গল্প-উপন্যাস বা চলচ্চিত্রে ভিলেন বা খলনায়কের মনস্তত্ত্ব একটা তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। এটা নিয়ে মাথা ঘামানোর বিস্তর সুযোগ রয়েছে। মনোজগতের অন্ধকার দিক এবং মানবচরিত্রের অত্যাশ্চর্য ধোঁয়াশাগুলো নিয়ে আলোচনা এই পর্যায়ভুক্ত। লম্বা সিরিজগুলোতে প্রায়ই একজন অপরাধীকে মাস্টার ক্রিমিনাল করে দেখানো হয় এবং তাকে বারবার ফিরিয়ে আনা হয়, যে হয় মূল চরিত্রের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। ফেলুদাতে মগনলাল, মাসুদ রানায় কবীর চৌধুরী, তিন গোয়েন্দা সিরিজে ডক্টর মুন কিংবা শার্লক হোমসে মরিয়ার্টি এরা সবাই মার্কামারা এবং এক অর্থে ভীষণ জনপ্রিয় ভিলেন। এরা থাকা মানেই পাঠকমনে অতিরিক্ত পুলকের সঞ্চরণ, টানটান উত্তেজনা। আলোচ্য বইটির বিষয়বস্তু নাম থেকেই অনুমেয়। প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত এর সত্যজিতের ভিলেন। মানে সত্যজিৎ এর লেখা এবং চলচ্চিত্রে আসা গুরুত্বপূর্ণ সব খলনায়ককে নিয়েই এই বইটি লিখেছেন তিনি। কেউ করেছে খুন, কেউ করেছে চুরি, কেউ প্রতারণা। শঙ্কু সিরিজের মতোই শঙ্কুর ভিলেনেরাও বড় অভিনব। কেউ নিজ ফর্মুলা প্রয়োগ করে মানুষকে আদিম মানুষ বানাচ্ছে তো কেউ পুতুল বানিয়ে রাখছে। আবার ছোট গল্প বা তারিণীখুড়োর গল্পগুলোতেও জব্বর সব চরিত্র দেখা যায়। কোন কোন গল্পে আবার যাকে কেন্দ্র করে কাহিনী বলা হচ্ছে সে নিজেই খলনায়ক। সাধারণ চুরি বা একটা কাজের জন্য হাতসাফাইকে সত্যজিৎ অপরাধের পর্যায়ে ফেলেন নি। যেমন ফেলুদাই কতবার তদন্তের স্বার্থে জিনিস সরিয়ে রেখেছে। একই বিষয় অন্যান্য গোয়েন্দা চরিত্রেও দেখা যায়। আবার সম্মেলন গল্পে অপরাধীর একটা গ্লাভস চোখের পলকে সরিয়ে ফেলেছিল গোয়েন্দাপ্রধান কিশোর পাশা যেন সেটা পরবর্তীতে কাজে লাগে। এটাকে ঠিক অপরাধপ্রবণতা বলা যায় না। যাই হোক, ফেলুদা যেহেতু গোয়েন্দা গল্প, আবার কিশোরদের জন্য লেখা, সেখানে ভিলেনরা মোটামুটি গৎবাঁধা। তবুও একেবারে শুরুর গল্প-ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি শেষ করে কে ভিলেন এইটা কিন্তু পাঠক দ্বিতীয়বার ভাবতে বসবেন। এছাড়াও ডক্টর মুন্সীর ডায়েরি, ছিন্নমস্তার অভিশাপ এবং ভূস্বর্গ ভয়ংকর এর ভিলেনদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে ভাবনার অনেক জায়গা রয়েছে। তবে বেশি বৈচিত্র্য রয়েছে শঙ্কু সিরিজ এবং ছোটগল্পগুলোতে। সত্যজিৎ এর গল্পগুলো তো এমনিতেই দুর্দান্ত, পাশাপাশি এই বিশেষ দিকগুলো আরো বেশি উপভোগ্য। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও কাঞ্চনজঙ্ঘা বা জলসাঘরে কাউকে এক কথায় ভিলেন বলে দেয়া সাজে না। চলচ্চিত্রের সত্যজিৎ অনেক বেশি সফিস্টিকেটেড, ধূসর। সাদা-কালোয় তাঁকে বিশ্লেষণ করা দুষ্কর সেখানে। ছোটদের জন্য বানানো ছবিগুলোতে বরং স্পষ্ট খলনায়ক রয়েছে। হীরক রাজা এবং তার মন্ত্রীবর্গ কিংবা বরফি এরা এক কথায় মন্দ লোক। অদ্ভুত চরিত্রের ভিলেনও কিছু কম ছিল না সত্যজিৎ এর গল্পে। গণেশ মুৎসুদ্দির পোর্ট্রেট বা শিল্পী গল্পে যেমন শিল্প সমালোচকদেরই ভিলেন সাজিয়ে বসেন লেখক। সম্ভবত বাস্তব জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা এই গল্পগুলোর খলনায়ক নির্বাচনের জন্য দায়ী। শঙ্কুর একটা চরিত্র গ্রেনফেলের নাকি ম্যাজিশিয়ান দেখলেই অস্বস্তি হত। সত্যজিৎ নিজে ম্যাজিক প্র্যাকটিস করেছেন একসময়, ফেলুদাও ম্যাজিক জানত। কিন্তু তাঁর গল্পে বেশ কয়েকবার বেশ প্রতিভাবান ম্যাজিশিয়ানরা শেষে ভিলেন প্রতিপন্ন হয়েছে। এর কারণ কী কে জানে। সত্যজিৎ নিজেও কি তাহলে ম্যাজিশিয়ানে অস্বস্তি বোধ করতেন? সত্যজিৎ এর গল্পে কেবল মানুষ ভিলেনই নয়, রয়েছে ভূত ভিলেন, প্রাণী ভিলেন, গাছ ভিলেন! অদ্ভুত রসের গল্প তো আর কম লেখেননি ভদ্রলোক! এছাড়াও রয়েছে পরিস্থিতি ভিলেন, মানে একটা বিশেষ পরিস্থিতি মানুষকে অপরাধ করতে বাধ্য করেছে। সাধারণত এমন চলচ্চিত্রে বেশি দেখা যায়। যেমন, জন অরণ্য তে বেকারসমস্যা এবং সামাজিক অবক্ষয়, অশনি সংকেত এ দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি। সত্যজিতের ভিলেন আলোচনা করতে গিয়ে এই বইয়ের লেখক আসলে তাঁর সমস্ত সৃষ্টিরই একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে ফেলেছেন। তবে নি:সন্দেহে প্রাধান্য পেয়েছে নেতিবাচক চরিত্রেরা। কিছু পুনরাবৃত্তি না থাকলে আরো বেশি পয়েন্ট পেত বইটি। তবুও সত্যজিৎ প্রেমীদের কাছে এই কম আলোচিত বিষয়টি আরো ভালো করে আলোয় নিয়ে আসার জন্য বইটি আদরণীয় হয়ে থাকবে। পাশাপাশি সত্যজিৎ এর ভাবনাবলয় যে কতটা ছড়ানো ছিল সেটা আরো একবার অনুধাবন করবেন পাঠকেরা। বই: সত্যজিতের ভিলেন লেখক: প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত প্রকাশন: পত্রলেখা