পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে পিষ্ট হয়েছে, যা ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠেছিল ব্যক্তিতান্ত্রিক। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দিয়ে ব্যক্তিই হয়ে উঠছিল রাষ্ট্র। ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের লক্ষণগুলো কী? কীভাবে এই ধরনের শাসনের উত্থান ঘটে? রাজনীতি ও সমাজের কোন উপাদানগুলো ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের পথ সুগম করে? বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করে এই সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ। আমিই রাষ্ট্র: বাংলাদেশে ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র গ্রন্থে এই শাসনের প্রকৃতি ও পরিসর বিশ্লেষণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাংলাদেশে এই ধরনের শাসনের উত্থান রোধের জন্য করণীয় কী সে বিষয়েও আলোকপাত করা হয়েছে। এক ঐতিহাসিক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়ানো বাংলাদেশের রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ বুঝতে আগ্রহীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য এই বই।
Ali Riaz (Bengali: আলী রীয়াজ) is a Bangladeshi American political scientist and writer. He is a Distinguished Professor at Illinois State University where he joined in 2002. Most of his work deals with religion and politics, particularly on South Asian politics and political Islam.
অনেক নতুন তথ্য জানতে পারলাম বা ঋদ্ধ হলাম বলতে পারছি না।গত ১৫ বছরে যা ঘটেছে আমরা তার প্রত্যক্ষদর্শী।আলী রিয়াজের বিশেষত্ব হচ্ছে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও শেখ হাসিনার দুঃশাসনের বয়ান উপস্থাপন করা।বোঝা যায়, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো আবার ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের কবলে পড়ছে এবং বাংলাদেশের ঘটনাটি মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়।
(কোন কোন বই থেকে বক্তব্য বা উদ্ধৃতি নেওয়া হয়েছে তা সরাসরি প্রবন্ধের মধ্যে না দিয়ে পৃষ্ঠার নিচে / অধ্যায় শেষে দেওয়া হলে পড়ে স্বস্তি পাওয়া যেতো।)
সম্প্রতি বাংলাদেশ এক ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন আবার কোনো নতুন স্বৈরাচার জেঁকে না বসতে পারে, সে জন্য আমাদের জানা দরকার—স্বৈরাচারের উত্থান কীভাবে ঘটে, কেন ঘটে, একজন স্বৈরাচার কীভাবে ক্ষমতা সংহত করে এবং আমাদের করণীয় কী। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ড. আলী রীয়াজ লিখেছেন "আমিই রাষ্ট্র: বাংলাদেশে ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র"।
ড. আলী রীয়াজকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তিনি ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর এবং সংবিধান-সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—"লুন্ঠিত ভবিষ্যৎ", "নিখোঁজ গণতন্ত্র: কর্তৃত্ববাদের পথরেখা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ", "ভয়ের সংস্কৃতি: বাংলাদেশে রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ ও ব্যক্তিজীবন", "Lived Islam and Islamism in Bangladesh", "The Charade: Bangladesh’s 2024 Election" ইত্যাদি।
বইটির মূল প্রতিপাদ্য:
এই বই আসলে স্বৈরতন্ত্রের এক বিস্তারিত রিভিউ। লেখক বৈশ্বিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে দেখেছেন— - স্বৈরতন্ত্র কী? - এটি কীভাবে জন্ম নেয়? - বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্র কখন ও কীভাবে প্রবেশ করল? - এটি কি একদিনে আসে, নাকি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়? - ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র কি সাধারণ স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে আলাদা? - স্বৈরতন্ত্রের পতন কীভাবে ঘটে? - ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্র যেন আর না আসে, সে জন্য আমাদের করণীয় কী?
লেখক এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তুলনামূলক বিশ্লেষণ, ঐতিহাসিক নজির ও গবেষণা-নির্ভর রেফারেন্সের মাধ্যমে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
একাত্তরের পরবর্তী বাংলাদেশকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের সরকার ব্যবস্থা গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে পেন্ডুলামের মতো দুলছে। কখনো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আবার কখনো কর্তৃত্ববাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। স্বৈরশাসনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব আমাদের সমাজ ও রাজনীতিতে কতটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, লেখক সেটিও ব্যাখ্যা করেছেন।
বইটির বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন:
ড. আলী রীয়াজের লেখার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে—তিনি জটিল রাজনৈতিক বিষয়গুলোও সহজবোধ্যভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। তবে বইটি কেবল রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়, বরং এটিকে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ধরনের সতর্কীকরণও বলা যায়।
বইয়ের শক্তিশালী দিক হলো— ✔ লেখকের যুক্তি গবেষণালব্ধ ও তথ্যনির্ভর। ✔ এটি শুধুমাত্র বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাকে নয়, বরং ইতিহাসের আলোকে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকেও নজর দিয়েছে। ✔ তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র ও অন্যান্য শাসনব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য দেখানো হয়েছে।
তবে কিছু পাঠকের কাছে বইটি তথ্য-নির্ভর হলেও কিছু অংশ অপেক্ষাকৃত একাডেমিক মনে হতে পারে। তবুও এটি এমন এক বই, যা শুধু রাজনীতি সচেতন পাঠকের জন্যই নয়, বরং সাধারণ পাঠকের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার:
আমরা চাই না, বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের কোনো রূপ আবার ফিরে আসুক। সে জন্য আমাদের পেছনে ফিরে তাকানো ছাড়া বিকল্প নেই। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে কীভাবে ভবিষ্যতে গণতন্ত্র রক্ষা করা যায়, সেটিই হচ্ছে এই বইয়ের মূল শিক্ষা।
এই বইটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য যেমন জরুরি, তেমনি পাঠকের জন্যও চিন্তার খোরাক জোগাবে।