রজতকান্ত রায়ের গ্রন্থ মূলত এক নৈতিক-দৃষ্টিকোণনির্ভর ব্যাখ্যা, যেখানে পলাশীর ঘটনাকে তিনি দেখিয়েছেন সুপরিকল্পিত এক ষড়যন্ত্র হিসেবে—স্থানীয় অভিজাতদের লোভ, বণিকস্বার্থের অদম্য তৃষ্ণা এবং ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কূটকৌশলের যৌথ ফলাফল।
ভাষা সরল, তাতে আঞ্চলিক টান ও লোককথার স্বাদ রয়েছে। দরবারি জাঁকজমক, দরিদ্র জনজীবন ও শহুরে বণিকশক্তির বিনিময়—সবই যেন জীবন্ত চিত্রে ফুটে ওঠে। গ্রন্থটির প্রধান শক্তি এই নৈতিক দৃঢ়তা: স্থানীয় সহযোগীদের দায়বোধ ও তাতে ভর করে বাইরের শোষণ কীভাবে প্রোথিত হলো, তা তিনি স্পষ্ট ও নির্দ্বিধায় তুলে ধরেন। এর ফলে পাঠক ইতিহাসকে শুধু পড়েন না, বরং ব্যক্তিগত ও নৈতিক স্তরে অনুভবও করেন।
কিন্তু বন্দ্যোপাধ্যায়ের From Plassey to Partition and After–এর বিস্তৃত কাঠামোর সাথে তুলনা করলে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য স্পষ্ট হয়। বন্দ্যোপাধ্যায় Plassey-কে শুধু একটি সামরিক সংঘর্ষ হিসেবে নয়, আধুনিক ভারতের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের সূচনা বিন্দু হিসেবে বিশ্লেষণ করেন।
নীতিগত পরিবর্তন, জমিদারি ও রাজস্বব্যবস্থার পুনর্গঠন, এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর—সবকিছুর ধারাবাহিক বিশ্লেষণ তিনি দেন। রজতকান্ত যেখানে ষড়যন্ত্রের নৈতিক দিক ও স্থানীয় সহযোগীদের দোষপ্রমাণে জোর দেন, বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে কাঠামোগত পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের দিকে মনোনিবেশ করেন। ফলে রজতকান্তের পাঠে তীব্র নৈতিক আবেদন মিললেও, বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠে আসে একটি দীর্ঘকালীন ইতিহাসচিন্তার দৃষ্টি।
সুদীপ চক্রবর্তী ও স্টুয়ার্ট রেইড Plassey-এর সামরিক ও কূটনৈতিক চিত্র অতি সূক্ষ্মভাবে অঙ্কন করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রের বিন্যাস, কৌশল, ঘটনাক্রমের পুনর্গঠন—সবই সেখানে বিস্তারিত। রজতকান্তের বইতেও সামরিক নাটকীয়তা আছে, কিন্তু তা আংশিক; তাঁর প্রধান মনোযোগ স্থানীয় রাজনীতি, দরবারি প্রতিহিংসা, বণিকস্বার্থ ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে।
তাই যারা যুদ্ধকৌশল ও সূত্রভিত্তিক পুনর্নির্মাণ খুঁজছেন, তাদের জন্য চক্রবর্তী ও রেইড বেশি তৃপ্তিদায়ক হবেন; আর যারা সমাজ-সংস্কৃতি ও নৈতিকতার দিকটি জানতে চান, তারা রজতকান্তের কাছে সরাসরি টান পাবেন। তাঁর লোককথা, গান ও দরবারি কথোপকথন ব্যবহারে Plassey যেন যুদ্ধের সীমা পেরিয়ে সমাজের মানসিক পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
ব্যক্তিত্বচিত্রণে রজতকান্ত বিশেষত মির জাফরের দুর্বলতা ও বিশ্বাসঘাতকতাকে তীব্র সমালোচনার ভাষায় ধরেন। অন্য অনেক ঐতিহাসিক জীবনী যদিও ক্লাইভের কৌশল বা মির জাফরের ভূমিকাকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করে, রজতকান্ত প্রায়শই ঘটনাকে সরল ‘ষড়যন্ত্র’ কাঠামোয় বেঁধে রাখেন। এতে ন্যারেটিভ জোরালো হলেও কিছু জটিলতা বাদ পড়ে যায়।
সূত্রব্যবহারে রজতকান্ত লোকজ ও আঞ্চলিক উপাদানকে অগ্রাধিকার দেন—দরবারি বিবরণ, বণিকদের নথি, গান ইত্যাদি। কিন্তু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো গবেষণাধর্মী কাজ রাষ্ট্রীয় নথি, রাজস্বপঞ্জি ও বিদেশি আর্কাইভের উপর দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের বিশ্লেষণও দেয়। ফলে অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কাঠামোর গভীরতর বোঝাপড়ার জন্য বন্দ্যোপাধ্যায় অপরিহার্য।
তবু রজতকান্তের সবচেয়ে বড় অবদান Plassey-কে জনসাধারণের নৈতিক অভিজ্ঞতার ভেতর বসানো—এক হারানো আত্মমর্যাদা, ঐতিহ্যের ক্ষয় ও প্রতারণার যন্ত্রণা।
এতে তিনি দেখান, ইতিহাস কেবল ঘটনাপঞ্জি নয়—এটি মানুষের নৈতিকতা, লোভ ও ক্ষমতার জটিল গল্পও।