটে একটি অসামান্য সংযোজন । এটি কেবল একটি উপন্যাস নয়, বরং একটি জীবন্ত ইতিহাসের ক্যানভাস, যেখানে সাতশো বছরের ঘটনাক্রম একটি পরিবারের নয় প্রজন্মের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়। হুগলি এবং সরস্বতী নদীর মধ্যবর্তী 'মাছের আকৃতির' সেই প্রাচীন বন্দরনগরী সাতগাঁকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই কাহিনী, মৌসুমী হাওয়ার প্রবাহের মতোই অস্থির এবং অবিরাম।
লেখক এখানে বাংলার ঐতিহাসিক গভীরতাকে একটি সাহসী কল্পনার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন।

উপন্যাসটি শুরু হয় সাতগাঁর সেই অদ্ভুত ভূপ্রকৃতিতে—হুগলি এবং সরস্বতী নদীর সংযোগস্থলে, যা মাছের মতো আকৃতিতে বিস্তৃত। এখানে কয়েক শতাব্দী ধরে আরব, চীনা এবং ইউরোপীয় বণিকরা মৌসুমী হাওয়ার সাহায্যে যাত্রা করেছে; পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসিরা ডেরা বেঁধেছে। কিন্তু কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দু একটি স্মার্ত ব্রাহ্মণ পরিবার—চট্টোপাধ্যায়রা—যাদের নয় প্রজন্মের ইতিহাস এই নদীতীরের সঙ্গে জড়িত। এই পরিবারের ৪৯টি প্রধান চরিত্রের মধ্যে মানুষের পাশাপাশি একটি কাকাতুয়া, একটি ঘোড়া এবং একটি হার্লি ডেভিডসন মোটরবাইকও রয়েছে, যা দেখায় যে এখানে 'চরিত্র' বলতে শুধু মানুষ নয়, বরং সময়ের অংশীদার সবকিছুকে বোঝানো হয়েছে।

উপন্যাসের প্লটটি রৈখিক নয়, এটি হাওয়ার মতোই ঘুরে-ফিরে চলে, অতীতের ঘটনা বর্তমানের সঙ্গে মিশে যায়, মিথ এবং ইতিহাসের সীমা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি 'হলফনামা' (শপথপত্র) এই কাহিনীর মূলে রয়েছে, যা পরিবারের ভাগ্যকে নির্ধারণ করে এবং প্রশ্ন তোলে: ইতিহাস, মিথ ও স্মৃতির অলীক ধারা কি একটি পরিবারকে বাঁচাতে পারে? এই গঠনটি উপন্যাসকে একটি মহাকাব্যে পরিণত করে, যেখানে সাতগাঁ শুধু একটি স্থান নয়, বরং বাংলার সামগ্রিক ইতিহাসের প্রতীক—মৎস্যভূমি থেকে উপনিবেশকালীন বন্দর, এবং আধুনিক হুগলী জেলা পর্যন্ত।

হাওয়া—পরিবর্তনের অদৃশ্য শক্তি
উপন্যাসের শিরোনাম 'সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা' নিজেই একটি ইঙ্গিত: 'হাওয়াতাঁতিরা' বলতে মৌসুমী বাতাসের তাঁত (পাল) বোঝানো হয়েছে, যা বণিকদের জাহাজ চালিয়েছে। হাওয়া এখানে সময়ের প্রবাহ, অস্থিরতা এবং পরিবর্তনের প্রতীক। বাংলার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, মৌসুমী বাণিজ্যপথগুলো (যেমন আরব-চীনা বাণিজ্য) হাওয়ার উপর নির্ভরশীল ছিল, এবং লেখক এই মোটিফকে ব্যবহার করে দেখান কীভাবে বাহ্যিক শক্তি (উপনিবেশবাদ, বাণিজ্য) একটি সমাজের অভ্যন্তরীণ গঠনকে আমূল বদলে দেয়।

একদিকে হাওয়া যেন সৃষ্টিকর্তা—এটি নতুন যাত্রা শুরু করে, নতুন সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ, পর্তুগিজ এবং ডাচ বণিকদের আগমন হাওয়ার সঙ্গে যুক্ত, যা সাতগাঁকে একটি মাল্টিকালচারাল হাবে পরিণত করে। কিন্তু অন্যদিকে, এটি ধ্বংসাত্মকও—যেন ঝড়ের মতো, এটি ঐতিহ্যকে উড়িয়ে নেয়। পরিবারের প্রজন্মগুলো এই হাওয়ার শিকার। প্রথম প্রজন্মের ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্য চীনা বাণিজ্যের সঙ্গে মিশে যায়, পরবর্তীতে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ এটিকে আরও জটিল করে। এই থিমটি মনে করিয়ে দেয় যে পরিচয় স্থির নয়, বরং অবিরাম বিলম্বিত এক প্রক্রিয়া। পাঠক যেন অনুভব করে, হাওয়া যেমন দৃশ্যমান নয়, তেমনি ইতিহাসের গতিও অদৃশ্য, কিন্তু অপ্রতিরোধ্য। বিষয়ের এই গভীরতা উপন্যাসকে মনোজ্ঞ করে তোলে, কারণ এটি পাঠককে নিজের জীবনের 'হাওয়া'গুলোর সঙ্গে যুক্ত করে।

একটি পরিবারের মাধ্যমে সাতশো বছরের ইতিহাস বর্ণনা করা সহজ নয়, কিন্তু লেখক এটিকে অসাধারণভাবে সম্ভব করেছেন। চট্টোপাধ্যায় পরিবার এখানে শুধু একটি নয়, বরং বাংলার সামাজিক বিবর্তনের প্রতীক। নয় প্রজন্মের মধ্যে প্রত্যেকটি একটি যুগকে প্রতিফলিত করে: প্রথমগুলোতে ব্রাহ্মণ্য রীতি এবং স্থানীয় মৎস্যভূমির জীবন, মধ্যবর্তীতে উপনিবেশকালীন সংঘর্ষ, এবং শেষগুলোতে আধুনিকতার দ্বন্দ্ব। ৪৯টি চরিত্রের বৈচিত্র্য—মানুষ থেকে পশু-যান—দেখায় যে ঐতিহ্য একটি চেইন, যা অ-মানবিক উপাদান দিয়েও বজায় থাকে।

এই থিমটি পরিবারকে 'কালের সেতু' হিসেবে দেখায়। এখানে পরিবারই মিডিয়াম, যার মাধ্যমে ইতিহাস প্রচারিত হয়। কিন্তু এটি রোমান্টিক নয়, এতে বিচ্ছেদ, বিশ্বাসঘাতকতা এবং পুনর্মিলনের টানাপোড়েন রয়েছে। হলফনামাটি এখানে একটি মেটাফর—যেন একটি আইনি দলিল যা ঐতিহ্যকে সুরক্ষিত করে, কিন্তু সময়ের সামনে অসহায়। পাঠকের জন্য এটি একটি আয়না, আমাদের নিজের পরিবারের গল্প কতটা ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত? উপন্যাস এবং তার চরিত্রগুলির এই গভীরতা পাঠককে যেন 'গ্রাস করে ফেলে'।

সাতগাঁর বন্দর হিসেবে এই উপন্যাস উপনিবেশবাদের একটি জটিল চিত্র তুলে ধরে। আরব-চীনা বাণিজ্য থেকে ইউরোপীয় দখল—এসব শুধু ঘটনা নয়, বরং সংস্কৃতির মিশ্রণের উৎস। লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে এই মিশ্রণ বাংলার পরিচয় গড়ে তোলে। একদিকে ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্য, অন্যদিকে পর্তুগিজ খ্রিস্টান প্রভাব বা ডাচ বাণিজ্যিকতা। এখানে উপনিবেশবাদ শুধু দমন নয়, বরং নতুন পরিচয়ের জন্মদাতা।

এই বিষয়টি একটি প্রশ্ন তোলে, বাংলা কি তার অশুদ্ধতাতেই বিশুদ্ধ? উপন্যাসে চরিত্রগুলোর মাধ্যমে এটি উন্মোচিত হয়—একজন প্রজন্ম চীনা মশলার বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ে, অন্যজন ফরাসি কলোনিয়ালিজমের শিকার হয়। কিন্তু এতে কোনো বিদ্বেষ নেই; বরং একটি উদাসীনতা, যেন হাওয়া সবকিছুকে মিশিয়ে দেয়। এই মিশ্রণ সিলেটের চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলার বিস্তৃত ভূগোলকে এক করে।

বইটি মিথ, স্মৃতি এবং ইতিহাসের এক অসামান্য সংমিশ্রণ। এর অন্যতম অসাধারণত্ব হলো ইতিহাস এবং মিথের মিশ্রণ। সাতগাঁর লোককথা, নদীর দেবতা এবং বণিকদের কিংবদন্তি—এসব স্মৃতির অলীক ধারায় বোনা। এই উপন্যাসে স্মৃতি ইতিহাসকে পুনর্নির্মাণ করে। হলফনামাটি এখানে একটি মি���িক ডকুমেন্ট, যা প্রশ্ন করে, সত্য কি ঐতিহাসিক রেকর্ডে, না স্মৃতির গল্পে? চরিত্রগুলোর বৈচিত্র্য (কাকাতুয়া যেন একটি মিথিক সাক্ষী) এই সংমিশ্রণকে জীবন্ত করে। ফলে, উপন্যাসটি পাঠককে চিন্তা করায়, আমাদের ইতিহাস কতটা কল্পনা-সমৃদ্ধ?

উপন্যাসের ভাষা কাব্যিক এবং সহজবোধ্য —নদীর প্রবাহের মতো, এটি পাঠককে বয়ে নিয়ে যায়। শৈলীতে পোস্টমডার্ন উপাদান রয়েছে: নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভ, মাল্টি-ভয়েসড চরিত্র। এটি এমন একটি ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস, যা শুধুই ঘটনার তালিকা নয়, বরং এক দার্শনিক অনুসন্ধান।

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা একটি মনোজ্ঞ যাত্রা—যেখানে হাওয়া আমাদেরকে অতীত থেকে ভবিষ্যতে নিয়ে যায়। উপন্যাসটির বিষয়ের গভীরতা এটিকে অসাধারণ করে তোলে। যদি আপনি বাংলার আত্মার সন্ধানে করতে চান, এই উপন্যাস আপনার জন্য।
Profile Image for Ronel Barua.
60 reviews5 followers
January 30, 2026
দীর্ঘদিন বাংলা সাহিত্য কালজয়ী ফিকশনের যে খরায় জীর্ণ ছিল সেই খরার বুকে এক পশলা বৃষ্টি ‘সাতগাঁর হাওয়াতাতিরা’।

“মি'লেডি, ক্যালকাটা শাস্ত্রীর এই আবিষ্কার বাংলা ভাষাকে – মিশ্র অর্বাচীন বুলি হিসেবে যা চিরকাল সংস্কৃত পণ্ডিতদের অবজ্ঞার শিকার হয়েছে, রাজারামের মতো কট্টর নৈয়ায়িকেরা এমনকি দৈনন্দিন কাজেকর্মেও যে ভাষাকে অস্বীকার করতে চেয়েছন– কয়েক শতাব্দী প্রাচীন অতীতের কোলে স্থাপন করল। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহেঞ্জোদড়ো আবিষ্কার যেমন ভারতীয় সভ্যতার কয়েক হাজার বছরের প্রাচীনত্ব চিহ্নিত করেছিল, এটিও তেমনই এক যুগান্তকারী আবিষ্কার।”—

একটি পরিবারের নয়টি প্রজন্মের সাতশো বছরের ইতিহাসকে ধারণ করে রচিত এই মহা–উপাখ্যানটি এক বিস্তৃত কালপরিসরে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক টানাপোড়েনকে তুলে ধরেছে। মন্দিরে ব্রিটিশ কামানাঘাত থেকে শুরু করে সমকালীন ভারতের এনআরসি সমস্যার মতো স্পর্শকাতর বাস্তবতা, সবই এই উপন্যাসের আখ্যানভূমিতে মিশে গেছে গভীর দক্ষতায়।

সময়ের প্রবাহে কাহিনির সত্যানুসন্ধানে হাজির হন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী—কলকাতা শাস্ত্রী নামে; শ্রীঅরবিন্দ আবির্ভূত হন অ্যাক্রয়েড ঘোষ পরিচয়ে; ইউনূস আক্সফার্দি রূপ নেন উইলিয়াম জোনসে; আর বঙ্কিমচন্দ্র চেনা দেন রামমোহন চ্যাটার্জি নামে। ইতিহাস যদি পাঠকের কাছে অপরিচিত বা কাঁচা হয়, তবে চরিত্র শনাক্ত করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই হোঁচট খাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বইটি পড়তে গিয়ে বহুবার ইতিহাসের আশ্রয় নিতে হয়েছে।
এমনকি যে পরিবারের কেন্দ্র ঘিরে এই উপাখ্যান রচিত—শূন্যপুরাণের অনুল্লেখিত রচয়িতা রামাই পণ্ডিত, তাকেও নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে জানতে, ভাবতে ও অনুসন্ধান করতে হয়েছে ভিন্ন কষ্টিপাথরে। চরিত্রদের গতির সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে না পারলে পাঠকের পা পিছলে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।

সাতশো বছরের ইতিহাসকে আখ্যানবদ্ধ করা নিঃসন্দেহে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। তবে লেখক সেই দুরূহ কাজটি করেছেন অসাধারণ সংযম ও সূক্ষ্মতায়—কখনো অতীতের অলিন্দে, কখনো বর্তমানের বাস্তবতায়, আবার কখনো স্মৃতিচারণার আবেশে কাহিনিকে প্রবাহিত করে।

ঐতিহাসিক উপন্যাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকে ঐতিহাসিক চরিত্র ও কালপর্বের মেলবন্ধনে। এই উপন্যাসে লেখক পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দরপ খান, শাহজালাল, ব্রিটিশ শাসনকাল, দেশভাগ, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক জাতীয় আইনকে একসূত্রে গেঁথেছেন, ঠিক যেন নক্সীকাঁথার নিখুঁত কারুকাজ।

স্মৃতি, কিংবদন্তি ও নথির সম্মিলনে চর্চাপদ আবিষ্কার, লোককথার মতো নানা উপাদান বাস্তব ইতিহাসের সঙ্গে আপন গতিতে মিশে গেছে। এই স্বতঃস্ফূর্ত মিশ্রণ উপন্যাসটিকে দিয়েছে এক অনন্য আখ্যানধর্মী গভীরতা।

ধর্মীয় সংস্কার ও সংস্কারমুক্ত হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে রামনুজ, গঙ্গারাম ও পাগলরাম চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে—যেখানে বিশ্বাস ও প্রশ্ন একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ায়।
—“ঘোর কলির আর বাকি রইল কী!' রামানুজ আক্ষেপ করেন। 'স্মার্ত নৈয়ায়িক বংশের সন্তান যজন অধ্যাপন ছেড়ে কর্মকার হয়েছে। আরেকজন শুদ্র অস্পৃশ্য দেহ স্পর্শ করে রোগনির্ণয় করছে। স্বর্গত পূর্বপুরুষেরা এইসব দেখে কী নরকযন্ত্রণাই যে ভোগ করছেন!”

৪৭-এ ফেলে আসা চরিত্রগুলোর অনিবার্য পুনর্মিলন ঘটে ’৭১-এ তানভীরের শহীদ হওয়ার বেদনাবিধুর ঘটনায়—যেন ইতিহাস নিজেই নিজের অসমাপ্ত হিসাব চুকিয়ে নেয়।

মি. লেডি, সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই দীর্ঘ, বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক উপাখ্যানকে ঠিক কোন শ্রেণিতে ফেলব? ঐতিহাসিক, আঞ্চলিক, না কি আত্মজৈবনিক? আমার বিবেচনায়, একে ঐতিহাসিক–আঞ্চলিক উপন্যাস বললেই বোধ হয় সবচেয়ে যথাযথ হবে।

অবশেষে, দীর্ঘ বিরতির পর বাংলা সাহিত্য এক কালজয়ী উপন্যাস তার দোলনায় তুলল।


৩০/০১/২০২৬ ইং।
Profile Image for Sudeep Chatterjee.
Author 15 books39 followers
February 22, 2025
বইমেলা থেকে একটাই বই কিনেছি। হয়তো আমার মতো অনেকেই এই একটা বইয়ের জন্য হাপিত্যেশ করে বসে ছিলেন কয়েক বছর ধরে। ৬৪৮ পাতার বই। বলতে পারি, বাংলায় এমন এপিক মায়াবী উপন্যাস সম্ভবত আগে লেখা হয়নি, এভাবে লেখা হয়নি। সংক্ষেপে একটা আইডিয়া দেওয়ার চেষ্টা করছি।

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতির সাতগাঁর আদিরামবাটি বংশের নয় প্রজন্মের সুবিশাল আখ্যান। বইয়ে তেরোটি অধ্যায় আছে। প্রত্যেকটায় আটটা দশটা করে পর্ব। ব্লার্বে বলাই আছে, এখানে প্রধান চরিত্র পঁয়তাল্লিশটি, এছাড়াও ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন বিন্দুতে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র এসেছেন। এসে মুখ দেখিয়েই বিদায় নেননি, বরং স্বল্প সময়ের মধ্যে নিজের অস্তিত্ব, দর্শন, এবং কালক্রম সম্পর্কে পাঠককে অবগত করে একটা দীর্ঘস্থায়ী ইম্প্যাক্ট তৈরি করে গেছেন। প্রথম পাতাতেই একটা দীর্ঘ বংশতালিকা আছে, যা দেখে হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিটিউডের কথা মনে পড়া অসম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন সাতগাঁর সাহিত্যিক অবস্থানের সঙ্গে মাকোন্দোর তুলনা অনায়াসে টানা যায়। কিন্তু তফাত আছে। শৈলি বা উচ্চাকাঙ্খার দিক থেকে কোথাও সেই বইটি এই আখ্যানকে অনুপ্রাণিত করে থাকলেও এই বইটি আদপে একটি স্বতন্ত্র, স্বতঃস্ফূর্ত রচনা। স্কেল, আঙ্গিক, ডিটেলিং, চরিত্রায়ন, বর্ণনা, কল্পনা সবদিক থেকেই পরিমল ভট্টাচার্যের কলম যে উচ্চতা স্পর্শ করেছে, না পড়লে বোঝা মুশকিল। গাবোর বইটা নিয়ে কিছু কিছু খুঁতখুঁতে পাঠকের অভিযোগ ছিল, এত চরিত্র আর ঘটনার ঘনঘটার ফলে অনেক চরিত্র ঠিকঠাক এস্ট্যাবলিশ হয়নি, অনেকের সঙ্গে সেই কানেকশন তৈরি হয় না, সেই মনসংযোগ হয় না। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে এই বইয়ের চরিত্রদের কোনও তাড়া নেই, তারা স্থিরমতি, স্থিতিশীল, নিজের নিজের জীবন নিয়ে শান্তিতে আছে, কারো গল্পের চরিত্র হওয়ার বাসনা নেই। কারণ, এখানে গল্প বলতে যা আছে, তা আছে নন লিনিয়ার ন্যারেটিভে। এই নন লিনিয়ার ন্যারেটিভে সামনে আসা একের পর এক চরিত্র তাদের নিজ নিজ কাহিনি নিয়ে এতটাই সম্পূর্ণ যে পাঠক মুগ্ধ হয়ে পড়ে চলে। ইতিহাসের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা অগুনতি লোককথা, উপাখ্যান সাবলীল ভাবে মিশে গেছে ন্যারেটিভের সঙ্গে। ভাষার কথা না বলাই ভালো, কারণ পরিমল ভট্টাচার্যের কলমের সঙ্গে পরিচিত পাঠক জানেন, তিনি বাংলা ভাষাকে ঠিক কোন জায়গায় নিয়ে যেতে পারেন! তাঁর লেখায় গভীরতা আছে, দর্শন আছে, প্রজ্ঞা আছে, এম্প্যাথি আছে, কিন্তু অয���া জটিলতা ঢোকানোর প্রবণতা নেই, আমার মতন সাধারণ পাঠকও নাগাড়ে পড়ে যেতে পারে, বই ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু যে কথাটা না বললেই নয়, তা হল, ভীষণ ভাবে 'উচ্চাকাঙ্খী' আর 'আন্তর্জাতিক' হওয়া সত্ত্বেও এই লেখা ভীষণ ভাবে আপন, ভীষণ ভাবে রুটেড, ভীষণ ভাবে বাঙালি। বলা যায় আধুনিক বাঙালির ইতিহাস ও অস্তিত্বের জীবন্ত বয়ান, যা সাহিত্যের নিরিখে তো বটেই, ডকুমেন্টারি এভিডেন্স হিসেবেও সমকালীন সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে। ভবিষ্যতে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে বাঙালি কে? তাঁদের ইতিহাস ভূগোল সমাজ সংস্কৃতি কীরকম, চোখ বন্ধ করে এই একটা মাত্র বই ধরিয়ে দিন।

বই শেষ করে বলতে পারি, এর পর অন্য বই পড়তে গেলে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে। এও বলতে পারি, এই বই যদি ইন্সট্যান্ট ক্লাসিক বলে গণ্য না হয় (সময়ের পরীক্ষা সব কিছুকেই দিতে হয়, কিন্তু আবেগের ভিত্তিতে বহু শিল্পকর্মকে ইন্সট্যান্ট ক্লাসিক বলা হয় তা মিথ্যা নয়) এবং পরবর্তীতে ক্লাসিক বলে বিবেচিত না হয়, 'ক্লাসিক' কথাটা তুলে দেওয়াই বরং ভালো।

হে বাঙালি পাঠক, দু হাত জড় করে প্রার্থনা জানাই, সব ছেড়ে সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা পড়ুন। প্লিজ পড়ুন।
2 reviews
October 21, 2025
মজ্জায়, চেতনায় বয়ে চলা যে কালের প্রবাহ তার প্রামাণ্য নথি কি? কাঁচা সিদলের গন্ধ আর মৎস্যভূমির মাটির শতাব্দী প্রাচীন সোঁদা গন্ধ যখন মিলেমিশে যায় সেই গন্ধের উত্তরাধিকার নির্ধারণ করতে পারে কি কাঁটাতার? দেশ কালের সীমানা বারে বারে একাকার হয়ে যায় কখনও দরপ গাজী, কখনও ওলন্দাজ, পর্তুগীজ, আর্মানি, ফরাসিদের পদচিন্হে। দরপ গাজীর গঙ্গাস্তোত্র হয়ে ওঠে পাশ্চাত্য বৈদিক পন্ডিতের স্তবমন্ত্র। হাজার বছর প্রাচীন চর্যাপদ দাক্ষিণাত্য ব্রাহ্মণের স্মৃতিতে ধরা থাকে। সরস্বতীর প্রবাহের মত ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে সাতগাঁর গৌরব, আদিরামবাটীর ঔজ্জ্বল্য। হয়ত বা নদীর মত খাত বদলে সেই গৌরবগাথা প্রবাহিত হয় সেই সব মানুষদের শিরায় শিরায় যাদের বা যাদের পূর্বসূরীদের গর্ভফুল ঘুমিয়ে আছে সাতগাঁর শিয়ালকাঁটার ঝোপের নীচে। মানুষের শিকড় কি প্রোথিত থাকে এক টুকরো শংসাপত্রে না কি আবহমান কালের নদী, হাওয়া, মাটির কাহিনীতে?
এই সাহিত্য বর্ণনার অতীত। একে অনুভব করতে হয়। এর ভিতর ডুব দিয়ে শতাব্দীর ওপার থেকে ভেসে আসা ফিসফিসানি শুনতে হয়। বর্তমান আর অতীতের মধ্যে স্খলিত পদে চলাচল করতে হয়। স্মৃতির সৌরভে আবিষ্ট হতে হয়।
Profile Image for Asif Khan Ullash.
148 reviews8 followers
May 30, 2025
সাতগাঁর গল্পের ফড়িং উড়ে বেড়িয়েছে গল্পতরূর শাখা থেকে প্রশাখা হয়ে পাতায় পাতায়; নির্দিষ্ট করে বললে ৬৪৮ টি পাতায়।

শুধু কি সাতগাঁ? ফড়িং উড়ে চলে বাংলার আবহমান সময় জুড়ে, সেই চর্যাপদ থেকে শুরু করে, hum kagaz nahi dikhayenge পর্যন্ত। মাঝে কলকাতায় কয়বার ডি-ট্যূর দিলেও, ফড়িঙয়ের ডানা বিশ বাই আট কিলোমিটারের সাতগাঁতেই ঝাপটায় পুরো সময়। অবশ্য ওইটুকু জায়গাতেই যদি কয়েকশো (নাকি কয়েক হাজার?) বছরের ইতিহাস ঢুঁড়ে ফেলা যায়, সুলুকসন্ধান করা যায় সম্পূর্ণ এক জাতির তাহলে আর বৃথা ছোটাছুটি করার দরকারটাই বা কি?

এতকিছুর পরেও সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকলো শেষের পাতা কটাই। পুরো আখ্যানের এসেন্স ওই কটা পাতাতেই ধরা আছে।
November 27, 2025
এই উপন্যাসটা পড়ার অভিজ্ঞতা এক আশ্চর্য, অবিস্মরণীয় ভ্রমণের সমতুল্য হয়ে রইলো। লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ।
61 reviews19 followers
December 31, 2025
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা
পরিমল ভট্টাচার্য
পাতা - ৬৪৮
প্রকাশক - অবভাস

আসলে এটা ৩.৭৫।
এই বইটি পড়ে মনে হল একটা আসল বাংলা বই পড়লাম।
শুধুমাত্র এমন সুন্দর বাংলা ভাষার জন‍্যই এই ৬৪৮পাতার বইটা পড়ে আনন্দ পাওয়া যায় এবং একটা সুখপাঠ‍্য ( যা আজকাল বাংলা সাহিত্যে বিরল) বলা যায়।
খুব সুক্ষ সূতোয় বোনা, মন কেমন করা সুদূর অতীতের শুরু করা এক গল্প।
অতীতের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ, অতি তুচ্ছ জিনিষের অসাধারন বর্ণনা । যেসব আমরা আমাদের মা,কাকিমা,জ‍্যেঠিমা,ঠাকুমা,দিদিমাদের মুখে শুনে বড় হয়েছি সেই সময়ের মন কেমন করা গল্প।

সেই সুদূর অতীতকে নিয়ে অতি আধুনিক ভারতবর্ষের সবথেকে আলোচিত যে বিষয়, গল্পটা আসলে তাকে নিয়ে।লেখক পরিমল ভট্টাচার্যের গভীর গবেষণার ফল এই অসাধারন উপন্যাস ।

৯ প্রজন্মকে নিয়ে লেখা এই বৃহৎ পরিসরের উপন‍্যসে সাধারণভাবেই অনেকবার পুনরাবৃত্তি আছে। চরিত্রদের সঙ্গে বেশী চলা হল না বলে তাদের সাথে ঠিক একাত্মতা অনুভব করা গেল না।এত প্রশস্ত লেখা, অতএব একটা চরিত্র দুটো অথবা তিনটে পরিচ্ছদ ধরে এগোবার পর তারা এত দেরী করে আবার আসছে যে মনে হল তারা যেন আমার অগোচরে হঠাৎ বড় হয়ে গেল বা বুড়ো হলে গেল পাঠক-পাঠিকাদের সঙ্গে আত্তিক যোগ ব‍্যতিত।
পরের উপন‍্যাসের অপেক্ষায় রইলাম।
Displaying 1 - 13 of 13 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.