#রিভিউ - #বইমেলা_২০২০
তিনি সপ্তাহে সাত দিন সাতটি স্বপ্ন দেখেন। বীভৎস, ভয়ংকর, ছটফট করে ঘুম ভাঙ্গাতে চাওয়া সব স্বপ্ন! আশ্চর্য ব্যাপার, পরের সপ্তাহে সেই একই স্বপ্নগুলো আবারও দেখেন, একই ক্রমানুসারে।
আহমেদ করিম চোখ বন্ধ করে লোকটির সমস্যা শুনলেন। সমস্যা শোনাই তার পেশা, আহমেদ করিম একজন মনোবিজ্ঞানী। মানুষ হিসেবে খুবই বিরক্তিকর, সহকর্মীর সাথে ঝগড়ার জের ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজির শিক্ষক পদটি হারিয়েছেন। নিকট লোক বলতে রয়েছে শুধু সোহেল, সে-ও একই বিভাগে নতুন যোগ দিয়েছে। সন্ধ্যার পর আহমেদ করিমের চেম্বারে বসে গল্পগুজব করে, তার নানারকম খারাপ ব্যবহার স্বত্ত্বেও।
চৌধুরী আজিজুল গণি ময়মনসিংহের নেত্রকোনা অঞ্চলের নামকরা পরিবারের সন্তান। স্ত্রী মারা গেছেন চার বছর হলো, একমাত্র মেয়ে এষাকে রেখে। আজিজুল গণির মতে, এষা ঠিক স্বাভাবিক নয়, বিশেষ কোনো ক্ষমতা আছে তার।
আহমেদ করিম ও সোহেল নেত্রকোনায় হাজির হলেন আজিজুল গণির আমন্ত্রণে। বৃষ্টিতে ভেজা বিশাল পুরনো একটি কাঠের দোতলা বাড়ি। তারপাশেই নতুন একটি ইঁটের দালান। স্যাঁতস্যাতে বাড়িটার যেন কিছু একটা ঠিক নেই। লম্বা থামগুলোর আশেপাশে মনে হচ্ছে লুকিয়ে আছে কালো কালো ছায়া। মনে হচ্ছে চারপাশ থেকে কারা যেন সব দেখছে। কুয়োর মুখটা পাথরের ভারী স্ল্যাব দিয়ে আটকানো। উঠোনে সবুজ শাড়ি পরে নিশ্চল, অপলক দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে।
আজিজুল গণি তাদের চিনতে পারলেন না, তিনি ক'মাসের মধ্যে ঢাকাই যাননি! আহমেদ করিম জানতে পারলেন, যে লোকটি স্বপ্ন-সমস্যা নিয়ে তার কাছে গিয়েছিল সে ট্রেনের নীচে পরে মারা গিয়েছে, পরিচয়পত্র বলছে তার নাম সুবোধ বসাক। তাহলে একই চেহারায় যে লোকটি চৌধুরী মঞ্জিলের বৈঠকখানায় বসে রয়েছে, সে কে? এষা আহমেদ করিমকে যা দেখালো সেসব কি সত্যি?
সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নেই, জানতেন না আহমেদ করিম। বিশেষ করে সেইসব প্রশ্নের, যার উত্তর প্রোথিত আছে এক অভিশপ্ত বংশের ইতিহাসে।
কিছু বই আছে, কোনোরকম চিন্তাভাবনা ছাড়াই ঠিক করে নেওয়া যায় - এটা পড়তেই হবে। 'রূপকুমারী ও স্বপ্নকুহক'র ব্যাপারটাও ছিল তেমন। বইটি প্রি অর্ডারের পর বিভিন্ন আলোচনায় দেখলাম এটিকে মিসির আলীর সাথে তুলনা করা হচ্ছে। পড়া শুরু করতে নিজেরও মাথায় তাই তেমনটাই খেলা করছিল। একজন আত্মীয় পরিজনহীন মনোবিজ্ঞানী, নেত্রকোনা শহরে পুরনো বাড়ি, মা মরা বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন মেয়ে আর তার বাবা - এটুকু পড়লে যে কারো হুমায়ূন আহমেদের 'অন্যভুবন' উপন্যাসের কথা মনে হবে।
কিন্তু কয়েক পাতা পরেই সেসব ভুল ধারণা কেটে গেল। সত্যি বলতে কী, এতোটাই জমে গেলাম যে অন্য কোনো ধারণা করার সুযোগ ছিল না। শুরুটা বাদে, গল্পের আবহে, প্লটে বা গল্প বলায়, কোনোভাবেই অন্য কোনো উপন্যাসের সাথে মিল খোঁজার সুযোগই নেই। আহমেদ করিমের চরিত্রটি নিঃসন্দেহে মিসির আলীর চাইতে বৈশিষ্ট্যগত দিক গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। উপন্যাসের ভৌতিক বর্ণনাগুলো জমিয়ে দেওয়ার মতোই, মনের উপর চাপ ফেলে, কোনো হাস্যকর অতি-নাটকীয়তা নেই তার মাঝে। কাঠের বাড়ি, বৃষ্টি, ছায়াময় উপস্থিতি আর রহস্যের ধূম্রজাল তাতে এনেছে বাড়তি মাত্রা। লেখক শরীফুল হাসানের 'ছায়াসময়' পড়ে আগেই তাঁর ভক্ত হয়েছিলাম, সেই মুগ্ধতার মাত্রা বাড়লো আরো এ যাত্রায়।
বইটির আরো সম্পাদনার প্রয়োজন ছিল। ছাপার ভুল চোখে পড়েছে বেশ কিছু। সজল চৌধুরীর করা প্রচ্ছদ এক কথায় 'ক্লাসি' বলা চলে। নামলিপিটিও খুব ভালো লেগেছে।
যুক্তি, রহস্য আর ভয়ের সংমিশ্রণের বইটি দিয়ে সার্থকভাবে শুরু করলাম এবারের বইমেলা।
বই: রূপকুমারী ও স্বপ্নকুহক
লেখক: শরীফুল হাসান
প্রকাশনায়: অবসর প্রকাশনা
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারী ২০২০
প্রচ্ছদ: সজল চৌধুরী
পৃষ্ঠাসংখ্যা: ১৫৯
মুদ্রিত মূল্য: ৩০০ টাকা