"অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে প্রথমে কিছু দেখা যায় না। তারপর আস্তে আস্তে সব অবয়ব পরিস্কার হয়ে আসে। জীবনটাও মনে হয় এরকম। গভীর মনােযােগে না তাকালে সবকিছু অস্পষ্ট লাগে।"
'জনারণ্যে একা কয়েকজন' বইটাতে কয়েকজন মানুষের গল্প বলা হয়েছে যারা জন অরণ্যে থেকেও বাস্তবিকই একা। আচ্ছা আপনাদের কারো কখনো এমন হয়েছে যে, হাজার মানুষের ভিরে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন, সবাই আপনার পরিচিত, কিন্তু মনে হচ্ছে আসলে আপনি একা? জীবনের কোনো এক সময় প্রায় সব মানুষের জীবনেই এমন পরিস্থিতি আসে। কেউ একাকীত্ব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে, কেউ হয়তো টেরই পায় না। অনেকে হয়তো ডিপ্রেশনে আত্মহত্যাও করে। আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছে যাদের কারো সাথে কোনো প্রেমের সম্পর্ক নেই, পড়ালেখায়ও ভালো, বাবা মায়ের টাকা পয়সারও অভাব নেই, কিন্তু হুট করে আত্মহত্যা করে বসে। আমরা বাইরে থেকে ভাবি ছেলেটা তো ছ্যাকা খায়নি, টাকা পয়সারও অভাব নেই, বাবা মায়েরও কোনো সমস্যা নেই, তারপরও কেন আত্মহত্যা করলো? নিশ্চয় কোনো কুকর্ম করেছে। একবারও ভাবি না ছেলেটা এত কিছুর ভিড়েও একা থাকতে পারে, একাকীত্ব তিলে তিলে শেষ করে দিতে পারে। না, এসব আমরা ভাবি না, এসব ভাবার সময় আমাদের নেই। আসলে আমরা নিজেদের বাইরে কাউকে নিয়ে ভাবতে পছন্দ করি না।
আসিফ ঢাকায় একটা বাসায় সাবলেট থাকে। আফরোজা এবং মঞ্জুরের ছোট্ট সংসার। সুমি নামের একটা ফুটফুটে মেয়েও আছে তাদের। হুট করে চাকরি ছেড়ে দেয়ায় বাসা ভাড়া এবং সংসারের খরচ কমাতে আফরোজার ছোটভাইয়ের সাথে সাবলেট হিসেবে আসিফকে উঠায়। অল্প কয়দিনেই আকবরের বন্ধু হয়ে যায় আসিফ। আকবরের বোন দুলাভাইকেও নিজের বোন দুলাভাই মনে করে। আসিফ এমন ���কটা ছেলে যাকে দূর থেকে দেখে বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপের কথা মনে হয়। যে দ্বীপে কেউ বসবাস করে না। মাছ ধরা নৌকাও এড়িয়ে চলে।
আসিফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ভার্সিটিতে ওর বন্ধুবান্ধব একদম কম। যেকয়জন ক্লোজ তারা হয়তো ওকে ভালোভাবে চিনে বলেই ওর সাথে মেশে। তাদের মধ্যে নায়লা মেয়েটাকে মনে মনে পছন্দ করে আসিফ। হাবভাবে বোঝা যায় নায়লাও ওকে পছন্দ করে। সুমনা আর পলি সারাক্ষণ আছে পড়াশুনা আর হিন্দি সিরিয়াল নিয়ে। কামাল তো পড়াশুনার বাইরে কথা বলতেও নারাজ। তাদের মধ্যে একজন ব্যতিক্রম, যার সাথে আসিফের ভালো জমে। সে হলো শাহেদ। মাস তিনেক পর পর আসিফ একদিন শাহদের হলে সার রাত থাকে, নিষিদ্ধ আনন্দ উপভোগ করে।
নায়লার বড়বোন শায়লা অসুস্থ, সারাদিন কাটে বিছানাতেই। একবার বোনম্যারো ট্রান্সফার করা হয়েছিল, কী এক জটিলতায় আবার নাকি অপারেশন করতে হবে। সারাদিন ভার্সিটিতে মেতে থাকার চেষ্টা করলেও বাসায় আসলেই বিষণ্ণতা চেপে বসে।
আর আকবর আছে রাজনীতি নিয়ে। ওর বিশ্বাস ভালো কোনো নেতার শেল্টার পেলে ও অনেক উপরে উঠতে পারবে। একজনকে পছন্দ করে, যার জন্য যে কাউকে খুন করতেও দ্বিধা নেই কোনো।
এইযে এখানে অনেকগুলো চরিত্রের কথা বললাম এদের কেউই এখানে মূখ্য নয় আবার কেউই গৌণ নয়। মনে হতে পারে গল্পটা আসিফের, আবার মনে হবে গল্পটা আসলে আকবরের, কিংবা শাহেদের কিংবা নায়লার। এমনকি কামাল কিংবা সুমনার। লেখক প্রত্যেকটা চরিত্র এমনভাবে গঠন করেছেন, কোনো চরিত্রকেই দুর্বল ভাবতে পারবেন না আপনি। এই গল্পে একক কোনো নায়ক নেই। প্রত্যেকেই তার নিজ গল্পের নায়ক।
গল্পটা শুরু থেকেই একদম সাদামাটাভাবে এগিয়েছে, শেষও হয়েছে সাদামাটাভাবেই। বইটা লেখক উৎসর্গ করেছেন নিজেকেই, এ থেকে বোঝা যায় এই বইটি তার বইগুলোর মধ্যে প্রিয় বই। কোনো এক কথা প্রসঙ্গে আমাকেও বলেছিলেন এই বইটা বিশেষ করে পড়ার জন্য। আমি যেহেতু থ্রিলার পড়ে অভ্যস্ত তাই কোনো একটা গুরুতর পরিস্থিতি না আসা পর্যন্ত ঠিক যুৎ পাচ্ছিলাম না। সেইদিক হিসেব করলে এই বইয়ে সেরকম পরিস্থিতি আসতে অনেক সময় লেগেছে এবং বইয়ে পুরোপুরিভাবে ঢুকে যেতে আমারও সময় লেগেছে। তবে একবার ঢুকে যাওয়ার পর শেষ না করে বের হওয়ার আর সুযোগ পাইনি।
শরীফুল হাসানের লেখার হাত যে কেমন সেটার প্রমাণ তো আপনারা সাম্ভালা, রাত্রি শেষের গান, আঁধারের যাত্রী যারা পড়েছেন তারা জানেনই। উনি যেমন দুর্দান্ত ফ্যান্টাসি থ্রিলার লিখতে পারেন তেমনি সামাজিক গল্পও লিখতে পারেন। সেসব গল্পে সমাজের বিভিন্ন অসংগতির সাথে সাথে থ্রিলারের উপাদান থাকে বলে অনেকেই সেটাকে সামাজিক থ্রিলারও বলে থাকেন। তবে এই বইটাতে অন্যান্য বইগুলোর মত থ্রিলারের উপাদান বলতে গেলে ছিলই না, সেক্ষেত্রে আমি এটাকে সামাজিক থ্রিলার না বলে বরং সমসাময়িক গল্প বলব।
এই বইটা আমার কাছে ভালো লেগেছে। কিন্তু লেখকের অন্যান্য বইয়ের তুলনায় দুর্বল লেগেছে অনেক। হতে পারে কোনো কারণে এটা লেখকের প্রিয় বই, কিন্তু আমি তার মত করে বইটাকে প্রিয় করতে পারিনি। আমার কাছে বরং ছায়া সময় কিংবা রাত্রী শেষের গান এর থেকে অনেক ভালো লেগেছে। আর সাম্ভালার সাথে তো তুলনাই চলে না।
বাতিঘরের অন্যান্য বইয়ের তুলনায় এই বইয়ের বাইন্ডিং খুবই দুর্বল। চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী বানান ভুল এবং টাইপিং মিস্টেক তো আছেই, এমনকি কয়েক জায়গায় চরিত্রের নামই বদলে গেছে। এটা বেশিরভাগ হয়েছে মঞ্জুরের ক্ষেত্রে। একবার তাকে সোহেল বলা হয়েছে আবার তাকে আসিফ বলা হয়েছে। আশা করব পরবর্তী সংস্করণে যেন এই বিষয়গুলো দেখা হয়।
আপনি যদি কখনো, এক মুহূর্তের জন্য এই জন অরণ্যে একা অনুভব করে থাকেন তবে এই বইটা আপনার জন্য। হ্যাপি রিডিং...