ঢাবি-মেডিকেল-বুয়েট-কুয়েট থেকে শুরু করে সবখানে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে কোথাও চান্স না পেয়ে, একদমই হঠাৎ, এক চকিত সিদ্ধান্তে, একটা হুলুস্থুল বিবাহ ঘটিয়ে ফেলল বখতিয়ার রাকিব—পরিবার, সমাজ ও মহান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গিয়ে। মোটামুটি তখনই একটা অশান্ত ধূলিঝড় উড়ে গেল সুয়েজ খালের ওপর দিয়ে এবং পিরামিডের দুটো ব্লক খুলে-খসে-ধসে পড়ল ইতিহাসের গা থেকে। বিদ্রোহের অপরাধে আসামিকে জর্জরিত করতে তোলা হলো পবিত্র এজলাসে। উদিত হলেন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বজনশ্রদ্ধেয় পুরোহিতগণ নিজ নিজ সংবিধান অনুযায়ী বিচার করতে। কিন্তু ততক্ষণে সবাই একটা তর্কের ভাষা পেয়ে গেছে এবং কেউই আশ্বস্ত না এবং নিজের সকল কাজের পক্ষে সবাই বাগিয়ে রেখেছে অজুহাতের ঢাল আর যুক্তির ফলা। অতএব এক তুখোড় ক্যাওয়াজ উঠল চারপাশে—সবাইকে বিদ্ধ বিক্ষত উদাম করার ইচ্ছা, সবকিছু ভেঙে দেওয়ার খায়েশ। আর তা আরও জোরালো হলো যেহেতু স্বয়ং আসামি বখতিয়ার রাকিব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, সে নিজেকে সবসময় দণ্ডায়মান রাখবে পরিস্থিতির সাত মাথার মোড়ে এবং তার একের পর এক আকস্মিক সিদ্ধান্ত কাউকে কোথাও স্থির দাঁড়াতেই দেবে না এবং তা সবসময় সবার পায়ের নিচের মাটিই সরাবে শুধু।
বিয়ে ও বিচার : একটা ব্যতিক্রমী গদ্যঅলা ছোটগল্পের বই। নয়া এশটাইলিশ গদ্য। প্রচলিত বিবিধ নিয়মরে ভাঙ্গার কোশেশ স্পষ্ট লেখকের গদ্যের, গল্পের লাইনে লাইনে। আমি যখন পড়ছিলাম, ২৩ এর বইমেলার কথা, একটানে পড়ে উঠছিলাম। বইয়ের পয়লা পাতাই চোখ ছানাবড়া বানায়ে দিবে পাঠকের, যখন সে পড়তে শুরু করবে বই খুলে, গল্পের শুরুতে :
“বখতিয়ার রাকিবের বাসায় যখন ঢুকলাম তখন দুপুর আড়াইটা বাজে। এই সময়ে আমাদের এলাকার উঁচু-নিচু কাঁচা-পাকা সমস্ত বাড়িঘরে আমি নিশ্চিত যে মানুষজন খেতে বসেছে খাবারের প্লেট সামনে নিয়ে এবং তাদের সামনে তাদের স্ত্রীরা দয়ার ডানা মেলে ধরে মায়ার আঁচলে কপালের ঘাম মুছে দিয়ে দুই হাতে ছড়িয়ে দিয়েছে খাবারের টেবিলের ওপর, খাবারের দস্তরখানের ওপর, দুই- তিন পদের তরকারি-মাছ-মাংস-ডিম-ডাল-সবজি; সঙ্গে আচার, সঙ্গে কাঁচা পিঁয়াজে-মরিচে মাখানো সালাদ; আর স্বামীরা যখন এক হাত খাবারে ডুবিয়ে অন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছে পানির গ্লাসের দিকে, তখন তারা দ্রুত জগ হাতে গ্লাসে গ্লাসে পানি ঢেলেছে সরসর এবং এইমাত্র কারেন্ট চলে যাওয়ায় এক সতী স্ত্রী হাতপাখা নিয়ে এলো এবং আরেকজন তার স্বামীর খাওয়া প্রায় শেষের দিকে বিধায় সরবরাহ করল বিশুদ্ধ দই ও মিষ্টান্ন।
মোটামুটি এভাবেই আমাদের এলাকার প্রেমময়ী স্ত্রীগণ যখন সুসম্পন্ন করছে তাদের পতিভজনার দায়িত্ব, তখন-আমি, বখতিয়ার রাকিব, তার মা, তার আত্মীয়স্বজন ও তার তিন বন্ধু-আমরা সবাই না-খাওয়া; সবাই খিদায় পেট চোঁ চোঁ এবং আমি ছাড়া সবাই উদ্বিগ্ন-চেহারা দেখে বোঝা যায়; সবাই একটা রুমে কেউ বিছানায় পা তুলে, বালিশে হেলান দিয়ে, কেউ চেয়ারে, কেউ দরজার কাছে বসে বসে গড়ে তুলেছি একটি মহান বিচারসভা, একটি পবিত্র অখণ্ডনীয় থমথমে পরিবেশ; কারণ আমাদের সবার প্রিয় বন্ধু বখতিয়ার রাকিব একটি ভয়ংকর কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে, সে মস্ত বড়ো একটা সামাজিক ছিছি আর থুথু ধরনের অপরাধ ঘটিয়ে ফেলেছে; ছাত্র বয়সেই, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই, এবং এই বিশাল খোলা নীল আকাশের নিচে উত্তরে হিমালয় আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরকে সাক্ষী রেখে, কোনোরকম লাজলজ্জা ছাড়াই, কাউকে না জানিয়ে জাস্ট বিয়ে করে ফেলার মাধ্যমে।”
গল্পের কাহিনিও খুব বাস্তবসম্মত। বই রেটিং ৫ এর মধ্যে সাড়ে ৪ পাবে ।
হাপ কম, কারণ আশা করি লেখকের গদ্য আরো কামাল দেখাবে। তাই হাপ রেটিং সেই লমহার জন্যই তোলা রইল। 🧡