পুরাণে পঞ্চকন্যা বা পঞ্চসতী নামে পরিচিত অহল্যা, মন্দোদরী, তারা, কুন্তী ও দ্রৌপদী। প্রথম তিনজন মূলত রামায়ণের চরিত্র। মাহমুদুর রহমান-এর 'পঞ্চকন্যা' এদের গল্প না। বরং মহাভারতের পাঁচ নারী চরিত্রকে নিয়ে এই বই। তারা হলেন হিড়িম্বা, সত্যবতী, সুভদ্রা, অম্বা ও গান্ধারী। প্রত্যেকেই মহাভারতে নানা ঘটনার নিয়ামক। কিন্তু তাদেরকে মহাভারতে অন্য অনেক চরিত্রের মধ্যে আলাদা করে দেখা সহজ না। এই পাঁচ নারীকে কাছ থেকে দেখার চেষ্টা, তাদের গল্প বলার চেষ্টা 'পঞ্চকন্যা'।
হিড়িম্বা আর সত্যবতি পড়ে বাকি তিন কন্যা পড়ার ইচ্ছেটা মরে গেছে। লেখকের থেকে এতো অ্যামেচার আর অতি সাধারণ লেখা আমার এক্সপেকটেশনে ছিল না। বিশেষত যেখানে তিনি মোগলনামা তে পাঁকা হাতের খেল দেখিয়েছেন ভালোমতোই। মহাভারত যারা দেখেছেন কিংবা পড়েছেন তার তুলনায় এ নেহাত আগডুম বাগডুম। হিড়িম্বা পড়ে তো আমি হাসতে হাসতে গড়াগড়ি। মহাভারত সিরিয়াল দেখে লিখলেও এর চেয়ে শতগুনে ভালো কিছু ডেলিভার করা সম্ভব।
এমনিতেই পাতাগুলো ছোট ছোট। তারপর মাত্র ২০০ পৃষ্ঠার মধ্যে মহাভারতের অন্যতম ৫ টা চরিত্রকে যায়গা দেওয়ার জন্য যেরকম মুন্সিয়ানা দরকার ততটুকু আমি প্রথম দুটো চরিত্রে পাইনি। হ্যাঁ, যারা এদের সম্পর্কে কিছুই জানেন না, মহাভারত কখনো চেখে দেখেননি তাদের ভালো লাগতে পারে। তাদের জন্য শুভকামনা।
❛নারী- বিপুল রহস্যের আধার। নারী কখনো সরল, কখনো কুটিল, কখনোবা জটিল। এই নারীই আবার কোমলতার বিমূর্ত প্রতীক। নারী সব সয়ে নেয়, আবার নারীই সইতে না পেরে সব তছনছ করে দিতে পারে।❜
মহাভারতে পঞ্চপাণ্ডব বলতে আমরা চিনি যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল আর সহদেবকে। এদের একেকজনের একেক দক্ষতা। আবার পুরাণে পঞ্চকন্যা বলতে যাদের চিনি তাদের তিনজন রামায়ণের এবং দুইজন মহাভারতের চরিত্র। তবে আলোচিত চরিত্র ছাড়াও মহাভারত নামক মহাকাব্যে এমন অনেক চরিত্র আছে যারা মূল চরিত্রদের ভিড়ে আলো পায় না। রয়ে যায় নিভৃতে। আবার আমরা তাদের চিনি কুটিল, জটিল হিসেবে। কিন্তু আদতেই কি তারা অতটাই কুটিল ছিলেন? তাদের দিকের গল্পটা আমরা কতটা জানি?
মহাভারতে আছে এমন পাঁচ কন্যা যারা গল্পের খাতিরে এসেছে আবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে রয়ে গেছে আলোচনাহীন। কিন্তু তাদেরও হয়তো দুঃখ ছিল, ছিল না পাওয়া কিংবা এমন কোনো অনুভূতি যা নিয়ে আলোচনা হয়নি।
এই যেমন হিড়িম্বা। নগরের কাছে তারা পরিচিত রাক্ষসী হিসেবে। মহাভারতে তাকে আমরা চিনি ভীমের প্রণয়াপ্রার্থী হিসেবে। ভীমকে ভালোবেসে সে স্বামী হিসেবে পেলেও সংসার করতে পারেনি। নগরে যে তাদের ঠাঁই নেই। তবুও ক্ষণিকের সেই সংসার উপভোগ করেছেন প্রয়োজনের সময় পুত্রকেও উৎসর্গ করতে পিছপা হয়নি। লোকালয়ে থেকে আমরা পুত্র হারানোর শোকে বিহ্বল যেসব নারীর ক্রন্দন শুনতে পাই তেমনটা অরণ্যের গহীনে থাকা হিড়িম্বার আর্তনাদ কি শুনতে পাই?
সত্যবতীকে কুটিলা নারী হিসেবেই জানে লোকে। কিন্তু রাজার মেয়ে হয়েও পালকগৃহে বাস, গায়ে মাছের গন্ধ আর নারী বলে জীবনের অদ্ভুত সব মোড়ে দাঁড় হওয়া এই নারীর জীবনী কতটা সুখের? যৌবনের এক প্রতিজ্ঞার পরিণাম কি তাকে শেষকালে ভুগিয়েছিল? অন্যায় সে করেছিল তবে তাতে মনের সায় কতটুক ছিল আর পরিস্থিতির দায় কেমন ছিল?
অর্জুনের প্রেমে মত্ত কৃষ্ণের ভগিনী সুভদ্রা। তাকে স্বামী হিসেবে পেয়েছিল। কিন্তু পাণ্ডববর পেয়েও তার জীবনের বাঁকগুলো সহজ ছিল না। কীভাবে সে টেনে নিয়ে গিয়েছিল বিলীন হতে যাওয়া কুরুবংশকে? কুরুক্ষেত্রের ময়দানে পুত্রের করুণ পরিণতি দেখে তার হৃদয়ের আর্তনাদ কেমন ছিল? কীভাবেই বা সে দ্রৌপদীর সাথে ভাগ করেছিল স্বামীকে? অথবা তার উল্টোটাই বরং বেশি মানানসই।
অম্বা, অম্বিকা, অম্বালিকা তিন ভগিনী। ভীষ্মের দ্বারা হরণ হয়েছিল তারা। বাকি দুই বোন বিচিত্রবীর্যের স্ত্রী হলেও অস্বীকার করেছিল অম্বা। তার জীবনের গল্প করুণ। স্বয়ম্বরে হরণ হওয়ায় হারাতে হয়েছিল প্রেমিক সৌভরাজকে। অপমানিত হয়েছিল। তেমনি প্রতিজ্ঞার দোহাই দিয়ে ত্যাগ করেছিল ভীষ্মও। পরজন্মে সেই কী করে হলো শিখণ্ডি আর নিজের ঘৃণার আনজাম দিলো এই গল্প অবাক করবে।
গান্ধারী মহাভারতের স্বেচ্ছায় অন্ধত্ব বরণ করে নেয়া এক আড়ালে থাকা নারী। অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের সাথে সত্যবতীর পরিকল্পনায় বিবাহ করার ফলে নিজের জন্য স্বেচ্ছা অন্ধত্ব বেছে নিয়েছিল সে। এ কি ছিল নিরুপায় নারীর নীরব প্রতিবাদ নাকি স্বামীর দুঃখ ভাগ করে নেয়া? তিনিও রাজমাতা হয়েছিলেন কিন্তু তার বিনিময়ে কি খুব বেশি ছিল না? যাকে আমরা শতপুত্রের জননী হিসেবে জানি তার সব পুত্র হারানো আর সেই হ ত্যাকারীদের সাথেই একত্রে বসবাস করা তার জন্য কষ্টের ছিল কি? যদিও তার পুত্রেরা ঘোর পাপ করেছিল। তবুও সে মাতা। জীবন সায়াহ্নে এসে নিজের কৃতকর্মের কথা ভেবে অনুশোচনা হয়েছিল কি?
নারী মাত্রেই পরিকল্পনার অংশ। কখনো সওদা করা হয় তাদের দিয়ে। আবার তারাই রাজনীতির এক ঘুটি হিসেবে রাজ্য বাড়ানোর চাল হিসেবে ব্যবহার হয়। এই নারীরাও তেমনই খেলার অংশ হয়েছিল।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝পঞ্চকন্যা❞ মাহমুদুর রহমানের মহাভারতের পাঁচ নারীকে নিয়ে লেখা আখ্যান। একে উপন্যাস বা সংকলন কোনো কাতারেই সেভাবে ফেলা যায় না।
মহাভারতে পুরুষের সৌম্য, শক্তি আর তেজের ছড়াছড়ি। আছে অলৌকিক সব ঘটনা। আছে নারীর রূপের আলোকচ্ছটা। এসবের আড়ালেও আছে অনেক চরিত্র। যাদের আমরা তেমনভাবে চিনি না বা চিনলেও তাদের গল্পগুলো আড়ালে রয়ে যায়। বলে না কোনো ঘটনায় দুই পক্ষের গল্পই শুনা আবশ্যক। কে সঠিক কে ভুল এই বিচার করতে হলে গল্পের দুটো দিকই জানা উচিত। এই প্রয়াস নিয়েই লেখক মহাভারতের কম আলোচিত কিংবা জটিল পাঁচ নারীর আখ্যান পুঁজি করে লিখেছেন বইটি। লেখকের পুরাণ সিরিজ নিয়ে বেশ আগ্রহ থাকলেও কেন জানি পড়া হয়ে উঠেনি। এই বইটা দেখার পর আগ্রহ বেশ ছিল। অবশেষে পড়তে পারলাম।
ক্রাউন সাইজের ২০৫ পৃষ্ঠার বইতে লেখক মহাকাব্যে আসা পাঁচ নারীর জীবনী খুবই ছোটো করে জায়গা দিয়েছেন। একে রেফারেন্স ধরে পড়াটা হয়তো যৌক্তিক হবে না। তবে গল্পের খাতিরে পড়লে খারাপ লাগবে না।
মহাভারতের গল্প বিভিন্ন লেখকের লেখায় ভিন্নভাবে পড়তে বেশ লাগে। লেখকও তার নিজস্ব লেখার মুন্সিয়ানায় গল্পগুলো বলেছেন পাঁচটি আলাদা অংশ করে।
হিড়িম্বা, সত্যবতী, সুভদ্রা, অম্বা কিংবা গান্ধারীকে তুলে ধরেছেন নতুন এক রূপে। তাদের মনের ভিতরকার অন্তর্দ্বন্দ্ব, বেদনা বা ক্ষোভের সন্ধান হয়তো আমরা জানি না। লেখক তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের গল্পগুলো বলেছেন।
তবে অল্প কয়েক পাতায় তাদের ঠাঁই দেয়া যথেষ্ট মুশকিলের কাজ। লেখক চেষ্টা করেছেন যথাসম্ভব সহজবোধ্য করতে। তবুও মনে হয়েছে চাইলে আরেকটু টানা যেত।
আমার কাছে পড়তে ভালোই লেগেছে। যদিও এদের গল্প অল্পস্বল্প জানতাম। তবে অবশ্যই ভিন্ন আলোকে। লেখক তার কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন।
মহাভারতে অলৌকিকতার শেষ নেই। এই বইতে লেখক সেই অলৌকিকতাকে বেশ বাস্তবিক তথা লৌকিক আকার দিয়েছেন। এই যেমন, গান্ধারীর শতপুত্রের ব্যাপারটাকে একেবারেই স্বাভাবিক এবং সহজ ব্যাখ্যা দিয়ে ফুটিয়েছেন। মহাভারতের উল্লেখ করা এই পাঁচ নারীর জীবনের জটিলতা, মনের খেয়াল আর কর্মগুলোকে সংগ্রাম করা সাধারণ যুগের নারীদের কাতারেই এনেছেন। নারীরা শক্তির আধার। বর্তমান যুগ কিংবা সেই প্রাচীন যুগ হোক কালক্রমে নারীরাই শক্তির উৎস।
হাজার বছর পর আজও নারীরা কি মুক্ত? কিংবা বড়ো কোনো দানের ছোট্ট অংশ হিসেবে ব্যবহার হয় না? তবুও আমাদের কাছে পুরাণের চরিত্ররা কেন এখনো অবাস্তব চরিত্র হিসেবে আসবে? দিন বদলালেও ঘটনার গভীরতা কি সহজেই বদলায়?
পাঁচ স্বল্পজীবনীর মধ্যে হিড়িম্বার ঘটনা আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে। আবার অম্বা তথা শিখণ্ডির পরিণতির সাথে ভ��ষ্মের পরিণতির কথা সেভাবে আসেনি। হুট করেই যেন অম্বা থেকে শিখণ্ডিতে টার্ন নিয়েছে লেখক। শুরুতে বুঝতে পারিনি।
মোটের উপর বইটা পড়তে খারাপ লাগে না। মহাভারত পুরোটা পড়া নেই। এদিক সেদিক অল্প স্বল্প মিলিয়ে গল্প জানি। সারাংশ জানি। যারা মহাভারত নিয়ে জানে না তাদের কাছে আরো উপভোগ্য লাগবে। আমার আশা আরেকটু বেশি ছিল।
তবে অস্বীকার করা যাবে না লেখকের শব্দ চয়ন, বাক্যের ব্যবহার। কিছুটা প্রাচীন রীতি আর গম্ভীর শব্দের প্রয়োগ ছিল। এ ধরনের ভাষায় পড়ে অভ্যস্ত না থাকলে পড়তে কঠিন লাগবে। তবে মহাভারতের কাহিনির সাথে এমন ভাষার প্রয়োগই আমার মনে হয়েছে সবথেকে যৌক্তিক। লেখক বইয়ের ভাষায় নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
বইটার প্রতি আগ্রহ হওয়ার অন্যতম নিয়ামক ছিল প্রচ্ছদ। খুবই সাধারণ কিন্তু চোখে লাগার মতো প্রচ্ছদ। আমার খুবই ভালো লেগেছে।
বইতে ছিল কাহিনির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু ইলাস্ট্রেশন। সেগুলো বেশ ভালো লেগেছে।
সম্পাদনায় তেমন ঘাটতি নজরে আসেনি। দু একটা ছাপার ভুল ছিল। এছাড়া পড়তে সমস্যা হয়নি।
❛নারীর গল্প কখনো মহাকাব্যের থেকেও বিশাল। তার ত্যাগ, সংগ্রাম কিংবা যাতনার খবর শুধু তার মনের গহীনেই সন্ধান সম্ভব।❜
আমরা কমবেশি সবাই মহাভারত, রামায়ন নিয়ে জানি, ছোটবেলায় এই বিষয়ের উপর বানানো টিভি সিরিয়াল আমরা অনেকেই দেখতাম। তবে যত নাটকই বানানো হোক না কেনো তারা কিন্তু সবসময় কিছু প্রধান চরিত্রকে মাঝে রেখেই গল্পটা তুলে ধরত। মহাভারতের কাহিনীতে এই চরিত্রগুলো ছাড়াও আরো অনেক চরিত্র রয়েছে যারা নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে, নিজের সুখ বিসর্জন দিয়েছে। কিন্তু তাদের নিয়ে কখনো কোনো কথা বলা হয়নি, দেয়া হয়নি প্রাপ্য সম্মান।
এই বইতে লেখক মহাভারতের পাঁচজন বিশিষ্ট নারীর জীবনের গল্প এবং তাদের অবদান তুলে ধরেছেন যারা আজীবন থেকে গেছেন লোকচক্ষুর আড়ালে, যারা আজীবন রয়ে গেছেন পার্শ্ব চরিত্র হিসেবে যাদের কেউ মনেও রাখেনা। এই পাঁচ নারী হলেন হিড়িম্বা , সত্যবতী, সুভদ্রা, অম্বা এবং গান্ধারী। এই পাঁচ নারী ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে পাণ্ডব এবং কৌরবদের সাথে, তাদের পরিবারের সাথে, তাদের ভিতরের যুদ্ধের সাথে। এই নারীরা মহাভারতের বিস্তৃত আখ্যানে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাহিনী বা ঘটনার প্রেক্ষিতে এসেছিলেন। এই বইতে তাদের পাঁচজনকে আলাদাভাবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এখানে লেখকের নিজস্ব কিছু কল্পনা এসেছে লেখার প্রয়োজনে, যদিও মূল ঘটনা বা চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বদলানো হয়নি। এই বইতে হয়তো আপনারা পুরো মহাভারতের কাহিনী পাবেন না, ছাড়া ছাড়া কাহিনী পাবেন। কারণ এটা মহাভারতের কাহিনী নিয়ে বই না, এটা মহাভারতের পাঁচ নারীর জীবনের গল্প ছোট আকারে দেখানোর চেষ্টা মাত্র। পুরাণের গল্পের প্রতি আগ্রহ থাকলে এটা পড়ে দেখতে পারেন। খুব সহজ বাংলায় লেখা সেটা বলবনা, একটু কঠিন বাংলা ব্যবহার করেছেন লেখক পুরাণের অনুভূতি দেয়ার জন্য। তাই অনেকের পড়তে খানিকটা কষ্ট হতে পারে। তবে খারাপ লাগবেনা আশা করি। এই বই পরে লেখকের বাকি বইগুলো পড়বার ইচ্ছে জেগেছে। তার বাকি বইগুলোও ইতিহাস আর পুরাণ নিয়েই। এই নিয়েই তার বেশিরভাগ লেখালেখি।
মাহমুদুর রহমানের আমার পড়া প্রথম বই এইটা। পুরাণে পঞ্চকন্যা বলতে মহাভারত আর রামায়ণ এর সম্মিলিত ৫ জনের কথা বলা হয়নি এই বই তে। এখানে উন্মোচিত হয়েছে মহাভারত এর তেমন লাইম লাইটে না আসা ৫ জন নারী এর ইতিহাস। হিড়িম্বা, সত্যবতী, অম্বা, গান্ধারী, সুভদ্রা মহাভারতে তেমন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে না থাকলেও তাদের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, ত্যাগ, মনোভাব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে উঠিয়েছেন লেখক। যার মহাভারত সম্পর্কে সামান্যতম জ্ঞান নেই সে ও অনায়াসে পড়ে ফেলতে পারবেন পুরো বইটা। তার শব্দচয়ন ছিল অতি মনোমুগ্ধকর। তিনি এমন সব তৎকালীন শব্দ ব্যবহার করেছেন যেটি মহাভারতের গাম্ভীর্য ধরে রেখেছেন যেটি না থাকলে বইটির অসাধারণত্ব ই থাকতো না, অবশ্য এমন সব শব্দ ব্যবহার করেন নি যেটি দুর্বোধ্য আমাদের কাছে। অনেককের কাছে কেমন লাগবে জানি না কিন্তু আমার কাছে এই বিষয়টা আশ্চর্যভাবে ভালো লেগেছে যে তিনি মহাভারতের অলৌকিক কোনো বর্ণনা দেননি বরং তিনি সাভাবিক ভাবেই তখনকার রাজনীতি, ব্যক্তিমনোভাব সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
বইটির প্রচ্ছদ ছিল চোখে লাগার মত। আমি মহাভারত সম্পর্কে আগে তেমন ধারণা ছিল না কিন্তু লেখক এর লিখিনী তে মুগ্ধ হয়ে পুরো রাজশেখর বসু এর মহাভারত পড়তে শুরু করেছি।
মহাভারতের ৫ জন নারীকে নিয়ে লেখা পঞ্চকন্যা। হিড়িম্বা,সত্যবতী,সুভদ্রা,অম্বা,গান্ধারী এই পঞ্চকন্যার অবদান,আত্মত্যাগ,সুখ-দুঃখ-প্রেম-বিরহ গাঁথা উঠে এসেছে এক মলাটে। যারা মহাভারতের নারীদের নিয়ে জানেন না,কিন্তু জানতে চান,তাদের জন্য বইটি চমৎকার একটি পাঠ্য হতে পারে।পঞ্চকন্যার সংক্ষিপ্ত জীবনী-ই বলা যায়। আর যারা মহাভারত নিয়ে জানেন,তারা তবুও বইটি সংগ্রহে রাখতে পারেন এর চমৎকার প্রচ্ছদের জন্য।(আমার মতো) ভেবে দেখলাম,রাক্ষসী হোক বা মানবী,দাসী হোক বা রাজকুমারী,হিড়িম্বা ডাকুন বা গান্ধারী,রাজমাতা হোক বা পাটনী-নাম,ধাম,কর্ম,চেহারা,পরিচয় বদলে দিলেও,মহাভারতের এসব নারীদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ঐ একই থাকে। শুধু মহাভারত কেন?সেই যুগ থেকে এই যুগ-কন্যারা আজো কেমন হতভাগ্যি।
আধাত্মিক ধর্মগুরু হিসেবে বেদব্যাস কতটা সফল ছিলেন তার অকাট্য প্রমাণ খুব বেশি অবশিষ্ট নেই। তবে একজন কাব্যকার হিসেবে তার সফলতার নিদর্শন মহাভারত। কালীপ্রসন্ন সিংহ, কবীন্দ্র পরমেশ্বর, কাশীরাম দাস, হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ, রাজশেখর বসু সহ আরো অনেকেই প্রতিবর্ণীকরণ করেছেন ব্যাসের এই মহাকীর্তির। বঙ্কিম থেকে বাণী বসু, এই পাড়ে হরিশঙ্কর জলদাস হয়ে মাহমুদুর রহমান মহাভারতের চরিত্রগুলো বারংবার এসেছে বিভিন্ন লেখকের আতশি কাঁচের নিচে।
চরিত্র এবং গল্পের ডামাডোলে মহাভারত এক বিস্তৃত আখ্যান। অনেক চরিত্রই তাই এই মহাকাব্যে বিকশিত হয় নি। গল্পের প্রেক্ষাপট সৃজনে এদের আবির্ভাব, অনেকটা নীরবেই তাদের বিদায়। ���ই যেমন ধরুন হিড়িম্বা। রাজশেখর বসুর সারানুবাদে আদিপর্বে আমরা তাকে দেখি ভীমের প্রণয়প্রার্থিনী রূপে।। সারা মহাকাব্যে তার আর উপস্থিতি নেই। কিন্তু কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধে তাঁর সবেধন নীলমণি ঘটোৎকচকে হারানোর কষ্টটা আমরা মহাভারতে পাই না। ভীষ্ম আর শাল্বের অহং এর যুদ্ধে বিধ্বস্ত অম্বার মনের প্রকৃত ছবি ব্যাসদেবের আখ্যান আমাদের দেয় না। বা ধরুন পুত্র ও স্বামী ধর্মে ব্রতী করতে ব্যর্থ হওয়া অথবা নিজের পুত্রহন্তাকারীদের আশ্রয়ে থাকতে বাধ্য হওয়া গান্ধরীর মনের মানচিত্র কতটা এসেছে এই মহা আখ্যানে?আদিপর্ব আমাদের বলে অর্জুন কর্তৃক সুভদ্রা হরণের কথা-ই কিন্তু সুভদ্রা তখন কি ভাবছিলেন? সত্যবতী কি কখনো অনুশোচনায় ভুগেছেন ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা বা অম্বা, অম্বিকা, অম্বালিকাকে নিয়ে??
পুরাণে পঞ্চকন্যা হিসেবে বলা হয় অহল্যা, মন্দোদরী, তারা, দ্রৌপদী ও কুন্তীকে তবে মাহমুদুর রহমান তাঁর লেখার জন্য বেছে নিয়ে মহাভারতের পাঁচ চরিত্র: হিড়িম্বা, সত্যবতী, অম্বা, সুভদ্রা ও গান্ধারী। আলাদা ক্যানভাসে লেখক চেয়েছেন চরিত্রগুলোকে মহাভারতের মূলগল্প থেকে বের করে ফুটিয়ে তুলতে। নারী বরাবরই শক্তির আধার। পৌরাণিক নারীদের একুশ শতকের বাস্তবতার আলোয় ফুটিয়ে তুলতেই চেয়েছেন লেখক। মহাভারতের পাঁচ নারীর হতাশা, ব্যথা, অভিমান, অনুযোগ আর মনের ছবি ধরা পড়েছে মাহমুদুর রহমানের কলমে।
পঞ্চকন্যা উপন্যাস না; গল্প না; উপন্যাসিকাও নয়, বরং বিশ্লেষণধর্মী আখ্যান। যারা গল্পের আশা নিয়ে বই পড়েন তাদের জন্য এই বইয়ে তেমন কিছু নেই। মহাভারতে অনেক অলৌকিক ঘটনার ঘনঘাটা। কখনো সখনো এই অলৌকিকত্ব মহাভারতের চরিত্রগুলোকে বিপর্যস্ত করেছে। পঞ্চকন্যার লেখক চেষ্টা করেছেন সেসব অলৌকিকত্বে লৌকিক প্রলেপ দেওয়ার। তবে পুরো মহাভারত জুড়েই এতোই অলৌকিকতা যে প্রলেপটা ঠিক যুতসই হয় নি সবখানে। এই যেমন অম্বার শিখন্ডী হওয়ার ব্যাখা লেখক দাঁড় করালেও, ভীষ্মের ইচ্ছেমৃত্যু নিয়ে কোন ব্যাখা নেই। মাহমুদুর রহমানের লেখার ভঙ্গিটা পৌরণিক আখ্যানের সাথে বেশ ভালো খাপ খায়। পঞ্চকন্যাতেও এর ব্যত্যয় হয় নি। পঞ্চকন্যাকে আমি দেখতে চাই একটা নিরীক্ষা হিসেবেই। এই সময়ের দৃষ্টি দিয়ে প্রায় ২৫০০ বছরের প্রাচীন ঘটনাকে দেখার প্রয়াস হিসেবে।
পুরাণ গল্পের মাঝে আমার বরাবর অদম্য আগ্রহ কাজ করে থাকে। তন্মধ্যে হিন্দু পুরাণ নিতে কম বেশি আগ্রহ ছিল আগে থেকেই। মনের মত কোনো পুরাণধর্মী কোনো উপন্যাস বা বই পেলে হাতছাড়া না করে সেটি পড়তে বেশ ভালোই লাগে। এর আগে পড়েছিলাম সিদ্দীক আহমেদের ধনুর্ধর উপন্যাস। তুখোড় ধনুক চালানো অর্জুনের এক টানটান উত্তেজনাময় উপন্যাস, যেটি শেষ পর্যন্ত আমাকে মুগ্ধ করেছে। এছাড়া হরিশংকর জলদাসের শূপর্নখা বইটি প্রকাশ হওয়ার দিনেই সংগ্রহ করি। মোটকথা, পুরাণের গল্প নিয়ে আমার আগ্রহের স্থান সবসময়েই রয়েছে। তন্মধ্যে এই বছরের বইমেলার পুরান আশ্রিত আরেকটি বই যেটি নজর কাড়ে সেটি হচ্ছে মাহমুদুর রহমান ভাইয়ের লেখা পঞ্চকন্যা বইটি।
পঞ্চকন্যা বইটি নিয়ে আলোচোনা অনেকদিন ধরেই। মূলত হুমায়ুন আহমেদের একটি বই রয়েছে যেটির নামও পঞ্চকন্যা। তাই এই বইটি নানাভাবে নানাকারণে কিছুটা বিভ্রান্তি করেছিলো কিন্তু পরবর্তীতে সেটি পরিষ্কার করেন মাহমুদুর ভাই নিজেই।
পঞ্চকন্যা বইটি মহাভারতের উল্লেখযোগ্য পাচটি নারী হিড়িম্বা, সত্যবতী, সুভদ্রা, অম্বা, গান্ধারীকে নিয়ে পাচ ভাগে লেখা একটি বই। আদতে পাচটি গল্পের সাথে কোনো সংযোগ না থাকলেও, মূল সংযোগ রয়েছে মহাভারতের সাথে। মহাভারতের আড়ালে পড়ে থাকা নারীদের নিয়ে লিখেছেন তিনি, তাদের জীবন এবং তাদের প্রেম, স্বপ্ন কিংবা স্বপ্নভঙ্গ নিয়ে। বইটিতে রয়েছে পাচটি আলাদা নারী, এবং পাচ জনের ভিন্ন স্বপ্ন, জীবনযাপন, প্রেম ও স্বপ্নভঙ্গের আখ্যা নিয়ে লিখেছেন পঞ্চকন্যা বইটি।
মাহমুদুর ভাইয়ের বই এখনো তেমন পড়া হয়নি। মোগলনামা বইটি সংগ্রহে নিয়েও পড়া হয়ে উঠে নি। তবে পঞ্চকন্যা পড়ে আমি পুরাণের এমন এক আবহ পেয়েছি যেটা সচরাচর খুব কম লেখকের মাঝে পাওয়া যায়। তিনি লেখনির মাধ্যমে হিন্দু পুরাণকে চমৎকারভাবে তুলে ধরেন, যেটি আরকি আমার পুরো বইটিতে আটকে রাখতে সক্ষম হয়। যদিও বাংলা ভাষায় এমন সব শব্দ আসলেও আছে সেগুলো বইটি না পড়লে জানতাম না। যদিও সেটি বই পড়ার গতিতে কিছুটা বাধা হয়ে আসে, তবে মোটের উপর আবহটাকে আরো বেশি চমৎকার করে তোলে। গল্পের পরিধিগুলো ছোট হওয়ায় অনেকাংশে ডিটেইলিং গুলো খুবই কম হয়েছে, যেগুলোকে বড় পরিধিতে পরিবেশ করতে পারলে বেশ ভালো হত। তবে বলতে হয় যে গল্পের ন্যারেটিভ বা গল্প বলার ধরন বেশ চমৎকার এবং ভিন্নধর্মী। যদি আপনাত পুরাণ কিংবা এ জাতীয় বই নিয়ে আগ্রহ থাকে এবং ছোট পরিসরে পুরাণের নারীদের চিনতে চান, তাহলে এই বইটি এক বসায় পড়ে ফেলতে পারেন।
নিজের কথায় 'কুরুক্ষেত্র' শব্দ ব্যবহার করে নি কিংবা 'কুরুক্ষেত্র' সম্পর্কে শুনে নি এমন মানুষ ভূ-ভারতে বিরল। বড় কোনো ঝামেলার কথা হলেই বলে উঠি 'কুরুক্ষেত্রের ময়দান হয়ে গেছে'/'কুরুক্ষেত্র বেঁধে গেছে'। এই কুরুক্ষেত্র কিন্তু এসেছে হিন্দু পুরান 'মহাভারত' থেকে। মহাভারতকে নিয়ে আছে বিস্তর জল্পনা-কল্পনা, আলাপ-আলোচনা। বই-পুস্তকও নেহাত কম নেই বাংলা সাহিত্যে। সেই দিক বিবেচনায় এই 'পঞ্চকন্যা' বইয়ের কোনো বিশেষত্ব নেই। মহাভারতের পাঁচ স্ত্রী চরিত্র - হিড়িম্বা, সুভদ্রা, গান্ধারী, সত্যবতী, আর অম্বাকে নিয়ে লিখা এই বই। পুরো মহাভারত জুড়ে পঞ্চপাণ্ডব, দুর্যোধন, মামা শকুনি, দ্রোপাদী যেভাবে আলোচনায় স্থান পায়, এই পাঁচ চরিত্র তেমনি ভাবেই আলোচনার বাইরে। মাহমুদূর রহমান এই পাঁচ চরিত্রকে টেনে এনেছেন লিখার জন্য এই বিষয়টা বইটাকে উল্লেখযোগ্য করেছে। 'যা নেই ভারতে, তা নেই ভারতে' এই কথার কারণেই মূলত মহাভারত নিয়ে লিখা সাহিত্যে আমার উৎসাহ বেশি। আর এই কারণেই বইটার প্রতি আমার এক্সপেকটেশন বেশি ছিল। কিন্তু বইটা পড়া শেষ করে মনে হয়েছে, বইটা আসলে যতটা গভীর হওয়া দরকার ছিল ততটা হতে পারেনি। বইয়ের বেশিরভাগই জানা বিষয়। নতুন কোনো দিক বইতে তেমন একটা আলোচনায় আসে নি। অন্তত আমি জানতে পারি নি। তবে এই ব্যাপারটা জেনে অবাক হয়েছি যে, গান্ধারীর 'শতপুত্র' বলতে 'সংখ্যা'-র দিক থেকে শত নয়, বরং 'শক্তি'-র দিক থেকে 'শতপুত্র'কে বুঝানো হয়েছে। যদিও গান্ধারীর ঔরসজাত সন্তানদের ছাড়াও ধৃতরাষ্ট্রের অন্য পুত্রদের মিলিয়ে শতজন কুরুকুমার-ই হয়েছিল। বইয়ের প্রচ্ছদ যথেষ্ট ভালো ছিল। বানানে যদিও কয়েক জায়গায় ভুল চোখে পড়েছে এবং সেটিকে আসলে হাইলাইট করা উচিত না, কারণ এতগুলো পৃষ্ঠার মাঝে কিছু শব্দ চোখ এড়িয়ে যেতেই পারে সম্পাদনার সময়। বাঁধাই থেকে শুরু করে কাগজের মান, ছাপা সব কিছুই ভালো লেগেছে। যদি আলোচনা আরেকটু গভীর হতো, তাহলে বইটাকে অনায়াসে ৪.৫/৫ দেয়া যেত।