হয়তো প্রকৃতির একটা বন্ধ দরজা আছে, আছে আড়াল। আমরা যেটুকু দেখি সেটুকুই সব নয়, বরং সামান্যই। যা কিছু প্রকাশিত, তাও সব নয়, আছে আরও অপ্রকাশিত বহু কিছু। দৃশ্যমান জগতের বাইরেও আছে অদৃশ্য এক মহাজগৎ, এক অপার বিস্ময়। আমাদের আশেপাশেই থাকে সেসব, তবু আমরা দেখতে পাই না, এমনকি অনুভবও করতে পারি না। কারণ, ওই অদৃশ্য দরজাটা বন্ধই থাকে, খোলার সাধ্য নেই কারো, নিজে থেকে না খুললে কেউ জানতেই পারে না, দরজার ওপারে কী আছে। এমনকি এও জানা হয় না যে, একটা দরজা বন্ধ হয়ে আছে। প্রকৃতি সেই দরজা সবার জন্য খোলে না, খোলে অল্প কিছু নির্বাচিত মানুষের জন্য, অনেক দুর্ভোগ আর অকথ্য যন্ত্রণার অসহনীয় ভার বয়ে যাওয়ার বিনিময়ে। এই গ্রন্থের কিছু গল্পের কতিপয় চরিত্র, অতি সাধারণ মানুষ হয়েও, হয়তো সেই অচেনা জগতের সন্ধান পেয়েছিল। গল্পগুলো তাদের, এবং আমাদেরও, যারা দৈনন্দিন নিষ্ঠুর বাস্তবতার ভেতরে বাস করেও এক পারমার্থিক জীবনের সন্ধান করি।
আহমাদ মোস্তফা কামালের জন্ম মানিকগঞ্জে। তার বাবার নাম মুহাম্মদ আহমাদুল হক এবং মায়ের নাম মেহেরুন্নেসা আহমেদ। পাঁচ ভাই এবং তিন বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। মানিকগঞ্জের পাটগ্রাম অনাথ বন্ধু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে এসএসসি, ১৯৮৮ সালে ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন আহমাদ মোস্তফা কামাল। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৯২ সালে স্নাতক, ১৯৯৩ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে এম ফিল এবং ২০১০ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পেশাগত জীবনের শুরু থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। বর্তমানে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন তিনি।
লেখালেখির শুরু '৯০ দশকের গোড়া থেকেই। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘দ্বিতীয় মানুষ’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে, এরপর আরো ছ’টি গল্পগ্রন্থ, ছ’টি উপন্যাস ও চারটি প্রবন্ধগ্রন্থ বেরিয়েছে। তাঁর চতুর্থ গল্পগ্রন্থ ‘ঘরভরতি মানুষ অথবা নৈঃশব্দ্য’ ২০০৭ সালে লাভ করেছে মর্যাদাপূর্ণ ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই’ পুরস্কার, দ্বিতীয় উপন্যাস ‘অন্ধ জাদুকর’ ভূষিত হয়েছে ‘এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরস্কার ২০০৯’-এ, তাঁর তৃতীয় উপন্যাস ‘কান্নাপর্ব’ ২০১২ সালের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে লাভ করেছে ‘জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩’।
৩.৫/৫ "রূপ নারানের কূলে" গল্পগ্রন্থটি সমকালকে ধারণ করতে চেয়েছে, কখনো চেয়েছে সমকালকে অতিক্রম করে যেতে। বেশিরভাগ গল্পে অতিলৌকিকতা আছে, তবে পরিমাণে তা খুবই সামান্য। আমাদের চারপাশের বাস্তবতা, শুষ্ক দয়ামায়াহীন সময়, যাপিত জীবনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ আর একের পর এক ঘটে যাওয়া দুর্যোগ - দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, করোনাকালীন চাপা ভয় ও যোগাযোগহীনতা, বান্ধবহীন শহুরে জীবন - অসহ একাকিত্ব ঘুরেফিরে এসেছে সংবেদনশীল লেখকের কলমে। বাস্তবতার সীমার মধ্যে থেকেই আহমাদ মোস্তফা কামাল কখনো তুলে ধরেন অতীত বা বর্তমান (যেমন - পোড়া টিনের বাড়ি, বিভ্রম কিংবা বিড়ম্বনার গল্প)। আবার জীবন থেকে পালাতে যেয়ে অথবা জীবনকে আরো গভীরভাবে আকড়ে ধরতে যেয়ে শুষ্ক জীবনে এক পশলা বৃষ্টি নেমে আসার মতো রূঢ় সময়ে ঘটে যায় কোনো অব্যাখ্যাত ঘটনা (যেমন-, দায়ভার অথবা শোকসভার গল্প, সৎকারগাথা)। মনে হয়, এমন তো হতেই পারে। মনে হয়, এমন তো হওয়াই উচিত। গ্রন্থের নাম যে কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে ("রূপ নারানের কূলে জেগে উঠিলাম, জানিলাম এ জগৎ স্বপ্ন নয়") তা ছিলো জগতের প্রতি এক রোমান্টিক বার্তা। রূপ নারানের কূলে আমরাও জাগতে চাই, জীবন নিয়ে দার্শনিক উপলব্ধি অন্যদের সাথে আয়েশ সহকারে আলাপ করতে চাই, নির্ভাবনায় হাসি আনন্দে লীন হতে চাই কিন্তু আমাদের দেশ ও কাল সে সুযোগ আমাদের দেয়নি। মনে হয় পালাতে পারলে বাঁচি। কোনো একটা বর্বর ঘটনা ঘটলেই মনে হয়, না এ হতে পারে না সত্য। কিন্তু বাস্তবতা থেকে আমাদের মুক্তি নেই। লেখকের কলমে তা-ই ফুটে ওঠে হাহাকার (আমার মতো তাঁর আগের সব গল্পগ্রন্থ পড়ে থাকলে পুনরাবৃত্তি পাওয়া খুবই সম্ভব), সাথে ফুটে ওঠে এক অপার্থিব মুক্তির সন্ধান। কবি নরেশ গুহের মতো বলতে ইচ্ছা করে,
"বুক ভেঙে যায় আনন্দে বিষাদে বেদনায় কী মন্ত্র শেখায়, দ্যাখো, আনন্দিত শালবীথি, বলে, 'আশা রাখো জীবনের যতো অসম্ভবে।' সব হবে, মন বলে, আবার আবার সব হবে।"
প্রথম গল্পটা সুন্দরভাবে আগাচ্ছিল। ভবঘুরে, মানবপ্রেমী পথিক ভাইয়ের কাহিনি ভালো লাগছিল। তার বাল্যকালের ছোট একটা ঘটনা কীভাবে তার পুরো জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল সেটাও চমৎকার ছিল। কিন্তু শেষদিকে কিছুটা মেলোড্রামা এসে গেলো লেখায়। জীবনটা এতটাই মেলোড্রামায় পূর্ণ হয়ে গেছে যে এখন আর লেখার মধ্যে এসব নিতে পারি না।
দ্বিতীয় গল্পটা সুন্দর, তবে গল্পের পরিণতি আগেভাগে ধরতে পারায় কিছুটা বিরক্ত লেগেছিল।
এ পর্যায়ে এসে এই বইয়ের থেকে হতাশা আসবে মোটামুটি ধরে নিয়েই আগাচ্ছিলাম।
আমার আশঙ্কা অমূলক ছিল, পরের প্রায় সবগুলো গল্প সুন্দর এবং অনেকদিন মনে রাখার মতো। 'পোড়া টিনের বাড়ি', 'অপ্রতিসম', 'রূপ-নারাণের কূলে' 'সৎকারগাথা' বিশেষ ভালো লেগেছে।
বিচিত্র ঘরানার অনেকগুলো গল্পের সমাহার। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, ভবঘুরে মানুষের আখ্যান, বাম রাজনীতির গল্প, স্মৃতিকাতরতা, একাকী মানুষ ও তার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আলাদা জগৎ - এসব নিয়েই এক একটা গল্প।
প্রচ্ছদ দেখে নাম বোঝার উপায় না থাকলেও, গল্পের নামগুলো ভুলে গেলেও গল্পগুলো মনে থাকবে।
প্রথম গল্প 'দায়ভার অথবা শোকসভার গল্প' পড়তে গিয়ে মনে হলো এত মমতা নিয়ে লেখা গল্প অনেকদিন পড়িনি। গল্পের পথিক ভাই নয় যেন লেখক নিজেই মমতা মাখানো নরম মনের মানুষটি। যেকোনো নরম এবং সচেতন মনকে সতেজতার পরশ বুলিয়ে দিয়ে যাবে যান্ত্রিক কোলাহলের মাঝে। "রূপ-নারানের কূলে" বইয়ে লেখক মলাট বদ্ধ করেছেন দশটি গল্প। গল্পগুলো পাঠকের মনকে ভালো করে দেয় যেমন তেমনই বিষাদেও ভরে দেয়। কিছু গল্পে রয়েছে অতিপ্রাকৃতের ছোঁয়া। আহমাদ মোস্তফা কামালের লেখা যারা পড়েছেন তারা জানেন, উনার লেখায় মানবিকতা, মমত্ববোধ, ভালোবাসা ফুটে উঠে অসাধারণ ভাবে। তাই তার লেখা পড়তে আমার ভালো লাগে। সেই প্রেক্ষিতে সংগ্রহ করা এবারের মেলায় তার প্রকাশিত নতুন বই "রূপ-নারানের কূলে"। একজন মানুষের প্রকৃতিকে ছোঁয়ার যে আপ্রাণ চেষ্টা সেটাই তার লেখায় ফুঁটে উঠে। তার লেখাগুলো বইয়ের পাতা থেকে উঠে আমার কাছে ধরা দেয় প্রকৃতির রূপ,রস,গন্ধ সমেত। তাই এড়াতে পারি না তার টান। এতটা কোমলতা নিয়ে যে লিখেন তাকে এড়ানোর ক্ষমতা নেই। সম্ভবত মন খারাপের দিনে তার গল্পগুলো আবার পড়বো। এবার গল্পের কথায় প্রবেশ করি। এই গ্রন্থের সবচেয়ে পছন্দের গল্পগুলো হলো, 'দায়ভার অথবা শোকসভার গল্প', 'পোড়াটিনের বাড়ি', 'অপ্রতিসম', 'রূপ-নারানের কূলে'। এই গল্পগুলো ছাড়া বাকি গল্পগুলোও ভালো। 'রূপ-নারানের কূলে' গল্পটিতে দেখি একজন মানুষকে সে যা কিছু আপন করে নেয়, তা-ই ভেঙে পড়ে। বস্তুত মানুষ যা-ই আপন করে কখনো না কখনো তার সেই আপন করার মোহে চিড় ধরে। তা সাময়িকও হতে পারে অথবা চিরস্থায়ীও। 'অপ্রতিসম' গল্পটি বিধস্ত করে দেয়, অভিভাবকদের শাসন একজন কিশোরের মনে কতটা প্রভাব ফেলে তা আন্দাজ করা যায় এখান থেকে। আসলে উত্তম পুরুষের জবানিতে বলা গল্পটিতে গল্প কথক যেন আমাদের সময়ের কিংবা তারও আগের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। যেখানে অভিভাবকের উন্মত্ত শাসনের কবলে পড়ে একটি কিশোর মনের যে পরিবর্তন ঘটে তাকেই তুলে ধরা হয়েছে। এবারের বইমেলার কোন বই সম্পর্কে কেউ যদি জানতে চান তবে অবশ্যই "রূপ-নারানের কূলে" বইটির কথা বলবো৷ বইটি ভীষণ ভালো লেগেছে। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু গল্পে ('সৎকারগাথা', 'অপ্রতিসম') অতিপ্রাকৃত ঘটনাকে এমন ভাবে টেনে আনা হয়েছে যে পরে সেটি পুরোপুরি ভালো লাগেনি। এইদিকটি ছাড়া অন্য সব মিলিয়ে গল্পগ্রন্থটি আমার কাছে অসাধারণ।
রূপ-নারানের কূলে জেগে উঠে রবীন্দ্রনাথ জেনেছিলেন এই জগত স্বপ্ন নয়। আহমাদ মোস্তফা কামালও আমাদের দেখালেন এমন একটা পৃথিবী, যেই পৃথিবী আসলে স্বপ্নের নয় বরং আমাদের খুব কাছের, চেনা জানা। কেবল আমাদের দেখার চোখটা নেই, বোঝার চোখটা নেই। কুকুর, কবুতর, পাখি, জ্যামিতি, ফুল এসবের সাথে আমাদের জীবন কীভাবে জড়িয়ে আছে, সেই গল্পগুলো আমাদের বললেন এবার আহমাদ মোস্তফা কামাল। তবে সবাইকে সেই গল্পগুলো ধরা দেয় না। খুব বেশি সংবেদনশীল না হলে জীবনে এসব গল্পের সন্ধান পাওয়া কঠিন এবং প্রায় অসম্ভব। গল্প সংকলের দু একটি গল্প বাদে বাকি সবই মূলত প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্কের কথা বলেছে। দায়ভার অথবা শোকসভার গল্পটা ঈদসংখ্যায় আগেও পড়া হয়েছিল। আবারও পড়া হলো। শেষটা খুব ড্রামাটিক লাগলেও এমন করে দীর্ঘদিন ধরে পড়া হবে। আহমাদ মোস্তফা কামালের নস্টালজিক গদ্য, জীবনকে গভীরে দেখার চোখ, এই বইটি পাঠের সময়টা একসাথে আনন্দদায়ক ও বিমর্ষ করে তোলে।