দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রকাশিত হলো মহিউদ্দিন মোহাম্মদের 'বিশ্বসাহিত্য ভাষণ' সিরিজের প্রথম খণ্ড, যদিও মূল সিরিজে এটি প্রথম খণ্ড নয়। কিন্তু প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় লেখক এটিকেই প্রথম খণ্ড রূপে প্রকাশ করতে দিয়েছেন। বাংলাদেশের সমাজে মাওলানা রুমির জনগুরুত্বই সম্ভবত এর কারণ। দর্শন ও বিশ্বসাহিত্যে মহিউদ্দিন মোহাম্মদের পাণ্ডিত্য সর্বজনবিদিত। তীব্র গবেষণাধর্মী এ বইটিকেও তিনি স্বভাবজাত সাহিত্যিক মুন্সিয়ানায় সুখপাঠ্য করে তুলেছেন। প্রদর্শন করেছেন তাঁর সুপরিচিত সিগন্যাচার স্টাইল। কঠিন ও জটিল বিষয়কে সহজে বোঝানোর জন্য মহিউদ্দিন মোহাম্মদের গদ্য অপ্রতিদ্বন্দ্বী। রুমিকে নিয়ে ভক্তিবাদী বই বাংলায় শতো শতো আছে, কিন্তু রুমির জীবন ও সাহিত্যকর্মের এমন সাবলীল ও নিরপেক্ষ বিচার বাংলা ভাষায় এই প্রথম মনে করি। সাধারণ পাঠক, যারা সুফিবাদ ও রুমি নিয়ে কৌতূহলী, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রা/শিক্ষক, যারা বুঝতে চান রুমির জীবনদর্শন ও সাহিত্যকে, তারা সকলেই বইটি থেকে অশেষ উপকৃত হবেন। অনিচ্ছাকৃত মুদ্রণক্রটি নজরে এলে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার ও আমাদেরকে অবহিত করার অনুরোধ থাকল।
নন-ফিকশন দিয়ে বছরটা শুরু করতে হাতের কাছের বইটা নিয়েছি। ফেসবুক মারফত জানা হয়েছিল, মহিউদ্দিন মোহাম্মদ খুবই জনপ্রিয় একজন লেখক। কিন্তু আমার এখনো তাঁর কোনো বই পড়া হয়নি। তাই নতুন বছর নতুন লেখককে পড়ে শুরু করলাম...
ফ্ল্যাপে লেখা ছিল, 'রুমির সাহিত্যকর্মের নিরপেক্ষ বিচার'–তবে পুরো লেখার কোথাও নিরপেক্ষতা খুঁজে পেলাম না। শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, রুমির দফারফা করার বাসনা নিয়েই লেখা এগিয়েছেন। আর চিন্তাবিদদের নিরপেক্ষ বিচার বলতে আসলে যা হয়–একটি নির্দিষ্ট ধর্মের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ আছেই!
যাই হোক, লেখাটা পড়ে আমি হতাশ। এই কারণে নয় যে লেখক আমার মনমতো লেখেননি। যথেষ্ট স্বচ্ছ থাকার চেষ্টা করেও লেখকের লেখা খুব জোর-আরোপিত বলে মনে হয়েছে। রুমির জনপ্রিয়তাকে নিছক দুর্ঘটনা বলার স্বপক্ষে পাতার পর পাতা লিখেছেন। আবার রুমির যৌনজীবন সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত প্রমাণ ছাড়াই উনার অনুমান ও ধারণাগুলোই বারবার বলে বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়েছেন।
লেখকের বাকি বইয়ে তার লেখনীর হাত যে ধারালো সেটা দেখেছি। তবে এই বইটি লিখতে গিয়ে তিনি মনে হয় আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন যে রুমি রচনা কে কপি এবং মানহীন প্রমান করাই তার উদ্দেশ্য। কিছু পয়েন্ট আলোচনা করি–
১। রুমি একজন সুফি কবি। সুফি কবিদের বৈশিষ্ট্যই হলো কোরআন, হাদিস ও অন্যান্য আসমানী কিতাবে থাকা কথা, কাহিনী র উপরে ভিত্তি করে সাহিত্য রচণা করা। সকল সুফি ই একই ধাঁজে লিখেছেন, রুমির লেখাও তার ব্যাতিক্রম নয়। এখন কেউ যদি বলে এসব লেখা তো কপি লেখা, কারণ কাহিনী কিতাবে আছে; তবে সেটি হবে শ্রেফ বোকামি।
২। রুমি এবং শামস তাব্রিজের সম্পর্ককে তিনি লম্বা একটা সময়ধরে সমকামীতার সম্পর্ক রূপে দেখানো চেষ্টা করেছেন। প্রায় এতটাই দীর্ঘ আলোচনা করেছেন যে, রুমির সম্পর্কে পূর্বে বিস্তর পড়াশোনা না করা পাঠক ধরেই নিবেন– রুমি সমকামী ছিলেন। কিন্তু এই আলোচনার মাঝে তিনি নিজেই ছোট করে লিখেছেন - "রুমি আর শামসের মাঝে সমকামীতার থেকে প্রচলিত পীর মুরিদের সম্পর্ক থাকার সম্ভবনাই বেশী" তবে যেটার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তার আলোচনা এত দীর্ঘ কেন?
৩। এবার আসি অন্য কথায়, লেখক সমালোচনা করেছেন এই বলে যে, সকল সুফিদের লেখনীর সারকথা একই। শুধু কাহিনী কিছুটা আলাদা আলাদা। এদের স্বকীয়তা নেই, সৃষ্টিশীলতা নেই... আরও অনেক কিছু।
দেখুন, সুফিবাদ একটা ধারা। এটির মূলকথা শুরুতেও যা ছিলো, পরবর্তিতেও তাই রয়ে গেছে। সুফিদের লক্ষ ছিলো সাহিত্য লিখে নোবেল পাওয়া নয়, সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করা নয়, বরং সুফিবাদের বানী মানুষের কাছে প্রচার করা। যেহেতু সুফিবাদের মূলকথা অপরিবর্তিত, তাই সুফিদের সাহিত্যের মূলকথাও অপরিবর্তিতই থাকবে। তাতে যতসময় অতিবাহিত হোক। এটা সুফিবাদের স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ থাকার একটি প্রমাণও বটে। আরও একটু ভিন্নভাবে ক্লিয়ার করি– রুমি ১২শ শতকে একটি কবিতায় লিখেছিলেন, " We Fantasize that the full moon is a bread"
আবার ১৯ শতকে এসে খ্যাতনামা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য লিখেছেন, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় "পূর্নিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি"
অর্থ করলে দুইটা একই লেখা। আমি কি এখন বলবো সুকান্ত ভট্টাচার্য্য, রুমিকে কপি করেছেন! এটা বললে আদৌ কি সেটার কোনো ভিত্তি থাকবে!
কিন্তু দুজনের কথার সার একই। কারণ রুমির সময়ে তিনি ক্রুসেডের মতো ধর্মযুদ্ধ দেখেছেন, সুকান্ত দেখেছেন বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বিশ্ব। উভয় কবি ই খুব কাছ থেকে দেখেন মানুষের ক্ষুধার রাজ্যের তাড়না। আমি এটাই বুঝাতে চাই যে, সারকথা একই থাকা মানেই কপি লেখা নয়।
৪। লেখক বলেছেন, রুমির জীবনীগ্রন্থ হিসেবে রুমির সমসাময়িক সময়ের লেখা গ্রন্থ গুলো লেখকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি, কিন্তু ৫শ বছর পরে এসে লেখা ইংরেজি বইগুলো থেকে তিনি নিঃসন্দেহে দিব্যি রেফারেন্স টেনেছেন। বাহ! ১৯ শতকের একজন ইংরেজ লেখক যেন টাইম ট্রাভেল করে রুমির সময়ে গিয়ে, অতঃপর এসব বই লিখেছেন। হাহহা...
আরও অনেক পয়েন্টে এই বইয়ের সমালোচনা করা যায়। লেখকের বাকি বইগুলোর তুলনায় এই বইটি আমার কাছে ১০ তে ১ পায় কিনা সন্দেহ।
২৬ ফেব্রুয়ারি বইটি পড়ে শেষ করার পর যা লিখেছিলাম তা মুছে দিলাম।
যেকোনো বই পড়ার পর আমাদের মধ্যে একটা ইন্সটেন্ট ইম্প্রেশন তৈরি হয়। আগের রিভিউটা ছিল মূলত সেটাই। এখন, বই পড়ার তিন সপ্তাহ পরে, আমার মনোভাব বদলে গেছে।
মহিউদ্দিন মোহাম্মদের আগের বইগুলোতে গদ্য ভাল। আটকে যায় না। পড়াশোনা করেছেন তা বোঝা যায়। কিন্তু এটি আলাদা। বেশ বিরক্তিকর। নিজের টেক্সট বোঝাতে পারেন নাই। একেবারে হতাশাজনক।
আমার নেক্সট বই 'আহত হরিণের আর্তনাদে' সুফিদের প্রসঙ্গ থাকবে। তার প্রস্তুতি হিসেবে বইটা পড়া। মহিউদ্দিন মোহাম্মদের গবেষণা ও খাটাখাটুনি প্রশংসনীয়, কিন্তু কেন জানি মনে হলো তিনি বইটা লেখার আগে এন্ড পয়েন্ট কী হবে তা আগেভাগেই ঠিক করে রেখেছেন। তার রিসার্চ ছিল সেই নির্দিষ্ট এন্ড পয়েন্টে যাওয়ার উছিলা মাত্র। তাই কিছু উপসংহার/রায় একপেশে মনে হতে পারে, যেমন আমার মনে হয়েছে।
মহিউদ্দিন মোহাম্মদের গদ্য সাবলীল, সুখপাঠ্য। পড়তে আরাম। জায়গায় জায়গায় পাদটীকা আছে। কিন্তু পাদটীকা এত বেশি এবং এত ব্যাপক যে মাঝে মাঝেই তা বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়েছে। শেষের দিকে রেফারেন্স বই-পুস্তকের বিবরণ চাইলে ছোট ফন্টে, কম স্পেসে দেওয়া যেত, তাতে বইয়ের আবেদন বিন্দুমাত্র কমতো না।
রুমি রে নিয়ে লিখা আর ৫/৭ টা বই থেকে আলাদা। মহিউদ্দিন মেইনলি এখানে রুমি শামস রে নিয়ে তার ভক্তকুলরা যেই অলৌকিক ধ্যান ধারণা রাখে তা ভাঙ্গার চেষ্টা করছে। রুমি র অন্ধ ভক্ত হলে এই বই আপনার ভালো লাগবেনা। কারন তখনকার পারস্যের আর অন্যান্য সুফি পীর থেকে যে রুমি আলাদা বিশেষ কিছু না তার প্রমাণ করতে লেখক খাটছে এই বইয়ে। কম্পারেটিভলি তার সাহিত্যের বিশ্লেষণ কমই ছিল। বই ভরে ফেলছে আলাদা ইংলিশ রেফারেন্স দিয়ে। সো এসব বাদ দিলে বই শ পেইজের মতো। আমার এক্সপেক্টেশন হাই ছিল তাই তেমন আহামরি ভালো লাগেনাই।
লেখককে অনেক ধন্যবাদ। সাম্প্রতিক সময়ের সেরা গবেষণাধর্মী লিখনি। এরকম একটা বই লিখতে হলে অনেক স্টাডি আর রেফারেন্স ঘাঁটাতে হবে। যারা নির্মোহভাবে রুমিকে জানতে চান, তাদের জন্যই এই বই। অল্প জানা যে বিপদজনক তা এই বইটি পড়লে বুঝা যাবে। যাই আমরা আশে পাশে রুমির ব্যাপারে সোশ্যাল পোষ্ট দেখি আর বাস্তব ই���িহাস যে কতো ভিন্নরকম, তা এই বইটি পড়লে বুঝা যাবে।
রুমি সম্পর্কে পড়াশোনা কম আমার। তাই এই বই কতটা জাস্টিফায়েড সেটা আলোচনা করাটা কঠিন। লেখক প্রচুর রেফারেন্স দিয়েছেন। মুদ্রার দুই পিঠই জানা থাকা ভালো- ওই চিন্তা থেকেই বইটা পড়া আরকি। রুমির সময় সম্পর্কে আবছা একটা ধারণা পাওয়া গেছে অবশ্য।
লেখক তার কোনো বইয়ের একটা অধ্যায় হিসেবে রুমি টপিক ব্যবহার করতে পারতেন। পুরো একটা বই প্রয়োজন ছিলো না। রুমি সম্পর্কে বেশিরভাগই তথ্য যা দেয়া হয়েছে প্রায় সবই জানা। নতুন বিশেষ কিছু পাই নি। তবে বাঙালি মুসলিম সমাজ নিয়ে কিছু চাঁছাছোলা মন্তব্য করেছেন, সেগুলো ভালো লেগেছে।
বইমেলা থেকে কেনা এ মাসে পড়া বই । বাদবাকি বই থেকে বেশ আলাদা ধাঁচে লিখা এ বইটা পড়ে আরও বিষদ কিছু জানার ইচ্ছা বেড়ে যায়, যেটা বইটাতে ছিলোনা আবার সাহিত্যের বিশ্লেষণও ছিলো কম। তবে বইটাতে reference পেয়েছি, যেটা আমার সুবিধাজনক লেগেছে।