শুধু ভারতবর্ষেই নয়, বিশ্ব জুড়েই সমাদৃত এবং অত্যুজ্জল এক সাহিত্যকীর্তি মহাভারত। অগণিত চরিত্র আর ঘটনার আড়ালে ভারতবর্ষের ইতিহাস-ঐতিহ্য, রাজনীতি-সংস্কৃতি, ধর্ম কিংবা অর্থনীতি ও তাঁর স্বাতন্ত্রের অভিজ্ঞানসূত্র গ্রন্থিত রয়েছে এই গ্রন্থে। তবে তা মোটাদাগে সরাসরি নয়, রহস্য আর ইঙ্গিতের বাতাবরণে। এই অনুপম কাব্যের যিনি স্রষ্টা তিনি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস। তাঁর জীবন সম্পর্কে খুব একটা জানা যায়নি। মহামহিম এই মানুষটির জগতবাসও তাই রহস্যে ঘেরা। ব্যাসের ব্যক্তি জীবন নিয়ে উল্লেখ্যযোগ্য সাহিত্যকীর্তির কোনো খোঁজ অনেকেরও মতো আমাদের জানা নেই। কিন্তু এই অজানার মধ্যেই শাহযাদ ফিরদাউস সেই অতুর কবিকে নিয়ে সৃষ্টি করেন তাঁর উপন্যাস “ব্যাস”। নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যে এটি লেখকের এক অতুলনীয় সৃজন। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস সম্পর্কে কতিপয় সত্য জ্ঞানের সাথে কবিতুল্য কল্পনার ঘেরাটোপে নির্মিত হয়েছে এই কাহিনী পুরাণ। অথচ ঘটনার পরম্পরা, ভাষা আর বাক্য গাঁথুনির শৈল্পিকচলনে কখনো একে রুপকথাজাত কথকতার সমাহার বলে মনে হয় না।
জন্ম ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৫০। প্রথম জীবনে কবিতা লিখতেন। উভয় বাংলার শ্রেষ্ঠ পত্রপত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। তারপর সিনেমার বিষয়ে উৎসাহী হয়ে উঠলেন এবং এপর্যন্ত বেশ কিছু তথ্যচিত্রসহ ‘তথাগত’ নামে গৌতম বুদ্ধের জীবনের উপর ভিত্তি করে একটি হিন্দি কাহিনিচিত্র তৈরি করেছেন। তাঁর রচনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষকরা তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং করছেন। ‘ব্যাস’ উপন্যাসের মাধ্যমে নতুন করে সাহিত্যযাত্রা শুরু হয়। তাঁর উপন্যাস নিয়ে প্রখ্যাত সমালোচক পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় ‘শাহ্যাদ ফিরদাউসঃ উপন্যাসের সন্দর্ভ’ নামে একটি গ্রন্থ লিখেছেন। স্বপ্না পালিত ও স্বপন ভট্টাচার্য ‘মুখোমুখি শাহ্যাদ ফিরদাউস’ নামে একটি সাক্ষাৎকার ভিত্তিক গ্রন্থ তৈরি করেছেন। ‘অ-য়ে অজগর’ পত্রিকা তাঁর প্রথম নয়টি উপন্যাস নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। সাহিত্য এবং চলচ্চিত্র ছাড়াও তিনি সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। কলকাতার রুশ দূতাবাসের সংস্কৃতি দপ্তরের সহযোগিতায় পরিচালিত সাহিত্য সংস্থা ‘প্রগতি সাহিত্য সংবাস’-এর সম্পাদক। শান্তি সংগঠন ‘কলকাতা পিস মুভমেন্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক এবং শান্তিপূর্ণ জীবনের শিক্ষা দেওয়া ও নেওয়ার প্রতিষ্ঠান ‘পিস স্কুল’-এর প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক।
"In the middle of the journey of our life, I came to myself within a dark wood, Where the straight way was lost." _Dante, Divine Comedy
"ব্যাস" উপন্যাসটি দুই পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে আছে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের জন্ম ও জীবনবৃত্তান্ত। দ্বিতীয় পর্ব শুরু করে বুঝলাম, আগের প্রায় পুরো পর্বই ছিলো গৌরচন্দ্রিকা। শিষ্যসমেত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করতে গিয়েছিলেন ব্যাস। যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে ক্লান্ত,শ্রান্ত ব্যাস ও তার শিষ্যরা আশ্রম অভিমুখে যাত্রা করেন। সেই যাত্রায় অগস্ত্যযাত্রার মতো একে একে পতন হয় মুনিদের।বিচিত্র শ্রেণি ও পেশার মানুষের সাথে দেখা হয় তাদের। সারাজীবন যা করে এসেছেন তা নিয়ে গভীর সন্দেহ ও দ্বিধা দেখা দেয় ব্যাসের মধ্যে।মহাজ্ঞানী ও মহাগুরু ব্যাস জীবনের শেষপ্রান্তে এসে উপনীত হন শিষ্যের ভূমিকায়। কী রয়ে গেছে ভুল?মানুষ কেন এতো ধ্বংসপ্রবণ? মুনি ঋষিরা যে ভাষায় কথা বলছেন তা কি সাধারণের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না? অন্যায়ের প্রতিকার হচ্ছে না বলে কি প্রতিবাদ থেমে যাবে? এমন সব গূঢ় দার্শনিক প্রশ্ন আর তার সম্ভাব্য উত্তর নিয়ে গড়ে উঠেছে "ব্যাস" এর কাহিনি।মুগ্ধ হয়ে পড়েছি। মনে রাখার মতো অজস্র পঙক্তি রয়েছে বইতে। যেমন,"ভুল ভ্রান্তি কিংবা মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই জ্ঞানচর্চার একমাত্র বিষয়। আরও পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করব-একমাত্র প্রতিবাদের লক্ষণ দেখেই জ্ঞানী বা মূর্খের পার্থক্য চিহ্নিত করা হবে।"সবার জন্য "ব্যাস" অবশ্যপাঠ্য। গল্পের শেষে ব্যাস ও বৈশম্পায়ন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে যা ঘোষণা করেছেন তা সত্য হোক- "-আমাদের কাহিনি মানুষের অন্তহীন সম্ভাবনার কাহিনি। -মানুষের অন্তহীন সম্ভাবনার কাহিনি। -আমাদের কাহিনি মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের প্রতিবাদ। -মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের প্রতিবাদ।"
মহাভারতের রচয়িতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের জীবনী হচ্ছে ব্যাস। ছোট পরিসরে ব্যাসকে দারুণভাবে মলাটবন্দি করেছেন লেখক শাহযাদ ফিরদাউস। ব্যাসের জন্মলগ্নের আগের ঘটনা, শৈশবকাল, সন্নাসজীবন, রাজপরিবারের বংশবৃদ্ধির দায়িত্বপ্রাপ্তি, শিক্ষা, দর্শন, যুদ্ধ মহাভারত লেখা ও এর চরিত্র সৃষ্টির অনুপ্রেরণার উৎস খুব সুন্দরভাবে সংক্ষেপে দেখানো হয়েছে কাহিনীটাতে। রয়েছে জীবন সমন্ধে দারুণ কিছু উক্তি। রয়ে সহে পড়লে বেশ ভালোভাবে অনুধাবন করার অনেক জায়গা আছে বইটিতে।
ঠিক কতদিন পর একটা বই পড়লাম বলতে পারছিনা। বইটা মাত্রই শেষ করা। কি চমৎকার একটা বই। এই বছর পড়া সেরা বইগুলোর একটি হয়ে থাকবে অবশ্যই। মহাভারতের স্রষ্টা মহাকবি কৃষ্ণদৈপায়ন বেদব্যাস এর জীবন ও জীবনপূর্ব সময়কাল নিয়ে লেখা এই বইটি এত ব্রিলিয়ান্ট, না পড়লে বোঝাতে পারছিনা। শাহযাদ ফিরদাউস এর সাথেও প্রথম পরিচয় আমার এই বইটির মাধ্যমে। এত অসাধারণভাবে লিখতে পারেন লেখক, অভূতপূর্ব! বইটা শুরু করবার সময় আমি কঠিনতর শব্দভান্ডারের প্রয়োগ দেখে ভাবছিলাম এতদিন না পড়া আমি কি এটা শেষ করতে পারবো? নাকি মাঝপথেই রেখে যাবো? অবাক করা ব্যাপার এটা শেষ করতে আমার আসলেই খুব একটা সময় লাগেনি। শক্তিশালী শব্দভান্ডারের কি সহজ স্বাভাবিক প্রয়োগ। খুব আগ্রহ নিয়ে শেষ করলাম। আর বইটার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিলো সংলাপ আর প্রশ্নোত্তর গুলো। এত গভীর আলাপ জীবন নিয়ে প্রতিটা প্রশ্নে উঠে এসেছে যে, প্রতিটা সংলাপ একেকটা উক্তি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। বইটা এমন একটা সময়ে আমার হাতে আসলো, জীবন নিজ হাতে যেনো তুলে দিলো বইটাকে। নাহলে এখন আমার মানসিক অবস্থা অনুযায়ি এরকম একটা বই আমি তুলে নিতাম না।
"...এবার বলো বৈশম্পায়ন, জীবনের কাছে আমরা কী আশা করেছিলাম এবং জীবন আমাদের কাছে কী আশা করেছিল? -- গুরুদেব খুব স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়, জীবনের কাছে আমরা কী আশা করেছিলাম তা কখনো স্পষ্ট হয়নি। একইভাবে জীবন আমাদের কাছে কী আশা করেছিল তা স্পষ্ট নয়।"
পরম বেদনাবোধ করেও বেদনাকে অতিক্রম করে যাওয়া, জীবনের নিরিখে বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ চিন্তা, জ্ঞানার্জন, মানুষের মনের ভাব প্রকাশের জন্য সৃষ্টি যে ভাষা তার সীমাওবদ্ধতা, যুদ্ধ, মানুষে মানুষে রেষারেষি ইত্যাদি এই সকল হাজারো গভীর কিন্তু চিন্তার খোরাক বিষয়আশয় নিয়ে তিনি ব্যাসদেব আর তার শিষ্যদের মাধ্যকার আলাপচারিতার মাধমে যেভাবে তুলে ধরেছেন, অসাধারণ! বইটা মূল চেতনা গুলো আমার মতে এই যুগের প্রায় সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়া উচিত। এভাবে সন্ন্যাস জীবন যাপন করে হয়তো জীবনবোধ অর্জনের জন্য সব বিসর্জন দেয়া সম্ভব নয়, তবে জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এসে সমগ্র জীবনটা নিয়ে একবার ভাবা উচিত, একবার নিজের সমস্ত বিবেক কে উলটে পালটে দেখা উচিত সকলের। আমরা কি ভুল করলাম? আমরা কি আসলে জীবনের মানে খুঁজে পেলাম? সুন্দর একটা জীবন কী কাটাতে পারলাম আমরা? বিষয় অনুযায়ি কিছুটা ভারী বই, তবে পড়ে দেখবেন। আশা করি ভালো লাগবে আপনাদেরও।
যাহোক, শেষ আরেকটি উক্তি দিয়ে শেষ করছি, "মানুষ যতদিন মানুষকে শ্রদ্ধা করবে, স্নেহ করবে এবং ভালোবাসবে ততদিন মানুষের সর্বনাশের সম্ভাবনা নেই, ততদিন মানুষের সভ্যতার বিনাশ ঘটবেনা।"
মহাকাব্যের রচয়িতা ব্যাসের জীবনকাহিনী না বলে এটি তার ভ্রমণকাহিনী বলাই যুক্তিসঙ্গত। মাতৃ আজ্ঞা পালন করা অত্যন্ত বিড়ম্বনার কাজ এ কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি কিন্তু ব্যাসের মতো এমন প্রত্যক্ষ জলজ্যান্ত উদাহরণ খুব কম ই দেখতে পাওয়া যায়।এই ভদ্রলোক কেই মহাভারতের যাবতীয় অনিষ্টের পরোক্ষ কারণ বলা যেতে পারে। প্রচন্ড ফিলোসফিক্যাল ব্যক্তিত্বের কারণে শিষ্য সমাজে যেমন খুব খ্যাতি অর্জন করেছেন তেমন সমান তালে অশিক্ষিত সিভিলিয়ানদের কাছে তিরস্কৃতও হয়েছেন। বৃদ্ধ বয়সে নিজের শিষ্যদের সাথে খুব কাছ থেকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ করে যারপরনাই প্রবল হতাশ ও বিরক্ত হন। সেই যুদ্ধ থেকে নিজের আশ্রমে ফিরতে ফিরতে একে একে প্রায় সকল শিষ্যরা তাকে ত্যাগ করলে তিনি আরো বিপর্যস্ত ও বয়স্ক হয়ে পড়েন। এভাবেই পথ চলতে চলতে একদিন সিদ্ধান্ত নেন তার এই বিরক্তি আর হতাশা তিনি গোটা বিশ্বে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিবেন। সাথে একজন মাত্র শিষ্য অবশিষ্ট ছিলেন। মানব সম্প্রদায়ের উপর প্রতিশোধ নেয়ার এমন লোভনীয় প্রস্তাব সে কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইলেন না; তাই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পূর্ণ সম্মতি প্রকাশ করলেন। অতঃপর যাহা সত্যি তাহাই ঘটিল। লেখক অল্প কথায় বয়স্ক জ্ঞানী মানুষদের মনোজগৎ নিয়ে মোটামুটি চমৎকার একটা সৃজনশীল আবহাওয়া তৈরি করেছেন যা একই সাথে ইরিটেটিং এবং উপভোগ্য ।
ব্যাসদেব যিনি মহাভারতের উপাখ্যান আমাদের শুনিয়েছেন, এই উপন্যাসে শাহযাদ ফ���রদৌস উনার গল্পটা আমাদের শুনালেন। তা ও কি চমৎকারভাবে! শাহযাদ ফেরদৌসের গদ্যভাষা অপূর্ব।বিশেষ করে গল্পের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ভাষায় যে নিঃস্পৃহতা আর সংযমতা এনেছেন কিন্তু তা করতে গিয়ে ভাষাকে জটিল না করে যেরকম অপরূপ মাধুর্যময় করে তুলেছেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার। ব্যাস' উপন্যাসটি শুধু সেই মহান ঋষির সরলরৈখিক উপাখ্যান নয় একই সাথে সেই ঋষির জীবনকে উপলব্ধি করার গভীর যে দর্শন তা ও চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। দীর্ঘ জীবনের পরিক্রমায় ব্যাসদেবের জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার অভিজ্ঞান আমরা ও কিছুটা পাই।
“ধন্যবাদ, প্রিয়তম শিষ্য, প্রিয় বন্ধু, প্রিয় পুত্র! জীবনকে স্বাগত জানাও, জীবনের প্রতিটি পর্বকে আলিঙ্গন করো। সুখ-দুঃখ নির্বিশেষে জীবনের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি মোড়, প্রতিটি চড়াই-উতরাই এবং পতন উত্থানকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে গ্রহণ করো। জীবন মানে বর্জন নয় গ্রহণ; বিয়োগ নয়, সংযোগ; যা কিছু অবশ্যম্ভাবী তাকে শান্ত চিত্তে আলিঙ্গন করো। মনে রেখো, অতিক্রম আর বর্জন এক কথা নয়। অতিক্রম করতে হলেও গ্রহণ করতে হয়”। জীবনের শেষ পর্যায়ে প্রায় ৯০ বছর বয়সে এসে কোমর বাঁকা হয়ে যাওয়া উপলক্ষে এক বৃদ্ধ তার সহকারীকে আদেশ করছে তাকে অভিনন্দিত করার জন্য; আর তার মতোই এভাবে জীবনের প্রতিটি পর্বকে আলিঙ্গন করার জন্য। জীবনের দীর্ঘ সময়ে কেটেছে তার ধ্যান, তপস্যা আর জ্ঞান চর্চায়; প্রীতি, কলহ, যুদ্ধ, বিগ্রহ সব কিছু সে অবলোকন করেছে বাহ্যিক এবং অন্তর চক্ষু দিয়ে। জীবন সায়াহ্নে লব্ধ অভিজ্ঞতার ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য লিপিবদ্ধ করে রাখার উদ্দেশ্যে সহযাত্রীকে নিয়ে এই বৃদ্ধ চলেছে তার আশ্রমের দিকে। এই বৃদ্ধ কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন, এই বৃদ্ধ বেসব্যাদ, এই বৃদ্ধকে জীবন্ত করে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন শাহযাদ ফিরদাউস।
শাহযাদ ফিরদাউস লিখেছেন অনেক, আর একেকটা লেখার পিছনে কতটা শ্রম দিয়েছেন সেটা তার উপন্যাসের পাতায় পাতায় দৃশ্যমান। উপন্যাসের পাতায় পাতায় বললাম কেননা তিনি শুধু উপন্যাস-ই লিখেন, গল্প কবিতা বা প্রবন্ধ নয়। দীর্ঘ পরিশ্রমের পথ পাড়ি দিয়ে কথা আর শব্দের বুননে পৌরনিক চরিত্র ব্যাসকে জীবন্ত করতে গিয়ে ফিরদাউস রচনা করেছেন অনন্য এক সাহিত্য। অথচ এই অসাধারণ সৃষ্টিটাই কিনা বই লেখার উদ্দেশ্য নিয়ে লিখতে শুরু করেননি, শুরু করেছিলেন সিনেমার স্ক্রিপ্ট হিসেবে। মধ্য আশিতে বলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা দিলীপ কুমারকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে কল্পনা করে সিনেমার একটা স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ তার হাতে আসে। এ ধরনের কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও চ্যালেঞ্জ হিসেবেই তিনি কাজটি হাতে নেন, আর প্লট হিসেবে চিন্তা করেন কৃষ্ণ দ্বৈপায়নের জীবন কাহিনী। দ্বৈপায়নকে বেছে নেবার কারণ ছিল পিছনের ২৫ বছর। দীর্ঘ এই সময় ফিরদাউস বুঁদ হয়ে ছিলেন মহাভারতের সাহিত্যরসে, মনে প্রাণে তীব্র ইচ্ছা ছিল এই মিথোলজিক্যাল মহাকাব্য নিয়ে কিছু একটা সৃষ্টি করার। দুঃখজনক ভাবে তার সৃষ্টি চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি; কিন্তু সেই স্ক্রিপ্টের রূপান্তর বই হিসেবে পাঠক মহলে গৃহীত হয়েছে সাদরে।
শুধুমাত্র ভারতবর্ষেই নয় সারা বিশ্বজুড়েই বহুল পঠিত এবং সমাদৃত অত্যুজ্জ্বল এক সাহিত্য কীর্তি মহাভারত। অগণিত চরিত্র আর ঘটনার ঘনঘটার আড়ালে লুক্কায়িত রয়েছে ভারতবর্ষের ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি বা ধর্মের আভিজ্ঞানসূত্র। মহাভারত পাঠের জন্য প্রয়োজন মানসিক প্রস্তুতি এবং সুদীর্ঘ সময়, উপলব্ধির জন্য প্রয়োজন মানসিক বিস্তৃতি এবং আরও দীর্ঘ সময়। কিন্তু মহাভারতের জীবন সম্পর্কে ধারণা পেতে দরকার জীবনের মহত্ত্বে বিশ্বাসী সংবেদনশীল এবং জ্ঞানপিপাসু একটি হৃদয়। তেমনি একটি সংবেদনশীল এবং জ্ঞানপিপাসু হৃদয় নিয়ে শাহযাদ ফিরদাউস সত্য জ্ঞানের সাথে কবি তুল্য কল্পনার ঘেরাটোপে পাঠকের সামনে জীবন্ত করে তুলেছেন এই অনুপম মহাকাব্যের স্রষ্ঠা কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসকে।
মহাভারতে এবং বিভিন্ন পুরাণে প্রাপ্ত বেস ব্যাধের জীবনের আবছা রূপরেখাকে ফিরদাউস তুলে ধরেছেন ধারাবাহিকভাবে, যার শুরু হয়েছে পরাশর মুনির কালির রতি প্রার্থনার মধ্য দিয়ে। নৌকার মাঝি সত্যবতীর রূপে বিমুগ্ধ হয়ে ভুবন বিখ্যাত মুনি পরাশর তার কাছে রতি প্রার্থনা করেন। কামান্ধ পরাশর ছলে বলে কৌশলে কুমারী সত্যবতীকে বাধ্য করেন দেহদান করতে। কুমারীর গর্ভের পুত্রসন্তানকে লোকনিন্দার ভয়ে সত্যবতী জন্ম দেন এক জন মানবহীন দ্বীপে, সেখানেই ছেলে বড় হতে থাকে পরাশরের আশ্রমে। দেখতে কালো বলে ছেলের নাম রাখা হয় “কৃষ্ণ”, দ্বীপে জন্ম বলে নাম হয় “দ্বৈপায়ন” আর বৈদিক যুগে বেদ গবেষণা করতেন বলে উপাধি “বেদব্যাস”।
সত্যবতীতে কে ত্যাগ করে পরাশর একসময় কৃষ্ণকে নিয়ে দূরবর্তী আশ্রমে গমন করেন তাকে যথাযথ শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে। মাতৃস্নেহ থেকে নির্বাসিত দ্বৈপায়ন পিতার আশ্রমে শুরু করে তপস্যা, ধ্যান, যজ্ঞ, প্রার্থনা। মহাভারতের পরিচিত কাহিনী ধরে এরপর উপস্থিত হতে থাকেন ভরত বংশের বিভিন্ন প্রয়োজনে, উপস্থিত হন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে, যুদ্ধ শেষে শত পুত্রের জননী গান্ধারীকে সান্ত্বনা দিতে। উপন্যাসে উঠে এসেছে ব্যাসের জীবনাচার, জীবনানুভূতি, কিন্তু জীবন বিস্তৃতির ঘটনার পরম্পরা নয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছ থেকে জ্ঞান আহরণের ধারায় পিতা পরাশরকে ত্যাগ করার সময় পিতার দর্শনের এবং জীবনানুভূতির প্রতি অবজ্ঞায় যেমন গভীর মনুষ্যত্ব বোধ ফুটে ওঠেছে, তেমনি অম্বিকা এবং অম্বালিকার গর্ভে সন্তান দানের রতিক্রিয়ার পর মা সত্যবতীর সাথে আলাপনে উঠে এসেছে জীবনের প্রতি নিরপেক্ষ দর্শন। ঋষি চার্বাক, পুত্র শুকদেব, বৃদ্ধ কৃষক, ভীষ্মের সাথে আলাপনের মধ্য দিয়ে শাহযাদ ফিরদাউস ধীরে ধীরে ব্যাসের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং জীবন দর্শন উন্মোচন করতে গিয়ে রচনা করে ফেলেছেন গভীরতম এক জীবন কাব্য।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ পর্যন্ত পরিচিত কাহিনীর অপরিচিত উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে ব্যাসকে দেখার প্রচেষ্টাকে যদি ধরা হয় উপন্যাসের প্রথমাংশ তাহলে উপন্যাসের দ্বিতীয়াংশ হল ব্যাসের মধ্য দিয়ে জীবনকে বোঝার প্রয়াস। যুদ্ধের শেষে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, ভারাক্রান্ত ব্যাস তার শিষ্যদের নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন তার আশ্রমে, পথে একে একে বিদায় নিচ্ছে তার শিষ্য পৈল, জৈমিনি। দীর্ঘ জীবন সাধনা আর উপাসনা করে মানব মুক্তির পথ খুঁজে বেড়ানো অতি বৃদ্ধ ব্যাস নিজের চোখের সামনেই দেখেছেন কুরুক্ষেত্রে প্রিয়জনদের অন্তিমতার পথে যাত্রা করতে। এ যাত্রা বৃদ্ধকে করেছে ভঙ্গুর, নিজের জীবন দর্শন আর জীবনাচারের সামনে নিজেকেই দণ্ডায়মান করে দিয়েছে প্রতিপক্ষ হিসেবে। প্রতিপক্ষ হিসেবে শুধু নিজেকেই নয়, ত্যাগ করতে যাওয়া শিষ্যদের কাছেও ব্যাস জানতে চেষ্টা করেন জীবন সম্পর্কে, মৃত্যু সম্পর্কে তাদের ভাবনা; মানুষের ভবিষ্যতের সাথে জীবনচর্চা, জ্ঞানান্বেষণ, সত্যের অনুসন্ধান, দৃষ্টিভঙ্গির সম্পর্ক; প্রকৃতির সাথে, সময়ের সাথে জীবনের নির্ভরতার স্বরূপ। শিষ্যদের সাথে ব্যাসের এই কথোপকথন, পথে আশ্রয় দানকারী গৃহী সন্ন্যাসী মেঘরাজের সাথে আলাপন, বৈশম্পায়নের সাথে আলোচনা করা জীবন দর্শন এই উপন্যাসকে ভিন্ন মাত্রায় তুলে নিয়েছে।
উপন্যাস শেষ হয়েছে বৈশম্পায়নকে সাথে নিয়ে লাঠিতে ভর করে ব্যাসের আশ্রমের দিকে ফিরে চলার মধ্য দিয়ে যেখানে তার দীর্ঘ জীবন��র অর্জনকে ইতিহাসের দর্পণে ফেলে একটি মহা-গ্রন্থ রচনার কাজ শুরু করবেন। সেই মহাগ্রন্থের নাম দেবেন "মহাভারত"।
মহাভারত-এর রচয়িতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস---তাকে নিয়েই এই বই। 'মহাভারত' বিপুল পঠিত এবং চর্চিত গ্রন্থ হলেও এই অসাধারণ মহাকাব্যের যিনি স্রষ্টা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায়নি। তার সম্পর্কে জানার উৎস-ও নিতান্তই অপ্রতুল। সেই অপ্রতুল তথ্য-উৎসের সীমাবদ্ধতা নিয়েই শাহ্যাদ ফিরদাউস তৈরি করেছেন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের জীবনী। ব্যাসের জীবনীর সাথে নিজের কল্পনা মিশিয়ে গেঁথেছেন লেখক এই বইয়ের কাহিনি। ব্যাসদেবের জীবন সমগ্র মহাভারতে টুকরো টুকরোভাবে ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে---সেই টুকরো টুকরো আভাস-ইঙ্গিত এক সুতোয় জোড়া দিয়ে, তার সাথে নিজের কল্পনার মাধুরী মিশিয়ে ব্যাসকে সৃষ্টি করেছেন লেখক। ব্যাস যেহেতু মহাভারতে মাঝে মাঝেই সংকট মুহূর্তে আবির্ভূত হয়ে জ্ঞান দান করেন, সেহেতু খুব স্বাভাবিকভাবেই মহাভারতের ঘটনাপঞ্জি খুব সংক্ষেপে এসেছে বইয়ে। বর্ণিত হয়েছে ব্যাস এবং তার পুত্র শুক-এর জন্মবৃত্তান্ত। বর্ণিত হয়েছে হস্তিনাপুরের রাজপরিবার অপুত্রক ভরতবংশের জন্য মা কালী ওরফে সত্যবতীর আদেশে তার সন্তান উৎপাদন, এবং সেই পরিবারে জন্ম নেয়া পুত্রদের পুত্রদের হাত ধরে জন্ম নেয়া কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সারাৎসার।
ব্যক্তিজীবনে ব্যাস ছিলেন জ্ঞানানুসন্ধানী সন্ন্যাসী। বিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে বহু মানুষের পরিশ্রম এবং বহু মানুষের জীবন একাই অতিবাহিত করেছেন তিনি। তাই দীর্ঘ জীবনকালে মহাভারতের মতো মহাকাব্য সৃজনের জন্য যে সুদীর্ঘ প্রস্তুতি, অভিজ্ঞতা, এবং প্রজ্ঞার প্রয়োজন, তা নিতে পেরেছেন তিনি। দীর্ঘ জীবনের ভূয়োদর্শনই তাকে সাহায্য করেছে এরকম মহৎ এক কাব্য সৃজনে।
আপাতদৃষ্টিতে ব্যাস মহাভারত-স্রষ্টার জীবনকাহিনি। কিন্তু সেই জীবনকাহিনিকে প্রায় সময়ই ছাপিয়ে উঠেছে জীবনের অর্থ কী, সেই প্রশ্ন। কী উদ্দেশ্যেই বা এই মানব জনম, সে প্রশ্নও ব্যাসের সাথে সাথে জর্জরিত করেছে পাঠককে। তাই, শেষ অবধি শাহ্যাদ ফিরদাউস-এর সুনিপুণ লেখনীর ছোঁয়ায় ব্যাস হয়ে উঠেছে গভীর এক জীবনদর্শন, জীবনকাব্য। সুখের বিষয় হলো, শাহ্যাদ ফিরদাউস জটিল বিষয় নিয়ে জটিল কথা বললেও, লিখেন সহজ ভাষায়---তাই আমার মতো সাধারণ পাঠকের কোন সমস্যা হয় না কথাগুলো কিছুটা হলেও বুঝতে। প্রিয় লেখকদের তালিকায় উঠে এলেন শাহ্যাদ ফিরদাউস।
পৃথিবী শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যগুলোর তালিকা করলে 'মহাভারত' সেখানে অনায়াসে জায়গা পাবে। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস রচিত মহাভারত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মগ্রন্থের বাইরেও সাহিত্যের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। শাহযাদ ফিরদাউস এই মহাকাব্যের রচয়িতা ব্যাসদেবের জীবন ও তার দর্শনকে উপজীব্য করে উপন্যাসটি রচনা করেছেন।
পরাশর মুনি সফরকালে একদিন নদী পার হওয়ার সময় নৌকার মাঝি কালীর প্রতি আকৃষ্ট হন। কালীর নিকট তার সতীত্ব প্রার্থনা করেন। কিন্তু কালী রাজি না হওয়ায় তাকে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার হিসেবে একজন বিদ্বান সন্তানের প্রতিশ্রুতি দেন। কালী রাজি হয় পরাশর মুনির ঔরসে সন্তান জন্ম দিতে। নির্দিষ্ট সময় পর কালীর একটি পুত্র সন্তান হয়। কিন্তু বিবাহ বহির্ভূত সন্তান জন্ম দেওয়ায় ছেলেকে লোকচক্ষুর আড়ালে পরাশর মুনির নিকটেই পালন করতে দেন। দ্বীপে জন্ম নেওয়ায় তার নাম রাখা হয় দ্বৈপায়ন এবং গায়ের রং কালো হওয়ায় কৃষ্ণ। ব্যাসদেবের বয়স কিছু বেশি হলে মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে বাবার সাথে জ্ঞান অন্বেষণে বেরিয়ে পড়েন।
হস্তিনাপুরের রাজা মহারাজ শান্তনু একদিন নদীর পাড়ে কালীকে দেখে তার পাণি প্রার্থনা করেন। কিন্তু শান্তনুর পুত্র দেবব্রত ভবিষ্যতে সাম্রাজ্য পাবে এই আশঙ্কায় কালী রাজি হতে চায়নি। তখন দেবব্রত পিতার আকাঙ্খা পূরণে সাম্রাজ্যের প্রতি নিজের দাবি প্রত্যাহার করে কালীকে নিজের সৎ মা হিসেবে নিয়ে আসেন। শান্তনু ও কালী তথা সত্যবতীর চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য নামে দুই সন্তানের জন্ম হয়। তারা নিজেদের বংশ রক্ষার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেন। তখন দেবব্রত তথা ভীষ্ম এবং সত্যবতী চিন্তিত হয়ে পড়েন। কারণ বংশ রক্ষা না হলে সাম্রাজ্যের কোনো মূল্য নেই। সত্যবতী তখন নিজের আরেক পুত্র ব্যাসদেবের কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন তার মাধ্যমে বিচিত্রবীর্যের স্ত্রীদের গর্ভে সন্তান উৎপাদন করলে বংশরক্ষা হবে। তখন ব্যাসদেব মায়ের আজ্ঞা পূরণে রাজি হন এবং তার ঔরসে ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও বিদুরের জন্ম হয়। ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ এবং বিদুর দাসীর গর্ভজাত হওয়ায় কনিষ্ঠ পুত্র পাণ্ডু সিংহাসনে বসেন। পাণ্ডুর মৃত্যুর পর ধৃতরাষ্ট্রের সন্তান ও পাণ্ডুর সন্তানদের মাঝে যে দ্বন্দ্ব এবং যুদ্ধের অবতারণা হয় তাইই মহাভারতের মূল উপজীব্য। এই ঘটনাগুলোকেই প্রত্যক্ষ করে লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব নেন ব্যাসদেব।
উপন্যাসটির দুইটি অংশ। একটি অংশে আমরা দেখতে পাই মহাভারতের ঘটনাগুলোর প্রবাহ। রাজ্য নিয়ে আত্মীয়ের মাঝে যুদ্ধ এবং নিজ হাতে মিত্রদের হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তগতের আকাঙ্খা চরিতার্থ হয়েছে এই মহাকাব্যে। অন্য অংশে দেখা যায় ব্যাসদেবের দার্শনিক ভাবনা। মহাভারতে যেরকম উত্থান পতন রয়েছে, তেমনই ব্যাসদেবের সফরেও উত্থান পতন দেখা যায়। বয়স যখন কম ছিল তখন আশ্রমের সঙ্গীদেরকে নিয়ে পথে নেমেছিলেন ব্যাসদেব। তখন একরকম ভাবনা তাদের মাঝে উদ্ভব হয়েছিল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর যখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ সবাই নিজেদের মাঝে মৃত্যুচিন্তা ও জীবনের অর্থ খোঁজার তাগিদ দেখতে পায়। পথে একজন একজন করে সঙ্গীকে রেখে আসা এবং তাদেরকে জীবনের অর্থ জিজ্ঞাসা করে ব্যাসদেবের মাধ্যমে লেখক পাঠককে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন।
মহাভারতের গল্পের সাথে ব্যাসদেবের জীবনদর্শন বইটাতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। তবে বইটিতে ব্যাসদেবকে সম্পূর্ণভাবে পাওয়া যাবেনা। গল্পের বিস্তৃতি কম কিন্তু যথেষ্ট ভাবনার জায়গা রয়েছে। শাহযাদ ফিরদাউসের আরো দুইটি বই পড়েছিলাম। তিনি সবসময় ভিন্ন দৃষ্টিতে পাঠককে ভাবতে উৎসাহ দেন। এই বইটিও পাঠককে হতাশ করবেনা বলে আশা করি। হ্যাপি রিডিং।
আপাতত তিনি শুধুই শান্ত সন্ন্যাসী, বিশাল পরিচয় তাঁর তিনি মহাভারতের স্রষ্টা। নাম তাঁর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস, বিশাল-বৃহৎ জীবনের মাধ্যমে তিনি একাই বহু মানুষের জীবন ধারণ করেছেন, করেছেন অনেক প্রানকে তাঁর প্রানে ধারণ।
মহাভারতের স্রষ্টার সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় না। শাহযাদ ফিরদাউস এবার নিজের কল্পনার রঙ মিশিয়ে লিখেছেন তার জীবনী। মহাভারত, তৎকালীন ধর্মব্যবস্থা, সমাজ, দর্শন সব মিলেমিশে একাকার হয়েছে শক্তিমান এই লেখকের বইয়ের প্রতিটা পাতায় পাতায়।
মহামুনি পরাশর একদা কামান্ধ হয়ে ছলেবলে কৌশলে কুমারী সত্যবতীকে বাধ্য করে দেহদানে। কুমারী সত্যবতী মানবহীন দ্বীপে লোক লজ্জার ভয় থেকে বাঁচতে এক ছেলে, নাম যার 'কৃষ্ণ'- কারণ সে দেখতে কা��ো। আর দ্বীপে জন্ম বলে নামের সাথে যোগ হয় 'দ্বৈপায়ন', আর বেদ গবেষণা করতেন বলে 'বেদব্যাস'।
মাতৃস্নেহ থেকে নির্বাসিত 'কৃষ্ণ' বাবার হাত ধরে আশ্রমে শুরু করেন জ্ঞান চর্চা। জ্ঞানের খোঁজে একদিন সে শূদ্রের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। এতে তার ক্ষেপে গিয়ে তাকে আঘাত করে। তখন কৃষ্ণ জবাবা দেয়, "পিতা! আপনি নিশ্চিত জেনে রাখুন, যদি সমস্ত পৃথিবী আমাকে পরিত্যাগ করে তবু আমি জীবন জানার জন্য শূদ্রার কাছে মাথা নত করব, ধূলিকনার কাছে মাথা নত করব, পঙ্কচারী কীটের কাছে মাথা নত করব!"
কুরক্ষেত্রের যুদ্ধের আগের পর্যন্ত পাঠক শুধু ব্যাসকেই দেখে যায়। আর দ্বিতীয় অংশ থেকে ব্যাসের মাধ্যমে নিজের জীবনকে দেখা শুরু করে। ব্যাস জানতে চেষ্টা করেন জীবনকে, খুঁজতে থাকেন বেঁচে থাকার অর্থ, প্রশ্ন করেন নিজের জ্ঞান সাধনাকে। আর এস্ব প্রশ্ন যন্ত্রণায় ভোগাতে থাকেন, পাঠককেও। রুগ্ন ভঙ্গুর ব্যাস এক পর্যায় বলেন,"হে তরুণ পন্ডিত! পুঁথির ভারে নিজেকে খুব ভারি ভেবো না। সমগ্র জীবন পুঁথির পাতা উল্টে শেষ বেলায় এসে দেখবে, জীবন আমারই মতো এক বৃদ্ধ, অসহায়, নিঃস্ব এবং সর্বহারা।"
শাহযাদ ফিরদাউসের সুনিপুণ কলমের আঁচড়ে ব্যাস হয়ে উঠেছে এক জীবনদর্শন। অত্যন্ত সহজ ভাষার কারণে আমার মতো গরীব পাঠকেরও বুঝতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। দিনশেষে ব্যাস বলে যায়,
"এই জগৎ ঈশ্বরদ্বারা পরিবৃত। সর্বত্র তাঁর সৃজনের বিপুল প্রকাশ। সর্বভূতে তাঁর উত্তাল উপস্থিতি। সমস্ত জড় আর সকল সচল বস্তুতে তিনি বিম্বিত... তবে আমি কেন পরিত্যক্ত, নিঃসঙ্গ, একা, অবিকাশ, সৃষ্টিহীন! তিনি উঠে দাঁড়ালেন, নদীর পার ধরে বিভ্রান্ত পদক্ষেতে হাঁটতে লাগলেন। কে আমি?"
শাহযাদ ফিরদাউসের লেখা উপন্যাস ‘ব্যাস’ বাংলা সাহিত্যে একটি অনন্য সংযোজন, যা পাঠককে মহাভারতের স্রষ্টা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের জীবন ও দর্শনের গভীরে নিয়ে যায়। এই উপন্যাসে লেখক ইতিহাস ও কল্পনার মেলবন্ধনে ব্যাসের চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলেছেন, যা পাঠককে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে মহাভারতের পটভূমি অনুধাবনে সহায়তা করে।
উপন্যাসটির ভাষা ও গদ্যশৈলী অত্যন্ত মাধুর্যময় ও সংযত, যা পাঠককে সহজেই আকৃষ্ট করে। গল্পের সংলাপ ও প্রশ্নোত্তর পর্বগুলো গভীর জীবনবোধ ও দর্শনের প্রতিফলন ঘটায়, যা পাঠককে আত্মজিজ্ঞাসায় উদ্বুদ্ধ করে। উপন্যাসটি ব্যাসের জীবনের বিভিন্ন পর্যায় জন্ম, শিক্ষা, বেদ গবেষণা, মহাভারতের রচনা এবং কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তার অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধিচিত্রিত করে, যা পাঠককে তার অন্তর্দৃষ্টি ও জ্ঞানচর্চার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
‘ব্যাস’ উপন্যাসটি শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক চরিত্রের জীবনী নয়, এটি একটি দার্শনিক অন্বেষণ, যা জীবনের অর্থ, মানবিক সম্পর্ক , সমাজব্যবস্থা এবং আত্মজিজ্ঞাসার প্রশ্নগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। লেখক শাহযাদ ফিরদাউসের নিপুণ কলমের ছোঁয়ায় উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে একটি সাহিত্যিক রত্ন, যা বাংলা সাহিত্যে ছাপ ফেলেছে।
‘ব্যাস’ উপন্যাসের গহীনে লুকিয়ে আছে এক গভীর দার্শনিক স্রোত। জীবন কী? কর্তব্য আর বৈরাগ্যের টানাপড়েনে একজন মুনি কীভাবে মানবজগতে অবস্থান করেন? কীভাবে তিনি নিজেকে সময় ও পরিস্থিতির ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন, আবার কখনো সেই সময়েই গেঁথে ফেলেন নিজেকে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমরা ব্যাসদেবের চোখে দেখি মানবজাতির অন্তর্দ্বন্দ্ব।
উপন্যাসটি বারবার প্রশ্ন তোলে লেখক কি এক নির্মোহ কাহিনিকার, না কি ইতিহাসের সহস্র কণ্ঠের মাঝে একজন নির্বাক দ্রষ্টা? ব্যাসের রচনায় যেমন রয়েছে যুদ্ধ, নীতি, কৌশল, তেমনি রয়েছে অশ্রু, প্রেম, আত্মবিরাগ। এই উপন্যাসে ব্যাস যেন নিজেই প্রশ্ন করেন “আমি কি কেবল ইতিহাসের প্রতিলিপিকার, না কি সময়ের দায়ে আমি নিজেই এক ইতিহাস?”
ব্যাসের কণ্ঠে বেদ উঠে আসে, কিন্তু সেই কণ্ঠে শোনা যায় সন্তানহীন নারীর আকুতি, বঞ্চিত মানুষের আর্তনাদ, আর যুদ্ধের মধ্যে জন্ম নেওয়া যন্ত্রণার আর্তি। এ উপন্যাস বেদান্তের, কিন্তু সেই সঙ্গে ব্যথারও। ‘ব্যাস’ মূলত এক লেখকসত্তার আত্মকথন, যেখানে শিল্প, ধর্ম, সমাজ ও আত্মার সমাহারে এক অসাধারণ সাহিত্যিক ও দার্শনিক সৃষ্টি হয়েছে। এটি একদিকে ঐতিহাসিক পুনর্বিন্যাস, অন্যদিকে মানবমন ও বিবেকের পুনঃনির্মাণ।
It’s a highly philosophical book. The kind of book I wanna read. It can make you think in a different way. If you wanna know what it’s about.. Anyone will probably say It’s basically based on a historical character. But I think it’s just a cover for telling a more enthusiastic story. Shahzad Firdaus wrote it in a proper and soothing way. I liked his story telling and language. It’s very amusing and the story has the ability to attach the reader easily. Highly recommended!
মহাভারতের রচয়িতা কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস-এর জীবনী নিয়ে চমৎকার একটা বই। কিন্তু ব্যাসের পুরো জীবন কী এতে উঠে এসেছে? হয়তো না। অন্ততপক্ষে আমি তৃপ্ত হতে পারিনি। তবে এটা ঠিক লেখকের সমস্যা নয়। ব্যাসের ব্যাপারে এমনিতেও ইতিহাসে খুব বেশি তথ্য নেই। যেটুকু পাওয়া যায়,সেটুকুর উপর ভিত্তি করেই শাহযাদ ফিরদাউস দারুণ এই বইটি লিখেছেন। রয়েসয়ে পড়তে পারলে বিভিন্ন দার্শনিক কথাবার্তা নতুন ভাবনার খোরাক জোগাবে।
পরাশর মুনী ও সত্যবতীর বিয়ে বহির্ভূত প্রেমের ফলে দ্বৈপায়ন দ্বীপে জন্ম নেন কৃষ্ণ , পরবর্তীতে যিনি হয়ে উঠেন বেদব্যাস। শিশু অবস্থা থেকেই তাকে মায়ের সঙ্গ ছেড়ে জ্ঞানার্জনের জন্য পিতার সাথে পথে বেরিয়ে পড়তে হয়। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে মায়ের সংকটকালে উদ্ধার করতে সে পিছপা হয়নি। হস্তিনাপুরের উত্তরাধিকারী আনয়নে তার ভূমিকা অপরিসীম। ব্যাস একসময় পিতার সান্নিধ্য ছেড়ে জ্ঞানার্জনের জন্য মাটির কাছাকাছি সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যান। জীবন সম্পর্কে তাদের ধারণা ও জীবনের নিগুঢ় উদ্দেশ্যও তিনি তাদের কাছে শিখেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষে নিজেদের আশ্রমের উদ্দেশ্যে যখন দীর্ঘ পথ যাত্রা করেন তখন পথিমধ্যে তার এক এক শিষ্য অন্তিম বিদায় জানায়। তবু শেষ পর্যন্ত বৈশম্পায়নকে নিয়ে তিনি আশ্রমে যেভাবেই হোক পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নেন। কারণ তার এখনো অনেক কাজ বাকি। জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি রচনা করতে চান জয় নামক মহাকাব্য যেখানে জয় পরাজয় সমানভাবে বিস্তার করবে। তাই জরায় আক্রান্ত বেদব্যাস তার অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব দিয়ে যান প্রিয় শিষ্য বৈশম্পায়নকে।
বেদব্যাসের এই নাতিদীর্ঘ জীবনী থেকে মহাভারতের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে জানার সুযোগ নেই, আখ্যান এসেছে হাতে গোনা দুইএকটা। শেষ যাত্রার শিষ্যদের সাথে তার কথোপকথন বর্ণণায় সংলাপ ব্যবহার করা হয়েছে যা নিঃসন্দেহে বইয়ের অনন্য সংযোজন।
"—আমাদের কাহিন��� মানুষ এবং তার অন্তহীন দুর্বলতার কাহিনী । —মানুষ এবং তার অন্তহীন দুর্বলতার কাহিনী । —আমাদের কাহিনী মানুষের অন্তহীন সম্ভাবনার কাহিনী। —মানুষের অন্তহীন সম্ভাবনার কাহিনী। —আমাদের কাহিনী মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের প্রতিবাদ —মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের প্রতিবাদ।"
-ব্যাস শাহযাদ ফিরদাউস
অতঃপর পরাশর পুত্র কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস লেখা শুরু করলেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকর্ম যার বিস্তৃত সমগ্র ভারত জুড়ে ছড়িয়ে। আদিকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত যাকে আমরা "মহাভারত" নামে সম্বোধন করি। মহাভারত এবং কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন মিলে একাকার। কৃষ্ণ দ্বৈপায়নকে আমরা বেদব্যাস বলেও ডেকে থাকি। কারণ তিনি বেদকে সুবিন্যস্ত রূপ দিয়েছেন। যার ফলে তাকে বেদব্যাস নামেও ডাকা হয়। বেদব্যাস রচিত মহাভারত আদিকাল থেকে সর্বজন জ্ঞাত এবং বর্তমানেও তার জৌলুস দৃশ্যমান। মহাভারত সম্পর্কে আমরা সকলেই জানি এই মহাভারতকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে রচিত হয়েছে আরো বহু বহু গ্রন্থ। কিন্তু মহাভারতের রচয়িতা কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন সম্পর্কে খুব কম জানা যায়। সেই "খুব কম জানা" বিষয়গুলোকে একত্রিত করে লেখক শাহযাদ ফিরদাউস রচনা করলেন "ব্যাস" নামের উপন্যাস। উপন্যাসের প্রথমভাগে ব্যাসের জীবন এবং তার সময়কালকে নিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। এরপরের ভাগে দেখা যায় ঋষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস স্বচক্ষে মহাভারতের যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করে নিজেকে বহু প্রশ্নের বাণে জর্জরিত করছেন। সেসব প্রশ্ন তার শিষ্য ঋষি জৈমিনি, ঋষি পৈল,ঋষি সুমন্ত, ঋষি বৈশম্পায়��কেও প্রশ্নের করছেন। শেষ বয়সে জীবনকে নতুন রূপে দেখে নতুন প্রশ্ন উদিত হচ্ছে জীবনকে নিয়ে আবার তাদের ঋষি জীবন পালন করা সঠিক পথ ছিলো কিনা সেটা নিয়েও প্রশ্ন করেছেন বারবার।
যেমন ঋষি সুমন্তকে বেদব্যাস প্রশ্ন করছেন, "আমরা সারাজীবন স্রোতের প্রতিকূলে দাঁড়িয়ে স্রোতের গতিমুখ পাল্টে দিতে চেয়েছি, সেই প্রসঙ্গে বলছি । সুমন্ত বল, অন্তর থেকে বল—আমরা কি ভুল করেছি?
— স্রোতের প্রতিকূল কিংবা অনুকূল বলে কিছু নেই। সবই আবর্ত, ঘূর্ণি, চক্রাকার চলাচল। আমরা কেউ স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারিনি, স্রোতও আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেনি। জীবনের স্রোত এবং আমরা যারা তার বিরুদ্ধে ছিলাম বলে ঘোষণা করছি তারা পরস্পরবিরোধী দুটি যুযুধান গোষ্ঠী নই, সবাই এক অর্থহীন চক্রাকার প্রবাহের কুশীলব।"
আবার এই কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস মৃত্যুর আগে ঈশ্বরের কাছে তিনটি বিষয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে যান। আরিফ রহমান তার লেখা এটা আমার দর্শনের নোটখাতা নয় বইতে এইভাবে তার উল্লেখ করেছেন— "তো ব্যাসদেব অনেকগুলো পুরান রচনা করার পর মৃত্যুর আগে ভগবতে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন তাঁর তিনটি অপরাধের জন্য। সেই অপরাধগুলো হচ্ছে:
প্রথমত- ‘রূপং বূপবিবজি্ধত্য ভবতো। ধ্যানেন যদ্ধণিতং' অর্থাৎ: ঈশ্বরের কোনো রূপ নেই কিন্তু আমি ধ্যানে ঈশ্বরের রূপ কল্পনা করে সেটা বিবৃত করেছি।
দ্বিতীয়ত — ‘ব্যাপিত্বঞ্চ বিনাশিতং ভগবতো যত্তীর্ঘযাত্ৰাদিনা' অর্থাৎ: ঈশ্বর নিরাকারে সর্বময় বিরাজ করেন কিন্তু আমি ঈশ্বরকে বিভিন্ন তীর্থে বেঁধে দিয়ে গেলাম।
তৃতীয়ত — 'স্তত্য। নির্র্বচনীয়তা খিলগুরো দূরীকৃতা যন্ময়া' অর্থাৎ, প্রভু তুমি সবরকম প্রশংসা-স্তুতির অতীত, তুমি অচিন্ত্য, অনির্বচনীয়, তবুও আমি আমার মুখ দিয়ে তোমার লীলা বর্ণনা করে ফেলেছি, আমার মুখ দিয়ে আমি তোমার প্রশংসা করে ফেলেছি।
শেষে ব্যাসদেব ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলছেন— ‘ক্ষন্তব্যং, জগদীশ, তদ্ধিকলতাদোবত্রয়ং মৎকৃতং’ অর্থাৎ অতএব হে অখিলগুরু, জগতের ঈশ্বর, আমার চিত্তের এই অপরাধ মার্জনা কর।" -এটা আমার দর্শনের নোটখাতা নয়
অতএব কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস রচিত মহাভারত যেমন বেদব্যাসের সঞ্জীবনী দ্বারা স্বয়ংসিদ্ধ তেমনই বেদব্যাসের সম্পূর্ণ জীবনও কৌতূহলোদ্দীপক।
মহাভারতের কাঠামোর ভেতর লেখক শাহ্যাদ ফিরদাউস যে বেদব্যাসের নিমার্ণ করেছেন সে ব্যাস তার নিজস্ব। মহাভারতের ব্যাসের প্রজ্ঞা ও অনুসন্ধিৎসা এখানে উপস্থিত থাকলেও, অনুপস্থিত তাঁর প্রগাঢ় ব্যাক্তিত্ব। লেখকের বেদব্যাসের আত্ম-বিশ্লেষণ, আত্মবিশ্বাস ও সিদ্ধান্তে একটা দোদুল্যমান নির্যাস পরিলক্ষিত হয়।
লেখক শান্তি ও মানবতাবাদী। যুদ্ধের বিপক্ষে তার সুদৃঢ় অবস্থান। কিন্তু একথাও ভুলে গেলেও চলবে না ব্যাস পৌরাণিক চরিত্র। বিশ্বাসীদের নিকট ঐতিহাসিক চরিত্র। লেখকের ব্যক্তিচেতনা ও আদর্শ কৃষ্ণ দ্বৈপায়নের বেদব্যাসের উপর এখানে আরোপিত। ফলশ্রুতিতে মূল ব্যাসের অনুসন্ধান ব্যর্থ না হোক অন্তত এখানে বিঘ্নিত হয়েছে।
আমেরিকার অ্যারিজোনা ইউনিভার্সিটির থিওলজির প্রফেসর Bruce M. Sullivan ব্যাস সম্পর্কে বলেছেন,
'Vyasa is the author of Mahabharata in duel sense; not only is he the reputed composer of the text but also the creator of the Bharat family on whom the story is centered.'
একইসাথে মহাভারতের স্বীকৃত মার্কিন গবেষক Alf Hiltebeitel বলেছেন,
'Vyasa, the ever receding figure in the epic, is thus a character of the ultimate enigma of the Mahabharata.'
পাশ্চাত্য এই দুজন গবেষকদের উক্তি থেকে বোঝা যায়, মহাভারতের কেন্দ্রের ব্যাসের উপস্থিতি প্রচ্ছন্ন মনে হলেও গভীর পর্যবেক্ষণে উজ্জ্বল ও অনিবার্য হয়ে ওঠে। কিন্তু লেখক শাহ্যাদ ফিরদাউসের ব্যাস সেই কেন্দ্রিকতাকে থেকে বেশ দূরত্বে চলে গেছেন।
বইটা পড়ে খানিকটা হতাশই হয়েছি৷ তবে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ পরিদর্শন শেষে আশ্রমে ফেরার পথে ঋষি পৈল, সুমন্ত ও জৈমিনির একে একে পতন মহাভারতের মহাপ্রস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অন্তিমে টিকে থাকার ইঙ্গিতে শুধু বৈশাম্পায়ন। লেখক কল্পিত, ঋষিদের এই প্রস্থান নিতান্তই লৌকিক ও আড়ম্বরহীন কিন্তু সত্য। ঋষিদের বিশাল বিস্তৃত জীবনের অন্তিমে এসে এই প্রস্থানপর্বের যাবতীয় দার্শনিক আলাপ এক পাশে সরিয়ে রেখেও এই মৃত্যু ও বিদায়ের চিত্রকল্প অভূতপূর্ব অনুভূতি রেখে যায়।
মহাভারতের লেখক কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেবকে নিয়ে লেখা উপন্যাস। ভালো। সবচেয়ে বেশি ইন্ট্রেসটিং পার্ট হচ্ছে এখানে ব্যাসকে কৌরব আর পঞ্চপাণ্ডবদের দাদু করা হয়েছে। মহাভারতের স্রষ্টাকে সত্যি সত্যি স্রষ্টা বানিয়ে দেয়া হল। ব্যাস নিজেই এখানে মহাভারতের চরিত্র। পঞ্চপান্ডবদের রক্ষা করছে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ করছে। মানে হচ্ছে, মহাভারতের সমান্তরালে ব্যাসের জীবনকাহিনী। আসলেই ইন্ট্রেসটিং।
জীবন মানে কী? জীবনের অর্থ কী? জীবনে চলার পথে আমরা অনেক কিছু পেছনে ফেলে তাকে অতিক্রম করে আসি। অতিক্রম করে আগামীকে অনুসরণ করে আমরা দিন শেষে কী পাই? জীবন এমনি অজস্র প্রশ্নের সমাহার। যার উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই একদিন সব শেষ হয়ে যায়। জীবনের অর্থ হচ্ছে ‘আমার চলার পথে যাই আসুক, দুঃখ-কষ্ট, ভালো-মন্দ, প্রেম-বিরহ এই সবকিছুকেই আলিঙ্গন করেই আগামীতে চলতে থাকা। ’মন্দ’ বা ‘কষ্ট’ বলে তাকে অবহেলা করা যাবে না। লেখক ‘শাহযাদ ফিরদাউস’এর লেখা ‘ব্যাস’ বইয়ের প্রধান চরিত্র কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস-এর জীবনাচরণ পড়ে আমার এই উপলব্ধি হয়।
বিশ্ব সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম গুলোর মধ্যে মহাভারত একটি। বইটি আমি পড়িনি তবে শুনেছি এই বিশাল সাহিত্যের এক একটি চরত্রি নিয়ে আলাদা আলাদা করে অনেক উপন্যাস তৈরি করা যায়। হয়েছেও বহু। এমন এক মহাকাব্যের যিনি স্রষ্টা সেই কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসের জীবন নিয়েই বর্তমান উপন্যাসটি লেখা হয়। বইতে তাকে বিশদ ভাবে পাওয়া না গেলেও চমৎকার ধারণা পাওয়া যায় তার দার্শনিক ভাবনার।
ঋষি পরাশর মুনির ঔরসে এবং মা সত্যবতীর গর্ভে জন্ম হয় ব্যাসের। গায়ের রঙ কালো হওয়ায় কৃষ্ণ এবং তার জন্ম দীপে হয় তাই নাম হয় দ্বৈপায়ন। তার জন্মটা হয় বাবা মায়ের বিবাহ বহির্ভূত অবস্থায়। ফলে সত্যবতী তাকে লোকচক্ষুর আড়ালে বড় করেন। কিছুটা বড় হবার পর বাবা পরাশর মুনির আশ্রমে রেখে আসা হয় তাকে। সেখানে বাবার সান্নিধ্যে শিক্ষা লাভ করতে থাকে ব্যাসদেব।
অন্যদিকে সত্যবতীর পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয় মহারাজ শান্তনুর সাথে। এখানেও থাকে এক প্যাঁচ। যেহেতু ‘মহারাজ’ তাই তার আরো স্ত্রী আছে। সেই হিসেবে তার বড় ছেলেও আছে। আইনমোতাবেক রাজার পর বড় ছেলে রাজ্য পাবেন। কিন্তু সত্যবতীর শর্ত হচ্ছে তার সন্তানকে রাজ্য পেতে হবে। তখন বড় ছেলে বাবা শান্তনুর মুখ চেয়ে রাজ্য বিসর্জন দিয়ে সৎ মা হিসেবে সত্যবতীকে গ্রহন করেন। এই সংসারে সত্যর দুই সন্তান হয়। কিন্তু জীবনতো এতো সহজ না, তাই সত্যের ঐ দুই সন্তান নিজেরাই কোনো সন্তান জন্ম না দিয়ে নিজ স্ত্রী রেখে মারা যায়। এখন বংশ রক্ষা হবে কি করে? সত্যবতী আর সৎ বড় ছেলে চিন্তায় পড়েন। তখন সত্যবতী প্রস্তাব দেন তার আরেক সন্তান ব্যাসকে দিয়ে সত্যের বড় ছেলের রেখে যাওয়া স্ত্রীর মাধ্যমে সন্তান উৎপাদন করাবেন, আর সেই সন্তান দিয়ে বংশের রক্ষা হবে।
ব্যাস তার মায়ে অনুরোধ রাখেন। তার ঔরসে জন্ম নেয় ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডুর, বিদুর। এর মধ্যে আবার প্যাঁচ লাগিয়ে দেয় জীবন। ধৃতরাষ্ট্র হয় অন্ধ, আর বিদুর জন্ম হচ্ছে দাসীর মাধ্যমে তাই ব্যাসের ছোট পুত্র পান্ডুর সিংহাসনে বসেন। এদিকে জীবন তার পালে হাওয়া লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। পান্ডুর মৃত্যুর পর সিংহাসনে কে বসবেন এ নিয়ে ধৃতরাষ্ট্র ও বিদুরের সন্তানদের মধ্যে দন্ধ চলতে থাকে। তারই ফলশ্রুতিতে আমরা মহাভারতের বিখ্যাত কাহিনি ‘কুরুক্ষেত্র’ দেখতে পাই। এখানে যুদ্ধ হয় নিজ পরিবারের মানুষদের মাঝেই।
মূলত ব্যাসদেবের জন্ম, বেড়ে উঠা, রাজবংশ রক্ষা এবং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে তার এই সুদীর্ঘ জীবনের নানা উত্থান এবং পতনের মধ্যে যে জ্ঞান অর্জন করেছেন সেসব তিনি দার্শনিকের চোখে দেখেছেন। সামান্য এক রাজ্য দখলকে কেন্দ্র করে কিভাবে নিজ পরিবারের মানুষদের মাঝে এমন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়, এবং তাদের মাঝে নানান ছলচাতুরী, লোভ এই সবকিছুই ব্যাসদেবকে অনেক ভাবে ভাবিত করে তুলেন। তিনি ও তার সফরসঙ্গীরা এইসব দেখে জীবনের অর্থ খুঁজতে থাকেন। অনেকেই কোনো উত্তর না পেয়ে পথিমধ্যে তার সেই সঙ্গ ত্যাগ করেন।
লেখক শাহযাদ ফিরদাউস অতি চমৎকার ভাবে আমাদের কাছে সেসব প্রশ্ন উপস্থাপন করেছেন। যা একজন পাঠককেও ভাবিত করে তুলবে। বইটিতে চমৎকার সব দর্শন আছে যা একজন দর্শনপ্রিয় পাঠককে আগ্রহী করবে বইটি পড়তে।
'বেদব্যাস' কোন ব্যক্তিবিশেষের নাম নয় এটা একটা উপাধি মাত্র। বৈদিক যুগে যাঁরা বেদ-গবেষণা করতেন তাঁরাই ছিলেন বেদব্যাস। তেমনি চার্বাকও কোন ব্যক্তি বিশেষের নাম নয়, একটি বিশেষ মতাবলম্বী গোষ্ঠীর নাম।
এক্ষেত্রে অনেক বেদব্যাস এর ভেতর কৃষ্ণদৈপায়ন যেমন বেদ-গবেষণা ছাড়াও মহাভারতের আদি গ্রন্থ "জয়" রচনা করেন তেমনি অনেক চার্বাকের ভেতর মূল চার্বাক নিশ্চয়ই একজন ছিলেন, যেমন বৃহস্পতি।
মহামুনি পরাশর ও সত্যবতী পুত্র কৃষ্ণদৈপায়ন বেদব্যাস। সত্যবতী কুমারী অবস্থায় জন্ম হওয়ার কারনে লোকচক্ষুর অন্তরালে এক নির্জন দ্বীপে তাঁর জন্ম হয় তাই নাম হয় দৈপায়ন, ছোট বেলার নাম কৃষ্ণ কারণ তাঁর গায়ের রং ছিলো কালো। সত্যবতীও ছিলোন কালো, ডাকনাম কালী। দৈপায়ন বাব পরাশর কাছেই মানুষ আশ্রমে থেকে। পিতার শিক্ষায় ও আদর্শে হয়ে ওঠেন বেদব্যাস।
শুধু ভারতবর্ষে নয় বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ও অত্যুজ্জ্বল এক সাহিত্যকীর্তি মহাভারত। অসংখ্য চরিত্রে চিত্রিত এই গ্রন্থ। তবে এই চরিত্র আর ঘটনার আড়ালে ভারতবর্ষের ইতিহাস-ঐতিহ্য, রাজনীতি-সংস্কৃতি, ধর্ম কিংবা অর্থনীতি ও তার স্বাতন্ত্র্য অভিজ্ঞতার এক গ্রন্থ এটি।
মহাভারত ও অন্যান্য গ্রন্থে ব্যাসের জীবন সম্পর্কে যেটুকু তথ্য পাওয়া যায় তা একটি পরিপূর্ণ চরিত্র সৃষ্টি যথেষ্ট কঠিন। দর্শন ধর্ম রাজনীতি ও জীবনের গভীর বোধ প্রসঙ্গে মহাভারতে তাঁর দীর্ঘ ভাষণ থাকলেও নিজের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে প্রায় কিছুই নাই। তিনি এক গভীর সংকট কালে আবির্ভূত হন, জ্ঞানূান করেন এবং নিষ্ক্রান্ত হন। যা কিছু আছে তা টুকরো টুকরো ঘটনা৷ সেই সব টুকরো ঘটনা থেকে লেখক ধারাবাহিক এক জীবন কাহিনি দিয়ে ব্যাস চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। লেখকের লেখাতে চরিত্র উজ্জ্বল হয়েছে যদিও মহাভারতে এই চরিত্রের আবির্ভাব, তেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠেনি। তবে মহাভারতের কাহিনি টা সৃষ্টি উনার দ্বারাই। মহাভারতের চরিত্র নিয়ে আগেও অন্য লেখকের উপন্যাস পড়েছি, তবে সে সব চরিত্র সৃষ্টিতে ব্যর্থ্য হয়েছেন আমার মনে হয়েছে। "ব্যাস" উপন্যাসে লেখকের নির্মোহতা ও ভাষার ব্যবহার চরিত্রকে আকর্ষনীয় করে তুলেছে। ঘটনার অহেতুক বর্ণনা নাই নাই টানাটানি করে লম্বা করার চেষ্টা। অসাধারণ এক উপন্যাস। লেখকের লেখা আগেও পড়েছি। এক কথায় দারুণ লেখেন লেখক।
বিশ্বজুড়ে সমাদৃত সাহিত্যকর্ম মহাভারত এর স্রষ্টা কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস। তাঁর ব্যাক্তিজীবন নিয়ে তেমন কোন সাহিত্যকর্ম না থাকায় রহস্যে ঘেরা এই মানুষটির জীবনী নিয়ে খুব একটা জানা যায়না। কৃষ্ণ দ্বৈপায়নকে নিয়ে কতিপয় জ্ঞানের সাথে শাহ্জাদ ফিরদাউস তার কল্পনা মিশিয়ে রচনা করেছেন ব্যাস। সহজ সাবলীল ভাষায় এতে উঠে এসেছে ব্যাস দেবের জীবনকাল, মহাভারতের সংক্ষিপ্ত ঘটনাপঞ্জি, ধর্ম, জীবন নিয়ে দর্শন।
"অসতো মা সদগময় তমসো মা জ্যোতির্গময় মৃত্যোর্মামৃতংগময়... অসত্য থেকে আমায় সত্যে নাও, অন্ধকার থেকে আমায় আলোয় নাও, মৃত্যু থেকে আমায় অমৃতে নাও... সকল দুর্বলতা থেকে আমায় মুক্ত করো, মুক্ত করো...মুক্ত কর..."
"জ্ঞানের পথ ধারালো ক্ষুরের মতো দুর্গম আর বিপজ্জনক; জ্ঞান কি ভালোবাসার চেয়েও দরকারি? " জীবন তো একটা প্রশ্নই বটে যার উত্তর সন্ধানে আমরা ছুটে চলি দিগন্তরেখা ধরে। মানুষ জীবনের এই নিত্য খেলায় কেবল দর্শক হয়ে বাঁচতে পারে না, প্রতিটি মানুষ কামনা করে তার বুদ্ধি, শক্তি আর কল্পনা অনুযায়ী জীবনে একটি প্রবল ভূমিকা। আরো কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় মানুষ গতিশীল হয়ে ওঠে। আকাঙ্ক্ষা ;" মহত্বের আকাঙ্খা ছাড়া ছাড়া মানুষ আর কিছু ভাবে না, লোভকে আকাঙ্ক্ষা ভেবে সে লুব্ধ হয়। ভোগ কে প্রাপ্তি ভেবে বিভ্রান্ত হয়।" অতিরিক্ত হৃদয়বাদ এবং অতিরিক্ত মস্তিষ্কবাদ দুইই সমান পরিত্যাজ্য। এগিয়ে চলাই শেষ ���থা নয় কোন্ লক্ষ্যে চলছি সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। উপন্যাস পড়াকালীন অনুভব করেছি প্রতিটা শব্দ আমি দেখছি, শুনছি তার ঘ্রাণ আমার সমগ্র সত্তায় মিশে যাচ্ছে আমি স্পর্শ করতে পারছি সবটা! প্রথমবার বুঝলাম কেবল মন নয় আমার পঞ্চইন্দ্রিয় জুড়ে কোনো উপন্যাসের স্পন্দন ধ্বনিত হচ্ছে। আবেশে ডুবে যাওয়া যায় প্রতিটা বাক্যে এমনই এক উপন্যাস শাহযাদ ফিরদাউস এর 'ব্যাস'। এক গ্রন্থ রচনার কাহিনী ' ব্যাস ' যার অভ্যন্তরে লেখা হতে থাকবে জয় এবং পরাজয়ের কাহিনী, মানুষের কাহিনী তার অন্তহীন সম্ভাবনার কাহিনী। এখানে গ্রন্থিত হয়েছে ব্যসদেবের জীবন কখনও তা নাটকীয়, কখনো পর্বতের মতন তা শান্ত কখনও বা আবেগে পরিপূর্ণ। প্রসঙ্গে বলা উচিত ' বেদব্যাস' কারোর নাম নয়, উপাধি। বৈদিক যুগে যাঁরা বেদ গবেষণা করতেন তাঁরাই ছিলেন বেদব্যাস। ফলে বহু মানুষের আবেগকে ধারণ করে " ব্যাস " উপন্যাস তার কর্মোদ্যোগে এগিয়ে গেছে।
'' ব্যাস '' প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ জুলাই, পর্বান্তরে। গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশ ১৯৯৫, ২৫শে জানুয়ারি। প্রথমে '' ব্যাস '' রচিত হয়েছিল চিত্রনাট্য আকারে, পরবর্তীকালে যখন উপন্যাসে এর রূপান্তর ঘটে দীর্ঘ আট বছর পর ২০০৭ সালে তখন সংযোজিত হয় ব্যাসের দ্বিতীয় পর্ব। এই উপন্যাস মহাভারত নয় তাই তার বিশালতাও এতে নেই, " ব্যাস" এর পরিধি অতটাই করা হয়েছে যতটা প্রয়োজন , শিল্পগুণ সমৃদ্ধ এমন এক উপন্যাস যা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে বারংবার পড়ার দাবী রাখে। এই উপন্যাস পাঠ করে পাঠক নতুন করে তার চিন্তা শক্তির উপাদান খুঁজে পাবে।
"... যা কিছু অতিক্রান্ত অতীত অথবা যা কিছু অনাগত ভবিষ্যৎ অথবা যা কিছু দৃষ্ট বর্তমান তার সবটাই কাল-দ্বারা সংঘটিত। "
বেশ কিছুদিন আগে, এক বন্ধুর সাথে শাহযাদ ফিরদাউস কে নিয়ে কথা হতে হতে ওনার এই ২০/২৫ বছর আগেকার লেখা বইটা নিয়ে কথাবার্তা হয়! উপন্যাসের বিষয় মহাভারতের স্রস্টা, মহাকবি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাসের জীবন। তা মহাকবিকে কে টুকটাক এদিক ওদিক থেকে জানি বলে ভাবছিলাম, আচ্ছা দেখা যাবে একসময় ... ...পরে। তা ওই করেই পড়ে ছিল! এমনিতেও তো কত কিছুই জানা হয় না... ! যেমন শাহযাদ ফিরদাউসকেও লোকজন জানে না... চেনে না। অথছ কী দারুণ প্রতিভাবান একজন লেখক। শামসুর রাহমান একবার উচ্ছ্বসিত হয়ে উনাকে বলেছিলেন " ...অসামান্য লেখার ক্ষমতা আপনার।"
শাহযাদ ফিরদাউসের এই উপন্যাস লেখার পেছনের গল্পটাও অদ্ভুত! সেসময় উনার ঘোর ফিল্ম বানানো নিয়ে। সেই স্বপ্ন সত্যি করতে রীতিমতো পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে চলে গেলেন ইউরোপে। আর সেখানে বসেই তাঁর ছবির চিত্র নাট্য লেখা শুরু ... সেন্ট্রাল প্রোটাগনিস্ট কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস !রহস্যের আড়ালে পড়ে থাকা এক মহারথী। ছবি হবে হিন্দিতে আর নায়ক হবেন দীলিপকুমার! চিত্রনাট্য শেষ করে শাহযাদ প্ল্যান ধরে সোজা ফিরে এলেন ইন্ডিয়া (মুম্বাইতে) দীলিপকুমারের বাড়ী! চিত্রনাট্য পড়ে দীলিপকুমার উচ্ছ্বসিত... মুগ্ধ। অভিনয়ের সাথে সাথে ছবির প্রযোজক হিসেবে থাকবার আগ্রহ জানালেন ! শাহযাদ ফিরদাউসের এক স্বপ্নময় শুরু হলো ... কিন্তু স্বপ্ন ভাঙতে বেশি সময় লাগে নি... বিশাল ন্যারেটিভের এই ছবিটা শেষ পর্যন্ত তৈরী হয় নি... আলোর মুখ দেখে নি... আর সেটা এই আশংকায় যে, সিনেমায় এক হিন্দু মহা কবির চরিত্র করবেন এক মুসলমান নায়ক, তাতে আবার মুসলমান প্রযোজক,সাথে মুসলমান পরিচালক !! কী দূর্ভাগ্যজনক ... তা সেই ধাক্কাতেই হিন্দি চিত্রনাট্য ডুবলো অতলে ...আর আমরা পেলাম বাংলায় লেখা ওর প্রথম উপন্যাস "ব্যাস"।
১২৮ পৃষ্ঠার ছোট একটা বই কিন্তু তাতে চিন্তার খোরাক জোগানোর মত দূর্দান্ত সব আলোচনা আছে ... ঘটনার বর্ননা আছে। কখনো প্রহেলিকায় আর কখনো তা সারল্যে। আমার যেমন, মহাকবি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসের সাথে মহর্ষি বৃহস্পতি চার্বাকের তীব্র তর্ক যুদ্ধের অংশ টা পছন্দ। যেখানে প্রচন্ড তর্ক শেষে,"চিন্তার সৃজন কিভাবে সম্ভব? " তাঁর উত্তরে চার্বাক বলছেন, "যার পা মাটির যতটা গভীরে সে ততটা সৃজনশীল।যার হাত পা দুই-ই মাটির সংগে সম্পর্কিত সে আরো সৃজনশীল।"
ভাষা চিত্র থেকে বের হওয়া এই এডিশনটায় মুদ্রণ প্রমাদ যথেষ্ঠ বিরক্তির উদ্রেক করেছে পড়বার সময়। তাতে এক তারা কাটা পড়েছিলো । পরে ভাবলাম , এতে লেখকের কি দোষ , তাই খানিকটা পক্ষ পাতিত্ব সাথে অনেকটা ভালো লাগা নিয়ে পাঁচে পাঁচ :)
মোটামুটি অনেকগুলা পৌরাণিক চরিত্র বিষয়ক বই পড়া হইছে কিন্তু এই লেখকের লেখা অভূতপূর্ব , কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের জীবনের আদ্যোপান্ত নিয়ে মোটাদাগে একটা উপন্যাসের পাশাপাশি শেষ দিকে অর্থাৎ দূর থেকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রত্যক্ষ দর্শন শেষে যাত্রাপথে গুরু ও শিষ্যের মধ্যে যে এক নিবিড় প্রবৃষ্ট অবিচ্ছেদ্য বন্ধন - জীবন দর্শন এর এক অসামান্য কাহিনী লেখক ফুটায় তুলছে, সেটা সবকিছুর উর্ধেব। ❤️
মহাভারত রচয়িতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস নিয়ে তেমন কিছু জানা ছিলোনা শুধুমাত্র তিনি পরাশর মুনি এবং সত্যবতীর সন্তান যিনি মহাভারতের বিভিন্ন সমস্যায় এসে দর্শন, ধর্ম, রাজনীতি বিষয়ে মতবাদ/জ্ঞান/ভাষণ দান করেন এইটুকু ছাড়া। তাঁর জীবনী নিয়ে লেখার প্রাক্কালে তাই লেখক নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে ব্যাসের জীবন সম্পর্কে যেটুকু তথ্য পাওয়া যায় তা দিয়ে তাঁর চরিত্র নির্মাণ যথেষ্ট নয়। মহাভারতের আদিগ্রন্থ 'জয়' কীভাবে ব্যাসের মাধ্যমে রচিত হল সেটি বোঝাতেই মূলত পুরো চরিত্রটি মহাভারতে ছড়ানো-ছিটানো আভাস, ইঙ্গিত ব্যবহার করে দাঁড় করিয়েছেন। ব্যাসের জন্ম ও জীবনবৃত্তান্ত, জীবন নিয়ে দর্শন, তাঁর বিশাল কর্মযজ্ঞ, মানুষের সাথে মানুষের দ্বন্দ্ব, সংঘাত মনুষত্ব নিয়ে দর্শন, জীবনের মহত্ত্ব নিয়ে বোধ, জ্ঞানানুসন্ধান নিয়ে চিন্তাভাবনাগুলোকে সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন পাঠকদের জন্য। ব্যাসের জন্ম ও জীবনবৃত্তান্ত দিয়ে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত এখানে ব্যাসের দার্শনিক জীবন ও দর্শনের বিভিন্ন ব্যাখ্যাই তুলে ধরা হয়েছে। বই পড়তে পড়তে পাঠক জীবন নিয়ে, জীবন বোধ এবং জীবনের লক্ষ্য নিয়ে ভাবতে বাধ্য হবেন। লেখকের অসামান্য লেখার গুণে ঐতিহাসিক চরিত্র ছাপিয়ে গিয়ে ব্যাস হয়ে উঠেছেন এক জীবনদর্শনের নাম। সবথেকে ভাল লেগেছে বিভিন্ন পটভূমিতে ব্যাসের সাথে তার বিরোধীপক্ষ কিংবা শিষ্যদের কিংবা তার পিতা মুনী পরাশরের মতভেদের বয়ান। তিনি অপরপক্ষের মতবাদকে যেমন যুক্তিতর্ক দিয়ে ধূলিসাৎ করেছেন একইসাথে যুক্তির খাতিরে গ্রহণ করেও নিয়েছেন শ্রদ্ধার সাথে। আমার তাঁকে আরেকটু জানার ইচ্ছা ছিল যে কেন তিনি কৌরব আর পান্ডবদের যুদ্ধ ঠেকাতে পারলেন না? কেন তিনি তাঁর উত্তরসূরীদের বিনাশ করলেন? সেকী নিছক গল্প নাকি ইতিহাস নাকি এখানেও অন্য কোন সংকেত রেখে দিয়েছেন আমাদের মত উত্তোরাধুনিক মানুষদের জন্য? যেহেতু ব্যাসকে নিয়ে আর কিছু জানিনা তাই লেখক তাঁর প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন কীনা সেটা বুঝতে পারছিনা। পরিশেষে, মহাভারতের স্রষ্টাকে নিয়ে এইটুকু জানানোর জন্য এবং আরো ভাললাগা তৈরি করবার জন্য ৫ তারা।
মহাভারত সম্পর্কে জানতে চাইলে আমরা সবাই অনেক কাহিনীই বলতে পারবো। কিন্তু যিনি মহাভারতের রচিয়তা, কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস, তাঁর সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? বলতে গেলে সেই অর্থে, মহান এই ব্যক্তির ব্যক্তিজীবন নিয়ে বিশেষ কিছু আমাদের জানা নেই, অন্তত আমার তো কোনো কিছুই জানা নেই। আর সেই অজানাকে জানতেই হাতে তুলে নিয়েছি শাহযাদ ফিরদাউস'এর এই "ব্যাস" উপন্যাসটি। ভারতবর্ষের সাথে সমগ্র বিশ্বেও একইসাথে সমাদৃত এবং অত্যুজ্জ্বল মহাভারত গ্রন্থ, যেখানে রয়েছে রহস্য আর ইঙ্গিতের বাতাবরণ। আর এই গ্রন্থের মতোই তাঁর স্রষ্টার জীবনও রহস্যে ঘেরা। সেই রহস্য উন্মোচন করতেই সত্য জ্ঞানের সাথে কল্পনা আশ্রিত হয়ে শাহযাদ ফিরদাউস রচনা করেছেন এই "ব্যাস" উপন্যাসটি। যা বাংলা সাহিত্যে এক অভিনব সৃষ্টি।
মহামুনি পরাশর যমুনা নদী পার হওয়ার জন্য ঘাটে এসে দাঁড়ালে ধীবরকন্যা সত্যবতী বা কালী নৌকা বেয়ে ঘাটের কাছে এগিয়ে আসেন। ধীবরকন্যা কালীর অপরূপ রূপ দেখে মুনি চমকে ওঠেন। কালীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মুনি তাঁর কাছে একটি রাত প্রার্থনা করেন। "মুনির কামান্ধ্য দৃষ্টি লক্ষ্য করে কালী বললেন— প্রাজ্ঞ! আপনি চঞ্চল যুবকের মতো কথা বলছেন। দয়া করে সৌজন্য রক্ষা করুন। পরাশর তাঁর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে কালীর উরু জড়িয়ে ধরে বললেন— আমি ভুবনবিখ্যাত পরাশর। তোমাতে বিমুগ্ধ। আমাকে রতি দান কর।" পরাশরের ঔরসে অবিবাহিত কালী গর্ভবতী হয়ে একটি পুত্রের জন্ম দেন, তিনিই হলেন কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস। এখানে বলে রাখি 'ব্যাস' কিন্তু তাঁর নাম ছিল না, সেটি ছিল তাঁর উপাধি।
"খাওয়া শেষে কৃষ্ণকে দুধের পাত্র দিলে সে এক নিঃশ্বাসে সবটুকু দুধ শেষ করে। কিছুটা লজ্জিত হয়ে বলে— যাহ্! সবটা খেয়ে ফেলেছি। কালী আঁচল দিয়ে ছেলের মুখ মুছিয়ে বললেন— বেশ করেছো, কালু সোনা। কৃষ্ণ বিরক্ত হয়ে বলে— 'কৃষ্ণ' বলতে পার না? যা তা নাম বল কেন? কালী ছেলেকে আদর করে কাছে টেনে বললেন— নামের কোনো মাথা-মুন্ডু আছে নাকি? শোন্, আমি দেখতে কালো তাই আমার বাবা আমায় 'কালী' ডাকেন। তুই দেখতে কালো তাই তোর নাম 'কালু'। আবার দেখ্, তুই এই দ্বীপে জন্মেছিস তাই তোর আর এক নাম হবে দ্বৈপায়ন।" "এ নাম ছাড়াও বড় হয়ে তুমি যদি ভালো কাজ করতে পার তো লোকরা তোমার আরও ভালো নাম দেবে।" এরপর কৃষ্ণকে আরও জ্ঞানী, অভিজ্ঞ করে তোলার জন্য পরাশর তাঁকে তাঁর মায়ের সাথে বাঁধন ছিন্ন করিয়ে অন্য আশ্রমে নিয়ে যান।
পরবর্তীতে সত্যবতী হস্তিনাপুরের সম্রাট শান্তনুর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং বিবাহের পর তাঁদের দুটি পুত্র সন্তান হয় চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দুজনেই মৃত্যবরণ করেন। ফলে ভারতবংশ নির্বংশ হয়ে যায়। কারণ সম্রাট শান্তনুর পূর্ব পত্নীর পুত্র ভীষ্ম পিতাকে দেওয়া প্রতিজ্ঞার জন্য সিংহাসনে বসতে চান না। তাই বংশ রক্ষার জন্য সত্যবতী তাঁর প্রথম সন্তান অর্থাৎ বিবাহের পূর্বে জন্ম হওয়া সন্তান কৃষ্ণকে হস্তিনাপুরে আসার আহ্বান জানান।
একদিন সত্যবতী তাঁর ভারতবংশকে রক্ষার জন্য ব্যাসদেবকে আহ্বান করে পুত্র সন্তানের জন্ম দিতে বলেছিলেন। কিন্তু কালের নিয়মে সেই বংশের কৌরব ও পান্ডব, দুই ভ্রাতৃকুলের পারস্পরিক যুদ্ধে দুই পক্ষের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে কেবল দশজন। "গান্ধারী বুকভাঙা কন্ঠে বললেন— আজ সমস্ত কৌরবগৃহ পুরুষবর্জিত।" "কৌরবদের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য আর কোনো পুত্র নেই। পান্ডবকুল রক্ষার জন্য আর কোনো পুত্র নেই।" "হায় সত্যবতী! তোমার ভারতবংশের শেষ দেখে যাও, তোমার সাধের ভারতকুল!"
ব্যাসদেব তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়ন, জৈমিনি, পৈল ও সুমন্তকে নিয়ে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ প্রত্যক্ষ দর্শন করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের হত্যালীলা দেখে তিনি বেদনার্ত হন। "ঈর্ষা আমন্ত্রণ করেছে ক্রোধ, ক্রোধ আমন্ত্রণ করেছে যুদ্ধ, যুদ্ধ আমন্ত্রণ করেছে মৃত্যু, মৃত্যু হত্যা করেছে জীবন।"
এরপর ব্যাসদেব তাঁর শিষ্যদের নিয়ে কুরুক্ষেত্র ত্যাগ করে এগিয়ে যেতে থাকেন তাঁদের আশ্রমের দিকে। যাত্রাপথ অনেক দীর্ঘ। আর এই যাত্রাপথে তাঁদের সাক্ষাৎ হয় বিভিন্ন পেশাগত শ্রেণীর মানুষদের সাথে। এরপর ধীরে ধীরে তাঁদের মনে দ্বিধার সঞ্চার ঘটে যে সারাজীবনে তাঁরা যা করে এসেছেন অর্থাৎ তাঁদের জীবনচর্চা, জ্ঞানান্বেষণ, সত্যের অনুসন্ধান এগুলো সব ঠিক ছিল নাকি ভুল? আর এই সকল প্রশ্ন থেকেই উঠে আসে জীবন দর্শনের এক অসামান্য দিক। সুমন্তর কথা, "গুরুদের, মানুষ শুধু সামনে দেখতে পারে, তার পাশে কিংবা পেছনে দেখতে পারে না। এটাই মানুষের সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা। যদি সে তার চারপাশ ভালোভাবে দেখতে পারত তাহলে সে কখনো অন্যের দিকে অস্ত্র তুলে আক্রমণ করতে পারত না, অন্য মানুষের রক্তে নিজের হাত রক্তাক্ত করতে পারত না।"
বইমেলায় বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন থেকে বইটি কিনেছিলাম। পড়বো পড়বো করে পড়াই হচ্ছিল না। ভাবছিলাম যথেষ্ট কঠিন শব্দ, ভাষা থাকবে, যার ফলে একটু বেগ পেতে হবে পড়তে। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। গতকাল সকালে বইটি নিয়ে পড়া শুরু করার পর সম্পূর্ণ মোহগ্রস্থ হয়ে কখন যে শেষ পাতায় পৌঁছে গেলাম বুঝতেও পারলাম না। ব্যাসদেবের জন্মকাহিনী থেকে শুরু করে তাঁর জীবনবৃত্তান্ত, জীবনদর্শনের সমস্ত ব্যাখ্যা এখানে সুনিপুণভাবে উঠে এসেছে। সুন্দর, সুনিপুণ ভাষায় লেখক রচনা করেছেন ব্যাসদেবের জীবনের এক অসামান্য আখ্যান।
পুরো বইটিই আমার পাঠ করে ভালো লেগেছে, তবে যেই বিষয়টি বেশি ভালো লেগেছে সেটি হলো, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ স্থান ত্যাগ করে যাত্রাপথে গুরু ও শিষ্যের মধ্যস্থ প্রগাঢ় বন্ধন এবং তাঁদের জীবনদর্শনের অসামান্য দিকটি।
পাঠকদের বলবো বইটি একবার পড়ে দেখতে। আশা করি ভালো লাগবে।
সবশেষে বইয়ের কয়েকটি অংশ~ ১) "আমি সত্যের দাসত্ব করি না! সত্যের ইচ্ছা হলে আমাকে পরিত্যাগ করতে পারে! মানুষকে সবাই পরিত্যাগ করতে পারে কিন্তু মানুষ কাউকে পরিত্যাগ করতে পারে না। ব্রাক্ষ্মণ হয়তো শূদ্রকে ত্যাগ করতে পারে কিন্তু মানুষ শূদ্রকে ত্যাগ করতে পারে না। বিদ্যা মূর্খতাকে ত্যাগ করতে পারে কিন্তু মূর্খ বিদ্যাকে পরিত্যাগ করতে পারে না। একজন মানুষ যতক্ষণ ব্রাক্ষ্মণ অথবা শূদ্র, জ্ঞানী অথবা মূর্খ, পিতা অথবা পুত্র, তার বেশি সময় জুড়ে সে মানুষ। আর মানুষ হলে তার কিছুই ত্যাগ করা চলে না। বিশ্বচরাচরে যা কিছু বিদ্যমান তার সবই মানুষের প্রয়োজন। আপনি কি এমন একজন মূর্খ দেখাতে পারেন যে শুধু মূর্খ অথচ মানুষ নয়? যদি সে মানুষ হয় তাহলে অবশ্যই সে বিদ্বান্। কারণ মানুষ বিদ্যাকে পরিত্যাগ করতে পারে না। একজন মূর্খকেও বাঁচতে হলে কোনো না কোনো বিদ্যার আশ্রয় নিতে হয়। পিতা! আমি অভিশপ্ত হতে পারি কিন্তু মূর্খ অবশ্যই বিদ্বান্।"
২)"মানুষ পাখির ভাষা বুঝতে পারে না কিন্তু কোনটা কর্কশ এবং কোনটা মধুর এটুকু বুঝতে পারে। ঠিক সেভাবেই আমাদের জীবনের কর্কশ দিক এবং মাধুর্যের দিক সমানভাবে তুলে ধরতে হবে। মানুষ তখন নিঃসন্দেহে মাধুর্যকে গ্রহণ করতে আগ্রহ বোধ করবে।" "বৈশম্পায়ন, সত্যের সপক্ষে এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হলে সত্যের সঙ্গে মিথ্যার পার্থক্য নিরূপণ করতে হবে। সত্য এবং মিথ্যা উভয়কে সঠিকভাবে চিত্রিত করতে হবে।"
❛জীবনের অর্থ আর উদ্দেশ্য খুঁজতে গেলে দেখা যায় জীবন আসলে ষোলো আনাই ফাঁকি। কর্মের উদ্দেশ্য আর সার্থকতা আদৌ কিসে নিহিত এর উত্তর বেজায় কঠিন। এসবের উত্তর খুঁজতে গেলে মহাকাব্য রচিত হয়ে যায়। তেমনি কারো জন্মও কখনো কখনো মহাকাব্যের রচনার পথ তৈরি করে দেয়।❜
গায়ের রং কালো বলে ধীবরকন্যার নাম ছিল কালী। নৌকায় ব্রাহ্মণ পার করত সে। একদিন পরাশর নামে এক ব্রাহ্মণ কালীর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে কামনা করে। কিন্তু সতী নারী কেমনে সে আশা পূরণ করে? পরাশর তার বিনিময়ে তাকে বর হিসেবে দিবেন এক জ্ঞানী পুত্র। কালী রাজি হয়। ব্রাহ্মণ তার কামনা পূরণ করে।
যথাসময়ে কালীর ঔরসে জন্ম হয় এক পুত্রের। যেহেতু বিয়ের আগে জন্ম নেয়া সন্তান তাই কালী সেই সন্তানকে গোপনে পালন করে। পরাশরের সাথে সে জ্ঞান চর্চা করে। ও হ্যাঁ, সেই সন্তানও কৃষ্ণ বর্ণ। তাই নাম তার কৃষ্ণ। দ্বীপে মানুষ বলে তার নাম হয় কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন। এই সন্তান বড়ো হয়ে পিতার সাথে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। ধীরে ধীরে সে হয়ে ওঠে জ্ঞানী কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসবেদ।
হস্তিনাপুরের রাজা শান্তনু একদিন নদী পার হতে গিয়ে কালীকে দেখে মুগ্ধ হয়। বিয়ে করতে চায় তাকে। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কালীর পিতা বিয়ের এমন এক শর্ত দেয় যা কঠিন। কালীর ঔরসজাত যেন সিংহাসন লাভ করে এই শর্ত মানা শান্তনুর পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ তার নিজের পুত্র দেবব্রত সিংহাসনের উত্তরসূরী। পিতার কামনাকে পূরণ করতে দেবব্রত ত্যাগ করে সিংহাসন এবং কঠিন এক প্রতিজ্ঞা করে। কালী তথা সত্যবতীকে সৎ মা হিসেবে নিয়ে আসে পিতার কাছে। এরপর থেকে লোকে তাকে এরপর থেকে চিনে ভীষ্ম নামে।
সত্যবতীর ঔরসে দুই পুত্র হলেও প্রথমজন মা রা যায়। পরের পুত্র বিচিত্রবীর্য তার দুই স্ত্রী অম্বিকা এবং অম্বালিকাকে রেখে কঠিন রোগে প্রাণ হারায়। হস্তিনাপুরের সিংহাসন তখন পুরুষশুন্য। যেখানে তখন একমাত্র পুরুষ সন্ন্যাসব্রত নেয়া ভীষ্ম। কুরুবংশ টিকিয়ে রাখতে হলে চাই উত্তরাধিকার। কিন্তু প্রতিজ্ঞা নেয়া ভীষ্ম কখনোই তা পূরণ করতে পারবে না।
এখানেই দৃশ্যপটে আসে সত্যবতীর পূর্বের ঔরসজাত ব্যাস। মায়ের কথায় বিচিত্রবীর্যের দুই স্ত্রীর সাথে এবং এক দাসীর সাথে মিলিত হওয়ায় জন্ম নেয় তিন পুত্র। ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু এবং বিদুর। তবে প্রথমজন অন্ধ এবং শেষজন দাসীপুত্র হওয়ায় সিংহাসনে অধীন হয় পাণ্ডু। তবে সেও একসময় মা রা গেলে সিংহাসনের হাল ধরে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র। এদিকে বংশ বৃদ্ধি হয়। ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারীর শত পুত্র হয়। তারা কৌরব নামে পরিচিতি পায়। ওদিকে কুন্তীর পাঁচ পুত্র যাদের আমরা পঞ্চপাণ্ডব নামে চিনি তারা বেড়ে উঠতে থাকে।
সময় গড়িয়ে গেলে ক্ষমতার ল ড়াই, সত্য আর ন্যায়ের যু দ্ধে বিশাল এই বংশ মুখোমুখি হয় কুরুক্ষেত্রের ময়দানে। ময়দানের সেই র ক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দেখতে আসে এদের পূর্বপুরুষ তথা যার মাধ্যমে বিশাল এই বংশের জন্ম তথা ব্যাস।
কুরুক্ষেত্রের ভয়াবহ পরিণতি, পরিবারের লোকের একে অপরের বিরুদ্ধে দন্ডায়মান হওয়া আর লা শের মিছিল দেখে ব্যাস এবং তার সঙ্গীরা নির্বাক হয়ে যায়।
ব্যাস তার সঙ্গীদের নিয়ে যু দ্ধ শেষে পথ চলতে শুরু করে। উদ্দেশ্য নিজের আশ্রম। পথে একে একে তার সঙ্গীরা নিজেদের সমাপ্তি ঘোষণা করলে শেষমেষ রয়ে যায় বৈশম্পায়ন। ব্যাস তার সুদীর্ঘ জীবনের অর্থ আর মানুষের এই ধ্বংসলীলার মানে খুঁজতে থাকে। তার পুরো জীবনই কি বৃথা? জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা কি পুরোটাই ফেলনা হয়ে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে সে তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যেতে থাকেন।
নিজের প্রত্যক্ষ দর্শন, জীবনবোধ আর অভিজ্ঞতা থেকেই রচনা করেন তিনি বিখ্যাত মহাভারত।
ব্যাস এক ব্যক্তি, এক রচনাকার, জীবনবোধের অর্থ সন্ধানের এক দার্শনিক যিনি পৌরাণিক চরিত্র থেকেও বেশি একজন র ক্ত মাংসের মানুষ।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝ব্যাস❞ শাহ্যাদ ফিরদাউসের লেখা উপন্যাস। মহাভারত এক মহাকাব্য। এর রচয়িতা কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসের ব্যক্তিজীবন নিয়ে লেখক এই উপন্যাস সাজিয়েছেন। মহাভারত শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি ধর্মগ্রন্থ হিসেবে সীমাবদ্ধ রয়নি। এটি সাহিত্যের অন্যতম মহাকাব্য। যা সকলেই পাঠ করে।
মাত্র ১২৭ পৃষ্ঠার বইতে লেখক মহাভারতের মতো মহাকাব্যের সাথে এর রচয়িতা জীবনের কাহিনি, চিন্তাধারাগুলোকে এত নিদারুণ দক্ষতায় একত্র করেছেন যে মুগ্ধ হতে হবে।
উপন্যাসটাকে মূলত দুই অংশে দেখা যায়। শুরুতে আসে ব্যাসের জন্মের পূর্বের কাহিনি। তার জন্মের ঘটনা, বেড়ে ওঠা এবং তার মাধ্যমে তৈরি কৌরব, পাণ্ডবদের বংশ এবং বিখ্যাত সেই কুরুক্ষেত্রের যু দ্ধের বর্ণনা।
যদিও লেখক বিশাল কাব্যের কাহিনি বলা যায় ফাস্ট ফরোয়ার্ড স্পিডে বলে গেছেন। তবুও পড়তে খারাপ লাগেনি। লেখকের গল্প বলার নিজস্ব একটা ধরন আছে। যেখানে খুব সাধারণ ঘটনাও কেমন গুরুগম্ভীর এবং দার্শনিক একটা দিক পায়।
পরের অংশে এসেছে কুরুক্ষেত্রের পরে ব্যাসবেদ এবং তার সঙ্গীদের পথ চলা। আমার মনে হয়েছে এই অংশটাই উপন্যাসের মূল প্রাণ। লেখক এখানে নিজস্ব ধারায় ব্যাসের চরিত্রকে সাজিয়েছেন। যেখানে তিনি শুধুই একজন জ্ঞানী সন্ন্যাসী নন। তিনি আপাদমস্তক একজন ব্যক্তি মানুষ যার চিন্তাধারা সবসময় হয়তো সঠিক হয় না। যার মধ্যে দোদুল্যমান অবস্থা বিরাজ করে। যে সন্দিহান জীবন নিয়ে, জীবনের অর্থ নিয়ে। কিংবা নিজের দীর্ঘ জীবনের মর্মার্থ বা সার্থকতা নিয়েও যে প্রশ্ন করে যায়। এই অংশে লেখক দর্শনের প্রশ্ন আর উত্তরের খেলায় ব্যাসের চরিত্রের ভিন্ন এক দিক প্রকাশ করেছেন। যার মধ্যে দ্বিধা ছিল, ছিল সত্য জানার স্পৃহা। যিনি জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চার গভীর অর্থ নিজে বুঝতে চেয়েছেন। নিজের জীবনের আসল অর্থ জানতে চেয়েছেন। ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর ব্যাপারেও যে শিক্ষা খুঁজেছেন। কৈশোর থেকে বয়সের ভারে ন্যুব্জ এক জ্ঞানী তার জীবনের বিভিন্ন পর্যায় পেরিয়ে যখন শেষভাগে আসে তখন নানা প্রশ্ন আর দ্বিধায় জর্জরিত থেকে নিজেকে আসলভাবে খুঁজে পাওয়ার এক গল্প লেখক বলেছেন।
সংক্ষিপ্ত এই বইতে হয়তো পৌরাণিক চরিত্র কিংবা মহাকাব্যিক ব্যাসকে পুরোপুরি জানা যাবে না। তবে লেখকের নিজস্বতায় নতুন এক ব্যাসের সাথে পরিচয় হবে।
লেখকের লেখা এমনিতেই আবার খুবই পছন্দ। ছোটো আকারের বইগুলোর মাঝেও তিনি এমন দর্শন আর বোধের দেখা করিয়ে দেন যে ভাবতে হয়। গভীর অর্থ থাকে সেই ছোট্ট লেখাগুলোর মাঝে। এই বইটাও তেমনি।
আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে পড়তে। লেখকের আপন চিন্তায় পৌরাণিক চরিত্রগুলোকে ছাপোষা র ক্ত মাংসের মানুষ হিসেবে পড়তে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
প্রচ্ছদটা একেবারেই সাধারণ কিন্তু সুন্দর।
সম্পাদনায় কিছুটা ঘাটতি ছিল। টাইপো রয়ে গেছিল।
❛যা কিছু অতিক্রান্ত অতীত অথবা যা কিছু অনাগত ভবিষ্যৎ অথবা যা কিছু দৃষ্ট বর্তমান তার সমতারই কাল-দ্বারা সংঘটিত।❜
বহুদিন পরে কোন একটা বই হাতে নিলাম এবং টানা দুইবেলায় পড়ে শেষ করলাম। বেশ উৎফুল্ল অনূভুতি হচ্ছে। অনেকদি হয় এরকম ছোট কলেবরের ফিকশন বা নন ফিকশন পড়া হচ্ছিল না। বড় কলেবরের বই ধরতাম আর কিছুদুর আগায়ে প্রতিনিয়ত নিয়ে বসবার অভ্যাসের অভাবে আর শেষ করা হচ্ছিল না। এ উপন্যাসটা শুরু করা সে দিক থেকে একটা ভালো সিদ্ধান্ত ছিল।
উপন্যাসটা মহাভারতের রচয়িতা কৃষ্ণদৈপায়ণ ব্যসের জীবনীগ্রন্থ বলা চলে। তবে এত প্রাচীণ এবং এত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রাজ্ঞ একজন ব্যক্তির জীবনীগ্রন্থ ঠিক কত বড় কলেবরের হলে সেটা সেই মানুষটার কিছুটা হলেও ধারণ করতে পারবে সেটা বলা মুশকিল। তাই এই গ্রন্থকে ঠিক কৃষ্ণদৈপায়নের জীবনী না বলে বরং তার জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার এবং সে সকল ঘটনার প্রেক্ষিতে তার জীবন দর্শনের একটা কাল্পনিক চিত্র হিসেবেই ধরা চলে।
একজন লেখক, তা সে ফিকশন রাইটারই হোক বা নন ফিকশন, মানুষ হিসাবে কখনোই তার নিজস্ব বায়াসের উর্ধ্বে উঠে কিছু লিখতে বা করতে পারে না। সে তা যত জ্ঞান লাভ করুক আর যতই জানার চেষ্টা করুক। তবে জ্ঞানের বা জানার মূল ব্যপারটাই এই যে জ্ঞান মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন পরিবর্ধন করতে শেখায়, বুঝতে শেখায় যে তার কথাই শেষ কথা নয়। তাই বলা যায় এই উপন্যাসেও লেখকের নিজস্ব চিন্তাধারাই কৃষ্ণদৈপায়নের মুখের সংলাপ হয়ে লেখার পাতায় উঠে এসেছে। কৃষ্ণদৈপায়ন সারা জীবন জ্ঞানের অন্বেষায়, মানুষকে বোঝার আশায় পথে পথে ঘুরে শেষ বয়েসে এসেও নিজের কাছে প্রশ্ন রাখেন যে, 'জ্ঞানের উদ্দেশ্য কি আসলে? কিসের আশায় আর কিসের তাড়নায় আমি পথে পথে ঘুরছি?' সব প্রশ্নের শেষ উত্তর এসে দাঁড়ায় এই যে, 'the show must go on.' এবং এই জীবন নামক রঙ্গমঞ্চে যার যার দায় ঘাড়ে নিয়ে যার যার দায়িত্ব সম্পাদন করাই হয়ত জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। অথবা উদ্দেশ্য ব্যপারটাই একটা অলীক মরিচীকা।
কাহিনীর বিন্যাস অত সুগঠিত না হলেও বইটার সংলাপের ধরন এবং কথপোকথন গুলো পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগানোর জন্য যথেষ্ট। এবং কোন বই বা লেখাকে তখনই সুলিখিত বলা যায় যখন সেটা পাঠকের মনে প্রশ্ন রেখে যায়। সেদিক থেকে ব্যস অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।
বইটার সবচেয়ে পছন্দের সংলাপটা তুলে দিয়ে রিভিউটা শেষ করছি। এই রিভিউর সকল পাঠকের জন্য বইটা রিকমেন্ডেড থাকল।
"আমি সত্যের দাসত্ব করি না! সত্যের ইচ্ছা হলে আমাকে পরিত্যাগ করতে পারে! মানুষকে সবাই পরিত্যাগ করতে পারে কিন্তু মানুষ কাউকে পরিত্যাগ করতে পারে না। ব্রাক্ষণ হয়তো শূদ্রকে ত্যাগ করতে পারে কিন্তু মানুষ শূদ্রকে ত্যাগ করতে পারে না। বিদ্যা মূর্খতাকে ত্যাগ করতে পারে কিন্তু মূর্খ বিদ্যাকে পরিত্যাগ করতে পারে না। একজন মানুষ যতক্ষণ ব্রাক্ষণ অথবা শূদ্র, জ্ঞানী অথবা মূর্খ, পিতা অথিবা পুত্র, তার বেশি সময় জুড়ে সে মানুষ। আর মানুষ হলে তার কিছুই ত্যাগ করা চলে না। বিশ্বচরাচরে যা কিছু বিদ্যমান তার সবই মানুষের প্রয়োজন। আপনি কি এমন একজন মূর্খ দেখাতে পারেন যে শুধু মূর্খ অথচ মানুষ নয়? যদি সে মানুষ হয় তাহলে অবশ্যই সে বিদ্বান। কারণ মানুষ বিদ্যাকে পরিত্যাগ করতে পারে না। একজন মূর্খকেও বাঁচতে হলে কোন না কোন বিদ্যার আশ্রয় নিতে হয়। পিতা! আমি অভিশপ্ত হতে পারি কিন্তু মূর্খ অবশ্যই বিদ্বান।" - কৃষ্ণদৈপায়ণ
শাহ্যাদ ফিরদাউসের উপন্যাস ‘ব্যাস’ বাংলা সাহিত্যকে নতুন মাত্রা প্রদান করেছে। এই বিশেষ কর্মটি কেবল মহাভারতের স্রষ্টা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের জীবন ও দর্শনের নানান কাহিনী বর্ণনা করে না, বরং পাঠকদের মহাভারতের স্বর্ণালী ইতিহাসের দিকে আরো গভীরতর দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা পাঠকের ভাবনা ও মননকে নতুনভাবে উদ্দীপ্ত করে।
লেখক ইতিহাস এবং কল্পনার সমন্বয়ে ব্যাসের চরিত্রকে অত্যন্ত জীবন্ত করে তুলেছেন। তাঁর গদ্যশৈলী ও ভাষার সুরেলা সংগতি সমগ্র গল্পে একটি স্নিগ্ধতা তৈরি করে, যা পাঠকদের সহজে আকর্ষণ করে এবং উপন্যাসের সংলাপগুলির মাধ্যমে জীবনবোধের গভীরতা উপলব্ধি করতে সহায়তা করে। প্রতিটি প্রশ্ন ও উত্তর শুধুমাত্র কথার আদান-প্রদান নয়, বরং মানব জীবনের জটিলতা এবং দার্শনিক অনুসন্ধানের প্রতিফলন হিসেবে কাজ করে।
এই উপন্যাসটি বিভিন্ন পর্বে বিভক্ত—যেখানে ব্যাসের জন্ম, শিক্ষা, বেদ গবেষণা, মহাভারতের রচনা এবং কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ঘটনাবলি যথাক্রমে বর্ণিত হয়েছে। এই বিশেষ পর্বগুলো পাঠকদের জন্য ব্যাসের অন্তর্দৃষ্টি এবং তার জ্ঞানচর্চার পথ উন্মোচন করে।
‘ব্যাস’ শুধু ইতিহাসের প্রতিফলন নয়, বরং এটি গভীর মানবিক সম্পর্ক, সমাজ ব্যবস্থা এবং আত্মজিজ্ঞাসার প্রশ্নের জগতে প্রবেশ করে। ব্যাস যখন প্রশ্ন করে, “আমি কি কেবল ইতিহাসের প্রতিলিপিকার, না কি সময়ের দায়ে আমি নিজেই এক ইতিহাস?” তখন তিনি মানব জাতির অন্তর্দ্বন্দ্বের দিকে পাঠকদের সজাগ করে তোলেন। এই প্রশ্নগুলো সমস্ত পাঠককে মনে করিয়ে দেয়, যে ইতিহাসের গ্রহণযোগ্যতা কখনোই একপেশে নয়, বরং এটি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়িত হতে পারে।
এই উপন্যাসটির গভীরে সমাহিত আছে আশা ও অন্ধকারের দ্বন্দ্ব। পাঠকদের সামনে জীবনের সুন্দর ও কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের বোঝায়, বেদান্তের মধ্যেও নৈতিক সংগ্রাম এবং মানসিক যন্ত্রণার চিত্র প্রতিফলিত হয়।
অতএব, ‘ব্যাস’ কেবলমাত্র একটি ঐতিহাসিক চরিত্রের জীবনী নয়, বরং এটি মানব আত্মার অসংখ্য কাহিনীর প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে শাহ্যাদ ফিরদাউসের অবদান অনন্তকাল ধরে অমলিন থাকবে।