কথাশিল্পী-প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক মোজাফ্ফর হোসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে বাংলা একাডেমির অনুবাদ উপবিভাগে কর্মরত। প্রধানত ছোটগল্পকার। পাশাপাশি সাহিত্য সমালোচক ও অনুবাদক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি আছে। অতীত একটা ভিনদেশ গল্পগ্রন্থের জন্য তিনি এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ কথাসাহিত্য পুরস্কার এবং স্বাধীন দেশের পরাধীন মানুষেরা গল্পগ্রন্থের জন্য আবুল হাসান সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেছেন। এছাড়াও ছোটগল্পের জন্য তিনি অরণি সাহিত্য পুরস্কার ও বৈশাখি টেলিভিশন পুরস্কারে ভূষিত হন।
"কল মি লাইকা" বিষয়বস্তুর কারণেই উল্লেখযোগ্য। কারণ এ বিষয়ে লিখতে অনেকেই সাহস পাবেন না। উপন্যাসে ভাষার সহজ কিন্তু কাব্যিক ব্যবহার নজর কাড়ে । যেমন - "দাদির শরীর থেকে ঘুণে পোকার কুরে কুরে কাঠকাটার শব্দ আসে।" বা "যে কোনো ঘটনা দাদির কানে তুলে দিলে দুদিন পর সেটা গল্প হয়ে ফিরে আসে।" পুরো উপন্যাসে আছে অনেক ছোট ছোট দার্শনিক বাক্য। যেমন - "বেঁচি থাকাও একটা অভ্যাস।" চরিত্রদের পটভূমি আর পরিস্থিতির সাথে অনেক ভাবনা অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়। যেমন - "আমি বেঁচে থাকতে চেয়েছি অনন্ত অশব্দের ভেতর।"
গ্রামীণ পটভূতিতে লেখা উপাখ্যানটি পড়তে যেয়ে মনে হলো চিরায়ত গ্রামবাংলা তার রূপ রস গন্ধ বর্ণ নিয়ে যেন হাজির হয়েছে। একটা একান্নবর্তী পরিবার, এর সদস্যরা খুবই ভালো, খুবই সহযোগিতাপ্রবণ ; এরাই আবার নিজেদের কথায় কাজে হয়ে ওঠে নির্মম। মানুষের এই পরস্পরবিরোধী চেহারা আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার চালচিত্র বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। ছোটবড় সব প্রধান চরিত্রই গুরুত্ব পেয়েছে লেখকের কাছে। তবে মূল গল্পটা আলেকের, সঙ্গে লাইকার। লাইকা হচ্ছে প্রথম মহাকাশচারী। মানুষ জেনেশুনে খুব আদর দিয়ে তাকে মহাকাশে পাঠিয়েছিলো গিনিপিগ হিসেবে। তারা জানতো, লাইকার বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা নেই। নিষ্পাপ লাইকা বলি হয়েছে মানুষের কৌতূহলের। এদিকে আলেকও পৃথিবীতে স্বেচ্ছায় আসেনি। অন্য সব শিশুর মতোই স্বাভাবিক, অনাড়ম্বর, হাসিখুশি ভরা ছিলো তার জীবন। কিন্তু সে তৃতীয় লিঙ্গের এটা জানাজানি হওয়ার পর পরিবারে ও সমাজে অচ্ছুৎ হয়ে যায়। আলেক নিজের লিঙ্গ নির্ধারণ করেনি, এ ব্যাপারে তার কোনো হাত নেই কিন্তু সব দায়ভার বহন করে তাকেও লাইকার মতো পরিণতির দিকে ধাবিত হতে হয়। সব মিলিয়ে, "কল মি লাইকা" আমাদের গভীর মনোনিবেশ দাবি করে।
এমন এক প্রোটাগনিস্টকে নিয়ে লেখা উপন্যাস, যাকে নিয়ে লেখার সাহস করবে না অনেকেই। গল্প বা উপন্যাস খুব মন্থর গতিতে এগোলেও মোজাফফর মায়াময় গদ্য সেই স্লোনেস খুব একটা গায়ে লাগতে দেয় না। আলী অথবা আলেক অথবা আলেক লতার এই গল্পটা বিমর্ষ করে তোলে, খানিক জায়গায় চরিত্রের মনোলগের গভীরতা বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন তুললেও উতরে যায়। শান্ত, ধীর স্থির, উপন্যাসে কিছু জাদুবাস্তবতার এলিমেন্টে গল্পটি হয়েছে আরো মধুর। নিজের পূর্ব গল্পের চরিত্র মজ্জেলের ব্যবহার সুন্দর। শেষ করে মন খারাপ করে বসে থাকতে হয়।
অবশ্য আমাদের মন খারাপের জন্য বই পড়ার বা কী প্রয়োজন? তারপরও দিনশেষে বইয়ের কাছেই ফিরতে হয়। আজ কল মি লাইকা, কাল হয়তো অন্যকিছু।
"মজ্জেল দাদা বলেছিল, কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর নিজেকেই অন্বেষণ করতে হয়। মানুষ যেটা বলে সেটা সমাজের কথা, সমষ্টির ধারণা; তার মধ্যে ব্যক্তির সত্য থাকে না।.....
........যা ঘটেনি কিন্তু ঘটবে এমন নিশ্চিত করে ওঁত পেতে আছে অনেকেই; যা ঘটবে বলে সমাজ ধারণা করে, সেটা কোনো না কোনোদিন ঘটেও, না ঘটলেও ঘটে; গণভাষ্য এমনই ক্ষমতাবান যে আমরা প্রকৃতপক্ষে যা তার বাইরেও একটা সত্য প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়; তখন আর প্রকৃত সত্য দিয়ে বানোয়াট সত্যকে খণ্ডন করা যায় না; তাই বাড়িতে যে ভয়ের আবহ, সেটার যৌক্তিকতা বুঝতে আমার কোনো অসুবিধা হয় না। বুঝেও যে আমার কিছু করার থাকে না, কষ্ট যত এখানেই। এর চেয়ে ভালো হতো, যদি নির্বোধ প্রাণী হতাম-গরু-ছাগল কিংবা হাঁস-মুরগির মতো। অবশ্য ওরা যে নির্বোধ তাই-বা নিশ্চিত হই কীভাবে! নির্বাক মানেই তো বোধহীন হওয়া নয়।......"
চমৎকার এই লাইনগুলো "কল মি লাইকা" থেকে নেয়া। বইটি আসলে কোনো উপন্যাস নয়, একটা ফিলসফির জার্নি। উপন্যাস বা গল্পের আদলে বর্ণনা করা কিছু বাস্তব সত্যভিত্তিক দর্শন যা আমরা বেশিরভাগ মানুষ ভেবে দেখি না বলে জীবনটা আমাদের চোখে খুব সীমাবদ্ধ কিছু প্যাটার্নের মতো মনে হয়। জীবনের দর্শন মোটেও সহজ নয়, মানুষ তা অনেকটাই জটিল করে রেখেছে নিজেদেরই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গীর সীমাবদ্ধতা দিয়ে। এই সীমাবদ্ধতাগুলো ভাবার গল্প "কল মি লাইকা"।
মোজাফফর হোসেন এর লেখার আমি চরম ভক্ত বলা যায়। যে কারণে তার লেখার পারতপক্ষে পাঠ প্রতিক্রিয়া জানানো থেকে বিরত থাকি আমি, কারণ বায়াসড হয়ে আলোচনা করার একটা সম্ভাবনা থাকে সেক্ষেত্রে। দেখা যাবে লেখা নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীর বদলে ভক্তের দৃষ্টিতে চিন্তা করছি, ফলে আলোচনায় রয়ে যাবে পক্ষপাতিত্ব, মুদ্রার অপর পিঠের বক্তব্য হয়তো চোখ এড়িয়ে যাবে। কিন্তু এই উপন্যাসটি পড়া দরকার ছিল, আলাপ করাও দরকার ছিল- বইয়ের কন্টেন্ট এর জন্য। বইটি এমন এক প্রসঙ্গে লেখা যা আমাদের নিয়মতান্ত্রিক সমাজ কখনোই আলাপ করতে চায় না, ভেবে নেয় অস্পৃশ্য কিছু। আর আমার মনে হয় একজন লেখক বা সাহিত্যিক সেই কথাই বলা বেশি জরুরি যা তার সমাজ বা তার সময় বলছে না কিংবা বলতে চাইছে না। সাহিত্যিকের কলমে সেই সময় ও সমাজের বলতে না চাওয়া কথাগুলোও রয়ে যাবে ইতিহাসের পৃষ্ঠায়। "কল মি লাইকা" পড়ার পরে তেমনি এক প্রচেষ্টার ছাপ চোখে পড়েছে আমার।
লাইকা ছিল মূলত স্পুটনিক মহাকাশযানের মাধ্যমে মহাকাশে পাঠানো প্রথম প্রাণি যে মানুষের গবেষণা ও বিজ্ঞানের হাজারো প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার লক্ষ্যে মহাকাশে গিয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল। যদিও সেই প্রাণ বিসর্জন সে স্বেচ্ছায় দেয়নি, ছিল না এটা মহান কোনো আত্মত্যাগের ঘটনা। মানুষই নিজের স্বার্থে এই অমানবিক ঘটনা ঘটিয়েছে মানবিকতা, বিজ্ঞান ও গবেষণার চাদরে ঢেকে।
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আলেক নিজেকে নিয়ে ভাবে, সেও লাইকার মতোই কোনো এক গবেষণার গিনিপগ। যে স্বেচ্ছায় বিসর্জন বা আত্মত্যাগ করতে আসেনি, সে চায় না আত্মত্যাগ করতে, যাকে কোনো এক মহান পরীক্ষার বা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার অংশ হিসেবে পাঠানো হয়েছে এই দুনিয়ায়। কেন ভাবে আলেক নিজেকে নিয়ে এমন?
সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে কল মি লাইকা- বইটিতে। আত্মভাবনায় নিমগ্ন বালক কিংবা বালিকা আলেকের জবানি ও চিন্তার মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে পুরো বই। তার চিন্তাগুলো যদিও বালক/বালিকাসুলভ নয়, যথেষ্ট পরিণত, এবং ক্ষেত্রবিশেষে যথেষ্ট বিশ্লেষণাত্মক। পরিপক্ক এসব ভাবনাগুলো গড়ে উঠে তার আশেপাশের চরিত্রগুলোর সাথে তার কথোপকথন, অভিজ্ঞতা ও তার নিজের জীবনের চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে।
কী সেই চ্যালেঞ্জ? কী সেই দর্শন যা ছোট আলেকের মনে জন্ম দেয় নিজেকে লাইকার সাথে তুলনা করার মতো রূপকের? বিস্তারিত জানতে বইটি পড়তে হবে আপনাকে। আর শীঘ্রই পেজে এই নিয়ে আপলোড করবো একটি বিস্তারিত পাঠ প্রতিক্রিয়া বা এপিলগ। কেননা দর্শন শুধু পড়ে বসে থাকার বিষয় নয়, দর্শন আলাপ করার বিষয়। হয়তো আলাপ করতে গিয়েই আমরা একদিন জানতে পারবো লাইকা-র বিসর্জন কতটা মূল্যবান ছিল আমাদের জন্য।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, কিছু ভিন্ন দিক চোখে পড়েছে আমার বইটি পড়ার সময়, মোজাফফর হোসেন এর লেখার প্যাটার্ন পরিবর্তন হয়েছে মনে হচ্ছিল। এমন পরিবর্তন যা আমার ঠিক ভালো লাগছিলো না, অস্বস্তি লাগছিল, আবার পড়ার পর এটাও মনে হলো এই বইটি বা এই গল্পটি হয়তো এমন বর্ণনাই ডিমান্ড করে। অবশ্য মজার বিষয়, বইটি মোজাফফর ভাইয়ের দ্বিতীয় উপন্যাস মাত্র। তিনি মূলত পাঠকপ্রিয় বেশি সম্ভবত তার ছোটগল্প আর প্রবন্ধের জন্যই। এতদিন গল্প আর প্রবন্ধ লেখার পর এই বছর আবার একটি উপন্যাস এনেছেন তিনি।
তবে আগেই বলেছি, বইটি আসলে ঠিক উপন্যাস নয়, একটি দর্শনভিত্তিক যাত্রা, যেই যাত্রায় এক রকম জীবনবোধ থেকে একজন কিশোর বা কিশোরি ভিন্ন জীবনবোধে পৌঁছে যায়। তবে তার যাত্রা সমাপ্ত হয় না, নতুন রাস্তা খুঁজে পায় মাত্র।
গত মেলায় প্রথম পড়া বই। লেখকের আগে কোনো বই পড়িনি। এটা পড়ে ঘোরের মধ্যে আছি। গুডরিডস-এ এসে প্রথম কোনো বইয়ে কমেন্ট করছি। ভাষা দিয়ে এমন জাদু করা যায় জানা ছিল না। কোন অঞ্চলের ভাষা কেউ বলতে পারেন? লেখকের আগে কোনো বই পড়িনি বলে নিশ্চিত হতে পারছি না। অসাধারণ আঞ্চলিক ও প্রমিত ভাষার মিশেল। থার্ড জেন্ডার শিশুর এমন বায়োগ্রাফি আর লেখা হয়েছে কিনা জানি না। আসলেই তো, আমরা পথেঘাটে তৃতীয় লিঙ্গ দেখি, কিন্তু কখনোই ভেবে দেখি না শৈশবে পরিবারে থাকতে তারা কিভাবে সমাজচ্যুত হলো। পরিবারের গল্পটা আমরা জানি না। আধ্যাত্মিক ভ্রমণের জন্য এই বইটা আবার পড়ব।
উপন্যাস নয়, একটা স্পিরিচুয়াল জার্নি। প্রতিটা চরিত্র আসে ইটারন্যাল সাফারিংস নিয়ে। শেষ পর্যন্ত দারুণ একটা হিলিং হয়। না সুখকর কোনো এন্ডিং নেই, কিন্তু মুক্তি আছে।