তেরোটি অরিজিনাল ও এগারোটি অনুবাদ গল্পের সমাহার মিডনাইট হরর অখণ্ড। মোট চব্বিশটি গল্পের ভাব কখনও রোম্যান্টিক আবার কখনও হরর কিংবা ফ্যান্টাসি। কখনও আবার এই তিনের মেলবন্ধনে বাস্তব পরাবাস্তবের জাল বুনেছেন লেখক। চলুন কল্পনার জাদুখড়ম পরে চবিবশ পা হাঁটি আমরা। দেখা যাক কোথায় পৌঁছাই...
এ জিনিস নিয়ে অতিরিক্ত না লিখলেও চলে। সায়ক আমানের বই বলে কথা। যাদের পড়ার তারা এমনিতেই পড়বে। যাদের খিল্লি করবার, তারা অন্তর্জাল কাপাবে যথা নিয়মে। এই দুইয়ের মাঝে আমার বাঁচলামো নেহাতই বেমানান। তবুও, অল্প-বয়সের সেন্টিমেন্টের তাগিদ। বোঝেনই তো?
বইয়ের নাম শুনেই হয়তো আন্দাজ করেছেন যে ভেতরের এই গল্পগুলো লেখকের ইউটিউব চ্যানেল 'মিডনাইট হরর স্টেশন'-এর ইন্টিগ্রাল অঙ্গ! সায়ক আমানের নিজের হাতের কাজ। সেই প্রথম দিকের উত্থানের সাক্ষী। কিছুটা কাঁচা, মানতেই হয়। অনেকটাই অপরিণত, সেটাও অদেখা করি কি করে? তাও, এসব লেখায় এখনও খুঁজলে পাওয়া যায় নস্টালজিয়ার দেখা।
বইটিকে তাই কোনো 'বেস্ট অফ...' কালেকশন ভেবে এগোলে ভুল করবেন। বরং, সেই অনেকদিন আগের এক তরুণ গল্পকারের, রেকর্ডিং স্টুডিওর আলো-আঁধারিতে বসে একক প্রচেষ্টায় সানডে সাসপেন্সের অল্টারনেট খোজার ভ্রান্ত নিদর্শন এই গল্পগুলি। বলাই বাহুল্য, বিদগ্ধ পাঠকেরা, যারা 'অডিও স্টোরি' শব্দদুটি শুনলেই নাক কুঁচকে একাকার করেন, তাদের কাছে এই বইয়ের কোনো প্রকৃত মূল্য নেই। লেখকের তথাকথিত 'ফ্যান' হয়েও এটুকু সত্যালাপ করতে পারি।
যাই হোক, মুভিং অন...
বইটি দুটি ভাগে বিভক্ত। 'বিভীষিকা ক্রম'-এ বিদ্যমান সায়ক আমানের তেরোটি অরিজিনাল গপ্পো। অপর প্রান্তে, 'ভাবানুবাদ ক্রম'-এ মিলছে এগারোটি বিদেশী গল্পের স্বাদু তর্জমা! লেখাগুলো পূর্বে বেনামী এক প্রকাশনী সংস্থার দুটি ওভারপ্রাইজড পেপারব্যাক হিসেবে বাজারে পাওয়া গেলেও, তা জনসাধারণের আওতার বাইরেই থেকে যায়। কালক্রমে, এহেন সংস্থা লেখকের রয়ালটি হাপিস করে, খেলা দেখিয়ে, এক্কেবারে হাওয়া হয়ে গেলে, দীপ প্রকাশন বাড়িয়ে দেয় সাহায্যের হাত।
তবে, এই সাহায্যের নেপথ্যেও ঝিলিক দেয় প্রকাশনীর ট্রেডমার্ক দায়সারা ভাব। নামে 'বিভীষিকা ক্রম' হলেও, এই পর্যায়ের তেরোটি গল্প স্রেফ ভৌতিক, অলৌকিক, হরিফিক নয়। আছে 'নিজের চোখে না দেখলে' নামক (আমার ভারী পছন্দের) একটি শিশুতোষ ফিল-গুড হরর রোমান্স। 'শতাব্দী গাছ' নামক একটি সলিড সাই-ফাই কাহিনী। বা 'ইয়ুয়িয়াকোর শিশু'র মতো একটি ইতিহাস ঘেঁষা কনস্পিরেসি থ্রিলার।
মানতে ক্ষতি নেই, এই অ্যাদ্দিন বাদে গল্পগুলোকে নতুন করে ঝালিয়ে নিতে মন্দ লাগলো না। 'ম্যানিকুইন' বা 'অসমাপ্ত' পড়তে গিয়ে ফিরে পেলাম, ক্রিপিপাস্তা পড়ার টিনেজ আনন্দ। আবার, 'কানা নাকি'র সেই বাক্যবাগীশ পেঁচার সাথে রহস্যভেদে নেমে মনে হলো কিছু কাহিনী অডিওতেই ভালো মানায়। তবে, 'পুব দিকের জানলা' নিয়ে আজও প্রশংসা করা যায়। গল্পটিতে প্রমথনাথ বিশীর একটি কালজয়ী হররের সামান্য ছায়া পেলেও, লেখাটিকে বইয়ের শ্রেষ্ঠ অরিজিনাল ক্রিয়েশনের তকমা দিতে আমার কোনো আপত্তি নেই।
কিন্তু একই সাথে, লেখাগুলোর প্রাথমিক দুর্বলতা ছাপার অক্ষরে আরও বেশি করে চোখে পড়ে যায়।
মাঝের কটা বছরে সায়ক আমানের লেখার হাত পেঁকেছে বিস্তর। এই লেখাগুলোতে সেই পরিপক্কতার হদিস চাইলেও খুঁজে পাওয়া যায় না। 'সে' নামক 'রোম্যান্টাসি'-টি এম.এইচ.এস ফ্যাণ্ডমে বিশেষ জনপ্রিয়। এককালে আমিও শুনে বেশ পুলকিত হতাম, বলা চলে। তবে, এতদিন বাদে পড়তে গিয়ে প্রেমের বদলে হাসি পেলো বেশি। দূর্বল গদ্য ও শহুরে আঁতলামি, দুটোই চোখে পড়ল বেশ মোটা দাগে। অনুরূপ কথা প্রযোজ্য, 'আওকিগাহারা' (অতি কনভলিউটেড), 'মাকড়সার জাল' (বোকা বোকা) বা 'একটি আষাঢ়ে গল্প' (গায়ে পড়া কমেডি)-এর ক্ষেত্রেও!
তাই নব-কলেবরে পরিবেশনার পূর্বে গল্পগুলোকে সামান্য ঘষামাজা করে নিলে বুঝি সকলের মঙ্গল হতো...
যাই হোক। বইয়ের প্রকৃত শক্তি, দ্বিতীয় ভাগের ওই অনুবাদ কাহিনীগুলো। যা অডিওরূপে শুনে একদা বেজায় শিহরিত হতাম। এবারে পড়েও যথেষ্ট ভালো লাগলো। ডিকেন্সের 'দ্য সিগনালম্যান', স্টোকারের 'রক্তাক্ত হাতের স্বপ্ন', ব্ল্যাকউডের 'একটি অলৌকিক দ্বীপ', লাভক্র্যাফটের 'পিকম্যানের মডেল'। চাঁদের হাট, যাকে বলে। ইংরেজী সাহিত্যের ক্লাসিক বাক্যশৈলী বিদেয় করে, ঘটপাকানো সমস্ত জটিলতার ভীড়ে সহজ, অপাংক্তেয় ভয়াল রসকে তুলে ধরাতেই এই ভাবানুবাদগুলোর চরম স্বার্থকতা।
পাঠক হিসেবে আমাদের লোকসান, লেখক সায়ক আমান আর নিজে বসে চ্যানেলের খাতিরে ঘনঘন অনুবাদ করেন না। সেসব দায়িত্ব এখন টিম-মেম্বারদের ঘাড়েই বর্তায়।
তবে এদের মধ্যে দুটি গল্প নিয়ে, কটা কথা আলাদা করে না বললেই নয়। বইতে ই.এফ.বেনসনের ভ্যাম্পায়ার কাহিনী, 'মিসেস অ্যামওয়ার্থ', 'মৃত্যুহীন পিশাচ' নামে নয়া মোড়কে পরিবেশিত হয়েছে। তবে, সে সময়ের অডিও মার্কেটের খাতিরেই বুঝি গল্পের শেষে লেজুড় হিসেবে একটা আনকোরা এন্ডিং জুড়ে দিয়েছিলেন লেখক। কেন করেছিলেন সেই নিয়ে কোনো বাড়তি টীকা নেই বইতে। কুমুদিনী চৌধুরী-গেলা বাঙালি শ্রোতাদের কাছে নতুন করে গল্পটিকে 'সেল্' করার খাতিরেই কি? কে জানে!
এছাড়াও, লাভক্রাফটের 'লার্কিং ফিয়ার' অবলম্বনে 'গোপন আতঙ্ক' লিখতে বসে গল্পের শেষলগ্নে মূল-ক্রিচারের রূপ ও পরিচয় বদলে ফেলেন লেখক। এ জিনিস উনি ঠিক কেন করেছিলেন সেই নিয়ে একখানা কৈফিয়ত অডিও গল্পের শেষে পোস্টস্ক্রীপ্ট হিসেবে শুনেছিলাম, মনে পড়ে। তবে, বইয়ের পাতায় সেসবের দেখা না পেয়ে হতাশ হলাম। একটা ছোট নোট বা সতর্কীকরণ জুড়ে দেওয়াটা খুব কঠিন কিছু ছিল না। এতে আর কিছু না হলেও, নতুন পাঠকেরা বিভ্রান্তির শিকার হতে বাঁচত, এই যা।
এখানেই দীপ প্রকাশনকে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হয়। বইতে কোনো অলঙ্করণ নেই। নেই কোনো সূক্ষ্ম সম্পাদনার প্রলেপ। মিডনাইট হরর স্টেশনের ভক্তবৃন্দেরা যদি ভেবে থাকেন, বইটি কিনে একটা গোটা ফ্যানবেসের গ্র্যান্ড সেলিব্রেশনের অংশ হতে পারবেন, তাহলে যারপরনাই হতাশ হবেন। বইতে বাড়তি ভূমিকাটুকুও নেই। নেই গল্পগুলো লেখার বা অডিওতে রূপান্তরিত হওয়ার যাবতীয় নেপথ্যকাহিনী। ওই 'বি.টি.এস ফুটেজ', যাকে বলে? কিছুই আলাদা করে জুড়ে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি লেখক-প্রকাশক দ্বয়ী।
তাই ভেবেচিন্তে বইটি কিনুন। স্মৃতি রোমন্থনের টাইম ক্যাপসুল হিসেবে একবার পড়ে দেখতেই পারেন। তবে, সবই দিনের শেষে ইউটিউবে লভ্য।
I really don't have enough good words to describe how amazingly this book is written. My mind was blown. The humor, plots, word selection, way of narrating, innovative story line -every thing is fantastic. He became one of my favorite writes. All the best wishes Sayak Aman. Hope you continue writing master pieces like this one.