Living is easy with eyes closed, misunderstanding all you see.
- John Lennon
উপরের কথাটি সম্পূর্ণ প্রযোজ্য ওসমান সাহেরবের স্ত্রী রেণুর ক্ষেত্রে। রেণু হলো সেসব মানুষের মতো যারা তার চারপাশের কিছু মানুষকে খুব ভালোবাসলেও সহজে তাদের ভালোবাসা দিতে জানেন না, সহজে মানুষের ভালোবাসা নিতে জানেন না, যারা নিজেরই তৈরি একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেন নিজের চারদিকে যে দেয়াল ভেদ করে তাকে ভালবাসতে গেলে বার বার ফিরে আসতে হয়, কষ্ট পেতে হয়, সে ও এই দেয়ালের প্রাচীর ভেদ করে তার ভালোভাসা প্রকাশ করতে পারেন না।
পড়ার সময় বারবার মনে হয়েছে, ওসমান সাহেবের মাঝে কি লেখক নিজেকে আঁকার চেষ্টা করেছেন? হয়তো করেছেন অথবা করেন নি অথবা আংশিক করেছেন। করুক বা না করুক পাঠক হিসেবে সেটা আমার বা আপনার জন্য খুব একটা জরুরী বিষয় নয়। গল্পের ওসমান সাহেব একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক যিনি রাইটার্স ব্লক এ আছেন। কোন কিছুই লিখতে পারছেন না। খুবই যৌক্তিক মানুষ ওসমান সাহেব; সহজে রাগেন না বা উত্তেজিত হন না, জীবনের সুখ দুঃখ সবকিছুকে অতিরিক্ত উৎসাহ ছাড়া সাদামাটাভাবে গ্রহণ করার একটা স্বাভাবিক স্বভাব তার রয়েছে। নিজের আবেগকে খুব বেশি প্রশ্রয় দেন না অথবা দেওয়ার চেষ্টা করেন না, চারপাশের মানুষের আবেগকে খুব ভালো বোঝেন কিন্তু সেই আবেগগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন তিনি করেন না অথবা করতে চান কিন্তু কোন কারনে করা হয় না অথবা নিজের আবেগের মূল্যায়ন না দিতে দিতে অন্য সকলের আবেগকে মূল্যায়ন দিতে তিনি ভুলে যান অথবা ভুলে না গিয়ে থাকলেও অনিচ্ছায় দেওয়া হয় না। নিজের একাকীত্বকে ভোগ করার একটা চমৎকার গুণ ওসমান সাহেরবের আছে যা বেশিরভাগ মানুষের মাঝেই পাওয়া যায় না। ওসমান সাহেরবের চরিত্রটা আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে কারণ আমার নিজের সাথে ওসমান সাহেবের অনেক কিছু মিলে যাচ্ছিলো।
গল্পের একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মিলি। কথায় কথায় মিথ্যা বলার একটি বিরক্তিকর স্বভাব সে রপ্ত করে ফেলেছে। মিথ্যা বলতে পারাটা একটা শিল্প, যেসকল মানুষ মিথ্যা বলতে পারে কিন্তু অন্য মানুষ তাদের মিথ্যা ধরতে পারেন না তারা খুব উঁচু মানের শিল্পি বলে আমার বিশ্বাস। মিথ্যা নিয়ে Friedrich Nietzsche এর একটা চমৎকার কোট আছেঃ I'm not upset that you lied to me, I'm upset that from now on I can't believe you. কথাটি সম্পুর্ণ প্রযোজ্য মিলির ক্ষেত্রে। তাকে কেউ বিশ্বাস করেনা, কারন সবাই জানে সে মিথ্যা বলে। মানুষ মিথ্যা বলে কেন? আমি নিজে নিজেকে এই কথা অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি। মানুষের মিথ্যা বোঝার পর চিন্তা করেছি, অবশেষে তিনটা কারণ খুঁজে পেয়েছি।
১। মানুষ ভয়ে মিথ্যা বলে। বড় বা ছোট সবাই ভয়ে মিথ্যা বলে বা প্রয়োজন বোধ করে।
২। মানুষ ভালোবাসা পাওয়ার জন্য মিথ্যা বলে। বাচ্চারা এটা করে বেশিরভাগ সময়। কিছু কিছু মানুষের মাঝে ভালোবাসা পাওয়ার একটা তীব্র ইচ্ছা বড় হওয়ার পরও রয়ে যায়, তখনও তারা মিথ্যা বলে, মিথ্যা বলে ভালোবাসা পেতে চায়।
৩। আরেক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা এমনি এমনি মিথ্যা বলে, কোন কারণ নেই। স্বভাবে এসে গেছে তাই মিথ্যা বলে, কেন বলে তারা নিজেরাও জানেন না।
গল্পের মিলি হলো দ্বিতীয় শ্রেণীর মিথ্যুক। ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ার পর কঠিন স্বভাবের বাবার কাছ থেকে খুব বেশি ভালোবাসা সে পায়নি। বড় ভাই ওসমান সাহবের কথা আগেই বলা হয়েছে, যিনি তার চারপাশের মানুষের আবেগ অনুভূতিকে খুব বেশি প্রশ্রয় দেন না। তিনি মিলির আবেগকেও প্রশ্রয় দেন নি। ফলে মিলি বড়ো হয়েছে শূন্যতায়, মিলি বড়ো হয়েছে অভালোবাসায়। আর তাই ভালোবাসা পাওয়ার তাগিদে, ভালোবাসার কাঙ্গাল হয়ে সে মিথ্যা বলার পথ বেছে নেয়। কিন্তু মিথ্যা বলার জন্য যতটা বুদ্ধিমতী আর চালাক হওয়া প্রয়োজন হয় মিলি ততটা বুদ্ধিমতী নন, ফলে তার মিথ্যা সবাই ধরে ফেলে এবং এটা হয়ে দাঁড়ায় ভালোবাসা না পাওয়ার আরেকটি কারণ।
বেচে থাকার কারণ হিসেবে একেক মানুষ একেক ধরণের জিনিস আঁকড়ে ধরে, কেউ কাউকে ভালোবাসার মাঝে জীবনের অর্থ খুঁজে পান, কেউ কারো ভালোবাসা পাওয়ার মাঝে জীবনের অর্থ খুঁজে পান, কেউ তার কোন কাজের মাঝে জীবনের অর্থ খুঁজে পান, কেউ কেউ কখনো জীবনের অর্থ খোঁজার অবসর পান না, জীবনকে টিকিয়ে রাখতে রাখতে কখনো তাদের মনে এই প্রশ্ন আসে না যে, জীবনের কোন অর্থ আছে বা অর্থ থাকার প্রয়োজন আছে। মিলি হলো সেসব মানুষের মতো যারা জীবনের অর্থ খুঁজে পান ভালোবাসা পাওয়ার মাঝে। এ ধরণের মানুষেরা ভালোবাসা না পেলে জীবনের প্রয়োজন হাড়িয়ে ফেলেন, মিলিও হাড়িয়ে ফেলেছিলো।
আরও বলা যায় অপলার কথা। তরল ভালোবাসায় পূর্ণ এক যুবতী। আমার মনে হয় পৃথিবীতে যদি বিশুদ্ধ প্রেম বলতে কিছু থাকে তাহলে সেটা একমাত্র টিনেজ মেয়েদের মনে থাকে। ওসমান সাহেবের শালী অপলা ওসমান সাহেবের প্রেমে পড়েন। বিশুদ্ধ প্রেম। এ প্রেমের সমাপ্তি বিচ্ছেদে, তবুও এ প্রেম সুন্দর। হয়তো পৃথিবীর সমস্ত বিচ্ছেদের প্রেমই সুন্দর। হুমায়ূন আহমেদেরই কোন বইএ মনে হয় পড়েছিলাম, টিনেজ মেয়েদের প্রথম প্রেম বেশিরভাগ সময়ই ভুল প্রেম হয়। অপলার ক্ষেত্রেও তাই হলো।
বইয়ের কিছু ভালো লাগা লাইনঃ
“যেখানে নিজের মনকে কখনো জানা যায় না, সেখানে অন্যের মন জানার প্রশ্নই ওঠে না।”
“শহুরে জোছনা পুরোনো দুঃখের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।”
“কিছু কিছু মানুষ সারাজীবন ভুল করার জন্য জন্মায়।”
“মানুষের জীবন বাধা পরবার নয় কিন্তু এ জীবনকে বাধার জন্যই মানুষের অনেক আয়োজন।”
“কোন একটা বিশেষ কিছুর জন্য মানুষ দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে পারে না। মানুষ প্রতিবারই নতুন কিছুর জন্য প্রতীক্ষা করে।”
“অক্ষমতা স্বীকার না করাটাও একটা অহংকার।”
“কোন মানুষই তার প্রতিভার বাইরে যেতে পারে না।”
“পুরুষদের আহত করার কৌশল মেয়েরা খুব তাড়াতাড়ি শিখে ফেলে এবং তা ব্যবহারও করে খুব চমৎকারভাবে।”
“কোন প্রিয়জন হঠাৎ করে অনেক দূরে চলে গেলে তার কথা বারবার মনে পড়ে।”
“মনের কথা প্রায় কোনো সময় বলা যায় না। বলা গেলে সংসারের জটিলতা কমত। কিন্তু সংসার জটিলতা পছন্দ করে।”
“সুখের উপকরণ চারদিকে ছড়ানো থাকে। আমরা প্রায় সময়ই তা বুঝতে পারি না! হঠাৎ এক সময় তার দেখা পাই এবং অভিভূত হয়ে পড়ি।”
“গাছের যৌবন বার বার ফিরে আসে, কিন্তু মানুষের যৌবন মাত্র একবার।”
“মাঝে মাঝে খুব কাছের মানুষও খুব অস্পষ্ট হয়ে যায়।”
“জীবজগতে মানুষ হচ্ছে একমাত্র প্রণী যে একা থাকতে পারে। অন্য কোনো প্রাণী পারে না। তাদের সঙ্গী বা সঙ্গীনী প্রয়োজন, তবে মানুষ অসাধারণ কল্পনা শক্তির অধিকারী বলেই সে নিঃসঙ্গ সময়টায় সঙ্গী কল্পনা করে নেয় এবং এক সময় একা থাকাটা তার অভ্যাস হয়ে যায়।”
“একজন মানুষ সমগ্র জীবনে অল্প কয়েকজন ভালো মানুষের সাক্ষাৎ পায় যারা তার উপর অসাধারণ প্রভাব ফেলে।”
“তীব্র ও তীক্ষ্ণ আনন্দের মুহূর্ত একজন মানুষের জীবনে বার বার আসে না।”
বই পড়ে আমার নিজের কিছু অনুভূতি তৈরি হয়েছেঃ
“এ পৃথিবীতে সুন্দরতম জিনিষগুলোর মাঝে একটা হলো প্রেমে পড়া কিশোরীর চোখ।”
“প্রেমে পড়া কিশোরীরা সব সময় পৃথিবীর সব কিছুর প্রতি একটা চাপা অভিমান বুকে নিয়ে ঘুরে।”
“মাঝে মাঝে আমরা অসম্ভব সুন্দর কিছু জিনিস দেখি, যেগুলো দেখার পর সেগুলো বাস্তব বলে মেনে নিতে কষ্ট হয়, মনে হয় যেনো কোন স্বপ্ন দেখছি, মনে হয় যেনো সব কল্পনা; চোখ খুললেই সব হাড়িয়ে যাবে, চোখ খুললেই সব মিথ্যা হয়ে যাবে, চোখ খুললেই সব কিছু ফিরে আসবে-জীবনের অসুন্দর সব কিছু।”