এই কাহিনির নায়িকা ঊর্মিলা। সেই ‘কাব্যে উপেক্ষিতা’ লক্ষ্মণের স্ত্রী ঊর্মিলা, যাকে অযোধ্যায় ফেলে রেখে রামানুজ লক্ষ্মণ স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিলেন ১৪ বছরের বনবাস। সেই ১৪টি বছর একাকিনী অযোধ্যার বিশাল রাজপ্রাসাদে কিভাবে কেটেছিল লক্ষ্মণজায়ার? মধ্যেকার ফেলে আসা সেই চোদ্দটি বছরে ঊর্মিলার জীবনপথের যাত্রার গল্প বলে এই কল্পনাসৃত কাহিনি। এটি মূলত ঊর্মিলার সাধারণ এক বালিকা থেকে পূর্ণতায় উত্তরণের চিত্র। লক্ষ্মণ যখন বনবাসে গেলেন তখন ঊর্মিলা কিশোরীমাত্র। শূন্যতার হাহাকার তাঁর হৃদয়কে নিঃস্ব করে দিয়েছিল। একাকিত্বকে আলিঙ্গন করে নিয়ে কিভাবে পরিপূর্ণ নারীত্বে বিকশিত হলেন ঊর্মিলা? সেই পরিপূর্ণতায় লক্ষ্মণের স্থান কোথায়? আপন আলোকে জ্যোতির্ময়ী, অযোধ্যাপুরীর গৃহলক্ষ্মী ঊর্মিলা কি অবশেষে পুনরায় গ্রহণ করতে পারবেন চোদ্দ বছর পূর্বে হারিয়ে যাওয়া প্রায় অচেনা জীবনসঙ্গীকে?
"সমগ্র নগরবাসী অশ্রুপাত করতে লাগলো, ধন্য ধন্য করতে লাগলো রামের পিতৃভক্তির, সীতার অনন্ত পতিব্রত্যের। কিন্তু অযোধ্যার অন্তঃপুরের একটি কক্ষে একাকিনী এক ষোড়শীর নীরব ত্যাগের কথা কেউ জানতেও পারলোনা।"
ঊর্মিলা - এক নারী, এক নীরব কান্নার প্রতিধ্বনি। তিনি রাজকন্যা, তিনি রাজবধূ, তিনি এক নিঃসঙ্গ প্রেমিকা। কিন্তু সর্বোপরি তিনি এক ‘উপেক্ষিতা’। আর সেই উপেক্ষিতার অন্তঃপুর থেকে তার স্বরই তুলে এনেছেন লেখিকা দেবস্তুতি গুহ তার এই উপন্যাসে।
পুরাণে লক্ষ্মণ বনবাসে যান রামের সাথে - ভ্রাতৃপ্রেমের এক অনন্য উদাহরণ স্থাপন করতে। কিন্তু এই আদর্শের গৌরবে হারিয়ে যায় এক নারীর ত্যাগ। ঊর্মিলা রয়ে যান প্রাসাদে - চৌদ্দ বছরের এক নির্জন তপস্যায়। কেউ তাঁর কথা জানতে চায় না, কেউ জানতে চায়নি কীভাবে একটি নববিবাহিতা কিশোরী দিন গুনেছে প্রিয় স্বামীর প্রতীক্ষায়, কীভাবে রাজপ্রাসাদের ভিড়ে থেকেও তিনি থেকেছেন নিঃসঙ্গ। কৃচ্ছ্রসাধনের তপস্যা করেও মাণ্ডবী পেয়েছিলেন স্বামী ভরতের সংসর্গে থাকার সুযোগ। কিন্তু গৃহলক্ষ্মীর ন্যায় নীরব কর্তব্যে সংসারকে হৃদয় দিয়ে পূর্ণ করে রাখার তপস্যা পালন করা ঊর্মিলার দাম কেই বা দিয়েছে।
আসলে এই অযোধ্যায় লক্ষ্মণের জন্য আলাদাভাবে কেউ ভাবতে পারেনি। তিনি চিরকাল রামের ছায়ামাত্র ; তাই হয়তো তিনি নিজেও একথা ভাবতে পারেননি যে তার ব্যক্তিগত জীবন শুধু তার একার নয়। জীবনসঙ্গীনীর মর্যাদা রাখতে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে সহধর্মিণীর মতামতটুকু, তার হৃদয়ের কথাটা শোনাও প্রয়োজন। এই কাহিনীতে ঊর্মিলা শুধু কাঁদেন না, তিনি জেগে ওঠেন। তিনি কৈশোর থেকে পূর্ণ নারী হয়ে ওঠেন। তার জীবনে সারথিপুত্র অনন্ত আসে, আসে মালিনী - জীবনের এমন কিছু বাঁক, যা তাকে একমাত্র 'লক্ষ্মণের স্ত্রী' থেকে মুক্ত করে একটি পূর্ণ মানুষ হিসেবে দাঁড় করায়। ঊর্মিলা কি কখনো পেয়েছিলেন তার লক্ষ্মণকে ফিরে? আশ্রয় দিয়েছিলেন এক শ্রান্ত, যুদ্ধ ক্লান্ত পুরুষকে?
লেখিকার কোনো লেখা আমার এই প্রথমবার পড়া হলো। তার সুদৃঢ় অথচ সহজ ভাষা, চরিত্র নির্মাণের পারদর্শিতা এবং পৌরাণিক প্রেক্ষাপটে আধুনিক মনস্তত্ত্বের যে স্পর্শ, তা এই কল্পনাশ্রিত পৌরাণিক উপন্যাসকে বানিয়ে তোলে সুখপাঠ্য। বিশেষ করে ঊর্মিলাকে কেন্দ্র করে সেরম কোনো লেখা এর আগে আমার পড়া না থাকায় সেইদিক থেকেই অভিজ্ঞতা বেশ ভালো। কেতাবির অ্যাপের দৌলতে বাংলা ক্লাসিকসহ অন্যান্য ইবুক পড়া এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে অন্তত আমার পক্ষে। হার্ডকপি পড়ার কোনো তুলনা কোনোদিন হতে পারে না, কিন্তু যাতায়াত পথে ইবুক অনেকটাই সুবিধেজনক। তার জন্য ধন্যবাদ কেতাবিকে।
সর্বোপরি এটুকুই বলার, এই কাহিনী এক সাধারণ নারীর, তার পারিপার্শিকের কিছু সাধারণ মানুষের- যাদের কথা লেখা ছিল না কোনো মহাকাব্যের পাতায়।