ডিয়ার ট্রিনিটি, সেই যে কান্না খাওয়ার অভ্যাস করেছিলাম, সেই অভ্যাস এখনো আছে। এখনও প্রায় সময় কান্না খেয়ে ফেলতে হয়। তবে ভয়ে নয়, এখন আর কান্না কাউকে দেখাতে ভালো লাগে না বলে। এখন কান্না খাওয়া ছোটোবেলার চেয়ে অনেক সহজ। কান্না চোখের ধারে কাছেই আসতে দিই না। বুকের ভেতর থেকে উথলে যখন আসে, কান্নাকে গলায় আটকে রাখি। আমার কান্না গলার ভেতর সমুদ্র হয়ে দুলতে থাকে। যখন জলোচ্ছ্বাসের আবহ তৈরি হয় তখন এক নিশ্বাসে গিলে ফেলি সেই দুলন্ত সমুদ্রটা।
৩.৫/৫ বিচিত্র বা মুক্তগদ্যের বই এটি। প্রতিটা লেখাই হ্রস্ব কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। শৈশব, মায়ের শাড়ি, প্রভাতফেরি,ময়ূর, র্যাব, যমজকলা, মেয়েদের ধুম্রপান, মন্ত্রী মহোদয়ের ওয়াইফ, কমলালেবু, কনডম, মায়াবড়ি,স্নান, প্রথম সিগারেট খাওয়া, টাকা ধার দেওয়া, গোবর কুড়ানো - এমন বিবিধ ও বিচিত্র বিষয়ে স্মৃতিচারণ বা নিজের কোনো অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন লেখক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজের আবেগ বা উপলব্ধি দিয়ে পাঠককে নাড়া দিতে সক্ষম তিনি। ছোটবেলায় "স্টার কেন খাই, পয়লা নম্বর তৃপ্তি পাই" বিজ্ঞাপন দেখে বাবার সিগারেট চুরি করে খাওয়া বা যমজকলা খেয়ে পেটে যমজ বাচ্চা হবে ভেবে লেখকের কান্নার ঘটনা হাসির উদ্রেক করে। আবার মায়ের শাড়ি বা তার বলা কোনো কথা মন বিষণ্ণ করে। শেষ করা যাক বইয়ে বর্ণিত এক ঘটনা দিয়ে-
"১৯৮৭ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত জীবনের বাইশটা বছর একাডেমিক পড়াশোনার পেছনে নাশ করে একদিন আধা-বেকার অবস্থায় ইদের ছুটিতে বাড়ি গিয়ে হাই- ইশকুলের সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার বন্ধু রফিকের সঙ্গে দেখা হল। সে প্রাইমারিতেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল। সে আমাকে রীতিমতো জড়িয়ে ধরল। তার আড়তে নিয়ে বসাল। এবং কথায় কথায় তার জন্যে একটা ম্যানেজার খুঁজতে বলল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'লেখাপড়া কী পাশ লাগবে?' রফিক বলল, 'তুই কী পাশ দিছস?' বললাম, 'এমএ পাশ'। সে খুব উৎফুল্ল হয়ে বলল, 'বন্ধু, এমএ পাশ হলেই হবে। এইখানে তো আর ডক্টর ডিগ্রির দরকার নাই'। খানিকটা বেদনাহত হলেও আমি বেশ মজা পেলাম শুনে। বাড়িতে এসে মাকে বললাম। শুনে তার মুখটা মলিন হয়ে গেল। আমি তার মনটা আরো খারাপ করবার জন্যে বললাম, 'মা, আমি ভাবতেছি রফিকের আড়তের ম্যানেজার হয়ে যাব'। মা কিছু বলল না।"
স্মৃতি শব্দটার পরের শব্দ বোধহয় শৈশব কিংবা ছেলেবেলা, শিশুকাল। আমার এই শব্দগুলোর রং বরাবরই হালকা উজ্জ্বল সবুজ-হলুদ। আমার শৈশব শীতের কুয়াশায় ঘেরা নয়তো তিন চার অক্ষরের মারপিট আর দুপুরে আম্মুকে ফাঁকি দিয়ে আনাসের সাথে দাপিয়ে বেড়ানোতেই ডোবা। আমি স্মৃতিগদ্য, আত্মজীবনী পড়তে বরাবরই মুখিয়ে থাকি। খোঁজ করি সবসময় কোথায় পুরোনো শীতোষ্ণ স্মৃতির সুবাস ছড়াচ্ছে, কোথায় কেউ তার খুব সাদামাটা জীবনের গল্প বলছে কোনো তাড়া ছাড়া, সংকোচ ছাড়া নিজের ভুলের কথা স্বীকার করছে!
“আমি আসলে এমন সবকিছু হতে চাইতাম যা কখনোই হতে পারব না। ফলে হবার চেষ্টাও ছিল না, কেবল স্বপ্ন ছিল। এখনো রাডার ছাড়াই আছি। এখনো নিয়মিত কতোকিছু হতে চাই। যেমন একদিন সন্ধ্যার পর থেকে গভীর হাওয়ার পেটের ভেতর বসে তারের বীণা হতে মন করল। ভাবছি যদি হতে পারতাম সস্তুর, সারেঙ্গি বা ভায়োলিন, তবে এই গভীর হাওয়ার রাতে তুমি কি আমায় বাজাতে না? আমার তারে কি তুলতে না পৃথিবীর গভীরতম বেদনা?”
পড়তে পড়তে নিজেকে ট্রিনিটি ভাবছিলাম। আর মনে হচ্ছিলো একজন নীরব নির্ঝরের সাথে গল্প করছি। মূলত শুনছি। এতো মায়া করে লেখেন!! মাঝে মাঝে তালহারা কথাবার্তা ভালো লাগছিলো না। তবে জীবনের সত্য গল্প কিনা!! মনে হচ্ছিলো একজন ভীষণ একা মানুশের জীবনের উজ্জ্বল কিংবা মানুশময় সময়ের কথা বলে বলে সেই সময়টাকে জীবন্ত করছেন নিজের কাছেও। কখনো বলছেন মায়ের শাড়ির গল্প, কখনো সন্ধ্যার শাদা শাদা রাজহাঁসের গল্প হয়তো কখনো আনমনে ডায়েরির পৃষ্ঠায় চোখ বুলিয়ে সাঁঝের বেলায় বিষন্ন হয়ে পুরোনো গল্পে ডুব দেওয়া কিংবা জ্বরের ঘোরে জ্বরের স্মৃতি আওড়ানো- সবই একটা সময়ের পর রূপকথার মতোন ঠেকে। এসবই নিজের জীবনে ঘটা মাঝে মাঝে ভাবতে অবাক লাগে।
নির্ঝরদার “বনভাঙা গান” প্রথম পড়েছিলাম বোধহয় ২০২১ সালে। সেই তখন থেকে এখন পর্যন্ত উনার লেখা পড়তে গেলেই আমি উনার জীবনের ছাপ পাই। হয়তো এটা আমার নিজেরই তৈরি করা। তবে এই স্মৃতিকথা পড়তে পড়তে আমার নির্ঝরদার বেশ অনেককটা ছোটগল্পের কথা মনে পড়েছে। কিছু বইয়ের গল্প থেকে, কিছু হুটহাট করে এমনিতেই মনে পড়েছে।
নামটা শুনলে যতোটা ক্ল্যাসি মনে হয় ভেতরের কথাগুলো ঠিক ততোটাই সাধারণ একজন সাদামাটা মানুশের। যার কাউকেই মুগ্ধ করার তেমন তাড়না নেই। আমার বরাবরই বইয়ের শেষ কটা পৃষ্ঠা পড়তে মন খারাপ করে। অনেক সময় বইটা শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে, অনেক সময় গল্পের কারণে। এই বইটার শেষ কটা পৃষ্ঠা পড়তে বেশ সময় নিয়েছি আর চাইছিলামও যেন শেষ না হয়।
"আমাদের একটা বিশাল শিমুলতুলার গাছ ছিল। ফুলের সময়ে সেই গাছের মাথা লাল হয়ে থাকত ফুলে ফুলে, হাওয়া এলে মনে হতো যেন লাল ফুলের সমুদ্র ঢেউ ভাঙছে গাছের মাথায়। সেইগাছ থেকে শিমুলফুলের পর তুলা হতো। আর ফেটে বাতাসে উড়ত। কিছু পেকে ঝরে পড়ত মাটিতে, আমরা বাতাস থেকে মেঘের মতো উড়ে বেড়ানো তুলা ধরতাম, আর মাটি থেকে কুড়াতাম। মা সেই তুলা দিয়ে বালিশ বানাত। মা আমার জন্যও দুটো ছোটো ছোটো বালিশ বানিয়েছিল। বাবার পুরানো দুটো প্যান্ট, একটা কালো আর একটা খাকিরং প্যান্ট কেটে থলে বানিয়ে তার মধ্যে শিমুল তুলা ভরে দিয়ে বানানো বালিশ। মায়ের বানানো সেই দুটো বালিশ এখনো আমার কাছে আছে। আমি মাথায় দিয়ে ঘুম যাই। আর মনে হয় শৈশবে মায়ের কোলে মাথা ডুবিয়ে ঘুম যাচ্ছি।"
পৃষ্ঠা - ৫৬
লেখক নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের অনেক পরিচয় আছে। তিনি একাধারে শিল্পী, প্রচ্ছদকার, কবি। ইন্ট্যারেস্টিং শৈশব, কৈশোর ও যৌবনযাত্রার কারণে তাঁর লেখনিতে ধরা পড়ে অনেক কিছুই। মুক্তগদ্য নিয়ে অনেক বছর কাজ করা লেখকের 'ডিয়ার ট্রিনিটি' এক বিচিত্রগদ্যের বই। হয়তো গ্রামে কিংবা শহরে বেড়ে ওঠা যেকোন জেনারেশন ওয়াই সদস্যের জীবনে এরূপ বিচিত্র অভিজ্ঞতা কমবেশি আছে। নির্ঝর নৈঃশব্দ্য চমৎকার গদ্যভাষার অধিকারী হওয়ার ফলে চোখের সামনে যেন ভেসে ওঠে কখনও স্বপ্ন আবার কখনও দুঃস্বপ্নের মতো এসব স্মৃতিকাহিনি। মানুষের প্রায় সব স্মৃতিচারণ তো দিনশেষে কাহিনি-ই। ফিকশনে নির্ঝরের জাদুবাস্তবতার জমিন যেমন তীব্র হাহাকারভরা প্রেমের উপর দাড়িয়ে থাকে, তাঁর নস্টালজিয়ায় ভরা আত্মকথা দাড়িয়ে আছে এক ধরণের নির্লিপ্ততা ও বিষণ্নতার পোক্ত জমিনের উপর। যে গদ্যভাষার ভূমির উপর চোখের জল পড়লে শুকিয়ে যায় না। কোথায় লুকিয়ে থেকে আবার কোত্থেকে যেন ফিরে আসে সেই অশ্রুধারা। ৮০-৯০ দশকের অনেক বিস্মৃত গল্প পরবর্তি প্রজন্মের জন্যে ফিরে ফিরে আসে এ বইয়ে। লেখকের প্রকাশিত ২০+ বইয়ের জার্নি দিয়ে যাওয়ার ভাগ্য যে পাঠকের হয়েছে, কিছু বিষয় তাঁর কাছে একটু পুনরাবৃত্তিমূলক মনে হতে পারে। তবে শুধুমাত্র বুকে ধাক্কা দেয়ার মতো কিংবা মাথা ঠিক কামড়ে ধরা নয় বরং মাথায় স্ট্যাপলার মেরে দেয়ার মতো কথাবার্তা নির্ঝর তো বলেই থাকেন। যে স্ট্যাপল খুলে ফেলার পর চিনচিনে সেই ব্যথা থেকেই যায়।
আমার সমুদ্র
"খুব ছোটো বেলায় মা একবার বলেছিল, 'জানিস তো! মানুষের বুকের ভেতর একটা সমুদ্র থাকে, সেটা গলার কাছে এসে আটকে থাকে। কখনো তার ঢেউ চোখের পেছনে এসে আছড়ে পড়ে। তখন মানুষ কাঁদে। তাই চোখের পানি গড়িয়ে জিভে এসে লাগলে নোনতা লাগে।' মা বলেছিল বলে এই কথা আমি সেইদিন বিশ���বাস করে ফেলেছিলাম। তখনো সমুদ্র দেখিনি। তাই লুকিয়ে লুকিয়ে বড়ো আয়নাটার সামনে বড়ো হাঁ করে সমুদ্র দেখার চেষ্টা করতাম কখনো নিঝুম দুপুরবেলা। কিন্তু কোনো সমুদ্র দেখতে পেতাম না। আমার তখন ধাঁধা লাগত সবকিছু। মা আর পৃথিবীতে থাকে না। এখন আমি বুঝি, প্রিয় ট্রিনিটি, মা কোন সমুদ্রের কথা বলেছিল সেইদিন।"
পৃষ্ঠা-৭৪
বই রিভিউ
নাম : ডিয়ার ট্রিনিটি লেখক : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৫ প্রচ্ছদ : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য প্রকাশক : চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন জনরা : বিচিত্রগদ্য রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ।
প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একটা অনুভূতিপ্রবণ মন থাকে। ।সে ছোট ছোট আনন্দে আপ্লুত হয়। আবার অনেক ছোট ছোট ব্যাপারে বড় আঘাত পায় । অনেক ছোট ছোট তুচ্ছ স্মৃতি সযত্নে সিন্ধুকে তুলে রাখে। ছোট শিশুরা তাদের এই অনুভূতিপ্রবণ মনকে সহজেই প্রকাশ করে। কিন্তু যতই তারা বড় হতে থাকে,ততই এটাকে লুকিয়ে ফেলে। যেন এর কখনও অস্তিত্বই ছিল না।
এ মন কিন্তু সবসময় রয়ে যায় আমাদের ভেতরে, কোন ফাঁক পেলে মানুষকে টেনে নিয়ে যায় তার ছোটবেলায়। অনেক নৃশংস মানুষের মাঝেও আমরা যে কোমলতা বা প্রেমের বহিঃপ্রকাশ দেখি তা ঐ লুকিয়ে থাকা অনুভূতিপ্রবণ বোকা মনটার জন্যই। এই মনের সিন্ধুক যার তার সামনে খোলা যায় না। কেবল কাছের মানুষকেই দেখানো যায় বুকের গভীরে লালিত আপাত মূল্যহীন আবার অমূল্য কিছু স্মৃতি। একটা ছোট বাচ্চা তার খেলনাগুলো গর্ব করে দেখায় তার প্রিয় বন্ধুকে, তেমনি আমরা আমাদের প্রিয় মানুষের কাছে মেলে ধরি আমাদের এই অনুভূতিপ্রবণ মনের সিন্ধুক। এখানে জমা থাকে আমাদের রাগী বাবার গোপনে কান্না, মায়ের প্রিয় শাড়ির গন্ধ, তার কড়া শাসনের আদর, তার ফুলে ভরা বাগানের স্মৃতি, কিংবা প্রথম কৈশোরের ব্যর্থ প্রেমের সুখের মত ব্যাথা বা জীবন যাপনের নানা তিক্ত-মধুর অভিজ্ঞতারা। লেখক ট্রিনিটি বা ত্রয়ী নামের প্রেমিকাকে সম্বোধন করে , আসলে পাঠকদের কাছেই তার মনের সিন্ধুকটা খুলে দিয়েছেন