একদা কলকাতা নামের এই শহরে শুভঙ্কর নামে ৪৫ বছর বয়সী এক সদ্যজাত যুবক ভালোবেসে ফেলেছিল নন্দিনী নামের এক বিদ্যুৎ-শিখাকে। গেরিলা-যুদ্ধের মতো তাদের গোপন ভালোবাসাবাসির নিত্যসঙ্গী ছিলাম আমি। আর নিজের খাতায় রোজ টুকে রাখতুম তাদের আবীর-মাখানো কথোপকথনগুলো। সেই শুভঙ্করের বয়স এখন ৫০। সেই নন্দিনী হয়তো এখন বন্দিনী নিদারুণ-সুখের কোনো সোনার পালঙ্কে। ওদের মাঝখানে নদী আর খেয়া দুটোই গেছে হারিয়ে। একবার ভেবেছিলুম ঝড়ের অন্ধকারে উড়িয়ে দেই টুকরো এইসব কাগজ। পরে মনে হলো, যারা ভালোবাসে, ভালোবেসে জ্বলে, জ্বলে পৃথিবীর দিগন্তকে রাঙিয়ে দেয় ভিন্ন এক গোধূলি-আলোয়, তাদের সকলেরই অনেক আপন-কথা, গোপন-কথা রয়ে গেছে এর ভেতরে। এমনকি আমার মৃত্যুর পরেও যাদের রক্তে শুরু হবে তুমুল শ্রাবণের চাষ-বাস, তাদের মুখগুলোও ভেসে উঠলো চোখে। অগত্যা ছিন্ন্-ভিন্ন ওই সব কাগজগুলোকে হেলাফেলায় মরতে দিতে পারলাম না আর।
Purnendu Patri (sometimes Anglicised as Purnendu Pattrea) was an Indian poet, writer, editor, artist, illustrator, and film director. He was best known for his poems and stories, particularly for his poetry collection Kathopokathan in Bengali, and for his experimentation with book cover design. He also was a researcher of the history of Kolkata.
কথোপকথন গুলো পড়তে পড়তে কেউ নিজেকে নন্দিনি, কেউ শুভঙ্কর কিংবা কেউ অমিতাভ কল্পনা করবেই। পড়তে পড়তে কলকাতার রাস্তাঘাট, ভিক্টোরিয়া, গঙ্গার ধার কিংবা কলেজ স্ট্রিট এর কোলাহলে মন হারাবেই। কারো হয়ত হুট করে এভাবেই মনের কথা গুলো বলে উঠতে ইচ্ছে করবে আর কারো হয়ত শুনতে ইচ্ছে করবে। কিন্তু পূর্ণেন্দু পত্রীর এই ভাষা কি আর কোথাও পাবে? মনে তো হয়না।
বইটা এর আগেও বহুবার পড়া। এবার দ্বৈত আবৃত্তির কিছু কবিতা খুঁজতে গিয়ে অনেকদিন পর আবার বইটা হাতে নিলাম। আবৃত্তির কবিতা খুব সহজেই পেয়ে গেলেও আর কোনো ছাড়াছাড়ি নেই। একবসায় পুরো বইটা আবার মন্ত্রমুগ্ধের মত সম্পূর্ণ গিলেছি। তারপর মনে হল আসলে দু চার লাইন লেখা দরকার এটা নিয়ে। কিন্তু ৩ দিন ধরে চেষ্টা করেও ভাষা খুঁজে পাচ্ছিনা কিছু লেখার। অব্যক্তই থাক নাহয়।
পাঠ্যবইয়ের বাইরে কবিতা পড়েছি একেবারেই কম। হাতে গোণা যাবে এমন অবস্থা। অনলাইনে কথোপকথন এর কিছু কিছু লাইন পড়ে বইটির প্রতি আগ্রহ জন্মে। গত বইমেলায় বইটা নিয়েছিলাম। কবি প্রকাশনী ৫ খন্ডকে একত্র করে অখন্ড সংস্করণ প্রকাশ করেছে।
প্রথম খন্ডে শুভঙ্কর-নন্দিনীর প্রেম, দ্বিতীয় খন্ডে শুভঙ্করের বন্ধু অমিতাভের সাথে কথোপকথন, তৃতীয় খন্ডে শুভঙ্কর-নন্দিনীর চিঠিপত্র, তৃতীয় খন্ডে নন্দিনীর ইউরোপ হতে ফেরা এবং শেষ খন্ডে শুভঙ্কর-নন্দিনীর তাদের শেষ জীবনের ঘটনাবলী স্থান পেয়েছে।
কলকাতা শহরের যুবক শুভঙ্কর একবার ভালোবেসেছিল নন্দিনী নামের এক নারীকে। ভালোবাসার উত্থান-পতনের পর নন্দিনীর বিয়ে হয় অন্য পুরুষের সাথে। নন্দিনী স্বামীর সাথে ইউরোপ চলে যায়। তাদের প্রেমে পড়া থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত যে কথোপকথন তাইই যেন কান পেতে শুনেছেন পূর্ণেন্দু পত্রী। অতঃপর পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন দুর্দান্ত রচনাশৈলীর মাধ্যমে। বইটিকে গতানুগতিক কবিতার বই ভেবে পড়লে হতাশ হবেন। এটি মূলত গদ্য কবিতার কথোপকথন।
শুভঙ্কর যে কিনা প্রেমিকার কথা ভেবে দিন পার করে আবার নন্দিনী দেখা করতে আগে আসলেও টিউশনির কারণে শুভঙ্কের দেরি হয়ে যায়। বন্ধু অমিতাভের সাথে সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে যার আড্ডা সেইই কিনা সন্ধ্যার পর আফসোসে ডুবে থাকে।
কথোপকথন ব্যাপারটাই অনেক সুন্দর। দ্বিমুখী আলাপের মাধ্যমে তাদের সম্পর্কের রসায়ন প্রতিফলিত হয়েছে বইটিতে। অনেক কথা বললেও যেন তাদের কথা ফুরোয় না। তখন শুভঙ্কর বলে, 'তোমরা এখনো কেন জেগে আছো এই হিহি শীতে? এত ছায়া নড়ে কেন উঠোনে দেয়ালে চৌকিতে? যতক্ষণ আকাশের নীল ঢেউয়ে নক্ষত্রের ফেনা, আমাদের কথা ফুরোবেনা।'
আসলে কবিতার বই নিয়ে লেখাটা অনেক কঠিন। কাব্যিক ভাষার উপস্থাপন সবাই করতে পারেনা। শুভঙ্কর-নন্দিনীর প্রেমের আখ্যান জানার আগ্রহ থাকলে বইটি পড়তে পারেন। হ্যাপি রিডিং।
কেন যেন বইটা পড়েছি বহুদিন ধরে। গ্যাপ দিয়ে দিয়ে। এই প্রেমময় কবিতা গুলোর মধ্য দিয়ে শুভংকর নন্দীনির জীবনের পথ দিয়ে হেঁটে এলাম যেন। যেন কলকাতা আমারই শহর, যেন প্রেম, কবিতা বুকের ভেতর উথালপাথাল, যেন গঙ্গার ধারে আমিও বসে আছি। কি সুন্দর!!
আমি কিছু বুঝলাম? না শিখলাম কিছু আবার? তবে এটা বলতে পারি, হারাইনি কিছু পাবার।
তাহলে পেয়েছ? নাকি নিয়েছ? দিয়ে দেওনি তো কিছু আবার?
পেয়েছি, নিয়েছিও। তবে দেওয়া হয়নি কিছু এবার।
নন্দিনীর শুভঙ্করকে কেমন লাগল? ভালো, প্রেমিক, অভিমানী ইত্যাদি। না আমার সাথে মিল নেই (হয়ত)। আবার অনেক শুভঙ্করের সাথেই আছে হয়ত। পড়লাম। খুব ভালো লেগেছে জানালাম।
বইটা হয়তো সত্যিই ভালো, তবে আমার জন্য নয়। তাই ২ ☆ যে দিয়েছি সেটা কিন্তু খুবই ব্যাক্তিগত দিক থেকে দেওয়া৷
আমি তো পুরোটা পড়তেই পারলাম না; ইচ্ছে করছিল না আর পড়তে। কিছুকিছু জায়গা নাড়া দিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু বেশিরভাগই মনে হয় যেন কোনো ব্যার্থ প্রেমিক-প্রেমিকার হাহাকার ছাড়া আর কিছুই নয়। নাহ, আর এসব পড়তে ভালো লাগে না! প্রেমের কবিতা পড়ার মত ধৈর্য হয়তো সত্যিই হারিয়ে ফেলেছি। 😶
পূর্ণেন্দু পত্রী আমার টিন-এইজ কালের কবি। মানে তখন কেবল নতুন নতুন ফেইসবুক চালানো শুরু করেছি। এতো বই ছিলোনা তখন; অন্তত কবিতার বই তো নয়-ই। পাওয়াই যেতো না। ফেইসবুকে তখন কিছু ভালো ভালো কবিতার পেইজ ছিলো। সারাদিন কত কবিতার পোস্ট! এখন আর ঐসব পেইজ দেখা যায়না। এখন আমরা ফেইসবুক বলতে যা বুঝি তা হলো, কোনো রাজনৈতিক আলাপ, দুনিয়ার কোনো স্থান দর্শন এর ছবি অথবা 'মিমস' নামক ছোট্ট হিউমর।
যাই হোক! সোশ্যাল মিডিয়া জ্ঞান না দিয়ে আসল কথায় আসি। তো তখন যাদের কবিতার সব থেকে বেশি পোস্ট দেখতাম তারা হলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং পূর্নেন্দু পত্রী। ঐ বয়সে মনের মধ্যে অনেক কিছুই তখন নতুন নতুন হানা দেয়া শুরু করেছে। তখনকার আবেগ কিছুদিন আগেও ক্রিঞ্জ লাগতো। কিন্তু এখন আর লাগে না।
"— যে কোন একটা ফুলের নাম বল — দুঃখ। — যে কোন একটা নদীর নাম বল — বেদনা।........"
"আজকে তোমাকে অনেক নামে ডাকতে ইচ্ছে করছে। ডাকব? আজকে তুমি প্রথম শ্রাবণ, সঙ্গে চাঁপার গন্ধ মাখব?"
কিংবা সেই বিখ্যাত দুই লাইন — "মৃত্যু এসে ফিরে যাবে এত প্রেম দিওনা আমাকে।"
পূর্ণেন্দু পত্রীর এই লাইন গুলো একটা সময় মনে আবেগের সঞ্চার করতো, মাঝখানে করে নাই, এখন আবার করা শুরু করেছে। আর তার জন্য আমি হ্যাপি! মনের বয়স যত "কম" হয় তত ভালো।
কবিতার বইয়ের রিভিউ লিখতে ভয় হয়। পাঠকসত্ত্বার ক্রিটিসিজমকে কেউ লেখকসত্ত্বার দুরাভিসন্ধি মনে না করেন। যদিও কবিরা তুলনামূলক বেশি হিংসুটে হয় তবুও আমি খুব বেশি কবি না এবং পূর্ণেন্দু পত্রীর কিচ্ছু আসে যায় না কী বলি এই ভরসায় বলা যায় বইয়ের মোটামুটি ৩/৪ ভাগ ফেলে দেওয়া যায়। তবে বাকিগুলো দুর্দান্ত।
`যা দাম হয়েছে বই পত্তরের ছুঁলেই হাতে ফোস্কা। অথচ বই আর ভালবাসাবাসি জীবনের লাঞ্চ এ্যন্ড ডিনার বলতে তো এই দুটোই।
বইয়ের তবু একটা সুবিধে কোনও একদিন মিলে যায় সুলভ সংস্করণ। কিন্তু ভালবাসার সবটাই রাজ সংস্করণ। আর দাম দু হাজার বছর আগেও যা এখনও তাই। একটা সোনালি বাঁটের ছুরি আর লাল আপেল।’
বেশ খানিকটা লজ্জা আর অনেকখানি আনন্দ আর গর্ব নিয়ে বলতেছি, এই প্রথম কোনো কবিতার বই সম্পূর্ণটা পড়ে ফেলছি! নন্দিনী আর শুভঙ্করের কথোপকথনে নিজের কত কথা খুঁজে পেলাম!