একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে কিংবদন্তিসম খ্যাতি-অর্জনকার বীরযোদ্ধা শাফায়াত জামিল, লড়াইয়ের ময়দানে অকুতোভয় যে-মানুষটি বাস্তবজীবনে পরম মিতবাক ও নিভৃতচারী। তদুপরি স্বাধীনতা-উত্তরকালে ষড়যন্ত্রকারীদের পুনরুত্থান, বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং নভেম্বরের প্রতিবিপ্লবী চক্রান্তে চার জাতীয় নেতা ও অগ্রণী মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যায় ব্যথিতচিত্তে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন আরো বেশি। অথচ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের একেবারে সূচনাকালে তাঁর নেতৃত্বেই ঘটেছিল বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রায় পাঁচশ’ সৈনিকের বিদ্রোহ, প্রাথমিক প্রতিরোধের সেটা ছিল গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এরপর রংপুর সিলেটের বিভিন্ন রণাঙ্গনে শত্রুর ত্রাস হয়ে বহু অপারেশনে নেতৃত্ব দিয়েছেন শাফায়েত জামিল, জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য করে স্বদেশের মুক্তির জন্য যে মরণখেলায় মেতেছিলেন তার শেষ পর্যায়ে গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন তিনি। চারিত্রিক দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগী মনোভাব দ্বারা যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি অনুপ্রাণিত করেছেন অগণিত সহযোদ্ধাদের এবং হয়ে উঠেছেন একাত্তরের বাঙালির বীরগাথার অন্যতম রূপকার। দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর তিনি বাঙ্ময় হয়ে বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের কথা, তরুণ সাংবাদিক সুমন কায়সারের সহযোগে তিনি মেলে ধরেছেন রণাঙ্গনের অগ্নিঝরা স্মৃতি। সেই সঙ্গে যোগ করেছেন পঁচাত্তরের নির্মম নিষ্ঠুর হত্যালীলার বিবরণ, যে-ঘটনাধারা অত্যন্ত কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে শাফায়াত জামিলের গ্রন্থ হয়ে উঠেছে আমাদের ইতিহাসের অনন্য ও অপরিহার্য সংযোজন।
কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) শাফায়াত জামিল (জন্ম: ১ মার্চ, ১৯৪০ - মৃত্যু: ১১ আগস্ট, ২০১২) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর বিক্রম খেতাব প্রদান করে।
'৭৫ এর ঘটনা পড়তেই বইটা পড়া। অতএব একাত্তর নিয়ে কোন মন্তব্য নেই। তবে বেশ কিছু ইন্ট্রেস্টিং ব্যাপার আছে।
পড়ে আমার মনে হল তিনি '৭৫ এ নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতেই বইটা লিখেছেন। এবং সেখানেই অন্য বইগুলোর সাথে কিছু কিছু তথ্যে অমিলও ধরা পড়েছে।
তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা বইয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে শাফায়েত জামিল ক্যুর বিষয়ে অবগত ছিলেন এবং যথেষ্ট সময় এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ফারুক গংদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি। এম এ হামিদের বইয়ে আছে, উনি যখন ফারুক-রশিদকে জিজ্ঞেস করেছিলেন শাফায়েত এ বিষয়ে কিছু জানেন কিনা তখন তারা হেয়ালি উত্তর দিয়েছিল, আপনি নিজেই বুঝে নেন ব্যাপারটা। এখন বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ বইয়ে আছে, অগাস্টের অনেক আগেই রশিদ তাকে জানিয়েছিল এবং এই বলে সতর্ক করেও দিয়েছিল যে, যদি কিছু জানান তবে আমি বলে দিব আপনিও জড়িত। অন্যেরা বিশ্বাসও করবে কেননা আমার এখন যশোরে থাকার কথা। আপনি আমাকে ঢাকায় থেকে যেতে বলেছেন। এম এ হামিদ এই বদলির দোষটা অবশ্য খালেদ মোশাররফের কাঁধে দিয়ে দিয়েছেন। এবং উনি আরো বলেছেন, জামিল এবং খালেদ দুজনই এই ঘটনায় বেশ উৎফুল্ল ছিল। এবং তখনই জামিল ফারুকদের বিপক্ষে চলে গেল যখন দেখল যে এই ঘটনায় তো তার কোন লাভ হয়নি বরং জুনিয়র অফিসারের খপ্পরে থাকতে হচ্ছে। এবং অ্যান্থনির বইয়ে আছে, খালেদ-জামিল নিশ্চিতভাবে চার নেতার হত্যা সম্বন্ধে অবগত হওয়ার পরও [যথেষ্ট বিতর্কিত] ফারুকদের দেশ ত্যাগে সাহায্য করেছিলেন। ................................... দুইটা বইয়ের অনেক পরে কিন্তু শাফায়েত বইটা লিখেছেন কিন্তু ঐ দুইটা বইয়ের যুক্তির বিপরীতে তার বক্তব্য জোড়ালো না।
আমার মনে হয়েছে শাফায়েত বরাবরই জিয়া ভক্ত। পড়ে যা মনে হল আরকি! পাল্টা ক্যুর ঘটনায় জিয়া অনেককে শাস্তি দিলেও তাকে বলতে গেলে কোন শাস্তি দেননি। পা ভেঙ্গে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে, জিয়া অবগত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের চারটিই মৃত্যুদন্ডযোগ্য অপরাধ ছিল। কিছুই হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কর্মকান্ডের জন্য শাফায়েত চরমভাবে সমালোচনা করেছেন এরশাদের। কিন্তু জিয়ার বিপক্ষেএকটা কথাও বলেননি। পাকিস্তান গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেছেন এটা বলে অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। মানে বলতে চেয়েছেন তারা তাদের ওই জ্ঞান দেশ বিরোধী কর্মকান্ডে কাজে লাগিয়েছেন। তো জামিল কেন জিয়ার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনেননি?
.. .. ..
এরশাদের সম্পর্কে যা বলা আছে সেসব বলা এখন সময় নষ্ট ছাড়া কিছুই না। এরশাদের সাথে আওয়ামী লীগের এখন খুব ভালো সম্পর্ক। এরশাদকে ছাড়া আওয়ামী লীগের চলেই না। ;)
শাফায়েত জামিলের বইটা ভালো লাগলো দুই কারণে। প্রথমত:, লেখক সম্ভবত সোজা-সাপ্টা কথা বলতে পছন্দ করেন এরকম একজন মানুষ, বইয়ে এই ছাপ সুস্পষ্ট। দ্বিতীয়ত:, তিনি ভুলগুলো জাস্টিফাই করার তেমন কোন চেষ্টা করেন নাই। ওই সময়ে করা প্রয়োজন ছিল, নিজের বিবেক যা বলছে, কর্ছি— তার কাছে এইরকম সহজ আলাপ পেয়েছি।
জামিল মুক্তিযুদ্ধ করেছেন জিয়ার আন্ডারে। রৌমারিতে তারা কিভাবে মুক্তাঞ্চল গড়ে তুললেন, অপারেশন কিভাবে চালাতেন, এসব কথা এসেছে শুরুতে। এনবিসি থেকে প্রামাণ্যচিত্র বানাতে তাদের সেক্টরে একটা টীম এসেছিল, প্রামাণ্যচিত্রের নাম আ কান্ট্রি মেইড ফর ডিজ্যাস্টার। (মেন্টাল নোট- য়ুটুবে সার্চ মেরে একবার দেখতে হবে এটা)
কর্নেল ওসমানির প্রতি বিরক্তি নির্দ্বিধায় প্রকাশ করেছেন জামিল, তাকে বলেছেন ‘স্থিরতাহীন, মানসিকভাবে অশান্ত’, ‘অসহিষ্ণু’। ছাতক অভিযানে উপরমহলের প্লানের অভাবের কারণে ব্যর্থ হওয়া, তাদের আহম্মকি নিয়ে সমালোচনা করেছেন। গুর্খা সৈনিকদের নিয়ে ফ্যাসিনেশনের কথা বলেছেন।
তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের গল্প আরো চমকদার। ডিজিএফআই ব্রিগেডিয়ার রউফের মিথ্যাচার, এরশাদের দু-মুখোনীতি, এরশাদ যে পাকি ইন্টেলিজেন্সের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন সেই সন্দেহ প্রমাণসহ প্রকাশ, এবং ‘সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ এর ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত বলদামির কারণে বঙ্গবন্ধু হত্যা ঘটেছে’ – এরকম অভিযোগ তুলেছেন জামিল। পরবর্তী সময়ের বর্ণনা দেওয়ার সময় তাহেরের পিন্ডি চটকেছেন তিনি, এমনকি নিজের প্রাক্তন কমান্ডার জিয়াকেও ছাড়েন নি তুলোধুনো করতে।
মহিউদ্দীন সা’বের বইয়ের সাথে এখানে একটা মিল পেলাম, উনার মতন জামিলও বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর একমাত্র প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসাবে আওয়ামি নেতা তোফায়েল আহমদের কথা বলেছেন, তার ব্যক্তিত্ব ও আনুগত্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এই লোকটা সম্পর্কে আরো জানা দরকার।
কর্ণেল শাফায়েত জামিল (অবঃ) বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেনা অধিনায়ক ও সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারী বীর। তাঁর অধীনস্ত ৪র্থ বেঙল রেজিমেন্টের ২টি কোম্পানি সমস্ত অস্ত্র গোলা যানবাহন সহ বিদ্রহ করে ২৭শে মার্চে, যা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাঅধিনায়ক খালেদ মোশাররফ এর ১টি কোম্পানির সাথে মিলে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বাহিনী হিসাবে আত্ম প্রকাশকরে, অল্প সময়ে এটি ২য় বেঙল রেজিমেন্টের সাথে যুক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি রচিত হয়। বাংলার সাধারণ বেসামরিক লোকজনের মধ্যে আশার আলো সঞ্চারিত হয়, যা ধীরে ধীরে পুরনাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হয়। মুক্তিযুদ্ধের একদম প্রাথমিক পর্যায়ে এই সকল সন্মানিত সেনা অধিনায়কদের সাহসীপূর্ণ বীরচিত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পিছনে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।
লেখক বইটির প্রথম অধ্যায়ে তাঁর বেঙল রেজিমেন্টে বিদ্রহের বর্ণনা ও পরবর্তীতে তাঁর নেতৃতে মুক্তিবাহিনী সংগঠিত ও সম্মুখ যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছেন অত্যন্ত চমৎকার ভাবে। সাথে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে সর্বাধিনায়ক ওসমানি সাহেবের কিছু অদক্ষতা ও দূরদর্শিতার অভাব, সুবিধাভোগী নেতাদের কার্যক্রম, পাকিস্তানি বা ভারতীয় সেনানায়কদের দ্বারা বাংলাদেশী যোদ্ধাদের বীরত্বের প্রাপ্ত সন্মান দিতে কৃপণতা, এবং ভারতের গুর্খা রেজিমেন্টের আমাদের মাতৃভুমির জন্য আত্মত্যাগ ইক্তাদি।
লেখক বইটির ২য় ও ৩য় অধ্যায়ে যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের সামরিক অবস্থা, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তী সময় থেকে ৩রা ও ৭ই নভেম্বর পর্যন্ত কান্টনমেন্টের পরিস্তিতি সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা উল্লেখ করেছেন যা ভ্যবিষতে সঠিক ইতিহাস পেতে সহায়ক হবে। কিছু বিষয় বিশেষ ভাবে তুলে ধরেছেন যা উল্লেখ না করলেই নয় যেমন
১' সুবিধাপ্রবন বাঙ্গালী অফিসার মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের সাথে বেইমানী করেছে, কিন্ত যুদ্ধের শেষে সদ্য গঠিত বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে সবহাল হয়েছেন, পরবর্তীতে এরাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেনা অফিসারদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে, ফলস্রুতিতে স্বাধীন বাংলাদেশে অনেক মুক্তিযুদ্ধা সেনা অফিসার প্রান হারিয়েছেন। ���খানে খন্দকার মোস্তাক গং এর বেইমানী মুখোসও হালকাভাবে তুলে ধরেছেন।
২' এরশাদ সাহেবের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা সর্বদায় প্রশ্নবিদ্ধ, যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীতে তার ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ তার স্পষ্ঠ ইঙ্গিত দিইয়েছেন
৩' রাজনৈতিক কারনে জিয়ার অবস্থানকে কোথাও খুব নেতিবাচক আবার কোথাও খুব ইতিবাচক হিসাবে দেখান হয়, কিন্তু লেখক এখানে মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে ৭ই নভেম্বরের অভুথ্যান পর্যন্ত জিয়ার অবস্থান, ভূমিকা অনেকটা নিরপেক্ষ বা যা দেখেছেন সেইভাবে উপস্তাপন করেছেন।
পরিশেষে আরও অনেক মুক্তিযুদ্ধার মত লেখকও আক্ষেপ করে বলেছেন "সব সম্ভবনার দেশ বাংলাদেশ" মুক্তিযোদ্ধাদের, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক মূল্যায়ণ না হওয়া, সুবিধাভোগী বেঈমানদের উঁচু স্থানে বসানো ইক্তাদি তুলে ধরেছেন।
কর্ণেল শাফায়াত জামিল (অবঃ), বীরবিক্রম, মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ কুশিলব। মুক্তিযুদ্ধে তিনি জেডফোর্সের আন্ডারে যুদ্ধ করেন। ৭৫ এ মুজিব হত্যা ও ছয় নভেম্বর খালেদ মোশাররফ এর সঙ্গে পাল্টা ক্যু এর বিভিন্ন পর্যায়ে তার নাম জড়িত। বঙ্গবন্ধুর প্রচন্ড ভক্ত এবং কাছের মানুষ হিসেবে ১৫ আগস্ট তার নিষ্প্রভতা নানাজনের মনে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে। বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী, ঘটনার কলাকুশলী, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ তার ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন তোলেন। এই বইটি মূলতঃ সেইসব জবাব এবং তার অবস্থান পরীষ্কার করতে লেখা হয়েছে।
লে: কর্নেল হামিদের বইতে ১৫ আগস্ট সম্পর্কে বলেন, সেনাপ্রধান শাফায়াতকে ভোর ৫:৩০ এ জানান। ৬টার দিকে প্রেসিডেন্ট নিহত হন। স্বাধীন ব্রিগেড কমান্ডার শাফায়াত জরুরি একশন নিতে সেদিন চরমভাবে ব্যর্থ হয়। শফিউল্লাহ বলেন, ছয়টার দিকে সেনাপ্রধান শাফায়াত জামিলকে ফোন করলে শাফায়াত ফোনের রিসিভার তুলে রেখেছেন টের পান। শাফায়াত কেন ট্রুপস মুভ করলেন না, পায়ে হেঁটে জিয়ার বাসায় ধীরেসুস্থে কেন গেলেন, রশীদ কেন সরাসরি শাফায়াতের বাসায় গিয়ে উপস্থিত হল, শফিউল্লাহ কেন নিজে কোনো ব্যবস্থা নিলেন না সেসব প্রশ্ন ওঠে। একটি অনুচ্ছেদে হামিদ বরং শাফায়াত- খালেদ মোশাররফ কে এই হত্যাকাণ্ডে উল্লসিত অবস্থায় দেখা গেছে বলে জানান। রশীদের সাথে শাফায়াতের ভালো সম্পর্কের কথা ফারুক, ম্যাসকারেনহাসও বলেছেন।
এ প্রসঙ্গে শাফায়াত বলেন সেদিন মেজর রশিদ সরাসরি কর্ণেল তার বাসায় যান এবং তাকে জানান ‘উই হ্যাভ কিলড মুজিব’ এবং তাকে হুশিয়ার করে জানিয়ে দেয় এই মূহূর্তে যেন তিনি কোন পাল্টা একশনে না যান। তাতে গৃহযুদ্ধ বেঝে যাবে। মেজর রশীদ ছিল শাফায়াত জামিলের আর্টিলারি ব্রিগেডের অধীনস্থ অফিসার। এরপরেই সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ তাকে ফোন করেন বিপর্যস্ত ভাবে। কিন্তু কোনো নির্দেশনা দেন না। তিনি নিজ থেকে দুইজন মেজরকে স্ট্যান্ডবাই রাখেন ও প্রস্তুতি নিতে বলে নিজে রওনা দেন জিয়ার বাসায়। গাড়ি না থাকায় অপেক্ষা না করে হেঁটেই রওনা দেন। জিয়া তখন ডেপুটি চিফ চিফ ছিলেন। তার নির্দেশে দল প্রস্তুত হতে থাকে, তখন সাড়ে সাতটার দিকে খালেদ মোশাররফ এসে জানান সেনাপ্রধান তাঁকে কমান্ড টেকওভার নিতে বলেছেন এখন থেকে। কার্যত এরপর জামিলের আর করণীয় ছিলনা।
তিনি সরাসরি সেনাপ্রধান শফিউল্লাহর উপর দোষারোপ করেন এই বলে যে সেনাপ্রধান সাড়ে চারটায় সব জেনেও তাকে ফোন করেন সবার সাথে কথা শেষে সাড়ে ছটায়। এই খবরটি তার অভিযুক্ত রশীদ থেকে শুনতে হয় বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। শফিউল্লাহ বিভিন্ন সময় অভিযোগ তোলেন যে শাফায়াত সেদিন ইউনিটেই উপস্থিত ছিলেন না, দূরত্বে ছিলেন। এসকল বক্তব্যের বিপরীতে প্রমাণ দেন শাফায়াত। তিনি বরং সেনাপ্রধানদের পরিস্থিতি মেনে নিয়ে আনুগত্য প্রদর্শন করাকেই মেনে নিতে পারেন নি। তিনি জেনারেল এরশাদকে সন্দেহ করেন। যেটি আরও অনেক ব্যক্তিবর্গের কথা হতে উঠে আসে। কাদের সিদ্দিকী সেনাপ্রধান কে অথর্ব, অকর্মণ্য বললেও হামিদ তার ব্যাপারটিকে অনিচ্ছাকৃত বলেন।
শাফায়াত জামিল সর্বাধিক পরিচিতি ৩রা নভেম্বর খালেদ মোশাররফ এর সাথে পাল্টা ক্যু্র পরিচালক হিসেবে। নানাভাবে ৩রা নভেম্বরের সেই ক্যু পুরোপুরি ব্যর্থ হয় এবং খালেদ মোশাররফ নিহত হন। ১৫ আগস্টের খুনিরা পালিয়ে যায় নিরাপদে, জাতীয় চার নেতা বলির পাঠা হন। শাফায়াত পলায়ন করেন এবং তীব্রভাবে সমালোচিত হন। তার বক্তব্য, ল এন্ড অর্ডার ফিরিয়ে আনতে ক্যু করেছিলেন। খুনিদের হাতে জিম্মি থাকা তিনি মেনে নিতে পারেননি। জুনিয়র অফিসারদের স্পর্ধাও ক্ষতি করছিল সেনাবাহিনীকে। সেজন্য তিনি সরাসরিই সেনা দরবারে বলে বসেছিলেন, "You are all liats, mutineers and deserters. You are all murderers. Tell your Mustaque that he is an usurper and conspirator. He is not my President. In my first opportunity I shall dislodge him and you all will be tried for your crimes."
শাফায়াত জাসদের সিপাহী বিপ্লবের কড়া সমালোচনা করেন। জেনারেল ওসমানীর অসুহিষ্ণুতা, অস্থিরতা, অপারগতা ও প্রহসনের সমালোচনা করেন। জিয়াকে তিনি পছন্দ করতেন।। এই বইতে মুক্তিযুদ্ধের অংশটি রোমাঞ্চকর ও তথ্যবহুল। বাকি দুটো অধ্যায় ছিল মূলতঃ নিজের উপর আনা নানান অভিযোগের যুক্তি খন্ডানো। বইতে খুব বেশি ইনফরমেটিভ কিছু তাই পাওয়া যায়নি। মনে হয়েছে লেখক শুধু নিজ জানালা হতে যতটুকু দেখেছেন, ততটুকুই বলেছেন। এর বাইরে তার সম্যক কোনো ধারণাই নেই। কর্নেল শাফায়াত জামিল মন থেকেই তিনি ছিলেন একজন সৈনিক। রাজনীতির অত ঘোরপ্যাঁচ সম্ভবত তার বোধগম্য হয়ে ওঠেনি। ইতিহাস তাকে শেষপর্যন্ত ক্ষমা করেছিল কিনা আমি জানিনা। তবে বইয়ের শেষাংশে নিজের কৃতকর্মের জন্য তিনি ক্ষমা চেয়েছিলেন।
কর্নেল শাফায়াত জামিলের বইটি মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের একটি বিশেষ অধ্যায়। এটি শুধুমাত্র তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অবস্থান নয়, বরং এক বিশাল রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে নির্মিত এক ঐতিহাসিক দলিল। তবে এই বইটি অন্যদের তুলনায় একটু ভিন্ন ধরনের, কারণ এতে শাফায়াত জামিল তার ভূমিকা ও অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে এমন কিছু বক্তব্য দিয়েছেন যা পাঠকদের ভেতরে নতুন করে চিন্তা উসকে দেয়।
প্রথমেই বলতে হয়, বইটির ভাষা ও শৈলী। শাফায়াত জামিলের বর্ণনা অত্যন্ত সোজাসাপ্টা এবং খোলামেলা। তার সমালোচনাগুলোও সরাসরি এবং অকপটে। ওসমানী ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে তার মতামত বেশ জোরালো এবং তিনি তাদের অদক্ষতা ও ব্যর্থতা নিয়ে কোন রকম দ্বিধা করেননি। এমন সরল ও সৎ সমালোচনা বাংলদেশের সামরিক ইতিহাসে বিরল।
তবে সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী পাল্টা অভ্যুত্থান নিয়ে তার বর্ণনা। এই বইয়ের মাধ্যমে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে সমালোচকরা বলবেন যে, তার প্রতিক্রিয়া অনেকাংশেই দুর্বল এবং বেশিরভাগ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে, তিনি কেন পাল্টা পদক্ষেপ নেননি বা সেনাবাহিনীর অন্য কর্মকর্তাদের সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হয়েছেন তা নিয়ে তার ব্যাখ্যা যথেষ্ট সন্তোষজনক নয়। এই দুর্বলতা তার অবস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করে।
শাফায়াত জামিলের বইয়ে ���িয়াউর রহমানের প্রতি তার সমর্থন খুব স্পষ্ট। যদিও জিয়া এবং এরশাদ উভয়ের সামরিক ভূমিকা নিয়ে বহু বিতর্ক রয়েছে, জামিল জিয়ার বিপরীতে এরশাদের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। এরশাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা এবং পরবর্তী সামরিক কর্মকাণ্ডকে তিনি সন্দেহের চোখে দেখেছেন এবং এরশাদকে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ করেছেন। কিন্তু জিয়ার বিরুদ্ধে তিনি কোনো সরাসরি অভিযোগ আনেননি, যা পাঠকদের মধ্যে পক্ষপাতিত্বের সন্দেহ জাগায়।
এ বইয়ের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো, এতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে, তোফায়েল আহমদের প্রতিবাদী ভূমিকাকে তিনি প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখেছেন, যা সমসাময়িক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এছাড়াও, সেনাবাহিনীর ভেতরে চলা ষড়যন্ত্র ও বিভক্তির বর্ণনা, বিশেষ করে ৩রা নভেম্বর খালেদ মোশাররফের ক্যু এবং তার ব্যর্থতা নিয়ে লেখকের মতামত যথেষ্ট বিশ্লেষণধর্মী।
অন্যদিকে, শাফায়াত জামিলের নিজের ভূমিকা এবং তার নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা করা হলেও, তিনি বইয়ের শেষের দিকে কিছুটা নিজের ভুল স্বীকার করেছেন। তিনি যেভাবে তার নিজের দোষত্রুটি এবং সিদ্ধান্তগুলোকে ব্যাখ্যা করেছেন, তা একজন সামরিক নেতার মনস্তত্ত্ব ও বাস্তবতাকে তুলে ধরে। এতে পাঠকরা বুঝতে পারেন যে, শাফায়াত মূলত একজন সৈনিক, যার রাজনৈতিক জটিলতাগুলো বুঝতে পারা তার জন্য সহজ ছিল না।
সবমিলিয়ে, কর্নেল শাফায়াত জামিলের বইটি ইতিহাসের একটি বিতর্কিত অধ্যায়ের দরজা খুলে দেয়। এতে লেখকের ব্যক্তিগত মতামত ও অভিজ্ঞতা থাকলেও, অনেক পাঠক তা থেকে নতুন করে ইতিহাসের সত্য অনুসন্ধানের প্রেরণা পাবেন।
This entire review has been hidden because of spoilers.
বইতে লেখকের বর্ণনার ধরন বেশ dull ছিল। মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সেনানীর কাছ থেকে বিভিন্ন অপারেশন এবং বিভিন্ন ঘটনার context এর সুন্দর বর্ণনা আশা করে হতাশ হয়েছি। বইয়ের শেষ দুটি পর্ব পড়ে মনে হয়ছে লেখক কিছু দায়মুক্তির জন্যে বইখানা লিখেছেন আর কিছু ব্যক্তিকে দোষী প্রমাণ করতে চেয়েছেন। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণের যথেষ্ট অভাব বোধ করেছি পাঠক হিসেবে।
স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য সবে দূরের স্বচ্ছ আকাশে আভা ছড়াতে শুরু করেছে। অন্তত আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হচ্ছিল। কিন্তু কে জানত এমন স্বচ্ছ দুনির্বার আকাশেও নিমেষেই বয়ে আসতে পারে মেঘের ভয়াল কালো থাবা। চারদিকে হঠাৎ-ই ঘনিয়ে আসে অচেনা এক দুর্যোগ। ১৯৯৮ সালে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। তখনই বইটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। 4/5
পঁচাত্তর এর আগস্ট থেকে নভেম্বর এদেশের রাজনীতি ও ক্যান্টনমেন্টে প্রকৃতপক্ষে কি হয়েছিল তার সুনির্দিষ্ট কোন দলিল বা সর্বজনস্বীকৃত কোন ইতিহাস আজও ডকুমেন্টেড করা সম্ভব হয় নি। তৎকালীন অসংখ্য সেনা কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদ তাদের বিভিন্ন বইয়ে যা লিখে গিয়েছেন তা থেকে শুধু একটা ধারণা পাওয়া যায় মাত্র। রাজনীতিতে দুইয়ে দুইয়ে যেমন চার মেলেনা, এক্ষেত্রেও মেলেনি; ওহীগ্রন্থের মতই একটা বিশ্বাস নিয়ে আসতে হয় কারো উপর।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের একেবারে সূচনাকালে কর্ণেল শাফায়েত জামিল (অবঃ) এর নেতৃত্বেই ঘটেছিল বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রায় পাঁচশ’ সৈনিকের বিদ্রোহ, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেনানায়ক খালেদ মোশাররফ, মেজর জিয়া এর সাথে একসাথে যুদ্ধ করেছেন, একজন খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা তিনি। পঁচাত্তর এর আগস্ট এ তিনি ছিলেন ৪৬ বিগ্রেড কমান্ডার, ঢাকা শহরের প্রতিরক্ষা তার দায়িত্তে ছিল। এমনকি পনের আগস্ট এর পরিকল্পনা ও সামনে থেকে নেতৃত্বদানকারী মেজর ফারুক ও তার অধীনস্ত ছিল। সেই রাতে বঙ্গবন্ধু ফোন করেছিলেন সেনাপ্রধানকে , সেনাপ্রধান কর্ণেল শাফায়েত জামিলকে ফোন দিয়ে কি নির্দেশ দিয়েছিল তা এখনো অজানা আমাদের কাছে। তার একটা মুভমেন্ট কি সেদিন রক্ষা করতে পারত মুজিবকে?
পরবর্তীতে গণভবনে মুশতাকের ক্ষমতার রাজনীতি, মেজরদের কাছে সেনাপ্রধান, উপসেনাপ্রধানদের মাথা নত করা, জেলহত্যা সবকিছুর সাক্ষী তিনি। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ এর অভ্যুত্থানেও সরাসরি জড়িত কর্ণেল জামিল, দেয়াল টপকে পালাতে গিয়ে পা ভেঙ্গে ফেললেও জান বাঁচাতে পেরেছিলেন, না হয় হয়ত তাকেও খালেদ মোশাররফ এর ভাগ্য বরণ করতে হত। আর ৭ নভেম্বর এর জাসদ আর বিপ্লবি সৈনিক বিদ্রোহ নিয়েও অনেক অজানা তথ্য দিয়েছেন তিনি এই বইতে; কতটুকু সত্য তা কে জানে। সব মিলিয়ে সুপাঠ্য একটা বই, বাংলাদেশের কালো রাজনীতির বিপুলা রহস্যের কিছুটা হয়ত অনাবৃত করতে পারে বইটি। যারা পরতে যান, রিকমেন্ডেড।
পচাত্তরের আগষ্টে নির্মম হত্যাকান্ডে লেখকের অবস্থান জানার জন্যই পড়া। তাই সাথে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অংশ পড়তেও খারাপ লাগে নি। কিন্তু অনেক জায়গাতেই পচাত্তরের অনেক কিছুই ধোয়াশাচ্ছন্ন। সব চেয়ে বড় বিভ্রম হল সেই সময়ের সেনাপ্রধান কে এম শফিউউলাহ এর অবস্থান। আর ওসমানীকে কোন দুঃখে যে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এর মত বড় সম্মান দেয়া হয়েছিল কে জানে?