১৯৬২ সালে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতর ‘কিউবার মিসাইল ক্রাইসিস’ থেকে শুরু করে আমাদের দেশে রমজান মাসে পণ্যের দাম কেনো বাড়ে? এসব ঘটনাগুলো যুক্তিবাদী মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে কখনো বোঝার চেষ্টা করেছেন? এরকম খুব ছোট থেকে অনেক বড় ঘটনার আসল রহস্য বোঝানোর জন্য ‘গ্লাডিয়েটর, জলদস্যু ও বিশ্বাসের খেলা’ বইয়ে গেম থিওরি ব্যবহার করা হয়েছে। লেখক হাইম শাপিরা দেখিয়েছেন, কীভাবে দৈনন্দিন জীবনের সব ক্ষেত্রেই এই থিওরি প্রয়োগ করে ঘটনার গতি প্রকৃতি জানা সম্ভব। গেম থিওরি কী সেটা বোঝার জন্য বইমেলার বই নিয়ে একটা গেম খেলা যাক।
একুশে বইমেলায় এবার অনেক নতুন বই এসেছে। বই মেলা উপলক্ষে আমার তিন বন্ধু হেনা,বাপ্পারাজ ও জসিমকে ১১১টা বই উপহার দিব। কিন্তু বই পাবার প্রথম শর্ত হলো, বই ঠিকমতো ভাগাভাগি না করতে পারলে সব বই ফেরত নেওয়া হবে। দ্বিতীয় শর্ত হলো, প্রথম জন শুধুমাত্র ১টা বই পাবে, প্রথম জনের পছন্দ অনুযায়ী দ্বিতীয় জন পাবে ১০টা বই। পরবর্তীতে দ্বিতীয় জনের পছন্দ অনুযায়ী তৃতীয় জন পাবে ১০০টা বই। একটু খেয়াল করলে দেখতে পাচ্ছেন, প্রথমজন যে বই পাচ্ছে পরবর্তী জন পাচ্ছে ঠিক তার ১০গুণ বই। এক্ষেত্রে আপনাদের কি মনে হয় যে আসলে বই কয়জন পাবে? এরকম ক্ষেত্রে দেখা যাবে প্রথম জন দ্বিতীয় জনকে ১০টা বই দিয়ে ১টা বই পেয়ে যাবে। কিন্তু দ্বিতীয় জন কোনোভাবেই মাত্র ১০টা বই নিয়ে ১০০টা বই দিতে চাইবে না। শেষমেশ আদতে ১১১টা বই আবার আমার কাছে ফেরত আসবে। এখন খেলাটা কেমন লাগছে? অনেক বেশি নিষ্ঠুর, বড্ড বেশি স্বার্থপরের মত তাই না? আদতে আমাদের জীবনটা এরকমই। আমরা সবসময়ই নিজে না পারলে অন্যকে জিততে না দেওয়ার চেষ্টায় থাকি। একজন সচেতন ব্যক্তি হিসেবে আপনি হয়তো এমন নাও করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে সবসময় এই ধরনের সিদ্ধান্তের ফলাফল আপনার নিজের উপর নির্ভর করে না। বরং ওই ১০০টা বই না দেয়ার সিদ্ধান্ত অনেকাংশেই অপর দুজন ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত। এইবার তো বিষয়টা একটু জটিল হয়ে গেল। আপনি দিবেন না সেটা আবার অন্য ব্যক্তির উপর নির্ভর করছে কীভাবে? এই বিষয়টা জানার জন্যই আমাদের এখন গেম থিওরি কী এবং কীভাবে কাজ করে সেটা জানার প্রয়োজন।
গেম থিউরিটিকে সহজ ভাবে বলা যেতে পারে; তিনজন পাঠক যখন সম্মিলিতভাবে ডিসিশন নিবে, কে কয়টা বই পাচ্ছে এবং তারা বইগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট। অর্থাৎ তাদের তিনজনের সিদ্ধান্ত এখানে থাকতে হবে এবং সেই সিদ্ধান্তে তিনজনে পুরোপুরি ঐক্যমতে পৌঁছাবে। বই ভাগ হবার পর ‘রাজুতে আয়!’ ‘তুই তিতুমীরে আয়!’ এমন ডাক দিয়ে মারামারি-ফাটাফাটি করা যাবে না। শান্তিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া সম্পূর্ণ হলে সেটাকে গেম থিওরি বলা যাবে। এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে কীভাবে ১০০ টা বই দেয়া শুধুমাত্র আপনার একার উপর নয়, বাকি দুজনের উপরও নির্ভরশীল। একবার চিন্তা করে দেখুন, আপনারা শূন্য হাতে ফেরত আসার চেয়ে যে কয়টা বই পাবেন তাই লাভ। এই ডিসিশন মেকিং এবং নিজেদের মধ্যে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থায় এসে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো এটাকে গেম থিওরির ভাষায় বলা হয় ‘ন্যাশ সাম্যবস্থা’। ন্যাশ সাম্যবস্থা কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই আপনি-আমি টিভিতে দেখি। ডিসকভারি চ্যানেলে মাঝে মাঝে দেখবেন, কয়েকটা সিংহ মহিষের পালকে তাড়া করছে। এখন হঠাৎ একজন লর্ড মহিষ ভাবলো,’ও মাই গড! ডিসকভারি চ্যানেল আমাকে ভিডিও করছে! পুরো দুনিয়া আমাকে দেখছে। আমি আজকে পালিয়ে যাব না। আমি আজকে সিংহের সাথে মারামারি করে বীরের মতো মরবো।’ আপনার কি মনে হয় এটা বুদ্ধিমানের মত সিদ্ধান্ত হবে? একদমই না। কারণ সিংহের মতো শিকারির সামনে ওই মহিষের টেকার কোন সম্ভাবনা নেই। কাজেই লর্ড মহিষের উচিত হবে লেজ গুটিয়ে তার দলের সাথে পালানো। আর সাথে সাথে বিষয়টা ন্যাশ সাম্যবস্থায় আসবে অর্থাৎ সিংহ-মহিষের ঘটনাটা স্বাভাবিক অবস্থায় আসলো।
এরকম সাম্যবস্থা বজায় রাখা পুরো দুনিয়ার যে কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতেই জরুরী। বর্তমানের রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ফিলিস্তিন-ইসরাইলের সংঘাত; যে কোন ঘটনাকে এ বিষয়টার সাথে তুলনা করা যায়। এর ঘটনার চমৎকার একটা উদাহরণ দেখা মেলে ১৯৬২ সালে। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রশেভ হুট করে ঘোষণা দেন, কিউবায় নিউক্লিয়ার ওয়্যারহেডসহ রাশিয়ান মিসাইল বসাতে চলেছেন। কিউবা থেকে আমেরিকার উপকূলের দূরত্ব মাত্র ২০০ কিলোমিটার। এখানে মিসাইল বসিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বোঝাতে চাইলো যে, ‘আমি মাল খেয়ে গাড়ি চালাচ্ছি, মাতাল অবস্থায় আছি। একটু পরে সানগ্লাস পরবো, মন চাইলে স্টিয়ারিং খুলে ফেলব। পারলে তুমি আমার রাস্তা ছেড়ে দাও।’ এরকম একটা জটিল পরিস্থিতিতে আমেরিকা কি করতে পারে?
এক. তারা চুপ করে বসে থাকতে পারে যেটা তাদের জন্য বড্ড অপমানজনক।
দুই. তারা যুদ্ধ শুরু করতে পারে যেটা আমেরিকাকে অর্থনৈতিকভাবে আরও দূর্বল করে দেবে।
তিন. বাকী একটাই পথ থাকলো, তারা রাশিয়ার উপর সব রকম অবরোধ চাপিয়ে দিবে।
বাস্তবে তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কেনেডি ঠিক এই ডিসিশনটা নিয়েছিলেন; রাশিয়ার উপর লাগাতার অবরোধ চাপিয়ে। অবরোধ দিয়ে এখানে কেনেডি রাশিয়াকে বুঝিয়েছে, ’আমি তোমার থেকেও বড় মাতাল। আমারও চোখে চশমা, কিছুক্ষণ পরে আমার গাড়ির ব্রেক ফেল করবে। দূরে গিয়ে মরো!’। এখানে বিষয়টা খেয়াল করুন, আমেরিকা এবং রাশিয়া দুই পক্ষের মারমুখী সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত একটা সাম্যবস্থা, একটা শান্তিপূর্ণ মীমাংসায় চলে আসলো। এই সমঝোতায় আসার কারণে কিন্তু তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলো না। যদি রাশিয়া এবং আমেরিকা যুদ্ধ জড়িয়ে পড়তো তাহলে বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা ভয়াবহ খারাপ হতো।
পুরো বইতে এরকম ছোট ছোট অনেক মজার মজার ঘটনা আছে এবং সেই ঘটনাগুলো কেন ঘটে? কী কারনে ঘটে? সেগুলোর ব্যাখ্যাও দেয়া হয়েছে গেম থিওরি ব্যবহার করে। এটা হুট করে টানা পড়ে যাওয়ার মতো বই নয়। বরং ধীরে ধীরে যত সময় নিয়ে বুঝে পড়বেন তত মজাটা পাওয়া যাবে। আন্তর্জাতিক যেকোনো ঘটনা কীভাবে আমাদের জীবনের উপরে প্রভাব ফেলে সেটা এই বই পড়লে সহজেই ধরতে পারবেন। তরুণদের ক্যারিয়ার গড়তে, ডিসিশন মেকিংয়ে দক্ষতা আনতে বইটা বেশ কাজে কাজ দেবে। এবং একই সাথে আমরা দৈনন্দিন জীবনে যত কাজ করি বেশিরভাগ কাজই গেম থিওরির সাথে সম্পর্কিত সেটা বোঝার জন্য এই বইটা পার্ফেক্ট। একটা বিষয় বলতে তো ভুলেই গেছি, ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ানের’ জ্যাক স্প্যারোর সাথে যদি আপনি গুপ্তধন লুট করার সুযোগ পান তাহলে সেটা কীভাবে ভাগ বন্টন করবেন? আপনার কী মনে হয় জ্যাক মজায় মজায় আপনাকে লুটের মাল ভাগ করে দিয়ে দিবে? মোটেও না। সেখানে অপেক্ষা করছে সবচেয়ে বড় চমক, জীবন মরণের খেলা। জ্যাক স্প্যারোর সাথে আপনাদের গেম থিওরির জার্নি কেমন লেগেছে, বইটা পড়ে আমাকে জানাবেন।