প্রমথনাথ বিশীর জন্ম ১১ জুন ১৯০১, বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার জোয়াড়ি গ্রামে।
১৯১০-এ শিক্ষালাভের জন্য শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমে আসেন। ছাত্রজীবন কেটেছে রবীন্দ্রনাথের সস্নেহ সান্নিধ্যে। ১৯২১-এ বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠা। প্রথম দু’জন ছাত্রের একজন প্রমথনাথ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম এ, প্রথম শ্রেণিতে প্রথম (১৯৩২)। রামতনু লাহিড়ী বৃত্তি নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা (১৯৩৩-৩৬)। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র সম্পাদকীয় বিভাগে যোগদান (১ জানুয়ারি ১৯৪৬)। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগদান ১৯৫০-এ। কাব্য, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, প্রবন্ধের স্রষ্টা। বহুবিধ সম্মানে ভূষিত। পেয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরোজিনী বসু স্বর্ণপদক (১৯৫৮), রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৬০), আনন্দবাজার পত্রিকা’র তরফে প্রফুল্লকুমার সরকার স্মৃতি পুরস্কার (১৯৬১), ভারত সরকারের ‘পদ্মশ্রী’ উপাধি (১৯৭১), গান্ধী মেমোরিয়াল কমিটির পুরস্কার (১৯৭৫), শরৎ-সমিতির শরৎ পুরস্কার (১৯৮১), পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত বিদ্যাসাগর স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৩), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী স্বর্ণপদক (১৯৮৩)।
বইটা একটু অগোছালো, অবিন্যস্ত কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি পড়তে। প্রমথনাথ বিশীর রসবোধ অনন্য। সেইসঙ্গে তার মজলিশি গল্প বলার গুণে প্রাণভরে উপভোগ করলাম এই স্মৃতিকথা, এই গুরুদক্ষিণা। শান্তিনিকেতন আর রবীন্দ্রনাথ জীবন্তভাবে হাজির হয়েছেন বিশীর কলমে। কতো হাসি, কতো অম্লমধুর স্মৃতি যে হাজির করেছেন তিনি! মন ভালো হয়ে গেলো পড়ে।
শান্তিনিকেতন নিয়ে স্মৃতিকথা বিভিন্ন জনের লেখায় পড়েছি নানান জায়গায়, তার অনেক কিছুই ভাস্বর গুরুবন্দনায়। তবে গুরুদেব যদি সত্যিই গুরুদক্ষিণা বলে কিছু নিয়ে থাকতেন, তাহলে প্রমথনাথ বিশীর এই বইয়ের চেয়ে ভালো কিছু বোধ হয় চাইতেন না।
শান্তিনিকেতনের সেই সময়টুকুর এমন প্রমথনাথের লেখায় এমনই প্রাণোচ্ছল, রসময় যে মনে হচ্ছিল সন্ধ্যাবেলায় ঘরের দাওয়ায় বসে কেউ বেশ জমিয়ে গল্প শোনাচ্ছেন। এসব রচনায় যা হয়, গুরুর প্রতি অতিভক্তি অনেক সময় লেখককে আচ্ছন্ন করে রচনার রসটুকু নিংড়ে নেয়। তবে বিশী সাহেবের লেখায় ভক্তি আর রস যেন আম আর দুধের মতো, রবীন্দ্রনাথের রসিক দিকটা সেখানে ধরা দেয় নতুন করে। লেখকের দেখার চোখ ছিল, আর ছিল সরস মন। শান্তিনিকেতনের সেই সময়টা পড়তে পড়তে যেন টাইম মেশিনে করে চলে যেতে হয় বোলপুরে। একটা ছোট্ট ঘটনা যেমন বলা যাক। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পাওয়ার পর ছাত্রদের কারও ধারণা ছিল না, নোবেল আসলে কী বস্তু। কেউ বলল, গুরুদেব আসলে নোভেল লেখেন বলে তাঁকে নোবেল দেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সেই নোবেল পাপ্তি শান্তিনিকেতনের অর্থদৈন্য কাটিয়ে দিল অনেকখানি।
এ তো কেবল একটা। নানান মজার সব ঘটনায় এই বইটি আক্ষরিক অর্থেই টইটম্বুর।
প্রমথনাথ বিশীর 'রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন' পড়বার অভিজ্ঞতা চমৎকার। বিশী সাহেবের রসবোধ ধারালো, আগেই জানতাম। স্মৃতি আশ্রয়ী লেখার সাথে নিজস্ব আবেগ আর বিষয়ের যোগফলে এই বইটা ভালোভাবেই সেই বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছে। কৃতী লেখকের হাতে পড়লে নিতান্ত আটপৌরে সহপাঠী আর শিক্ষকেরাও বেঁচে থাকেন বহুদিন, আর এ যে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং !
দুর্দান্ত সরস স্মৃতিচারণ। প্রমথনাথ বিশীর রসবোধের সঙ্গে পরিচিত হয়ে চমৎকৃত হয়েছি। বইটির কিয়দংশ আমার আগ্রহকে ধরে রাখতে পারেনি, বাকিটা এক কথায় দারুণ! হাস্যরসে অনুরঞ্জিত পাতার পর পাতা স্মৃতিচারণের ফাঁকে ফাঁকে সূক্ষ্ম সব পর্যবেক্ষণ বইটিকে আরো স্বাদু করে তুলেছে।