❛চারদিকে হাহাকার সব হাভাত
অভাব শুধু এক থালা ভাত!❜
সাদা মেঘের মতো এক থালা গরম ভাতের সাথে মাংস ভুনা, একটু কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ আর সাথে ডিম ভাজি হলে খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা যায়। আহ কি সুস্বাদু!
❛ভাত দে❜ সিনেমার কথা মনে আছে? অল্প একটু ভাতের জন্য কী কষ্ট, ত্যাগ আর হাহাকার ছিল! ভাতের কষ্ট বড়ো কষ্ট। দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের জন্য মানুষের ছুটে চলা, কত সংগ্রাম!
মেহেরজান, অপূর্ব এক রমণী। দেখলে বয়স বোঝা যায় না। বিশাল বাড়িতে তার সঙ্গী দুটো সারমেয় আর দারোয়ান আবেদ আলী। রাতের বেলা গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বের হয় সে। সাথে বক্স ভর্তি করে খাবার। রাস্তায় ঠাঁই করে নেয়া অসহায় মানুষগুলোর মুখে মাঝেমাঝে সে খাবার তুলে দেয়। কেউ যদি ভাত চায় তবে মেহেরজান না করতে পারে না। গাড়ির দরজায় টোকা দিয়ে শিশুরা যদি বলে,
❛ভাত খামু❜, তবে মেহেরজানের কী জানি হয়ে যায়! না করতে পারে না। বাড়ি নিয়ে এসে খাওয়ায় যত্ন করে। এটাই তার নেশা। এরপর?
নয় বছর আগের এক বিভৎস হ ত্যাকাণ্ড। স্বামী আর অন্ধ স্ত্রীর জোড়া খু ন। পুরো শরীর ঠিক আছে কিন্তু মাথা দুটো একেবারে ভর্তা। পিবিআই দক্ষিণের এসআই শাকিল আবার এই পুরোনো কেসের খাতা খুলে। এবার ধরতে পারে খু নের আসামিকে। নাম সেলিম। কিন্তু এই চেহারা সুরতের লোক কীভাবে এই কর্ম করলো সে এক বিস্ময়। যাই হোক, বান্দা এক জিনিস। শাকিল সহ তার দলকে ধরা পড়ার পরেও অদ্ভুতভাবে ঘোল খাইয়ে রাখছে। ঘোল খেয়ে হলেও শাকিল শুনবে সেলিমের খু ন করার পিছনের ঘটনা।
মুতাওয়ার মনে প্রাণে কবি। কবি হওয়ার জন্যে সেই কোন কালে ঘর ছেড়েছিল। ভেবেছিল কবিতাই তার জীবন। কবি হয়েই সে জীবনের কয়টা দিন পার করে দিবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কবি হলেও আশানুরূপ সাড়া ফেলতে পারেনি তার ছন্দ। লোকে আজকাল কবিতা গিলে না। প্রকাশক বললেন উপন্যাস ফাঁদতে। কিন্তু র ক্তে যার কবিতার নাচন, সে কী করে কল্পিত জীবনের গল্প লিখবে?
বাপ-মা ছেড়ে প্রেমের টানে কুদ্দুসকে নিয়ে ভেগেছিল আমেনা। সুখের সন্ধানে পেতেছিল সংসার। কিন্তু জামাইটা জুতের না। ভালবাসে তাকে, নেই কোনো মেয়ের দোষ। কিন্তু আছে এক নেশা। কত থানা পুলিশ হলো কিন্তু এই নেশা কমে না।
ফ্লাইওভারের নিচে একদল টোকাই থাকে। দ স্যিপনা, টুকটাক কাজ আর চেয়ে খেয়েই যাদের জীবন চলছে। এদের প্রতি মুতাওয়ারের ভীষণ মায়া। হয়তো তাদের মধ্যে নিজের অসহায়তা খুঁজে পায় সে। এদের মধ্যে হাফসা নামের একটি মেয়ে দিন দুয়েক ধরে নিখোঁজ। কোথায় গেল?
সৎমায়ের সাথে রাগ করে শাহানা ঘর ছেড়েছে। পিতা আজিজ মিয়া হন্যে হয়ে খুঁজছে মেয়েকে। হদিস নেই। যেন মেয়েটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। তাকে খুঁজতে সরব হয়েছে গোলাম গনি।
শহরে গত কয়েক বছরে নিখোঁজ হয়েছে বেশকিছু শিশু। যাদের প্রায় সকলের বয়সই ১৪ এর আশেপাশে। কমবেশি হতে পারে। এদের সকলেই পথশিশু, যাদের পরিচয় নেই, সহায় সম্বল নেই। হারিয়ে গেলে খোঁজ করার, অপেক্ষা করার কেউ নেই। এদের মধ্যে কয়জন ফিরে এলেও সংখ্যাটা কম। কোথায় হারিয়ে গেল শিশুগুলো?
সে অতীত মনে করে দুঃখ পায়। বিধাতা যেন তার জীবনে সুখ দিলো না। সুখের নাগাল পেতে না পেতেই কেমন করে অশান্তির বাতাস ঝাঁপটা দিয়ে সব তছনছ করে দেয়। অসম্ভব দুঃখ গ্রাস করে তাকে। এরপর কী যে হলো। নেশা উঠলো, শোণিতের নেশা!
গান শুনতে শুনতে কিংবা কবিতা মনে করতে করতে সে ভিক্টিমের দেহ থেকে চামড়া আলাদা করে, মাংস কাটে, র ক্ত মেখে বসে থাকে। কী যে শান্তি লাগে তখন! বাঁচার আহাজারি, হাড় কোপানোর শব্দে যেন শরীরে শিহরণ বয়ে যায় তার। সে তো কষ্ট দিচ্ছে না। বরং কষ্টের জীবন থেকে মুক্তি দিচ্ছে!
এরপর সে রান্না করে। কেউ কখনো খেয়ে খারাপ বলেনি। শুধুমাত্র যে রাফসান চৌধুরীই রান্না ভালো করে এমন না! রান্নাটা ভালো সেও করে। মানুষকে খাইয়ে, খেতে দেখে তৃপ্তি পায়। যেন এক প্লেট শিউলি ফুলের ভাত খাচ্ছে সামনে বসা মানুষটি! এর থেকে সুন্দর দৃশ্য আর হতে পারে?
শাহানা নিখোঁজ হওয়ার আগে শাহবাগ থেকে বিক্রির উদ্দেশ্যে গোলাপ আর শিউলি ফুল কিনেছিল। কোথায় গেল সে?
নিখোঁজ হওয়া বাচ্চাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে জানতে পিবিআই অফিসার দুর্জয় শাকিল যোগ দিয়েছে গোলাম গনির সাথে। কিছু ফুটেজ আছে, যাচাই বাছাই চলছে। এরই মাঝে নিখোঁজ হয় আরেকটি ফুটফুটে মেয়ে। কিছু হওয়ার আগেই কি তাকে পাওয়া যাবে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝শিউলি ফুলের ভাত❞ মনোয়ারুল ইসলামের সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ধাঁচের উপন্যাস।
লেখকের ক্রমিক খু নি ধাঁচের লেখা পড়েছি আগে। সাথে মানুষের মনস্তত্ত্বের মিশেলে পূর্ব থ্রিলারগুলো সাজিয়েছেন তিনি। এই উপন্যাসটিও সাইকোলজিক্যাল ধারার। এখন পর্যন্ত লেখকের লেখা দীর্ঘ উপন্যাস এটি।
শুরুটা আমার কাছে একটু ধীর গতির লেগেছে। গল্প, চরিত্র সাজাতে একটু সময় নিয়েছেন লেখক। অতীত, বর্তমানের ঘটনা গল্পের মাঝে এসেছে। কাহিনির বিন্যাসে একেক সময় প্রাধান্য পেয়েছে অতীত। এক ঘটনা থেকে আরেক ঘটনায় মুভ হয়েছে দ্রুত। তবে সেখানে সামঞ্জস্য ছিল, ভালো লেগেছে ব্যাপারটা।
এবারের খু নি বা আসামির ঘটনা এসেছে ভিন্ন ভাবে। একজন ধরা পড়েছে। সে নানাভাবে তদন্ত কর্মকর্তাদের যাতনা দিয়ে যাচ্ছে।
আর আরেকজন?
সে একেবারে ফাটিয়ে দিচ্ছে! তার বর্ণনা পড়ে মায়া হয়েছে, কখনো কোমল লেগেছে। আবার তার কর্ম একেবারে ভয়াবহ আকার দেখিয়েছে। খু নের এই বিভৎসতাকে দারুণ বলব, না-কি ভয়ানক বলব? কোমল মুড থেকে সাইকো মুডের টার্ন ছিল অসাধারণ।
এবারের হ ন্তারক শুধু র ক্তের হোলি খেলে না। একেবারে রান্না করে সুস্বাদু করে। ভুনা মাংস, পুডিং, স্যুপ ওরে মা গো! মুখরোচক খাবার তৈরি করে ফেলে আশরাফুল মাখলুকাত দিয়ে।
উপন্যাসে জায়গায় জায়গায় থ্রিল ছিল না। টুইস্ট টার্নও একেবারে পাতায় পাতায় নেই। কিন্তু পড়তে বেশ লেগেছে। বিভৎসতার বর্ণনা দিয়েছেন লেখক নিখুঁতভাবে। চোর পুলিশের খেলা সেভাবে ছিল না। আমাদের খু নি এসব নিয়ে কোনো ভয়ই পায়নি। কারণ তার সিস্টেম আলাদা।
তবে আমি পড়ার আগে একটু চিন্তায় ছিলাম খু নোখু নি সহ্য করতে পারবো নাকি! তবে আমার কাছে তেমন বিভৎস লাগেনি (কেয়া পাতা আমিও পা গল হয়ে যাচ্ছি নাকি!)।
উপন্যাসের সবথেকে ভালো লেগেছে সমাজের অসামঞ্জস্য বিষয়গুলোকে লেখক তুলে ধরেছেন। সমাজে অবহেলিত, অসহায় মানুষগুলোর জীবনের কথা, তাদের জন্য সমাজের তেমন কিছুই আসে যায় না। বিশেষ করে পথশিশুদের অনিশ্চিত বয়ে চলা জীবনের বর্ণনা লেখক দিয়েছেন দারুণভাবে। ঘটনাগুলোর স্থান আমার চেনা পরিচিত খুব, তাই দৃশ্যগুলো কল্পনা করতে অসুবিধা হয়নি।
ছোটবেলার ঘটনা মানুষের জীবনে কী রকম প্রভাব ফেলে আর সেই প্রভাব যে একটা সাধারণ মানুষকে অস্বাভাবিক, অসুস্থ করে তুলতে পারে এই বিষয়টা মোটাদাগে দেখিয়েছেন। একটা সুন্দর জীবনের জন্য একটা সুন্দর পরিবার, স্বাভাবিক পরিবার দরকার।
মানুষ সুখের আশায় চাতকপাখির মতো অপেক্ষা করে। কিন্তু বাস্তবতার গ্রাসে সে অপেক্ষা ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়। আর সেই অভিজ্ঞতা তাকে কখনো সাইকো করে তুলে।
ঘটনা অনেক জায়গায় মোড় নিয়েছে। তবে কিছু জায়গায় আমার একটু কনফিউসড লেগেছে। যেমন আরিফ কী করে সন্দেহ করল, ব্যাপারটা সেটা বুঝতে পারিনি।
এর আগের থ্রিলার গুলোতে লেখক হুদাই কুকুর মে রে ফেলতেন। এবার তাদের প্রতি সদয় হয়েছেন।
মানুষের মনের অদ্ভুত খেয়াল, আশা, জিঘাংসা মানুষকে যে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে সেটা নাগাল পাওয়া মুশকিল!
চরিত্র:
মেহেরজান!
আমার দারুণ লেগেছে। তার সবকিছুই ভালো লেগেছে। লেখক আগের বইয়ের টানা অভিযোগ এবার ঘুচিয়েছেন। আর এটাই সবথেকে ভালো লেগেছে। মেহেরজানের অতীত, বর্তমান সবকিছু নির্দিষ্ট সময় নিয়ে পরতে পরতে সাজিয়েছেন। শেষের আগে দিয়ে ভালোই ধাক্কা লেগেছে। উপন্যাসের নামের সাথে মিলটা ভালো হয়েছে।
দুর্জয় শাকিল আগের থেকে এখানে পরিপক্ক হয়েছে। তার তদন্ত প্রক্রিয়া ভালো লেগেছে। তবে তাকে আমি আরো তুখোড় আশা করি।
সেলিম চরিত্রটা পিকুলিয়ার লেগেছে। এর সাথে অতীতের সংযোগ ভালো ছিল।
আবেদ আলীকেও লেখক ভালো স্পেস দিয়েছেন। কাহিনির খাতিরে এদের সকলের অতীত এবং বর্তমানের সুতো মিলিয়েছেন বেশ ভালো ভাবে।
উপন্যাসের শেষে দিকে এসে ❛দুনিয়া গোল❜ এটা আবার প্রমাণিত হয়েছে। শেষে সব কিছুর সুতা একদিকে এসেছে।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
বইটার প্রচ্ছদ ভালোই লেগেছে। নামলিপিটা পুরোনো দিনের একটা ভাইব দেয়।
অন্যধারার সম্পাদনায় আরো মনোযোগী হওয়া উচিত। মুদ্রণ প্রমাদ, বানান ভুল, ই/য় এর কিছুক্ষেত্রে সমস্যা, শব্দের সমস্যা লক্ষণীয় মাত্রায় ছিল। এদিকে আরো যত্নশীল হওয়া উচিত।
❛একটু শিউলি ফুলের ভাতের উপর যদি র ক্তের ফোঁটা টপাটপ টপাটপ পড়তে থাকে সে ভাতের স্বাদ কি বাড়ে?❜