এই দুনিয়াকে দেখবার বাসনায় মানুষ যখন চোখ মেলে তখন সে কী দেখে? সবই তো দৃশ্যের খেলা। এই জগৎ এইসব বানোয়াট দৃশ্যের কারখানা। উত্তাল দরিয়ার ঢেউয়ের তালে তালে শুরু হওয়া মাছেদের মৃত্যুর কোলাহল। একজন পেশাদার খুনি ভাগ্যের ফেরে মিশে যায় সেই কোলাহলে, কখনো দশ দিগন্তের হাওয়া এসে তাকে উতলা করে, আর সেই উতলা হাওয়ায় সে ঘুরে বেড়ায় বসন্ত থেকে বসন্তে। কিন্তু জীবন তো শুধু প্রতিশোধ কিংবা প্রণয় নয়, ফলে প্রার্থনার নামে তার অন্তর্গত মহাজাগতিক প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায় অন্ধকার থেকে অন্ধকারে। কতক সে ধরতে পারে, কতক তার হাত ফসকে বেরিয়ে যায়, সে সেসবের খবর রাখে না। আর থাকে দেশ, ঘূর্ণির ভেতর ঘুরতে থাকা স্বপ্ন, মুঠোয় ধরে থাকা হাওয়ার মতো বিপ্লবের বাসনা। সেই সমস্ত বাসনাও মূলত প্রেম আর মৃত্যুর সুফলা সংগীত। মুরাদ কিবরিয়ার এই উপন্যাসটি মূলত এক বিপুল আখ্যানকে ধারণ করেছে, যেখানে নানা অদ্ভুত চরিত্রের মানুষেরা সবকিছু বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছে জীবনের অলঙ্ঘনীয় উত্তাল সংগ্রামে। সেখানে প্রেম, প্রার্থনা আর মৃত্যু--- সব একাকার হয়ে তাদেরকে আছড়ে ফেলেছে জীবনের চোরাবালিতে। উপন্যাস-সাহিত্যের প্রচলিত গতানুগতিক গল্প এবং ভাষার প্রভাব থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নতুন ধরনের এক কল্পনার জাদুময় জগৎ তিনি সৃষ্টি করেছেন। সেই বহুরূপী কল্পনার জগতে পাঠককে স্বাগতম।
৩.৫/৫ "প্রেম প্রার্থনা মৃত্যু"র প্রধান সমস্যা এর আয়তন। সাড়ে চারশো পাতার উপন্যাস, মনে হয় চাইলেই কমিয়ে আনা যেতো। জীবনদর্শন যতোই বাস্তবসম্মত আর মুগ্ধকর শোনাক, ক্লান্তি এসে যায় একটা পর্যায়ে। কাহিনির ক্ষেত্রে বলবো, পূর্ববর্তী উপন্যাস "নিনাদ" এর ধারা ধরে রাখলেও লেখক অনেকটাই গোছানো আর ধীরস্থির এখানে। কিবরিয়ার বড় একটা গুণ, তিনি যাই-ই লেখেন পাঠকের কাছে তা আত্মবিশ্বাসের সাথে (ও বিশ্বাসযোগ্য করে) উপস্থাপন করতে পারেন। কাহিনি নাটকীয়ভাবে শুরু হলেও মুরাদ কিবরিয়া তা "অ-নাটকীয়" করে তীব্র বিষাদাচ্ছন্ন পরিবেশের সৃষ্টি করেছেন। এতোটা একা যাতে কখনো কাউকে না হতে হয়। ভালো লাগলেও, প্লটের ক্ষেত্রে লেখককে নতুনত্ব আনতে হবে এরপর, না হয় পড়ার আগ্রহ পাবো না ব্যক্তিগতভাবে।
কখনো কখনো এমন কিছু বই পড়া হয়, পাঠ শেষে বইটি বন্ধ করে তাকিয়ে থাকতে হয় দেয়ালের দিকে। এক ধরণের অপার মুগ্ধতা ঘিরে ফেলে পাঠককে। মুরাদ কিবরিয়ার 'নিনাদ'এর রোলার কোস্টার জার্নি অনেকটা এরকম মুগ্ধ করেছিলো। লেখকের দ্বিতীয় উপন্যাস সেই অনুভূতি জারি রেখেছে।
প্রেম প্রার্থনা মৃত্যু। এই তিনের সমাহারেই তো মানবজীবন জ্বলজ্বল করে। যারা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে অংশগ্রহন করেন না, তারাও কি প্রার্থনার উর্ধ্বে?
কিলার। নিজের এবং মা-বাবার নামপরিচয়হীন এক পেশাদার খু*নি। শৈশবে তাঁর শ্রদ্ধেয় স্যারের ভাষ্যমতে 'ছোটবাবু'। এই ছোটবাবু জীবনের মরু ঝড়ে, স্রোতের ঘূর্ণিতে জড়িয়ে পড়ে 'নেটওয়ার্কে'।
নেটওয়ার্ক। ভাড়া খাঁটা খু*নি-মাস্তানদের সঙ্ঘ। আপাতদৃষ্টিতে একজন খু*নিকে আমরা শুধুমাত্র খু*নি হিসেবেই দেখি। কিন্তু তাদের জগতেও আছে আইন-কানুন, অলিখিত সংবিধান। আছেন গডফাদার ও ওস্তাদ হাকিমেরা।
এসব খু*নাখু*নির মাঝে আছে রাজনীতি। স্বয়ং ওস্তাদ হাকিমেরা যে বিষয়ে সদাসতর্ক। বিপ্লবী সঙ্ঘ 'মুখোশ' ছাত্র-জনতা-মাস্তানদের সাথে নিয়ে ঘটাতে চায় তাদের কাঙ্ক্ষিত বিপ্লব।
এখানে আছেন খবরি কুতুব, খু*নিদের মাঝেও আছেন একজন কবি। গডফাদারদের মাঝে আছে প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা। আর আমাদের কিলার? একজন কন্ট্রাক্ট কিলারের ইন্ট্যারেস্টিং শৈশব, কৈশোরের কারণে আমরা তাঁর মাঝে দেখতে পাই দার্শনিকতার, উদাসীনতার এবং ভালোবাসার প্রতি কাঙালপনা, যে তীব্র আকুতি অনেকটা সূর্যকে মেঘের ঢেকে রাখার মতো চাপা থাকে। কিন্তু সেই সূর্য কতক্ষণই বা থাকে মেঘের আড়ালে?
মুরাদ কিবরিয়ার লিরিক্যাল, কাব্য ভঙ্গিমার সুন্দর গদ্যভাষার সাথে তীক্ষ্ম ইনসাইট এবং মানুষের অদ্ভুতুড়ে স্ববিরোধিতার গল্প আছে এ উপন্যাসে। খু*নি-মাস্তান-গডফাদার-হাকিমদের যে এক অনন্য জগত থাকতে পারে তা সচেতন পাঠককে নিবিড়ভাবে ধরে রাখার মতো গদ্যে লিখেছেন মুরাদ। ৪৫৪ পৃষ্ঠার উপন্যাস একবার শুরু করে ফেলার পর রিডার চলে যাবেন এক অ্যাঙ্গেজিং জগতে। হয়তো অনেকে নিজের খন্ডিত অংশও খুঁজে পাবেন বিস্তৃত এ আখ্যানে।
উপন্যাসে একশন আছে, আছে থ্রিল, তবে উপন্যাসটি নয় কোন গতানুগতিক থ্রিলারের ছকে আটকানো, ধাঁধাঁয় মোড়ানো কিছু। প্রেম প্রার্থনা মৃত্যু যেন বলে মানবজীবন নামের এক মহাকাব্যের কথা।
কিলারের বিষণ্নতা তাকে আলাদা করে ফেলে অনেক কিছু থেকেই। আবার তড়িৎগতিতে মাস্তানি কর্মকান্ড করতে দেখা যায় সেই কিলারকেই। জীবন নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি কিলার পাঠককেও সেসবের মধ্যে নিয়ে যায়। নির্লিপ্ততার সাথে কিলারের পাশাপাশি হাঁটতে হয়তো বাধ্য হন পাঠক নিজেই।
উপন্যাসের প্রতিটি অধ্যায়ের যথাযথ, সুন্দর নামকরণ চোখে পড়ে। সেই সাথে স্রোতে খেয়ার মতো ভেসে আসা প্রেম প্রার্থনা মৃত্যু কিলারকে তাঁর জীবনের কঠিনতম পরীক্ষায় ফেলে দেয়।
ক্ষমতা কী? কীভাবে তা কাজ করে, মানবজীবনের অনেক অনেক চিন্তার সূত্র স্বতস্ফূর্ততার সাথে ওস্তাদ হাকিমদের দরবারে পাঠক কিলারের সাথে নিজেও পেয়ে যেতে পারেন। অথবা হয়তো এইসব প্রশ্ন মানব-বিবর্তনের সমান্তরালে আমাদের সবার অবচেতনেই ছিলো, আছে।
উপন্যাস নিয়ে অনেকের মাঝেই অভিযোগ, উপন্যাস হয় না, হচ্ছে না। মুরাদ কিবরিয়ার লেখালিখির ক্রাফ্টম্যানশিপ, গল্পকথনের সুদক্ষতা এবং বিস্তৃত ক্যানভাসে 'প্রেম প্রার্থনা মৃত্যু'র কাব্যিক, গতিশীল, বহুমাত্রিক যাত্রায় পাঠক নেমে পড়লে ঠকবেন না অন্তত এ কথা বলতে পারি।
বই রিভিউ
নাম : প্রেম প্রার্থনা মৃত্যু লেখক : মুরাদ কিবরিয়া প্রচ্ছদ : সব্যসাচী মিস্ত্রী প্রথম প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ প্রকাশক : আদর্শ রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ।
প্রথমত, বইয়ের আয়তন আরো কমানো যেত এবং সেটাই সঙ্গতিপূর্ণ হত বলে মনে করি। মূল কাহিনির যে থিম সে বিবেচনায় বইয়ের বিস্তার অনেক বেশি। মেদ ছেঁটে আরো ১০০ পৃষ্ঠা অনায়াসে কমানো যেত।
দ্বিতীয়ত, বইয়ে প্রচুর ফিলোসফিকাল আলাপচারিতা আছে। প্রথমদিকে সেগুলো বেশ আকর্ষণীয় লাগলেও পরবর্তীতে একঘেয়েমি ভর করেছে এবং শেষদিকে কিঞ্চিৎ বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তৃতীয়ত, কিছু জিনিস বেখাপ্পা লেগেছে। যদিও গল্পটা আন্ডারগ্রাউন্ড দুনিয়ার, যা সম্পর্কে আমার বা আমাদের চাক্ষুষ জ্ঞান কম। তবুও কিছু কিছু ঘটনা এত কাব্যিক এবং সিনেমাটিক যে হজম করতে কষ্ট হয়েছে, বিশেষ করে কিলারের সাথে খেয়ার ব্যাপারটা।
চতুর্থত, গল্পের নায়ক 'সেকেন্ড কিলার'কে অতিমানবীয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। খুললাম খুল্লাভাবে দেখানো নাহলেও কিলার সাহেবকে বেশিই সুপেরিয়র হিসেবে দেখানো হয়েছে। (জানি গল্পের নায়করা বাকিদের চেয়ে সুপেরিয়র হয়, হতেই হবে। কিন্তু একজন ভাড়াটে খুনি একইসাথে সাহিত্যপ্রেমী, প্রেমিক, দার্শনিক, স্টোয়িক, দয়াশীল, আদর্শবান, ক্যারিশমাটিক হবে এই ব্যাপারটা কেমন জানি। বাংলা সিনেমার জসিমের মতো সৎ ও আদর্শবান মাস্তান টাইপ ফিল আসে)
পরিশেষে, লেখকের লেখার হাত সুন্দর। গল্প বলার স্টাইলও ভালো লেগেছে। বইয়ে কিছু উক্তি, সংলাপ মনে রাখার মতো। লেখকের বাকি লেখাগুলোও পড়তে আগ্রহী।
ঢাকা শহরের খুনিদের নেটওয়ার্কের একজন অন্যতম খুনি হচ্ছে আমাদের বইয়ের প্রধান চরিত্র ‘কিলার’। তার জবানীতেই বইয়ের কাহিনী এগিয়েছে। আমরা ধীরে ধীরে জানতে পারি তার অতীত, বর্তমানের কিলার হয়ে উঠার পেছনের বিষাদময় গল্প। জানতে পারি ঢাকা শহরের কিলার গ্রুপের নিয়মনীতি, ওপরতলার হাকিম থেকে রাস্তার মাস্তানতক নেটওয়ার্কের গঠনবিন্যাস, কার্যপ্রণালী। সাথে আছে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, আনুগত্য, বেইমানী আর খুনের গল্প।
এই বইয়ের প্রতিটি চরিত্রই ভীষণ রকমের একলা। গোটা বইটাকেই আমার কাছে একজন নিঃসঙ্গ মানুষের আলাপন মনে হয়েছে। ৪৫৪ পৃষ্ঠার বিশাল কলেবরের বইয়ের এই আলাপন পড়তে ভালো লেগেছে। এইরকম গদ্যকেই বুঝি বলে মিঠা গদ্য।
বইয়ের কাহিনী স্লো কিন্তু সাবলীল গদ্যের জন্য, ভাবনার গভীরতার জন্য বই রেখে উঠা যায় না, এইসব ভাবনার মধ্যে আধ্যাত্মিকতার রেশও টের পাওয়া যায়। আর কিলার চরিত্রটাকে মনে হয়েছে চরমতম নিঃসঙ্গ একজন মানুষ। সে অন্যের সাথে যত কথা বলে তার থেকে অনেক বেশি বলে নিজের সাথে। তার চিন্তার জগতকে জানতে ভালো লাগে। ভেতরে ভেতরে আমরা প্রতিটা মানুষই একলা বলে হয়তো কিলারের সাথে রিলেট করতে পারি চট করে। কিলারের অনেক কথাকেই মনে হয় নিজের ভাবনার অংশ।
বইয়ের শুরু থেকেই কিলারকে মনে হচ্ছিল সে লেগো সেটের এমন একটা অংশ যা কোথাও সেট হয় না। একলা থাকাই যেন তার নিয়তি। এই নিয়তির বাইরে যাওয়ার কোন তাগিদও তার মধ্যে নেই। সে অনেক কিছু করে আবার কিছু না করে চুপচাপ যা হওয়ার তা হবে টাইপ ভাইব নিয়ে বসে থাকে।
শেষ কথা হচ্ছে বইটা দারুননননন লেগেছে। লম্বা সময় নিয়ে পড়েছি। ব্যক্তিগত মত হচ্ছে এই বই তাড়াহুড়া করে না পড়ে একটু বেশি সময় দিয়ে পড়লে ভালো হবে। সব্যসাচী মিস্ত্রীর করা প্রচ্ছদটা সুন্দর হয়েছে। একদম সাদামাটা কিন্তু সুন্দর।
বাংলাদেশে এখন যারা উপন্যাস লেখেন তাদের মধ্যে অন্যতম মুরাদ কিবরিয়া। নিনাদ দিয়েই তার জাত চিনিয়েছেন।
উপন্যাসের সাধারণ প্লটে আপনারা কী চান? ক্যারেক্টার, সমস্যা ও সমাধান? নাকি আরও কিছু?
সেই আরও কিছুর সঙ্গেই ডিল করেন মুরাদ কিবরিয়া। বাবার খুনির সঙ্গে উন্মাতাল প্রেম আর মৃত্যু যে আপনার ২ ইঞ্চি দূরে ঘুরতে থাকে সেটা হয়তো জানেন। কিন্তু কখনো হয়তো সেভাবে দেখেননি।
গা শিউরে উঠবে উপন্যাসের পাতায় পাতায়। মুরাদ কিবরিয়ার গদ্য আর মেটাফর এমন যে আপনাকে বই থেকে চোখ সরাতে দিবে না। মনে হবে আরে যত বড়ই হোক যত কাজই থাকুক শেষ করে উঠি।
কখনো দুঃখবোধে আড়ষ্ট হবেন। মনে হবে জীবন এত মাদারচোদ কেন! আবার কখনো ভয়ে কাঁপবেন মনে হবে একটা সাপ পিঠ দিয়ে সড়সড় করে পার হচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে আপনার কী করার থাকতে পারে? চুপচাপ সাপকে ক্রস করতে দেওয়াই তো? উপন্যাসেই এই মনে হবে। মনে হবে শেষ করি। এই ভয় থেকে উঠে যাওয়া ঠিক হবে না।
আবার বইয়ে পাবেন ঢাকার গোপন অনেক কিছু যা আপনি বিশ্বাস করতে চাবেন। এবং আপনার কাছে মনে হবে সত্যিই এক গডফাদার আছে, যে পুরো এই অপরাধ জগৎ চালায়।
অপরাধ জগতের অন্ধকার ঘুপচি গলি ধরে হাঁটতে থাকবেন। আবার অপরাধীকে মনে হবে আপনারই আপন কেউ। যে আপনার বন্ধু বানাতে মন চাবে। যার দুঃখে আপনার মন খারাপ হবে।
এত এত ভায়োলেন্সের জগতে প্রেমও যে মানুষকে কেমন চোদনা বানিয়ে ফেলে এটা একটু অদ্ভুতভাবেই পাবেন। উটের জকি থেকে টপ টেররের বয়ানে এই উপন্যাসের গতি খুব স্মুথ।
"অন্ধকার আর কতটুকুই গাঢ় যে অন্ধকারে মধ্যে পতিত মানুষ নিজের মৃত্যুকে দেখতে পায়না? অন্ধকার তো তখনই অন্ধকার, যখন শরীর এবং হৃদয়, কোনটাকেই আর খুঁজে পাওয়া যায় না''
বই : প্রেম প্রার্থনা মৃত্যু
লেখক : মুরাদ কিবরিয়া
জনরা : সমকালীন উপন্যাস
প্রকাশনী : আদর্শ
পৃষ্ঠা : ৪৫৪
মুদ্রিত মূল্য : ৯০০
আত্মপরিচয় ভুলে যাওয়া নামহীন এক চরিত্র - কিলার! জীবনের নানান পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছে পেশাদার খু/নি। ঢাকা শহরের এই খু/নিদের বিশেষ সংগঠন আছে। আছে সংগঠনের নিয়ম কানুন, লিখিত-অলিখিত সংবিধান। আছে ওস্তাদ হাকিম, আছে গডফাদার আর মাস্তানরা।
কিলারের জবানিতে একে একে উঠে আসে তার অতীতের বিষাদময় গল্প। প্যারালালি চলে তার বর্তমান কিলার হয়ে ওঠার পিছনের ঘটনা। নিয়মাফিক খুনোখু/নির মাঝে আছে রাজনীতি, আছে বিপ্লবী সংঘ।
আছে কিলারের হাকিম হওয়ার পরীক্ষার বিবরণ। এতো খুনোখু*নির মাঝে আছে কিলারের প্রেমে পড়ার কাব্যিক বর্ণনা। আছে সদ্য বিধবা হওয়া এক অনিন্দ্য সুন্দরীর অর্থহীন সম্পর্কের ছক। সবটাই কি ছল?
লেখকের আগের উপন্যাসে (নিনাদ) প্রচুর নাটকীয় মোড় ছিলো। এই বইয়েও ছিলো তবে কিছুটা কম। সমাপ্তি অবশ্য অ-নাটকীয় ছিলো, তাইতো এতোটা মেলানকোলিক হয়ে উঠেছে।
উপন্যাসে বেশ কিছু খামতি আমার চোখে পড়েছে। শুরুতেই এর আয়তন - ৪৫৪ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটি হয়তো কিছুটা ছাঁটলেই আরও সুন্দর হতো।
ক্রাইমের এই অন্ধকার জগৎ এর ঘটেছে দারুণ সব সিনেম্যাটিক ব্যাপার৷ যেমন, খেয়ার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা কিংবা শাকিলের সদ্য বিধবা বউয়ের সাথে সখ্যতা। এগুলা বাস্তবতা বিবর্জিত মনে হয়েছে।
আর হ্যাঁ, কিলারের বহুগুণের অবতারণা ঘটিয়েছেন লেখক। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও আর ভাড়াটে খু*নি হওয়া সত্ত্বেও - কিলার একজন দার্শনিক, সাহিত্যপ্রেমি, ন্যায়পন্থী, আবার প্রেমিকও। এই ব্যাপারগুলা হজম করতে একটু কষ্ট হইছে।
এমনিতেই, লেখকের গদ্যশৈলী বেশ আকর্ষণীয়। পড়তে বেশ আরাম, লিরিকাল একটা ভাইব আছে। পাশাপাশি দার্শনিকতায় মোড়ানো বেশ কিছু উক্তি একদম চমৎকার ছিলো। কিছু কিছু লাইন এতো চমৎকার ছিলো যে, কয়েকবার করে পড়েছি।
তবে লেখক এই ধারা থেকে বের হতে না পারলে সম্ভবত ওনার বই পড়ায় পরবর্তীতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারি।
বাতিঘরে চার ঘন্টা বসে থেকে এক টানা সাড়ে চারশ পৃষ্ঠার বই শেষ করা একটু অদ্ভুতই বটে! যদিও শেষের একশ পেইজ উড়ন্ত গতিতে গেছে...
পরিশেষে বক্তব্য, চাইলেই বইয়ের কলেবর কমানো যেতো। নিনাদের মতোন অতটা মুগ্ধতায় ভেসে যাইনি, তবে জীবন দর্শনের বিভিন্ন আলাপগুলো হৃদয় ছুয়েছে বরাবরের ন্যায়৷ নিনাদের লেখকের কাছ থেকে প্রত্যাশা অনেক, যা মুরাদ কিবরিয়া ভাই এই বইয়ের মাধ্যমে পূরণ করতে সক্ষম হননি বলেই আমার মনে হয়েছে....