' আজ্ঞাবহ দাস ওরে আজ্ঞাবহ দাস
সারা জীবন বাঁধলি আঁটি,
ছিঁড়িলি বালের ঘাস,
আজ্ঞাবহ দাসমহাশয়, আজ্ঞাবহ দাস। ' - নবারুণ ভট্টাচার্য
নবারুণ ভট্টাচার্যের অনেকগুলো পরিচয় আছে। তবে সবচেয়ে বড়ো পরিচয় বোধহয়, তিনি ক্ষমতার সামনে শিরদাঁড়া সোজা করে প্রশ্ন করতে পারেন। সব সময় চ্যালেঞ্জ করতেন প্রশ্নহীন আনুগত্যকে। এমনকি বামপন্থির ছদ্মবেশে থাকা মুগ্ধ বালকদের মুগ্ধতাকে ধবলধোলাই করেন বিনা আয়াসে। কম-বেশি বিশটি সাক্ষাৎকার নিয়ে এক শ ষাট পাতার বইটির প্রকাশক কলকাতার 'ভাষাবন্ধন প্রকাশনী'।
কথাসাহিত্যিকদের 'ব্যবসা' কথা ও শব্দ নিয়েই। তাই কঠিন কথাকে অনেকেই 'সুগারকোটিং' করে বলতে পছন্দ করেন। এদের দলে নেই নবারুণ ভট্টাচার্য। তিনি সোজাসাপটা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তার অনেকগুলো কারণ থাকতেই পারে। অন্যতম হয়তো,
'...আমায় লিখে খেতে হয় না। '
লিখে খেতে হলে পাঠকের মনোরঞ্জন করতে হয়। আর, লোকরঞ্জনবাদী লেখকের পেটের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু বিসর্জন দিতে হয় নিজস্ব সত্তা।
শিল্পের জন্য শিল্পে - ধরনের তত্ত্বে মোটেই আস্থাশীল নন নবারুণ ভট্টাচার্য। তিনি নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের মধ্যে বড়ো হয়েছেন। তাই তাদের প্রতি একটা দায়িত্ববোধ তিনি অনুভব করেন।
নবারুণ ভট্টাচার্যের মা প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী ও বাবা নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য। মাকে নিয়ে তার ধারণা ইতিবাচক নয়। এমনকি মহাশ্বেতা দেবীর লেখাকে অনেকটাই খারিজ করে দিয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার জন্য সমালোচনা করেছেন। পিতা বিজন ভট্টাচার্য তাকে প্রভাবিত করেছেন। জীবনের মার্গদর্শন করিয়েছিলেন। বিজন ভট্টাচার্য তাকে বলেছিলেন,
' তোমার যা ইচ্ছে কর, কিন্তু মনে রেখ, পরে তা নিয়ে যেন অনুশোচনা না করতে হয়। '
বামপন্থিদের পতন নিয়ে তার মূল্যায়ন,
'একজন মানুষ নিজের অধঃপতন তো জাজ করতে পারেন না। একদিন সন্ধেবেলা একজন একটু মদ খাওয়াল, তারপর দিন আর একজনের সঙ্গে দেখা করলাম ওই ধান্দায়— যদি খাওয়ায়। এই করতে করতে অধঃপতনটা শুরু হল। এটা সব সময় তো ওভাবে মাপা যায় না। একদিন আবিষ্কার করলাম যে একদম গোল্লায় গেছি। তখন কোনো সন্ধেই আর নিজের থাকল না। '
পুরস্কারপ্রাপ্তিকে মন্দ চোখে দেখেন না নবারুণ। তবে তা নিয়ে খামোখা মাতামাতি তার অপছন্দনীয়।
লেখার ভাষার চাইতে কনটেন্টে বেশি জোর দেওয়ার পক্ষে তিনি। হ্যাঁ, তার লেখায় স্ল্যাং অনেক বেশি ব্যবহার করা হয়। উত্তর সহজ। তিনি ড্রয়িংরুম বিলাসীদের জন্য লেখেন না। এমনকি তাদের জীবন নিয়েও লেখেন না। তাই সুশীলদের ভাষা তার কলমে আসে না।
আঠারো বছর সোভিয়েত ইউনিয়নের সংবাদসংস্থায় চাকরি করেছেন। কিন্তু নিজের মগজ সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে বন্ধক দেননি। অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সোভিয়েত ইউনিয়নে লেখক, কবি, চলচ্চিত্রনির্মাতাসহ সৃষ্টিশীল মানুষদের ওপর নিপীড়নের সমালোচনা করেছেন। এ-ও বলেছেন, এত জুলুম সৃষ্টিশীল মানুষদের ওপর আর কোথাও হয়নি।
যারা নবারুণ ভট্টাচার্যের উপন্যাস পড়েছেন, তারা জানেন ফ্যাতাড়ু কে৷ সেই ফ্যাতাড়ুর কনসেপ্ট নিয়ে বলেছেন নবারুণ ভট্টাচার্য।
নবারুণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে আলাপের চাইতে তার লেখা কবিতা ও উপন্যাস পড়লে তাঁকে আরও নিবিড়ভাবে বোঝা যায়। এটুকু স্বীকার করতেই হবে, নবারুণ ভট্টাচার্যের মতো অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহসী মানুষ আগেও কম ছিল। আর, এখন তা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। তাই নবারুণ ভট্টাচার্যের মতো একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের সাক্ষাৎকার পড়তে পারা নিঃসন্দেহে চমৎকার অভিজ্ঞতা।