লেখকের বাকি বইয়ে তার লেখনীর হাত যে ধারালো সেটা দেখেছি। তবে এই বইটি লিখতে গিয়ে তিনি মনে হয় আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন যে রুমি রচনা কে কপি এবং মানহীন প্রমান করাই তার উদ্দেশ্য।
কিছু পয়েন্ট আলোচনা করি–
১। রুমি একজন সুফি কবি। সুফি কবিদের বৈশিষ্ট্যই হলো কোরআন, হাদিস ও অন্যান্য আসমানী কিতাবে থাকা কথা, কাহিনী র উপরে ভিত্তি করে সাহিত্য রচণা করা। সকল সুফি ই একই ধাঁজে লিখেছেন, রুমির লেখাও তার ব্যাতিক্রম নয়। এখন কেউ যদি বলে এসব লেখা তো কপি লেখা, কারণ কাহিনী কিতাবে আছে; তবে সেটি হবে শ্রেফ বোকামি।
২। রুমি এবং শামস তাব্রিজের সম্পর্ককে তিনি লম্বা একটা সময়ধরে সমকামীতার সম্পর্ক রূপে দেখানো চেষ্টা করেছেন। প্রায় এতটাই দীর্ঘ আলোচনা করেছেন যে, রুমির সম্পর্কে পূর্বে বিস্তর পড়াশোনা না করা পাঠক ধরেই নিবেন– রুমি সমকামী ছিলেন।
কিন্তু এই আলোচনার মাঝে তিনি নিজেই ছোট করে লিখেছেন - "রুমি আর শামসের মাঝে সমকামীতার থেকে প্রচলিত পীর মুরিদের সম্পর্ক থাকার সম্ভবনাই বেশী"
তবে যেটার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তার আলোচনা এত দীর্ঘ কেন?
৩। এবার আসি অন্য কথায়, লেখক সমালোচনা করেছেন এই বলে যে, সকল সুফিদের লেখনীর সারকথা একই। শুধু কাহিনী কিছুটা আলাদা আলাদা। এদের স্বকীয়তা নেই, সৃষ্টিশীলতা নেই... আরও অনেক কিছু।
দেখুন, সুফিবাদ একটা ধারা। এটির মূলকথা শুরুতেও যা ছিলো, পরবর্তিতেও তাই রয়ে গেছে। সুফিদের লক্ষ ছিলো সাহিত্য লিখে নোবেল পাওয়া নয়, সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করা নয়, বরং সুফিবাদের বানী মানুষের কাছে প্রচার করা। যেহেতু সুফিবাদের মূলকথা অপরিবর্তিত, তাই সুফিদের সাহিত্যের মূলকথাও অপরিবর্তিতই থাকবে। তাতে যতসময় অতিবাহিত হোক। এটা সুফিবাদের স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ থাকার একটি প্রমাণও বটে।
আরও একটু ভিন্নভাবে ক্লিয়ার করি–
রুমি ১২শ শতকে একটি কবিতায় লিখেছিলেন,
" We Fantasize that the full moon is a bread"
আবার ১৯ শতকে এসে খ্যাতনামা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য লিখেছেন,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
"পূর্নিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি"
অর্থ করলে দুইটা একই লেখা। আমি কি এখন বলবো সুকান্ত ভট্টাচার্য্য, রুমিকে কপি করেছেন! এটা বললে আদৌ কি সেটার কোনো ভিত্তি থাকবে!
কিন্তু দুজনের কথার সার একই। কারণ রুমির সময়ে তিনি ক্রুসেডের মতো ধর্মযুদ্ধ দেখেছেন, সুকান্ত দেখেছেন বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বিশ্ব। উভয় কবি ই খুব কাছ থেকে দেখেন মানুষের ক্ষুধার রাজ্যের তাড়না।
আমি এটাই বুঝাতে চাই যে, সারকথা একই থাকা মানেই কপি লেখা নয়।
৪। লেখক বলেছেন, রুমির জীবনীগ্রন্থ হিসেবে রুমির সমসাময়িক সময়ের লেখা গ্রন্থ গুলো লেখকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি, কিন্তু ৫শ বছর পরে এসে লেখা ইংরেজি বইগুলো থেকে তিনি নিঃসন্দেহে দিব্যি রেফারেন্স টেনেছেন। বাহ! ১৯ শতকের একজন ইংরেজ লেখক যেন টাইম ট্রাভেল করে রুমির সময়ে গিয়ে, অতঃপর এসব বই লিখেছেন। হাহহা...
আরও অনেক পয়েন্টে এই বইয়ের সমালোচনা করা যায়। লেখকের বাকি বইগুলোর তুলনায় এই বইটি আমার কাছে ১০ তে ১ পায় কিনা সন্দেহ।