কেউ থেমে নেই এই শহরে। সবাই কেমন যেন ঘোরের মধ্যে রয়ে এগিয়ে চলে। ঠিক যেন মথের মত। কিন্তু কোথায় যায় তারা? আগুন না আলোর দিকে? যারা এগিয়ে যায় তারা নিজেও জানে না হয়তো। ঠিক যেভাবে ওই তিনজন জানত না, ওদের নিয়তির কথা। কিন্তু কেউ কেউ এমনও থাকে যারা নিজেদের ছাই করার লক্ষ্যেই এগিয়ে চলে সেই আগুনের দিকে। কেউ এগিয়ে যায় তার সৃষ্টির আগুনের দিকে, আবার কাউকে তাড়িয়ে বেড়ায় অতীতের অজানা আগুন। এই চেইন রিয়্যাকশন তাদের নিয়তিকেও যেন এক সরলরেখায় নিয়ে আসে। কিন্তু এই আত্মঘাতী যাত্রা থামে না। এই আত্মঘাতী যাত্রা থামার নয়। নিজের ভেতরের আগুনে জ্বলতে থাকা এরকম কিছু মানুষের কথা বলছে এই উপন্যাস, আত্মঘাতী মথ।
পুনশ্চ: এই আত্মঘাতী মথেদের মধ্যে এমন একজন রয়েছে যার গল্প এত তাড়াতাড়ি থামবে না। অদৃশ্য সুতো দিয়ে বাঁধা রয়েছে সে ভবিষ্যতের খুঁটিতে, যেখানে তার নিয়তি অপেক্ষা করছে, নিঃশব্দে!
Born in 1988, 23rd August. Spend the childhood in Jalpaiguri, West Bengal. Then started migrating from one city to another for higher studies and work. A researcher by profession, writer by passion. Often tries to express his weird imagination and fantasy through the words and often this ends up as a wild ride! Not a perfect writer, not a perfect human being, Trying to be, but not quite there yet. Who knows if he will ever be that!
আত্মঘাতী মথ: ক্লাব ২৭, অগ্নিকণিকা, আর এক উন্মত্ত প্রয়াসের মানসযাত্রা
কিছু কিছু উপন্যাস নিছক রহস্যের খাঁচা ভাঙে না—তারা আমাদের অস্তিত্বের আলোকছায়ায় নিয়ে যায়, যেখানে প্রতিটি ছায়া একেকটি অসমাপ্ত প্রশ্নচিহ্ন। রজত শুভ্র কর্মকার–এর আত্মঘাতী মথ সেই গোত্রের থ্রিলার, যেখানে খুন একটা ঘটনা মাত্র—আসল খেলা চলে আত্মার অন্ধকার অলিন্দে, মানসিক অবসাদের বেলাভূমিতে।
নগর কলকাতার এক বৃষ্টিসিক্ত, ক্লান্ত প্রান্তরে যখন পরপর দুই জনপ্রিয় গায়কের বীভৎস হত্যা ঘটে, তখন পাঠক বুঝে যায়—এই উপন্যাস শুধুমাত্র ‘whodunit’ নয়, এটি “whydunit”—প্রশ্নটা সোজাসাপটা নয়—কেন কেউ নিজের দহন চায়? কেন কেউ আগুনের দিকে ছুটে যায়, জেনেও যে সেখানে শুধু ছাই অপেক্ষা করছে? এই উপন্যাস সেই প্রশ্নেরই মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়—শুধু পুলিশি তদন্তে নয়, শিল্প, খ্যাতি, একাকিত্ব আর অন্ধকার জীবনের গভীর ছায়ায়।
আগুনের উৎসে এসে দাঁড়ায় Club 27—রক ইতিহাসের সেই কুখ্যাত, ট্র্যাজিক তালিকা, যেখানে জিমি হেন্ড্রিক্স, জানিস জোপলিন, জিম মরিসন, কার্ট কোবেইন, অ্যামি ওয়াইনহাউসের মতো প্রতিভাবানরা থেমে গেছেন ঠিক ২৭ বছর বয়সে। এই তালিকা আজ আর শুধুই ইতিহাস নয়—এ এক চিরস্থায়ী মিথ। ওয়াইনহাউস যেমন বলেছিলেন, “I don’t think I’m gonna be at all famous. I don’t think I could handle it. I would probably go mad.”
আত্মঘাতী মথ সেই বিখ্যাত পাগলামির সীমান্তে গিয়ে দাঁড়ায়। খুনি প্রতিবার রেখে যায় এমন প্রতীক, যা যেন সমাজের চাক্ষুষ শ্রেষ্ঠত্বে প্রশ্ন তোলে। কাহিনির ভাষায় যেন বারবার বাজে সেই পুরনো অথচ চিরন্তন কবিতা—
"Some say the world will end in fire, Some say in ice..." —Robert Frost।
এই খুনের তদন্তে নামে ইন্সপেক্টর সমর দাস, কিন্তু কাহিনির মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠেন বিতাড়িত, অনিয়মিত, প্রায় পৌরাণিক গোয়েন্দা সলোমন ফিলিপস—যার জীবন এক অন্ধকার সুরঙ্গ, যেখানে আলো দেখা যায় কেবল অন্তর্দৃষ্টির চোখে। সলোমনের চরিত্র যেন তৈরি হয়েছে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের সেই তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের সত্যতা নিয়ে: “Everyone has three lives: a public life, a private life, and a secret life.”
সলোমনের উপস্থিতি কাহিনিকে এনে দেয় এক গা ছমছমে তাপ। তার রসবোধ, বোহেমিয়ান জীবনযাপন, আর সেই অদ্ভুত হিমশীতল বিচক্ষণতা—এই তিন মিলে গড়ে ওঠে এমন এক চরিত্র, যে বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের ‘গ্লাসি-আইড রোল মডেল’-দের পাশ কাটিয়ে নিজস্ব স্পেস দাবি করে।
খুনের তদন্ত যেমন এগোয়, তেমনি খোলা হতে থাকে মানুষের মনের আঁধার জানলা। শিল্পের নামে জনপ্রিয়তার পুঁজিবাদ, হিপ-হপ কালচারের উচ্ছ্বাস আর গোপন ঘৃণা, নারীর প্রতি male gaze, আত্মবিশ্বাস আর সৃজনের দ্বন্দ্ব—সব কিছু যেন জমে ওঠে এই উপন্যাসের অজস্র স্তরে।
লেখক এখানে বড়সড় এক সাইকোলজিকাল মোটিভ এনেছেন শেষভাগে, যেখানে খুনের কারণ হয়ে ওঠে আত্ম-সন্দেহ, শিল্পের নিষ্ফলা সাফল্য, এবং অন্তরের শূন্যতা। যেন T. S. Eliot-এর মতো উচ্চারণ শুনি—
"We are the hollow men We are the stuffed men Leaning together Headpiece filled with straw. Alas!"
তবে হ্যাঁ, গল্পের গতি মাঝে মাঝে কিছু পূর্বানুমানযোগ্য হয়ে পড়ে—বিশেষত একটি গুরুত্বপূর্ণ খলচরিত্রের পরিচয় মাঝামাঝি সময়েই স্পষ্ট হয়ে যায়। সংলাপের বিন্যাস যদি কিছুটা পরে হত, তাহলে রহস্য আরও জমাট হতো।
তবুও, পুরো কাহিনির টানটান রোমাঞ্চ, অস্বস্তিকর নৈতিক দোলাচল, আর আত্মার গভীরে গিয়ে মথের মতো পুড়ে যাওয়ার এই প্রয়াস মনে থেকে যায়। এই উপন্যাসের নামকরণই যেন এক অন্তর্দৃষ্টি—“আত্মঘাতী মথ”—যারা পুড়ে মরার জন্যই জন্মায়, আলোর দিকে ছুটে গিয়ে দগ্ধ হওয়াকেই যারা জীবনের শেষ গীত ভাবে।
সলোমনের গল্প এখানেই শেষ নয়—শেষ পৃষ্ঠায় যেন অদৃশ্য সুতোর টানে বাঁধা থাকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, যেটা অপেক্ষা করছে আমাদের পড়ার, বোঝার, আর দগ্ধ হওয়ার জন্য।
আত্মঘাতী মথ একাই দাঁড়ায় আজকের বাংলা থ্রিলার সাহিত্যের ভিড়ে। এখানে খুন আছে, রহস্য আছে, কিন্তু তারও ওপরে আছে এক মানসিক, দার্শনিক, প্রায় অস্তিত্ববাদী প্রতিফলন। এই উপন্যাস পড়া মানে শুধুই খুন ধরার খেলা নয়—এ এক প্রগাঢ়, আত্মমগ্ন মানসযাত্রা, যেখানে আমরা নিজেরাই প্রশ্ন করি—“আমরা কি বাঁচতে চাই, না পুড়ে যেতে?”
শুরুটা হয় দুজন জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পীর গা শিউরে ওঠা হত্যাকাণ্ড দিয়ে—একজন ডান্সফ্লোরের দেবতা, এক তীব্র টেম্পোর ডিজে; আরেকজন লিরিকের মত্ত খেলোয়াড়, সোশ্যাল মিডিয়ার rap -পুজোয় প্রতিষ্ঠিত এক আধুনিক কবি। তারা দুজনেই ছিলেন বর্তমান শহুরে সংস্কৃতির 'দেবতুল্য' ব্র্যান্ড, পিক্সেল-জন্মা পরিচিতির শিখরে আরোহী। অথচ, তাদের শেষ গন্তব্য—নিঃসঙ্গ, রক্তাক্ত মৃত্যু।
খুনির পদ্ধতি নিছক নিষ্ঠুরতা নয় —তা প্রতীকময় কাব্য, এক পরিশীলিত প্রতিশোধ। প্রতিটি খুন যেন শিল্পের নামে সমাজে বিক্রি হওয়া ভাঙাচোরা আবেগের মুখোশ খুলে ফেলে। ফুঁড়ে দেওয়া চোখের নিচে কাজল, বা কেটে নেওয়া কান—এইসব চিহ্ন শুধু মৃতদেহের নয়, যেন কফিন রচনা করে সেই কৃত্রিম জনপ্রিয়তার, যার ভিতরে বসবাস করে এক নিঃসঙ্গ, হাঁপিয়ে ওঠা আত্মা।
এই প্রক্রিয়া যেন একটি অদ্ভুত পারফরমেটিভ শোকযাত্রা—যেখানে প্রতিটি দেহ আসলে একটি বার্তা, শিল্পের নামে বিকৃত এক সভ্যতার বিরুদ্ধে নীরব অভিযোগ।
এইখানেই এসে মুখোমুখি দাঁড়ায় Club 27—পৃথিবীর সেই রহস্যময়, প্রায় অভিশপ্ত তালিকা, যেখানে ঝলসে উঠেছিল জিমি হেন্ড্রিক্স, জানিস জোপলিন, কার্ট কোবেইন, অ্যামি ওয়াইনহাউসের মতো শিল্পীদের নাম। শুধু রকস্টার বা মিউজিশিয়ান নয়, এরা যেন ছিল আগুনে লেখা এক জাতীয় চুক্তির সাক্ষরকারী—প্রতিভা, যন্ত্রণা, এবং আত্মবিসর্জনের অদ্ভুত সমীকরণে বাঁধা পড়া প্রাণ।
এই ক্লাব আমাদের সামনে স্রেফ কিছু পরিসংখ্যান রেখে যায় না -- এটি একটি অদৃশ্য দরজা খুলে দেয়, যেখানে ঢুকতে হয় নিজেকে প্রশ্ন করে—“কেন কেউ কেউ, খ্যাতির শিখরে দাঁড়িয়ে, আত্মাকে জ্বালিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়? কেন সাফল্যের ঠিক পরেই নামে এই দহন-তৃষ্ণা?”
Club 27 এর অস্তিত্ব এক আত্মমগ্ন, মগ্নচৈতন্য প্রশ্নের জন্ম দেয়—প্রতিভা কি আত্মধ্বংসের সহোদর? নাকি শিল্পের চূড়ান্ত প্রকাশপথই নিজের অন্তর্গত নিঃশেষকরণ?
রক মিউজিকের গায়ে এই সংখ্যাটি আজ শুধু পৌরাণিক নয়, ট্র্যাজিক। যেন ২৭ সংখ্যাটি এক মানসিক দূরত্ব, এক suchness, যেখানে প্রবেশ করলে আর ফিরে আসা যায় না।
আত্মঘাতী মথ এই ক্লাব ২৭-এর প্রশ্নটিকে শুধু গ্রহণ করে না—এ একে ছুঁয়ে দেখে, ধরে রাখে, তারপর এক নির্মম সাইকোলজিক্যাল সিরিয়াল কিলার থ্রিলারের ধাঁচে মিশিয়ে দেয়।
এই থ্রিলার আমাদের হাতে তুলে দেয় ‘সলোমন ফিলিপস’ নামের এক বিতাড়িত গোয়েন্দার কাহিনি—যিনি কোনও স্পটলাইটের নায়ক নন, বরং এক বারে-ঘেরা যৌনপল্লির অন্ধ গলিতে বাস করা, ধারদেনায় ক্লান্ত এক বোহেমিয়ান।
সলোমনকে কেউ পাত্তা দেয় না—পুলিশ বিভাগ তাঁকে বর্জন করেছে, সমাজ তাকে ঘৃণার চোখে দেখে। কিন্তু ঠিক সেখানেই, সেই পরিত্যক্ত চেয়ারের ওপর বসেই, সে চোখ বন্ধ করলেই শুনতে পায় হত্যার স্পন্দন। তার মনোজগতে আজও রয়েছে এক জ্বলন্ত অনুসন্ধানী বুদ্ধি—যা রক্তের গন্ধ পেলেই জেগে ওঠে।
সলোমনের চরিত্র নির্মাণ এক কথায় বিস্ময়কর নয়, প্রায় শ্বাসরোধকারী। তার ডিফেন্সিভ হিউমার কেবল ব্যঙ্গ নয়—তা এক অবচেতনের বর্ম, এক বেঁচে থাকার নীরব প্রতিবাদ। সে ঠাট্টা করে, কারণ অশ্রু বিসর্জনের অধিকার তার নেই। তার ইমোশনাল ইম্যাচিউরিটি নিছক দুর্বলতা নয়—তা এক করুণ, ক্লান্ত মানবিকতা, যা বারবার ব্যর্থ হয়েছে ভালোবাসা, বিশ্বাস আর স্বীকৃতি পেতে।
আর তার নৈতিক সীমাহীনতা কোনো সহজপাঠ্য অমরাবতীর প্রোটাগনিস্টের বিচ্যুতি নয়। তা যেন নিয়ন আলোয় সাঁতরানো অপরাধ আর নির্লজ্জ সত্যের অন্তর্দ্বন্ধে ডুবে থাকা এক নগরের চিরক্লান্ত ছায়া, যেখানে আইন নয়, মনস্তত্ত্বই সত্য নির্ধারণ করে। সলোমন নিয়ম ভাঙে, কারণ নিয়ম তাকে রক্ষা করেনি। সত্য খুঁজতে গিয়ে সে আইন ও অপরাধের মাঝখানের ছায়াপথে হাঁটে। সে মন একজন ব্যক্তি, যে দোষী না হলেও নিষ্কলুষ নয়।
সলোমন আমাদের সেই কল্পনার গোয়েন্দা, যে নায়ক নয়—বরং সমাজের গর্ভগৃহে আটকে থাকা এক ব্যথাতুর রাজপুত্র। সে আলোর পথ দেখাতে সক্ষম, কিন্তু নিজে চিরকাল বাস করে অন্ধকারেই।
এই তিনের অসম্ভব সমন্বয়ে গড়ে ওঠে এক এমন চরিত্র— যে কাহিনির বুকে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক আগুনের মতো। পোড়াচ্ছে, আলো দিচ্ছে, কিন্তু স্পর্শ করলে জ্বালিয়ে দেওয়ার স্পর্ধা রাখে। আর সেই জন্যেই, আত্মঘাতী মথ–এর গোটা রহস্যনাট্য নিজের কাঁধে বহন করে নিয়ে যায় সে —এক হাতে সিগারেট, মনে বিশ্লেষণ, আর এক বিষণ্ণ চোখ।
কিন্তু এই গল্পের আদিম চালিকা শুধু রহস্যভেদের খেলা নয়—এর গভীরে লুকিয়ে আছে সেইসব মুখোশের সন্ধান, যেখানে জনপ্রিয়তার কৃত্রিম আলোর নিচে মিশে থাকে অবাধ যৌনতার ক্লান্ত রাত্রি, শিল্পের মেকি শুদ্ধতা আর একরাশ বেহিসাবি অতৃপ্তি। এই খুনগুলো যেন শুধুই হত্যা নয়—প্রতিটি খুনে, আততায়ী রেখে যায় এক নিঃশব্দ মেটাফর। সে রেখে যায় ফুঁড়ে দেওয়া চোখে লেপ্টে থাকা ঘোলাটে কাজল, কেটে নেওয়া কানে ঝুলতে থাকা নিস্তব্ধ সুর, কিংবা শতাব্দীপ্রাচীন এক তালিকার অদৃশ্য ইঙ্গিত, যা অজানা ভবিষ্যতের দিকে হাত বাড়িয়ে রাখে।
পুরো শহর যেন রূপ নিয়েছে এক প্রলম্বিত অলৌকিক অন্ত্যেষ্টি অনুষ্ঠানে—যেখানে প্রতিটি মৃত্যু একটি দৃশ্য-পরিচালিত পারফরম্যান্স, আর খুনি নিজে এক অভিশপ্ত শিল্পী, যার তুলিতে রক্ত, আর ক্যানভাসে মানুষের ভয়। এই পারফরম্যান্স নিছক প্রতিশোধ নয়—এ এক ধর্মযুদ্ধ, বিনোদন জগতের নোংরা, মেকি, কালো অহংকার, তার ছদ্ম-আবেগ, তার আয়না-পরা নকল আত্মার বিরুদ্ধে এক কনসার্টেড কোরিওগ্রাফি।
শো অফ, শূন্যতা, বিকৃত সৌন্দর্যবোধ—এই ত্রিমাত্রিক কুয়াশার ভেতর দিয়ে হাঁটে হত্যাকারী, যেন প্রতিটি খুনই এক জবাব: সুরের নামে এই যে উন্মাদনা, শরীরের নামে এই যে কার্নিভাল—তাতে শিল্প কোথায়, আত্মা কোথায়?
শহরের বুকজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সেই নিঃশব্দ স্লোগান — "তোমরা যাদের তারকা বলো, তারা আসলে পোকা— তার আলো না, উড়ে যায় আগুনে। এইটা শিল্প নয়, আত্মদাহ।"
এবং এখানেই উঠে আসে সেই জ্বালাময় মূল প্রশ্ন—তুমি কেন গান গাও? তুমি কেন শিল্প করো? বাঁচার জন্য, না ধ্বংসের আলোকে নিজেকে উৎসর্গ করার জন্য? আত্মপ্রকাশ, না আত্মাহুতি? আত্মঘাতী মথ পড়তে পড়তে বারবার মনে পড়ে যায় ব্লেইকের সেই অনন্ত দ্বন্দ্বময় পংক্তি—“Did he who made the Lamb make thee?” সেই নির্মাতা কি একই, যে কোমলতা ও হিংস্রতার, নির্মাণ ও ধ্বংসের, দুটি বিপরীত অস্তিত্বের রূপকার?
এই অগ্নিসদৃশ প্রতিভা—যে প্রতিভা জ্বলে ওঠে সমস্ত নিয়ম ভেঙে—তার জন্ম কি সৃষ্টির পূজায়, না নিজেকে ছাই করে দেওয়ার এক নিষিদ্ধ কামনায় ?
এই থ্রিলারের প্রতিটি খুন, প্রতিটি clue যেন সেই প্রশ্নেরই এক-একটি অনুচ্চারিত প্রতিধ্বনি।
আর পাঠক, এক সময়, নিজেকেই প্রশ্ন করে ফেলে—আমার ভেতরের আগুনটা আমি ব্যবহার করি নিজেকে আলোকিত করার জন্য, না নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার জন্য?
আরেকটা দিক, যা পড়তে পড়তে বারবার চোখে লেগে থেকেছে, তা হলো লেখকের একরকম ঐচ্ছিক সততা। তিনি ‘মেল গেজ’-এর প্রথাগত ফ্রেম থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেননি—নারী চরিত্রদ্বয় রয়ে গেছেন প্রায়শই প্রেক্ষাপটের গহীন নৈশ্বব্দে, যেন তারা কেবল গল্পের ধারে একটি আবহ মাত্র। পাঠক হিসেবে আমরা একটু বেশি প্রত্যাশা করেছিলাম—আরও নিরপেক্ষ, আরও তীক্ষ্ণ, আরও আত্মনিষ্ঠ কিছু।
তবু, লেখকের বাকি প্রয়াস এতটাই সাহসিকতায়, সংবেদনশীলতায় আর ঘনীভূত অভিজ্ঞতায় ভরা, যে এই সীমাবদ্ধতাটুকু সত্ত্বেও বইটা অনায়াসে আপনাকে নিজের ভেতরে টেনে নিতে পারে। কোথাও যেন মনে হয়—এই অপরিণতিকে তিনি স্বীকার করেছেন, কিন্তু অতিক্রম করার সাহসও জোগাড় করছেন। এইখানে এসে পাঠকও হয়তো বলে ওঠে—“না, নিখুঁত না, কিন্তু সত্যি।”
এই উপন্যাসের ক্লাইম্যাক্স নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। সিরিয়াল কিলিংয়ের মোটিভে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক মোচড় এসেছে, যা শুধু থ্রিলারের শর্ত পূরণ করে না, বরং সেই শর্তগুলোকে প্রশ্ন করে—গভীরে নিয়ে যায় শিল্প, ক্ষোভ আর আত্মবিপর্যয়ের জটিল মেলবন্ধনে।
হ্যাঁ, মধ্যভাগেই একজন মূল খুনীর উপস্থিতি খানিকটা প্রতিভাত হয় —সংলাপের বিন্যাস আর কয়েক পৃষ্ঠা দেরিতে এলেই হয়তো চমকটা আরও টানটান হত। কিন্তু তা সত্ত্বেও, লেখক এমনভাবে গেঁথে দেন সমাপ্তির আগুন, যে তার দহন চিহ্ন পাঠকের মস্তিষ্কে থেকে যায় অনেকক্ষণ।
এটি সেই ধরনের উপসংহার, যা শুধু কেস ক্লোজ করে না—বরং একটা বদ্ধ জানলা খুলে দেয়, বাইরে ঝলসে ওঠা পৃথিবীর দিকে। পাঠক বুঝে যায়, এই গল্প শেষ হয় না, এই জ্বলন্ত পথচলা থামে না—কারণ সেই আত্মঘাতী মথেরা এখনও উড়ে চলেছে, এক আগুন থেকে আরেক আগুনের দিকে।
আত্মঘাতী মথ আদতে এক ধ্বংসযাত্রার আখ্যান। এখানে মানুষ জ্বলতে চায় — কারণ জীবনের শিখরে পৌঁছে গেলে অনেকে আর কিছু দেখতে পায় না, অনুভব করে না। সফলতা সেখানে এক শূন্যতা, অস্তিত্বের ভারে বাঁধা পড়ে বেঁচে থাকাটাই হয়ে ওঠে এক laboured নিঃশ্বাস। এই উপন্যাস শুধু কিছু খুনের কাহিনি নয় — এ এক আত্মাহুতির ক্রনিকল, যেখানে শিল্প, খ্যাতি আর মুক্তির নাম করে মানুষ ছুটে চলে নিজেরই তৈরি আগুনের দিকে। এখানে প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন এক সামাজিক মুখোশের খোলস, যেখানে আবেগ ক্ষয়ে যায়, আর সত্যের ভিতর দেখা যায় পুড়ে যাওয়া মুখ।
>b>শেষ দৃশ্যটি রেখে যায় এক অদৃশ্য টান — এক চরিত্র, সলোমন, যে এখনও বেঁচে আছে, আগুনের নিচে।
ভবিষ্যতের কোনও খুঁটির সঙ্গে যেন সে বাঁধা, আর তার গল্প এখনও শেষ হয়নি।
সে আবার আসবে। এবং আমরা, এই অন্ধকার মথদের মতো, বারবার পড়ে যাব সেই আগুনের গল্পে—আলোয় পুড়তে পুড়তে, বুঝেও না ফেরা যায় না।
কারণ কিছু গল্পের শেষ হয় না—তারা শুধু দগ্ধ চিহ্ন রেখে যায়।
◻️কাজরে নে লে লি মেরি জান... শহরে পরপর তিনটি খুন, আর প্রতিটি ঘটনায় আততায়ী ছেড়ে যায় এমন এক সূত্র যেটা শুধু বর্তমানকেই নয়, জুড়ছে ভবিষ্যতের ঘটনাকেও। সবকিছুর মূলে একশো বছরেরও পুরনো এক লিস্ট যেটাকে ধ্যান জ্ঞান করে রেখেছে এক মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তি। পুরো ঘটনার মূলে পৌঁছনোর চেষ্টা করছেন একজন প্রাক্তন গোয়েন্দা, যার নিজের অতীত তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
◻️ সলোমন... নামটা শুনলেই আমার প্রথমেই মনে পড়ে কিং সলোমনের কথা। এই কাহিনীর চরিত্র, শ্রীযুক্ত সলোমন ফিলিপস, বাংলা সাহিত্যের টেফ্লন কোটেড গোয়েন্দাদের সম্পূর্ণ বিপরীত হলেও নিজের জায়গায় কিং-এর থেকে কম কিছু নন। তাই এর কাছেই বাধ্য হয়ে আসতে হয়েছে ইন্সপেক্টর সমর দাসকে। কারণ ওপরতলাও জানে যে ফোর্সে থাকাকালীন এই 'ভদ্রলোক' যেভাবে সিরিয়াল কিলিং সংক্রান্ত কেসগুলোর সুরাহা করতেন, বর্তমানের ঘটনাবলীর সমাধান তিনিই করতে পারবেন। অথচ এমনিতে কেউ তাকে জয়েন্টের কাউন্টার দিতেও রাজি নয়! কিন্তু যেটা তিনি দেখিয়ে থাকেন, সেটাই কি তার আসল রূপ? অন্ধকারের সমাধান করতে সিদ্ধহস্ত এই মানুষটির জীবনও বর্তমানে কেমন যেন ধোঁয়াশা, রহস্যে ভরা।
◻️ লেখকের প্রথম বই পড়ার পর থেকেই ওনার ওপর আমার একটা প্রচ্ছন্ন ভরসা আছে ( সেটা স্বীকার করতে সংকোচ নেই) চেনা কোনো বিষয়ের মধ্যেও একদম অন্যরকম একটা নতুন concept তৈরী করার ব্যাপারে। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভীষণভাবে আলোচ্য অথচ রহস্যময় একটি বিষয়ই এই বইয়ের মূল ভিত, কিন্তু বাকি কাহিনীতে নতুনত্ব। থ্রিলার হওয়ার পাশাপাশি মানব মনের এক অন্যদিক সামনে আসে এই কাহিনীতে। তবে হ্যাঁ, পরিসরে আরেকটু বড়ো হলে বেশ লাগতো।
◻️কেউ কেউ থাকে যারা নিজেদের ছাই করার লক্ষ্যেই এগিয়ে চলে আগুনের দিকে। কেউ এগিয়ে যায় তার সৃষ্টির আগুনের দিকে, আবার কাউকে তাড়িয়ে বেড়ায় অতীতের অজানা আগুন। নিজের ভেতরের আগুনে জ্বলতে থাকা এরকম কিছু মানুষের কথা বলছে এই উপন্যাস, আত্মঘাতী মথ।থ্রিলার কাহিনীর এই এক ব্যাপার, বেশী কিছু বললেই স্পয়লার হয়ে যায়। তাই আর কিছু বললাম না, আপাতত সলোমনের ফেরার অপেক্ষায় থাকলাম।